📄 ০৪. বংশ রক্ষা করা
এ কারণেই আল্লাহ তাআলা জিনার হদ জারি করেছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন- الزَّانِيَةُ وَالزَّانِي فَاجْلِدُوا كُلَّ وَاحِدٍ مِنْهُمَا مِائَةَ جَلْدَةٍ 'ব্যভিচারিণী ও ব্যভিচারী তাদের প্রত্যেককে তোমরা একশটি করে বেত্রাঘাত করো।' ৩৫৯
টিকাঃ
***সূরা নূর, আয়াত: ২
📄 ০৫. ইজ্জত-আব্রুর হিফাজত করা
এই ইজ্জত-আব্রুর হিফাজতের জন্যই 'কাযিফকে' (অপবাদ আরোপকারীকে) ৮০টি বেত্রাঘাতের (হদ্দে কযফ) হুকুম আরোপ করা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন- وَالَّذِينَ يَرْمُونَ الْمُحْصَنَاتِ ثُمَّ لَمْ يَأْتُوا بِأَرْبَعَةِ شُهَدَاءَ فَاجْلِدُوهُمْ ثَمَانِينَ جَلْدَةً 'আর যারা সতী নারীদের অপবাদ দেয়, অতঃপর তারা চারজন সাক্ষী উপস্থিত করতে না পারে, তাহলে তাদের ৮০টি বেত্রাঘাত করো।'৩৬০
টিকাঃ
*” সূরা নূর, আয়াত: ৪
📄 ০৬. সম্পদ রক্ষা করা
এজন্য আল্লাহ তাআলা হাত কাটার বিধান আরোপ করেছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন-
وَالسَّارِقُ وَالسَّارِقَةُ فَاقْطَعُوا أَيْدِيَهُمَا جَزَاءً بِمَا كَسَبَا نَكَالًا مِّنَ اللَّهِ وَاللهُ عَزِيزٌ حَكِيمٌ (۳۸) 'আর তোমরা পুরুষ ও নারী চোরের হাত কাটো তাদের কৃতকর্মের কারণে, আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে শাস্তিস্বরূপ।'৩৬১
উপরের আলোচনা থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়, কুরআনের বিধিবিধান রাষ্ট্রে বাস্তবায়িত করলে রাষ্ট্রে অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক সকল কল্যাণের ধারা উপচে পড়বে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিভিন্ন প্রশাসক, গভর্নরদের কাছে পাঠানো চিঠিতে অভ্যন্তরীণ মন্ত্রণালয়ের বেশ কিছু মূলনীতি তুলে ধরেছেন। যেমন: রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন আলা ইবনু হাজরামিকে বাহরাইনে পাঠিয়েছেন তখন বেশ বড়ো একটি চিঠি লিখেন। নিচে চিঠিটি তুলে ধরা হলো-
"বিসমিল্লাহির রহমানির রহিম।
এই চিঠি মুহাম্মাদ ইবনু আবদিল্লাহ, যিনি নবী, উম্মি, কুরাইশি, তাঁর পক্ষ থেকে আলা ইবনু হাজরামি ও সাথে থাকা অন্যান্য মুসলিমদের জন্য। এটা মূলত একটি নির্দেশনামা, যা নবীজি তাদের উদ্দেশ্য পাঠিয়েছেন।
হে মুসলিমগণ, তোমরা সাধ্যানুযায়ী আল্লাহকে ভয় করো। আমি আলা ইবনু হাজরামিকে তোমাদের আমির বানিয়েছি। তাকে আমি আদেশ করেছি, যাতে সে আল্লাহকে ভয় করে-যার কোনো শরিক নেই; এবং যাতে সে তোমাদের সাথে কোমল আচরণ করে, হকের ওপর চলে, তোমাদের মাঝে এবং অন্যান্যদের মাঝে কুরআনকে সামনে রেখে ইনসাফের সাথে ফায়সালা করে। আর আমি তোমাদেরকে আদেশ করছি, যাতে তোমরা তার আনুগত্য করো। যদি সে উল্লিখিত দায়িত্ব আদায় করে-বিচার করলে ইনসাফ করে, তার কাছে দয়া চাইলে দয়া করে, তাহলে তোমরা তার কথা শোনো, তার আনুগত্য করো, তাকে রাষ্ট্রীয় কাজে সাহায্য করো। কারণ, তোমাদের ওপর আমার আনুগত্যের হক আছে। এছাড়া এমন কিছু হক আছে, যা তোমরা পুরোপুরি কদর করতে পারবে না। আসলে বলে বোঝানো যাবে না যে, আল্লাহর হক ও তাঁর রাসুলের হক কত বড়ো।
শোনো, ব্যাপকভাবে সকল মানুষের ওপর, বিশেষ করে তোমাদের ওপর আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের আনুগত্য, তাঁদের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করার হক আছে। আল্লাহ তাআলা তাদের প্রতি সন্তুষ্ট থাকুন—যারা আনুগত্যকে আঁকড়ে ধরে, অনুসৃত ব্যক্তির হক, শাসকের হককে গুরুত্বের সাথে দেখে, ঠিক তেমনিভাবে মুসলিমদের ওপর তাদের শাসকদের জন্য আনুগত্যসহ অন্যান্য হক রয়েছে। এই আনুগত্যের মাঝেই নিহিত রয়েছে সকল কল্যাণের উৎস, যা মানুষ পেতে চায়। এই আনুগত্যের মাঝেই রয়েছে সকল অনিষ্টতা থেকে মুক্তির পথ, যা থেকে মানুষ সুরক্ষা পেতে চায়।
আমি আল্লাহকে সাক্ষী রেখে বলছি—কাউকে আমি মুসলিমদের ছোটো বা কোনো বড়ো দায়িত্ব দেওয়ার পর যদি সে তাদের মাঝে ইনসাফ না করে, তাহলে তার আনুগত্য করা হবে না। সে দায়িত্ব থেকে বরখাস্ত। সে মুসলিমদের প্রতিশ্রুতি, অঙ্গীকার ও দায়িত্ব থেকে মুক্ত।
অতএব, তোমরা (আমির) নির্বাচনের সময় আল্লাহর কাছে কল্যাণ চেয়ে নাও। ইস্তিখারা করো। তারপর নিজেদের মধ্য থেকে একজন শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিকে নিয়োজিত করো।
জেনে রাখো, যদি আলা ইবনু হাজরামি কোনো অন্যায় করে বসে, তাহলে খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ তোমাদের মাঝে আলা ইবনু হাজরামির জন্য আল্লাহর তরবারি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সুতরাং, তোমরা তার কথা শোনো, আনুগত্য করো; যতক্ষণ না সে হকের ওপর থেকে সরে যায়। তোমরা আল্লাহ তাআলার বরকত, নুসরত, সাহায্য, সুস্থতা, হিদায়াত ও তাউফিকের সাথে থাকো।
যাদের সাথেই তোমাদের দেখা হবে তাদের দাওয়াত দাও—আল্লাহ তাআলার কিতাব, তাঁর বিধান, তাঁর রাসুলের বিধান, আল্লাহ তাআলা যা কুরআনে কারিমে হালাল করেছেন, তা হালাল হিসাবে মেনে নেওয়া এবং যা কিতাবে হারাম করেছেন, তা হারাম বলে মেনে নেওয়া এসবের দিকে। আর তারা যেন আল্লাহ তাআলার জন্য সমকক্ষ সাব্যস্ত করা থেকে বিরত থাকে, শিরক ও কুফর থেকে সম্পর্কহীনতার ঘোষণা করে, তাগুত, লাত, উজ্জার ইবাদাতকে অস্বীকার করে। ঈসা ইবনু মারইয়াম, উজাইর ইবনু হুরওয়া, ফেরেশতা, সূর্য, চাঁদ, আগুন, এছাড়া আরও অন্যান্য যে সকল জিনিসকে আল্লাহর পরিবর্তে গ্রহণ করা হয়—এ-সবের ইবাদাতকে ছেড়ে দেয়। তারা যেন আল্লাহ ও তাঁর রাসুলকে বন্ধু হিসাবে গ্রহণ করে। আল্লাহ ও তাঁর রাসুল যা থেকে সম্পর্কহীনতার ঘোষণা করেছেন, তা থেকে সম্পর্কচ্ছেদ করে।
তারা যদি এ সকল কাজ সম্পন্ন করে, স্বীকার করে এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের বন্ধুত্ব গ্রহণ করে, তাহলে আল্লাহ তাআলার কিতাবে থাকা যে সকল বিষয়গুলোর দিকে তোমরা তাদের ডাকো, সেগুলো তাদের সামনে স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করো এবং বলে দাও—'এটা আল্লাহ তাআলার কিতাব, যা রুহুল আমিনের (জিবরাইল আ.) মাধ্যমে নাজিল করা হয়েছে বিশ্বজগতের শ্রেষ্ঠতম ব্যক্তি মুহাম্মাদ ইবনু আবদিল্লাহর ওপর, যিনি আল্লাহর রাসুল ও নবী, যাকে আল্লাহ বিশ্ববাসীর জন্য রহমতস্বরূপ পাঠিয়েছেন, সাদা হোক বা কালো, জিন হোক বা মানুষ। এটা এমন এক কিতাব, যাতে তোমাদের পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সকল বিষয়ের সংবাদ রয়েছে।
এ কিতাব নাজিল করা হয়েছে, যাতে সেটা মানুষের পরস্পরের মাঝে প্রতিবন্ধক হতে পারে, যা দ্বারা আল্লাহ তাআলা পরস্পরকে পরস্পরের খারাপ আচরণ থেকে, পরস্পরের ইজ্জত-আব্রু পরস্পরের হাত থেকে বিরত রাখবেন। এটা আল্লাহ তাআলার কিতাব, সকল কিতাবের ওপর ফায়সালাকারী—তাওরাত, ইনজিল ও জাবুরে যা এসেছে, তার সত্যায়নকারী। এর মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা তোমাদের সংবাদ দেন, যা তোমাদের হাত ছাড়া হয়ে গেলেও তোমাদের পূর্বপুরুষরা পেয়েছে। যাদের কাছে আল্লাহ তাআলার রাসুলগণ ও আম্বিয়ায়ে কিরাম এসেছেন, তারা কেমন জবাব দিয়েছিল তাদের রাসুলদেরকে, আল্লাহ তাআলার আয়াতসমূহকে তারা কেমন বিশ্বাস করেছিল, আল্লাহ তাআলার আয়াতসমূহ নিয়ে কেমন ছিল তাদের মিথ্যা প্রতিপন্নতা?
আল্লাহ তাআলার তাঁর এ কিতাবে উল্লেখ করেছেন, তাদের বংশ, তাদের কাজকর্ম এবং তাদের রাজা-বাদশাহদের কাজকর্ম, যাতে তোমরা তাদের মতো করা থেকে বিরত থাকতে পারো। আল্লাহ তাআলার কিতাবে বর্ণিত তাদের ওপর আপতিত কোনো শাস্তি, গজব, বা পাকড়াও যেন তোমাদের ওপর এসে না পড়ে, যেমনটি তোমাদের পূর্ববর্তীদের ক্ষেত্রে তাদের বদ আমলের কারণে হয়েছিল। কারণ, তারা আল্লাহ তাআলার আদেশের ক্ষেত্রে শিথিলতা করেছিল।
তদ্রূপ আল্লাহ তাআলা তাঁর এ কিতাবে তাদের কথাও বলেছেন, যারা তোমাদের পূর্ববর্তীদের মধ্য হতে নাজাত পেয়েছে, যাতে তোমরাও তাদের মতো আমল করতে পারো। আল্লাহ তাআলা তাঁর এ কিতাবে সবকিছুই উল্লেখ করেছেন তোমাদের প্রতি দয়া ও অনুগ্রহস্বরূপ। তোমাদের প্রতি মায়া ও মমতাস্বরূপ।
এ কিতাব গোমরাহি থেকে হিদায়াত দান করে, অন্ধত্ব থেকে স্পষ্ট করে, পদস্থলন থেকে রক্ষা করে, ফিতনা থেকে মুক্তির উত্তরণ করে, অন্ধকার থেকে আলোর পথ সুগম করে, যাবতীয় রোগ থেকে আরোগ্য দান করে, ধ্বংস থেকে রক্ষা করে, ভ্রষ্ট পথ থেকে সুপথ দেখায়, অস্পষ্টতা থেকে স্পষ্টতা দান করে, দুনিয়া থেকে আখিরাত পর্যন্ত কী কী হরেন।
এ কুরআনের মাঝেই রয়েছে তোমাদের দ্বীনের পূর্ণাঙ্গতা। অতএব, তোমরা যখন এসব বিষয় তাদেরকে বলবে, আর তারাও সেগুলো স্বীকার করে নেবে, তাহলে তারা 'ওলা' বা বন্ধুত্বকে পূর্ণাঙ্গ করে নিল।
সুতরাং, এখন তাদের সামনে ইসলাম পেশ করো। ইসলাম হলো পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়া, জাকাত আদায় করা, বাইতুল্লাহর জিয়ারত করা, রামাদানের রোজা রাখা, জানাবাত বা নাপাক অবস্থা (গোসল ফরজ হওয়ার অবস্থা) থেকে গোসল করা, নামাজের আগে পবিত্রতা অর্জন করা, মা-বাবার সাথে সদাচার করা, মুসলিমদের আত্মীয়তার সম্পর্ক অটুট রাখা, মুশরিক পিতামাতার সাথে সুন্দর আচরণ করা। তারা যদি এসব বিধান পালন করে, তাহলে তারা মুসলিম।
অতঃপর তাদের ঈমানের দিকে দাওয়াত দাও। তাদের সামনে ঈমানের হুকুম-আহকাম, ঈমানের মাআলিমের (নিদর্শন, বৈশিষ্ট্য) কিছু অংশ পেশ করো। ঈমানের মাআলিম দ্বারা উদ্দেশ্য - এ সাক্ষ্য দেওয়া যে, এক আল্লাহ ছাড়া সত্য কোনো ইলাহ নেই, তাঁর কোনো শরিক নেই এবং এ সাক্ষ্য দেওয়া যে-মুহাম্মাদ তাঁর বান্দা ও রাসুল। আর মুহাম্মাদ যা নিয়ে এসেছেন তা সত্য, এ-ছাড়া সব বাতিল ও মিথ্যা। আর আল্লাহ তাআলা, ফেরেশতাগণ, কিতাব, রাসুল ও আম্বিয়ায়ে কিরাম এবং শেষ দিবসের প্রতি ঈমান আনা এবং তার সামনে ও পেছনে যা কিছু হবে, তা বিশ্বাস করা। তাওরাত, ইনজিল, জাবুরের প্রতি বিশ্বাস করা। বদ আমল, নেক আমল, জান্নাত-জাহান্নাম, জীবন-মৃত্যু বিশ্বাস করা। আল্লাহ ও তাঁর রাসুল এবং মুমিনদেরদের সত্যায়ন করা। তারা যদি এগুলো করে এবং স্বীকার করে নেয়, তাহলে তারা মুসলিম ও মুমিন দুটোই।
তারপর তোমরা তাদের ইহসানের কথা বলো। তাদের ইহসান শিক্ষা দাও। অর্থাৎ তারা যেন আমানত আদায় করার ক্ষেত্রে, প্রতিশ্রুতি রক্ষার ক্ষেত্রে আন্তরিক হয়। যে প্রতিশ্রুতি আল্লাহ তাঁর রাসুলকে দিয়েছেন, আর রাসুল মুমিনদের নেতা ও আমিরদের কাছে সোপর্দ করেছেন। আর খেয়ানতকারী থেকে - চাই হাত হোক বা মুখ-মুসলিমদের নিরাপত্তা দান করার ক্ষেত্রে, তারা যেন অন্যান্য মুসলিমের জন্য সেভাবেই কল্যাণ কামনা করে, যেভাবে মানুষ নিজের জন্য কামনা করে। আর তারা যেন আল্লাহ তাআলার ওয়াদাসমূহ, তাঁর সাথে সাক্ষাৎ ও তাঁর শাস্তি দেওয়াকে বিশ্বাস করে। আর তারা যেন বিশ্বাস করে যে, যেকোনো সময় দুনিয়া থেকে চলে যেতে হতে পারে। প্রতিটি দিন শুরু করার আগে তারা যেন নফসের মুহাসাবা করে (হিসাব নেয়), দিন-রাত (আখিরাতের জন্য) পাথেয় সংগ্রহ করে। আল্লাহ তাআলা যা ফরজ করেছেন, সেগুলো যেন প্রকাশ্যে-অপ্রকাশ্যে আদায় করে। তারা যদি এগুলোও আমলে নেয়, তাহলে তারা মুসলিম, মুমিন ও মুহসিন।
তারপর তাদের সামনে কবিরা গুনাহগুলো তুলে ধরো। সেগুলো স্পষ্ট করো এবং তাদেরকে কবিরা গুনাহে পড়ে বরবাদ হওয়ার ভয় দেখাও। তাদেরকে বলো, এই কবিরা গুনাহই মানুষকে ধ্বংস করে। এগুলোর মধ্যে মারাত্মক কবিরা গুনাহ হলো-
০১. আল্লাহ তাআলার সাথে শিরক করা। আল্লাহ তাআলা বলেন—
إِنَّ اللَّهَ لَا يَغْفِرُ أَن يُشْرَكَ بِهِ
‘নিঃসন্দেহে আল্লাহ তাআলা তাঁর সাথে শিরক করাকে মাফ করবেন না।’
০২. জাদু। তবে জাদুকর কিছুই সৃষ্টি করতে পারে না।
০৩. আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করা। আল্লাহ তাদের অভিশাপ দেন।
০৪. যুদ্ধের ময়দান থেকে পালানো। এরা তো আল্লাহ তাআলার গজব নিয়ে ফেরে।
০৫. গনিমতের সম্পদ চুরি করা। সে তার চুরিকৃত গনিমত নিয়ে কিয়ামতের দিন উপস্থিত হবে।৩৬০ কিন্তু, তাদের থেকে সেটা গ্রহণ করা হবে না।
০৬. মুমিন ব্যক্তিকে হত্যা করা। মুমিনকে হত্যার শাস্তি তো জাহান্নام।৩৬৪
০৭. কোনো সতী নারীকে অপবাদ দেওয়া। এরা (অপবাদদানকারী) তো দুনিয়া ও আখিরাতে অভিশপ্ত।৩৬৫
০৮. ইয়াতিমের সম্পদ আত্মসাৎ করা। এরা মূলত নিজেদের পেটে আগুন ভক্ষণ করে।
০৯. সুদ খাওয়া। তাহলে তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ঘোষণা নিয়েনাও।৩৬৬
অতঃপর এরা যদি কবিরা গুনাহ থেকেও বিরত থাকে, তাহলে তারা হবে মুসলিম, মুমিন, মুহসিন ও মুত্তাকি। এটাই তাকওয়ার পূর্ণাঙ্গতা।
এখন, তোমরা তাদের ইবাদাতের কথা বলো। ইবাদাত মানে রোজা, নামাজে দাঁড়ানো, খুশু-খুজু, রুকু-সিজদা, ইয়াকিন (বিশ্বাস), ইনাবাত (আল্লাহ তাআলার দিকে প্রত্যাবর্তন), ইহসান, তাহলিল (লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলা), তাসবিহ (সুবহানাল্লাহ বলা), তাহমিদ (আলহামদু লিল্লাহ বলা), তাকবির (আল্লাহু আকবার বলা)। বলা), জাকাত দেওয়ার পরও সাদাকা করা, বিনয়, ক্লান্তি/পরিশ্রান্তি ও স্থিরতা, দুআ করা, কান্নাকাটি করা, ফেরেশতাদের অস্তিত্ব স্বীকার করা, ইবাদাত করা, বেশি বেশি নেক আমল করা। তারা যদি এগুলোও আঞ্জাম দেয়, তাহলে তারা হবে মুসলিম, মুমিন, মুহসিন, মুত্তাকি ও আবিদ। আর এটাই ঈমানের পূর্ণাঙ্গতা।
তখন তোমরা তাদের জিহাদের দাওয়াত দাও এবং সেটা তাদের সামনে স্পষ্টভাবে তুলে ধরো। আল্লাহ তাআলা জিহাদের ফজিলতের কথা বলে যেভাবে জিহাদের প্রতি উদ্বুদ্ধ করেছেন, তোমরাও তাদের সেভাবে উদ্বুদ্ধ করো যে—এর প্রতিদান একমাত্র আল্লাহ তাআলার নিকট। তারা যদি এতেও সম্মত হয়, তাহলে তাদের বাইআত গ্রহণ করো এবং তাদের আল্লাহ তাআলা ও তাঁর রাসুলের বিধানের ওপর বাইআত গ্রহণের আহ্বান করো। তাদের বলো যে—তোমাদের ওপর রয়েছে আল্লাহ প্রতিশ্রুতি ও জিম্মাদারি এবং সাতটি দায়িত্ব। (দাউদ ইবনুল মুহাব্বার বলেন, এ কথার অর্থ হলো: আল্লাহ তাআলা সাতবার পূরণ করে দেবেন।)-
০১. তোমরা বাইআত ভাঙবে না;
০২. মুসলিমদের কোনো আমিরের আদেশও লঙ্ঘন করবে না। তারা যদি এ বিষয়ে সম্মতি জানায়, তাহলে তাদের হাতে বাইআত গ্রহণ করো এবং আল্লাহর কাছে তাদের জন্য ইস্তিগফার করো।
তারা যখন আল্লাহর রাস্তায় আল্লাহর জন্য ক্রোধান্বিত হয়ে তাঁর দ্বীনকে সাহায্য করার লক্ষ্যে জিহাদে বের হবে, তখন তাদের পুনরায় অনুরূপ দাওয়াত দাও; যেমন দাওয়াত তাদের ইতোপূর্বে দেওয়া হয়েছিল। অর্থাৎ, আল্লাহর কিতাবের দিকে আহ্বান, তাঁর ডাকে সাড়া দান, ইসলাম, ঈমান, ইহসান, তাকওয়া, ইবাদাত ও হিজরতের দাওয়াত।
যে ব্যক্তি তাদের অনুসরণ করবে, সেই হবে সাড়াদানকারী মুমিন, মুহসিন, মুত্তাকি, আবেদ ও মুহাজির। তার জন্য এ সুযোগ সুবিধা থাকবে, যা তোমাদের (মুসলিমদের) জন্য রয়েছে। একইভাবে তার ওপর ওই সকল দায়িত্ব অর্পিত হবে, যা তোমাদের ওপর অর্পিত হয়েছে।
আর যে ব্যক্তি তাদের ডাকে সাড়া দিতে অস্বীকার করবে, তাদের বিরুদ্ধে তোমরা লড়াই চালিয়ে যেতে থাকো, যতক্ষণ না তারা আল্লাহর দিকে তথা আল্লাহ তাআলার দ্বীনের দিকে ফিরে আসে। আর যাদের সাথে তোমরা চুক্তি করো এবং যাদের নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি দাও, তাদের সাথে এই চুক্তি পূর্ণ করো। আর চুক্তিবদ্ধদের মধ্য থেকে যে ইসলাম গ্রহণ করবে এবং তোমাদের প্রতি সন্তুষ্ট থাকবে, সেও তোমাদের মতো মুসলিম গণ্য হবে, তোমরাও তাদের মতোই মুসলিম হবে। কিন্তু এ চুক্তির পরও যারা তোমাদের বিরদ্ধে লড়াই করতে আসবে, অথচ তোমরা চুক্তির মেয়াদ (ও যাবতীয় বিষয়) তাদের স্পষ্টভাবে বলে দিয়েছ, তাহলে তোমরা তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করো।
মোটকথা, যারা তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে, তোমরাও তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করো। যারা তোমাদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে, তোমরাও তাদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করো। যারা তোমাদের বিরুদ্ধে বাহিনী একত্র করে, তোমরা তাদের বিরুদ্ধে বাহিনী একত্র করো। যারা তোমাদের ধ্বংস করে দিতে চায়, তোমরাও তাদের ধ্বংস করে দাও। যারা তোমাদের ঘায়েল করতে চায়, তোমরাও তাদের ঘায়েল করো। যারা তোমাদের ধোঁকা দেয়, তোমরাও তাদের ধোঁকা দাও, তবে সীমালঙ্ঘন করা যাবে না। যারা তোমাদের বিরুদ্ধে চক্রান্ত করে, তোমরাও তাদের বিরুদ্ধে চক্রান্ত করো, তবে সীমালঙ্ঘন করা যাবে না—প্রকাশ্যে হোক বা অপ্রকাশ্যে। কারণ, কেউ অত্যাচারিত হওয়ার পর যদি প্রতিশোধ গ্রহণ করে, তাহলে তার কোনো দোষ নেই। তবে জেনে রাখো, আল্লাহ তাআলা তোমাদের সাথে আছেন। তিনি তোমাদের দেখছেন, তোমাদের কৃতকর্ম দেখছেন এবং তোমরা যা করো, তার সবকিছুই তিনি জানেন।
সুতরাং, তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং সতর্ক থাকো। কারণ, এই দ্বীন আমার কাছে আমানত, যা আমাকে আমার রব দান করেছেন, যাতে আমি এই দ্বীন তাঁর বান্দাদের কাছে পৌঁছে দিতে পারি, যাতে এটা আল্লাহ তাআলার কাছে তাদের সামনে কৈফিয়ত হয়ে যায় এবং প্রমাণ হিসাবে বাকি থাকে; যা তিনি সৃষ্টিকুলের মধ্যে তাদের বিরুদ্ধে পেশ করতে পারবেন, যাদের কাছে এই কিতাবের বার্তা পৌঁছেছে।
যে কেউ এই কিতাব অনুযায়ী আমল করবে, সে নাজাত পাবে। যে এই কিতাব অনুসরণ করবে, সে হিদায়াতপ্রাপ্ত হবে। যে এই কিতাবের জন্য ঝগড়া-বিবাদে লিপ্ত হবে, সে সফল হবে। যে এই কিতাবের জন্য লড়াই করবে, সে সাহায্যপ্রাপ্ত হবে। কিন্তু যে এই কিতাব ছেড়ে দেবে, সে এই কিতাবের দিকে ফিরে আসার আগ পর্যন্ত পথভ্রষ্ট থাকবে।
অতএব, তোমরা ভালো করে জেনে নাও, এই কিতাবে কী কী আছে। অতঃপর তোমাদের কানকে শোনাও, তোমাদের অন্তরে ধারণ করো, তোমাদের হৃদয়ে হিফাজতে রাখো। কারণ, এই কিতাব চোখের জন্য নূর, হৃদয়ের জন্য বসন্ত বাহার, অন্তরের জন্য শিফা। আদেশ-নিষেধ, শিক্ষা ও উপদেশ হিসাবে এবং হারাম থেকে বিরত রাখার জন্য, আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের পথে দাওয়াত দেওয়ার জন্য এতুটুকই যথেষ্ট। এটাই ওই কল্যাণ যাতে কোনো অকল্যাণ নেই।
এই পত্র মুহাম্মাদ ইবনু আবদিল্লাহর পক্ষ থেকে প্রেরিত—যিনি আল্লাহর রাসুল ও নবী—আলা ইবনু হাজরামির উদ্দেশ্যে, যাকে তিনি বাহরাইনের গভর্নর হিসাবে এই উদ্দেশ্যে পাঠিয়েছেন যে, সে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের দিকে দাওয়াত দেবে। অর্থাৎ, হালালের আদেশ এবং হারাম থেকে নিষেধ করবে, মানুষকে কল্যাণের পথ দেখাবে এবং ভ্রষ্টতার পথ থেকে নিষেধ করবে। এই পত্রে আল্লাহর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আলা ইবন হাজরামি ও তার খলিফা খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ সাইফুল্লাহর প্রতি আস্থা প্রকাশ করেছেন। এই পত্রের নির্দেশাবলি কেবল এই দুজনকে লক্ষ্য করে নয়, বরং তাদের সঙ্গী-সাথি অন্যান্য মুসলিমদের লক্ষ্য করেও বলা হয়েছে। এই পত্রের কোনো কিছু অমান্য করার ক্ষেত্রে তাদের কোনো ওজর গ্রহণযোগ্য হবে না।
এমনকি স্বয়ং দায়িত্বশীলের ওজরও নয়। অতএব, যে কারও কাছেই এই পত্র পৌঁছবে, তার আর কোনো ওজর বাকি থাকবে না, প্রমাণও থাকবে না। এই পত্রে যা যা বিষয় উল্লেখ রয়েছে, তার কোনো কিছু সম্পর্কে অজ্ঞাত থাকার ওজরও গ্রহণ করা হবে না।"
এই পত্রটি লেখা হয়েছে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের (মদিনায়) আবির্ভাবের চার বছর পর পূর্ণ হওয়ার দুই মাস পূর্বে-জিলকদ মাসের তিন তারিখ। পত্রটি লেখার সময় প্রত্যক্ষ করেছেন ইবনু আবি সুফইয়ান। আর উসমান ইবনু আফফান তাকে বলে দিচ্ছিলেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বসা ছিলেন, (আর সাথেই পাশে আরও ছিলেন) মুখতার ইবনু কাইস কুরাইশি, আবু জর গিফারি, হুজাইফা ইবনুল ইয়ামান আবসি, কাসি ইবনু আবু উমাইর, হুমাইরি, শাবিব ইবনু আবু মারসাদ গাসসানি, মুসতানির ইবনু আবি সাসা খুজায়ি, আওয়ানা ইবনু শামাখ, জুহানি, সাদ ইবনু মালিক আনসারি, সাদ ইবনু উবাদা আনসারি, জায়িদ ইবনু আমর।
আর বাকি যারা উপস্থিত ছিলেন, তারা হলেন- নকিবগণ (আমিরগণ)- কুরাইশ গোত্রের একজন, জুহাইনা গোত্রের একজন, আর চারজন আনসারি সাহাবি। এরা সবাই উপস্থিত ছিলেন, যখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পত্রটি আলা ইবনু হাজরামি ও খালিদ ইবনুল ওয়ালিদকে দিচ্ছিলেন। ৩৬৭
টিকাঃ
*” সূরা মায়িদা, আয়াত: ৩৮
৩৮২ সূরা নিসা, আয়াত: ৪৮
৩৬০ সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৬১
৩৬৪ সূরা নিসা, আয়াত: ৯৩
৩৬৫ সূরা নূর, আয়াত: ২৩
৩৬৬ সূরা বাকারা, আয়াত: ২৭৯