📄 প্রধানমন্ত্রী নিযুক্তকরণ
শুধুমাত্র খলিফার মাধ্যমেই প্রধানমন্ত্রী নিযুক্ত করা হবে, সেখানে দুটো শর্ত উল্লেখ থাকবে。
* প্রথমত, ব্যাপক ক্ষমতা。
* দ্বিতীয়ত, নায়েব হওয়া。
কিন্তু যদি শুধু ব্যাপক ক্ষমতার কথা বলে, নায়েব হওয়ার কথা না বলে, তাহলে এর দ্বারা প্রধানমন্ত্রী হবে না। কারণ, তখন সেটা ‘ওয়ালায়তে আহদ’ (প্রতিশ্রুতি দান) হবে। আর যদি শুধু নায়েব হওয়ার কথা বলে, তাহলে এখানে অস্পষ্টতা চলে আসে যে-এটা কি ব্যাপক না সীমাবদ্ধ, তানফিজ না তাফবিজ। সুতরাং, কোনো একটি শর্ত উল্লেখ না করলে প্রধানমন্ত্রী নির্ধারিত হবে না। আর যদি দুটোই উল্লেখ করে, তবেই প্রধানমন্ত্রী নির্ধারিত হবে।
টিকাঃ
*** আল আহকামস সলতানিয়া
📄 উজিরে তাফবিজের সংখ্যা
ইমাম মাওয়ারদি বলেন—খলিফার জন্য একই সাথে একাধিক উজিরে তাফবিজ রাখা বৈধ নয়। কারণ, এই উজিরের ক্ষমতা ব্যাপক। এ-জন্যই একই সাথে একাধিক শাসক বৈধ নয়। আল্লাহ তাআলা বলেন—
لَوْ كَانَ فِيهِمَا آلِهَةٌ إِلَّا اللَّهُ لَفَسَدَتَا، فَسُبْحَانَ اللَّهِ رَبِّ الْعَرْشِ عَمَّا يَصِفُونَ (۲۲)
'যদি আসমান-জমিনে একাধিক ইলাহ থাকত আল্লাহ ছাড়া তাহলে আসমান-জমিন ধ্বংস হয়ে যেত।' ৩০৪
কিন্তু তিনি যদি একাধিক উজির নির্ধারণ করেনই, তাহলে তিনটি অবস্থার যেকোনো একটি হবে—
এক. একাধিক ব্যক্তিকেই ব্যাপক ক্ষমতা দান করবেন। তবে, এটা কার্যকর হবে না। এর কারণ এবং দলিল পূর্বেই পেশ করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে করণীয় হলো—তাদের নির্ধারণ করার অবস্থাটি দেখতে হবে। যদি তাদের একই সময়ে নির্ধারণ করা হয়, তাহলে এই নির্ধারণ পরিত্যাজ্য হবে। আর যদি আগে-পরে হয়, তাহলে যাকে আগে নির্ধারণ করা হয়েছে, সেই নির্ধারিত হবে; আর যাকে পরে নির্ধারণ করা হয়েছে, তার নির্ধারণ প্রত্যাখাত হবে।
নির্ধারণ করা প্রত্যাখ্যাত হওয়া এবং বরখাস্ত করা, এ দুয়ের মাঝে পার্থক্য হলো—যদি নির্ধারণ করা প্রত্যাখ্যাত হয়, তাহলে পূর্বে এ মন্ত্রী যে সকল বিষয় কার্যকর করেছেন, সেগুলো প্রত্যাখ্যাত হবে। আর যদি বরখাস্ত করা হয়, তাহলে এই মন্ত্রী পূর্বে যা যা করেছে, সেগুলো প্রত্যাখ্যাত হবে না।
দুই. তাদের তিনি একই সাথে নির্ধারণ করবেন, তবে কাজের ক্ষেত্রে শরিক রাখবেন। কাউকে একক ক্ষমতা দান করবেন না।
অতএব, এটা বৈধ। আর মন্ত্রণালয়টি তাদের মাঝে শরিকানা থাকবে, নির্দিষ্ট কারও দায়িত্বে থাকবে না। তারা উভয়ে মিলে যে কাজ কার্যকর করবেন, সেটাই কার্যকর হবে। কিন্তু যে বিষয়ে তারা মতবিরোধ করবেন, সেটা কার্যকর হবে না। বরং সেটা খলিফার সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল হবে। তাদের সিদ্ধান্ত এক্ষেত্রে কার্যকর হবে না। তবে এই প্রকারের মন্ত্রণালয় তাফবিজ মন্ত্রণালয় থেকে দুই দিক থেকে নিম্নমানের হবে—
:: প্রথমত, তারা যে বিষয়টি কার্যকর করবেন, সেটার ওপর একমত হতে হবে।
:: দ্বিতীয়ত, তারা যে বিষয়ে মতবিরোধ করবেন, সেক্ষেত্রে তাদের সিদ্ধান্ত অকার্যকর হয়ে যাবে।
এখন তারা যদি বিরোধিতা করার পর একমত হয়ে যান, তাহলে এক্ষেত্রে বিশ্লেষণ রয়েছে। যদি তারা উভয়ে সঠিক বিষয়ের ওপর একমত হন সে বিষয়ে মতবিরোধিতা করার পর, তাহলে এক্ষেত্রে তাদের সিদ্ধান্ত কার্যকর হবে। কারণ, পূর্বে যে মতবিরোধ সৃষ্টি হয়েছে, সেটা একমত হওয়া থেকে বাধা দেয় না।
আর যদি একজন অপরজনের কথা শুধু মেনে নেন, বাকি নিজের মতের ওপর অটল থাকেন, তাহলে এক্ষেত্রে তাদের সিদ্ধান্ত কার্যকর হবে না। কারণ, একজন মন্ত্রী থেকে ওই সিদ্ধান্ত কার্যকর হয় না, যেটাকে তিনি সঠিক মনে করেন না।
তিন. তাদেরকে কোনো বিষয়ে শরিক রাখবেন না। প্রত্যেককে আলাদা আলাদা দায়িত্ব দেবেন।
এটা দুই ভাবে হতে পারে—হয় এমন কাজের ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ করবেন যেক্ষেত্রে তার ক্ষমতা ব্যাপক হবে, কাজটি সীমাবদ্ধ থাকতে হবে। যেমন—কাউকে পূর্বাঞ্চলীয় দেশের দায়িত্ব দিলেন, আর কাউকে পশ্চিমাঞ্চলীয় দেশের দায়িত্ব। অথবা প্রত্যেককে এমন দায়িত্ব দেবেন যেক্ষেত্রে কাজটি ব্যাপক হবে, কিন্তু ক্ষমতা সীমাবদ্ধ থাকবে। যেমন—কাউকে যুদ্ধের বিষয়ে দায়িত্ব দিলেন, আর কাউকে খারাজের বিষয়ে দায়িত্ব।
এ দুটো দিকই বৈধ, তবে তখন তারা আর উজিরে তাফবিজ থাকবেন না। বরং ভিন্ন ভিন্ন দুটো বিষয়ের দায়িত্বশীল থাকবেন। কারণ, 'তাফবিজের মন্ত্রণালয়' তখনই বলা হয়, যখন ক্ষমতা ব্যাপক থাকে এবং যেখানে উজিরের আদেশ প্রত্যেকটি ক্ষেত্রে কার্যকর হয়, তার প্রত্যেকটি সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হয়।
এই দুই ক্ষেত্রে তাদের প্রত্যেকের নির্ধারণ করা, যে বিষয়ে তাকে নির্ধারণ করা হয়েছে সেক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ থাকবে, কারও অন্য কাউকে বিরোধিতা করার অধিকার নেই।
টিকাঃ
সূরা আম্বিয়া, আয়াত: ২২
📄 তানফিজ করার মন্ত্রণালয়ের শর্ত
এ মন্ত্রণালয়ের ক্ষেত্রে সাতটি শর্তারোপ করা হয়, যা আদব-শিষ্টাচার ও অভিজ্ঞতার সাথে সম্পৃক্ত। শর্তগুলো হলো—
১। আমানতদারিতা, যাতে যে বিষয়ে তাকে বিশ্বাস করা হয়েছে, সেক্ষেত্রে খিয়ানত না করে এবং ধোঁকা না দেয়।
২। সত্যবাদী হওয়া, যাতে তার কথা দ্বারা বিশ্বাস করা যায় এবং তার নিষেধ দ্বারা কাজ করা যায়।
৩। লোভ কম থাকা, যাতে নিজ দায়িত্বের বিষয়ে ঘুষ না খায়, ধোঁকাগ্রস্ত না হয়। অন্যথায় দায়িত্বের মাঝে শিথিলতা চলে আসবে।
৪। তার মাঝে এবং জনগণের মাঝে যেন কোনো প্রকার শত্রুতা বা বিদ্বেষ না থাকে। কেননা, শত্রুতা মানুষকে ইনসাফ থেকে বাধা দেয়, কোমলতা থেকে বিরত রাখে।
৫। তিনি খলিফার কাছে যে সকল বিষয় পেশ করবেন, কিংবা খলিফার পক্ষ থেকে মানুষের কাছে পেশ করবেন, সে বিষয়ে অধিক স্মৃতিশক্তির অধিকারী হওয়া। কারণ, তিনি এক্ষেত্রে তার সাক্ষী।
৬। বুদ্ধি ও বিচক্ষণতা, যাতে তার কাছে কোনো বিষয় অস্পষ্ট না হয়ে যায়। ফলে কোনো আকস্মিক ঘটনায় পরিস্থিতি ঘোলাটে হয়ে যাবে। একটি আরেকটির সাথে মিলে যাবে। কেননা, বিভ্রাটের সাথে কোনো প্রতিজ্ঞাবদ্ধ বিষয় ঠিক রাখা যায় না, ঘোলাটে হয়ে থাকা কোনো বিষয়ের সাথে কোনো কিছু দৃঢ় ও শক্তিশালী করা যায় না।
৭। প্রবৃত্তি বা খাহেশাত না থাকা। কারণ, এই প্রবৃত্তিই তাকে সত্য থেকে মিথ্যার দিকে নিয়ে যায়। এই খাহেশাতের কারণেই মিথ্যা থেকে সত্য অস্পষ্ট হয়ে যায়। এই প্রবৃত্তিই বড়ো বড়ো জ্ঞানীকেও ধোঁকা দেয়, তাকে সঠিক পথ থেকে বিচ্যুত করে। এজন্য নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন—
حُبُّكَ الشَّيْءَ يُعْمِي وَيُصِمُّ 'কোনো জিনিসের প্রতি ভালোবাসা মানুষকে অন্ধ করে দেয়, বধির করে তোলে।'
আল্লামা জুহাইলি বলেন—এই মন্ত্রণালয়ের ক্ষেত্রে অথবা তাফবিজ মন্ত্রণালয়ের ক্ষেত্রে অথবা খিলাফতের ক্ষেত্রে কোনো নারীকে গ্রহণ করা হবে না। কারণ, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন— ‘ওই জাতি কখনো সফল হতে পারবে না, যারা নিজেদের যাবতীয় বিষয় একজন নারীর কাছে সোপর্দ করেছে।’
এছাড়া এই সকল দায়-দায়িত্বের ক্ষেত্রে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ কাজ রয়েছে, যার জন্য প্রয়োজন সুদৃঢ় সিদ্ধান্ত, ইস্পাত দৃঢ় মনোবল, যা একজন নারীর মাঝে অনুপস্থিত।
দুই. মন্ত্রণালয়ের মাঝে পার্থক্য। এই পার্থক্য চারদিক থেকে পরিলক্ষিত হয়—
১। তাফবিজের মন্ত্রী নিজে নিজেই হুকুম প্রয়োগ করতে পারেন, অন্যায়-অবিচার প্রতিরোধ করতে পারেন। কিন্তু তানফিজের উজির সেটা করতে পারেন না।
২। তাফবিজের মন্ত্রী প্রশাসকদের নিযুক্ত করতে পারেন, তানফিজের উজির সেটা করতে পারেন না।
৩। তাফবিজের মন্ত্রী সেনাবাহিনীকে একক সিদ্ধান্তে যুদ্ধে নিয়ে যেতে পারেন, যুদ্ধ পরিচালনা করতে পারেন, যা তানফিজের উজির করতে পারেন না।
৪। তাফবিজের মন্ত্রী বাইতুল মালের সম্পদের ক্ষেত্রে হস্তক্ষেপ করতে পারেন, অর্থাৎ গ্রহণ করতে পারেন এবং যেখানে যা প্রয়োজন সেগুলো করতে পারেন, যা তানফিজের উজির করতে পারেন না।
এই চারটি পার্থক্য থাকার কারণে শর্তগুলোর ভেতরে আরও চারটি পার্থক্য দেখা গিয়েছে—
১। ‘তাফবিজ করার মন্ত্রণালয়’-এর ক্ষেত্রে স্বাধীন হওয়া ধর্তব্য, ‘তানফিজ করার মন্ত্রণালয়’-এর ক্ষেত্রে ধর্তব্য নয়।
২। তাফবিজ করার মন্ত্রণালয়ের ক্ষেত্রে ইসলাম ধর্তব্য, তানফিজ করার মন্ত্রণালয়ের ক্ষেত্রে ধর্তব্য নয়।
৩। তাফবিজ করার মন্ত্রণালয়ের ক্ষেত্রে শরিয়তের হুকুম-আহকাম সম্পর্কে জ্ঞান থাকা শর্ত, তানফিজ করার মন্ত্রণালয়ের ক্ষেত্রে শর্ত নয়।
৪। তাফবিজ করার মন্ত্রণালয়ের ক্ষেত্রে যুদ্ধ ও খারাজ সম্পর্কে জ্ঞান থাকা শর্ত, তানফিজ করার মন্ত্রণালয়ের ক্ষেত্রে শর্ত নয়।
অতএব, এখানে চারদিক থেকে শর্তগুলোতে পার্থক্য দেখা গিয়েছে যেমন অধিকারের ক্ষেত্রে চারদিক থেকে পার্থক্য দেখা গেছে।
এছাড়া অন্য যে সকল অধিকার বা শর্ত রয়েছে সেক্ষেত্রে দুই মন্ত্রণালয়ই সমান।
📄 যাদের ক্ষমতা ব্যাপক, কিন্তু কাজের পরিধি সীমাবদ্ধ
রাষ্ট্রের সীমানা যখন অনেক বৃদ্ধি পায়, তখন রাষ্ট্রকে বিভিন্ন বড়ো বড়ো ভাগে ভাগ করা হয়, বিভিন্ন অঞ্চল হিসেবে পার্থক্য করা হয়। আর প্রত্যেক অঞ্চলের शासককে আমির বলা হয়, যার ক্ষমতা ব্যাপক কিন্তু কাজের পরিধি সীমাবদ্ধ। অর্থাৎ, ওই দেশের সকল জিনিসের সাথেই তার কর্তৃত্ব সম্পৃক্ত; নিরাপত্তাব্যবস্থা হোক, প্রতিরক্ষাব্যবস্থা হোক বা বিচার ব্যবস্থা হোক, কিংবা অর্থনৈতিক-ব্যবস্থা হোক-সকল ক্ষেত্রেই। কিন্তু তার কর্তৃত্বের পরিধি শুধু ওই দেশের ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ। যেমন-উমার রা. এর যুগে ইসলামি রাষ্ট্রের পরিধি অনেক বৃদ্ধি পায়, তখন ইসলামি রাষ্ট্রকে বিভিন্ন ভাগে ভাগ করা হয়। অর্থাৎ, শামের দেশগুলোকে দুই ভাগে ভাগ করা হয়, পারস্যের দেশগুলোকে তিন ভাগে ভাগ করা হয়, আফ্রিকার দেশগুলোকে তিন ভাগে ভাগ করা হয়। আর এই প্রত্যেকটি অঞ্চলে একজন প্রশাসক থাকেন, যিনি নামাজ পড়াতেন, বিচার করতেন, যুদ্ধে সেনাবাহিনীর নেতৃত্ব দিতেন, বাইতুল মালের ব্যবস্থা গ্রহণ করতেন।
ইসলামি রাষ্ট্রের পরিধি আরও অনেক বৃদ্ধি পায়। যার ফলে পাঁচটি বড়ো বড়ো ভাগে ভাগ করা হয়। অর্থাৎ, হিজাজ, ইয়ামান ও তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চল, মিসর (অর্থাৎ নিম্নভূমি এবং উচ্চভূমি), দুই ইরাক অর্থাৎ আরব (বাইবেল ও প্রাচীন আশুর শহর), আজম (পারসিক দেশ), জাজিরাতুল আরব, সাথে ছিল আরমানিয়া, আজারবাইজান, উত্তর আফ্রিকা, আন্দালুস এবং কিছু দ্বীপ।
যুগ যুগ ধরে আরবরা তাদের বিজয়ী দেশগুলোতেও এই ধারা অব্যাহত রেখেছে, তবে প্রয়োজনের কারণে সামান্য পরিবর্তন করা হয়েছে।
অবশ্য ইসলামি রাষ্ট্র ও তার পরিধি বৃদ্ধি পাওয়ার সাথে সাথে রাষ্ট্র পরিচালনা খণ্ডিত হয়ে যায়, দিওয়ানের (রাষ্ট্রীয় ফাইল) সংখ্যা অনেক হয়ে যায়, বিশেষ করে আব্বাসিদের যুগে-যারা বিচার ব্যবস্থা ও রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে পারসিকদের দ্বারা খুব প্রভাবিত হয়।৩০৫
কোনো অঞ্চলের আমিরের নেতৃত্বকে নির্দিষ্ট কোনো বিভাগে সীমাবদ্ধ করা যেতে পারে। যেমন: সেনাবাহিনী পরিচালনা। আল্লামা জুহাইলি বলেন-ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায়, ইসলামের সূচনাতে রাষ্ট্র ব্যবস্থাপনা অনেক ব্যাপক ছিল। তারপর রাষ্ট্রের পরিধি বিস্তৃত এবং রাষ্ট্র ব্যবস্থাপনা সীমাবদ্ধ থাকার কারণে ধীরে ধীরে খন্ডিত এবং সীমাবদ্ধ হতে থাকে। যেমন-আমর ইবনুল আস প্রথমে মিসরের ব্যাপক ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন। তারপর উমার রা. আরেকজনকে খারাজ উসুল করার জন্য নির্ধারণ করেন, যিনি ছিলেন আব্দুল্লাহ ইবনু সারাহ। তারপর বিচারব্যবস্থার ক্ষেত্রে কাজি হিসেবে নির্ধারণ করা হয় কাব ইবনু সুরকে। এভাবে সেনাবাহিনী পরিচালনা এবং নামাজ পড়ানোর ক্ষেত্রে অঞ্চলের শাসকের কর্তৃত্ব সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে।
আল্লামা মাওয়ারদি অঞ্চলের প্রশাসকের নেতৃত্বকে দুই ভাগে ভাগ করেছেন—
• ০১. ব্যাপক, এবং
• ০২. সীমাবদ্ধ।
আবার, ব্যাপককে দুই ভাগে ভাগ করেছেন—
• ০১. ইমারতে ইসতিকফা,
• ০২. ইমারতে ইসতিলা।
তিনি বলেন—খলিফা যখন কাউকে কোনো ভূখণ্ডের বা কোনো অঞ্চলের শাসক নির্ধারণ করবেন, তখন তার নেতৃত্ব দুইভাবে হতে পারে—
• ০১. ব্যাপক, এবং
• ০২. সীমাবদ্ধ।
আর ব্যাপক দুইভাবে হতে পারে—
• ০১. ইমারতে ইসতিকফা, যা স্বেচ্ছায় এবং
• ০২. ইমারতে ইসতিলা, যা অনিচ্ছায় অর্জিত হয়।
০১. ইমারতে ইসতিকফা: আল্লামা জুহাইলি বলেন—ইমারতে ইসতিকফা হলো এমন নেতৃত্ব, যা শাসক কোনো যোগ্য ব্যক্তিকে স্বেচ্ছায় এবং সন্তুষ্টির সাথে দিয়ে থাকেন। যেমন: খলিফা কাউকে কোনো দেশের বা অঞ্চলের অধিবাসীদের শাসক বানাবেন, খলিফার যাবতীয় কাজ তাকে দেবেন। ফলে তার ক্ষমতা সীমাবদ্ধ হলেও (যেহেতু তার ক্ষমতা শুধু ওই দেশের জনগণের ওপর) তিনি ব্যাপক ক্ষমতার অধিকারী (কারণ, তার ক্ষমতা ওই দেশের যাবতীয় সমস্ত বিষয়াদির ওপর)।
মোটকথা, খলিফার ওপর সে অঞ্চলের যে সকল দায়দায়িত্ব ছিল সেগুলো তার ওপর ন্যস্ত করবেন। প্রশাসক নির্ধারণের এই ধারাটি মিসর, ইয়ামান, শাম, ইরাক-এ সকল দেশের অঞ্চলের প্রশাসক নির্ধারণের মাধ্যমে খুলাফায়ে রাশিদিনের যুগ থেকে উমাইয়া খিলাফত পর্যন্ত এবং আব্বাসিদের স্বর্ণযুগ পর্যন্ত অব্যাহত ছিল।
তারপর হিজরি তৃতীয় শতাব্দীর মধ্যভাগ থেকে শুরু হয়ে যায় ইমারতে ইসতিলা (আধিপত্য বিস্তার করে নেতৃত্ব গ্রহণ)। তখন পশ্চিম ও পূর্বাঞ্চলীয় দেশগুলোতে ছোটো ছোটো রাজ্য প্রকাশ পেতে শুরু করে। যেমন—পূর্বাঞ্চলীয় দেশগুলোতে বুওইহিয়্যা, সামানিয়্যা, গজনি বংশ, সেলজুক সাম্রাজ্য। পশ্চিমাঞ্চলীয় দেশগুলোতে তুলুনিয়া, ইখশিদিয়্যা এবং আগলাবিয়্যা বংশ। এই প্রশাসকদের দায়িত্বে যে সকল কাজ ছিল, সেগুলো ছিল সাতটি-
১। বাহিনীদের পরিচালনা করা। তাদের দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সুবিন্যস্ত করে রাখা। তাদের ভাতা নির্ধারণ করে দেওয়া। কিন্তু যদি খলিফা নিজে নির্ধারণ করে দেন, তাহলে সেভাবেই দেওয়া হবে।
২। হুকুম-আহকাম পর্যালোচনা করা। কাজি ও বিচারকদের নিয়োগ দেওয়া।
৩। খারাজ উসুল করা, সাদাকা গ্রহণ করা এবং সেজন্য কর্মী নিয়োগ দেওয়া। সকল সম্পদ হকদারদের কাছে পৌঁছে দেওয়া।
৪। দ্বীন রক্ষা করা, নিষিদ্ধ বিষয় থেকে হিফাজতে রাখা, দ্বীনকে পরিবর্তন কিংবা বিকৃতি থেকে রক্ষা করা।
৫। আল্লাহ তাআলার হক এবং বান্দাদের হকের ক্ষেত্রে হদ কায়েম করা।
৬। নিজে কিংবা নায়েবের মাধ্যমে জুমুআর নামাজ এবং অন্যান্য নামাজ পড়ানোর ব্যবস্থা করা।
৭। ফরজ হজ আদায়ের সহজ ব্যবস্থা করা।
শত্রুর পার্শ্ববর্তী দেশের প্রশাসকের ওপর অষ্টম আরেকটি কর্তব্য রয়েছে। আর তা হলো-শত্রুদের বিরুদ্ধে জিহাদ করা, শরিয়তের আহকাম অনুযায়ী গনিমত বণ্টন করা।
এই প্রকারের নেতৃত্বের জন্য ওই শর্তগুলোই ধর্তব্য, যেগুলো তাফবিজের মন্ত্রণালয়ে আলোচিত হয়েছে। কারণ, এ দুয়ের মাঝে খুবই সামান্য পার্থক্য বিদ্যমান। অর্থাৎ, অঞ্চলের পার্থক্য। উজিরে তাফবিজ এর ক্ষমতা রাষ্ট্রের প্রত্যেকটি স্থানেই। কিন্তু অঞ্চলভিত্তিক প্রশাসকের ক্ষমতা' শুধু তার অঞ্চলেই। এজন্যই উজিরে তাফবিজ প্রশাসকদের কাজকর্ম পর্যবেক্ষণ করতে পারেন। বরং তিনি চাইলে ওই প্রশাসকদের বরখাস্তও করতে পারবেন, যদি তিনিই তাদের নির্ধারণ করে থাকেন। আর যদি খলিফা তাদের নির্ধারণ করেন কিংবা খলিফার নির্দেশে তাদের নির্ধারণ করা হয়, তাহলে বরখাস্ত করার বিষয়ে খলিফার একমত হওয়া জরুরি।
অঞ্চলভিত্তিক প্রশাসক যদি চান তাহলে নিজের জন্য একজন 'উজিরে তানফিজ' বাস্তবায়নকারী মন্ত্রী রাখতে পারেন, খলিফার অনুমোদিত হোক বা না হোক, তবে তিনি খলিফার অনুমতি ছাড়া 'উজিরে তাফবিজ' রাখতে পারবেন না। কারণ, 'উজিরে তানফিজ' সাহায্যকারী আর উজিরে তাফবিজ' একক ক্ষমতার অধিকারী।
টিকাঃ
৩০৫ ইসলাম ওয়া আদিল্লাতই ৮/