📄 নবীযুগে আদালত-ব্যবস্থা
যখন ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হয়, তখন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে আদেশ করেন, যাতে তিনি মানুষের মাঝে ফায়সালা করেন ওই বিধান অনুযায়ী, যা আল্লাহ তাআলা নাজিল করেছেন, দ্বীনি হোক বা দুনিয়াবি। এক্ষেত্রে বহু আয়াতে কারিমা এসেছে। যেমন মহান আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন—
وَأَنِ احْكُم بَيْنَهُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ 'আর আপনি তাদের মাঝে ফায়সালা করেন ওই বিধান অনুযায়ী, যা আল্লাহ নাজিল করেছেন।'৩৭৪
মহান আল্লাহ তাআলা আরও ইরশাদ করেছেন-
إِنَّا أَنزَلْنَا إِلَيْكَ الْكِتَابَ بِالْحَقِّ لِتَحْكُمَ بَيْنَ النَّاسِ بِمَا أَرَاكَ اللَّهُ
'নিঃসন্দেহে আমি আপনার প্রতি কিতাব নাজিল করেছি সত্য সহকারে, যাতে আপনি মানুষের মাঝে ওই জ্ঞান অনুযায়ী ফায়সালা করেন, যা আল্লাহ আপনাকে প্রদর্শন করেছেন।'৩৭৫
এই আয়াতগুলো থেকেই নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিচার-ব্যবস্থা উদঘাটন করেন। আর এভাবে ধীরে ধীরে ইসলামি রাষ্ট্রগুলোতে কাজা বা বিচার-ব্যবস্থা একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ ব্যবস্থার রূপ ধারণ করে।
প্রথমে মুসলিমদের মাঝে কোনো নতুন পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে, অথবা পরস্পরের মাঝে কোনো বিরোধিতা দেখা দিলে সে বিষয়ে ইসলামি বিধান জানার জন্য সাহাবায়ে কিরাম নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের শরণাপন্ন হতেন। তখন তিনি সে বিষয়ে কথা বলতেন। মূলত নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ছিলেন একজন শারে' (শরিয়ত পরিবর্তনকারী) কাজি, এবং মুনাফিফজ (বাস্তবায়নকারী)।
এর মাধ্যমে তিনি মূলত ইসলামি শাসন-ব্যবস্থার তিনটি ভিত্তি তথা, আইন ব্যবস্থা, বাস্তবায়ন ব্যবস্থা এবং বিচার-ব্যবস্থার মাঝে সমন্বয় সাধন করেছেন। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিচার-ব্যবস্থার মূলনীতি ও নীতিমালা স্পষ্ট করে দিয়েছেন। তিনি বলে দিয়েছেন যে-কাজি যখন মামলা-মোকাদ্দমা শুনবে, তখন তার কথাবার্তা ও বেশভূষা কেমন হবে। আবু দাউদ রাহিমাহুল্লাহ সুনানু আবি দাউদে আবদুল্লাহ ইবনু জুবাইর রা. থেকে বর্ণনা করেন-
قضى رسول الله صلى الله عليه وسلم أن الخصمين يقعدان بين يدي الحاكم ...
'রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আদেশ করেছেন-বাদী-বিবাদী দুজনই কাজির সামনে বসবে।'৩৭৬
সুতরাং, বসার ক্ষেত্রে উভয়কে সমান জায়গায় বসাতে হবে। তাদের কেউ যেন অপরের চেয়ে কাজির বেশি কাছাকাছি বসতে না পারে। তদ্রুপ উঁচু স্থানেও বসতে পারবে না। বরং বসার ক্ষেত্রে সবচেয়ে উত্তম হচ্ছে, উভয়ে কাজির সামনাসামনি বসা, যেমনটি হাদিসে বলা হয়েছে। তাছাড়া এর মাধ্যমে যেমন শরিয়তের হুকুমের সামনে পূর্ণ আত্মসমর্পণ ও বিনয় প্রকাশ পায়, তেমনি নিজেদের মাঝে সমান অধিকারও সাব্যস্ত করা যায়। তদ্রুপ নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বাদী-বিবাদীর মাঝে ভাষা-ভঙ্গি ও ইঙ্গিতেও ইনসাফ করার তাগিদ দিয়েছেন। যেমন: উম্মে সালামা রা. বর্ণনা করেন—
من ابتلى بالقضاء بين المسلمين فليعدل فى لحظه ولفظه وإشارته ومقعده وفي رواية من ابتلى بالقضاء بين المسلمين فليعدل بينهم في المجلس والإشارة والنظر
'যে মুসলিমদের মাঝে বিচার করার পরীক্ষায় আপতিত হবে, সে যেন তার ভঙ্গি, উচ্চারণ, ইঙ্গিত ও বসার ক্ষেত্রে ইনসাফ করে। যে মুসলিমদের মাঝে বিচার করার পরীক্ষায় আপতিত হবে, সে যেন তাদের মাঝে বসা, ইঙ্গিত ও দৃষ্টিদানের ক্ষেত্রে ইনসাফ করে।' ৩৭৭
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কাজিকে নিষেধ করেছেন, যাতে তিনি একজনের পরিবর্তে অন্যের ক্ষেত্রে আওয়াজ উঁচু না করেন। যেমন: ইমাম দারাকুতনি রাহিমাহুল্লাহর বর্ণনায় রয়েছে—
من ابتلي بالقضاء بين الناس فلا يرفعن صوته على أحد ما لا يرفع على الآخر 'কেউ যদি মানুষের মাঝে বিচার করার পরীক্ষায় আপতিত হয়, তাহলে সে যেন কারও ক্ষেত্রে আওয়াজ উঁচু না করে, যতক্ষণ না সে অপরের ক্ষেত্রে আওয়াজ উঁচু করে।' ৩৭৮
এই হাদিস থেকে স্পষ্টভাবে বোঝা যায় যে, বাদী-বিবাদীর মাঝে যতটুকু সম্ভব সমতা বিধান করা ওয়াজিব। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বাদীকে বলতেন—সে যেন নিজের হকের চেয়ে বেশি কিছু না নেয়। যেমন: আবু সায়িদ খুদরি রা.-এর হাদিসে আছে। তিনি বলেন—
أصيب رجل في عهد رسول الله صلى الله عليه وسلم في ثمار ابتاعها فكثر دينه فقال رسول الله صلى الله عليه وسلم تصدقوا عليه فتصدق الناس عليه فلم يبلغ ذلك وفاء دينه فقال رسول الله صلى الله عليه وسلم لغرمائه خذوا ما وجدتم وليس لكم إلا ذلك رواه مسلم ؛ باب استحباب الوضع من الدين)
'একবার নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের যুগে এক লোক ফল ব্যবসায় খুব ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফলে তার ঋণ অনেক হয়ে ওঠে। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, তোমরা এ লোককে সাদাকা দাও। কিন্তু সবাই সাদাকা দেওয়ার পরও তার ঋণের পরিমাণ সম্পদ হলো না। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার ঋণদাতাকে বললেন, তোমরা যতটুকু পাচ্ছ ততটুকুই নাও। (যেহেতু সে দেউলিয়া হয়ে গেছে, তার কাছে আর কিছু নেই, তাই) এছাড়া তোমাদের কিছুই নেওয়ার অধিকার নেই।'৩৭৯
এখানে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঋণদাতাদের তাদের হকের চেয়ে বেশি কিছু নিতে নিষেধ করেছেন। তাদের হক ছিল, ঋণগ্রস্ত ব্যক্তির কাছে যা পাবে, তা নেওয়া। এ হাদিস থেকে বোঝা যায়—গরিব-নিঃস্ব ব্যক্তিকে ঋণের কারণে আটকে রাখা হবে না। বরং তালবাহানাকারী ধনী ব্যক্তিকে আটক করা হবে। যেমন: নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন— مطل الغني ظلم 'ধনী ব্যক্তির তালবাহানা করা অন্যায়, জুলুম।'৩৮০
মদিনাতে তখন নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ছাড়া আর কোনো কাজি ছিল না। তিনি নিজেই কাজির দায়িত্ব নিয়েছিলেন। তবে কখনো কখনো নিজের উপস্থিতিতে কোনো কোনো সাহাবিকে বিচারের দায়িত্ব দিয়েছেন, যাতে তাঁর অনুপস্থিতিতে বা তাঁর মৃত্যুর পর তারা এ মহান দায়িত্ব আঞ্জাম দিতে পারেন। আবার, তাদেরকে অন্যান্য শহরে কাজি হিসাবে পাঠানোর আগে পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য তিনি এমনটি করতেন।
ইমাম হাকিম রাহিমাহুল্লাহ তার মুসতাদরাকে উল্লেখ করেন—
একবার নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে দুই বিবাদী এলে নবীজি আমর রা.-কে বলেন—'তুমি তাদের দুজনের মাঝে ফায়সালা করো।' তখন আমর রা. বলেন— 'ইয়া রাসুলাল্লাহ, আপনার উপস্থিতিতে আমি তাদের মাঝে ফায়সালা করব?' নবীজি বললেন—'হ্যাঁ! এ কথা স্মরণ করে ফায়সালা করো যে, যদি সঠিক ফায়সালা করো, তাহলে তোমার দশটি সাওয়াব হবে। আর যদি ইজতিহাদে ভুল করো, তাহলে তোমার একটি সাওয়াব।' হাকিম রাহিমাহুল্লাহ বলেন—হাদিসটির সনদ সহিহ। কিন্তু শাইখাইন তা উল্লেখ করেননি।৩৮১
ইমাম দারাকুতনি রাহিমাহুল্লাহ বর্ণনা করেন— একবার একদল লোক রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে বাঁশের তৈরি ঘরের বিষয়ে বিচার নিয়ে আসে, যা তাদের মাঝে শরিকানা ছিল। নবীজি তাদেরকে হুজাইফা রা.-এর কাছে পাঠান। তিনি ওই ঘরটা তাদের পক্ষে ফায়সালা করেন, যাদের নিয়ন্ত্রণে বাঁশ বাঁধার রশি ছিল। পরে তিনি নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে গিয়ে খবর দেন। নবীজি তাকে বলেন— তুমি সঠিক ফায়সালা করেছ বা উত্তম ফায়সালা করেছ। ৩৮২
যাইহোক, সময় গড়াতে গড়াতে একসময় ইসলামি রাষ্ট্রের পরিধি যখন আরও বৃদ্ধি পেল, প্রশাসকদের রাষ্ট্রের বিভিন্ন এলাকায় পাঠানোর প্রয়োজন দেখা দিল, তখন বিচার-ব্যবস্থাও প্রশাসকদের এলাকা পরিচালনা করার দায়িতের একটি অংশ ছিল। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আলি রা.-কে ইয়ামানে পাঠানোর সময় বললেন—
علمهم الشرائع واقض بينهم
'তাদের শরিয়তের বিধিবিধান শেখাও এবং তাদের মাঝে ফায়সালা করো।'
আলি রা. বললেন— 'আমার তো কাজার বিষয়ে কোনো জ্ঞানই নেই।' তখন নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আলি রা.-এর বুকে মৃদু আঘাত করে বললেন—
اللهم اهده للقضاء 'আল্লাহ আপনি তাকে কাজার জন্য পথ দেখিয়ে দেন।' ৩৮৩
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আলি রা.-কে বিচার-ব্যবস্থাও শিখিয়ে দিয়েছিলেন। আলি রা. থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন—
بعثني رسول الله صلى الله عليه وسلم إلى اليمن قاضيا فقلت يا رسول الله ترسلني وأنا حديث السن ولا علم لي بالقضاء فقال إن الله سيهدي قلبك ويثبت لسانك فإذا جلس بين يديك الخصمان فلا تقضين حتى تسمع من كما سمعت من الاول فانه أحرى أن يتبين لك القضاء قال فما زلت قاضيا أو ما سكت في
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাকে ইয়ামানে কাজি হিসাবে পাঠানোর কথা বললে আমি বললাম— 'ইয়া রাসুলাল্লাহ, আমাকে আপনি (কাজার জন্য) পাঠাচ্ছেন, অথচ আমি এখনো অপ্রাপ্তবয়স্ক? তাছাড়া আমার তো কাজার বিষয়ে জ্ঞানও নেই।'
তখন নবীজি বললেন— 'নিঃসন্দেহে, আল্লাহ তোমার অন্তরকে (কাজার) পথ দেখিয়ে দেবেন। তোমার মুখকে জোরালো করে দেবেন। শোনো, যখন তোমার সামনে বাদী-বিবাদী বসবে, তখন একজনের কথা শুনে অপরজনের কথা শোনার আগেই ফায়সালা করো না। কারণ, বিচারের ধরনটা কেমন হবে সেটাও তোমার সামনে স্পষ্ট হওয়া খুবই প্রয়োজন।'
আলি রা. বলেন-'এরপর থেকে আমি আজীবন কাজির কাজ করেছি কিংবা (বলেছেন) এরপর আমি আর কখনো কোনো বিচারে সন্দেহগ্রস্ত হই নি।'৩৮৪
ইবনু ইসহাক রাহিমাহুল্লাহ উল্লেখ করেন-
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আবু উবাইদা ইবনুল জাররাহ রা.-কে নাজরানে কাজি হিসাবে পাঠান। ঘটনা হচ্ছে-নাজরানের প্রতিনিধিদল একবার রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে এসে আবদার করল, তিনি যেন তাঁর পছন্দমতো এক সাহাবিকে তাদের সাথে পাঠান, যে তাদের মতবিরোধপূর্ণ বিষয়ে ফায়সালা করে দেবে। তখন নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আবু উবাইদা রা.-কে ডেকে বললেন-
اخرج معهم فاقض بينهم بالحق فيما اختلفوا فيه
'তুমি তাদের সাথে বের হয়ে পড়ো। তাদের মাঝে কোনো মতবিরোধ দেখা দিলে ইনসাফের সাথে তাদের মাঝে ফায়সালা করো।'
তদ্রুপ নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইবনু উসাইদ রা.-কেও মক্কা বিজয়ের পর মক্কার প্রশাসক ও কাজি নিযুক্ত করেন।
টিকাঃ
৩৭৪ সূরা মায়িদা, আয়াত: ৪৯
৩৭৫ সূরা নিসা, আয়াত: ১০৫
৩৭৬ সুনানু আবি দাউদ, ৩৫৮৮
৩৭৭ সুনানে দারাকুতনি, ৪৪৬
৩৭৮ সুনানু দারাকুতনি, ৪৪৭
৩৭৯ সহিহ মুসলিম, ১৫৫৬
(رواه البخاري عن أبي هريرة رضي الله عنه باب مطل الغني ظلم) 2800
*** ০৮১ মুসতাদরাকে হাকিম, ৭০০
৩৮২ সুনানে দারাকুতনি, ৪৫৪৫
৩৮৩ মুসতাদরাকে হাকিম, ৭০০০
*** সুনানু আবি দাউদ, ৩৫৮৩
📄 উমাইয়া খিলাফতকালে বিচার-ব্যবস্থা
উমাইয়া খিলাফতের সূচনা হয় আবু সুফইয়ান রা.-এর খিলাফত থেকে, যখন ৪০ হিজরিতে শামে মানুষরা তার হাতে বাইআত গ্রহণ করে। অর্থাৎ, চতুর্থ খলিফা আলি রা.-এর শাহাদাতের পর। যখন হাসান ইবনু আলি রা. মুআবিয়া রা.-এর জন্য খিলাফত ছেড়ে দেন, তখন সবাই ৪১ হিজরিতে মুআবিয়া রা.-এর হাতে বাইআত গ্রহণ করে, মুসলিমরা ঐক্যবদ্ধ হয়। তাই এ বছরকে আমুল জামাআত বলা হয়। আমুল জামাআত অর্থ একত্র বা ঐক্যবদ্ধ হওয়ার বছর। বনু আব্বাস আসার আগ পর্যন্ত উমাইয়া খিলাফত অব্যাহত থাকে। যখন উমাইয়াদের সর্বশেষ খলিফা মারওয়ান ইবনু মুহাম্মাদ ইবনু মারওয়ান ইবনু হাকামকে ১৩২ হিজরিতে হত্যা করা হয়। ৩৯৬
টিকাঃ
২০* আত তুরুকুল হিকমিয়্যা, ৪৭
৩* জাহিলি, তারিখুল কুজাত ফিল
📄 বিচার-ব্যবস্থায় সংযোজন
উমাইয়া খিলাফতের সময় বহু নতুন বিষয়ের উদ্ভব ঘটে, যা খিলাফত ও রাষ্ট্র পরিচালনার সাথে যুক্ত, যেমনটি ইতিহাসের পাতায় লেখা আছে। তখন ইসলামি ভূখণ্ড অনেক বিস্তৃতি লাভ করে। পূর্বদিকে সিন্ধু ও হিন্দুস্তান পর্যন্ত, পশ্চিমে আন্দালুস ও ফ্রান্স, উত্তরে রুম, আরমানিয়া এবং মা ওয়ারাউন নাহর পর্যন্ত বিস্তৃতি লাভ করে। তবে এই প্রশস্ততা সত্ত্বেও বিচার-ব্যবস্থায় তেমন কোনো প্রভাব পড়েনি। তাদের রাষ্ট্র পরিচালনা ছিল খুব শক্তিশালী। তখন ইনসাফ রক্ষিত হতো, বিশেষ করে উমার ইবনু আবদিল আজিজ রহ. এর যুগে ইনসাফ সর্বোচ্চ চূড়ায় উপনীত হয়েছিল। তবে উমাইয়া খিলাফতে বিচার-ব্যবস্থায় নতুন নতুন কিছু বিষয় সংযোজিত হয়। যেমন:
০১। খুলাফায়ে রাশিদা নিজেরাই বিচার কার্য পরিচালনা করতেন, মামলা-মোকদ্দমা, ঝগড়া-বিবাদ নিরসন করতেন। তখন বিভিন্ন এলাকার প্রশাসকও এমন ছিলেন (তারা নিজেরাই সবকিছু করতেন), যদি না তাদেরকে প্রশাসনের জন্য নির্দিষ্ট করে দেওয়া হতো। অর্থাৎ যদি না তাদেরকে বিচার কার্য থেকে নিষেধ করা হতো, তারা ছাড়া অন্য কাউকে বিচারের জন্য নির্ধারণ করা হতো। কিন্তু মুআবিয়া রা. যখন খিলাফত গ্রহণ করেন, তখন তিনি বিচার কার্য থেকে একেবারেই সরে যান। তিনি দামেশকের কাছাকাছি অঞ্চলগুলোয় কাজি নির্ধারণ করে দেন। তাদের কাছে বিচার-ব্যবস্থার যাবতীয় বিষয়াদি সোপর্দ করেন, মামলা-মোকদ্দমার ক্ষেত্রে তাদের পূর্ণ অধিকার দেন। বিভিন্ন এলাকার প্রশাসকরাও এই নীতি অবলম্বন করেন।
মোটকথা, প্রশাসন ব্যবস্থা বিচার-ব্যবস্থা থেকে সম্পূর্ণ আলাদা হয়ে যায়। এজন্যই দেখা যায় যে, উমাইয়া খিলাফতের সময় বিচার-ব্যবস্থা পুরো স্বয়ংসম্পূর্ণ ছিল। অন্য কারও অধীনে ছিল না। এমনকি শাসক বা প্রশাসকের অধীনেও ছিল না। তাদের দায়িত্ব ছিল শুধু কাজি নিযুক্ত করা বা বরখাস্ত করা। কিন্তু কাজির কোনো কাজে বা হুকুমের ক্ষেত্রে শাসক বা প্রশাসকের হস্তক্ষেপের কোনো সুযোগ ছিল না। তারা শুধু কাজিদের হুকুমগুলো বাস্তবায়ন করতেন। মুআবিয়া রা.-ই সর্বপ্রথম খলিফা যিনি পুরোপুরি বিচার-ব্যবস্থা থেকে আলাদা হয়ে যান, বিচারের দায়িত্ব অন্যজনের হাতে ছেড়ে দেন।
রাষ্ট্রের মৌলিক জায়গাগুলোয় তার কিছু কাজি ছিল। পুরো খিলাফত জুড়ে বনু উমাইয়ার খলিফারা এ পদ্ধতিই অবলম্বন করেছে। বিচার-ব্যবস্থা থেকে খলিফাদের সম্পর্ক পুরোপুরিই বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, তিনটি বিষয় ছাড়া।
এক. খিলাফতের রাজধানী দামেশকের কাজি সরাসরি খলিফার হাতে নিযুক্ত হতো। আর অন্যান্য জায়গার কাজিরা প্রশাসন কর্তৃক নিযুক্ত হতো।
দুই. কাজিদের কাজকর্ম, তাদের বিচার কার্য পর্যবেক্ষণে রাখা। তারা যে সকল বিচার করে, সেগুলো বিশ্লেষণ করা।
তিন. অন্যায়ভাবে কেড়ে নেওয়া সম্পত্তির বিচার করা। 'হাসাবা' গঠন করা।
উমাইয়া খলিফারা অন্যায়ভাবে ছিনিয়ে নেওয়া সম্পত্তির বিচারে আলাদা গুরুত্ব দিত। একসময় সেজন্য সম্পূর্ণ ভিন্ন ব্যবস্থাপনাও কায়েম করা হয়। উমাইয়া খলিফাদের মধ্যে আব্দুল মালিক ইবনু মারওয়ানই প্রথম, যিনি অন্যায়ভাবে ছিনিয়ে নেওয়া সম্পত্তির বিষয়ে দেখাশোনা করেন। তারপর বিষয়টি আরও ব্যাপক হয়ে যায়।
খলিফা আব্দুল মালিক অন্যায় সম্পত্তির জন্য আলাদা একদিন নির্ধারণ করেন। সেদিন তিনি মাজলুমদের সব কথা শুনতেন, তখন যদি কোনো সমস্যা দেখা দিত, বা কোনো হুকুম কার্যকর করার প্রয়োজন হতো, তাহলে তার কাজি আবু ইদরিস আজদির কাছে পাঠিয়ে দিতেন। তখন আবু ইদরিস সে হুকুম বাস্তবায়ন করত। অর্থাৎ, আবু ইদরিস বিচার সম্পন্ন করতেন, আর আব্দুল মালিক আদেশ করতেন। তারপর মহান ন্যায়পরায়ণ শাসক ও খলিফা উমার ইবনু আবদিল আজিজ এই গুরুদায়িত্ব পালন করো জিনিক প্রথমো নিজেকে দিয়েই শুরু করেছিলেন। তার নিজের সম্পদ, স্ত্রীর সম্পদ, সব বাইতুল মালে ফিরিয়ে দেন। তারপর তিনি বন্ধু উমাইয়ার মধ্য হতে তার আত্মীয়সুজনদের সম্পদের হিসাব করেন। তারপর প্রশাসক ও গভর্নরদের বিষয়ে মনোযোগ দেন। তিনি এক ধাপেই বারো জন গভর্নরের ধনসম্পদ বাইতুল মালে ফেরত দেন।
তিনি তার দরজা খুলে দেন, যাতে রাষ্ট্রের যেকোনো প্রান্ত থেকে জনগণ অভিযোগ ও লুণ্ঠিত সম্পদের বিচারের জন্য আসতে পারে। এক্ষেত্রে তার অনেক বিস্ময়কর ঘটনা, আশ্চর্যকর কাহিনী ও ইনসাফপূর্ণ বিচার রয়েছে, যার মাধ্যমে উদাহরণ পেশ করা হয়। ৩৯৭
০২। উমাইয়া খিলাফতের সময় বিচারের বেশ কয়েকটি উৎস সৃষ্টি হয়েছে, যা নববি যুগ বা খিলাফতে রাশিদার যুগে ছিল না। তা হলো—
* সাহাবির উক্তি;
* ইজমা;
* পূর্ববর্তী কাজা বা বিচার।
০৩। উমাইয়া খিলাফতেই প্রথম বিভিন্ন বিচার লিপিবদ্ধ করে রাখা হয়। কাজি নিজের কৃত বিচারগুলো ফাইলে লিপিবদ্ধ করে রাখতেন, যাতে প্রয়োজনের সময় আবার দেখা যায়, অথবা যাতে ভুলে না যান, বা কেউ অস্বীকার করতে না পারে। সর্বপ্রথম যিনি লিপিবদ্ধ করা শুরু করেন, তিনি হলেন মুআবিয়া রা.-এর সময়কালের মিসরের কাজি সুলাইম ইবনু আতর তাজিবি। একবার কিছু লোক তার কাছে মিরাস বণ্টনের বিষয়ে বিচার নিয়ে আসলে তিনি তাদের মাঝে ফায়সালা করে দেন। এরপর কিছুকাল তাদের দেখা পাওয়া যায় না। পরে তারা আবার নিজেদের মাঝে ইখতিলাফ ও মতবিরোধ শুরু করে, পূর্বের করা ফায়সালাকে অস্বীকার করে বসে। এরপর তারা দ্বিতীয়বারের জন্য কাজি সুলাইমের কাছে আসে, তখন তার এ লোকগুলোর ঘটনা মনে পড়ে যায়। তিনি তাদেরকেও ওই ঘটনা স্মরণ করিয়ে দিলে তারা স্বীকার করে, তখন তিনি আবার সেই আগের হুকুমই প্রয়োগ করেন। আর কাতিবকে বলেন, এসব হুকুম লিপিবদ্ধ করে রাখার জন্য। তিনি তাদের বিচারের একটি ফাইল তৈরি করে ফেলেন, সাথে সাক্ষীও রেখে দেন। ৩৯৮
ইমাম কিনদি রাহিমাহুল্লাহ বলেন— 'মিসরের প্রথম শাসক সুলাইম-ই সর্বপ্রথম নিজের বিচার নিয়ে একটি ফাইল তৈরি করেন। আমাদের জানামতে, সুলাইম-ই সর্বপ্রথম বিচারের বিষয়ে সাক্ষী রাখতেন, যাতে তা সুদৃঢ় হয়ে যায় এবং কেউ অস্বীকার করতে না পারে। তারপর বনু আব্বাসের মাঝেও সেটা স্থান পায়।'
০৪। মামলা-মোকদ্দমা বিন্যাস করা। খাদী-বিবাদীরা যেন একজনের পর একজন পর্যায়ক্রমে আসতে পারে এজন্য চিরকুট ব্যবহার করা শুরু হয়।
০৫। কাজিদের সহযোগী নিযুক্তকরণ। তারা হলো বিচারালয়ে বসে থাকা সাহায্যকারী, এবং নিরাপত্তা বাহিনী।
মাওসুআতুস সিয়ারে (খণ্ড : ৯, পৃষ্ঠা : ২৭০) আছে—উমার ইবনু আবদিল আজিজ কাজিদের নির্বাচনে খুব সূক্ষ্ম দৃষ্টি রাখতেন, যাতে জনগণের ওপর এমন কাজি চেপে না বসে, যে তাদের মাঝে অন্যায়ভাবে ফায়সালা করবে। এজন্য উমার ইবনু আবদিল আজিজ কাজির জন্য পাঁচটি শর্ত নির্ধারণ করেছেন। এই পাঁচটি শর্ত পূর্ণ হওয়ার আগ পর্যন্ত বিচারক হওয়া যাবে না। সেগুলো হলো—
* এক. ইলম;
* দুই. হিলম (সহনশীলতা);
* তিন. চারিত্রিক পবিত্রতা;
* চার. পরামর্শ করা
* পাঁচ. সত্য প্রকাশে সাহসিকতা
আব্বাসি খিলাফতকালে বিচার-ব্যবস্থা
আব্বাসি খিলাফতের সূচনা হয় ১৩২ হিজরিতে, যখন বনু আব্বাস উমাইয়াদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে, আবু আব্বাস সাফফাহর হাতে খিলাফতের বাইআত করা হয়। এর সমাপ্তি হয় ৬৫৯ হিজরিতে তাতারিদের হাতে বাগদাদ ধ্বংস হওয়ার মাধ্যমে, যখন বনু আব্বাসের সর্বশেষ খলিফা মুতাসিম বিল্লাহকে হত্যা করা হয়। আব্বাসিদের খিলাফতকাল বহু দীর্ঘ ছিল। ইসলামি ইতিহাসের সবচেয়ে বৃহৎ শাসন-ব্যবস্থা ছিল আব্বাসি খিলাফত। এই খিলাফত পাঁচ শতাব্দীরও বেশি (৫২৪ বছর) অব্যাহত ছিল, যা উমাইয়া খিলাফতের ৬ গুণ এবং খিলাফতে রাশিদার ১৮ গুণ। মানচিত্রে আব্বাসি খিলাফত ছিল ইসলামি সাম্রাজ্যের সবচেয়ে বিস্তৃত সাম্রাজ্য। তাদের ভূমির বিস্তৃতি ছিল অনেক দীর্ঘ। দক্ষিণে জাযিরাতুল আরব, উত্তরে মা ওয়ারাউন নাহর, আজারবাইজান, আরমানিয়া, আফগানিস্তান, বুখারা, তাশকন্দ, বাঙ্গাল, সিন্ধু, তুর্কিস্তান, পশ্চিমে আফ্রিকা পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল।
আব্বাসি খিলাফতের দুইটি যুগ ছিল—
প্রথম যুগ : এই যুগ ছিল স্বর্ণযুগ (১৩২ হিজরি থেকে ২৪৬ হিজরি পর্যন্ত), যখন তুর্কিরা মুতাওয়াকিকল আলাল্লাহকে হত্যা করে, তখন তারা তার ছেলে মুনতাসির বিল্লাহকে পিতার স্থানে বসায়। রাষ্ট্র ক্ষমতা ছিল তখন খলিফাদের হাতে। রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে তাদের কথাই গ্রহণযোগ্য ছিল। সে যুগে জ্ঞান-বিজ্ঞান, শিল্প- প্রযুক্তি, সভ্যতা-সংস্কৃতির বসন্ত বাহার ছিল। নেতৃত্ব, বাস্তবায়ন, শক্তি, প্রতাপ- সব ক্ষেত্রেই এই প্রথম যুগ অন্যান্য যুগের চেয়ে ভিন্ন এবং অনন্য ছিল, চাই তা বাহিরে বা ভেতরে, অথবা হোক রাষ্ট্রীয় ক্ষেত্রে।
দ্বিতীয় যুগ: এই যুগটি ছিল দুর্বলতা ও অস্থিরতার যুগ, যখন মুসলিমদের ঐক্যে ফাটল দেখা দেয়, যার সূচনা ২৪৭ হিজরি থেকে ৬৫৬ হিজরি পর্যন্ত। তখন রাষ্ট্র ক্ষমতা হয় উজিরে আলির (প্রধানমন্ত্রী) হাতে ছিল, অথবা সেনাপ্রধানের নেতৃত্বে ছিল, কিংবা অন্যান্য অনেক বিষয়াদি তত্ত্বাবধায়কের হাতে ছিল। খলিফাদের বিভিন্ন দুর্বলতার চিত্র প্রকাশ পাচ্ছিল। একই সাথে রাষ্ট্রে অভ্যন্তরীণ বিভক্তি বাড়ছিল, দুর্বলতা ও ফাটল ধরার উপক্রম হচ্ছিল। সবাই নিজের মনমতো হুকুম বাস্তবায়ন করত। অনেক এলাকার প্রশাসকগণ তো পুরোপুরি স্বাধীনতা ঘোষণা করে স্বয়ংসম্পূর্ণও হয়ে যায়। অবশ্য কেউ কেউ বাগদাদের খিলাফতকে স্বীকার করত, কিন্তু হুকুমের ক্ষেত্রে কোনো তোয়াক্কাই করত না। আব্বাসিদের দ্বিতীয় যুগের এই প্রভাব প্রথম যুগের বিচার-ব্যবস্থার ওপরও পড়ে। প্রথম যুগে বিচার-ব্যবস্থা পুরো খিলাফত জুড়ে এক ছিল (সবকিছু ছিল খলিফার কর্তৃত্বে)। কিন্তু দ্বিতীয় যুগে যখন প্রশাসকরা স্বাধীন হয়ে যায়, তখন তারা নিজেরাই বিচার-ব্যবস্থা পরিচালনা করত। একসময় দেখা গেল অধিকাংশ এলাকাগুলোতেই প্রশাসকরা প্রধান বিচারপ্রতি হিসাবে থাকত। ১৯
রাজনৈতিক দিক থেকে আব্বাসি খিলাফত উমাইয়া খিলাফতের জন্য একটি ইনকিলাব বা বিদ্রোহের নামান্তর ছিল। তাই, আব্বাসি খলিফারা উমাইয়া খিলাফতের নিদর্শন, চিহ্ন পরিবর্তন করে ফেলে, তাদের সভ্যতা ও সংস্কৃতি মুছে ফেলে। খিলাফতের রাজধানী শাম, দামেশক থেকে ইরাক ও বাগদাদে রূপান্তরিত হয়। এজন্য রাজনৈতিক ক্ষেত্রে আরবি ভাষার প্রাণ হারিয়ে যায়, প্রথমে ফারসি ভাষা পরবর্তী সময়ে তুর্কি ভাষার প্রকাশ ঘটে।
এটা ছিল রাজনৈতিক দিক থেকে। কিন্তু শিক্ষা, বিচার-ব্যবস্থার দিক থেকে এমনটি ছিল না বরং আগের মতোই ছিল, তবে কিছুটা উন্নত হয়েছিল। এই ইনকিলাবের কারণে এ দুটো বিষয়ে তেমন পার্থক্য সৃষ্টি হয় নি। বরং উমাইয়া খিলাফতের শিক্ষা ও বিচার-ব্যবস্থাকে আব্বাসি খলিফারা আরও উন্নত করেছে। খিলাফতে রাশিদায় বিচার-ব্যবস্থার যে সকল মূলনীতি ছিল, সেগুলোও আপন জায়গায় বহাল ছিল। এমনকি খিলাফতে উমাইয়ার বহু কাজি আব্বাসি খিলাফতের পরও নিজ নিজ পদে বহাল ছিলেন। বহু ইমাম উলামা ও ফুকাহায়ে কিরাম দুই খিলাফতের সময়ই ছিলেন। তারা দুই খিলাফতই প্রত্যক্ষ করেছেন। যেমন: ইমাম আবু হানিফা রহ., ইমাম আওযায়ি রহ., মদিনার কাজি ইয়াহইয়া ইবন সায়িদ আনসারি দুই খিলাফতেই কাজি হিসাবে ছিলেন—আবু জাফর মানসুরি তাকে ইরাকের হাশিমি এলাকার কাজি বানিয়েছেন। অধিকাংশ এলাকায় উমাইয়া খিলাফতের কাজি, আব্বাসি খিলাফতেরও কাজি ছিলেন। যেমন: মুহাম্মাদ ইবন ইমরান, উমাইয়া খিলাফতে মদিনার সর্বশেষ কাজি ছিলেন। খলিফা মানসুর এসে তাকে মদিনার কাজি হিসাবেই বহাল রাখেন।
রাষ্ট্র পরিচালনা ও বিচার-ব্যবস্থার ক্ষেত্রে আব্বাসি খলিফাগণ উমাইয়া খিলাফত থেকে বেশ ফায়দা গ্রহণ করেন। একই সাথে যুগোপযোগী বেশ কিছু নতুন বিষয়ও যুক্ত করেন। এভাবে বিচারালয় খুব বিস্তৃতি ও প্রশস্ততা লাভ করে। এর প্রমাণ হচ্ছে (ইমাম মালিকের বর্ণনায়) উমার ইবনু আবদিল আজিজ বলেন—
يحدث للناس من الأقضية بقدر ما يحدث لهم من الفجور
‘মানুষের মাঝে যে পরিমাণ পাপাচার ও অশ্লীলতা অনুপ্রবেশ করবে, সে পরিমাণ বিচার ফায়সালাও বৃদ্ধি পাবে।’
সুতরাং, যখন জীবনব্যবব্যবস্থা অগ্রগতি লাভ করল, জ্ঞান-বিজ্ঞান, বিশেষ করে ‘ফিকহ’ শাস্ত্র উন্নীত হলো, তখন বিচার-ব্যবস্থারও অগ্রগতি ঘটল। উমাইয়া খিলাফতের যে সকল দুর্বলতা ও ত্রুটি ছিল, আব্বাসি খলিফাগণ সেগুলো সংশোধন করেন। তারা শাসন-ব্যবস্থার পাশাপাশি বিচার-ব্যবস্থাকেও ঢেলে সাজান। বিচার- ব্যবস্থাকে আলাদা গুরুত্ব প্রদান করেন। আবু জাফর মানসুর এসে কাজিদের নিয়োগ করার অধিকার বাগদাদের খলিফার হাতে সোপর্দ করেন।
আব্বাসি খলিফারা লুণ্ঠিত সম্পদ বিচারের বিষয়ে খুব গুরুত্ব দেন। ‘হাসাবা’র জন্য তারা আলাদা বিচার-ব্যবস্থা খোলেন। আব্বাসি খিলাফতেই সর্বপ্রথম লুণ্ঠিত সম্পদ বিচারের জন্য আলাদা ঘর বানানো হয়। সেটাকে দারুল আদল (ইনসাফের ঘর) বলা হতো। প্রায় অধিকাংশ খলিফাগণই মাজালিমের বিচারের জন্য বসেন। অন্যান্য বিচার-ব্যবস্থা শাসক ও প্রশাসকদের দায়িত্বমুক্ত থাকত। তাদের দায়িত্ব ছিল শুধু কাজি নিয়োগ ও বরখাস্ত করা। বিচার কার্যে তাদের অনুপ্রবেশের অধিকার ছিল না। তবে কোনো কোনো খলিফা অনুপ্রবেশের চেষ্টা করে যাতে নিজেদের মত খাটানো যায়, কিন্তু তখন উলামায়ে কিরাম বিচার পদ গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানাতে শুরু করেন।৪০০
টিকাঃ
৩৯৭ তারিখুল কাজা ফিল ইসলাম
৩৯৮ তারিখুল কাজা ফিল ইসলাম
*১৯ তারিখুল কাজা ফিল ইসলাম
📄 উসমানি খিলাফতকালে বিচার-ব্যবস্থা
উসমানি খিলাফত দু-ভাবে বিভক্ত-
প্রথম ভাগ : যখন থেকে দাওলাতে উসমানিয়ার সূচনা হয়, তখন থেকে খ্রিস্টীয় ১৯ শতাব্দীর মধ্যভাগ পর্যন্ত। অর্থাৎ, সুলতান আব্দুল মাজিদের শাসনামল (১২৫৫ হিজরি বা ১৮৩৯ খ্রিস্টাব্দ) পর্যন্ত; মানে প্রায় সাড়ে তিন শতাব্দী। তখন আইন-কানুন ছিল পুরোপুরি ইসলামভিত্তিক, বিচার-ব্যবস্থা ছিল দ্বীন ও শরিয়তের আলোয় আলোকিত।
দ্বিতীয় ভাগ : ১৯ শতাব্দীর মধ্যভাগ থেকে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তি পর্যন্ত যুদ্ধের ফলস্বরূপ আরব দেশগুলো দাওলাতে উসমানিয়া থেকে পৃথক হয়ে যায়।
এই দ্বিতীয় ভাগে রাষ্ট্রের আইন-কানুনের উৎস অনেকগুলো হয়ে যায়, বিচার-ব্যবস্থায় অনেক কিছু যুক্ত হয়, বৈদেশিক অনেক আইন-কানুন অনুপ্রবেশ করে, বিজাতিদের আদালত প্রতিষ্ঠা করা হয়। এটা তখন শুরু হয়, যখন বিভিন্ন অধিকার, বিচার-ব্যবস্থার বৈশিষ্ট্যগুলো দেশের বাইরের সংখ্যালঘু সম্প্রদায় এবং দেশের ভেতরে থাকা বৈদেশিক নাগরিকদের দেওয়া হয়। প্রথমে এই স্বাতন্ত্র্যগুলো ব্যবসায়িক ও রাজনৈতিক স্বার্থের উদ্দেশ্যে কোনো কোনো সুলতান অন্যান্য দেশকে দেয়। যার ফল খুবই খারাপ হয়, যা খিলাফতের প্রতি শ্রদ্ধা ও গাম্ভীর্যও কমিয়ে দেয়। ধীরে ধীরে নেতৃত্বাধীন ভূখণ্ডগুলো কমতে থাকে। বিজাতিরা শাসন কার্যে অনুপ্রবেশ করে এবং বিভিন্ন ভূখণ্ড থেকে সুবিধা ভোগ করতে থাকে।
এই সমস্যাগুলো আরও বড়ো আকার ধারণ করে, যখন ফ্রান্সের সাথে উসমানি খিলাফতের চুক্তি হয়, যা সুলতান সুলাইমান আল-কানুনির তত্ত্বাবধানে হয়েছিল। এটাই ছিল প্রথম চুক্তি, যার মাধ্যমে উসমানি খিলাফতের দুর্বলতা প্রকাশ পায়। অথচ এই দাওলাতে উসমানিয়া এক সময় কী শক্তি ও দাপটের সাথে ছিল! মূলত, এই চুক্তিটিই ফ্রান্সের সরকারের সামনে উসমানিদের দুর্বলতা, লাঞ্ছনা ও নত হওয়া প্রমাণ করে। এই চুক্তিতে উল্লেখ ছিল—
০১। ফ্রান্সের রাষ্ট্রদূত তার যে সকল দায়িত্ব আছে, অর্থাৎ ফ্রান্সের নাগরিকদের মামলা-মোকদ্দমা, অপরাধমূলক সমস্যা; সেগুলো তিনি শুনতে পারবেন, বিচার করতে পারবেন এবং ফায়সালা করতে পারবেন। এক্ষেত্রে কোনো প্রশাসক বা শরয়ি কাজি কিংবা অন্য কোনো পদের কেউ তাকে বাধা দিতে পারবে না।
০২। ফ্রান্সের ব্যবসায়ী বা অন্যান্য নাগরিকদের মামলা-মোকদ্দমার ক্ষেত্রে কোনো অবস্থাতেই শরয়ি কাজির হস্তক্ষেপ চলবে না। এমনকি যদি তারা নিজেরাও এসে বিচার করার আবদার করে, তবুও না। এ অবস্থায় তিনি যদি কোনো ফায়সালা করেনও, তাহলেও সেটা অকার্যকর হবে, সেটা কোনোভাবেই আমলে নেওয়া হবে না। সেটা কার্যকরও হবে না, যদি না ফ্রান্সের রাষ্ট্রদূত সম্মতি জানায়।
০৩। কোনো তুর্কি বা খারাজ উশুলকারী, অথবা অন্য কোনো প্রভাবশালী রাষ্ট্রের নাগরিকদের অভিযোগের ভিত্তিতে কোনো শরয়ি কাজির এই অধিকার নেই যে, তিনি ফ্রান্সের ব্যবসায়ী বা সাধারণ নাগরিকদের বিরুদ্ধে কোনো মামলা-মোকদ্দমা শুনবেন বা ফায়সালা করবেন। বরং কাজির কর্তব্য হলো, অপরাধীদেরকে সদরে আজমের বাসভবনের প্রদান ফটকে উপস্থিত করা।
০৪। কোনো বিদেশি নাগরিককে আটক করা যাবে না। তার ঘরে প্রবেশ করা যাবে না, তার কাছে বিচারের কোনো চিরকুট পাঠানো যাবে না। তাকে আদালতে উপস্থিত করা যাবে না। মোটকথা, তার বিরুদ্ধে কোনো হুকুমই আরোপ করা যাবে না। হ্যাঁ, প্রয়োজন হলে তার রাষ্ট্রদূতের মাধ্যমে এসব বিষয়ের সমাধান করতে পারবে।
এ সকল লাঞ্ছনাকর চুক্তির মূল কারণ ছিল একটাই। সেটা হলো, দাওলাতে উসমানিয়ার দুর্বলতা ১০১
টিকাঃ
* তারিখুল কাজা ফিল ইসলাম