📄 ইসলামি শরিয়তের আলোকে এর বিশ্লেষণ
ব্যক্তিগত, সামাজিক, বা রাষ্ট্রীয় সম্পদ হোক, সবগুলোর মূল ভিত্তি হালাল ও উত্তম সম্পদ। এ-জন্যই ইসলাম হালাল ও উত্তম সম্পদের প্রশংসা করেছে, হালাল সম্পদ উত্তমভাবে কাজে লাগাতে বলেছে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন-
نعم المال الصالح للمرء الصالح উত্তম মানুষের জন্য উত্তম সম্পদ কতই না উত্তম! ০০০
কুরআনে কারিমে আছে-
وَلَا تُؤْتُوا السُّفَهَاءَ أَمْوَالَكُمُ الَّتِي جَعَلَ اللَّهُ لَكُمْ قِيَامًا وَارْزُقُوهُمْ فِيهَا وَاكْسُوهُمْ وَقُولُوا لَهُمْ قَوْلًا مَّعْرُوفًا
আল্লাহ তাআলা যে সম্পদকে তোমাদের ভিত্তি বানিয়েছেন, সেগুলো তোমরা নির্বোধদের হাতে দিয়ো না। তবে সেখান থেকে তাদেরকে খাবার দাও এবং পরার কাপড় দাও। আর তাদেরকে উত্তম কথা বলো।' ৩০৪
এ-আয়াতের ব্যাখ্যায় 'আত-তাফসিরুল কাবিরে' ইমাম রাজি রাহিমাহুল্লাহ বলেন- আল্লাহ তাআলা কুরআনে কারিমের বহু জায়গায় বান্দাদেরকে সম্পদ সংরক্ষণ করার আদেশ দিয়েছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন-
وَلَا تُبَذِّرْ تَبْذِيرًا (٢٦) إِنَّ الْمُبَذِّرِينَ كَانُوا إِخْوَانَ الشَّيَاطِينَ (২৭)
আর আপনি কিছুতেই অপচয় করবেন না। কারণ, নিঃসন্দেহে অপচয়কারীরা শয়তানের ভাই!**
আল্লাহ তাআলা আরও বলেন- وَلَا تَجْعَلْ يَدَكَ مَغْلُولَةً إِلَى عُنُقِكَ وَلَا تَبْسُطُهَا كُنَّ الْبَسْطِ فَتَقْعُدَ مَلُومًا محْسُورًا আর তোমার হাত তোমার গলার সাথে বেঁধে দিয়ো না, আবার তা একেবারে প্রসারিত করেও দিয়ো না, তা করলে তুমি তিরস্কৃত ও নিঃস্ব হয়ে বসে পড়বে। ০৩৬
তিনি আরও বলেন- وَالَّذِينَ إِذَا أَنفَقُوا لَم يُسْرِفُوا وَلَمْ يَقْتُرُوا وَكَانَ بَيْنَ ذَلِكَ قَوَامًا (٦٧) (আর রহমানের বান্দা) তারাই, যখন তারা ব্যয় করে তখন অপব্যয় করে না এবং কৃপণতাও করে না। আর তাদের পন্থা হয় এতদুভয়ের মধ্যবর্তী।১০৭
আল্লাহ তাআলা 'আয়াতে মুদায়ানাতে'ও সম্পদ হিফাজতে রাখার বিষয়ে উদ্বুদ্ধ করেছেন। তিনি সেখানে অর্থ মুআমালার ক্ষেত্রে লিখে রাখা, সাক্ষী রাখা ও বন্ধক রাখার আদেশ করেন। যুক্তিও সেটা সমর্থন করে। কারণ, মানুষ তখনই দুনিয়া ও আখিরাতে উন্নতি লাভ করে যখন ফারেগ ও কর্মব্যস্ততামুক্ত থাকে। আর অর্থশক্তি ছাড়া কখনোই কর্মব্যস্ততামুক্ত থাকা সম্ভব নয়। কারণ, এই অর্থশক্তির মাধ্যমেই উপকার লাভ করা যায়। ক্ষতি রোধ করা যায়।
যদি কেউ এই উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে দুনিয়ার অর্থশক্তি অর্জন করতে চায়, তার জন্য দুনিয়াই হয় আখিরাতে সৌভাগ্য অর্জনের বড়ো একটি সহায়ক মাধ্যম। কিন্তু কেউ যদি শুধু সম্পদের আশায় অর্থশক্তি লাভ করতে চায়, তাহলে এই সম্পদই তার জন্য আখিরাতে সৌভাগ্য অর্জনের বাধা হয়ে দাঁড়ায়। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন-
أن الله حرم عليكم عقوق الأمهات ووأد البنات ومنع وهات وكره لكم قيل وقال وكثرة السؤال وإضاعة المال 'নিঃসন্দেহে আল্লাহ তাআলা তোমাদের ওপর হারাম করেছেন মায়ের অবাধ্যতা, কন্যাসন্তানকে পুঁতে ফেলা, যা আবশ্যক তা দেওয়া থেকে বিরত থাকা এবং তোমাদের জন্য অপছন্দ করেছেন অজ্ঞতাবশত এই সেই বলা, বেশি বেশি প্রশ্ন করা, সম্পদ নষ্ট করা।' ৩৩৮
এ সম্পর্কে আরও বহু আয়াত ও হাদিস রয়েছে। তবে যেসব জায়গায় সম্পদ, সচ্ছলতা, ধনাঢ্যতার নিন্দা করা হয়েছে, সেখানে উদ্দেশ্য হলো-সম্পদ, ধনাঢ্যতা সেচ্ছাচারিতা ও অপচয়ের কারণ হয়। সম্পদ যদি গুনাহ, অবাধ্যতা, পাপাচারের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয় এবং আল্লাহ তাআলার নিয়ামত অসীকার করা হয়, তবেই সেটা নিন্দিত। অর্থশক্তি উন্নতির তিনটি মাধ্যম:
০১. চাষাবাদ, ০২. ব্যবসা-বাণিজ্য, ০৩. কাজ করা ও উপার্জন করা।
টিকাঃ
০০০ সহিহ ইবনু হিব্বান: ৩১১0; আল আদাবুল মুফরাদ: ২৯৯
৩০৪ সূরা নিসা, আয়াত: ৫
*** সূরা ইসরা, আয়াত: ২৬-২৭
*** সূরা ইসরা, আয়াত: ২৯
*** সূরা ফুরকান, আয়াত: ৬৭
*** সহিহ বুখারি, ২৪০৮
📄 ০৩. কাজ করা ও উপার্জন করা
ইসলাম এক্ষেত্রেও তার অনুসারীদেরকে উদ্বুদ্ধ করেছে। যারা কাজ করে খায়, তাদের প্রশংসা করে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন-
ما أكل أحد طعاما قط خيرا من أن يأكل من عمل يده وإن نبي الله داود عليه السلام كان يأكل من عمل يده ) رواه البخاري في صحيحه)
'নিজের হাতে অর্জিত খাবারের চেয়ে উত্তম আর কোনো খাবার হতে পারে না। আর আল্লাহর নবী দাউদ আ. নিজের হাতে উপার্জন করে খাবার খেতেন।' ৩৫০
তিনি আরও বলেন-
لأن يحتطب أحدكم حزمة على ظهره خير له من أن يسأل أحدا فيعطيه أو يمنعه (رواه البخاري)
'নিজের পিঠে লাকড়ি সংগ্রহ করে বিক্রি করা এর চেয়ে উত্তম-কেউ আরেকজনের সামনে হাত পাতবে, অতঃপর হয় সে দিবে কিংবা বিরত থাকবে।' ৩৫১
আনাস ইবন মালিক রা. থেকে বর্ণিত এক হাদিসে আছে, একলোক নবীজি সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে এসে হাত পাতল। তখন তিনি বললেন-'তোমার বাড়িতে কোনো কিছু আছে কী?'
তিনি (আনাস রা.) বলেন—লোকটি বলল, 'হ্যাঁ, একটি কাপড় আছে। এর কিছু আমরা পরি, আর কিছু বিছিয়ে রাখি। আরেকটি পাত্র আছে, যাতে করে পানি পান করি।' তিনি বললেন, 'যাও, বস্তু দুটো নিয়ে এসো।'
আনাস রা. বলেন—তখন লোকটি ওই দুটো জিনিস নিয়ে এলো। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সেগুলো হাতে নিয়ে বললেন-'কে এই দুটি জিনিস কিনবে?'
একলোক বলল—'আমি এক দিরহাম দিয়ে কিনব।' নবীজি বললেন—'কে আরেক দিরহাম বৃদ্ধি করে দেবে?'
একলোক বলল, 'আমি দুই দিরহাম দিয়ে নেব।' তখন নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে এ দুটো জিনিস দিয়ে দুই দিরহাম নিলেন, আর ওই আনসার লোকটিকে দুই দিরহাম দিয়ে বললেন—'এক দিরহাম দিয়ে খাবার কিনে পরিবারকে দাও, আর আরেক দিরহাম দিয়ে কুড়াল কিনে আমার কাছে নিয়ে এসো।'
লোকটি তাই করল। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কুড়ালের সাথে একটি কাঠ লাগিয়ে দিলেন। আর বললেন,- 'তুমি এখন কাঠ সংগ্রহ করতে যাও। আর তোমাকে যেন পনের দিনের আগে না দেখি। লোকটি কাঠ সংগ্রহ করে বিক্রি করতে লাগল। তারপর লোকটি দশ দিরহাম নিয়ে আবার নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে এলে নবীজি বললেন—'এর কিছু দিয়ে খাবার কিনো, আর কিছু দিয়ে কাপড় কিনো। তারপর বললেন—
هذا خير لك من أن تجيء والمسألة نكتة في وجهك يوم القيامة ، إن المسألة لا تصلح إلا لذي فقر مدقع أو لذي غرم مفظع أو دم موجع (رواه ابن ماجه)
'এটা করা এর চেয়ে উত্তম যে, তুমি কিয়ামতের দিন উপস্থিত হবে, আর তোমার মুখে (হাত পাতার) চিহ্ন থাকবে।'
অপরজনের কাছে সেই চাইতে পারবে, যে নিঃস্ব, দরিদ্র কিংবা প্রচণ্ড ঋণগ্রস্ত, অথবা যার ওপর বড়ো কোনো 'দম' আবশ্যক হয়ে পড়ে। ৩৫২
উমার রা. বলেন-
لا يقعد أحدكم عن طلب الرزق ويقول اللهم ارزقني وقد علم أن السماء لا تمطر ذهبا ولا فضة
'তোমাদের কেউ যেন রিজিক অন্বেষণ করা থেকে বিরত না থাকে, আর বলে— 'আয় আল্লাহ! আমাকে রিজিক দান করেন'। অথচ সে জানে যে, আসমান থেকে কখনো স্বর্ণও ঝরে না, রূপাও পড়ে না।' ৫৩
এই কাজ ও উপার্জন-ব্যবস্থা সমৃদ্ধ করার জন্য খলিফাকে তিনটি কাজ করতে হবে—
• প্রথমত, কর্মজীবীদের প্রয়োজনীয় হাতিয়ার ও যন্ত্রপাতি সহজলভ্য করা。
• দ্বিতীয়ত, তাদের তৈরি জিনিসগুলো বাহিরে পাঠানোর ব্যবস্থা করা。
• তৃতীয়ত, তাদের থেকে কম পরিমাণে ট্যাক্স নেওয়া।
টিকাঃ
৩৫০ সহিহ বুখারি, ২০৭২
**১ সহিহ বুখারি, ২০৭৪
***সুনানু ইবনি মাজাহ, ২১৯৮
*** আবু উমার আন্দালুসি, আল ইকদুল ফারিদ।.
📄 ফায়দা—ইসলামের দৃষ্টিতে অর্থনীতি
০১। অর্থনীতির ক্ষেত্রে ইসলাম সর্বপ্রথম বলে, যাবতীয় সম্পদ তথা আসমান ও জমিনে যা আছে, সবকিছুর মালিক একমাত্র আল্লাহ তাআলা। এক্ষেত্রে কারও কোনো অংশীদারত্ব নেই। কুরআনে কারিমে এ সম্পর্কে বহু আয়াত এসেছে। যেমন—
:: আল্লাহ তাআলা বলেন— له ملك السماوات والأرض 'তাঁরই জন্য আসমান-জমিনের রাজত্ব।'
:: আল্লাহ তাআলা বলেন— الله ما في السماوات والأرض 'আসমান-জমিনে যা আছে, সবই আল্লাহ তাআলার।'
:: আল্লাহ তাআলা বলেন— وما بكم من نعمة فمن الله 'তোমাদের মাঝে যে নিয়ামতই আছে, তা আল্লাহ তাআলার পক্ষ হতে।'
০২। পৃথিবীতে মানুষ হলো আল্লাহ তাআলার সৃষ্ট জীবের সেরা জীব। আল্লাহ্ তাআলা বলেন—
ولقد كرمنا بني آدم ‘আর অবশ্যই আমি আদম-সন্তানদেরকে সম্মানিত করেছি।’
তাই, পৃথিবীর সবকিছুকে আল্লাহ তাআলা মানুষের জন্য অনুগত এবং নিয়োজিত করে দিয়েছেন। তাদের উপকারগ্রহণের ক্ষেত্রে সমান বানিয়েছেন。
:: আল্লাহ তাআলা বলেন—
و سخر لكم الفلك ‘আর তিনি তোমাদের জন্য নৌযানকে অনুগত করে দিয়েছেন।’
:: আল্লাহ তাআলা বলেন—
وسخر لكم الأنهار ‘আর তিনি তোমাদের জন্য দিবসকে নিয়োজিত করে রেখেছেন।’
:: আল্লাহ তাআলা বলেন—
وسخر لكم الليل والنهار ‘আর তিনি তোমাদের জন্য দিন ও রাতকে নিয়োজিত করে রেখেছেন।’
:: আল্লাহ তাআলা বলেন—
سخر لكم ما في الارض ‘তিনি তোমাদের জন্য পৃথিবীতে যা আছে অনুগত করে দিয়েছেন।’
:: আল্লাহ তাআলা বলেন—
ض وسخر لكم ما في السماوات وما في الارض جميعا منه ‘আর তিনি তোমাদের জন্য অনুগত করে দিয়েছেন, যা কিছু আছে আসমানসমূহে এবং যা আছে জমিনে তার সবকিছুকে।’ ৩২৪
:: আল্লাহ তাআলা বলেন—
هو الذي خلق لكم ما في الارض جميعا ‘তিনিই সেই মহান সত্তা, যিনি তোমাদের উপকারের জন্য সৃষ্টি করেছেন, যা কিছু আছে জমিনে।’
০৩। সম্পদ একটি উসিলা বা মাধ্যম। সম্পদ কোনো মৌলিক জিনিস নয়, পৃথিবীর ভালো ও কল্যাণকর জিনিস অর্জনের উপায় ও মাধ্যম। সুতরাং, সম্পদ তখনই কল্যাণকর হবে, যদি তা কল্যাণকর ও ভালো ক্ষেত্রে ব্যয় করা হয়। অন্যথায়, সম্পদ কল্যাণকর হওয়ার পরিবর্তে অকল্যাণকর হয়ে উঠবে, যা শুধু মানুষের ক্ষতিই ডেকে আনবে।
সুতরাং, শাসক-শাসিত সবার কর্তব্য হলো শরয়ি পদ্ধতিতে তথা বৈধ পন্থায় সম্পদ অর্জন করা, যাতে এর মাধ্যমে দুনিয়ায় উপকার লাভ করা যায় এবং আখিরাতেও কল্যাণ হাসিল করা যায়।
মোটকথা, মানুষ চেষ্টা-উপার্জন করে যে সম্পদ লাভ করে, সেটা তার কাছে আমানত; প্রকৃত মালিক আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা। তিনি এ সম্পদ মানুষকে দান করেছেন, যাতে সে নিজের ও পরিবারের জন্য, গরিব ও দুর্বলদের জন্য, মাজলুম ও মাহবুসের (কারাবন্দী) জন্য, সবার জন্য খরচ করতে পারে। তাই খলিফার জন্য বৈধ যে, তিনি শরিয়ত নির্দেশিত পন্থায় ধনীদের থেকে সম্পদ নিতে পারবেন। যেমন: সেনাবাহিনী প্রস্তুত করার জন্য, দ্বীন ও শরিয়ত রক্ষা করার জন্য, মাজলুমদের উদ্ধার করার জন্য। তবে এটা তখন, যখন বাইতুল মালে যথেষ্ট পরিমাণ সম্পদ থাকবে না। এ বিষয়ে আরও বিস্তারিত জানতে আগ্রহীদের জন্য ফিকহের কিতাব দ্রষ্টব্য।
টিকাঃ
৩২৪ সূরা জাসিয়া, আয়াত: