📄 খলিফা যে কাজে নিজে নিজেই বরখাস্ত হন
নিজে নিজেই বরখাস্ত হওয়ার মাধ্যমে ক্ষমতার সমাপ্তি, এক্ষেত্রে উলামায়ে কিরাম একমত যে, খলিফা যতদিন পর্যন্ত তার ওপর ন্যাস্ত করা দায় দায়িত্ব পালন করবেন, জনগণের যাবতীয় বিষয়াদি সুষ্ঠভাবে পালন করে যেতে পারেন, তাদের মাঝে ইনসাফ করবেন, ততদিন পর্যন্ত তিনি বরখাস্ত হবেন না। তাকে বরখাস্তও করা যাবে না, তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহও করা যাবে না। বরং এসব থেকে ইসলাম খুব সতর্ক করেছে। তদ্রুপ খলিফার সামান্য কিছু ভুলত্রুটি হলেও তাকে বরখাস্ত করা যাবে না। কারণ, ভুলত্রুটির উর্ধ্বে কেবল আল্লাহ তাআলাই। আর গুনাহ বা ভুলত্রুটি থেকে মুক্ত থাকতে পারেন কেবল সেই, যাকে আল্লাহ তাআলা মুক্ত রাখেন। মূলত প্রত্যেক মানুষই ভুল করে, তাদের মধ্যে তারাই উত্তম ভুলকারী যারা ভুল থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে। তবে কিছু বিষয় আছে যা মুসলিমদের দ্বীনি ও দুনিয়াবি জীবনে খুব প্রভাব ফেলে, যার কারণে খলিফাকে বরখাস্ত করা প্রয়োজন হয়ে পড়ে। এ সকল বিষয়ের (যা করলে খলিফা বরখাস্ত হয়ে যান) কিছু আছে যা বরখাস্ত হওয়ার ‘কারণ’ হওয়ার ক্ষেত্রে সমস্ত উলামায়ে কিরামের সবাই একমত। আর কিছু আছে বিরোধপূর্ণ, এখন সে-সকল কারণ উল্লেখ করা হচ্ছে, যাতে আলিমদের বক্তব্য আমরা জানতে পারি-
এক. ইসলামগ্রহণের পর কুফুরি ও ধর্মান্তর : খলিফা যদি এমন কোনো গুরুতর অপরাধ করে ফেলেন, যার কারণে স্পষ্টভাবে কুফুরি বা ধর্মান্তর বোঝা যায়, তাহলে তিনি নিজে নিজেই বরখাস্ত হয়ে যাবেন। কোনো মুসলিমের ওপর তার ক্ষমতা বাকি থাকবে না। জুনাদা ইবনু আবি উমাইয়া রহ. বলেন—আমরা উবাদা ইবনু সামিত রা.-এর কাছে এলাম, তখন তিনি অসুস্থ ছিলেন। আমরা বললাম— আল্লাহ তাআলা যেন আপনাকে সুস্থ করে দেন। এখন আপনি এমন একটি হাদিস বর্ণনা করেন, যার মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা আপনার উপকার করছেন, যা আপনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে শুনেছেন। তিনি বললেন—আমাদেরকে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ডাকলে আমরা তার হাতে বাইআত গ্রহণ করি, যে সকল বিষয়ে বাইআত গ্রহণ করি তা হচ্ছে—
ان بايعنا على السمع في منشطنا ومكرهنا وعسرنا ويسرنا وأثرة علينا ننازع الأمر أهله إلا ان تروا كفرا بواحا عندكم من الله فيه برهان ..
(খলিফার কথা) শোনা এবং মানার ওপর, চাই সেটা আমাদের ইচ্ছায় হোক বা অনিচ্ছায়, কষ্ট হোক বা সহজ, এবং (বাইআত গ্রহণ করেছি) আমাদের বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্ব করলে তা মেনে নেওয়ার ওপর, এবং শাসকদের সাথে ঝগড়া-বিবাদে লিপ্ত না হওয়ার ওপর। তবে যদি তোমরা (তাদের থেকে) স্পষ্ট কুফুরি দেখতে পাও, যা (কুফুরি হওয়ার) ব্যাপারে তোমাদের কাছে আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রমাণ আছে。
ইমাম খাত্তাবি রহ. বলেন—এখানে إلا ان تروا كفرا بواحا( মধ্যে )بواحا( শব্দের অর্থ সুষ্পষ্ট, যেমন বলা হয়—( باح به الشيء يبوح به بوحا ومباح اذا صرح به( 'কোনো কিছু স্পষ্ট করল'।
হাদিসের উদ্দেশ্য হচ্ছে—এমন কুফুরি কথা যা দ্ব্যার্থহীন, কোনো ব্যাখ্যার সম্ভাবনা রাখে না। তো যদি এমনই হয়, তাহলে শাসকদের সাথে লড়াই করা বৈধ হবে পক্ষান্তরে কোনো ব্যাখ্যার সম্ভাবনা থাকলে বৈধ নয়। (فيه الله من عندكم برهان - তোমাদের কাছে তার স্বপক্ষে আল্লাহর পক্ষ হতে প্রমান রয়েছে) এখানে প্রমাণ বলতে কুরআনের সুষ্পষ্ট আয়াত এবং হাদিস উদ্দেশ্য, যা কোনো ব্যাখ্যার সম্ভাবনা রাখে না।
হাফিজ ইব্ন হাজার রহ. বলেন-কুফুরি বাক্য বলার মাধ্যমে শাসক পদচ্যুত হয়ে যাবেন, প্রত্যেক মুসলিমের ওপর ওয়াজিব সে বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়া। তো, যে তার বিরুদ্ধে সোচ্চার হবে, তার সাওয়াব হবে; আর যে তার তোষামোদি করবে, তার গুনাহ হবে। তবে কেউ যদি অক্ষম থাকে, তাহলে তার ওপর ওই দেশ থেকে হিজরত করা ওয়াজিব।
দুই. ফিসক ও পাপাচার : এক্ষেত্রে ইখতিলাফ আছে। অধিকাংশ উলামায়ে কিরামের মতে, খলিফা ফাসিক হয়ে গেলে পদচ্যুত হবেন না। বরং আপন পদেই বহাল থাকবেন। তবে ফিতনার আশংকা না থাকলে তাকে বরখাস্ত করা উত্তম। ইমাম নববি রহ. মুসলিম শরিফের ব্যাখ্যাগ্রন্থে বলেন, আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের অধিকাংশ ফুকাহা এবং মুহাদ্দিসিনে কিরাম এবং কালাম শাস্ত্রবিদ বলেন-পাপাচার, জুলুম, হক না প্রদানের মাধ্যমে শাসক বরখাস্ত হবে না, তাকে বরখাস্ত করাও যাবে না, এ সব কারণে তার বিরুদ্ধে বিদ্রাহও করা যাবে না। তবে কুরআন-হাদিসের মাধ্যমে তাকে ওয়াজ-নসিহত করা হবে, ভয় দেখানো হবে।
ইবনু আবিদীন রহ. বলেন-কোনো ন্যায়পরায়ণ ব্যক্তিকে শাসক বানানোর পর জুলুম শুরু করলে বা পাপাচার করলে তিনি বরখাস্ত হবেন না। তবে ফিতনার আশংকা না থাকলে তাকে বরখাস্ত করাই উত্তম এবং তাকে ও বরখাস্ত হওয়ার আহবান করবে। তবে তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা যাবে না。
টিকাঃ
সূত্র : সহিহ বুখারি
২০১৮ ফাতহুল বারি, খণ্ড: ১৩, পৃষ্ঠা: ১২৩
* রদুল মুহতার, বাবুল ইমাম
নিজে নিজেই বরখাস্ত হওয়ার মাধ্যমে ক্ষমতার সমাপ্তি, এক্ষেত্রে উলামায়ে কিরাম একমত যে, খলিফা যতদিন পর্যন্ত তার ওপর ন্যাস্ত করা দায় দায়িত্ব পালন করবেন, জনগণের যাবতীয় বিষয়াদি সুষ্ঠভাবে পালন করে যেতে পারেন, তাদের মাঝে ইনসাফ করবেন, ততদিন পর্যন্ত তিনি বরখাস্ত হবেন না। তাকে বরখাস্তও করা যাবে না, তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহও করা যাবে না। বরং এসব থেকে ইসলাম খুব সতর্ক করেছে। তদ্রুপ খলিফার সামান্য কিছু ভুলত্রুটি হলেও তাকে বরখাস্ত করা যাবে না। কারণ, ভুলত্রুটির উর্ধ্বে কেবল আল্লাহ তাআলাই। আর গুনাহ বা ভুলত্রুটি থেকে মুক্ত থাকতে পারেন কেবল সেই, যাকে আল্লাহ তাআলা মুক্ত রাখেন। মূলত প্রত্যেক মানুষই ভুল করে, তাদের মধ্যে তারাই উত্তম ভুলকারী যারা ভুল থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে। তবে কিছু বিষয় আছে যা মুসলিমদের দ্বীনি ও দুনিয়াবি জীবনে খুব প্রভাব ফেলে, যার কারণে খলিফাকে বরখাস্ত করা প্রয়োজন হয়ে পড়ে। এ সকল বিষয়ের (যা করলে খলিফা বরখাস্ত হয়ে যান) কিছু আছে যা বরখাস্ত হওয়ার ‘কারণ’ হওয়ার ক্ষেত্রে সমস্ত উলামায়ে কিরামের সবাই একমত। আর কিছু আছে বিরোধপূর্ণ, এখন সে-সকল কারণ উল্লেখ করা হচ্ছে, যাতে আলিমদের বক্তব্য আমরা জানতে পারি-
এক. ইসলামগ্রহণের পর কুফুরি ও ধর্মান্তর : খলিফা যদি এমন কোনো গুরুতর অপরাধ করে ফেলেন, যার কারণে স্পষ্টভাবে কুফুরি বা ধর্মান্তর বোঝা যায়, তাহলে তিনি নিজে নিজেই বরখাস্ত হয়ে যাবেন। কোনো মুসলিমের ওপর তার ক্ষমতা বাকি থাকবে না। জুনাদা ইবনু আবি উমাইয়া রহ. বলেন—আমরা উবাদা ইবনু সামিত রা.-এর কাছে এলাম, তখন তিনি অসুস্থ ছিলেন। আমরা বললাম— আল্লাহ তাআলা যেন আপনাকে সুস্থ করে দেন। এখন আপনি এমন একটি হাদিস বর্ণনা করেন, যার মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা আপনার উপকার করছেন, যা আপনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে শুনেছেন। তিনি বললেন—আমাদেরকে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ডাকলে আমরা তার হাতে বাইআত গ্রহণ করি, যে সকল বিষয়ে বাইআত গ্রহণ করি তা হচ্ছে—
ان بايعنا على السمع في منشطنا ومكرهنا وعسرنا ويسرنا وأثرة علينا ننازع الأمر أهله إلا ان تروا كفرا بواحا عندكم من الله فيه برهان ..
(খলিফার কথা) শোনা এবং মানার ওপর, চাই সেটা আমাদের ইচ্ছায় হোক বা অনিচ্ছায়, কষ্ট হোক বা সহজ, এবং (বাইআত গ্রহণ করেছি) আমাদের বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্ব করলে তা মেনে নেওয়ার ওপর, এবং শাসকদের সাথে ঝগড়া-বিবাদে লিপ্ত না হওয়ার ওপর। তবে যদি তোমরা (তাদের থেকে) স্পষ্ট কুফুরি দেখতে পাও, যা (কুফুরি হওয়ার) ব্যাপারে তোমাদের কাছে আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রমাণ আছে。
ইমাম খাত্তাবি রহ. বলেন—এখানে إلا ان تروا كفرا بواحا( মধ্যে )بواحا( শব্দের অর্থ সুষ্পষ্ট, যেমন বলা হয়—( باح به الشيء يبوح به بوحا ومباح اذا صرح به( 'কোনো কিছু স্পষ্ট করল'।
হাদিসের উদ্দেশ্য হচ্ছে—এমন কুফুরি কথা যা দ্ব্যার্থহীন, কোনো ব্যাখ্যার সম্ভাবনা রাখে না। তো যদি এমনই হয়, তাহলে শাসকদের সাথে লড়াই করা বৈধ হবে পক্ষান্তরে কোনো ব্যাখ্যার সম্ভাবনা থাকলে বৈধ নয়। (فيه الله من عندكم برهان - তোমাদের কাছে তার স্বপক্ষে আল্লাহর পক্ষ হতে প্রমান রয়েছে) এখানে প্রমাণ বলতে কুরআনের সুষ্পষ্ট আয়াত এবং হাদিস উদ্দেশ্য, যা কোনো ব্যাখ্যার সম্ভাবনা রাখে না।
হাফিজ ইব্ন হাজার রহ. বলেন-কুফুরি বাক্য বলার মাধ্যমে শাসক পদচ্যুত হয়ে যাবেন, প্রত্যেক মুসলিমের ওপর ওয়াজিব সে বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়া। তো, যে তার বিরুদ্ধে সোচ্চার হবে, তার সাওয়াব হবে; আর যে তার তোষামোদি করবে, তার গুনাহ হবে। তবে কেউ যদি অক্ষম থাকে, তাহলে তার ওপর ওই দেশ থেকে হিজরত করা ওয়াজিব।
দুই. ফিসক ও পাপাচার : এক্ষেত্রে ইখতিলাফ আছে। অধিকাংশ উলামায়ে কিরামের মতে, খলিফা ফাসিক হয়ে গেলে পদচ্যুত হবেন না। বরং আপন পদেই বহাল থাকবেন। তবে ফিতনার আশংকা না থাকলে তাকে বরখাস্ত করা উত্তম। ইমাম নববি রহ. মুসলিম শরিফের ব্যাখ্যাগ্রন্থে বলেন, আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের অধিকাংশ ফুকাহা এবং মুহাদ্দিসিনে কিরাম এবং কালাম শাস্ত্রবিদ বলেন-পাপাচার, জুলুম, হক না প্রদানের মাধ্যমে শাসক বরখাস্ত হবে না, তাকে বরখাস্ত করাও যাবে না, এ সব কারণে তার বিরুদ্ধে বিদ্রাহও করা যাবে না। তবে কুরআন-হাদিসের মাধ্যমে তাকে ওয়াজ-নসিহত করা হবে, ভয় দেখানো হবে।
ইবনু আবিদীন রহ. বলেন-কোনো ন্যায়পরায়ণ ব্যক্তিকে শাসক বানানোর পর জুলুম শুরু করলে বা পাপাচার করলে তিনি বরখাস্ত হবেন না। তবে ফিতনার আশংকা না থাকলে তাকে বরখাস্ত করাই উত্তম এবং তাকে ও বরখাস্ত হওয়ার আহবান করবে। তবে তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা যাবে না。
টিকাঃ
সূত্র : সহিহ বুখারি
২০১৮ ফাতহুল বারি, খণ্ড: ১৩, পৃষ্ঠা: ১২৩
* রদুল মুহতার, বাবুল ইমাম
📄 জালিম শাসকদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার মাসআলা
কোনো কোনো উলামায়ে কিরাম বলেন-কোনো জালিম শাসকের বিরুদ্ধে কোনো অবস্থাতেই বিদ্রোহ করা যাবে না, যতক্ষণ তিনি মুসলিম নাম ধারণ করে আছেন। তবে মুহাক্কিক উলামায়ে কিরামের স্পষ্ট কথা থেকে এটাই প্রতীয়মান হয় যে-জালিম শাসকের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ না করার বিষয়টা এতটা ব্যাপক না যে, কোনো অবস্থাতেই কোনো জালিম শাসকের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা যাবে না; বরং বিষয়টা একটু বিস্তারিত বিবরণের অবকাশ রাখে। ইমাম আবু বকর জাস্সাস রহ. ('আমার প্রতিশ্রুতি জালিমদের নিকট পৌঁছবে না।' সূরা বাকারা, আয়াত: ২৪)-এ আয়াত প্রসঙ্গে বলেন-জালিম ও অত্যাচারী শাসকদের সাথে লড়াইয়ের বৈধতার ব্যাপারে আবু হানিফা রহ.-এর মাজহাব সবচেয়ে প্রসিদ্ধ ছিল, এ-জন্যই ইমাম আউঝায়ি রহ. বলেন-আবু হানিফা রহ. সব কথাকে আমরা (সহিহ হওয়ার) সম্ভাবনাময় মনে করতাম। কিন্তু যখন তিনি তরবারির ক্ষেত্রে অর্থাৎ জালিম শাসকদের সাথে লড়াইয়ের কথা বললেন, তখন আর সেটাকে সম্ভাবনাময় মনে করতে পারি নি। তিনি বলতেন-জালিম শাসককে মুখে 'আমর বিল মারুফ নাহি আনিল মুনকার' তথা সৎকাজের আদেশ অসৎ কাজ হতে নিষেধ করা ফরজ। এরপরও যদি কাজ না হয়, তাহলে তরবারি দিয়ে তাকে আদেশ-নিষেধ করা হবে। তাছাড়া জায়িদ ইবনু আলি রা.-এর ক্ষেত্রে তো তাঁর পদক্ষেপ অর্থাৎ তাকে সম্পদ দিয়ে সাহায্য করা তাকে সাহায্য করা ওয়াজিব বলে মানুষকে গোপনে ফতোয়া প্রদান এবং তার সাথে লড়াই করার ব্যাপারে এসব ক্ষেত্রে আবু হানিফা রহ. খুবই প্রসিদ্ধ। তদ্রুপ মুহাম্মাদ ও ইবরাহিম ইবনু আবদিল্লাহ ইবনি হাসানের সাথেও তিনি এমন করেছেন।
জাস্সাস রহ. জায়িদ ইবনু আলি রহ.-এর কথা বলে যে ঘটনা বোঝাতে চেয়েছেন তা হলো-আব্দুল্লাহ ইবনু মালিক ইবনি সুলাইমান থেকে ইতিহাসবিদরা বর্ণনা করেন, তিনি বলেন-জায়িদ ইবনু আলি রহ. ইমাম আবু হানিফার রহ.-এর কাছে বাইআত গ্রহণের আবেদন জানিয়ে দূত পাঠালেন।
তখন আবু হানিফা রহ. দূতকে বলেন-তার বাবাকে যেমন লোকেরা পরিত্যাগ করেছে, তাকেও সবাই পরিত্যাগ করবে না বলে যদি জানতাম, তাহলে অবশ্যই তার সাথে আমি জিহাদ করতাম। কারণ, তিনি একজন ন্যায়পরায়ণ শাসক। তবে জিহাদ করার পরিবর্তে তাকে আমি সম্পদ দিয়ে সাহায্য করব। তখন তিনি তার উদ্দেশ্যে দশ হাজার দিরহাম দিলেন। আর দূতকে বলে দিলেন-আমার ওজরটা কিন্তু তাকে খুলে বলবে।
আরেক রিওয়াতে আছে, তিনি বলেছেন-তার সামনে ওজর পেশ করো যে, আমি অসুস্থ তবে তার দলে যোগ দিতে কোনো বাধা নেই। আবু হানিফা রহ.-কে জায়িদ ইবনু আলি রহ.-এর সাথে জিহাদ করা সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, এটা বদরের উদ্দেশ্যে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বের হওয়ার মতো হবে।
তখন তাকে জিজ্ঞেস করা হলো-তাহলে আপনি কেন বের হন না?
তিনি বললেন-আমার কাছে থাকা মানুষের আমানতগুলোর কারণে বের হতে পারছি না। সেগুলো ইবনু আবি লাইলার সামনে পেশ করলে সে না করে, তাই আমার আশঙ্কা হচ্ছে-যদি আমি অজ্ঞাত স্থানে মারা যাই, তাহলে তো (আমানতগুলো) ফেরত দিতে পারব না। পরবর্তী সময়ে তিনি যখনই বের না হওয়ার কথা স্মরণ করতেন, খুব কাঁদতেন।
আর মুহাম্মাদ ও তার ভাই ইবরাহিম ইবনু আবদিল্লাহর সাথে আবু হানিফা রহ.-এর ঘটনা হচ্ছে, তারা দুই ভাই খলিফা মানসুরের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে। ইমাম মালিকি রহ. 'মানাকিব' কিতাবে লেখেন—আবু হানিফা রহ. মানুষকে ইবরাহিমের ব্যাপারে উদ্বুদ্ধ করতেন, তাকে অনুসরণ করার আদেশ করতেন। বলা হয়, এ-জন্যই মানসুর আবু হানিফা রহ.-কে বিষ প্রয়োগ করে মেরেছিল।
তো, এ বিষয়ে আয়াত ও হাদিস ফুকাহা ও মুহাদ্দিসিনে কিরামের কথা থেকে যা বোঝা যায়—আল্লাহই ভালো জানেন—পাপাচার মূলত চার প্রকার:
এক. এমন পাপাচার, যা নিজের মাঝেই সীমাবদ্ধ থাকে; যেমন—জিনা ও মদপান। এর হুকুম হচ্ছে, শাসক নিজে নিজেই বরখাস্ত হয়ে যাবেন না, তবে বরখাস্ত হওয়ার মতো কাজ করেছেন। সুতরাং সবার কর্তব্য ফিতনার আশংকা না থাকলে তাকে বরখাস্ত করা, যেমন, ইবনু আবিদিনের কথা পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে যে, শাসক বরখাস্ত হওয়ার উপযুক্ত। তবে এ কারণে তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা যাবে না। কারণ, জানমালের ক্ষয়ক্ষতি হবে। যারা বলেন—ফাসিক বা জালিম শাসকের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা যাবে, না তাদের কথা দ্বারা এ প্রকার পাপাচারই উদ্দেশ্য।
দুই. এমন পাপাচার, যা অন্যদের সম্পদের ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলে, যেমন মানুষের সম্পদ নেওয়ার ক্ষেত্রে জুলুম করা। তবে এগুলো করার সাথে সাথে এমনভাবে ব্যাখ্যাও করে নেন, যা থেকে মনে হয়—পুরোপুরি বৈধ না হলেও বৈধ হওয়ার মতো। যেমন—মানুষের ওপর বিভিন্ন কর চাপিয়ে জাতির কল্যাণের কথা বলেন। এর হুকুমও একই অর্থাৎ এর মাধ্যমে তিনি বরখাস্ত হবেন না, তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা তো দূরের কথা, বরং তার আনুগত্য করা আবশ্যক। যেমন—ইবনু আবিদিন রহ.-এর কথা সামনে আসছে।
তিন. জনগণের ধন-সম্পদের ক্ষেত্রে জুলুম করবেন, কিন্তু এর স্বপক্ষে তার কাছে কোনো ব্যাখ্যাও নেই, যাতে বোঝা যায় যে বৈধ হতে পারে, এক্ষেত্রে হুকুম হচ্ছে যে মাজলুম চাইলে যে কোনো উপায়ে লড়াই করে হলেও নিজের থেকে জুলুম প্রতিহত করবেন, আবার চাইলে ধৈর্যও ধরতে পারেন, এক্ষেত্রে সাওয়াবও পাবে। তবে লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে—এখানে যে লড়াইয়ে কথা বলা হচ্ছে, সেটা দ্বারা বিদ্রোহ করা উদ্দেশ্য নয়। বরং তার জুলুম প্রতিহত করা। এখন শাসক যদি জুলুম থেকে বিরত হন, তাকেও লড়াই থেকে বিরত থাকতে হবে। ইবনু আবিদিন রহ. ফাতহুল কাদিরের রেফারেন্স দিয়ে বলেন—যারা প্রতিহত করতে সক্ষম তাদের ওপর শাসকের সাথে থেকে লড়াই করা ওয়াজিব। তবে শাসক থেকে যদি এমন কিছু প্রকাশ পায়, যা তার বিরুদ্ধে লড়াই করাকে বৈধ করে ফেলে, যেমন তাদের ওপর বা অন্যদের ওপর এমন জুলুম করা, যা জুলুম হওয়ার ব্যাপারে কোনো অস্পষ্টতা নেই, তাহলে তার বিরুদ্ধে লড়াই করা বৈধ। বরং তাদের কর্তব্য মজলুমদের সাহায্য করা, যতক্ষণ না তারা ন্যায়বিচার পায়, শাসক জুলুম বন্ধ করেন।
তবে জুলুম না হওয়ার ব্যাপারে যদি কোনো সন্দেহ থাকে, তাহলে তার বিরুদ্ধে লড়াই বৈধ নয়। যেমন—অনেক কর চাপিয়ে দেওয়া, যার বৈধতা (সামান্য হওয়ার ক্ষেত্রে) শাসকের আছে। কারণ, ব্যাপক ক্ষতি দূর করার জন্য ব্যক্তিগত ক্ষতি তিনি চাপাতে পারেন। এই হুকুম—লড়াইয়ের বৈধতা—ওই মাজলুমের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, যে নিজের থেকে জুলুম রোধ করার জন্য লড়াই করবে।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, তার সাথে অন্য কেউ কি শাসকের বিরুদ্ধে লড়াই করতে পারবে? এক্ষেত্রে উলামায়ে কিরামের বিভিন্ন বক্তব্য পাওয়া যায়। ফাতহুল কাদিরে উল্লেখ করা হয়েছে যে, তার ওপর বরং ওয়াজিব এই মাজলুমকে সাহায্য করা, যতক্ষণ না শাসক ইনসাফের পথে ফিরে আসেন। যেমন ইতিপূর্বে ফাতহুল কাদিরের রেফারেন্স দিয়ে রদ্দুল মুহতারে বলা হয়েছে। তবে জামিউল ফুসুলিয়্যিন, মুবতাগা এবং সিরাজ গ্রন্থে বলা হয়েছে—অন্যদের জন্য সমীচীন নয়, না সুলতানকে সাহায্য করা, আর না মাজলুমকে। আর ইবনু আবিদিন দুই কথা একত্র করে বলেন যে—তখন যদি এর ফলে বিদ্রোহের আশংকা না থাকে, মাজলুমকে সাহায্য করা ওয়াজিব। অন্যথায় নয়। এ-অবস্থায়, সবর করাটা উত্তম বলা হয়েছে হুজাইফা ইবনু ইয়ামান রা.-এর হাদিসের ভিত্তিতে। সেখানে আছে—
يكون بعدي أئمة لا يهتدون بهداي ولا يستنون بسنتي وسيقوم فيهم رجال قلوبهم قلوب الشياطين في جثمان قال قلت كيف أصنع يا رسول الله إن أدركت ذلك قال تسمع وتطيع للأمير وإن ضرب ظهرك وأخذ مالك فاسمع...
আমার পর এমন কিছু শাসক আসবে, যারা আমার নির্দেশিত পথে চলবে না, আমার সুন্নাতের অনুসরণ করবে না, অচিরেই তাদের মাঝে এমন কিছু মানুষের উদ্ভব ঘটবে। যারা দেখতে মানুষের মতো হলেও মনটা হবে যেন শয়তানের মনের মতো। হুজাইফা রা. বলেন—ইয়া রাসুল্লাল্লাহ, আমি যদি সেই যুগ পাই, তাহলে আমার কী করণীয়?
তিনি বললেন—শাসকের কথা শুনবে এবং মানবে, যদিও সে তোমাকে মারধর করে, তোমার সম্পদ লুণ্ঠন করে, তবুও তুমি তার কথা শোনো এবং মান্য করো。
এখানে বিদ্রোহ করতে নিষেধ করা হয়েছে। সুতরাং এই তৃতীয় অবস্থাতে বিদ্রোহ করা যাবে না। জুলুম প্রতিহত করার জন্য যে লড়াইয়ের কথা বলা হয়েছে, তার দলিল ওই সকল হাদিস—যেখানে নিজের জান-মালের জন্য লড়াই করার বৈধতা দেওয়া হয়েছে। তবে, যেহেতু এই লড়াইটাও অনেকটা বিদ্রোহের মতো, দীনের কল্যাণ কামনার স্বার্থে তাই লড়াই না করাই উত্তম।
চার. এমন পাপাচার, যা জনগণের ধর্মের ক্ষেত্রে প্রভাব সৃষ্টি করে; যেমন—তাদের গুনাহের করতে বাধ্য করা, এটা 'ইকরাহ' তথা বাধ্য করানোর হুকুমের মতো, যার বিস্তারিত বিবরণ যথাস্থানে আছে। এখানে উল্লেখ করার অবকাশ নেই। এই বাধ্য করানোটা কখনো কখনো স্পষ্টভাবেই কুফুর বলে সাব্যস্ত হবে আবার কখনো কখনো পরোক্ষভাবে সাব্যস্ত হবে। যেমন—কুফুরের বিভিন্ন প্রদর্শনী করা, তার বৈশিষ্ট্যগুলো তুলে ধরা তার আইন-কানুন বাস্তবায়ন করা, ইসলামের বিধিবিধানের ক্ষেত্রে শিথিলতা করা, সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও অপছন্দের কারণে শরিয়তের হুকুম কার্যকর করা থেকে বিরত থাকা, অন্য ধর্মকে শরিয়তের ওপর প্রাধান্য দেওয়া তো এসব কিছু হাদিসে বর্ণিত ‘কুফরে বাওয়াহ’ তথা সুস্পষ্ট কুফুরির শামিল। তখন তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা বৈধ। তবে শর্ত হচ্ছে—সেই জন্য শক্তি এবং প্রতিরোধবাহিনী দুটোই থাকতে হবে, তদ্রুপ শাসকের পর এমন শাসকের নেতৃত্ব পাওয়া যেতে হবে, যার মাঝে নেতৃত্বের শর্ত বিদ্যমান থাকবে। কিন্তু যদি এক জালিম থেকে আরেক জালিমের হাতে নেতৃত্ব আসে কিংবা এ-জন্য আরও বড়ো বড়ো ক্ষতি আসতে পারে, যেমন কাফিররা বিদ্রোহ করার সুযোগে মুসলিমদের ওপর প্রাধান্য বিস্তার করতে পারে, তাহলে এই দুই অবস্থাতে বিদ্রোহ করা যাবে না।
ইমাম নববি রহ. মুসলিম শরিফের হাদিস ২২৫ প্রসংঙ্গে বলেন—এ হাদিস থেকে বোঝা যায় যে, শুধু জুলুম বা পাপাচারের কারণে শাসকদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা যাবে না যদি না তারা ইসলামের কোনো মূলনীতিতে হস্তক্ষেপ করে? আল্লাহই ভালো জানেন।
তিন. শাসনকার্যে দুর্বলতা: বরখাস্ত হওয়ার আরেকটি কারণ হচ্ছে, শাসনকার্যে খলিফার দুর্বল হয়ে যাওয়া। অর্থাৎ এমন কিছু সৃষ্টি হওয়া, যা খলিফার শাসনক্ষমতাকে সীমাবদ্ধ করে ফেলে। অথবা একবারেই অক্ষম করে দেয়। এটা দুই প্রকার— . . এক. হাজর, (প্রভাববিস্তার) দুই. কহর। (জোরপ্রয়োগ) .
أفلا نقاتلهم ؟ قال لا ما صلوا
না কি তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করবো না? নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন—না যতক্ষণ না পর্যন্ত ওরা নামাজ পড়ে।)
টিকাঃ
৪৯০ আহকামুল কুরআন জাসসাস, খণ্ড: ১, পষ্ঠা: ৮৫
২০ আল-জাওয়াহিরুল মদিনা খণ্ড
*** রদ্দুল মুহতার, বাবুল বুগাত
** রদ্দুল মুহতার, বাবুল বুগাত
সূত্র: সহিহ মুসলিম
২২৮ ইমদাদুল ফাতওয়া আশরাফ আলি থানবি রহ..
খলিফা যে কাজে নিজে নিজেস্থ স্ব: পৃষ্ঠা: ১২৪-১৩৫
কোনো কোনো উলামায়ে কিরাম বলেন-কোনো জালিম শাসকের বিরুদ্ধে কোনো অবস্থাতেই বিদ্রোহ করা যাবে না, যতক্ষণ তিনি মুসলিম নাম ধারণ করে আছেন। তবে মুহাক্কিক উলামায়ে কিরামের স্পষ্ট কথা থেকে এটাই প্রতীয়মান হয় যে-জালিম শাসকের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ না করার বিষয়টা এতটা ব্যাপক না যে, কোনো অবস্থাতেই কোনো জালিম শাসকের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা যাবে না; বরং বিষয়টা একটু বিস্তারিত বিবরণের অবকাশ রাখে। ইমাম আবু বকর জাস্সাস রহ. ('আমার প্রতিশ্রুতি জালিমদের নিকট পৌঁছবে না।' সূরা বাকারা, আয়াত: ২৪)-এ আয়াত প্রসঙ্গে বলেন-জালিম ও অত্যাচারী শাসকদের সাথে লড়াইয়ের বৈধতার ব্যাপারে আবু হানিফা রহ.-এর মাজহাব সবচেয়ে প্রসিদ্ধ ছিল, এ-জন্যই ইমাম আউঝায়ি রহ. বলেন-আবু হানিফা রহ. সব কথাকে আমরা (সহিহ হওয়ার) সম্ভাবনাময় মনে করতাম। কিন্তু যখন তিনি তরবারির ক্ষেত্রে অর্থাৎ জালিম শাসকদের সাথে লড়াইয়ের কথা বললেন, তখন আর সেটাকে সম্ভাবনাময় মনে করতে পারি নি। তিনি বলতেন-জালিম শাসককে মুখে 'আমর বিল মারুফ নাহি আনিল মুনকার' তথা সৎকাজের আদেশ অসৎ কাজ হতে নিষেধ করা ফরজ। এরপরও যদি কাজ না হয়, তাহলে তরবারি দিয়ে তাকে আদেশ-নিষেধ করা হবে। তাছাড়া জায়িদ ইবনু আলি রা.-এর ক্ষেত্রে তো তাঁর পদক্ষেপ অর্থাৎ তাকে সম্পদ দিয়ে সাহায্য করা তাকে সাহায্য করা ওয়াজিব বলে মানুষকে গোপনে ফতোয়া প্রদান এবং তার সাথে লড়াই করার ব্যাপারে এসব ক্ষেত্রে আবু হানিফা রহ. খুবই প্রসিদ্ধ। তদ্রুপ মুহাম্মাদ ও ইবরাহিম ইবনু আবদিল্লাহ ইবনি হাসানের সাথেও তিনি এমন করেছেন।
জাস্সাস রহ. জায়িদ ইবনু আলি রহ.-এর কথা বলে যে ঘটনা বোঝাতে চেয়েছেন তা হলো-আব্দুল্লাহ ইবনু মালিক ইবনি সুলাইমান থেকে ইতিহাসবিদরা বর্ণনা করেন, তিনি বলেন-জায়িদ ইবনু আলি রহ. ইমাম আবু হানিফার রহ.-এর কাছে বাইআত গ্রহণের আবেদন জানিয়ে দূত পাঠালেন।
তখন আবু হানিফা রহ. দূতকে বলেন-তার বাবাকে যেমন লোকেরা পরিত্যাগ করেছে, তাকেও সবাই পরিত্যাগ করবে না বলে যদি জানতাম, তাহলে অবশ্যই তার সাথে আমি জিহাদ করতাম। কারণ, তিনি একজন ন্যায়পরায়ণ শাসক। তবে জিহাদ করার পরিবর্তে তাকে আমি সম্পদ দিয়ে সাহায্য করব। তখন তিনি তার উদ্দেশ্যে দশ হাজার দিরহাম দিলেন। আর দূতকে বলে দিলেন-আমার ওজরটা কিন্তু তাকে খুলে বলবে।
আরেক রিওয়াতে আছে, তিনি বলেছেন-তার সামনে ওজর পেশ করো যে, আমি অসুস্থ তবে তার দলে যোগ দিতে কোনো বাধা নেই। আবু হানিফা রহ.-কে জায়িদ ইবনু আলি রহ.-এর সাথে জিহাদ করা সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, এটা বদরের উদ্দেশ্যে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বের হওয়ার মতো হবে।
তখন তাকে জিজ্ঞেস করা হলো-তাহলে আপনি কেন বের হন না?
তিনি বললেন-আমার কাছে থাকা মানুষের আমানতগুলোর কারণে বের হতে পারছি না। সেগুলো ইবনু আবি লাইলার সামনে পেশ করলে সে না করে, তাই আমার আশঙ্কা হচ্ছে-যদি আমি অজ্ঞাত স্থানে মারা যাই, তাহলে তো (আমানতগুলো) ফেরত দিতে পারব না। পরবর্তী সময়ে তিনি যখনই বের না হওয়ার কথা স্মরণ করতেন, খুব কাঁদতেন।
আর মুহাম্মাদ ও তার ভাই ইবরাহিম ইবনু আবদিল্লাহর সাথে আবু হানিফা রহ.-এর ঘটনা হচ্ছে, তারা দুই ভাই খলিফা মানসুরের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে। ইমাম মালিকি রহ. 'মানাকিব' কিতাবে লেখেন—আবু হানিফা রহ. মানুষকে ইবরাহিমের ব্যাপারে উদ্বুদ্ধ করতেন, তাকে অনুসরণ করার আদেশ করতেন। বলা হয়, এ-জন্যই মানসুর আবু হানিফা রহ.-কে বিষ প্রয়োগ করে মেরেছিল।
তো, এ বিষয়ে আয়াত ও হাদিস ফুকাহা ও মুহাদ্দিসিনে কিরামের কথা থেকে যা বোঝা যায়—আল্লাহই ভালো জানেন—পাপাচার মূলত চার প্রকার:
এক. এমন পাপাচার, যা নিজের মাঝেই সীমাবদ্ধ থাকে; যেমন—জিনা ও মদপান। এর হুকুম হচ্ছে, শাসক নিজে নিজেই বরখাস্ত হয়ে যাবেন না, তবে বরখাস্ত হওয়ার মতো কাজ করেছেন। সুতরাং সবার কর্তব্য ফিতনার আশংকা না থাকলে তাকে বরখাস্ত করা, যেমন, ইবনু আবিদিনের কথা পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে যে, শাসক বরখাস্ত হওয়ার উপযুক্ত। তবে এ কারণে তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা যাবে না। কারণ, জানমালের ক্ষয়ক্ষতি হবে। যারা বলেন—ফাসিক বা জালিম শাসকের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা যাবে, না তাদের কথা দ্বারা এ প্রকার পাপাচারই উদ্দেশ্য।
দুই. এমন পাপাচার, যা অন্যদের সম্পদের ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলে, যেমন মানুষের সম্পদ নেওয়ার ক্ষেত্রে জুলুম করা। তবে এগুলো করার সাথে সাথে এমনভাবে ব্যাখ্যাও করে নেন, যা থেকে মনে হয়—পুরোপুরি বৈধ না হলেও বৈধ হওয়ার মতো। যেমন—মানুষের ওপর বিভিন্ন কর চাপিয়ে জাতির কল্যাণের কথা বলেন। এর হুকুমও একই অর্থাৎ এর মাধ্যমে তিনি বরখাস্ত হবেন না, তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা তো দূরের কথা, বরং তার আনুগত্য করা আবশ্যক। যেমন—ইবনু আবিদিন রহ.-এর কথা সামনে আসছে।
তিন. জনগণের ধন-সম্পদের ক্ষেত্রে জুলুম করবেন, কিন্তু এর স্বপক্ষে তার কাছে কোনো ব্যাখ্যাও নেই, যাতে বোঝা যায় যে বৈধ হতে পারে, এক্ষেত্রে হুকুম হচ্ছে যে মাজলুম চাইলে যে কোনো উপায়ে লড়াই করে হলেও নিজের থেকে জুলুম প্রতিহত করবেন, আবার চাইলে ধৈর্যও ধরতে পারেন, এক্ষেত্রে সাওয়াবও পাবে। তবে লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে—এখানে যে লড়াইয়ে কথা বলা হচ্ছে, সেটা দ্বারা বিদ্রোহ করা উদ্দেশ্য নয়। বরং তার জুলুম প্রতিহত করা। এখন শাসক যদি জুলুম থেকে বিরত হন, তাকেও লড়াই থেকে বিরত থাকতে হবে। ইবনু আবিদিন রহ. ফাতহুল কাদিরের রেফারেন্স দিয়ে বলেন—যারা প্রতিহত করতে সক্ষম তাদের ওপর শাসকের সাথে থেকে লড়াই করা ওয়াজিব। তবে শাসক থেকে যদি এমন কিছু প্রকাশ পায়, যা তার বিরুদ্ধে লড়াই করাকে বৈধ করে ফেলে, যেমন তাদের ওপর বা অন্যদের ওপর এমন জুলুম করা, যা জুলুম হওয়ার ব্যাপারে কোনো অস্পষ্টতা নেই, তাহলে তার বিরুদ্ধে লড়াই করা বৈধ। বরং তাদের কর্তব্য মজলুমদের সাহায্য করা, যতক্ষণ না তারা ন্যায়বিচার পায়, শাসক জুলুম বন্ধ করেন।
তবে জুলুম না হওয়ার ব্যাপারে যদি কোনো সন্দেহ থাকে, তাহলে তার বিরুদ্ধে লড়াই বৈধ নয়। যেমন—অনেক কর চাপিয়ে দেওয়া, যার বৈধতা (সামান্য হওয়ার ক্ষেত্রে) শাসকের আছে। কারণ, ব্যাপক ক্ষতি দূর করার জন্য ব্যক্তিগত ক্ষতি তিনি চাপাতে পারেন। এই হুকুম—লড়াইয়ের বৈধতা—ওই মাজলুমের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, যে নিজের থেকে জুলুম রোধ করার জন্য লড়াই করবে।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, তার সাথে অন্য কেউ কি শাসকের বিরুদ্ধে লড়াই করতে পারবে? এক্ষেত্রে উলামায়ে কিরামের বিভিন্ন বক্তব্য পাওয়া যায়। ফাতহুল কাদিরে উল্লেখ করা হয়েছে যে, তার ওপর বরং ওয়াজিব এই মাজলুমকে সাহায্য করা, যতক্ষণ না শাসক ইনসাফের পথে ফিরে আসেন। যেমন ইতিপূর্বে ফাতহুল কাদিরের রেফারেন্স দিয়ে রদ্দুল মুহতারে বলা হয়েছে। তবে জামিউল ফুসুলিয়্যিন, মুবতাগা এবং সিরাজ গ্রন্থে বলা হয়েছে—অন্যদের জন্য সমীচীন নয়, না সুলতানকে সাহায্য করা, আর না মাজলুমকে। আর ইবনু আবিদিন দুই কথা একত্র করে বলেন যে—তখন যদি এর ফলে বিদ্রোহের আশংকা না থাকে, মাজলুমকে সাহায্য করা ওয়াজিব। অন্যথায় নয়। এ-অবস্থায়, সবর করাটা উত্তম বলা হয়েছে হুজাইফা ইবনু ইয়ামান রা.-এর হাদিসের ভিত্তিতে। সেখানে আছে—
يكون بعدي أئمة لا يهتدون بهداي ولا يستنون بسنتي وسيقوم فيهم رجال قلوبهم قلوب الشياطين في جثمان قال قلت كيف أصنع يا رسول الله إن أدركت ذلك قال تسمع وتطيع للأمير وإن ضرب ظهرك وأخذ مالك فاسمع...
আমার পর এমন কিছু শাসক আসবে, যারা আমার নির্দেশিত পথে চলবে না, আমার সুন্নাতের অনুসরণ করবে না, অচিরেই তাদের মাঝে এমন কিছু মানুষের উদ্ভব ঘটবে। যারা দেখতে মানুষের মতো হলেও মনটা হবে যেন শয়তানের মনের মতো। হুজাইফা রা. বলেন—ইয়া রাসুল্লাল্লাহ, আমি যদি সেই যুগ পাই, তাহলে আমার কী করণীয়?
তিনি বললেন—শাসকের কথা শুনবে এবং মানবে, যদিও সে তোমাকে মারধর করে, তোমার সম্পদ লুণ্ঠন করে, তবুও তুমি তার কথা শোনো এবং মান্য করো。
এখানে বিদ্রোহ করতে নিষেধ করা হয়েছে। সুতরাং এই তৃতীয় অবস্থাতে বিদ্রোহ করা যাবে না। জুলুম প্রতিহত করার জন্য যে লড়াইয়ের কথা বলা হয়েছে, তার দলিল ওই সকল হাদিস—যেখানে নিজের জান-মালের জন্য লড়াই করার বৈধতা দেওয়া হয়েছে। তবে, যেহেতু এই লড়াইটাও অনেকটা বিদ্রোহের মতো, দীনের কল্যাণ কামনার স্বার্থে তাই লড়াই না করাই উত্তম।
চার. এমন পাপাচার, যা জনগণের ধর্মের ক্ষেত্রে প্রভাব সৃষ্টি করে; যেমন—তাদের গুনাহের করতে বাধ্য করা, এটা 'ইকরাহ' তথা বাধ্য করানোর হুকুমের মতো, যার বিস্তারিত বিবরণ যথাস্থানে আছে। এখানে উল্লেখ করার অবকাশ নেই। এই বাধ্য করানোটা কখনো কখনো স্পষ্টভাবেই কুফুর বলে সাব্যস্ত হবে আবার কখনো কখনো পরোক্ষভাবে সাব্যস্ত হবে। যেমন—কুফুরের বিভিন্ন প্রদর্শনী করা, তার বৈশিষ্ট্যগুলো তুলে ধরা তার আইন-কানুন বাস্তবায়ন করা, ইসলামের বিধিবিধানের ক্ষেত্রে শিথিলতা করা, সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও অপছন্দের কারণে শরিয়তের হুকুম কার্যকর করা থেকে বিরত থাকা, অন্য ধর্মকে শরিয়তের ওপর প্রাধান্য দেওয়া তো এসব কিছু হাদিসে বর্ণিত ‘কুফরে বাওয়াহ’ তথা সুস্পষ্ট কুফুরির শামিল। তখন তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা বৈধ। তবে শর্ত হচ্ছে—সেই জন্য শক্তি এবং প্রতিরোধবাহিনী দুটোই থাকতে হবে, তদ্রুপ শাসকের পর এমন শাসকের নেতৃত্ব পাওয়া যেতে হবে, যার মাঝে নেতৃত্বের শর্ত বিদ্যমান থাকবে। কিন্তু যদি এক জালিম থেকে আরেক জালিমের হাতে নেতৃত্ব আসে কিংবা এ-জন্য আরও বড়ো বড়ো ক্ষতি আসতে পারে, যেমন কাফিররা বিদ্রোহ করার সুযোগে মুসলিমদের ওপর প্রাধান্য বিস্তার করতে পারে, তাহলে এই দুই অবস্থাতে বিদ্রোহ করা যাবে না।
ইমাম নববি রহ. মুসলিম শরিফের হাদিস ২২৫ প্রসংঙ্গে বলেন—এ হাদিস থেকে বোঝা যায় যে, শুধু জুলুম বা পাপাচারের কারণে শাসকদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা যাবে না যদি না তারা ইসলামের কোনো মূলনীতিতে হস্তক্ষেপ করে? আল্লাহই ভালো জানেন।
তিন. শাসনকার্যে দুর্বলতা: বরখাস্ত হওয়ার আরেকটি কারণ হচ্ছে, শাসনকার্যে খলিফার দুর্বল হয়ে যাওয়া। অর্থাৎ এমন কিছু সৃষ্টি হওয়া, যা খলিফার শাসনক্ষমতাকে সীমাবদ্ধ করে ফেলে। অথবা একবারেই অক্ষম করে দেয়। এটা দুই প্রকার— . . এক. হাজর, (প্রভাববিস্তার) দুই. কহর। (জোরপ্রয়োগ) .
أفلا نقاتلهم ؟ قال لا ما صلوا
না কি তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করবো না? নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন—না যতক্ষণ না পর্যন্ত ওরা নামাজ পড়ে।)
টিকাঃ
৪৯০ আহকামুল কুরআন জাসসাস, খণ্ড: ১, পষ্ঠা: ৮৫
২০ আল-জাওয়াহিরুল মদিনা খণ্ড
*** রদ্দুল মুহতার, বাবুল বুগাত
** রদ্দুল মুহতার, বাবুল বুগাত
সূত্র: সহিহ মুসলিম
২২৮ ইমদাদুল ফাতওয়া আশরাফ আলি থানবি রহ..
খলিফা যে কাজে নিজে নিজেস্থ স্ব: পৃষ্ঠা: ১২৪-১৩৫
📄 জালিম শাসক পদচ্যুত করার নিরাপদ পদ্ধতি
নিরাপদ পদ্ধতি হচ্ছে— প্রথমে আহলুল হিল্লি ওয়াল আকদ (নির্বাচন কমিশন)— যারা তার হাতে বাইআত গ্রহণ করেছে—জালিম শাসকের কাছে উপস্থিত হবে। তাকে নসিহত করবে। হক থেকে বিচ্যুতির পরিণাম সম্পর্কে সতর্ক করবে। তারপর কয়েকদিন সুযোগ দেবে এবং সবর করবে। হয়তো বা এতে তিনি জুলুম স্বেচ্ছাচার থেকে ফিরে আসবেন; কিন্তু তিনি যদি এমনটা বারবার করতেই থাকেন, তাহলে তাদের কর্তব্য হলো—যথাসম্ভব তার পদচ্যুতির জন্য যথাসময়ে সবকিছুর ব্যবস্থা করবে। তবে শর্ত হচ্ছে—যে ক্ষতি রোধ করার জন্য এত সব করা হচ্ছে, এর কারণে যেন আরও বড়ো ক্ষতি না চলে আসে; কারণ, তাকে পদচ্যুত করাও একপ্রকার ‘নাহি আনিল মুনকার’ অসৎ কাজ হতে নিষেধ আর কখনো অসৎ কাজ তার চেয়ে বড়ো অসৎ কাজ দিয়ে দূর করা যায় না। এ-জন্যই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম এই অবস্থায় সবর করতে বলেছেন। ইবনু আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন-
من كره من أميره شيئا فليصبر فإنه من خرج من السلطان شبرا مات ميتة جاهلية...
কেউ যদি তার শাসক থেকে কোনো কিছু অপছন্দ করে, তাহলে সে যেন সবর করে। কারণ, কেউ যদি শাসকের আনুগত্য থেকে সামান্যও বের হয়ে যায়, তাহলে সে যেন জাহিলি মৃত্যুবরণ করলেন।
আব্দুল্লাহ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমাদের রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন-
انكم سترون بعدي أثرة وأمور تنكرونها قالوا فما تأمرنا يا رسول الله قال أدوا إليهم حقهم وسلوا الله حقكم
আমার পর তোমরা পক্ষপাতিত্ব-সহ আরও কিছু বিষয় দেখতে পাবে, যা অস্বীকার করবে। তারা বললেন-তাহলে ইয়া রাসুলুল্লাহ, আমাদের আপনি কী আদেশ করেন? তিনি বললেন-তোমরা তাদের হক আদায় করো, আর তোমাদের হক আল্লাহর কাছেপ্রার্থনা করো।
এর থেকে আরও নিরাপদ পদ্ধতি হচ্ছে-যদি মুসলিম উম্মাহ এ অনুযায়ী আমল করে, যার দিকে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইঙ্গিত করেছেন )انما الطاعه في المعروف -কল্যাণ ও সৎ কাজের ক্ষেত্রেই আনুগত্য) বলে; কারণ, জনগণ যদি জুলুমের ক্ষেত্রে তার আনুগত্য থেকে বিরত থাকে, তাহলে সে হকের পথে ফিরে আসতে, ইসলামি শরিয়ত বাস্তবায়ন করতে বাধ্য। যেমন কাজিরা যদি শরিয়তবিরোধী কোনো হুকুম বাস্তবায়ন না করে, শাসনকাজে নিয়োজিত কর্মকর্তারা যদি আল্লাহর আদেশ বিরোধ কাজ না করে, ব্যাংক মালিকরা যদি সুদব্যবস্থা পরিহার করে, সাধারণ জনগণ যদি হারাম ব্যবসা থেকে বিরত থাকে, সুদভিত্তিক ব্যাংকে টাকা জমা রাখা থেকে বিরত থাকে, মোটকথা, প্রত্যেক মুসলিম যদি শরিয়তবিরোধী যে কোনো হুকুমের সামনে মাথানত করা থেকে অস্বীকৃতি জানায়, তাহলে শাসক আপনা আপনিতেই ইসলামি শরিয়তবিরোধী মানবরচিত বিধিবিধান উপেক্ষা করতে বাধ্য হবে। প্রচলিত শাসনব্যবব্যবস্থাকে শরিয়তের দিকে নিয়ে আসার এটা শরিয়তসম্মত পদ্ধতি।
পক্ষান্তরে বর্তমানে মানুষ পাশ্চাত্য থেকে শেখে। এ-জন্য যা যা করে, অর্থাৎ রাস্তাঘাট আটকে রেখে হরতাল করা, রাষ্ট্রীয় সম্পদ নষ্ট করা, আগুন জ্বালিয়ে দেওয়া—ইসলামে কোনোই স্থান নেই এগুলোর। আল্লাহ তাআলাই ভালো জানেন。
টিকাঃ
২০০ সূত্র: সহিহ বুখারি
*** সূত্র: সহিহ বুখাবি
নিরাপদ পদ্ধতি হচ্ছে— প্রথমে আহলুল হিল্লি ওয়াল আকদ (নির্বাচন কমিশন)— যারা তার হাতে বাইআত গ্রহণ করেছে—জালিম শাসকের কাছে উপস্থিত হবে। তাকে নসিহত করবে। হক থেকে বিচ্যুতির পরিণাম সম্পর্কে সতর্ক করবে। তারপর কয়েকদিন সুযোগ দেবে এবং সবর করবে। হয়তো বা এতে তিনি জুলুম স্বেচ্ছাচার থেকে ফিরে আসবেন; কিন্তু তিনি যদি এমনটা বারবার করতেই থাকেন, তাহলে তাদের কর্তব্য হলো—যথাসম্ভব তার পদচ্যুতির জন্য যথাসময়ে সবকিছুর ব্যবস্থা করবে। তবে শর্ত হচ্ছে—যে ক্ষতি রোধ করার জন্য এত সব করা হচ্ছে, এর কারণে যেন আরও বড়ো ক্ষতি না চলে আসে; কারণ, তাকে পদচ্যুত করাও একপ্রকার ‘নাহি আনিল মুনকার’ অসৎ কাজ হতে নিষেধ আর কখনো অসৎ কাজ তার চেয়ে বড়ো অসৎ কাজ দিয়ে দূর করা যায় না। এ-জন্যই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম এই অবস্থায় সবর করতে বলেছেন। ইবনু আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন-
من كره من أميره شيئا فليصبر فإنه من خرج من السلطان شبرا مات ميتة جاهلية...
কেউ যদি তার শাসক থেকে কোনো কিছু অপছন্দ করে, তাহলে সে যেন সবর করে। কারণ, কেউ যদি শাসকের আনুগত্য থেকে সামান্যও বের হয়ে যায়, তাহলে সে যেন জাহিলি মৃত্যুবরণ করলেন।
আব্দুল্লাহ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমাদের রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন-
انكم سترون بعدي أثرة وأمور تنكرونها قالوا فما تأمرنا يا رسول الله قال أدوا إليهم حقهم وسلوا الله حقكم
আমার পর তোমরা পক্ষপাতিত্ব-সহ আরও কিছু বিষয় দেখতে পাবে, যা অস্বীকার করবে। তারা বললেন-তাহলে ইয়া রাসুলুল্লাহ, আমাদের আপনি কী আদেশ করেন? তিনি বললেন-তোমরা তাদের হক আদায় করো, আর তোমাদের হক আল্লাহর কাছেপ্রার্থনা করো।
এর থেকে আরও নিরাপদ পদ্ধতি হচ্ছে-যদি মুসলিম উম্মাহ এ অনুযায়ী আমল করে, যার দিকে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইঙ্গিত করেছেন )انما الطاعه في المعروف -কল্যাণ ও সৎ কাজের ক্ষেত্রেই আনুগত্য) বলে; কারণ, জনগণ যদি জুলুমের ক্ষেত্রে তার আনুগত্য থেকে বিরত থাকে, তাহলে সে হকের পথে ফিরে আসতে, ইসলামি শরিয়ত বাস্তবায়ন করতে বাধ্য। যেমন কাজিরা যদি শরিয়তবিরোধী কোনো হুকুম বাস্তবায়ন না করে, শাসনকাজে নিয়োজিত কর্মকর্তারা যদি আল্লাহর আদেশ বিরোধ কাজ না করে, ব্যাংক মালিকরা যদি সুদব্যবস্থা পরিহার করে, সাধারণ জনগণ যদি হারাম ব্যবসা থেকে বিরত থাকে, সুদভিত্তিক ব্যাংকে টাকা জমা রাখা থেকে বিরত থাকে, মোটকথা, প্রত্যেক মুসলিম যদি শরিয়তবিরোধী যে কোনো হুকুমের সামনে মাথানত করা থেকে অস্বীকৃতি জানায়, তাহলে শাসক আপনা আপনিতেই ইসলামি শরিয়তবিরোধী মানবরচিত বিধিবিধান উপেক্ষা করতে বাধ্য হবে। প্রচলিত শাসনব্যবব্যবস্থাকে শরিয়তের দিকে নিয়ে আসার এটা শরিয়তসম্মত পদ্ধতি।
পক্ষান্তরে বর্তমানে মানুষ পাশ্চাত্য থেকে শেখে। এ-জন্য যা যা করে, অর্থাৎ রাস্তাঘাট আটকে রেখে হরতাল করা, রাষ্ট্রীয় সম্পদ নষ্ট করা, আগুন জ্বালিয়ে দেওয়া—ইসলামে কোনোই স্থান নেই এগুলোর। আল্লাহ তাআলাই ভালো জানেন。
টিকাঃ
২০০ সূত্র: সহিহ বুখারি
*** সূত্র: সহিহ বুখাবি
📄 নেতৃত্বে আবেদন করা
কোনো বুঝমান মুসলিমের উচিত নয়—নিজে আগ বেড়ে নেতৃত্ব চাওয়া। নেতৃত্বের জন্য সব ধরনের চেষ্টা ও দৌড়ঝাঁপ করা নিষেধ। কারণ, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আগে বেড়ে নেতৃত্ব চাওয়ার ভয়ংকর পরিণাম বিভিন্ন হাদিসে বলে গেছেন। তিনি বলেন—
إنكم ستحرصون على الإمارة يوم القيامة وستكون ندامة يوم القيامة فليعمل المرضعة وبئس الفاطمة
অচিরেই তোমরা নেতৃত্বের জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠবে। তবে কিয়ামতের দিন এর জন্য কতইনা আফসোস হবে। নেতার প্রথম অবস্থা তো অনেক ভালো থাকবে, কিন্তু শেষ অবস্থা কতই না ভয়ংকর。
‘এর জন্য কতইনা আফসোস হবে’—এই কথা দ্বারা বোঝা যায়, নেতৃত্ব চেয়ে নেওয়া ব্যক্তি সেদিন তার এই চেয়ে নেওয়া নেতৃত্বের জন্য খুবই আফসোস করবে। এটা দ্বারা ইঙ্গিত পাওয়া যায়—শাসক ইনসাফ না করলে এই নেতৃত্ব চাওয়াটা তার মন্দ পরিণামের কারণ হবে। আল্লামা আইনি রহ. বলেন—নেতৃত্বটা তার জন্য আফসোসের কারণ হবে। অর্থাৎ যে নেতৃত্বের দাবিনুযায়ী কাজ করে নি।
‘তার প্রথম অবস্থাটা ভালো হবে’; কারণ, তার সাথে তখন সম্পদ, খ্যাতি ও স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ জীবনযাপন—সবই থাকে, আর ‘শেষ অবস্থাটা বড়োই করুণ হবে’; কারণ, কখনো কখনো তাকে লড়াই-বিদ্রোহের সীকার হতে হবে, কখনো পদচ্যুত করা হবে। আর আখিরাতে প্রত্যেকটা জিনিসের হিসাব তো আছেই।
ইমাম দাউদি রহ. বলেন—হাদিসের অর্থ, তার প্রথম অবস্থা, অর্থাৎ দুনিয়ার অবস্থা কতইনা ভালো হবে, আর শেষ অবস্থা, অর্থাৎ মৃত্যু পরবর্তী অবস্থা কতইনা বিপদজনক হবে। কারণ, প্রত্যেকটা বিষয়ে তাকে হিসাব দিতে হবে। ফলে তার অবস্থা শিশুর মতো হবে, যার প্রয়োজন শেষ হওয়ার পূর্বেই দুধ বন্ধ করে দেওয়া হয়। ফলে তার ক্ষতির কারণ হয়।
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরও বলেন-
يا عبد الرحمن بن سمرة، لا تسأل الإمارة فان أوتيتها عن مسألة وكلت إليها وإن أوتيتها من غير مسألة أعنت عليها
আব্দুর রহমান ইবনু সামুরা, শোনো, তুমি কখনো নিজে আগে বেড়ে নেতৃত্ব চেয়ো না। কারণ, তোমার চাওয়ার ভিত্তিতে যদি দেওয়া হয়, তাহলে তোমাকে নেতৃত্বের ওপর নির্ভরশীল করে দেওয়া হবে। আর চাওয়া ছাড়া দেওয়া হলে তোমাকে সাহায্য করা হবে।
আবু হুরাইরা রা. থেকে বর্ণিত, উমার রা. তাকে রাষ্ট্রীয় কোনো কাজে নিযুক্ত করার জন্য ডাকলে তিনি অস্বীকার করেন। তখন উমার রা. বললেন, আপনি কি রাষ্ট্রীয় কাজ করতে অপছন্দ করছেন? অথচ আপনার চেয়ে উত্তম ব্যক্তি এই কাজ তলব করেছেন।
তিনি জিজ্ঞাসা করলেন-কে তিনি?
উমার রা. বললেন-ইউসুফ ইবনু ইয়াকুব আ.।
তখন আবু হুরাইরা রা. বললেন-ইউসুফ আ. তো ছিলেন, নবীর পুত্র নবী। আর আমি হচ্ছি আবু হুরাইয়রা ইবনু উমাইয়্যা! তো, আমি দুটো বা তিনটা জিনিসের আশংকা করি।
উমার রা. বললেন-(পূর্বে) আপনি না বললেন পাঁচটা?।
তিনি বললেন-(হ্যাঁ) (সেগুলো হচ্ছে):
* ০১. না জেনে কথা বলে ফেলব;
* ০২. না-হক ফায়সালা করবে;
* ০৩. আমাকে বেত্রাঘাত করা হবে;
* ০৪. আমার সম্পদ ছিনিয়ে নেওয়া হওয়া হবে;
* ০৫. আমার ইজ্জতের লুণ্ঠন করা হবে।
পক্ষান্তরে যদি তার সামনে নেতৃত্ব বা বিচারব্যবব্যবস্থা পেশ করা হয়, তাহলে তিনি গ্রহণ করবেন কি করবেন না-এক্ষেত্রে পাঁচটা দিক :
* ০১. ওয়াজিব : তিনি একাই উপযুক্ত, অন্য কেউ নেই।
০২. মুসতাহাব : আরও অনেকে আছে তবে তিনি বেশি উপযুক্ত।
০৩. ইচ্ছাপ্রাপ্ত : চাইলে গ্রহণ করবেন অন্যথায় নয়:- তিনিসহ অন্যান্যরা সমানযোগ্য।
০৪. মাকরুহ : তিনি উপযুক্ত তবে তার চেয়ে আরও বেশি যোগ্য আছে।
০৫. হারাম : তিনি বুঝতে পারছেন যে, এই কাজ তার দ্বারা হবে না, তিনি ইনসাফ করতে পারবেন না। কারণ, তার মাঝে খাহেশাতের অনুসরণ প্রবল。
টিকাঃ
২০৬ উমদাতুল কারি, খণ্ড: ২৪, পৃষ্ঠা: ২২৭
**সূত্র: আবু নুআইম
কোনো বুঝমান মুসলিমের উচিত নয়—নিজে আগ বেড়ে নেতৃত্ব চাওয়া। নেতৃত্বের জন্য সব ধরনের চেষ্টা ও দৌড়ঝাঁপ করা নিষেধ। কারণ, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আগে বেড়ে নেতৃত্ব চাওয়ার ভয়ংকর পরিণাম বিভিন্ন হাদিসে বলে গেছেন। তিনি বলেন—
إنكم ستحرصون على الإمارة يوم القيامة وستكون ندامة يوم القيامة فليعمل المرضعة وبئس الفاطمة
অচিরেই তোমরা নেতৃত্বের জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠবে। তবে কিয়ামতের দিন এর জন্য কতইনা আফসোস হবে। নেতার প্রথম অবস্থা তো অনেক ভালো থাকবে, কিন্তু শেষ অবস্থা কতই না ভয়ংকর。
‘এর জন্য কতইনা আফসোস হবে’—এই কথা দ্বারা বোঝা যায়, নেতৃত্ব চেয়ে নেওয়া ব্যক্তি সেদিন তার এই চেয়ে নেওয়া নেতৃত্বের জন্য খুবই আফসোস করবে। এটা দ্বারা ইঙ্গিত পাওয়া যায়—শাসক ইনসাফ না করলে এই নেতৃত্ব চাওয়াটা তার মন্দ পরিণামের কারণ হবে। আল্লামা আইনি রহ. বলেন—নেতৃত্বটা তার জন্য আফসোসের কারণ হবে। অর্থাৎ যে নেতৃত্বের দাবিনুযায়ী কাজ করে নি।
‘তার প্রথম অবস্থাটা ভালো হবে’; কারণ, তার সাথে তখন সম্পদ, খ্যাতি ও স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ জীবনযাপন—সবই থাকে, আর ‘শেষ অবস্থাটা বড়োই করুণ হবে’; কারণ, কখনো কখনো তাকে লড়াই-বিদ্রোহের সীকার হতে হবে, কখনো পদচ্যুত করা হবে। আর আখিরাতে প্রত্যেকটা জিনিসের হিসাব তো আছেই।
ইমাম দাউদি রহ. বলেন—হাদিসের অর্থ, তার প্রথম অবস্থা, অর্থাৎ দুনিয়ার অবস্থা কতইনা ভালো হবে, আর শেষ অবস্থা, অর্থাৎ মৃত্যু পরবর্তী অবস্থা কতইনা বিপদজনক হবে। কারণ, প্রত্যেকটা বিষয়ে তাকে হিসাব দিতে হবে। ফলে তার অবস্থা শিশুর মতো হবে, যার প্রয়োজন শেষ হওয়ার পূর্বেই দুধ বন্ধ করে দেওয়া হয়। ফলে তার ক্ষতির কারণ হয়।
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরও বলেন-
يا عبد الرحمن بن سمرة، لا تسأل الإمارة فان أوتيتها عن مسألة وكلت إليها وإن أوتيتها من غير مسألة أعنت عليها
আব্দুর রহমান ইবনু সামুরা, শোনো, তুমি কখনো নিজে আগে বেড়ে নেতৃত্ব চেয়ো না। কারণ, তোমার চাওয়ার ভিত্তিতে যদি দেওয়া হয়, তাহলে তোমাকে নেতৃত্বের ওপর নির্ভরশীল করে দেওয়া হবে। আর চাওয়া ছাড়া দেওয়া হলে তোমাকে সাহায্য করা হবে।
আবু হুরাইরা রা. থেকে বর্ণিত, উমার রা. তাকে রাষ্ট্রীয় কোনো কাজে নিযুক্ত করার জন্য ডাকলে তিনি অস্বীকার করেন। তখন উমার রা. বললেন, আপনি কি রাষ্ট্রীয় কাজ করতে অপছন্দ করছেন? অথচ আপনার চেয়ে উত্তম ব্যক্তি এই কাজ তলব করেছেন।
তিনি জিজ্ঞাসা করলেন-কে তিনি?
উমার রা. বললেন-ইউসুফ ইবনু ইয়াকুব আ.।
তখন আবু হুরাইরা রা. বললেন-ইউসুফ আ. তো ছিলেন, নবীর পুত্র নবী। আর আমি হচ্ছি আবু হুরাইয়রা ইবনু উমাইয়্যা! তো, আমি দুটো বা তিনটা জিনিসের আশংকা করি।
উমার রা. বললেন-(পূর্বে) আপনি না বললেন পাঁচটা?।
তিনি বললেন-(হ্যাঁ) (সেগুলো হচ্ছে):
* ০১. না জেনে কথা বলে ফেলব;
* ০২. না-হক ফায়সালা করবে;
* ০৩. আমাকে বেত্রাঘাত করা হবে;
* ০৪. আমার সম্পদ ছিনিয়ে নেওয়া হওয়া হবে;
* ০৫. আমার ইজ্জতের লুণ্ঠন করা হবে।
পক্ষান্তরে যদি তার সামনে নেতৃত্ব বা বিচারব্যবব্যবস্থা পেশ করা হয়, তাহলে তিনি গ্রহণ করবেন কি করবেন না-এক্ষেত্রে পাঁচটা দিক :
* ০১. ওয়াজিব : তিনি একাই উপযুক্ত, অন্য কেউ নেই।
০২. মুসতাহাব : আরও অনেকে আছে তবে তিনি বেশি উপযুক্ত।
০৩. ইচ্ছাপ্রাপ্ত : চাইলে গ্রহণ করবেন অন্যথায় নয়:- তিনিসহ অন্যান্যরা সমানযোগ্য।
০৪. মাকরুহ : তিনি উপযুক্ত তবে তার চেয়ে আরও বেশি যোগ্য আছে।
০৫. হারাম : তিনি বুঝতে পারছেন যে, এই কাজ তার দ্বারা হবে না, তিনি ইনসাফ করতে পারবেন না। কারণ, তার মাঝে খাহেশাতের অনুসরণ প্রবল。
টিকাঃ
২০৬ উমদাতুল কারি, খণ্ড: ২৪, পৃষ্ঠা: ২২৭
**সূত্র: আবু নুআইম