📄 নারীদের রাজনৈতিক কাজে জড়ানো
বর্তমান রাজনীতিতে নারীদের অংশগ্রহণ করা বৈধ নয়। কারণ, নারীদের আলাদা কাজ রয়েছে; আল্লাহ তাআলা তাদের যে উদ্দেশ্য সৃষ্টি করেছেন। অর্থাৎ, সন্তান ধারণ করা, তাদের জন্ম দেওয়া ও লালন-পালন করা। এগুলো হচ্ছে নারীদের বিশেষ কাজ। পুরুষরা এক্ষেত্রে হস্তক্ষেপ করতে পারবে না। পুরুষদের কাজ বাহিরে। অর্থাৎ নিজের জন্য, স্ত্রী ও সন্তানদের জন্য, বৃদ্ধ ও দুর্বল মা-বাবার জন্য উপার্জন করা; তাদের কাজ হচ্ছে-চাষাবাদ করা, তৈরি করা, ব্যবসা করা, অথবা রাষ্ট্রীয় কাজ করা। এগুলোই পুরুষের দিন-রাতের কাজ। আর এটাই প্রকৃতির রীতি। আল্লাহ তাআলার বিধানও।
এক্ষেত্রে কাফির ও মূর্খরা কী বলল, সেদিকে তাকানোই যাবে না! আফসোসের বিষয়-মুসলিমবিশ্বের প্রায় সবাই এভাবেই চলছে। যদি-না আল্লাহ তাআলা কাউকে কুফর বা নাস্তিকতা থেকে রহম করেন। যেমন আফগানিস্তানের ইমারতে ইসলামিয়া-আল্লাহ যেন তাকে রক্ষা করেন।
এখন নতুন আরেকটা ফিতনা বের হয়েছে ঐশী বিধানের বিরুদ্ধে যাকে বলা হয়-শিক্ষা ও নারী অধিকার! আফসোসের বিষয় হচ্ছে, এখন মুসলিম দেশগুলোতেও এটা ছড়িয়ে পড়েছে। সুতরাং সকল মুসলিমের কর্তব্য, বিশেষ করে আলিমদের কর্তব্য হলো-কুরআন-সুন্নাহ ও ফিকহের আলোকে নারী-পুরুষের যৌথ অধিকার এবং বিশেষ অধিকার ব্যাখ্যা করা।
রাষ্ট্রের প্রত্যেকটা ব্যক্তি ও সমাজের কাছে এর বার্তা পৌঁছে দেওয়া। চাই তা মুখের মাধ্যমে হোক বা কলমের মাধ্যমে। হোক লেখার মাধ্যমে হোক কিংবা জিহাদের মাধ্যমে। কারণ, এটাই প্রত্যেক মুসলিমের ওপর কর্তব্য। কুরআন কারিমে ঘোষিত হয়েছে-
كُنتُمْ خَيْرَ أُمَّةٍ أُخْرِجَتْ لِلنَّاسِ تَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَتَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنكَرِ وَتُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ
তোমরা হলে উত্তম জাতি, যাদের সৃষ্টি করা হয়েছে মানুষের কল্যাণের জন্য। তোমরা সৎ কাজের আদেশ করবে, অসৎ কাজ হতে নিষেধ করবে। আর আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস রাখবে।২৭৫
এ যুগে রাজনীতিতে যে নারীদের অংশগ্রহণ করা নিষেধ, এর একটা দলিল হচ্ছে-সর্বাবস্থার জন্য এখন নারীদের মসজিদে যাওয়া নিষেধ। হাফিজ ঝাইলায়ি রহ. বলেন-আমাদের যুগে এখন এটাই গ্রহণযোগ্য মত। সর্বাবস্থার জন্য নারীদের মসজিদে যাওয়া নিষেধ। যুগ পরিবর্তনের কারণে এ দলিল আরও শক্তিশালী করে ওই হাদিস, যা আম্মাজান আয়িশা রা. থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন-
لو أدرك رسول الله صلى الله عليه وسلم ما أحدث النساء لمنعهن كما منعت نساء بني اسرائيل
নারীরা পরবর্তী সময়ে যা কিছু করেছে, এগুলো যদি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দেখতে পেতেন, তাহলে তাদেরকেও বাইরে যেতে নিষেধ করতেন। যেমন বনি ইসরাইলের নারীদের নিষেধ করা হয়েছিল। ২৭৬
তো, যখন নারীদের মসজিদে যাওয়াই নিষিদ্ধ, যা দুনিয়ার সর্বশ্রেষ্ঠ জায়গা, যেখানে নেককার লোকেরাই শুধু থাকে, তাহলে রাস্তায় বা বাজারে বের হওয়ার বিধান, গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে যোগদানের বিধান কী হতে পারে!
নারীরা যে রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করতে পারবে না, এর আর আরেকটি দলিল হচ্ছে-আল্লাহ তাআলা তাদেরকে ঘরে অবস্থান করার আদেশ করেছেন। সৌন্দর্য প্রকাশ করতে নিষেধ করেছেন। অর্থাৎ নারী পুরুষের সংমিশ্রণ থেকে নিষেধ করেছেন। চাই সেটা কোনো কাজের কারণে হোক, অথবা সফরের কারণে হোক, কিংবা অন্য যে কোনো কারণ হোক। কেননা, এই ময়দানে আসাটাই নারীকে খারাপ কাজে নিয়ে যাবে। যার ফলে আল্লাহ তাআলার আদেশ লঙ্ঘিত হবে, একজন মুসলিম নারীর কাছে আল্লাহ তাআলা যে সকল দাবি পূরণের আশা করেন, সেটাও বিফলে যাবে। কুরআন কারিম স্পষ্ট করে প্রমাণ করে, নারী পুরুষ সংমিশ্রণ ও তার আরও যত উপায় আছে সবই হারাম। আল্লাহ তাআলা বলেন-
قُل لِّلْمُؤْمِنِينَ يَغُضُّوا مِنْ أَبْصَارِهِمْ وَيَحْفَظُوا فُرُوجَهُمْ ذَلِكَ أَزْكَى لَهُمْ إِنَّ اللَّهَ خَبِيرٌ بِمَا يَصْنَعُونَ (۳۰) وَقُل لِّلْمُؤْمِنَاتِ يَغْضُضْنَ مِنْ أَبْصَارِهِنَّ وَيَحْفَظْنَ فُرُوجَهُنَّ وَلَا يُبْدِينَ زِينَتَهُنَّ إِلَّا مَا ظَهَرَ مِنْهَا وَلْيَضْرِبْنَ بِخُمُرِهِنَّ عَلَى جُيُوبِهِنَّ ٣١ ( النور )
আপনি মুমিন পুরুষদের বলে দেন, যেন তারা নিজেদের দৃষ্টি অবনত রাখে, লজ্জাস্থান হিফাজত করে রাখে। এটাই তাদের জন্য অধিক পবিত্রদায়ক। নিঃসন্দেহে আল্লাহ তাআলা তাদের কৃতকর্ম সম্পর্কে অধিক অবগত। আর মুমিন নারীদের বলে দেন, তারা যেন নিজেদের দৃষ্টি অবনত রাখে, লজ্জাস্থান হিফাজত করে রাখে। আর যেন নিজেদের সৌন্দর্য প্রকাশ না করে। সাথে, তারা যেন নিজের বক্ষদেশের ওপর ওড়না দিয়ে রাখে।
এই আয়াতে আল্লাহ তাআলা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে আদেশ করেছেন-তিনি যেন মুমিন নর নারীদের একথা পৌঁছে দেন, তারা যেন আবশ্যকীয়ভাবে দৃষ্টি অবনত রাখে, জিনা থেকে লজ্জাস্থানকে হিফাজত করে। তারপর সুস্পষ্ট করে এটাও বলে দিয়েছেন যে—এটাই তাদের জন্য উত্তম।
এটা সবার জানা কথা যে, অশ্লীল কাজ থেকে লজ্জাস্থান তখনই হিফাজত করা সম্ভব, যদি তার সহায়ক উপায় ও মাধ্যমগুলো থেকে বেঁচে থাকা যায়। আর এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, কর্মক্ষেত্র বা অন্যান্য অঙ্গনে নারী-পুরুষের সংমিশ্রণ বা পুরুষ নারী সংমিশ্রণই অশ্লীল কাজের সবচেয়ে বড়ো সহায়ক এবং উপায়। আর এই দুটো বিষয় (অর্থাৎ দৃষ্টি অবনত রাখা ও লজ্জাস্থান হিফাজত রাখা) তখনই কখনোই সম্ভব নয়, যদি পুরুষ-নারী একই সাথে একই জায়গায় কাজ করে।
মোটকথা, তখন নিজেকে পবিত্র রাখা অসম্ভব। এজন্যই আল্লাহ তাআলা মুমিন নারীদের আদেশ করেছেন দৃষ্টি অবনত রাখতে, লজ্জাস্থান হিফাজত করতে, সৌন্দর্য প্রকাশ না করতে (তবে যা সাধারণত প্রকাশ পেয়েই যায় তার কথা ভিন্ন) বুকের ওপর ওড়না দিয়ে আবৃত করে রাখতেন। তাহলে কীভাবে সম্ভব দৃষ্টি অবনত রাখা, লজ্জাস্থান হিফাজত রাখা, সৌন্দর্য প্রকাশ না করা, যদি নারীরা পুরুষদের সাথে যুক্ত হয়, তাদের সাথে কর্মক্ষেত্রে মিশে যায়?
মূলত, সংমিশ্রণই সকল খারাপ কাজে জড়িয়ে পড়ার কারণ। কিছুতেই দৃষ্টি অবরোধ রাখা সম্ভব নয়, যদি নারী পুরুষের ডানে বামে চলাফেরা করে এই যুক্তিতে যে, সেও পুরুষের কাজে অংশীদার হবে, বা সমান অধিকার পাবে।
ইসলাম হারামকে যেমন হারাম বলেছে, তদ্রুপ হারাম কাজে লিপ্ত হওয়ার উপায় উপকরণ বা সহায়ককেও হারাম বলেছে। এজন্যই নারীদেরকে পুরুষের সাথে নরম কণ্ঠে কথা বলতে নিষেধ করা হয়েছে। কারণ, নরম কথার মাধ্যমেই তাদের দিকে পুরুষদের মন আকৃষ্ট হয়ে যায় যেমন আল্লাহ তাআলা বলেন—
يَا نِسَاءَ النَّبِيِّ لَسْتُنَّ كَأَحَدٍ مِّنَ النِّسَاءِ إِنِ اتَّقَيْتُنَّ فَلَا تَخْضَعْنَ بِالْقَوْلِ فَيَطْمَعَ الَّذِي فِي قَلْبِهِ مَرَضٌ وَقُلْنَ قَوْلًا مَّعْرُوفًا (۳২)
হে নবীপত্নীগণ, তোমরা সাধারণ কোনো নারীদের মতো নও, যদি তোমরা তাকওয়াবান হও। আর তোমরা কোমলভাবে পরপুরুষদের সাথে কথা বলো না। তাহলে যার মনে ব্যধি আছে, সে আকৃষ্ট হয়ে যাবে।
ব্যাধি দ্বারা উদ্দেশ্য, খাহেশাত ও প্রবৃত্তির ব্যাধি। এখন একসাথে মিশে থাকলে কীভাবে এটা থেকে রক্ষা পাবে? কারণ, এটা তো স্পষ্ট যে, কোনো নারী যদি পুরুষদের কর্মক্ষেত্রে যোগ দেয়, তাহলে তাকেও পরপুরুষদের সাথে কথা বলতে হবে, তাদেরকেও তার সাথে কথা বলতে হবে, শয়তান তাদের কথা আরও চাকচিক্য করে তুলবে, অশ্লীল কাজের দিকে ডাকবে। আর একসময় তারা শয়তানের শিকারে আটকে পড়ে যাবে!
আল্লাহ তাআলা বড়োই প্রজ্ঞাময়, সর্বজ্ঞানী। এজন্য তিনি নারীদের পর্দা ব্যবহারের আদেশ করেছেন। এর কারণ হচ্ছে— স্বভাবতই কিছু মানুষ নেককার; তবে কিছু মানুষ কিছু বদকারও। কিছু মানুষ পবিত্র আর কিছু অপবিত্র। তো, এ পর্দাই আল্লাহ তাআলার রহমতে ফিতনা থেকে তাদের রক্ষা করবে। ফিতনার সহায়ক বিষয়গুলো থেকে তাদের দূরে রাখবে। আর এর মাধ্যমে নারী-পুরুষের পবিত্রতা রক্ষা পাবে। অপবাদের আশঙ্কা থেকেও বেঁচে থাকবে। আল্লাহ তাআলা বলেন— وَإِذَا سَأَلْتُمُوهُنَّ مَتَاعًا فَاسْأَلُوهُنَّ مِن وَرَاءِ حِجَابٍ ذَلِكُمْ أَطْهَرُ لِقُلُوبِكُمْ وَقُلُوبِهِنَّ
আর যখন তোমরা তাদের কাছে (নবী-পত্নীগণ) কিছু চাইবে, তখন পর্দার আড়াল থেকে চাও। এই বিধানই তোমাদের অন্তর এবং তাদের অন্তরের জন্য অধিক পবিত্রদায়ক।
কাপড় দিয়ে চেহারা ও শরীর ঢাকার পর নারীদের জন্য সবচেয়ে উত্তম পর্দা হচ্ছে তাদের ঘর। ইসলাম নারীর জন্য পুরুষদের সাথে মেলামেশাকে হারাম করেছে। যাতে নারী সরাসরি বা অন্য কোনোভাবে ফিতনার সম্মুখীন না হয়। আব্দুল্লাহ ইবনু মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেন— المرأة عورة فإذا خرجت استشرفها الشيطان
নারী হলো আবরণীয় সত্তা। সে যখন বের হয়, তখন শয়তান তার দিকে উঁকি দেয়।২৭৯
এ-জন্যেই আল্লাহ তাআলা নারীকে ঘরে স্থির থাকার আদেশ করেছেন, ঘর থেকে বের হতে নিষেধ করেছেন। তবে গ্রহণযোগ্য প্রয়োজন থাকলে শরয়ি বিধান রক্ষা করে বের হতে পারবে। আল্লাহ তাআলা নারীর ঘরে অবস্থান করাকে -- قرار কারার- তথা ‘স্থির থাকা’ শব্দ দ্বারা ব্যক্ত করেছেন। কারণ, ঘরই হলো তার মূল বাসস্থান; যা তার সৃষ্টিগত স্বভাবের উপযোগী। এখানেই তার হৃদয়ের তৃপ্ততা, মনের উন্মুক্ততা। ঘর থেকে বের হলেই তার অস্থিরতা শুরু হয়ে যায়। হৃদয়ের তৃপ্তি হারিয়ে যায়। মন সংকীর্ণ হয়ে যায়। কখনো কখনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিণতিরও সম্মুখীন হতে হয়।
আশ্চর্য হয়ে যখন দেখি-কিছু নামধারী মুসলিম, বরং কোনো কোনো আলিমও, যাদের চিন্তাচেতনা পাশ্চাত্য দ্বারা প্রভাবিত, বলতে শুনি-নারী-পুরুষ সবার সমান অধিকার চাই, জীবনের প্রত্যেকটা অঙ্গনে, ঘরের বাইরে ও ভেতরে, শাসন-ব্যবস্থা ও রাজনীতিতে নেতৃত্ব ও মন্ত্রীতে, মোটকথা, কাজ করার যতগুলো ক্ষেত্রে আছে, সবগুলোতে। তখন বলতেই হবে-এটা স্রেফ অন্ধকারচ্ছন্ন মূর্খতা; যা কুরআন-সুন্নাহরও বিরোধী, যুক্তিরও বিরোধী, এটা আসমান জমিনের মহান সৃষ্টিকর্তার হুকুমের বিপরীত। আল্লাহ তাআলা আমাদের এবং সকল মুসলিমকে এই ধরনের অহেতুক চিন্তা, ভ্রান্ত আকিদা থেকে রক্ষা করেন। আমিন।
প্রশ্ন করতে পারেন, যুক্তিবিরোধী কেন?
বলতে হবে, এর কারণ আছে। কারণ হলো, নারী-পুরুষের মাঝে স্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে, যা কোনো সমঝদার ব্যক্তি অস্বীকার করবে না। কত বিষয়ই তো এমন আছে, যা পুরুষের তবিয়তের উপযোগী, আর নারীদের সাথে সাংঘর্ষিক। আবার কত বিষয় এমন আছে, যা নারী প্রকৃতির সাথে খাপ খায়, কিন্তু পুরুষদের স্বভাবের বিরোধী! তাহলে যুক্তি কীভাবে সমান অধিকারের কথা বলে!
আর এটি কুরআনের বিরোধী যুক্তি। কেন? কারণ, আল্লাহ তাআলা বলেন- وَلَا تَتَمَنَّوْا مَا فَضَّلَ اللَّهُ بِهِ بَعْضَكُمْ عَلَى بَعْضٍ لِلرِّجَالِ نَصِيبٌ مِّمَّا اكْتَسَبُوا وَلِلنِّسَاءِ نَصِيبٌ مِّمَّا اكْتَسَبْنَ: وَاسْأَلُوا اللَّهَ مِن فَضْلِهِ إِنَّ اللَّهَ كَانَ بِكُلِّ شَيْءٍ عَلِيمًا (۳۲) আল্লাহ তাআলা তোমাদের কাউকে অপরের ওপর যে বিষয় দ্বারা শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন, সেটা তোমরা (পাওয়ার) আকাঙ্ক্ষা করো না। পুরুষদের জন্য রয়েছে তাদের কৃতকর্মের অংশ, আর নারীদের জন্য রয়েছে তাদের কৃতকর্মের অংশ। আর তোমরা আল্লাহ তাআলার কাছে তাঁর অনুগ্রহ প্রার্থনা করো। নিঃসন্দেহে আল্লাহ তাআলা সবকিছু সম্পর্কে পূর্ণ অবগত।৮০
আল্লাহ তাআলা আরও বলেন الرِّجَالُ قَوَّامُونَ عَلَى النِّسَاءِ بِمَا فَضَّلَ اللَّهُ بَعْضَهُمْ عَلَىٰ بَعْضٍ وَبِمَا أَنفَقُوا مِنْ أَمْوَالِهِمْ পুরুষরা নারীদের ওপর কর্তৃত্ববান। এ কারণে যে, আল্লাহ তাআলা তাদের কাউকে (পুরুষদের) কারও (নারীদের) ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন। এবং এ কারণে যে, পুরুষরা তাদের ধনসম্পদ থেকে (নারীদের জন্য) খরচ করে।২৮১
টিকাঃ
২৭৫ সূরা আলে ইমরান, আয়াত :
* সহিহ বুখারি: ৮৬৯
"সূরা নূর, আয়াত: ৩০-৩১
*** সূরা আহঝাব, আয়াত: ৩৯
২০১ জামি তিরমিজি: ১১৭৩
২৮০ সূরা নিসা, আয়াত: ৩২
২৮১ সূরা নিসা, আয়াত: ৩৪
📄 ‘আহলুল হিল্লি ওয়ালা আকদ’ এর দায়িত্ব
‘আহালুল হিল্লি ওয়ালা আকদ’ এর দায়িত্ব দুইটি—
এক. খলিফা নির্বাচন এবং তার হাতে বাইআত গ্রহণ। কারণ, তাদের প্রথম দায়িত্বই হলো খলিফা নির্বাচন করা এবং তার হাতে বাইআত গ্রহণ করা।
দুই. নেতৃত্বের জন্য অধিক যোগ্য এবং অগ্রাধিকারপ্রাপ্তকে নির্ধারণ করা। কারণ এটাও তাদের একটি দায়িত্ব যে, তারা এমন কাউকে নির্ধারণ করবে—যিনি জনগণের পরিচালনায় অধিক যোগ্য, সবক্ষেত্রেই তাদের জন্য কল্যাণ বয়ে নিয়ে আসবে।
এখন যদি দুজনকেই যোগ্য পায়, তবে একজন বেশি জ্ঞানী এবং অপরজন অধিক বীর সাহসী; তাহলে নির্বাচনের ক্ষেত্রে সময়ের দাবি কী বলে, সেটাই রক্ষা করবে। যদি সাহসের বেশি প্রয়োজন থাকে, তাহলে সাহসী ব্যক্তিকেই অগ্রাধিকার দেবে। আর যদি জ্ঞানের বেশি প্রয়োজন থাকে, তাহলে জ্ঞানী ব্যক্তিই প্রাধান্য পাবে।
সব ক্ষেত্রেই যদি সমান হয়, তাহলে সবচেয়ে প্রবীণ ব্যক্তিকে অগ্রাধিকার দেবে। তবে যে বেশি বয়স্ক নয়, তার হাতে বাইআত করলেও জায়িজ হবে। এখন যদি প্রার্থিত সব বিষয়েই সমান সমান হয়, আর দুজনেই নেতৃত্ব নিয়ে বিবাদে লিপ্ত হয়; তাহলে কীভাবে তাদের বিবাদ নিরসন করা হবে, এক্ষেত্রে ফুকাহায়ে কিরামের মাঝে ইখতিলাফ আছে।
একদল বলেন—লটারি করা হবে। লটারিতে যার নাম উঠবে, সে-ই অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত।
অপরদল বলেন—বরং ‘আহলুল হিল্লি ওয়াল আকদ’ যাকে ইচ্ছা করেন, তার হাতে বাইআত গ্রহণ করবে। লটারির প্রয়োজন নেই।
তাই, যদি পুরো জামাআতের মধ্যে সর্বসম্মতিক্রমে একজন ব্যক্তি শ্রেষ্ঠ হিসেবে নির্ধারিত হন, তাহলে সবাই তার হাতে বাইআত গ্রহণ করবে। তারপর যদি পরবর্তী সময়ে তার চেয়ে যোগ্য ব্যক্তির বিকাশ ঘটে, তাহলে প্রথম ব্যক্তির নেতৃত্ব গ্রহণযোগ্য হবে। তার চেয়ে শ্রেষ্ঠ ব্যক্তির নিকট ক্ষমতা হস্তান্তর করা যাবে না। আর যদি অধিক শ্রেষ্ঠ ব্যক্তি থাকা সত্ত্বেও শুধু শ্রেষ্ঠ ব্যক্তির হাতে বাইআত গ্রহণ করা হয়, যদি সেটা গ্রহণযোগ্য ওজরের কারণে হয়—যেমন: অধিক শ্রেষ্ঠতম ব্যক্তি অসুস্থ বা অনুপস্থিত ছিল; অথবা শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিকে সবাই শ্রেষ্ঠতম ব্যক্তির চেয়ে বেশি আনুগত্য করে, তার প্রতি জনগণের ভালোবাসা থাকে—তাহলে শ্রেষ্ঠ ব্যক্তির নেতৃত্ব গ্রহণযোগ্য হবে। আর যদি ওজরের কারণে না হয়, তাহলে তার বাইআত ও নেতৃত্ব সহিহ হবে কি না—এ বিষয়ে ইখতিলাফ আছে।
কেউ কেউ বলেন—(তাদের একজন ইমাম জাহিজ রহ.), তার বাইআত গ্রহণযোগ্য হবে না। কারণ, নির্বাচনের ক্ষেত্রে অধিক যোগ্য ব্যক্তিই অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত। সুতরাং, তার চেয়ে নিচের যোগ্য ব্যক্তির হাতে বাইআত গ্রহণ করা যাবে না। যেমন—আহকামে শারইয়্যাহর ক্ষেত্রে ইজতিহাদের যোগ্যতা যার মাঝে বেশি পরিমাণে আছে, নেতৃত্বের ক্ষেত্রে সে-ই অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত।
তবে অধিকাংশ ফুকাহায়ে কিরাম ও মুতাকাল্লিমিন বলেন—তার বাইআতও সহিহ হবে, নেতৃত্বও গ্রহণযোগ্য হবে। অধিক শ্রেষ্ঠ ব্যক্তি থাকা শুধু শ্রেষ্ঠ ব্যক্তির নেতৃত্বের জন্য বাধার কারণ হবে না, যদি-না নেতৃত্বের শর্তাবলির ক্ষেত্রে ত্রুটি থাকে। যেমন—কাজা ও বিচার-ব্যবস্থার ক্ষেত্রে অধিক যোগ্য ব্যক্তি থাকলেও শুধু যোগ্য ব্যক্তিকে নির্ধারণ করা যায়। কারণ ‘অধিক’এর কথা বলা হয়েছে মূলত অতিশয়তা বোঝানোর জন্য, এটা নেতৃত্বের হকদার হওয়ার জন্য তেমন কোনো উল্লেখযোগ্য শর্ত নয়।
📄 ‘আহলুল হিল্লি ওয়াল আকদ’-এর সংখ্যা
‘আহলুল হিল্লি ওয়াল আকদ’-এর সদস্য সংখ্যা কী পরিমাণ হলে নেতৃত্ব সংঘটিত হবে—এ ব্যাপারে উলামায়ে কিরামের মাঝে মতবিরোধ রয়েছে। এর বিস্তারিত বিবরণ হলো:
এক. একদল উলামায়ে কিরাম নির্বাচিত খলিফার ব্যাপারে আহলুল হিল্লি ওয়াল আক্দের সকল সদস্যের ঐকমত্য শর্ত করেছেন। নির্দিষ্ট কোনো সংখ্যা নেই। এই মত অনেকটা মুতাজিলা সম্প্রদায়ের ইমাম আসামের কথার মতো। তিনি বলেন-ইজমা ছাড়া নেতৃত্ব কায়েম হবে না।১৮২
এমনটাই ইমাম আহমাদ রহ.-এর এক বর্ণনাতে পাওয়া যায়। ইব্ন হানি বলেন-আমি আবু আব্দুল্লাহকে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এই হাদিসের অর্থ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলাম-
من مات وليس له إمام مات ميتة جاهلية
যে ব্যক্তি এ অবস্থায় মৃত্যুবরণ করবে যে, তার কোনো ইমাম নেই, সে জাহিলিয়াতের মৃত্যু বরণ করে নিল।
তিনি বললেন-তুমি কি জানো, এখানে 'ইমাম' দ্বারা কী উদ্দেশ্য? ইমাম বা খলিফা তাকেই বলে, যার ব্যাপারে সমস্ত মুসলিম ঐকমত্য হয়ে বলে-ইনিই ইমাম। এটাই হাদিসের অর্থ।১৮৩
দুই. আরেকদল উলামায়ে কিরাম আহলুল হিল্লি ওয়াল আক্দের সংখ্যা নির্ধারণ করেছেন। তাদের কেউ কেউ বলেন-সর্বনিম্ন সংখ্যা ৪০জন। কারণ, মর্যাদার দিক থেকে ইমামতে কুবরা জুমুআর নামাজের ঊর্ধ্বে। আর ৪০-এর কমে জুমুআর নামাজ সংঘটিত হয় না।
কেউ কেউ বলেন-পাঁচজন।
কেউ বলেন-চারজন।
আবার কেউ বলেন-দুজন দ্বারাও তৃতীয় ব্যক্তির ইমামত সংঘটিত হয়ে যাবে। তবে শর্ত হচ্ছে-কয়েকজন সাক্ষীর সামনে হতে হবে; যাতে পরবর্তী সময়ে অস্বীকার করলে প্রমাণ পেশ করা যায়। কেউ কেউ এই মতকে ইমাম আবুল হাসান আশআরি রহ.-এর সাথে নিসবত করেছেন, যেমন রদ্দুল মুহতারে আছে।
শাফিয়ি মাজহাবের অধিকাংশ উলামায়ে কিরামের মতে, বাইআতের সময় উলামায়ে কিরাম, নেতৃবৃন্দ, অভিজাত শ্রেণির যারা যারা সাক্ষ্য দেওয়ার যোগ্য এবং সহজে উপস্থিত হতে পারবে, তাদের দ্বারাই নেতৃত্ব কায়েম হবে, এমনকি যদি একজনও থাকে তবুও যথেষ্ট।
ইমাম কলকাশান্দি বলেন-আমাদের শাফিয়ি মাজহাবের উলামায়ে কিরামের নিকট এটাই বিশুদ্ধ মত।
ইমাম দামিজি রহ. বলেন—ইমাম আবুল হাসান আশআরি রহ.-এর মত এবং শাফিয়ি উলামায়ে কিরামের মাঝে কিছুটা পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়। পার্থক্যটি হলো, শাফিয়ি উলামায়ে কিরামের নিকট আহলুল হিল্লি ওয়াল আকদের একজন সদস্য দ্বারাই ইমামত সহিহ হবে এই শর্তে যে—সেখানে সদস্য হিসেবে গণ্য করা যায়, এমন কেউ উপস্থিত না থাকা। আর ইমাম আশআরি রহ.-এর মতে, একজন সদস্য দ্বারাই ইমামত সহিহ হয়ে যাবে, অন্য কেউ থাকুক বা না থাকুক।২৮৪
তিন. আরেকদল বলেন—আহলুল হিল্লি ওয়াল আকদের অধিকাংশ সদস্য দ্বারাই ইমামত সহিহ হবে।
তারা সবার ঐকমত্যও শর্ত করেন না, নির্দিষ্ট কোনো সংখ্যাও বলেন না। আবু ইয়ালা রহ. বলেন—আহলুল হিল্লি ওয়াল আকদের অধিকাংশ সদস্য দ্বারাই ইমামত সহিহ হবে।
অনেক উলামায়ে কিরাম এই মতকেই প্রাধান্য দিয়েছেন। কারণ, কুরআন-হাদিস থেকেও এ ব্যাপারে কোনো দলিল নেই। আবার উলামায়ে কিরামের ইজমাও নেই যে, ঐকমত্য শর্ত না-কি নির্দিষ্ট সংখ্যা শর্ত। অগ্রাধিকার পাওয়ার কারণ হলো, উম্মতে মুসলিমা আহলুল হিল্লি ওয়াল আকদের সদস্যদের ওপর নির্ভর করে। তারাই জাতির চাওয়া-পাওয়ার ক্ষেত্রে প্রতিনিধিত্ব করেন। তাদের মাঝে নেতৃত্বের গুণাবলিও পূর্ণাঙ্গভাবে পাওয়া যায়। এটা আহলুল হিল্লি ওয়াল আকদের সকল সদস্যদের (প্রত্যেকের মধ্যে সমষ্টিগতভাবে) মাঝে যেমন পাওয়া যায়, আবার তাদের 'অধিকাংশের' মাঝেও পাওয়া যায়। কিন্তু সমস্যা হলো, বাইআতের সময় সবার (প্রত্যেকের) উপস্থিতি অসম্ভব না হলেও কিছুটা কঠিন। তাই, অধিকাংশ উপস্থিত থাকলেই যথেষ্ট। মোটকথা, বাইআতের ক্ষেত্রে নির্বাচিত খলিফার পক্ষে এই পরিমাণ অনুসারী, সাহায্যকারী ও সমর্থনকারী থাকা প্রয়োজন যাদের দ্বারা খলিফার আসন পাকাপোক্ত হতে পারে, তার পাশে শক্তিশালী দল থাকতে পারে, যারা তাকে রক্ষা করবে; যাতে পরবর্তী সময়ে খলিফার বিরুদ্ধে ঝড় বয়ে গেলেও খলিফার অনুসারীদের মূলৎপাটন করা সম্ভব হবে না। অতএব, যখন তার বাইআত শক্তি দ্বারা সুদৃঢ় হবে, সদলবলে প্রতিষ্ঠিত হবে, মজবুত হবে, সাহায্য দ্বারা সমর্থিত হবে, শত্রুদের ওপর বিজয়ী হওয়ার শক্তি নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হবে; তখনই ইমামত সুসাব্যস্ত ও স্থির হবে, নেতৃত্ব দৃঢ় হবে এবং অবিচল থাকবে। ইমামত সহিহ হওয়ার জন্য ইজমা মূলত শর্ত নয়।
বিষয়টি স্পষ্ট করার জন্য আবু বকর রা. এর বাইআতের ঘটনা লক্ষ্য করা যেতে পারে। বাইআতের পর তিনি হুকুম করেছেন, বিচার করেছেন, ফায়সালা করেছেন, সুসংহত করেছেন, মুজাহিদ বাহিনী প্রস্তুত করেছেন, ইসলামের ঝান্ডা উঁচু করেছেন, জাকাত অস্বীকারকারীদের বিরুদ্ধে জিহাদ করেছেন, ট্যাক্স নিয়েছেন এবং সেগুলো বণ্টন করেছেন। কিন্তু এগুলো করার আগে, মদিনাবাসীর বাইআতের পর তিনি এই অপেক্ষা করেন নি যে, তার বাইআতের খবর ইসলামের দূরদূরান্ত জনপদেও পৌঁছে যাক। যারা মদিনায় ছিল তারা ছাড়া অন্য কারও থেকেও স্বীকারোক্তির অপেক্ষা তিনি করেন নি। একইভাবে অপর তিন খলিফার বাইআতের ক্ষেত্রেও এমনটি হয়েছিল। এতে কোনো জ্ঞানী ব্যক্তি সন্দেহ পোষণ করতে পারে না। তারপর আমাদের এই ক্ষুদ্র জ্ঞানকে যে বিষয়টি আরও শক্তিশালী করে, তা হলো-খলিফা নির্বাচনের মূল উদ্দেশ্য। অর্থাৎ, রাষ্ট্রের হিফাজত, ইসলামের মৌলিক বিষয়-সহ অন্যান্য যাবতীয় নাজুক বিষয়ে গুরুত্ব প্রদান। এখানে লক্ষ্য করলে বোঝা যায় যে, এই বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে সামান্য অবকাশেরও সুযোগ থাকে না। কারণ, বিলম্ব করা হলে এমন জটিল সমস্যা হতে পারে, যার সমাধান হবে না। এমন মারাত্মক ভুল হতে পারে, যার ক্ষতিপূরণ হবে না! এখান থেকেই বোঝা যায় যে, ইমামতের জন্য ইজমা শর্ত নয়। ২৮৫
টিকাঃ
১৮২ আল ফারকু বাইনাল ফারকি, ১৫০
১৮৩ আল জামি লিউলুমুল ইমাম আহমাদ,
** ইমামতে উযমা, ১৭৮