📘 ইসলামি রাষ্ট্র ব্যবস্থা > 📄 ‘আহলুল হিল্লি ওয়ালা আকদ’ এর দায়িত্ব

📄 ‘আহলুল হিল্লি ওয়ালা আকদ’ এর দায়িত্ব


‘আহালুল হিল্লি ওয়ালা আকদ’ এর দায়িত্ব দুইটি—
এক. খলিফা নির্বাচন এবং তার হাতে বাইআত গ্রহণ। কারণ, তাদের প্রথম দায়িত্বই হলো খলিফা নির্বাচন করা এবং তার হাতে বাইআত গ্রহণ করা।
দুই. নেতৃত্বের জন্য অধিক যোগ্য এবং অগ্রাধিকারপ্রাপ্তকে নির্ধারণ করা। কারণ এটাও তাদের একটি দায়িত্ব যে, তারা এমন কাউকে নির্ধারণ করবে—যিনি জনগণের পরিচালনায় অধিক যোগ্য, সবক্ষেত্রেই তাদের জন্য কল্যাণ বয়ে নিয়ে আসবে।
এখন যদি দুজনকেই যোগ্য পায়, তবে একজন বেশি জ্ঞানী এবং অপরজন অধিক বীর সাহসী; তাহলে নির্বাচনের ক্ষেত্রে সময়ের দাবি কী বলে, সেটাই রক্ষা করবে। যদি সাহসের বেশি প্রয়োজন থাকে, তাহলে সাহসী ব্যক্তিকেই অগ্রাধিকার দেবে। আর যদি জ্ঞানের বেশি প্রয়োজন থাকে, তাহলে জ্ঞানী ব্যক্তিই প্রাধান্য পাবে।
সব ক্ষেত্রেই যদি সমান হয়, তাহলে সবচেয়ে প্রবীণ ব্যক্তিকে অগ্রাধিকার দেবে। তবে যে বেশি বয়স্ক নয়, তার হাতে বাইআত করলেও জায়িজ হবে। এখন যদি প্রার্থিত সব বিষয়েই সমান সমান হয়, আর দুজনেই নেতৃত্ব নিয়ে বিবাদে লিপ্ত হয়; তাহলে কীভাবে তাদের বিবাদ নিরসন করা হবে, এক্ষেত্রে ফুকাহায়ে কিরামের মাঝে ইখতিলাফ আছে।
একদল বলেন—লটারি করা হবে। লটারিতে যার নাম উঠবে, সে-ই অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত।
অপরদল বলেন—বরং ‘আহলুল হিল্লি ওয়াল আকদ’ যাকে ইচ্ছা করেন, তার হাতে বাইআত গ্রহণ করবে। লটারির প্রয়োজন নেই।
তাই, যদি পুরো জামাআতের মধ্যে সর্বসম্মতিক্রমে একজন ব্যক্তি শ্রেষ্ঠ হিসেবে নির্ধারিত হন, তাহলে সবাই তার হাতে বাইআত গ্রহণ করবে। তারপর যদি পরবর্তী সময়ে তার চেয়ে যোগ্য ব্যক্তির বিকাশ ঘটে, তাহলে প্রথম ব্যক্তির নেতৃত্ব গ্রহণযোগ্য হবে। তার চেয়ে শ্রেষ্ঠ ব্যক্তির নিকট ক্ষমতা হস্তান্তর করা যাবে না। আর যদি অধিক শ্রেষ্ঠ ব্যক্তি থাকা সত্ত্বেও শুধু শ্রেষ্ঠ ব্যক্তির হাতে বাইআত গ্রহণ করা হয়, যদি সেটা গ্রহণযোগ্য ওজরের কারণে হয়—যেমন: অধিক শ্রেষ্ঠতম ব্যক্তি অসুস্থ বা অনুপস্থিত ছিল; অথবা শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিকে সবাই শ্রেষ্ঠতম ব্যক্তির চেয়ে বেশি আনুগত্য করে, তার প্রতি জনগণের ভালোবাসা থাকে—তাহলে শ্রেষ্ঠ ব্যক্তির নেতৃত্ব গ্রহণযোগ্য হবে। আর যদি ওজরের কারণে না হয়, তাহলে তার বাইআত ও নেতৃত্ব সহিহ হবে কি না—এ বিষয়ে ইখতিলাফ আছে।
কেউ কেউ বলেন—(তাদের একজন ইমাম জাহিজ রহ.), তার বাইআত গ্রহণযোগ্য হবে না। কারণ, নির্বাচনের ক্ষেত্রে অধিক যোগ্য ব্যক্তিই অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত। সুতরাং, তার চেয়ে নিচের যোগ্য ব্যক্তির হাতে বাইআত গ্রহণ করা যাবে না। যেমন—আহকামে শারইয়্যাহর ক্ষেত্রে ইজতিহাদের যোগ্যতা যার মাঝে বেশি পরিমাণে আছে, নেতৃত্বের ক্ষেত্রে সে-ই অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত।
তবে অধিকাংশ ফুকাহায়ে কিরাম ও মুতাকাল্লিমিন বলেন—তার বাইআতও সহিহ হবে, নেতৃত্বও গ্রহণযোগ্য হবে। অধিক শ্রেষ্ঠ ব্যক্তি থাকা শুধু শ্রেষ্ঠ ব্যক্তির নেতৃত্বের জন্য বাধার কারণ হবে না, যদি-না নেতৃত্বের শর্তাবলির ক্ষেত্রে ত্রুটি থাকে। যেমন—কাজা ও বিচার-ব্যবস্থার ক্ষেত্রে অধিক যোগ্য ব্যক্তি থাকলেও শুধু যোগ্য ব্যক্তিকে নির্ধারণ করা যায়। কারণ ‘অধিক’এর কথা বলা হয়েছে মূলত অতিশয়তা বোঝানোর জন্য, এটা নেতৃত্বের হকদার হওয়ার জন্য তেমন কোনো উল্লেখযোগ্য শর্ত নয়।

📘 ইসলামি রাষ্ট্র ব্যবস্থা > 📄 ‘আহলুল হিল্লি ওয়াল আকদ’-এর সংখ্যা

📄 ‘আহলুল হিল্লি ওয়াল আকদ’-এর সংখ্যা


‘আহলুল হিল্লি ওয়াল আকদ’-এর সদস্য সংখ্যা কী পরিমাণ হলে নেতৃত্ব সংঘটিত হবে—এ ব্যাপারে উলামায়ে কিরামের মাঝে মতবিরোধ রয়েছে। এর বিস্তারিত বিবরণ হলো:
এক. একদল উলামায়ে কিরাম নির্বাচিত খলিফার ব্যাপারে আহলুল হিল্লি ওয়াল আক্‌দের সকল সদস্যের ঐকমত্য শর্ত করেছেন। নির্দিষ্ট কোনো সংখ্যা নেই। এই মত অনেকটা মুতাজিলা সম্প্রদায়ের ইমাম আসামের কথার মতো। তিনি বলেন-ইজমা ছাড়া নেতৃত্ব কায়েম হবে না।১৮২
এমনটাই ইমাম আহমাদ রহ.-এর এক বর্ণনাতে পাওয়া যায়। ইব্‌ন হানি বলেন-আমি আবু আব্দুল্লাহকে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এই হাদিসের অর্থ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলাম-
من مات وليس له إمام مات ميتة جاهلية
যে ব্যক্তি এ অবস্থায় মৃত্যুবরণ করবে যে, তার কোনো ইমাম নেই, সে জাহিলিয়াতের মৃত্যু বরণ করে নিল।
তিনি বললেন-তুমি কি জানো, এখানে 'ইমাম' দ্বারা কী উদ্দেশ্য? ইমাম বা খলিফা তাকেই বলে, যার ব্যাপারে সমস্ত মুসলিম ঐকমত্য হয়ে বলে-ইনিই ইমাম। এটাই হাদিসের অর্থ।১৮৩
দুই. আরেকদল উলামায়ে কিরাম আহলুল হিল্লি ওয়াল আক্‌দের সংখ্যা নির্ধারণ করেছেন। তাদের কেউ কেউ বলেন-সর্বনিম্ন সংখ্যা ৪০জন। কারণ, মর্যাদার দিক থেকে ইমামতে কুবরা জুমুআর নামাজের ঊর্ধ্বে। আর ৪০-এর কমে জুমুআর নামাজ সংঘটিত হয় না।
কেউ কেউ বলেন-পাঁচজন।
কেউ বলেন-চারজন।
আবার কেউ বলেন-দুজন দ্বারাও তৃতীয় ব্যক্তির ইমামত সংঘটিত হয়ে যাবে। তবে শর্ত হচ্ছে-কয়েকজন সাক্ষীর সামনে হতে হবে; যাতে পরবর্তী সময়ে অস্বীকার করলে প্রমাণ পেশ করা যায়। কেউ কেউ এই মতকে ইমাম আবুল হাসান আশআরি রহ.-এর সাথে নিসবত করেছেন, যেমন রদ্দুল মুহতারে আছে।
শাফিয়ি মাজহাবের অধিকাংশ উলামায়ে কিরামের মতে, বাইআতের সময় উলামায়ে কিরাম, নেতৃবৃন্দ, অভিজাত শ্রেণির যারা যারা সাক্ষ্য দেওয়ার যোগ্য এবং সহজে উপস্থিত হতে পারবে, তাদের দ্বারাই নেতৃত্ব কায়েম হবে, এমনকি যদি একজনও থাকে তবুও যথেষ্ট।
ইমাম কলকাশান্দি বলেন-আমাদের শাফিয়ি মাজহাবের উলামায়ে কিরামের নিকট এটাই বিশুদ্ধ মত।
ইমাম দামিজি রহ. বলেন—ইমাম আবুল হাসান আশআরি রহ.-এর মত এবং শাফিয়ি উলামায়ে কিরামের মাঝে কিছুটা পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়। পার্থক্যটি হলো, শাফিয়ি উলামায়ে কিরামের নিকট আহলুল হিল্লি ওয়াল আকদের একজন সদস্য দ্বারাই ইমামত সহিহ হবে এই শর্তে যে—সেখানে সদস্য হিসেবে গণ্য করা যায়, এমন কেউ উপস্থিত না থাকা। আর ইমাম আশআরি রহ.-এর মতে, একজন সদস্য দ্বারাই ইমামত সহিহ হয়ে যাবে, অন্য কেউ থাকুক বা না থাকুক।২৮৪
তিন. আরেকদল বলেন—আহলুল হিল্লি ওয়াল আকদের অধিকাংশ সদস্য দ্বারাই ইমামত সহিহ হবে।
তারা সবার ঐকমত্যও শর্ত করেন না, নির্দিষ্ট কোনো সংখ্যাও বলেন না। আবু ইয়ালা রহ. বলেন—আহলুল হিল্লি ওয়াল আকদের অধিকাংশ সদস্য দ্বারাই ইমামত সহিহ হবে।
অনেক উলামায়ে কিরাম এই মতকেই প্রাধান্য দিয়েছেন। কারণ, কুরআন-হাদিস থেকেও এ ব্যাপারে কোনো দলিল নেই। আবার উলামায়ে কিরামের ইজমাও নেই যে, ঐকমত্য শর্ত না-কি নির্দিষ্ট সংখ্যা শর্ত। অগ্রাধিকার পাওয়ার কারণ হলো, উম্মতে মুসলিমা আহলুল হিল্লি ওয়াল আকদের সদস্যদের ওপর নির্ভর করে। তারাই জাতির চাওয়া-পাওয়ার ক্ষেত্রে প্রতিনিধিত্ব করেন। তাদের মাঝে নেতৃত্বের গুণাবলিও পূর্ণাঙ্গভাবে পাওয়া যায়। এটা আহলুল হিল্লি ওয়াল আকদের সকল সদস্যদের (প্রত্যেকের মধ্যে সমষ্টিগতভাবে) মাঝে যেমন পাওয়া যায়, আবার তাদের 'অধিকাংশের' মাঝেও পাওয়া যায়। কিন্তু সমস্যা হলো, বাইআতের সময় সবার (প্রত্যেকের) উপস্থিতি অসম্ভব না হলেও কিছুটা কঠিন। তাই, অধিকাংশ উপস্থিত থাকলেই যথেষ্ট। মোটকথা, বাইআতের ক্ষেত্রে নির্বাচিত খলিফার পক্ষে এই পরিমাণ অনুসারী, সাহায্যকারী ও সমর্থনকারী থাকা প্রয়োজন যাদের দ্বারা খলিফার আসন পাকাপোক্ত হতে পারে, তার পাশে শক্তিশালী দল থাকতে পারে, যারা তাকে রক্ষা করবে; যাতে পরবর্তী সময়ে খলিফার বিরুদ্ধে ঝড় বয়ে গেলেও খলিফার অনুসারীদের মূলৎপাটন করা সম্ভব হবে না। অতএব, যখন তার বাইআত শক্তি দ্বারা সুদৃঢ় হবে, সদলবলে প্রতিষ্ঠিত হবে, মজবুত হবে, সাহায্য দ্বারা সমর্থিত হবে, শত্রুদের ওপর বিজয়ী হওয়ার শক্তি নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হবে; তখনই ইমামত সুসাব্যস্ত ও স্থির হবে, নেতৃত্ব দৃঢ় হবে এবং অবিচল থাকবে। ইমামত সহিহ হওয়ার জন্য ইজমা মূলত শর্ত নয়।
বিষয়টি স্পষ্ট করার জন্য আবু বকর রা. এর বাইআতের ঘটনা লক্ষ্য করা যেতে পারে। বাইআতের পর তিনি হুকুম করেছেন, বিচার করেছেন, ফায়সালা করেছেন, সুসংহত করেছেন, মুজাহিদ বাহিনী প্রস্তুত করেছেন, ইসলামের ঝান্ডা উঁচু করেছেন, জাকাত অস্বীকারকারীদের বিরুদ্ধে জিহাদ করেছেন, ট্যাক্স নিয়েছেন এবং সেগুলো বণ্টন করেছেন। কিন্তু এগুলো করার আগে, মদিনাবাসীর বাইআতের পর তিনি এই অপেক্ষা করেন নি যে, তার বাইআতের খবর ইসলামের দূরদূরান্ত জনপদেও পৌঁছে যাক। যারা মদিনায় ছিল তারা ছাড়া অন্য কারও থেকেও স্বীকারোক্তির অপেক্ষা তিনি করেন নি। একইভাবে অপর তিন খলিফার বাইআতের ক্ষেত্রেও এমনটি হয়েছিল। এতে কোনো জ্ঞানী ব্যক্তি সন্দেহ পোষণ করতে পারে না। তারপর আমাদের এই ক্ষুদ্র জ্ঞানকে যে বিষয়টি আরও শক্তিশালী করে, তা হলো-খলিফা নির্বাচনের মূল উদ্দেশ্য। অর্থাৎ, রাষ্ট্রের হিফাজত, ইসলামের মৌলিক বিষয়-সহ অন্যান্য যাবতীয় নাজুক বিষয়ে গুরুত্ব প্রদান। এখানে লক্ষ্য করলে বোঝা যায় যে, এই বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে সামান্য অবকাশেরও সুযোগ থাকে না। কারণ, বিলম্ব করা হলে এমন জটিল সমস্যা হতে পারে, যার সমাধান হবে না। এমন মারাত্মক ভুল হতে পারে, যার ক্ষতিপূরণ হবে না! এখান থেকেই বোঝা যায় যে, ইমামতের জন্য ইজমা শর্ত নয়। ২৮৫

টিকাঃ
১৮২ আল ফারকু বাইনাল ফারকি, ১৫০
১৮৩ আল জামি লিউলুমুল ইমাম আহমাদ,
** ইমামতে উযমা, ১৭৮

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00