📘 ইসলামি রাষ্ট্র ব্যবস্থা > 📄 সেনাবাহিনী গঠন করার শর্তাবলি

📄 সেনাবাহিনী গঠন করার শর্তাবলি


আল্লামা মাওয়ারদি বলেন—সেনাবাহিনীকে যেভাবে গঠন করলে (খলিফা ও আমিরের সামনে) তাদের আত্মসমর্পণ ও আনুগত্য অটুট থাকবে, তাদের বিজয় নিশ্চিত হবে, সেইভাবে গঠন করাটা তখনই সম্ভব, যদি তাদের মধ্যে চারটি শর্ত পাওয়া যায়। যদি সেনাবাহিনী সেই শর্তগুলো পূরণ করে, তাহলে তারা যোগ্য হবে এবং অবিচল থাকতে পারবে। আর যদি সেগুলোর ক্ষেত্রে ত্রুটি করে, তাহলে নিজেরাও বিনষ্ট হবে এবং রাজ্যের জন্য তারা বিপদজনকও হয়ে দাঁড়াবে।
প্রথম শর্ত: তাদের শিষ্টাচার শেখানোর মাধ্যমে বাহিনী গঠন করা, যা তাদের সাহায্য-সহযোগিতা অব্যাহত রাখবে, তাদের শক্তি বৃদ্ধি করবে, যাতে তিনি তাদের যোগ্য করে তুলতে পারেন নিজেদের জন্য, তারপর খলিফার জন্য, তারপর জনগণের জন্য। নিজেদের জন্য যোগ্য করে তোলার তিনটি পদ্ধতি—
এক. প্রথমত সেনাবাহিনীর যে সকল সাজ-সরঞ্জাম প্রয়োজন, সেগুলো তাদের দেওয়া। যেমন: গাড়ি চালানোর জন্য প্রশিক্ষণ দেওয়া, যুদ্ধের জন্য অভিজ্ঞতা তৈরি করানো। কারণ, এই দুটো জিনিস জ্ঞান ও কর্ম উভয়টি সমৃদ্ধ করবে।
দুই. দ্বিতীয়ত, তাদের শুধু সেনাবাহিনীর মাঝেই সীমাবদ্ধ রাখবে। অন্য কোনো কাজে যেন জড়াতে না পারে, অন্যথায় মূল জায়গাতেই ত্রুটি সৃষ্টি হবে।
তিন. তৃতীয়ত, ভারসাম্য রক্ষা করবে। অর্থাৎ আনন্দ উপভোগ করতে দেওয়া, তবে অতিরিক্ত করবে না, তাহলে সেদিকেই ঝুঁকে পড়বে। আবার বাধাও দেবে না, তাহলে তাদের উত্তেজিত করে ফেলবে।
শাসকের জন্য সেনাবাহিনীকে উত্তম করে গড়ে তোলার তিনটি পদ্ধতি—
এক. প্রথমত, তার মুহাব্বাত যেন তাদের অন্তরে বসে যায়। ফলে তারা হিতাকাঙ্ক্ষী হবে।
দুই. দ্বিতীয়ত, তাদের অন্তরে যেন তার প্রতি শ্রদ্ধাবোধ তৈরি হয়। ফলে তারা তার আনুগত্য করবে।
তিন. তারা যেন এই বিশ্বাস লালন করতে পারে যে—দেশের কল্যাণ তো নিজেদের কল্যাণ, দেশের অকল্যাণ তো নিজেদের অকল্যাণ।
জনগণের জন্য সেনাবাহিনীকে উত্তম করে গড়ে তোলার তিনটি পদ্ধতি—
এক. প্রথমত, প্রত্যেকে চেষ্টা করবে, যাতে নিজের দ্বারা জনগণের ক্ষতি না হয়।
দুই. দ্বিতীয়ত, জনগণের কোনো ক্ষতি হলে সেটা প্রতিরোধ করা।
তিন. তৃতীয়ত, জনগণের উপকারে সহযোগী হওয়া।
অতএব, এভাবে যদি শাসক সেনাবাহিনীকে গড়ে তুলতে পারেন, আর তারাও এই আদর্শকে ধরে রাখতে পারে, তাহলে তারা হবে একজন শ্রেষ্ঠ খলিফার শ্রেষ্ঠ বাহিনী।
দ্বিতীয় শর্ত: তাদেরকে কয়েকটি শ্রেণিবিন্যাসে ভাগ করতে হবে—
এক. প্রথমত, যুদ্ধে পরিশ্রম করা;
দুই. দ্বিতীয়ত, খলিফার পক্ষে লড়াই করা;
তিন. তৃতীয়ত, দ্রুত আনুগত্যের পথে লাভবান হওয়া।
এই শ্রেণিবিন্যাস করা হবে, যাতে তারা বুঝতে পারে যে—তাদের মাঝে কাদের কাজগুলো প্রশংসনীয়, কারা হিতাকাঙ্ক্ষী, কারা খলিফার আদেশ মেনে চলে আর কারা তার বিরুদ্ধে সীমালঙ্ঘন করে।
অতএব, এভাবে শ্রেণিবিন্যাসে ভাগ করলে তিনটি গুণ অর্জিত হবে, যার মাধ্যমে তাদের খারাপ কাজগুলো সংশোধন হয়ে যাবে, তারা তাদের গঠনগত উন্নতির দিকে এগিয়ে যাবে। তিনটি গুণ হলো—
এক. প্রথমত, তাদের মধ্যে যারা উত্তম, তারা আরও বেশি উত্তম কাজ করবে, উপদেশ শুনবে, যাতে পদোন্নতি হয়, বেতন বাড়িয়ে দেওয়া হয়। পদোন্নতি হবে, মানে বেতনও বাড়িয়ে দেওয়া হবে।
দুই. দ্বিতীয়ত, যারা নিজেদের দায়িত্ব ভালোভাবে আঞ্জাম দেয় না, অথবা খারাপ কাজ করে বেড়ায়, তারা যখন দেখবে ভালোদের পদোন্নতি হচ্ছে, বেতন বৃদ্ধি পাচ্ছে, তখন তাদের দেখে সে উৎসাহিত হবে, দায়িত্ব পালনে সচেষ্ট হবে।
তিন. তৃতীয়ত, যে অযোগ্য, সে এমন পদ চাওয়া থেকে বিরত থাকবে—যা তার জন্য সাজে না। সে এমন পদ থেকে পিছিয়ে থাকবে—যার উপযুক্ত সে নয়; বরং তার মনোবল যদি ছোটো হয়, তাহলে সে নিস্তেজতা নিয়েই সন্তুষ্ট থাকবে। যদি তার প্রেরণা দুর্বল হয়, তাহলে সে ত্রুটি নিয়েই তুষ্ট থাকবে। পরবর্তী সময়ে যদি কোনো চেতনা তাকে জাগ্রত করতে চায়, যদি সে এর চেয়ে বেশি কিছু না চায়, তারপরও হয়তো সে আগ্রহী হবে না। ৩১০
সুতরাং, খলিফার কর্তব্য হচ্ছে—প্রত্যেককে তার যোগ্যতা ও দক্ষতা অনুযায়ী কদর করা। আল্লাহ তাআলা বলেন—
إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُكُمْ أَن تُؤَدُّوا الْأَمَانَاتِ إِلَى أَهْلِهَا
'নিঃসন্দেহে, আল্লাহ তোমাদের আদেশ করছেন, যাতে তোমরা হকদারদের কাছে তার আমানত পৌঁছে দাও।' ৩১১
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন-
فإذا ضيعت الأمانة فانتظر الساعة قال كيف إضاعتها قال إذا وسد الأمر إلى غير أهله فانتظر الساعة
'যখন আমানত নষ্ট করে ফেলা হবে, তখন কিয়ামতের অপেক্ষা করো। একলোক বলে উঠল—আমানত কীভাবে নষ্ট করা হয়? নবীজি বললেন—যখন কোনো দায়িত্ব অযোগ্যকে দেওয়া হয়, তখন কিয়ামতের অপেক্ষা করো।'
তৃতীয় শর্ত: তাদের যথেষ্ট পরিমাণ বেতন দেওয়া, যাতে তাদের আর কোনো প্রয়োজন দেখা না দেয়। কারণ, এই প্রয়োজন তাদের তিনটি কাজ করতে প্ররোচিত করবে, যার কোনোটিই কল্যাণকর নয়—
০১. হয় তারা জনগণের সম্পদে হস্তক্ষেপ করবে,
০২. অথবা এমন কোনো খলিফার খোঁজে থাকবে, যার কাছে তারা যথেষ্ট পরিমাণ বেতন পাবে।
০৩. কিংবা তারা অন্য কোনো কাজে লেগে যাবে। ফলে মূল কাজেই ভাটা পড়বে। আর যখন তাদেরকে যুদ্ধে ডাকা হবে, তখন তারা নিজেদেরকে কষ্টে ফেলতে রাজি হবে না, যদি না খলিফা তাদের প্রয়োজন পূরণ করে দেন।
কেউ কেউ বলেন— ‘যে তোমার দান-অনুগ্রহে বিশ্বাসী হয়, সে তোমার ক্ষমতার প্রতি সহানুভূতিশীল হবে। তবে অতিরিক্ত দেওয়ার চেয়ে প্রয়োজন পরিমাণ দেওয়াই ভালো। কারণ, অতিরিক্ত দেওয়া হলে হয় তারা নষ্ট করবে, ফলে অপচয় করা হবে; কিংবা সম্পদ বেশি থাকার কারণে দায়িত্বে অবহেলা করবে।’ ৩১২
চতুর্থ শর্ত: খলিফা সবসময় সেনাবাহিনীকে পর্যবেক্ষণে রাখবেন, তাদের সম্পর্কে বেখবর থাকবেন না। তাদের খবরাখবর যেন গোপন না থাকে, তাদের অবস্থা যেন তার কাছে অজানা না থাকে। কারণ, তারাই রাষ্ট্রের পাহারাদার, জনগণের প্রতিরক্ষাকারী। এখন খলিফার যদি তাদের মন্দ গুণ জানা না থাকে, ভালো গুণ গোপন থাকে; তাহলে মন্দ গুণগুলোই ধীরে ধীরে সবার মাঝে ছড়িয়ে পড়বে। কারণ, ভালোর চেয়ে মন্দের প্রভাবই বেশি। মোটকথা, তারা নিজেরাও খারাপ থাকবে, অন্যদেরকেও খারাপ বানাবে।

টিকাঃ
তাসহিলুন নাজর: ১৭১
৩১০ তাসহিলুন নাজর
৩১১ সুরা নিসা, আয়াত: ৫৮

📘 ইসলামি রাষ্ট্র ব্যবস্থা > 📄 শাসকের জন্য সেনাবাহিনীকে উত্তম করে গড়ে তোলার তিনটি পদ্ধতি

📄 শাসকের জন্য সেনাবাহিনীকে উত্তম করে গড়ে তোলার তিনটি পদ্ধতি


এক. প্রথমত, তার মুহাব্বাত যেন তাদের অন্তরে বসে যায়। ফলে তারা হিতাকাঙ্ক্ষী হবে।
দুই. দ্বিতীয়ত, তাদের অন্তরে যেন তার প্রতি শ্রদ্ধাবোধ তৈরি হয়। ফলে তারা তার আনুগত্য করবে।
তিন. তারা যেন এই বিশ্বাস লালন করতে পারে যে—দেশের কল্যাণ তো নিজেদের কল্যাণ, দেশের অকল্যাণ তো নিজেদের অকল্যাণ।

টিকাঃ
তাসহিলুন নাজর: ১৭১

📘 ইসলামি রাষ্ট্র ব্যবস্থা > 📄 জনগণের জন্য সেনাবাহিনীকে উত্তম করে গড়ে তোলার তিনটি পদ্ধতি

📄 জনগণের জন্য সেনাবাহিনীকে উত্তম করে গড়ে তোলার তিনটি পদ্ধতি


এক. প্রথমত, প্রত্যেকে চেষ্টা করবে, যাতে নিজের দ্বারা জনগণের ক্ষতি না হয়।
দুই. দ্বিতীয়ত, জনগণের কোনো ক্ষতি হলে সেটা প্রতিরোধ করা।
তিন. তৃতীয়ত, জনগণের উপকারে সহযোগী হওয়া।
অতএব, এভাবে যদি শাসক সেনাবাহিনীকে গড়ে তুলতে পারেন, আর তারাও এই আদর্শকে ধরে রাখতে পারে, তাহলে তারা হবে একজন শ্রেষ্ঠ খলিফার শ্রেষ্ঠ বাহিনী।

টিকাঃ
তাসহিলুন নাজর: ১৭১

📘 ইসলামি রাষ্ট্র ব্যবস্থা > 📄 ইসলামি সেনাপ্রধানের বৈশিষ্ট্য

📄 ইসলামি সেনাপ্রধানের বৈশিষ্ট্য


ইসলামি সালতানাতের সেনাপ্রধানকে যেকোনো মূল্যেই উত্তম গুণাবলি অর্জন করতে হবে, ইসলামি আখলাক দ্বারা নিজেকে সজ্জিত করতে হবে। কারণ, সেনাবাহিনীই হলো রাষ্ট্রের শক্তিশালী বুনিয়াদ, ইলায়ে কালিমাতুল্লাহর (আল্লাহ তাআলার দ্বীন বুলন্দ করা) মূল ভিত্তি। সুতরাং, সেনাপ্রধানকে অবশ্যই সামনে উল্লিখিত গুণাবলি ধারণ করতে হবে—
০১. প্রয়োজনীয় পরিমাণ শরয়ি হুকুম-আহকামের ইলম থাকা;
মানুষকে সংশোধন করার বড়ো একটি মাধ্যম হলো ইলম। কারণ, ইলমের মাধ্যমেই হালাল-হারাম, ভালো-মন্দের মাঝে পার্থক্য করা সম্ভব। উমার রা.-ও প্রশাসক নির্বাচনে ইলমের বিবেচনা করতেন, বিশেষ করে মুজাহিদ বাহিনীর আমিরদের ক্ষেত্রে। ইমাম তাবারি রহ. বলেন—
إن أمير المؤمنين كان إذا اجتمع إليه جيش من أهل الإيمان أثر عليهم رجلا من أهل الفقه والعلم
‘আমিরুল মুমিনিন উমার রা.-এর কাছে যখন কোনো মুজাহিদবাহিনী আসত, তখন তিনি তাদের জন্য একজন আলিম, ফকিহকে আমির হিসাবে নিযুক্ত করতেন।’ ৩১৩
০২. তাকওয়া অবলম্বন, নেক কাজ করা এবং মন্দ কাজ পরিহার করা। খুলাফায়ে রাশিদিন তাদের প্রশাসকদের তাকওয়ার আদেশ করতেন। কাসিম ইবনু মুহাম্মাদ রহ. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন— আবু বকর রা. আমর এবং ওয়ালিদ ইবনু আকাবাকে সাদাকা উসুল করার কাজে পাঠিয়েছিলেন। পরবর্তী সময়ে তিনি তাদের কাছে চিঠি লিখে প্রত্যেককে আলাদাভাবে আদেশ করে বলেন-
'প্রকাশ্যে এবং অপ্রকাশ্যে আল্লাহকে ভয় করে চলো। কারণ, যে আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তাআলা তার জন্য উপায় বের করে দেন, তাকে এমন জায়গা থেকে রিজিক প্রদান করেন-যা সে কল্পনাও করতে পারে না। আর যে আল্লাহকে ভয় করবে, আল্লাহ তাআলা তার গুনাহ মোচন করে দেবেন। তাকে বিরাট প্রতিদান দেবেন। কারণ, মানুষ একে অপরকে যে বিষয়ের আদেশ করে, তার মধ্যে সবচেয়ে উত্তম হচ্ছে তাকওয়ার আদেশ করা।
তুমি আল্লাহর রাস্তায় আছ, যে বিষয়র ওপর দ্বীনের ভিত্তি প্রতিষ্ঠিত হবে, ইসলাম হিফাজত থাকবে; সেক্ষেত্রে যেন সামান্য তোষামোদ, শিথিলতা বা গাফিলতি না হয়। অতএব, দায়িত্বে শিথিলতা করো না, অবহেলা করো না। ৩১৪
নাফি রহ. থেকে বর্ণিত আছে, উমার রা. তার প্রশাসকদের কাছে চিঠি লিখে বলেন- إِنَّ أَهَمَّ أُمُورِكُمْ عِنْدِي الصَّلَاةُ مَنْ حَفِظَهَا وَحَافَظَ عَلَيْهَا حَفِظَ دِينَهُ وَمَنْ ضَيَّعَهَا فَهُوَ لِسَوَاهَا أَضْيَعُ
'আমার নিকট তোমাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে নামাজ। যে নামাজ হিফাজতে রাখবে, নিয়মিত আদায় করবে, সে দ্বীন হিফাজত রাখতে পারবে। আর যে নামাজ ঠিক রাখল না, সে কোনো কিছুই ঠিক রাখতে পারবে না।' ৩১৫
০৩. শক্তি;
০৪. আমানতদারিতা। কোনো দায়িত্ব কাউকে সোপর্দ করলে তার মাঝে শক্তি ও আমানতদারিতা থাকতেই হবে। শক্তির মাধ্যমে দায়িত্ব পালন করবে, আমানতদারিতার মাধ্যমে হিফাজতে রাখবে। এজন্যই শুআইব আলাইহিস সালামের মেয়ে তার বাবাকে (মুসা আ.-কে কাজ দেওয়ার কারণ হিসাবে) বলেছিলেন- يَا أَبَتِ اسْتَأْجِرْهُ إِنَّ خَيْرَ مَنِ اسْتَأْجَرْتَ الْقَوِيُّ الْأَمِينُ
'আব্বা, আপনি তাকে (মুসা আ.) শ্রমিক হিসাবে নিযুক্ত করেন। কারণ, আপনার মজুর হিসেবে উত্তম হবে সেই ব্যক্তি, যে শক্তিশালী ও বিশ্বস্ত।'৩১৬
০৫. বিচক্ষণতা ও অভিজ্ঞতা; যে কাজের ক্ষেত্রে অভিজ্ঞ না, সে ওই কাজ উপযোগী পন্থায় পূর্ণ করতে পারবে না; যদিও তার সে বিষয় সম্পর্কে অনেক জ্ঞান থাকে, শক্তি থাকে, আমানতদারিতা থাকে।
সুতরাং, কোনো কাজ করতে হলে অভিজ্ঞতা অবশ্যই জরুরি। এজন্যই উমার রা. কাউকে রাষ্ট্রীয় কাজে নিযুক্ত করতে চাইলে তাকেই নিযুক্ত করতেন, যে অভিজ্ঞ; যদিও অন্যান্য ক্ষেত্রে তার চেয়ে যোগ্য অন্য কেউ থাকত। ৩১৭
০৬. অধীন ব্যক্তিদের প্রতি স্নেহ ও দয়া; নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন-
اللهم من ولي من أمر أمتي شيئا فشق عليهم فاشقق عليه ومن ولي من أمر أمتي شيئا فرفق بهم فارفق به...
'হে আল্লাহ, যে আমার উম্মাহর কোনো দায়িত্ব গ্রহণ করার পর তাদের প্রতি কঠোরতার আচরণ করবে, আপনিও তার প্রতি কঠোরতার আচরণ করেন। আর যে আমার উম্মাহর কোনো দায়িত্ব গ্রহণ করার পর তাদের প্রতি নমনীয়তার আচরণ করবে, আপনিও তার প্রতি নমনীয়তার আচরণ করেন।' ৩১৮
উমার রা. এমন কাউকেই নির্বাচন করতেন না, যে তার অধীনদের প্রতি দয়া করে না। আবু উসমান থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন—একবার উমার রা. বনু আসাদের এক ব্যক্তিকে কোনো কাজে নিযুক্ত করলেন। একদিন লোকটি সালাম-মোলাকাতের উদ্দেশ্যে উমার রা. কাছে আসে, আর তখন উমার রা. এর এক সন্তান এলে তার মুখে চুমু খান।
তখন ওই লোকটি বলে উঠল— 'আরে, আপনি এর মুখে চুমু খাচ্ছেন? আল্লাহর কসম! আমি তো কখনোই কোনো সন্তানকে চুমু দিই নি।'
তখন উমার রা. বলেন— 'তাহলে তো তুমি মানুষের প্রতিও দয়া করবে না। যাও এখান থেকে! তুমি আর আমার সাথে কোনো কাজ করবে না!'
এভাবে উমার রা. তার দায়িত্ব ফিরিয়ে নিলেন।
আরেকবার উমার রা.-এর একটি বাহিনী পারস্যে যুদ্ধ করতে যায়। একসময় সামনে নদী আসে। উপরে কোনো ব্রিজ ছিল না। তখন ওই বাহিনীর আমির একজনকে কঠিন ঠান্ডার সময় পানিতে নামার আদেশ করে এটা দেখার জন্য যে, কোন দিক দিয়ে বাহিনী অতিক্রম করতে পারবে। তখন লোকটি বলল—আমি যদি পানিতে নামি, তাহলে মরে যেতে পারি। তবুও আমির তাকে নামতে বাধ্য করল। তখন লোকটি নেমে চিৎকার করে বলল-'উমার! উমার! আপনি কোথায়?' একটু পরই লোকটি মারা যায়। উমার রা. এর কাছে যখন ঘটনাটি পৌঁছে তখন তিনি মদিনার বাজারে ছিলেন। তিনি বলে উঠেন-'লাব্বাইক, লাব্বাইক।' উমার রা. বাহিনীর আমিরের কাছে পত্র লিখে তাকে বরখাস্ত করে দেন। আর বলেন- 'যদি না এটা প্রথা হয়ে যাওয়ার ভয় থাকত, তাহলে আমি অবশ্যই তোমার থেকে কিসাস গ্রহণ করতাম। এখন থেকে আর কখনো আমার সাথে কাজ করবেনা।' ৩১৯
০৭. সাহসিকতা; সেনাপ্রধানকে সাহসী হতে হবে। কারণ, যদি সাহসী পরিচালক না হয় তাহলে সাথিদের ওপর আপদ হয়ে দাঁড়াবে। কেননা, সৈনিক দুর্বল হলেও সাহসী নেতার সাথে শক্তি পায়। পক্ষান্তরে সৈনিক শক্তিশালী হলেও কাপুরুষ নেতার সাথে দুর্বল হয়ে যায়। ইমাম তুরতুশি রহ. বলেন, অনারব দার্শনিকরা বলেন-
أسد يقود الف ثعلب خير من ثعلب يقود ألف أسد
'যে শেয়াল হাজার সিংহের নেতৃত্ব দেয়, তার চেয়ে হাজার গুণ শ্রেষ্ঠ ওই সিংহ, যে হাজার শেয়ালের নেতৃত্ব দেয়।'
সুতরাং, বাহিনীর প্রধান তাকেই বানাবে—যে নির্ভীক, বীরত্বের অধিকারী, পরম বিক্রমশালী, সাহসী, শুধু সাহসী না, বরং দুঃসাহসী, অবিচল হৃদয়ের অধিকারী, দৃঢ় প্রত্যয়ী এবং ইস্পাত দৃঢ় মনোবলের অধিকারী।৩২০

টিকাঃ
৩১২ তাহসিলুন নাজর
৩১৩ সাল্লাবি, তারিখুল খুলাফা, ২/
৩১৪ কানজুল উম্মাল, ৪৪১৮৫
৩১৫ মুসান্নাফু ইবনি আবি শাইবা, ২০৩৮
৩১৬ সূরা কাসাস, আয়াত: ২৬
৩১৭ ইউসুফ সাল্লাবি (মৃ ৯০৯ হি.), আস সাওয়াব ফি ফাজায়িলি উমার ইবনুল খাত্তাব রা., খণ্ড : ১, পৃষ্ঠা: ৩১৯
৩১৮ সহিহ মুসলিম ১৮৯৮
৩১৯ ইবনুল জাউজি, মানকিবে আমিরুল মুমিনিন, ১৫০
৩২০ সিরাজল মলক, পৃষ্ঠা: ১৮৪

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00