📘 ইসলামি রাষ্ট্র ব্যবস্থা > 📄 মুসলিম সেনাপ্রধানের কর্তব্য

📄 মুসলিম সেনাপ্রধানের কর্তব্য


যে সেনাবাহিনীর নেতৃত্ব গ্রহণ করবে, তাকে ১৩টি কর্তব্য পালন করতে হবে—
০১. বাহিনীর পর্যবেক্ষণ; সুতরাং, সেনাপ্রধানকে সবসময় বাহিনীকে পর্যবেক্ষণ করতে হবে, যাতে শত্রুর কোনো কৌশলই তাদের ওপর বিজয় ছিনিয়ে নিতে না পারে।
০২. কখনোই নিজেদেরকে শত্রুর চক্রান্ত থেকে নিরাপদ মনে করবে না। শত্রুকে কখনোই দুর্বল ভাববে না, যদিও বাস্তবে তারাই দুর্বল হয়। বরং, শত্রু দুর্বল হলেও তার চেয়েও শক্তিশালী শত্রুদের মোকাবিলা করার প্রস্তুতি নিয়ে মাঠে নামতে হবে। ইমাম তুরতুশি রহ. বলেন-বিজয়ের একটি কৌশল হলো, শত্রু দুর্বল হলেও তাকে তুচ্ছ না ভাবা। তুচ্ছ হলেও তার সম্পর্কে বেখবর না থাকা। কারণ, কত ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কীটও বিশাল হাতিকে অশান্ত করে তোলে। কত ছোটো ছোটো বিষয়ও বাদশাহর ঘুম হারাম করে দেয়। কবি বড়ো বাস্তব কথা বলেছেন-
وَلاَ تَحْقِرَنَّ عَدُوًّا رَمَاكَ وَإِنْ كَانَ فِي سَاعِدَيْهِ قَصْرُ فَإِنَّ السُّيُوفَ تَحُزُّ الرِّقَابَ وَتَعْجَزُ عَمَّا تَنَالُ الْإِبَر
‘যে শত্রু তোমাকে নিক্ষেপ করে তাকে কখনো দুর্বল ভাববে না, যদিও থাকে দুর্বলতা তার হাতে।
কারণ, তরবারি কখনো কখনো সুইয়ের মতো ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কাজও করতে অক্ষম, যদিও বড়ো বড়ো মাথা দেয় ফেলে।'
০৩. যুদ্ধের জন্য একটি যথোপুযুক্ত থাকার জায়গা খুঁজে নেবে। জায়গাটি যেন চলাচলে সহজ, ঘাস-পানিতে পরিপূর্ণ এবং চারপাশ শত্রু থেকে নিরাপদ হয়, যাতে থাকতে সুবিধা হয় ও পর্যবেক্ষণ মজবুত হয়।
০৪. শত্রুদের যাবতীয় খবর রাখবে, তাদের চারপাশে গোয়েন্দা ছড়িয়ে দেবে, তাদের সংখ্যা, সেনাপ্রধান, জেনারেল এবং যুদ্ধাস্ত্র সম্পর্কে জানবে। জাবির রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম খন্দকের যুদ্ধে বলেন-
مَنْ يَأْتِينِي بِخَبَرِ الْقَوْمِ يَوْمَ الْأَحْزَابِ ؟ قَالَ الزُّبَيْرُ أَنَا ثُمَّ قَالَ مَنْ يَأْتِينِي بِخَبَرِ الْقَوْمِ ؟ قَالَ الزُّبَيْرُ أَنَا فَقَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِنَّ لِكُلِّ نَبِيٍّ حَوَارِيًّا وَحَوَارِي الزُّبَيْر ...
'কে আমার কাছে শত্রুদের খবরাখবর এনে দেবে?' জুবাইর রা. বললেন- ‘আমি।'
তারপর আবার বললেন- 'কে আমার কাছে শত্রুদের খবরাখবর এনে দেবে?' জুবাইর রা. বললেন- ‘আমি।' তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন-'প্রত্যেক নবীর একজন হাওয়ারি (জানবাজ সাথি) ছিল। আমার হাওয়ারি হলো জুবাইর।' ৩২১
০৫. বাহিনীর প্রয়োজনীয় বিষয়; যেমন: খাবার ও বাহনের যাবতীয় সরঞ্জাম প্রস্তুত করে রাখা; যাতে প্রয়োজনের সময় বণ্টন করা যায়। তাহলে তারা পেরেশানমুক্ত থাকতে পারবে।
০৬. রণাঙ্গনে বাহিনীকে সুবিন্যস্ত রাখা। কাতারের মাঝে কোনো ত্রুটি আছে কি না খোঁজ নেওয়া, শত্রুদের পার্শ্ববর্তী দলের প্রতি খেয়াল রাখা, যাতে প্রয়োজন হলে সাহায্য পাঠানো যায়।
০৭. বাহিনীকে সবসময় পারস্পরিক বিরোধিতা থেকে রক্ষা করবে। কারণ, এই পারস্পরিক বিরোধিতাই দুর্বলতার মূল কারণ। আল্লাহ তাআলা বলেন- وَلَا تَنَازَعُوا فَتَفْشَلُوا وَتَذْهَبَ رِيحُكُمْ 'আর তোমরা পরস্পর বিরোধিতা করো না, তাহলে তোমরা ব্যর্থ হবে আর তোমাদের প্রতাপ চলে যাবে।' ৩২২
তবে যদি কখনো বিরোধিতা হয়েই যায়, তাহলে ইনসাফ মোতাবেক তাদের মাঝে ফায়সালা করবে।
০৮. বিজয়ের অনুভূতি জাগ্রত করে এমন কথা বলে তাদের শক্তিশালী করে তোলা। তাদের সামনে বিজয়ের কারণগুলো তুলে ধরা, যাতে শত্রুরা তাদের চোখে নগণ্য হয়ে যায়। ফলে তারা যুদ্ধ করতে দুঃসাহসী হয়ে উঠবে। আর দুঃসাহসের মাধ্যমেই বিজয় সহজ হয়ে ওঠে। আল্লাহ তাআলা বলেন- إِذْ يُرِيكَهُمُ اللَّهُ فِي مَنَامِكَ قَلِيلًا - وَلَوْ أَرَنَكَهُمْ كَثِيرًا لَّفَشِلْتُمْ وَلَتَزَعْتُمْ فِي الْأَمْرِ وَلَكِنَّ اللَّهَ سَلَّمَ ، إِنَّهُ عَلِيمٌ بِذَاتِ الصُّدُورِ 'স্মরণ করেন ওই সময়ের কথা, যখন আল্লাহ আপনাকে স্বপ্নে শত্রুদের সংখ্যা কম করে দেখালেন। আর যদি তিনি তাদের সংখ্যা বেশি দেখাতেন, তাহলে তোমরা ব্যর্থ হতে, আদেশের ক্ষেত্রে পরস্পর বিবাদে লিপ্ত হতে। কিন্তু আল্লাহই তোমাদের রক্ষা করেছিলেন। (তোমাদের) অন্তরে যা আছে, সে সম্পর্কে তিনি খুবই ভালোভাবে অবহিত।' ৩২৩
এখানে, আল্লাহ তাআলা শত্রুদের সংখ্যা কম দেখানোর মাধ্যমে মুজাহিদদের মনোবল শক্তিশালী করে তুলেছেন। তাই, মুজাহিদরা লড়াই করার সাহস পেয়েছে আর বিজয় তাদেরই অর্জিত হয়েছে। এটা মূলত আল্লাহ তাআলার একটি নিয়ামত, যা তিনি আহলে বদরকে দান করেছিলেন।
ইমাম সামারকান্দি রহ. এই আয়াতের তাফসিরে বলেন- 'স্মরণ করেন ওই সময়ের কথা, যখন আল্লাহ আপনাকে স্বপ্নে শত্রুদের সংখ্যা কম করে দেখালেন' অর্থাৎ, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শত্রুদের সম্মুখীন হওয়ার পূর্বেই স্বপ্নে তাদের খুবই স্বল্প দেখতে পান। তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবায়ে কিরামকে স্বপ্নের কথা শোনালেন যে, শত্রুদের সংখ্যা তো খুবই অল্প। সাহাবায়ে কিরাম এ কথা শুনে বললেন-নবীদের স্বপ্ন তো সত্যই হয়। সুতরাং, কুরাইশদের সংখ্যা খুবই নগণ্য। পরবর্তী সময়ে যখন তারা বদরে মুখোমুখি হলেন, আল্লাহ তাআলা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের স্বপ্ন সত্যায়ন করার জন্য মুশরিকদের সংখ্যা মুমিনদের চোখে কমিয়ে দিলেন।
তারপর আল্লাহ তাআলা বলেন— 'আর যদি তিনি তাদের সংখ্যা বেশি দেখাতেন, তাহলে তোমরা ব্যর্থ হতে।' অর্থাৎ, তোমরা ভীত হয়ে রণাঙ্গন ছেড়ে পালাতে। 'আদেশের ক্ষেত্রে পরস্পর বিবাদে লিপ্ত হতে।' অর্থাৎ, যুদ্ধের বিষয়ে নবীজির আদেশের ক্ষেত্রে পরস্পর বিরোধিতায় লিপ্ত হতে। 'কিন্তু আল্লাহই তোমাদের রক্ষা করেছিলেন।' অর্থাৎ, শত্রুদের ওপর মুসলিমদের বিজয় পূর্ণ করেছেন।১৪
০৯. বাহিনীকে শত্রুদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের প্রতি উদ্বুদ্ধ করে কষ্টের ওপর সবর করতে বলবে। সাওয়াবের প্রতিদান ও 'নফলের' কথা উল্লেখ করবে।
নফলের মূল অর্থ অতিরিক্ত। পারিভাষিক অর্থে কারও জন্য আলাদাভাবে গনিমতের বিশেষ অংশ শর্তসাপেক্ষে নির্ধারণ করা। যেমন: মুজাহিদদের আমির কাউকে বললেন—তুমি যদি অমুককে হত্যা করতে পারো, অথবা অমুক দুর্গ জয় করতে পারো, তাহলে তোমাকে আলাদাভাবে গনিমত থেকে এই পরিমাণ অঙ্কের টাকা দেওয়া হবে। আল্লাহ তাআলা বলেন—
يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ حَرِّضِ الْمُؤْمِنِينَ عَلَى الْقِتَالِ 'হে নবী, আপনি মুমিনদের যুদ্ধের জন্য উদ্বুদ্ধ করেন।'০২০
'উদ্বুদ্ধ করার' বিষয়টি ব্যাপক—সাওয়াব উল্লেখের মাধ্যমে হতে পারে, নফলের মাধ্যমেও হতে পারে। এজন্যই আমাদের হানাফিদের নিকট তানফীল মুস্তাহাব, ওয়াজিব নয়। আল্লামা ইবনুল হুমام রহ. বলেন— উল্লিখিত আয়াতের কারণে 'উদ্বুদ্ধ করা' ওয়াজিব। তবে 'উদ্বুদ্ধ'টা শুধু তানফিলের মাঝেই সীমাবদ্ধ নয় যে, তানফিল ওয়াজিব। বরং, তানফিল ছাড়াও উদ্বুদ্ধ হতে পারে। যেমন: উত্তম উপদেশ দেওয়া, আল্লাহ তাআলার কাছে থাকা প্রতিদানের কথা বলা। তাহলে তানফিল শুধুই 'ওয়াজিব' নয়, বরং 'ইচ্ছাধিকার ওয়াজিব'।
বা واجب مخير 'ইচ্ছাধিকার ওয়াজিব' একটি শরয়ি পরিভাষা। এটা এমন হুকুমকে বলা হয়, যা আদায় করা ইচ্ছাধীন। করলে ওয়াজিব আদায় হবে, অন্যথায় অন্য কিছুর মাধ্যমে ওয়াজিব পালন করতে হবে।
তারপর তানফিলই যদি উদ্বুদ্ধকরণের পদ্ধতিগুলোর মধ্যে মূল উদ্দেশ্য (বিজয়) অর্জনে সবচেয়ে কার্যকর মাধ্যম হয়, তাহলে তানফিলের মাধ্যমেই ওয়াজিব আদায় হবে, অন্যগুলোর মাধ্যমে নয়। বরং, অন্যগুলো তখন মুস্তাহাব হবে। এখন শুধু মুস্তাহাবের মাধ্যমে ওয়াজিব আদায় করবে কিনা সেটা ইচ্ছাধিকার। ৩২৬
১০. কোনো জটিল বিষয়ে জ্ঞানী ও অভিজ্ঞদের সাথে আলোচনা করা, যাতে ভুল না হয়। এক দার্শনিক বলেন-একজন বুদ্ধিমানের কর্তব্য হলো তার চিন্তার সাথে জ্ঞানীদের চিন্তা যোগ করা। তার বুদ্ধির সাথে দার্শনিকদের বুদ্ধি একত্র করা। কারণ, অনেক সময় একক চিন্তা মানুষকে পদস্খলিত করে। একইভাবে কখনো কখনো নিজের একার বুদ্ধি মানুষকে ভ্রষ্ট করে ফেলে। ৩২৭ তদ্রূপ কঠিন বিষয়ে অবিচল ব্যক্তিদের শরণাপন্ন হবে, যাতে পদস্খলন থেকে বেঁচে থাকা যায়।
১১. আল্লাহ তাআলা যে সকল হক আবশ্যক করে দিয়েছেন, সেগুলো আদায় করার জন্য বাহিনীকে আদেশ করবে। বিশেষ করে জামাআতের সাথে নামাজ পড়ার আদেশ করবে। গুনাহ থেকে নিষেধ করবে। কারণ, যে আল্লাহ তাআলার দ্বীনের জন্য জিহাদ করে, তাকেই তো সে দ্বীনের বিধিবিধান মানতে হবে, হালাল-হারামের মাঝে পার্থক্য করতে হবে।
১২. কাউকে জিহাদ ব্যতীত অন্য কোনো কাজে ব্যস্ত থাকতে দেওয়া যাবে না। কারণ, এতে জিহাদের কষ্টে সবর করার স্পৃহা হারিয়ে যাবে।
১৩. দিন-রাত সর্বক্ষণ বাহিনীর খোঁজ নেবে-নিজে কিংবা বিশ্বস্ত ব্যক্তির মাধ্যমে। ব্যস, সেনাপ্রধান যদি এ সকল কাজগুলো আদায় করেন, তাহলে তিনি আল্লাহর পক্ষ হতে সাহায্যপ্রাপ্ত হবেন। তাছাড়া বাহিনীকে বিশৃঙ্খলা থেকে রক্ষা করলেন। নিজ দায়িত্বও আদায় করলেন। অন্যথায় সাহায্যও পাবেন না। নিজের হকও আদায় করলেন না। আল্লাহ আমাদেরকে সরল পথে পরিচালিত করুন।

টিকাঃ
৩২১ সহিহ বুখারি
৩২২ সূরা আনফাল, আয়াত: ৪৬
৩২৩ সূরা আনফাল, আয়াত: ৪৩
৩১২৪ তাফসিরুস সামারকান্দি, খণ্ড:
০২০ সূরা আনফাল, আয়াত: ৮০
৩২৬ ফাতহুল কাদির, খণ্ড: ৫, পৃষ্ঠা: ২৪৯
*** তাসহিলুন নাজর: ১০০

📘 ইসলামি রাষ্ট্র ব্যবস্থা > 📄 সেনাবাহিনীর কর্তব্যসমূহ

📄 সেনাবাহিনীর কর্তব্যসমূহ


সেনাপ্রধানের যেমন কিছু দায়দায়িত্ব আছে, একইভাবে সেনাবাহিনীরও কিছু দায়দায়িত্ব আছে। মাওয়ারদি রহ. বলেন- 'মুজাহিদদের যে সকল দায় দায়িত্ব আছে, সেগুলো দুই প্রকার। যথা- ০১. আল্লাহ তাআলার হকের ক্ষেত্রে দায়দায়িত্ব; ০২. আমিরের হকের ক্ষেত্রে দায়-দায়িত্ব。
প্রথম : আল্লাহর তাআলার হকের ক্ষেত্রে চারটি দায়িত্ব আছে
(ক) প্রথম হক: ধৈর্যের সাথে শত্রুদের মোকাবিলা করা। স্যংখায় দ্বিগুণ বা তার কম হলেও পলায়ন না করা। দুই অবস্থায় শত্রুর দ্বিগুণ হওয়া সত্ত্বেও রণাঙ্গন থেকে পলায়ন করা জায়িজ। হয় যুদ্ধ করার উদ্দেশ্যে পিছপা হয়ে বিশ্রাম করবে, আরও উদ্যম নিয়ে ফিরে আসবে, বা যেকোনো কৌশল অবলম্বন করে ফিরে যাবে; অথবা অন্য কোনো মুসলিম দলের সাথে যুক্ত হয়ে জিহাদ করবে। আল্লাহ তাআলা বলেন-
وَمَن يُوَلِّهِمْ يَوْمَئِذٍ دُبُرَهُ إِلَّا مُتَحَرِّفًا لِقِتَالٍ أَوْ مُتَحَيِّزًا إِلَى فِئَةٍ فَقَدْ بَاءَ بِغَضَبٍ مِّنَ اللَّهِ وَمَأْوَاهُ جَهَنَّمُ وَبِئْسَ الْمَصِيرُ
'আর সেদিন যে লড়াইয়ের কৌশল অবলম্বন বা অন্য কোনো দলের সাথে যুক্ত হওয়ার উদ্দেশ্য ছাড়া পৃষ্ঠপ্রদর্শন করবে, সে আল্লাহর গজব নিয়ে ফিরে এলো।' ৩২৮
চাই যে দলের সাথে যুক্ত হবে, সে দল কাছে থাকুক বা দূরে-উভয়টিতে যুক্ত হওয়াই জায়িজ। কারণ 'কাদিসিয়া' যুদ্ধের মুজাহিদরা যখন উমার রা.-এর কাছে ফিরে এসেছিলেন, তখন তিনি বললেন- '(এটা পৃষ্ঠপ্রদর্শন নয়। কারণ,) আমি প্রত্যেক মুসলিমের জন্য দল।'
(খ) দ্বিতীয় হক : লড়াইয়ের একমাত্র উদ্দেশ্য থাকবে আল্লাহ তাআলার দ্বীনকে সাহায্য করা। অন্যান্য ধর্মকে ধ্বংস করা-
لِيُظْهِرَهُ عَلَى الدِّينِ كُلِّهِ وَلَوْ كَرِهَ الْمُشْرِكُونَ
'যাতে তিনি এই দ্বীনকে সমস্ত ধর্মের ওপর বিজয়ী করেন, যদিও মুশরিকরা তা অপছন্দ করে।'
যদি নিজের মাঝে এই নিয়ত ধারণ করে, তাহলে আল্লাহর প্রতিশ্রুত প্রতিদান লাভ করতে পারবে, আদেশ-নিষেধের আনুগত্যকারী হবে, শত্রুর ওপর বিজয় অর্জনে সাহায্য লাভ করবে। ফলে যুদ্ধের কষ্ট লাঘব হবে, রণাঙ্গনে ইস্পাত দৃঢ় মনোবলের অধিকারী হবে। আল্লাহ তাআলার দ্বীনকে বিজয়ী করা ছাড়া জিহাদের মাধ্যমে অন্য কিছু উদ্দেশ্য করা যাবে না।
(গ) তৃতীয় হক: যে সকল গনিমত লাভ করবে, সেক্ষেত্রে আমানত রক্ষা করবে। জিহাদে অংশগ্রহণ করা মুজাহিদদের মাঝে বণ্টন করার আগে সেখান থেকে কিছু নিয়ে নেবে না। কারণ, সেখানে প্রত্যেকেরই হক আছে।
(ঘ) চতুর্থ হক: কখনো কাছের আত্মীয় শত্রুকেও ছাড় না দেওয়া। আল্লাহর দ্বীনের সাহায্যের ক্ষেত্রে কোনো কাছের মানুষকেও প্রাধান্য না দেওয়া। কারণ, আল্লাহ তাআলার দ্বীন অবশ্যই বিজয় লাভ করবে। (তাহলে অন্য কাউকে প্রাধান্য দিলে নিজেরই ক্ষতি হবে, আল্লাহর নয়।) তাঁর দ্বীনকে অবশ্যই সাহায্য করা হবে। আল্লাহ তাআলা বলেন-
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَتَّخِذُوا عَدُوِّي وَعَدُوَّكُمْ أَوْلِيَاءَ تُلْقُونَ إِلَيْهِم بِالْمَوَدَّةِ وَقَدْ كَفَرُوا بِمَا جَاءَكُم مِّنَ الْحَقِّ
'হে ঈমানদারগণ, তোমরা আমার শত্রু এবং তোমাদের শত্রুকে বন্ধু বানিয়ো না যে, তাদের কাছে বন্ধুত্বের বার্তা পাঠাবে। অথচ তারা অস্বীকার করে ওই হককে, যা তোমাদের কাছে এসেছে।' ৩২৯
সেনাপ্রধানের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য অধিকার ও কর্তব্য
সাধারণ সেনাদের পক্ষ থেকে একজন বাহিনী-প্রধানের চারটি অধিকার রয়েছে। আমরা এখানে সেগুলো জেনে নেব-
এক. সেনাপ্রধানের আনুগত্য করা
তার ছায়াতলে থাকা। কারণ, তার নেতৃত্বেই তাদের ক্ষেত্রে সাব্যস্ত। আর তার আনুগত্য নেতৃত্বের মাধ্যমেই ওয়াজিব। আল্লাহ তাআলা বলেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا أَطِيعُوا اللَّهَ وَأَطِيعُوا الرَّسُولَ وَأُولِي الْأَمْرِ مِنكُمْ
'হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহর আনুগত্য করো এবং আনুগত্য করো রাসুলের এবং তোমাদের নেতৃবর্গের।' ৩০০
দুই. প্রতিটি বিষয়ই তার সামনে পেশ করা এবং তার সিদ্ধান্ত মেনে নেওয়া
সাধারণ সেনা ও দায়িত্বশীলদের মধ্যে যাতে পারস্পরিক মতবিরোধ সৃষ্টি না হয়। এমনটি হলে তাদের পারস্পরিক ঐক্য বিনষ্ট হবে, তাদের মাঝে দলাদলি সৃষ্টি হবে। আল্লাহ তাআলা বলেন-
وَلَوْ رَدُّوهُ إِلَى الرَّسُولِ وَإِلَى أُولِي الْأَمْرِ مِنْهُمْ لَعَلِمَهُ الَّذِينَ يَسْتَنبِطُونَهُ مِنْهُمْ
'যদি তারা সে বিষয়টি পেশ করত রাসুলের সামনে, তাদের মধ্য হতে দায়িত্বশীলদের সামনে, তাহলে তাদের মধ্যে যারা (স্বরূপ) উদঘাটন করতে পারে, তারা তার (স্বরূপ) জানতে পারত।'০০১
এই আয়াতে আল্লাহ তাআলা দায়িত্বশীলদের কাছে সমস্যা পেশ করার কথা বলেছেন, যাতে তিনি সমস্যাটি জানতে পারেন, সমস্যারও সমাধান হয়। কিন্তু যদি তারা সঠিকটি বুঝতে পারে, যা তিনি বুঝতে পারেন নি; তাহলে তার সামনে সঠিকটি তুলে ধরবে, স্পষ্ট করবে। এজন্যই মাশওয়ারা করতে বলা হয়েছে, যাতে মাশওয়ারার মাধ্যমে সঠিক পদক্ষেপ নেওয়া যায়।
তিন. আদেশ-নিষেধ মান্য করা
তিনি যখন কোনো আদেশ করবেন, সাথে সাথে আদেশ পালন করবে। যখন নিষেধ করবেন, সেটা থেকে বিরত থাকবে। কারণ, এ দুটো বিষয়ই আনুগত্যের প্রধান মাধ্যম। কিন্তু যদি তারা আদেশ-নিষেধের তোয়াক্কা না করে তাহলে তিনি তাদের অবস্থা অনুযায়ী শাস্তি দেবেন। তবে গরম এবং কঠোর হবেন না। কারণ, আল্লাহ তাআলা বলেন,
فَبِمَا رَحْمَةٍ مِّنَ اللَّهِ لِنتَ لَهُمْ وَلَوْ كُنتَ فَظًّا غَلِيظَ الْقَلْبِ لَانفَضُّوا مِنْ حَوْلِكَ فَاعْفُ عَنْهُمْ وَاسْتَغْفِرْ لَهُمْ وَشَاوِرْهُمْ فِي الْأَمْرِ فَإِذَا عَزَمْتَ فَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ : إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُتَوَكِّلِين..
‘আল্লাহর অনুগ্রহের কারণেই আপনি তাদের জন্য কোমল হতে পেরেছেন। যদি আপনি কঠোর এবং রূঢ় হৃদয়ের অধিকারী হতেন, তাহলে তারা আপনার কাছ থেকে সরে পড়ত।’ ৩০২
চার.
তিনি যখন গনিমত বণ্টন করবেন, তখন তার সাথে আপত্তি করবে না। বরং, তার সমবণ্টনে সন্তুষ্ট থাকবে। কারণ, আল্লাহ তাআলাই গনিমতের ক্ষেত্রে সম্মানিত-অসম্মানিত, দুর্বল-শক্তিশালী সবার ক্ষেত্রে সাম্যের কথা বলেছেন।

টিকাঃ
৩২৮ সূরা আনফাল, আয়াত: ১৬
*সূরা মুমতাহিনা, আয়াত: ১
** সূরা নিসা, আয়াত: ৫৯
*** সূরা নিসা, আয়াত: ৮৩
৩০২ সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৫৯

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00