📘 ইসলামি রাষ্ট্র ব্যবস্থা > 📄 সেনাবাহিনীর কর্তব্যসমূহ

📄 সেনাবাহিনীর কর্তব্যসমূহ


সেনাপ্রধানের যেমন কিছু দায়দায়িত্ব আছে, একইভাবে সেনাবাহিনীরও কিছু দায়দায়িত্ব আছে। মাওয়ারদি রহ. বলেন- 'মুজাহিদদের যে সকল দায় দায়িত্ব আছে, সেগুলো দুই প্রকার। যথা- ০১. আল্লাহ তাআলার হকের ক্ষেত্রে দায়দায়িত্ব; ০২. আমিরের হকের ক্ষেত্রে দায়-দায়িত্ব。
প্রথম : আল্লাহর তাআলার হকের ক্ষেত্রে চারটি দায়িত্ব আছে
(ক) প্রথম হক: ধৈর্যের সাথে শত্রুদের মোকাবিলা করা। স্যংখায় দ্বিগুণ বা তার কম হলেও পলায়ন না করা। দুই অবস্থায় শত্রুর দ্বিগুণ হওয়া সত্ত্বেও রণাঙ্গন থেকে পলায়ন করা জায়িজ। হয় যুদ্ধ করার উদ্দেশ্যে পিছপা হয়ে বিশ্রাম করবে, আরও উদ্যম নিয়ে ফিরে আসবে, বা যেকোনো কৌশল অবলম্বন করে ফিরে যাবে; অথবা অন্য কোনো মুসলিম দলের সাথে যুক্ত হয়ে জিহাদ করবে। আল্লাহ তাআলা বলেন-
وَمَن يُوَلِّهِمْ يَوْمَئِذٍ دُبُرَهُ إِلَّا مُتَحَرِّفًا لِقِتَالٍ أَوْ مُتَحَيِّزًا إِلَى فِئَةٍ فَقَدْ بَاءَ بِغَضَبٍ مِّنَ اللَّهِ وَمَأْوَاهُ جَهَنَّمُ وَبِئْسَ الْمَصِيرُ
'আর সেদিন যে লড়াইয়ের কৌশল অবলম্বন বা অন্য কোনো দলের সাথে যুক্ত হওয়ার উদ্দেশ্য ছাড়া পৃষ্ঠপ্রদর্শন করবে, সে আল্লাহর গজব নিয়ে ফিরে এলো।' ৩২৮
চাই যে দলের সাথে যুক্ত হবে, সে দল কাছে থাকুক বা দূরে-উভয়টিতে যুক্ত হওয়াই জায়িজ। কারণ 'কাদিসিয়া' যুদ্ধের মুজাহিদরা যখন উমার রা.-এর কাছে ফিরে এসেছিলেন, তখন তিনি বললেন- '(এটা পৃষ্ঠপ্রদর্শন নয়। কারণ,) আমি প্রত্যেক মুসলিমের জন্য দল।'
(খ) দ্বিতীয় হক : লড়াইয়ের একমাত্র উদ্দেশ্য থাকবে আল্লাহ তাআলার দ্বীনকে সাহায্য করা। অন্যান্য ধর্মকে ধ্বংস করা-
لِيُظْهِرَهُ عَلَى الدِّينِ كُلِّهِ وَلَوْ كَرِهَ الْمُشْرِكُونَ
'যাতে তিনি এই দ্বীনকে সমস্ত ধর্মের ওপর বিজয়ী করেন, যদিও মুশরিকরা তা অপছন্দ করে।'
যদি নিজের মাঝে এই নিয়ত ধারণ করে, তাহলে আল্লাহর প্রতিশ্রুত প্রতিদান লাভ করতে পারবে, আদেশ-নিষেধের আনুগত্যকারী হবে, শত্রুর ওপর বিজয় অর্জনে সাহায্য লাভ করবে। ফলে যুদ্ধের কষ্ট লাঘব হবে, রণাঙ্গনে ইস্পাত দৃঢ় মনোবলের অধিকারী হবে। আল্লাহ তাআলার দ্বীনকে বিজয়ী করা ছাড়া জিহাদের মাধ্যমে অন্য কিছু উদ্দেশ্য করা যাবে না।
(গ) তৃতীয় হক: যে সকল গনিমত লাভ করবে, সেক্ষেত্রে আমানত রক্ষা করবে। জিহাদে অংশগ্রহণ করা মুজাহিদদের মাঝে বণ্টন করার আগে সেখান থেকে কিছু নিয়ে নেবে না। কারণ, সেখানে প্রত্যেকেরই হক আছে।
(ঘ) চতুর্থ হক: কখনো কাছের আত্মীয় শত্রুকেও ছাড় না দেওয়া। আল্লাহর দ্বীনের সাহায্যের ক্ষেত্রে কোনো কাছের মানুষকেও প্রাধান্য না দেওয়া। কারণ, আল্লাহ তাআলার দ্বীন অবশ্যই বিজয় লাভ করবে। (তাহলে অন্য কাউকে প্রাধান্য দিলে নিজেরই ক্ষতি হবে, আল্লাহর নয়।) তাঁর দ্বীনকে অবশ্যই সাহায্য করা হবে। আল্লাহ তাআলা বলেন-
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَتَّخِذُوا عَدُوِّي وَعَدُوَّكُمْ أَوْلِيَاءَ تُلْقُونَ إِلَيْهِم بِالْمَوَدَّةِ وَقَدْ كَفَرُوا بِمَا جَاءَكُم مِّنَ الْحَقِّ
'হে ঈমানদারগণ, তোমরা আমার শত্রু এবং তোমাদের শত্রুকে বন্ধু বানিয়ো না যে, তাদের কাছে বন্ধুত্বের বার্তা পাঠাবে। অথচ তারা অস্বীকার করে ওই হককে, যা তোমাদের কাছে এসেছে।' ৩২৯
সেনাপ্রধানের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য অধিকার ও কর্তব্য
সাধারণ সেনাদের পক্ষ থেকে একজন বাহিনী-প্রধানের চারটি অধিকার রয়েছে। আমরা এখানে সেগুলো জেনে নেব-
এক. সেনাপ্রধানের আনুগত্য করা
তার ছায়াতলে থাকা। কারণ, তার নেতৃত্বেই তাদের ক্ষেত্রে সাব্যস্ত। আর তার আনুগত্য নেতৃত্বের মাধ্যমেই ওয়াজিব। আল্লাহ তাআলা বলেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا أَطِيعُوا اللَّهَ وَأَطِيعُوا الرَّسُولَ وَأُولِي الْأَمْرِ مِنكُمْ
'হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহর আনুগত্য করো এবং আনুগত্য করো রাসুলের এবং তোমাদের নেতৃবর্গের।' ৩০০
দুই. প্রতিটি বিষয়ই তার সামনে পেশ করা এবং তার সিদ্ধান্ত মেনে নেওয়া
সাধারণ সেনা ও দায়িত্বশীলদের মধ্যে যাতে পারস্পরিক মতবিরোধ সৃষ্টি না হয়। এমনটি হলে তাদের পারস্পরিক ঐক্য বিনষ্ট হবে, তাদের মাঝে দলাদলি সৃষ্টি হবে। আল্লাহ তাআলা বলেন-
وَلَوْ رَدُّوهُ إِلَى الرَّسُولِ وَإِلَى أُولِي الْأَمْرِ مِنْهُمْ لَعَلِمَهُ الَّذِينَ يَسْتَنبِطُونَهُ مِنْهُمْ
'যদি তারা সে বিষয়টি পেশ করত রাসুলের সামনে, তাদের মধ্য হতে দায়িত্বশীলদের সামনে, তাহলে তাদের মধ্যে যারা (স্বরূপ) উদঘাটন করতে পারে, তারা তার (স্বরূপ) জানতে পারত।'০০১
এই আয়াতে আল্লাহ তাআলা দায়িত্বশীলদের কাছে সমস্যা পেশ করার কথা বলেছেন, যাতে তিনি সমস্যাটি জানতে পারেন, সমস্যারও সমাধান হয়। কিন্তু যদি তারা সঠিকটি বুঝতে পারে, যা তিনি বুঝতে পারেন নি; তাহলে তার সামনে সঠিকটি তুলে ধরবে, স্পষ্ট করবে। এজন্যই মাশওয়ারা করতে বলা হয়েছে, যাতে মাশওয়ারার মাধ্যমে সঠিক পদক্ষেপ নেওয়া যায়।
তিন. আদেশ-নিষেধ মান্য করা
তিনি যখন কোনো আদেশ করবেন, সাথে সাথে আদেশ পালন করবে। যখন নিষেধ করবেন, সেটা থেকে বিরত থাকবে। কারণ, এ দুটো বিষয়ই আনুগত্যের প্রধান মাধ্যম। কিন্তু যদি তারা আদেশ-নিষেধের তোয়াক্কা না করে তাহলে তিনি তাদের অবস্থা অনুযায়ী শাস্তি দেবেন। তবে গরম এবং কঠোর হবেন না। কারণ, আল্লাহ তাআলা বলেন,
فَبِمَا رَحْمَةٍ مِّنَ اللَّهِ لِنتَ لَهُمْ وَلَوْ كُنتَ فَظًّا غَلِيظَ الْقَلْبِ لَانفَضُّوا مِنْ حَوْلِكَ فَاعْفُ عَنْهُمْ وَاسْتَغْفِرْ لَهُمْ وَشَاوِرْهُمْ فِي الْأَمْرِ فَإِذَا عَزَمْتَ فَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ : إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُتَوَكِّلِين..
‘আল্লাহর অনুগ্রহের কারণেই আপনি তাদের জন্য কোমল হতে পেরেছেন। যদি আপনি কঠোর এবং রূঢ় হৃদয়ের অধিকারী হতেন, তাহলে তারা আপনার কাছ থেকে সরে পড়ত।’ ৩০২
চার.
তিনি যখন গনিমত বণ্টন করবেন, তখন তার সাথে আপত্তি করবে না। বরং, তার সমবণ্টনে সন্তুষ্ট থাকবে। কারণ, আল্লাহ তাআলাই গনিমতের ক্ষেত্রে সম্মানিত-অসম্মানিত, দুর্বল-শক্তিশালী সবার ক্ষেত্রে সাম্যের কথা বলেছেন।

টিকাঃ
৩২৮ সূরা আনফাল, আয়াত: ১৬
*সূরা মুমতাহিনা, আয়াত: ১
** সূরা নিসা, আয়াত: ৫৯
*** সূরা নিসা, আয়াত: ৮৩
৩০২ সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৫৯

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00