📄 সেনাবাহিনী পরিচালনা করা
সেনাবাহিনীর কাজ হলো জিহাদ করা। যতক্ষণ পর্যন্ত সেনাবাহিনী তাদের এই মহান কাজে নিয়োজিত থাকবে, ততক্ষণ পর্যন্ত তারা আল্লাহর রাস্তার মুজাহিদ বলে বিবেচিত হবে। কারণ, তারা মুসলিমদের ইজ্জত-আব্রু, ধনসম্পদ, তাদের দ্বীনি প্রতীক মসজিদ-মাদ্রাসা রক্ষা করেন। সেনাবাহিনী পরিচালনা ও গঠন করা রাষ্ট্রের মৌলিক ভিত্তি। কারণ, এই সেনাবাহিনীর মাধ্যমেই খলিফা বিজয় অর্জন করেন। তাই, যদি সেনাবাহিনী শক্তিশালী হয়ে ওঠে, যোগ্য হয়ে ওঠে, তাহলে এটা খলিফার নিজেরই শক্তি। আর যদি তারা বিনষ্ট ও অকর্মণ্য হয়ে যায়, তাহলে তার নিজেরই ক্ষতি। কারণ খুবই সম্ভব যে, তিনি তাদের থেকে ভালো কিছু পাবেন না।
সেনাবাহিনীকে প্রথমে ইসলামি শিষ্টাচার শিক্ষা দেওয়ার মাধ্যমে গঠন করা হবে। কারণ, এর মাধ্যমে প্রকৃত শক্তি অর্জিত হয়। তারপর যুদ্ধের সাজ-সরঞ্জাম দিয়ে ভালোভাবে প্রশিক্ষণ দেওয়ার মাধ্যমে গঠন করা হবে।
রবিআ ইবনু ইয়াজিদ থেকে বর্ণিত, আবু দারদা রা. বলেন—'হে লোকসকল, অভিযানে যাওয়ার আগে নেক আমল করতে হবে। কারণ, তোমরা তো লড়াই করবে কেবল তোমাদের নেক আমলের মাধ্যমেই।'৩০৬
আল্লাহ তাআলা বলেন—
وَأَعِدُّوا لَهُم مَّا اسْتَطَعْتُم مِّن قُوَّةٍ وَمِن رِبَاطِ الْخَيْلِ تُرْهِبُونَ بِهِ عَدُوَّ اللَّهِ وَعَدُوَّكُمْ وَآخَرِينَ مِن دُونِهِمْ لَا تَعْلَمُونَهُمُ اللَّهُ يَﻌْلَمُهُمْ ، وَمَا تُنفِقُوا مِن شَيْءٍ فِي سَبِيلِ اللَّهِ يُوَفَّ إِلَيْكُمْ وَأَنتُمْ لَا تُظْلَمُونَ
'আর তোমরা তাদের জন্য অস্ত্রশক্তি এবং অশ্বিনী দিয়ে যতটুকু পারো প্রস্তুতি গ্রহণ করো, যার মাধ্যমে তোমরা ভীতসন্ত্রস্ত করবে আল্লাহর শত্রুকে এবং তোমাদের শত্রুকে এবং তাদের চেয়ে অন্যদেরকে, যাদেরকে তোমরা জানো না, কিন্তু আল্লাহ তাদের জানেন। তোমরা আল্লাহর পথে যা খরচ করো, তার পুরোপরি প্রতিদান তোমাদের দেওয়া হবে, আর তোমাদের সাথে কক্ষনো জুলুম করা হবে না।'৩০৭
ইমাম রাজি রহ. বলেন— 'এই আয়াত প্রমাণ করে যে, তির-অস্ত্র, ঘোড়দৌড় এবং নিক্ষেপের মাধ্যমে জিহাদের প্রস্তুতি নেওয়া ফরজ। তবে সেটা ফরজে কিফায়া।'৩০৮
আল্লাহ তাআলা যে বলেছেন— 'তোমরা তাদের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করো' এর মধ্যে যুগোপযোগী সব ধরনের অস্ত্র উদ্দেশ্য। আরও উদ্দেশ্য সেনাবাহিনীকে সর্বোচ্চ মানের প্রশিক্ষণ দেওয়া। কারণ, সেনাবাহিনীই জাতির ঢাল এবং দুর্বোধ্য প্রাচীর। অবশ্য প্রস্তুতি গ্রহণ হবে সাধ্য অনুযায়ী। এ কারণে আল্লাহ তাআলা বলেন— 'তোমরা প্রস্তুতি গ্রহণ করো সাধ্য অনুযায়ী।'
টিকাঃ
*** সূরা আনফাল, আয়াত: ৬০
*** আত তাফসিরুল কাবির, ১৫/৪৯/
📄 সেনাবাহিনী গঠন করার শর্তাবলি
আল্লামা মাওয়ারদি বলেন—সেনাবাহিনীকে যেভাবে গঠন করলে (খলিফা ও আমিরের সামনে) তাদের আত্মসমর্পণ ও আনুগত্য অটুট থাকবে, তাদের বিজয় নিশ্চিত হবে, সেইভাবে গঠন করাটা তখনই সম্ভব, যদি তাদের মধ্যে চারটি শর্ত পাওয়া যায়। যদি সেনাবাহিনী সেই শর্তগুলো পূরণ করে, তাহলে তারা যোগ্য হবে এবং অবিচল থাকতে পারবে। আর যদি সেগুলোর ক্ষেত্রে ত্রুটি করে, তাহলে নিজেরাও বিনষ্ট হবে এবং রাজ্যের জন্য তারা বিপদজনকও হয়ে দাঁড়াবে।
প্রথম শর্ত: তাদের শিষ্টাচার শেখানোর মাধ্যমে বাহিনী গঠন করা, যা তাদের সাহায্য-সহযোগিতা অব্যাহত রাখবে, তাদের শক্তি বৃদ্ধি করবে, যাতে তিনি তাদের যোগ্য করে তুলতে পারেন নিজেদের জন্য, তারপর খলিফার জন্য, তারপর জনগণের জন্য। নিজেদের জন্য যোগ্য করে তোলার তিনটি পদ্ধতি—
এক. প্রথমত সেনাবাহিনীর যে সকল সাজ-সরঞ্জাম প্রয়োজন, সেগুলো তাদের দেওয়া। যেমন: গাড়ি চালানোর জন্য প্রশিক্ষণ দেওয়া, যুদ্ধের জন্য অভিজ্ঞতা তৈরি করানো। কারণ, এই দুটো জিনিস জ্ঞান ও কর্ম উভয়টি সমৃদ্ধ করবে।
দুই. দ্বিতীয়ত, তাদের শুধু সেনাবাহিনীর মাঝেই সীমাবদ্ধ রাখবে। অন্য কোনো কাজে যেন জড়াতে না পারে, অন্যথায় মূল জায়গাতেই ত্রুটি সৃষ্টি হবে।
তিন. তৃতীয়ত, ভারসাম্য রক্ষা করবে। অর্থাৎ আনন্দ উপভোগ করতে দেওয়া, তবে অতিরিক্ত করবে না, তাহলে সেদিকেই ঝুঁকে পড়বে। আবার বাধাও দেবে না, তাহলে তাদের উত্তেজিত করে ফেলবে।
শাসকের জন্য সেনাবাহিনীকে উত্তম করে গড়ে তোলার তিনটি পদ্ধতি—
এক. প্রথমত, তার মুহাব্বাত যেন তাদের অন্তরে বসে যায়। ফলে তারা হিতাকাঙ্ক্ষী হবে।
দুই. দ্বিতীয়ত, তাদের অন্তরে যেন তার প্রতি শ্রদ্ধাবোধ তৈরি হয়। ফলে তারা তার আনুগত্য করবে।
তিন. তারা যেন এই বিশ্বাস লালন করতে পারে যে—দেশের কল্যাণ তো নিজেদের কল্যাণ, দেশের অকল্যাণ তো নিজেদের অকল্যাণ।
জনগণের জন্য সেনাবাহিনীকে উত্তম করে গড়ে তোলার তিনটি পদ্ধতি—
এক. প্রথমত, প্রত্যেকে চেষ্টা করবে, যাতে নিজের দ্বারা জনগণের ক্ষতি না হয়।
দুই. দ্বিতীয়ত, জনগণের কোনো ক্ষতি হলে সেটা প্রতিরোধ করা।
তিন. তৃতীয়ত, জনগণের উপকারে সহযোগী হওয়া।
অতএব, এভাবে যদি শাসক সেনাবাহিনীকে গড়ে তুলতে পারেন, আর তারাও এই আদর্শকে ধরে রাখতে পারে, তাহলে তারা হবে একজন শ্রেষ্ঠ খলিফার শ্রেষ্ঠ বাহিনী।
দ্বিতীয় শর্ত: তাদেরকে কয়েকটি শ্রেণিবিন্যাসে ভাগ করতে হবে—
এক. প্রথমত, যুদ্ধে পরিশ্রম করা;
দুই. দ্বিতীয়ত, খলিফার পক্ষে লড়াই করা;
তিন. তৃতীয়ত, দ্রুত আনুগত্যের পথে লাভবান হওয়া।
এই শ্রেণিবিন্যাস করা হবে, যাতে তারা বুঝতে পারে যে—তাদের মাঝে কাদের কাজগুলো প্রশংসনীয়, কারা হিতাকাঙ্ক্ষী, কারা খলিফার আদেশ মেনে চলে আর কারা তার বিরুদ্ধে সীমালঙ্ঘন করে।
অতএব, এভাবে শ্রেণিবিন্যাসে ভাগ করলে তিনটি গুণ অর্জিত হবে, যার মাধ্যমে তাদের খারাপ কাজগুলো সংশোধন হয়ে যাবে, তারা তাদের গঠনগত উন্নতির দিকে এগিয়ে যাবে। তিনটি গুণ হলো—
এক. প্রথমত, তাদের মধ্যে যারা উত্তম, তারা আরও বেশি উত্তম কাজ করবে, উপদেশ শুনবে, যাতে পদোন্নতি হয়, বেতন বাড়িয়ে দেওয়া হয়। পদোন্নতি হবে, মানে বেতনও বাড়িয়ে দেওয়া হবে।
দুই. দ্বিতীয়ত, যারা নিজেদের দায়িত্ব ভালোভাবে আঞ্জাম দেয় না, অথবা খারাপ কাজ করে বেড়ায়, তারা যখন দেখবে ভালোদের পদোন্নতি হচ্ছে, বেতন বৃদ্ধি পাচ্ছে, তখন তাদের দেখে সে উৎসাহিত হবে, দায়িত্ব পালনে সচেষ্ট হবে।
তিন. তৃতীয়ত, যে অযোগ্য, সে এমন পদ চাওয়া থেকে বিরত থাকবে—যা তার জন্য সাজে না। সে এমন পদ থেকে পিছিয়ে থাকবে—যার উপযুক্ত সে নয়; বরং তার মনোবল যদি ছোটো হয়, তাহলে সে নিস্তেজতা নিয়েই সন্তুষ্ট থাকবে। যদি তার প্রেরণা দুর্বল হয়, তাহলে সে ত্রুটি নিয়েই তুষ্ট থাকবে। পরবর্তী সময়ে যদি কোনো চেতনা তাকে জাগ্রত করতে চায়, যদি সে এর চেয়ে বেশি কিছু না চায়, তারপরও হয়তো সে আগ্রহী হবে না। ৩১০
সুতরাং, খলিফার কর্তব্য হচ্ছে—প্রত্যেককে তার যোগ্যতা ও দক্ষতা অনুযায়ী কদর করা। আল্লাহ তাআলা বলেন—
إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُكُمْ أَن تُؤَدُّوا الْأَمَانَاتِ إِلَى أَهْلِهَا
'নিঃসন্দেহে, আল্লাহ তোমাদের আদেশ করছেন, যাতে তোমরা হকদারদের কাছে তার আমানত পৌঁছে দাও।' ৩১১
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন-
فإذا ضيعت الأمانة فانتظر الساعة قال كيف إضاعتها قال إذا وسد الأمر إلى غير أهله فانتظر الساعة
'যখন আমানত নষ্ট করে ফেলা হবে, তখন কিয়ামতের অপেক্ষা করো। একলোক বলে উঠল—আমানত কীভাবে নষ্ট করা হয়? নবীজি বললেন—যখন কোনো দায়িত্ব অযোগ্যকে দেওয়া হয়, তখন কিয়ামতের অপেক্ষা করো।'
তৃতীয় শর্ত: তাদের যথেষ্ট পরিমাণ বেতন দেওয়া, যাতে তাদের আর কোনো প্রয়োজন দেখা না দেয়। কারণ, এই প্রয়োজন তাদের তিনটি কাজ করতে প্ররোচিত করবে, যার কোনোটিই কল্যাণকর নয়—
০১. হয় তারা জনগণের সম্পদে হস্তক্ষেপ করবে,
০২. অথবা এমন কোনো খলিফার খোঁজে থাকবে, যার কাছে তারা যথেষ্ট পরিমাণ বেতন পাবে।
০৩. কিংবা তারা অন্য কোনো কাজে লেগে যাবে। ফলে মূল কাজেই ভাটা পড়বে। আর যখন তাদেরকে যুদ্ধে ডাকা হবে, তখন তারা নিজেদেরকে কষ্টে ফেলতে রাজি হবে না, যদি না খলিফা তাদের প্রয়োজন পূরণ করে দেন।
কেউ কেউ বলেন— ‘যে তোমার দান-অনুগ্রহে বিশ্বাসী হয়, সে তোমার ক্ষমতার প্রতি সহানুভূতিশীল হবে। তবে অতিরিক্ত দেওয়ার চেয়ে প্রয়োজন পরিমাণ দেওয়াই ভালো। কারণ, অতিরিক্ত দেওয়া হলে হয় তারা নষ্ট করবে, ফলে অপচয় করা হবে; কিংবা সম্পদ বেশি থাকার কারণে দায়িত্বে অবহেলা করবে।’ ৩১২
চতুর্থ শর্ত: খলিফা সবসময় সেনাবাহিনীকে পর্যবেক্ষণে রাখবেন, তাদের সম্পর্কে বেখবর থাকবেন না। তাদের খবরাখবর যেন গোপন না থাকে, তাদের অবস্থা যেন তার কাছে অজানা না থাকে। কারণ, তারাই রাষ্ট্রের পাহারাদার, জনগণের প্রতিরক্ষাকারী। এখন খলিফার যদি তাদের মন্দ গুণ জানা না থাকে, ভালো গুণ গোপন থাকে; তাহলে মন্দ গুণগুলোই ধীরে ধীরে সবার মাঝে ছড়িয়ে পড়বে। কারণ, ভালোর চেয়ে মন্দের প্রভাবই বেশি। মোটকথা, তারা নিজেরাও খারাপ থাকবে, অন্যদেরকেও খারাপ বানাবে।
টিকাঃ
তাসহিলুন নাজর: ১৭১
৩১০ তাসহিলুন নাজর
৩১১ সুরা নিসা, আয়াত: ৫৮
📄 শাসকের জন্য সেনাবাহিনীকে উত্তম করে গড়ে তোলার তিনটি পদ্ধতি
এক. প্রথমত, তার মুহাব্বাত যেন তাদের অন্তরে বসে যায়। ফলে তারা হিতাকাঙ্ক্ষী হবে।
দুই. দ্বিতীয়ত, তাদের অন্তরে যেন তার প্রতি শ্রদ্ধাবোধ তৈরি হয়। ফলে তারা তার আনুগত্য করবে।
তিন. তারা যেন এই বিশ্বাস লালন করতে পারে যে—দেশের কল্যাণ তো নিজেদের কল্যাণ, দেশের অকল্যাণ তো নিজেদের অকল্যাণ।
টিকাঃ
তাসহিলুন নাজর: ১৭১
📄 জনগণের জন্য সেনাবাহিনীকে উত্তম করে গড়ে তোলার তিনটি পদ্ধতি
এক. প্রথমত, প্রত্যেকে চেষ্টা করবে, যাতে নিজের দ্বারা জনগণের ক্ষতি না হয়।
দুই. দ্বিতীয়ত, জনগণের কোনো ক্ষতি হলে সেটা প্রতিরোধ করা।
তিন. তৃতীয়ত, জনগণের উপকারে সহযোগী হওয়া।
অতএব, এভাবে যদি শাসক সেনাবাহিনীকে গড়ে তুলতে পারেন, আর তারাও এই আদর্শকে ধরে রাখতে পারে, তাহলে তারা হবে একজন শ্রেষ্ঠ খলিফার শ্রেষ্ঠ বাহিনী।
টিকাঃ
তাসহিলুন নাজর: ১৭১