📄 খলিফার যে-সব দায়িত্ব
খলিফা রাষ্ট্রের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ একজন দায়িত্বশীল। যে কারণে তার দায়-দায়িত্বের সীমা-পরিসীমাও অনেক বেশি। আমরা এখানে তার দায়িত্বগুলো দেখব—
০১. দ্বীনের হিফাজত : এটা দুই পদ্ধতিতে হবে—
প্রথম পদ্ধতি : দ্বীনের বিভিন্ন হক রক্ষা করার মাধ্যমে, মুসলিমদের মাঝে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে দেওয়ার মাধ্যমে তবে সেটা ওইভাবে হতে হবে যেভাবে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের কাছে পৌঁছিয়েছেন, যে পন্থায় সাহাবায়ে কিরাম দ্বীনের হক-সমূহ রক্ষা করেছেন এবং পরবর্তীদের কাছে অর্পন করেছেন, যেভাবে সর্ব সম্মতিক্রমে নিযুক্ত খলিফারা এর ব্যাখ্যা করেছেন। আবু ইয়ালা রহ. বলেন— খলিফার ওপর দ্বীন রক্ষা করা কর্তব্য ওই নিয়ম-নীতির আলোকে, যার ওপর সালাফে সালিহিন একমত পোষণ করেন। এখন কারও যদি দ্বীনের বিষয়ে সন্দেহ জাগে, তাহলে তার সামনে তিনি প্রমাণ পেশ করবেন, সঠিকটা স্পষ্ট করবেন। যে সকল বিধিবিধান ও শাস্তি আছে সেগুলো প্রয়োগ করবেন যাতে দ্বীন ভুল ত্রুটি থেকে মুক্ত থাকে, মানুষও বিভ্রান্তি থেকে রক্ষিত থাকে。
এটা তখনই করা সম্ভব যখন বিদআতিদের বাধা দেওয়া যাবে, উলামায়ে হককে সাহায্য করা হবে দ্বীনি মাদরাসা কায়েম করা হবে, দ্বীনি ইলম ব্যাপকভাবে প্রচার করা হবে, এই ইলমকে প্রচলিত জ্ঞান-বিজ্ঞানের ওপর প্রাধান্য দেওয়া হবে।
দ্বিতীয় পদ্ধতি : দ্বীন হিফাজতের দ্বিতীয় পদ্ধতি হলো ইসলামের বিধিবিধান বাস্তবায়ন করা। এটা তখনই সফল হবে যখন মানুষের যাবতীয় পারষ্পরিক লেনদেন ও অন্যান্য ক্ষেত্রে শরিয়তের আহকাম প্রয়োগ করা হবে, মানুষকে শরিয়তের সীমালঙ্ঘন থেকে বিরত রাখবে, আল্লাহ তাআলার আদেশ পালন করবে, এসব বিষয়ে তাদের উদ্বুদ্ধ করা হবে, অবাধ্যদের শাস্তির আওতায় আনা হবে, সমাজ থেকে অন্যায়-দুর্নীতি, বিশৃঙ্খলা দূর করতে হবে। কারণ, সক্ষমতা থাকলেও অন্যায় বিশৃঙ্খলা দূর না করে দ্বীনের হিফাজত কখনোই সম্ভব না। আবু ইয়ালা রহ. বলেন— খলিফার কর্তব্য বিবাদের মাঝে শরিয়তের যে বিধিবিধান আছে সেগুলো প্রয়োগ করা, তাদের ঝগড়া নিরসন করা, যাতে সুবিচার করা সম্ভব হয়, তাহলে কোনো জালিমও শক্তি ‘প্রদর্শন’ করতে আসার সাহস করবে না, মজলুমকেও দুর্বল নিরুপায় হতে হবে না। প্রয়োজন দেখা দিলে হদও কায়েম করবে। যাতে কেউ আল্লাহ তাআলার নিষিদ্ধ বিষয়সমূহ ভঙ্গ করা, অসম্মানি করা থেকে রক্ষা করা যা এবং যাতে বান্দাদের হকও অযথায় বিফলে না যায়।
০২. দ্বীন মোতাবেক দুনিয়া পরিচালনা : এটা দ্বারা উদ্দেশ্য, শরিয়াহ মোতাবেক দুনিয়াবি বিষয় কার্যকর করা ও জনগণের দেখভাল করা; যা ইসলামি খিলাফতের বড়ো এবং মৌলিক একটি উদ্দেশ্য। এই পরিচালনার কিছু গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র—
এক. জনগণের মাঝে ইনসাফ ও ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা করা। ইয়াজ ইবনু হিমার থেকে বর্ণিত, যে নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আইলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন—
اهل الجنه ثلاثه موفق ورجل رحيم رقيق القلب بكل ذي قربى ومسلم ورجل فقير عفيف متصدق...
তিন শ্রেণির মানুষ জান্নাতবাসী হবে— * (এক) ন্যায়-বিচারক যে (বিবাদীদের মাঝে) মিল করে দেয় * (দুই) কোমল হৃদয়ের অধিকারী, নিকট আত্মীয় হোক অন্যান্য মুসলিম ভাই হোক সবার প্রতি দয়ালু * (তিন) দরিদ্র ব্যক্তি (গুনাহ থেকে) পবিত্র (সামান্য হলেও) দান ছদকা করে।
দ্বীন মোতাবেক রাষ্ট্র-পরিচালনার বড়ো একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ন্যায়বিচার কায়েম করা, ইনসাফ ছাড়া কোনো ইসলামি রাষ্ট্র টিকে থাকতে পারে না। এটা হারানো মানে ওই জাতির বাকি থাকার অধিকার বিলুপ্ত। রাসুল-প্রেরণেরও বড়ো একটি উদ্দেশ্য ইনসাফ কায়েম করা। কারণ, এর মাধ্যমেই উম্মতকে পুতঃপবিত্র করা সম্ভব। ইউনুস ইবনু মাইসারা ইবনি হালস থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, মাসলামা ইবনু মুখাল্লাদ মিসরে থাকা অবস্থায় মুআবিয়া রা. তার কাছে পত্র লিখে বলেন, আব্দুল্লাহ ইবনু উমারকে জিজ্ঞাসা করো, তিনি কি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছেন-
لا يقدس الله أمة لا يقضى فيها بالحق و يأخذ الضعيف حقه من القوي غير مضطهد
(আল্লাহ তাআলা ওই জাতিকে কখনো পবিত্র করবেন না, যাদের মাঝে ন্যায়বিচার করা হয় না, যেখানে দুর্বল নিজের হক জুলুম নির্যাতনের শিকার হয়ে আদায় করতে হয়।)
তো, আব্দুল্লাহ ইবনু উমার যদি তোমাকে বলে যে, তিনি রাসুল্লাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে এ হাদিস শুনেছেন, তাহলে তাকে বলো—তিনি যেন ডাক-বিভাগ থেকে বাহনে করে আমার কাছে চলে আসেন।
তিনি বলেন, ঠিক আছে। তখন তিনি পত্র প্রেরণ করলেন, আর ইবনু উমার রা. ডাক বিভাগের বাহনে করে মুআবিয়া রা.-এর কাছে এলেন। তারপর ওই হাদিসের ব্যাপারে বলেন—আমি রাসুল্লাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে ওই হাদিস বলতে শুনেছি। তখন মুআবিয়া রা. বললেন—তোমার মতো আমিও শুনেছি。
দুই. নিরাপত্তা ব্যবস্থা করা।
মুসলিম শাসকদের ওপর কর্তব্য, একইসাথে খিলাফাতে ইসলামিয়্যার বড়ো একটি উদ্দেশ্য দারুল ইসলামের নিরাপত্তা ব্যবস্থা করা। যাতে জনগণের জান, মাল ও ইজ্জত নিরাপদ থাকে। যেন দারুল ইসলামের এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্তে সবাই নিশ্চিন্ত মনে নিঃশঙ্কায় বিচরণ করতে পারে। আদি ইবনু হাতেম রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন-আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে বসা ছিলাম। এমন সময় এক লোক এসে তার কাছে দারিদ্রের কথা বলল, তারপর আরেকজন এসে ডাকাত-রাহাজানির অভিযোগ করল, তখন নবীজি বললেন-
يا عدي، هل رأيت الحيرة قلت لم أرها وقد مات عنها قال فإن طالت بك حياة لترين ترتحل من الحيرة حتى تطوف بالكعبة لا تخاف أحدا الا الله
আচ্ছা আদি, তুমি কি হিরা অঞ্চল চেন? আমি বললাম-না, তবে নাম শুনেছি। তিনি বললেন, যদি দীর্ঘ হায়াত পাও, তাহলে দেখতে পাবে- উটে আরোহণ করে হিরা থেকে একজন নারী সফর করে কাবা তাওয়াফ করবে, আল্লাহ ছাড়া (পথে) আর কারও ভয় থাকবে না。
এই উদ্দেশ্য পূর্ণাঙ্গভাবে তখনই বাস্তবায়িত হবে যখন নিরাপত্তা ভঙ্গকারীদের ও স্বেচ্ছাচারীদের শাস্তির আওতায় নিয়ে আনা হবে। তবে শর্ত হচ্ছে-শাস্তি ইনসাফপূর্ণ হতে হবে, ক্ষমতাশীল হোক বা দুর্বল, ধনী হোক বা গরীব নিকটাত্মীয় হোক বা দূরবর্তী; কারণ, এই ভেদাভেদই জাতির ধ্বংস ডেকে আনে। আয়িশা রা. থেকে বর্ণিত, একবার মাখজুম গোত্রের এক নারী চুরি করলে কুরাইশরা (হাত কাটা হবে বলে) খুব পেরেশান হলো। তারা বলাবলি করতে লাগল, উসামা ইবনু জায়িদ রা. ছাড়া নবীজির কাছে (এ বিষয়ে) কারও (মাফ চাওয়ার) সাহস নেই। কারণ, সেই একমাত্র আদরের টুকরো। তখন উসামা রা. (তাদের পীড়াপীড়িতে) মাফ চাইতে গেলেন, তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন-
أتشفع في حد من حدود الله ؟
তুমি আল্লাহ তাআলার হদ্দের বিষয়ে আমার কাছে সুপারিশ করতে এসেছো?
তারপর উঠে বক্তব্য দিলেন—
إِنَّمَا أَهْلَكَ الَّذِينَ قَبْلَكُمْ أَنَّهُمْ إِذَا سَرَقَ فِيهِمُ الشَّرِيفُ تَرَكُوهُ وَإِذَا سَرَقَ فِيهِمُ الضَّعِيفُ أَقَامُوا عَلَيْهِ الْحَدَّ وَايْمُ اللهِ لَوْ أَنَّ فَاطِمَةَ بِنْتَ مُحَمَّدٍ سَرَقَتْ لَقَطَعْتُ يَدَهَا
শোনো তোমাদের পূর্ববর্তী জাতিদের এটাই ধ্বংস করেছে যে, তাদের মাঝে কোনো অভিজাত ব্যক্তি চুরি করত, তারা তাকে ছেড়ে দিত আর কোনো দুর্বল চুরি করলে তার ওপর হদ লাগাত। আল্লাহর কসম যদি মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর মেয়ে ফাতিমাও চুরি করত, তাহলে আমি নিজে তার হাত কেটে ফেলতাম।
আবু ইয়ালা রহ. বলেন—খলিফার কর্তব্য দ্বীনের ইসলাম রক্ষা করা, সীমান্ত পাহারা দেওয়া; যাতে জনগণ নিশ্চিন্তে বসবাস করতে পারে, সফরে বের হতে পারে।
তিন. রাষ্ট্রীয় আয়কে কাজে লাগানো।
খলিফার একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হচ্ছে—রাষ্ট্রীয় আয়-অর্থ কাজে লাগানোর জন্য পদক্ষেপ গ্রহণ করা; যা জনগণের সাচ্ছন্দ্যবোধ, অর্থনৈতিক শক্তি ও উপযোগী বসবাসের ক্ষেত্রে সহায়ক হবে। সে জন্য সময় উপযোগী কিছু পদক্ষেপ নিতে হবে। যা রাষ্ট্রীয় বৃদ্ধির সহায়ক হবে যেমন—নদী খনন করা, কৃষি কাজের উন্নতি করা, ধাতব পদার্থগুলো বের করা, কারখানা তৈরি করা, রাস্তার উন্নতি করা, বিশেষ করে যেগুলোর ওপর রাষ্ট্রীয় উপার্জনের বিভিন্ন ভিত্তি নির্ভর করে, রাষ্ট্রীয় সম্পদ আনা-নেওয়া করা হয়, ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য রাস্তা তৈরি করা, ব্যবসায়ীদের বিশেষ সুযোগ সুবিধা দেয়। খুলাফায়ে রাশিদা জনগণের সমৃদ্ধির দিকে মনোযোগ দিতেন, আবু বকর রা. সেনাপতিদের আলাদাভাবে কৃষক ও গ্রামবাসীদের জন্য অসিয়ত করতেন। কারণ, তিনি আশা রাখতেন যে—এতে সাধারণ মানুষ ইসলামগ্রহণ করবে তদ্রুপ অর্থনীতির চাকাও সচল থাকবে, তাছাড়া তিনি জানতেন—অর্থনীতির চাকা সচল হওয়া ছাড়া কোনো রাষ্ট্রের অস্তিত্ব সম্ভব নয়। আর এই অর্থনীতির বড়ো একটা উৎস এই কৃষি কাজ। এই কৃষি কাজই মানুষের জীবন ও জীবনধারনের সাথে সম্পৃক্ত。
খলিফার কর্তব্য, জনগণকে কৃষিকাজ ও বৃক্ষরোপণে উদ্বুদ্ধ করা। সাধ্যমতো তাদের সাহায্য করা। কারণ, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামও উম্মতকে এ-বিষয়ে উদ্বুদ্ধ করেছেন। আনাস ইবনু মালিক রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন—
ما من مسلم يغرس غرسا أو يزرع زرعا فيأكل منه خيرا او انسان او بهيمة الا كان له به صدقة
কোনো মুসলিম যদি গাছ রোপণ করে চাষাবাদ করে তারপর সেখান থেকে কোনো পাখি বা মানুষ অথবা কোনো পশু খায় তাহলে বিনিময়ে তার নামে সাদকার সাওয়াব লেখা হয়ে যাবে।
সহিহ মুসলিমের এক বর্ণনায় আছে—
إلا كان له صدقة إلى يوم القيامة
কিয়ামত পর্যন্ত তার সাদকার সাওয়াব লেখা থাকবে।
এর দ্বারা উদ্দেশ্য, যতদিন পর্যন্ত তার গাছ বা ফসল থেকে খাওয়া হবে, ততদিন পর্যন্ত তার সাওয়াব হতে থাকবে চাই সে মারা যাক এমনকি যদিও অন্যের মালিকানায় চলে যায়। উপরের আলোচনা থেকে বোঝা গেল যে, গাছ রোপণ ও চাষাবাদে দুনিয়াবি যেমন ফায়দা আছে, তেমনি আখিরাতেরও ফায়দা আছে। দুনিয়াবি ফায়দা হচ্ছে রাষ্ট্রীয় আয়ের সমৃদ্ধি; কারণ, এর মাধ্যমে শুধু গাছ রোপণকারী বা চাষীর উপকার হবে না। বরং রাষ্ট্রের সবার এমনকি পশুপাখী ও কীটপতঙ্গেরও। আর আখিরাতের উপকার তো হাদিসেই উল্লেখ করা হলো।
আইনি রহ. বলেন—হাদিস থেকে স্পষ্টভাবে বোঝা যায় যে, গাছ রোপণকারী ও চাষী সাওয়াব লাভ করবে। যদিও তারা নিয়ত না করে। এমনকি গাছ রোপণ করে বা চাষ করে যদি বিক্রিও করে ফেলে, তবুও তার সাদকার সাওয়াব হতে থাকবে। কারণ, এটা অন্যদের খাদ্যের উপকরণ হয়েছে; যেমন, হাদিসে আমদানিকারীর সাওয়াবের কথা উল্লেখ আছে; যদিও সে ব্যবসা ও উপার্জনের উদ্দেশ্যে আমদানি করছো
চার. উপযুক্ত ব্যক্তির কাছে দায়িত্ব অর্পণ করা। খলিফার কর্তব্য উপযুক্ত ব্যক্তিকেই রাষ্ট্রের বিভিন্ন পদে বসানো। এতটুকুই যথেষ্ট নয়; বরং তাদের পর্যবেক্ষণ করাও তার কর্তব্য। আল্লাহ তাআলা বলেন—
إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُكُمْ أَن تُؤَدُّوا الْأَمَانَاتِ إِلَىٰ أَهْلِهَا وَإِذَا حَكَمْتُم بَيْنَ النَّاسِ أَن تَحْكُمُوا بِالْعَدْلِ : إِنَّ اللَّهَ نِعِمَّا يَعِظُكُم بِهِ إِنَّ اللَّهَ كَانَ سَمِيعًا بَصِيرًا
নিঃসন্দেহে আল্লাহ তোমাদের আদেশ করছেন যাতে তোমরা আমানত তার হকদারদের কাছে পৌঁছিয়ে দাও এবং যখন ফায়সালা করবে, তখন ইনসাফের সাথে ফায়সালা করবে। নিঃসন্দেহে আল্লাহ তোমাদের কতইনা উত্তম উপদেশ দিচ্ছেন। নিঃসন্দেহে আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা。
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন—
فإذا ضيعت الأمانة فانتظر الساعة قال كيف إضاعتها قال إذا وسد الأمر إلى غير أهله فانتظر الساعة..
যখন আমানত নষ্ট করে ফেলা শুরু হবে, তখন কিয়ামতের অপেক্ষা করতে থাকবে। উপস্থিত সাহাবায়ে কিরাম বললেন, নষ্ট করার ধরন কী? তিনি বললেন, যখন অযোগ্যকে দায়িত্ব দেওয়া হবে, তখন থেকে অপেক্ষা করো।
ইবনু আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন—
من استعمل رجلا من وفي تلك العصابة من هو أرضى الله منه فقد خان الله وخان رسوله وخان المؤمنين..
যে-ব্যক্তি কাউকে কোনো কাউমের দায়িত্ব দিল, অথচ সে কাউমে এমনও ব্যক্তি আছে, যে তার চেয়েও আল্লাহ কাছে বেশি গ্রহণযোগ্য। তাহলে সেই নিযুক্তকারী খিয়ানত করল, আল্লাহর সাথে সে খিয়ানত করল, তাঁর রাসুলের সাথে সে খিয়ানত করল, মুমিনদের সাথে。
ইয়াজিদ ইবনু আবি সুফয়ান রহ. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন—আবু বকর রা. যখন আমাকে শাসক হিসাবে শামের পাঠ দিচ্ছিলেন, তখন বললেন ইয়াজিদ (ওখানে) তোমার কিছু নিকটাত্মীয় আছে, আমার আশঙ্কা তুমি নেতৃত্বের ক্ষেত্রে তাদের প্রাধান্য দেবে, তোমার ওপর এটাই আমার সবচেয়ে বেশি আশঙ্কা। অথচ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন—
من ولي من أمر المسلمين شيئا فأمر عليهم أحدا محاباة فعليه لعنة الله لا يقبل الله منه صرفا ولا عدلا حتى يدخله جهنم..
কেউ মুসলিমদের কোনো দায়িত্ব পাওয়ার পর যদি সুজন-প্রীতির কারণে কাউকে মুসলিমদের আমির বানায় তাহলে তার ওপর আল্লাহর লানত তার থেকে আল্লাহ তাআলা না কোনো বদল গ্রহণ করবেন আর না মুক্তিপণ; বরং তাকে জাহান্নামে ঢোকাবেনই।
খুলাফায়ে রাশিদিন শুধু যোগ্য লোকদের দায়িত্ব দিয়েই ক্ষ্যান্ত হতেন না, বরং সর্বোচ্চ চেষ্টা করতেন তাদের সব সময় পর্যবেক্ষণে রাখার; যাতে তাদের দায়িত্ব দিয়ে নিশ্চিন্ত হতে পারতেন। উমার রা.-এর বৈশিষ্ট্য ছিল, এক মুহূর্তের জন্য কোনো জালিমকে রাখার চেয়ে প্রত্যক দিন একজন একজন করে বরখাস্ত করাটাই আমার কাছে উত্তম। তিনি একদিন চারপাশের লোকদের বলেন-আচ্ছা, বলো দেখি, আমার জানামতে তোমাদের শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিকে কোনো দায়িত্ব দিয়ে তাকে ইনসাফ করার নির্দেশ দিলেই কি আমার দায়িত্ব শেষ হয়ে যাবে? তারা বলল-হ্যাঁ।
উমার রা. বলেন-কক্ষনো না! যতক্ষণ না আমি তার কাজ পর্যবেক্ষণ করি, সে কি আদিষ্ট বিষয় পালন করেছে নাকি করে নি।
আবু ইয়ালা রহ. বলেন-খলিফার কর্তব্য হচ্ছে, বিভিন্ন দায়-দায়িত্বের ক্ষেত্রে হিতাকাঙ্খীদের দায়িত্ব দেওয়া। আর অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বিশ্বস্তদের নিযুক্ত করা। এর উল্টো করবে না। এটাও কর্তব্য যে তিনি নিজে সবার দায়িত্বের প্রতি সজাগ দৃষ্টি রাখবেন, পর্যবেক্ষণ করবেন। যাতে জাতির নেতৃত্ব ও দ্বীনের হিফাজতের ক্ষেত্রে ত্রুটি না হয়ে যায়। শুধু দায়িত্ব দিয়েই অন্য কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়বে না। কারণ, কখনো কখনো বিশ্বস্ত ব্যক্তিও খেয়ানত করে, হিতাকাঙ্খীও ধোঁকার আশ্রয় নেয়। আল্লাহ তাআলা বলেন-
يَا دَاوُودُ إِنَّا جَعَلْنَاكَ خَلِيفَةً فِي الْأَرْضِ فَاحْكُم بَيْنَ النَّاسِ بِالْحَقِّ وَلَا تَتَّبِعِ الْهَوَى
হে দাউদ, নিঃসন্দেহে আমি তোমাকে জমিনে খলিফা নিযুক্ত করেছি, সুতরাং তুমি মানুষের মাঝে সত্যানুযায়ী ফায়সালা করো, খাহেশাতের অনুসরণ করো না।
তো, এখানে আল্লাহ তাআলা শুধু নিযুক্ত করাকেই যথেষ্ট মনে করেন নি; বরং দায়িত্বের কথাও বলে দিয়েছেন। আল্লাহর নবী রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন-
كلكم راع وكلكم مسؤول عن رعيته
তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িতশীল আর প্রত্যেককেই তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসাকরাহবে。
পাঁচ. সেনাবাহিনী প্রস্তুত করা, সীমান্ত পাহারা দেওয়া।
শত্রুদের থেকে দেশ রক্ষা করা এবং তাদের বিরদ্ধে আগে বেড়ে হামলা করার জন্য এর প্রয়োজন অনস্বীকার্য। সুতরাং ইমামের কর্তব্য হচ্ছে যুগানুসারে রাষ্ট্রের প্রয়োজন মতো অস্ত্র তৈরি করা, শত্রুদের সন্ত্রস্ত করার জন্য অস্ত্রের মহড়া দেওয়া।
আবু ইয়ালা রহ. বলেন-খলিফার কর্তব্য প্রতিরক্ষামূলক অস্ত্র দিয়ে সীমান্ত রক্ষা করা; যাতে শত্রুরা সুযোগ পেয়ে কোনো অঘটন ঘটিয়ে ফেলতে না পারে, কোনো মুসলিম বা জিম্মির জানের ক্ষতি করতে না পারে। তদ্রুপ যাদের সামনে ইসলামের দাওয়াত পেশ করার পরও ইসলামের বিরোধিতা করে, তাদের বিরুদ্ধে জিহাদ করবে, যতক্ষণ না ইসলাম গ্রহণ না করে, অথবা চুক্তিবদ্ধ হয়। আল্লাহ তাআলা বলেন-
وَأَعِدُّوا لَهُم مَّا اسْتَطَعْتُم مِّن قُوَّةٍ وَمِن رَبَاطِ الْخَيْلِ تُرْهِبُونَ بِهِ عَدُوَّ اللَّهِ وَعَدُوَّكُمْ وَآخَرِينَ مِن دُونِهِمْ لَا تَعْلَمُونَهُمُ اللَّهُ يَعْلَمُهُمْ
আর তোমরা তাদের মোকাবেলার জন্য (সমর শক্তি) ও ঘোড়ার দল প্রস্তুত রাখো; যার দ্বারা তোমরা সন্ত্রস্ত্র করে রাখবে, আল্লাহর শত্রু এবং তোমাদের শত্রুকে এবং তাদের ছাড়া অন্যদের, যাদের তোমরা জানো না, আল্লাহ জানেন তাদের।
প্রত্যেক যুগের প্রস্তুতি-গ্রহণ সেই জিনিস দ্বারাই হবে, যা ওই যুগের উপযোগী। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের যুগে তির-যুদ্ধ প্রচলিত ছিল। তাই তিনি তির-নিক্ষেপ শেখার ওপর উদ্বুদ্ধ করেছেন, পক্ষান্তরে বর্তমান যুগের প্রস্তুতি হবে, যে সকল আগ্নেয়াস্ত্র এখন প্রচলিত, সেগুলোর ব্যবহার শেখার ওপর। কারণ, প্রশিক্ষণ প্রস্তুতিগ্রহণের ওপর উদ্বুদ্ধ করার উদ্দেশ্যেই হচ্ছে জিহাদ। অন্য কোনো উদ্দেশ্য না। আর যখন বর্তমান যুগে তির-যুদ্ধের প্রচলন নেই।
সুতরাং এটা শেখার কোনো ফায়দাও নেই। অতএব, উদ্বুদ্ধ করারও কোনো প্রশ্ন নেই। খলিফা এটাকে সামান্য কিছু মনে করে অলসতা করে বসে থাকতে পারেন না। কারণ, আমাদের শত্রুরা জলস্থল আকাশ পথ সব দিক থেকেই হামলা করে, অথচ সেগুলো থেকে প্রতিরক্ষা করার সামান্য শক্তিও আমাদের নেই।
ছয়. ফাই (যুদ্ধ করা ব্যতিরেকে অর্জিত গনিমত) এবং সাদাকাত আদায় করা এবং ভাতা নির্ধারণ করা।
আবু ইয়ালা রহ. বলেন-খলিফার কর্তব্য হচ্ছে, অন্যায় পদ্ধতিতে না নিয়ে শরিয়ত নির্ধারিত পরিমাণ ফাই ও সাদাকাত আদায় করা। তদ্রুপ বাইতুল মাল থেকে ভাতা ও অন্যান্য রাষ্ট্রীয় ব্যয় নির্ধারণ করা, বেশিও না কমও না এবং সেটা নির্দিষ্ট সময়ে করবেন আগেও না পরেও না। খলিফা যদি উল্লিখিত হকগুলো আদায় করে তাহলে বলা হবে তিনি আল্লাহ তাআলার হক আদায় করেছেন তাই সে হক জনগণের পক্ষে হোক বা বিপক্ষে। সেই সাথে তার জন্য জনগণের ওপর দুটো হক ওয়াজিব হবে-
* এক. নাফরমানি ছাড়া অন্য ক্ষেত্রে আনুগত্য; * দুই. সাহায্য করা।
(বিশেষ দ্রষ্টব্য: শাসকের উদ্দেশ্যে কিছু উপদেশ)
শাসক হলো আল্লাহর জমিনে আল্লাহর খলিফা। অতএব, আল্লাহ তাআলার নির্দেশের বিরোধিতা করে আল্লাহ তাআলার খিলাফত বা প্রতিনিধিত্ব কখনোই সুষ্ঠ থাকতে পারে না। সুতরাং ভাগ্যবান সেই শাসক যে রাজত্ব বিসর্জন দিয়ে হলেও দ্বীন রক্ষা করে, রাজত্ব রক্ষা করে দ্বীনকে বিসর্জন দেবে না, ন্যায়-বিচারের মাধ্যমে সুন্নাহকে জীবিত করে, জুলুম করে মৃত বানিয়ে ফেলে না, সুষ্ঠ পরিচালনা করে জনগণকে এগিয়ে নিয়ে যায়, খারাপভাবে শাসন করে তাদের ভবিষ্যৎ বিনষ্ট করে না, যাতে রাষ্ট্রীয় নীতিমালা জোরদার করতে পারে, রাষ্ট্রীয় ভিত্তিকে শক্তিশালী করে তুলতে পারে, আল্লাহ তাআলার জমিনে তাঁর আদেশ বাস্তবায়ন করতে পারে। কারণ, রাষ্ট্রীয় নেতৃত্ব ও প্রজাদের পরিচালনা করতে গিয়ে দ্বীনের ওপর অটল থাকা কিছুতেই অসম্ভব নয়। আল্লাহ তাআলার ফরজ বিধান পালন করার পর একজন শাসকের কর্তব্য জনগণের মাঝে ইনসাফ করা। তাদের সাথে সদাচরণ করা, দ্বীন ও শরিয়তের মাকাম বুলন্দ করা। তাকে মনে রাখতে হবে-যদি তার সৈন্য বা জনগণও জুলুম করে, তাহলে এর গুনাহ তার উপরেই চাপবে। যদি তিনি জেনে-বুঝেও নিষেধ না করেন, অথচ তিনি নিষেধ করতে সক্ষম ছিলেন। ঠিক তিনি যদি জনগণের মাঝে ইনসাফ কায়েম করেন, কুরআন-সুন্নাহর আলোকে ফায়সালা করেন, তাহলে তার একার একদিনের ইবাদাতের সাওয়াবই সমস্ত জনগণের ইবাদতের সমান বা বেশি হবে। যেমন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন-
عدل ساعة خير من عبادة ستين سنة
যাট বছর ইবাদাতের চেয়ে এক মুহূর্ত ইনসাফ করাই শ্রেয়।
আর তখন তিনি হাদিসে বর্ণিত ওই সাত শ্রেণির অর্ন্তভুক্ত হবেন, যাদেরকে আল্লাহ তাআলা কিয়ামতের দিন আরশের নীচে ছায়া দেবেন。
টিকাঃ
** আহকামে সুলতানিয়্যা: ২৭
১০০ আল-আহকামুস সুলতানিয়্যা: ২২৭
২০১ সহিহ ইবনু হিব্বান: ৭৪৫৩
* মুজামুত তাবারানি: ৩১৫
২০০ তারিখুল ইসলাম খঞ্জ: ৯ পস্থা ১৩০
২০৭ সহিহ বুখারি: ২৩২০
২০৮ উমদাতুল কারি
সূরা নিসা, আয়াত: ৫৮
মুসতাদারক আল-হাকিম: ৭০২৩
* তারিখুল খুলাফা, সাল্লারি
৩০ আল-আহকামস সলা
সূরা আনফাল শা
খলিফা রাষ্ট্রের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ একজন দায়িত্বশীল। যে কারণে তার দায়-দায়িত্বের সীমা-পরিসীমাও অনেক বেশি। আমরা এখানে তার দায়িত্বগুলো দেখব—
০১. দ্বীনের হিফাজত : এটা দুই পদ্ধতিতে হবে—
প্রথম পদ্ধতি : দ্বীনের বিভিন্ন হক রক্ষা করার মাধ্যমে, মুসলিমদের মাঝে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে দেওয়ার মাধ্যমে তবে সেটা ওইভাবে হতে হবে যেভাবে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের কাছে পৌঁছিয়েছেন, যে পন্থায় সাহাবায়ে কিরাম দ্বীনের হক-সমূহ রক্ষা করেছেন এবং পরবর্তীদের কাছে অর্পন করেছেন, যেভাবে সর্ব সম্মতিক্রমে নিযুক্ত খলিফারা এর ব্যাখ্যা করেছেন। আবু ইয়ালা রহ. বলেন— খলিফার ওপর দ্বীন রক্ষা করা কর্তব্য ওই নিয়ম-নীতির আলোকে, যার ওপর সালাফে সালিহিন একমত পোষণ করেন। এখন কারও যদি দ্বীনের বিষয়ে সন্দেহ জাগে, তাহলে তার সামনে তিনি প্রমাণ পেশ করবেন, সঠিকটা স্পষ্ট করবেন। যে সকল বিধিবিধান ও শাস্তি আছে সেগুলো প্রয়োগ করবেন যাতে দ্বীন ভুল ত্রুটি থেকে মুক্ত থাকে, মানুষও বিভ্রান্তি থেকে রক্ষিত থাকে。
এটা তখনই করা সম্ভব যখন বিদআতিদের বাধা দেওয়া যাবে, উলামায়ে হককে সাহায্য করা হবে দ্বীনি মাদরাসা কায়েম করা হবে, দ্বীনি ইলম ব্যাপকভাবে প্রচার করা হবে, এই ইলমকে প্রচলিত জ্ঞান-বিজ্ঞানের ওপর প্রাধান্য দেওয়া হবে।
দ্বিতীয় পদ্ধতি : দ্বীন হিফাজতের দ্বিতীয় পদ্ধতি হলো ইসলামের বিধিবিধান বাস্তবায়ন করা। এটা তখনই সফল হবে যখন মানুষের যাবতীয় পারষ্পরিক লেনদেন ও অন্যান্য ক্ষেত্রে শরিয়তের আহকাম প্রয়োগ করা হবে, মানুষকে শরিয়তের সীমালঙ্ঘন থেকে বিরত রাখবে, আল্লাহ তাআলার আদেশ পালন করবে, এসব বিষয়ে তাদের উদ্বুদ্ধ করা হবে, অবাধ্যদের শাস্তির আওতায় আনা হবে, সমাজ থেকে অন্যায়-দুর্নীতি, বিশৃঙ্খলা দূর করতে হবে। কারণ, সক্ষমতা থাকলেও অন্যায় বিশৃঙ্খলা দূর না করে দ্বীনের হিফাজত কখনোই সম্ভব না। আবু ইয়ালা রহ. বলেন— খলিফার কর্তব্য বিবাদের মাঝে শরিয়তের যে বিধিবিধান আছে সেগুলো প্রয়োগ করা, তাদের ঝগড়া নিরসন করা, যাতে সুবিচার করা সম্ভব হয়, তাহলে কোনো জালিমও শক্তি ‘প্রদর্শন’ করতে আসার সাহস করবে না, মজলুমকেও দুর্বল নিরুপায় হতে হবে না। প্রয়োজন দেখা দিলে হদও কায়েম করবে। যাতে কেউ আল্লাহ তাআলার নিষিদ্ধ বিষয়সমূহ ভঙ্গ করা, অসম্মানি করা থেকে রক্ষা করা যা এবং যাতে বান্দাদের হকও অযথায় বিফলে না যায়।
০২. দ্বীন মোতাবেক দুনিয়া পরিচালনা : এটা দ্বারা উদ্দেশ্য, শরিয়াহ মোতাবেক দুনিয়াবি বিষয় কার্যকর করা ও জনগণের দেখভাল করা; যা ইসলামি খিলাফতের বড়ো এবং মৌলিক একটি উদ্দেশ্য। এই পরিচালনার কিছু গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র—
এক. জনগণের মাঝে ইনসাফ ও ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা করা। ইয়াজ ইবনু হিমার থেকে বর্ণিত, যে নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আইলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন—
اهل الجنه ثلاثه موفق ورجل رحيم رقيق القلب بكل ذي قربى ومسلم ورجل فقير عفيف متصدق...
তিন শ্রেণির মানুষ জান্নাতবাসী হবে— * (এক) ন্যায়-বিচারক যে (বিবাদীদের মাঝে) মিল করে দেয় * (দুই) কোমল হৃদয়ের অধিকারী, নিকট আত্মীয় হোক অন্যান্য মুসলিম ভাই হোক সবার প্রতি দয়ালু * (তিন) দরিদ্র ব্যক্তি (গুনাহ থেকে) পবিত্র (সামান্য হলেও) দান ছদকা করে।
দ্বীন মোতাবেক রাষ্ট্র-পরিচালনার বড়ো একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ন্যায়বিচার কায়েম করা, ইনসাফ ছাড়া কোনো ইসলামি রাষ্ট্র টিকে থাকতে পারে না। এটা হারানো মানে ওই জাতির বাকি থাকার অধিকার বিলুপ্ত। রাসুল-প্রেরণেরও বড়ো একটি উদ্দেশ্য ইনসাফ কায়েম করা। কারণ, এর মাধ্যমেই উম্মতকে পুতঃপবিত্র করা সম্ভব। ইউনুস ইবনু মাইসারা ইবনি হালস থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, মাসলামা ইবনু মুখাল্লাদ মিসরে থাকা অবস্থায় মুআবিয়া রা. তার কাছে পত্র লিখে বলেন, আব্দুল্লাহ ইবনু উমারকে জিজ্ঞাসা করো, তিনি কি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছেন-
لا يقدس الله أمة لا يقضى فيها بالحق و يأخذ الضعيف حقه من القوي غير مضطهد
(আল্লাহ তাআলা ওই জাতিকে কখনো পবিত্র করবেন না, যাদের মাঝে ন্যায়বিচার করা হয় না, যেখানে দুর্বল নিজের হক জুলুম নির্যাতনের শিকার হয়ে আদায় করতে হয়।)
তো, আব্দুল্লাহ ইবনু উমার যদি তোমাকে বলে যে, তিনি রাসুল্লাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে এ হাদিস শুনেছেন, তাহলে তাকে বলো—তিনি যেন ডাক-বিভাগ থেকে বাহনে করে আমার কাছে চলে আসেন।
তিনি বলেন, ঠিক আছে। তখন তিনি পত্র প্রেরণ করলেন, আর ইবনু উমার রা. ডাক বিভাগের বাহনে করে মুআবিয়া রা.-এর কাছে এলেন। তারপর ওই হাদিসের ব্যাপারে বলেন—আমি রাসুল্লাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে ওই হাদিস বলতে শুনেছি। তখন মুআবিয়া রা. বললেন—তোমার মতো আমিও শুনেছি。
দুই. নিরাপত্তা ব্যবস্থা করা।
মুসলিম শাসকদের ওপর কর্তব্য, একইসাথে খিলাফাতে ইসলামিয়্যার বড়ো একটি উদ্দেশ্য দারুল ইসলামের নিরাপত্তা ব্যবস্থা করা। যাতে জনগণের জান, মাল ও ইজ্জত নিরাপদ থাকে। যেন দারুল ইসলামের এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্তে সবাই নিশ্চিন্ত মনে নিঃশঙ্কায় বিচরণ করতে পারে। আদি ইবনু হাতেম রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন-আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে বসা ছিলাম। এমন সময় এক লোক এসে তার কাছে দারিদ্রের কথা বলল, তারপর আরেকজন এসে ডাকাত-রাহাজানির অভিযোগ করল, তখন নবীজি বললেন-
يا عدي، هل رأيت الحيرة قلت لم أرها وقد مات عنها قال فإن طالت بك حياة لترين ترتحل من الحيرة حتى تطوف بالكعبة لا تخاف أحدا الا الله
আচ্ছা আদি, তুমি কি হিরা অঞ্চল চেন? আমি বললাম-না, তবে নাম শুনেছি। তিনি বললেন, যদি দীর্ঘ হায়াত পাও, তাহলে দেখতে পাবে- উটে আরোহণ করে হিরা থেকে একজন নারী সফর করে কাবা তাওয়াফ করবে, আল্লাহ ছাড়া (পথে) আর কারও ভয় থাকবে না。
এই উদ্দেশ্য পূর্ণাঙ্গভাবে তখনই বাস্তবায়িত হবে যখন নিরাপত্তা ভঙ্গকারীদের ও স্বেচ্ছাচারীদের শাস্তির আওতায় নিয়ে আনা হবে। তবে শর্ত হচ্ছে-শাস্তি ইনসাফপূর্ণ হতে হবে, ক্ষমতাশীল হোক বা দুর্বল, ধনী হোক বা গরীব নিকটাত্মীয় হোক বা দূরবর্তী; কারণ, এই ভেদাভেদই জাতির ধ্বংস ডেকে আনে। আয়িশা রা. থেকে বর্ণিত, একবার মাখজুম গোত্রের এক নারী চুরি করলে কুরাইশরা (হাত কাটা হবে বলে) খুব পেরেশান হলো। তারা বলাবলি করতে লাগল, উসামা ইবনু জায়িদ রা. ছাড়া নবীজির কাছে (এ বিষয়ে) কারও (মাফ চাওয়ার) সাহস নেই। কারণ, সেই একমাত্র আদরের টুকরো। তখন উসামা রা. (তাদের পীড়াপীড়িতে) মাফ চাইতে গেলেন, তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন-
أتشفع في حد من حدود الله ؟
তুমি আল্লাহ তাআলার হদ্দের বিষয়ে আমার কাছে সুপারিশ করতে এসেছো?
তারপর উঠে বক্তব্য দিলেন—
إِنَّمَا أَهْلَكَ الَّذِينَ قَبْلَكُمْ أَنَّهُمْ إِذَا سَرَقَ فِيهِمُ الشَّرِيفُ تَرَكُوهُ وَإِذَا سَرَقَ فِيهِمُ الضَّعِيفُ أَقَامُوا عَلَيْهِ الْحَدَّ وَايْمُ اللهِ لَوْ أَنَّ فَاطِمَةَ بِنْتَ مُحَمَّدٍ سَرَقَتْ لَقَطَعْتُ يَدَهَا
শোনো তোমাদের পূর্ববর্তী জাতিদের এটাই ধ্বংস করেছে যে, তাদের মাঝে কোনো অভিজাত ব্যক্তি চুরি করত, তারা তাকে ছেড়ে দিত আর কোনো দুর্বল চুরি করলে তার ওপর হদ লাগাত। আল্লাহর কসম যদি মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর মেয়ে ফাতিমাও চুরি করত, তাহলে আমি নিজে তার হাত কেটে ফেলতাম।
আবু ইয়ালা রহ. বলেন—খলিফার কর্তব্য দ্বীনের ইসলাম রক্ষা করা, সীমান্ত পাহারা দেওয়া; যাতে জনগণ নিশ্চিন্তে বসবাস করতে পারে, সফরে বের হতে পারে।
তিন. রাষ্ট্রীয় আয়কে কাজে লাগানো।
খলিফার একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হচ্ছে—রাষ্ট্রীয় আয়-অর্থ কাজে লাগানোর জন্য পদক্ষেপ গ্রহণ করা; যা জনগণের সাচ্ছন্দ্যবোধ, অর্থনৈতিক শক্তি ও উপযোগী বসবাসের ক্ষেত্রে সহায়ক হবে। সে জন্য সময় উপযোগী কিছু পদক্ষেপ নিতে হবে। যা রাষ্ট্রীয় বৃদ্ধির সহায়ক হবে যেমন—নদী খনন করা, কৃষি কাজের উন্নতি করা, ধাতব পদার্থগুলো বের করা, কারখানা তৈরি করা, রাস্তার উন্নতি করা, বিশেষ করে যেগুলোর ওপর রাষ্ট্রীয় উপার্জনের বিভিন্ন ভিত্তি নির্ভর করে, রাষ্ট্রীয় সম্পদ আনা-নেওয়া করা হয়, ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য রাস্তা তৈরি করা, ব্যবসায়ীদের বিশেষ সুযোগ সুবিধা দেয়। খুলাফায়ে রাশিদা জনগণের সমৃদ্ধির দিকে মনোযোগ দিতেন, আবু বকর রা. সেনাপতিদের আলাদাভাবে কৃষক ও গ্রামবাসীদের জন্য অসিয়ত করতেন। কারণ, তিনি আশা রাখতেন যে—এতে সাধারণ মানুষ ইসলামগ্রহণ করবে তদ্রুপ অর্থনীতির চাকাও সচল থাকবে, তাছাড়া তিনি জানতেন—অর্থনীতির চাকা সচল হওয়া ছাড়া কোনো রাষ্ট্রের অস্তিত্ব সম্ভব নয়। আর এই অর্থনীতির বড়ো একটা উৎস এই কৃষি কাজ। এই কৃষি কাজই মানুষের জীবন ও জীবনধারনের সাথে সম্পৃক্ত。
খলিফার কর্তব্য, জনগণকে কৃষিকাজ ও বৃক্ষরোপণে উদ্বুদ্ধ করা। সাধ্যমতো তাদের সাহায্য করা। কারণ, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামও উম্মতকে এ-বিষয়ে উদ্বুদ্ধ করেছেন। আনাস ইবনু মালিক রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন—
ما من مسلم يغرس غرسا أو يزرع زرعا فيأكل منه خيرا او انسان او بهيمة الا كان له به صدقة
কোনো মুসলিম যদি গাছ রোপণ করে চাষাবাদ করে তারপর সেখান থেকে কোনো পাখি বা মানুষ অথবা কোনো পশু খায় তাহলে বিনিময়ে তার নামে সাদকার সাওয়াব লেখা হয়ে যাবে।
সহিহ মুসলিমের এক বর্ণনায় আছে—
إلا كان له صدقة إلى يوم القيامة
কিয়ামত পর্যন্ত তার সাদকার সাওয়াব লেখা থাকবে।
এর দ্বারা উদ্দেশ্য, যতদিন পর্যন্ত তার গাছ বা ফসল থেকে খাওয়া হবে, ততদিন পর্যন্ত তার সাওয়াব হতে থাকবে চাই সে মারা যাক এমনকি যদিও অন্যের মালিকানায় চলে যায়। উপরের আলোচনা থেকে বোঝা গেল যে, গাছ রোপণ ও চাষাবাদে দুনিয়াবি যেমন ফায়দা আছে, তেমনি আখিরাতেরও ফায়দা আছে। দুনিয়াবি ফায়দা হচ্ছে রাষ্ট্রীয় আয়ের সমৃদ্ধি; কারণ, এর মাধ্যমে শুধু গাছ রোপণকারী বা চাষীর উপকার হবে না। বরং রাষ্ট্রের সবার এমনকি পশুপাখী ও কীটপতঙ্গেরও। আর আখিরাতের উপকার তো হাদিসেই উল্লেখ করা হলো।
আইনি রহ. বলেন—হাদিস থেকে স্পষ্টভাবে বোঝা যায় যে, গাছ রোপণকারী ও চাষী সাওয়াব লাভ করবে। যদিও তারা নিয়ত না করে। এমনকি গাছ রোপণ করে বা চাষ করে যদি বিক্রিও করে ফেলে, তবুও তার সাদকার সাওয়াব হতে থাকবে। কারণ, এটা অন্যদের খাদ্যের উপকরণ হয়েছে; যেমন, হাদিসে আমদানিকারীর সাওয়াবের কথা উল্লেখ আছে; যদিও সে ব্যবসা ও উপার্জনের উদ্দেশ্যে আমদানি করছো
চার. উপযুক্ত ব্যক্তির কাছে দায়িত্ব অর্পণ করা। খলিফার কর্তব্য উপযুক্ত ব্যক্তিকেই রাষ্ট্রের বিভিন্ন পদে বসানো। এতটুকুই যথেষ্ট নয়; বরং তাদের পর্যবেক্ষণ করাও তার কর্তব্য। আল্লাহ তাআলা বলেন—
إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُكُمْ أَن تُؤَدُّوا الْأَمَانَاتِ إِلَىٰ أَهْلِهَا وَإِذَا حَكَمْتُم بَيْنَ النَّاسِ أَن تَحْكُمُوا بِالْعَدْلِ : إِنَّ اللَّهَ نِعِمَّا يَعِظُكُم بِهِ إِنَّ اللَّهَ كَانَ سَمِيعًا بَصِيرًا
নিঃসন্দেহে আল্লাহ তোমাদের আদেশ করছেন যাতে তোমরা আমানত তার হকদারদের কাছে পৌঁছিয়ে দাও এবং যখন ফায়সালা করবে, তখন ইনসাফের সাথে ফায়সালা করবে। নিঃসন্দেহে আল্লাহ তোমাদের কতইনা উত্তম উপদেশ দিচ্ছেন। নিঃসন্দেহে আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা。
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন—
فإذا ضيعت الأمانة فانتظر الساعة قال كيف إضاعتها قال إذا وسد الأمر إلى غير أهله فانتظر الساعة..
যখন আমানত নষ্ট করে ফেলা শুরু হবে, তখন কিয়ামতের অপেক্ষা করতে থাকবে। উপস্থিত সাহাবায়ে কিরাম বললেন, নষ্ট করার ধরন কী? তিনি বললেন, যখন অযোগ্যকে দায়িত্ব দেওয়া হবে, তখন থেকে অপেক্ষা করো।
ইবনু আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন—
من استعمل رجلا من وفي تلك العصابة من هو أرضى الله منه فقد خان الله وخان رسوله وخان المؤمنين..
যে-ব্যক্তি কাউকে কোনো কাউমের দায়িত্ব দিল, অথচ সে কাউমে এমনও ব্যক্তি আছে, যে তার চেয়েও আল্লাহ কাছে বেশি গ্রহণযোগ্য। তাহলে সেই নিযুক্তকারী খিয়ানত করল, আল্লাহর সাথে সে খিয়ানত করল, তাঁর রাসুলের সাথে সে খিয়ানত করল, মুমিনদের সাথে。
ইয়াজিদ ইবনু আবি সুফয়ান রহ. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন—আবু বকর রা. যখন আমাকে শাসক হিসাবে শামের পাঠ দিচ্ছিলেন, তখন বললেন ইয়াজিদ (ওখানে) তোমার কিছু নিকটাত্মীয় আছে, আমার আশঙ্কা তুমি নেতৃত্বের ক্ষেত্রে তাদের প্রাধান্য দেবে, তোমার ওপর এটাই আমার সবচেয়ে বেশি আশঙ্কা। অথচ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন—
من ولي من أمر المسلمين شيئا فأمر عليهم أحدا محاباة فعليه لعنة الله لا يقبل الله منه صرفا ولا عدلا حتى يدخله جهنم..
কেউ মুসলিমদের কোনো দায়িত্ব পাওয়ার পর যদি সুজন-প্রীতির কারণে কাউকে মুসলিমদের আমির বানায় তাহলে তার ওপর আল্লাহর লানত তার থেকে আল্লাহ তাআলা না কোনো বদল গ্রহণ করবেন আর না মুক্তিপণ; বরং তাকে জাহান্নামে ঢোকাবেনই।
খুলাফায়ে রাশিদিন শুধু যোগ্য লোকদের দায়িত্ব দিয়েই ক্ষ্যান্ত হতেন না, বরং সর্বোচ্চ চেষ্টা করতেন তাদের সব সময় পর্যবেক্ষণে রাখার; যাতে তাদের দায়িত্ব দিয়ে নিশ্চিন্ত হতে পারতেন। উমার রা.-এর বৈশিষ্ট্য ছিল, এক মুহূর্তের জন্য কোনো জালিমকে রাখার চেয়ে প্রত্যক দিন একজন একজন করে বরখাস্ত করাটাই আমার কাছে উত্তম। তিনি একদিন চারপাশের লোকদের বলেন-আচ্ছা, বলো দেখি, আমার জানামতে তোমাদের শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিকে কোনো দায়িত্ব দিয়ে তাকে ইনসাফ করার নির্দেশ দিলেই কি আমার দায়িত্ব শেষ হয়ে যাবে? তারা বলল-হ্যাঁ।
উমার রা. বলেন-কক্ষনো না! যতক্ষণ না আমি তার কাজ পর্যবেক্ষণ করি, সে কি আদিষ্ট বিষয় পালন করেছে নাকি করে নি।
আবু ইয়ালা রহ. বলেন-খলিফার কর্তব্য হচ্ছে, বিভিন্ন দায়-দায়িত্বের ক্ষেত্রে হিতাকাঙ্খীদের দায়িত্ব দেওয়া। আর অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বিশ্বস্তদের নিযুক্ত করা। এর উল্টো করবে না। এটাও কর্তব্য যে তিনি নিজে সবার দায়িত্বের প্রতি সজাগ দৃষ্টি রাখবেন, পর্যবেক্ষণ করবেন। যাতে জাতির নেতৃত্ব ও দ্বীনের হিফাজতের ক্ষেত্রে ত্রুটি না হয়ে যায়। শুধু দায়িত্ব দিয়েই অন্য কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়বে না। কারণ, কখনো কখনো বিশ্বস্ত ব্যক্তিও খেয়ানত করে, হিতাকাঙ্খীও ধোঁকার আশ্রয় নেয়। আল্লাহ তাআলা বলেন-
يَا دَاوُودُ إِنَّا جَعَلْنَاكَ خَلِيفَةً فِي الْأَرْضِ فَاحْكُم بَيْنَ النَّاسِ بِالْحَقِّ وَلَا تَتَّبِعِ الْهَوَى
হে দাউদ, নিঃসন্দেহে আমি তোমাকে জমিনে খলিফা নিযুক্ত করেছি, সুতরাং তুমি মানুষের মাঝে সত্যানুযায়ী ফায়সালা করো, খাহেশাতের অনুসরণ করো না।
তো, এখানে আল্লাহ তাআলা শুধু নিযুক্ত করাকেই যথেষ্ট মনে করেন নি; বরং দায়িত্বের কথাও বলে দিয়েছেন। আল্লাহর নবী রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন-
كلكم راع وكلكم مسؤول عن رعيته
তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িতশীল আর প্রত্যেককেই তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসাকরাহবে。
পাঁচ. সেনাবাহিনী প্রস্তুত করা, সীমান্ত পাহারা দেওয়া।
শত্রুদের থেকে দেশ রক্ষা করা এবং তাদের বিরদ্ধে আগে বেড়ে হামলা করার জন্য এর প্রয়োজন অনস্বীকার্য। সুতরাং ইমামের কর্তব্য হচ্ছে যুগানুসারে রাষ্ট্রের প্রয়োজন মতো অস্ত্র তৈরি করা, শত্রুদের সন্ত্রস্ত করার জন্য অস্ত্রের মহড়া দেওয়া।
আবু ইয়ালা রহ. বলেন-খলিফার কর্তব্য প্রতিরক্ষামূলক অস্ত্র দিয়ে সীমান্ত রক্ষা করা; যাতে শত্রুরা সুযোগ পেয়ে কোনো অঘটন ঘটিয়ে ফেলতে না পারে, কোনো মুসলিম বা জিম্মির জানের ক্ষতি করতে না পারে। তদ্রুপ যাদের সামনে ইসলামের দাওয়াত পেশ করার পরও ইসলামের বিরোধিতা করে, তাদের বিরুদ্ধে জিহাদ করবে, যতক্ষণ না ইসলাম গ্রহণ না করে, অথবা চুক্তিবদ্ধ হয়। আল্লাহ তাআলা বলেন-
وَأَعِدُّوا لَهُم مَّا اسْتَطَعْتُم مِّن قُوَّةٍ وَمِن رَبَاطِ الْخَيْلِ تُرْهِبُونَ بِهِ عَدُوَّ اللَّهِ وَعَدُوَّكُمْ وَآخَرِينَ مِن دُونِهِمْ لَا تَعْلَمُونَهُمُ اللَّهُ يَعْلَمُهُمْ
আর তোমরা তাদের মোকাবেলার জন্য (সমর শক্তি) ও ঘোড়ার দল প্রস্তুত রাখো; যার দ্বারা তোমরা সন্ত্রস্ত্র করে রাখবে, আল্লাহর শত্রু এবং তোমাদের শত্রুকে এবং তাদের ছাড়া অন্যদের, যাদের তোমরা জানো না, আল্লাহ জানেন তাদের।
প্রত্যেক যুগের প্রস্তুতি-গ্রহণ সেই জিনিস দ্বারাই হবে, যা ওই যুগের উপযোগী। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের যুগে তির-যুদ্ধ প্রচলিত ছিল। তাই তিনি তির-নিক্ষেপ শেখার ওপর উদ্বুদ্ধ করেছেন, পক্ষান্তরে বর্তমান যুগের প্রস্তুতি হবে, যে সকল আগ্নেয়াস্ত্র এখন প্রচলিত, সেগুলোর ব্যবহার শেখার ওপর। কারণ, প্রশিক্ষণ প্রস্তুতিগ্রহণের ওপর উদ্বুদ্ধ করার উদ্দেশ্যেই হচ্ছে জিহাদ। অন্য কোনো উদ্দেশ্য না। আর যখন বর্তমান যুগে তির-যুদ্ধের প্রচলন নেই।
সুতরাং এটা শেখার কোনো ফায়দাও নেই। অতএব, উদ্বুদ্ধ করারও কোনো প্রশ্ন নেই। খলিফা এটাকে সামান্য কিছু মনে করে অলসতা করে বসে থাকতে পারেন না। কারণ, আমাদের শত্রুরা জলস্থল আকাশ পথ সব দিক থেকেই হামলা করে, অথচ সেগুলো থেকে প্রতিরক্ষা করার সামান্য শক্তিও আমাদের নেই।
ছয়. ফাই (যুদ্ধ করা ব্যতিরেকে অর্জিত গনিমত) এবং সাদাকাত আদায় করা এবং ভাতা নির্ধারণ করা।
আবু ইয়ালা রহ. বলেন-খলিফার কর্তব্য হচ্ছে, অন্যায় পদ্ধতিতে না নিয়ে শরিয়ত নির্ধারিত পরিমাণ ফাই ও সাদাকাত আদায় করা। তদ্রুপ বাইতুল মাল থেকে ভাতা ও অন্যান্য রাষ্ট্রীয় ব্যয় নির্ধারণ করা, বেশিও না কমও না এবং সেটা নির্দিষ্ট সময়ে করবেন আগেও না পরেও না। খলিফা যদি উল্লিখিত হকগুলো আদায় করে তাহলে বলা হবে তিনি আল্লাহ তাআলার হক আদায় করেছেন তাই সে হক জনগণের পক্ষে হোক বা বিপক্ষে। সেই সাথে তার জন্য জনগণের ওপর দুটো হক ওয়াজিব হবে-
* এক. নাফরমানি ছাড়া অন্য ক্ষেত্রে আনুগত্য; * দুই. সাহায্য করা।
(বিশেষ দ্রষ্টব্য: শাসকের উদ্দেশ্যে কিছু উপদেশ)
শাসক হলো আল্লাহর জমিনে আল্লাহর খলিফা। অতএব, আল্লাহ তাআলার নির্দেশের বিরোধিতা করে আল্লাহ তাআলার খিলাফত বা প্রতিনিধিত্ব কখনোই সুষ্ঠ থাকতে পারে না। সুতরাং ভাগ্যবান সেই শাসক যে রাজত্ব বিসর্জন দিয়ে হলেও দ্বীন রক্ষা করে, রাজত্ব রক্ষা করে দ্বীনকে বিসর্জন দেবে না, ন্যায়-বিচারের মাধ্যমে সুন্নাহকে জীবিত করে, জুলুম করে মৃত বানিয়ে ফেলে না, সুষ্ঠ পরিচালনা করে জনগণকে এগিয়ে নিয়ে যায়, খারাপভাবে শাসন করে তাদের ভবিষ্যৎ বিনষ্ট করে না, যাতে রাষ্ট্রীয় নীতিমালা জোরদার করতে পারে, রাষ্ট্রীয় ভিত্তিকে শক্তিশালী করে তুলতে পারে, আল্লাহ তাআলার জমিনে তাঁর আদেশ বাস্তবায়ন করতে পারে। কারণ, রাষ্ট্রীয় নেতৃত্ব ও প্রজাদের পরিচালনা করতে গিয়ে দ্বীনের ওপর অটল থাকা কিছুতেই অসম্ভব নয়। আল্লাহ তাআলার ফরজ বিধান পালন করার পর একজন শাসকের কর্তব্য জনগণের মাঝে ইনসাফ করা। তাদের সাথে সদাচরণ করা, দ্বীন ও শরিয়তের মাকাম বুলন্দ করা। তাকে মনে রাখতে হবে-যদি তার সৈন্য বা জনগণও জুলুম করে, তাহলে এর গুনাহ তার উপরেই চাপবে। যদি তিনি জেনে-বুঝেও নিষেধ না করেন, অথচ তিনি নিষেধ করতে সক্ষম ছিলেন। ঠিক তিনি যদি জনগণের মাঝে ইনসাফ কায়েম করেন, কুরআন-সুন্নাহর আলোকে ফায়সালা করেন, তাহলে তার একার একদিনের ইবাদাতের সাওয়াবই সমস্ত জনগণের ইবাদতের সমান বা বেশি হবে। যেমন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন-
عدل ساعة خير من عبادة ستين سنة
যাট বছর ইবাদাতের চেয়ে এক মুহূর্ত ইনসাফ করাই শ্রেয়।
আর তখন তিনি হাদিসে বর্ণিত ওই সাত শ্রেণির অর্ন্তভুক্ত হবেন, যাদেরকে আল্লাহ তাআলা কিয়ামতের দিন আরশের নীচে ছায়া দেবেন。
টিকাঃ
** আহকামে সুলতানিয়্যা: ২৭
১০০ আল-আহকামুস সুলতানিয়্যা: ২২৭
২০১ সহিহ ইবনু হিব্বান: ৭৪৫৩
* মুজামুত তাবারানি: ৩১৫
২০০ তারিখুল ইসলাম খঞ্জ: ৯ পস্থা ১৩০
২০৭ সহিহ বুখারি: ২৩২০
২০৮ উমদাতুল কারি
সূরা নিসা, আয়াত: ৫৮
মুসতাদারক আল-হাকিম: ৭০২৩
* তারিখুল খুলাফা, সাল্লারি
৩০ আল-আহকামস সলা
সূরা আনফাল শা
📄 ইনসাফ কাকে বলে?
ইনসাফ বলতে বোঝায়—প্রত্যেককে তার হক দেওয়া; শরিয়ত থেকে নির্দেশ করা হয় নি—এমন কিছু তার ওপর চাপিয়ে দেওয়া; অন্যায়ভাবে তার সম্পদ গ্রাস না করা; তাকে নিজের হক থেকে বাধা না দেওয়া।
আল্লামা ইবনু খালদুন বলেন—জুলুমের অর্থ খুব সীমিত নয়। শুধু অন্যের কোনো জিনিস বিনিময় বা কারণ ছাড়া নেওয়াকেই জুলুম বলে না, যেমনটা সবাই মনে করে! বরং জুলুমের অর্থ এর থেকেও অনেক ব্যাপক, কারও মালিকানাধীন জিনিস নেওয়া, কাজের ক্ষেত্রে ফাঁকি দেওয়া, অন্যায়ভাবে কারও থেকে কিছু দাবি করা, শরিয়ত আবশ্যক করে নি এমন কোনো কিছু আবশ্যক করা—এই সব কিছুকেই জুলুম বলে। এখন যারা জনগণ থেকে অন্যায়ভাবে ট্যাক্স নেয়, এরাও জালিম। যারা সে বিষয়ে বাড়াবাড়ি করে, তারাও জালিম। যারা লুট করে, তারাও জালিম। যারা জনগণের সম্পদ আটকে রাখে, এরাও জালিম। যারা বলপ্রয়োগ বা জোর-জবরদস্তি করে নেয়, তারাও জালিম। এর সবই জুলুমের অন্তর্ভুক্ত। এর পরিণামও রাষ্ট্রের ওপর বর্তাবে। একসময় রাষ্ট্র জনশূন্য হয়ে থাকবে, যে জনগণ ছিল রাষ্ট্রের মূল সম্পদ। কারণ, রাষ্ট্র নিজেই তার জনগণের আশা ও আস্থা হারিয়েছে।
জুলুম নিষিদ্ধ ঘোষণা করার বড়ো একটা কারণ ও হিকমত এটাই। অর্থাৎ, জুলুমের কারণে রাষ্ট্র যে জনশূন্য হয়ে না পড়ে। কারণ, জুলুমই বলে দেয় যে, এটা আর মানুষের বসবাসের উপযোগী কোনো রাষ্ট্র না।
শরিয়ত যে মূল পাঁচটি বিষয়ের ব্যাপারে এত বেশি গুরুত্ব দেয়, সেই পাঁচটি বিষয় হচ্ছে: দ্বীন, জান, মাল, আকল, নাসল বা বংশ;— এগুলো। এই পাঁচটি বিষয় হিফাজত করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এর কারণও কিন্তু উপরে যা বলা হলো, সেটাই। তো, এই জুলুমই যেহেতু মানুষকে একটি রাষ্ট্র থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে, একটি রাষ্ট্র জনশূন্য করে দেয়, তাই এটা নিষিদ্ধ ঘোষণা করা খুবই জরুরি। এর নিষিদ্ধতার বিষয়ে কুরআন-সুন্নাহয় এত দলিল-প্রমাণ আছে যে, গুনে শেষ করা যাবে না।
টিকাঃ
০০ মুকাদ্দামাহ ইবনু খালদুন, ২৮০
২০৪ সহিহ বুখারি: ৩৬১২
২০৫ সহিহ বুখারি: ৩৪৭৫
ইনসাফ বলতে বোঝায়—প্রত্যেককে তার হক দেওয়া; শরিয়ত থেকে নির্দেশ করা হয় নি—এমন কিছু তার ওপর চাপিয়ে দেওয়া; অন্যায়ভাবে তার সম্পদ গ্রাস না করা; তাকে নিজের হক থেকে বাধা না দেওয়া।
আল্লামা ইবনু খালদুন বলেন—জুলুমের অর্থ খুব সীমিত নয়। শুধু অন্যের কোনো জিনিস বিনিময় বা কারণ ছাড়া নেওয়াকেই জুলুম বলে না, যেমনটা সবাই মনে করে! বরং জুলুমের অর্থ এর থেকেও অনেক ব্যাপক, কারও মালিকানাধীন জিনিস নেওয়া, কাজের ক্ষেত্রে ফাঁকি দেওয়া, অন্যায়ভাবে কারও থেকে কিছু দাবি করা, শরিয়ত আবশ্যক করে নি এমন কোনো কিছু আবশ্যক করা—এই সব কিছুকেই জুলুম বলে। এখন যারা জনগণ থেকে অন্যায়ভাবে ট্যাক্স নেয়, এরাও জালিম। যারা সে বিষয়ে বাড়াবাড়ি করে, তারাও জালিম। যারা লুট করে, তারাও জালিম। যারা জনগণের সম্পদ আটকে রাখে, এরাও জালিম। যারা বলপ্রয়োগ বা জোর-জবরদস্তি করে নেয়, তারাও জালিম। এর সবই জুলুমের অন্তর্ভুক্ত। এর পরিণামও রাষ্ট্রের ওপর বর্তাবে। একসময় রাষ্ট্র জনশূন্য হয়ে থাকবে, যে জনগণ ছিল রাষ্ট্রের মূল সম্পদ। কারণ, রাষ্ট্র নিজেই তার জনগণের আশা ও আস্থা হারিয়েছে।
জুলুম নিষিদ্ধ ঘোষণা করার বড়ো একটা কারণ ও হিকমত এটাই। অর্থাৎ, জুলুমের কারণে রাষ্ট্র যে জনশূন্য হয়ে না পড়ে। কারণ, জুলুমই বলে দেয় যে, এটা আর মানুষের বসবাসের উপযোগী কোনো রাষ্ট্র না।
শরিয়ত যে মূল পাঁচটি বিষয়ের ব্যাপারে এত বেশি গুরুত্ব দেয়, সেই পাঁচটি বিষয় হচ্ছে: দ্বীন, জান, মাল, আকল, নাসল বা বংশ;— এগুলো। এই পাঁচটি বিষয় হিফাজত করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এর কারণও কিন্তু উপরে যা বলা হলো, সেটাই। তো, এই জুলুমই যেহেতু মানুষকে একটি রাষ্ট্র থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে, একটি রাষ্ট্র জনশূন্য করে দেয়, তাই এটা নিষিদ্ধ ঘোষণা করা খুবই জরুরি। এর নিষিদ্ধতার বিষয়ে কুরআন-সুন্নাহয় এত দলিল-প্রমাণ আছে যে, গুনে শেষ করা যাবে না।
টিকাঃ
০০ মুকাদ্দামাহ ইবনু খালদুন, ২৮০
২০৪ সহিহ বুখারি: ৩৬১২
২০৫ সহিহ বুখারি: ৩৪৭৫
📄 খলিফা যে দশটি মূলনীতি রক্ষা করবেন
০১. যখনই দেশে কোনো সমস্যা দেখা হবে, তিনি সেক্ষেত্রে নিজেকে জনগণ ভাববেন আর অপরজনকে শাসক ভাববেন, তখন যেটা নিজের কাছে ভালো লাগবে না, সেটা জনগণের কাছেও চাপাবেন না।
০২. তার দরজায় প্রয়োজনগ্রস্ত লোক এলে সেটাকে তুচ্ছ মনে করবেন না; বরং এর চিন্তা থেকেও দূরে থাকবেন। কারণ, আল্লাহ তাআলা চান না যে, জনগণের প্রয়োজন বিলম্বে পুরা করা হোক।
এই ব্যাপারে একটি ঘটনা বর্ণিত আছে। বিখ্যাত দার্শনিক এরিস্টটল একদিন তাদের বাদশাহকে উপদেশ দিয়ে বললেন-বাদশাহ, কেউ যখন প্রয়োজনে পড়ে আপনার দরবারে আসে, আপনি তাদের প্রয়োজনপূরণে শিথিলতা করবেন না। যাতে আল্লাহর রহমত ও মাগফিরাত বঞ্চিত না হয়ে যান।
০৩. দিনের পুরো সময় ব্যক্তিগত কাজে ব্যয় করবেন না; বরং চেষ্টা করবেন-কীভাবে রাষ্ট্র পরিচালনা জনগণের দেখভাল করায় সময় বেশি ব্যয় করা যায়।
ঘটনা বর্ণিত আছে যে-গ্রিসের এক দার্শনিক তাদের এক শাসককে উপদেশ দিতে গিয়ে বলেছিলেন-গাফেলদের মতো ঘুমিয়ে থাকবেন না, যাতে আপনার আদালত থেকে সুবিচারপ্রার্থীরা বঞ্চিত হয়ে আল্লাহর দরবারে বিচার না দিয়ে বসে। তখন আপনার রাষ্ট্র ত্রুটিপূর্ণ হয়ে যাবে। কারণ, রাষ্ট্র তো একটা সূর্যের মতো, যার আলো সকালে এক দেওয়ালে পড়ে, বিকালে অপর দেওয়ালে পড়ে। তদ্রুপ রাষ্ট্রক্ষমতা শাসকের নাফরমানির কারণে (সূর্যের আলোর মতো) এক শাসক থেকে অপর শাসকের কাছে হস্তান্তিরিত হয়।
০৪. প্রত্যেকটা কাজ সহজে কোমলভাবে সমাধানের চেষ্টা করবেন, কঠোরভাবে করবেন না। কারণ, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শাসকদের জন্য দুআ করে বলেন-
اللهم ارفق على كل وال رفق على رعيته واعنف على كل وال عنف على فعلى رعيته
আয় আল্লাহ, যে সকল শাসকরা জনগণের সাথে কোমল আচরণ করে, আপনিও তাদের সাথে কোমল আচরণ করেন। আর যারা জনগণের সাথে কঠোর আচরণ করে আপনিও তাদের সাথে কঠোরতা করেন।
হিশাম ইবনু মালিকের ঘটনা: তিনি অনেক বড়ো একজন খলিফা ছিলেন। বর্ণিত আছে, তিনি একবার আবু হাজিম রহ.-কে যিনি ওই যুগের একজন প্রসিদ্ধ আলিম ও জাহিদ ছিলেন-জিজ্ঞাসা করেন শাসনকার্যে জুলুম না করার উপায় কী। তখন আবু হাজিম রহ. বলেন, আপনি যদি আসলেই জুলুম থেকে মুক্ত হতে চান তাহলে আপনার কর্তব্য, নির্দিষ্ট স্থান থেকেই শুধু কর নেবেন। আবার শরিয়ত নির্দেশিত খাতেই সেগুলো ব্যয় করবেন। তখন হিশাম বলেন-সেটা কার পক্ষেই বা সম্ভব? আবু হাজিম রহ. বলেন—তাঁর পক্ষেই সম্ভব যে জাহান্নামের আগুন সহ্য করতে পারে না।
০৫. তিনি সাধ্যমতো চেষ্টা করবেন, যাতে অধিকাংশ জনগণ তাঁর প্রতি খুশি থাকে। তবে সেই খুশিটা শরিয়তসম্মত কারণেই হতে হবে। ঘটনা: একবার একজন শ্রেষ্ঠ আলিম এক বাদশাহকে উপদেশ দিতে গিয়ে বলেন—আপনি যদি চান, আল্লাহ তাআলা আপনার প্রতি সন্তুষ্ট থাকুক, তাঁর রহমত আপনার ওপর বর্ষিত হোক, তাহলে কোনো সাধারণ কারণ বা শরয়ি কারণ ছাড়া জনগণের সমালোচনাও করবেন না, তাদের মারবেনও না, জনগণের সন্তুষ্টি অর্জনের ক্ষেত্রে যেন শুধুই আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি উদ্দেশ্য হয়।
০৬. আল্লাহ তাআলার হুকুমের বিরোধিতা করে অন্য কারও সন্তুষ্টি অর্জনের পেছনে ছুটবেন না, নিজের ইচ্ছার ওপর শরিয়তের ইচ্ছাকে প্রাধান্য দেবেন। তিনি শরিয়তের বিধি মোতাবেক কারও বিরুদ্ধে রায় দিলে যদি কেউ তার সাথে শত্রুতা পোষণ করে, তাহলে তাঁর কোনো ক্ষতি হবে না। কারণ, এটাই তো তাঁর দায়িত্ব।
০৭. জনগণ যদি শাসকের পক্ষ থেকে শাসকের কাছে বিচার চান, তাহলে তিনি ইনসাফ করবেন। যদি দয়া চান, তাহলে তিনি মাফ করে দেবেন। যদি তাদের সাথে কোনো বিষয়ে ওয়াদা দেন, তাহলে তিনি এর খিলাফ করবেন না।
০৮. শাসকের কর্তব্য মুত্তাকি একনিষ্ঠ আমলি আলিমদের সোহবত গ্রহণ করা, তাদের ওয়াজ নসিহত শোনা, সাথে সাথে ওই সব আলিমদের থেকে বিরত থাকবেন, যাদের অভ্যাসই হলো শাসকের প্রশংসা করা, তাঁর চাহিদানুযায়ী নসিহত করা, যাতে শাসক তাদের উপহার-উপঢৌকন দেন; চাই হালাল হোক বা হারাম।
০৯. তিনি সাধ্যমতো চেষ্টা করবেন যাতে গর্ব, অহংকার না চলে আসে, বিশেষ করে ক্রোধ। কারণ, এই ক্রোধই আকল-বুদ্ধির শত্রু। তাছাড়া এর এত এত ক্ষতি আছে যে, বলে শেষ করা যাবে না।
১০. তিনি নিজে জুলুম থেকে বিরত থাকবেন না, বরং তাঁর কর্তব্য হলো—তাঁর সৈন্য, নায়িব, কাতিব, খাদিমসহ আরও যারা অধীনে থেকে কাজ করছে, সবাইকে জনগণের ওপর জুলুম করা থেকে বিরত রাখবেন। কারণ, এই জুলুমই সুলতানদের নেতৃত্ব শেষ করে দেয়。
টিকাঃ
আদ দুররাতুল গারবা, ফি নাসিহাতিম
০১. যখনই দেশে কোনো সমস্যা দেখা হবে, তিনি সেক্ষেত্রে নিজেকে জনগণ ভাববেন আর অপরজনকে শাসক ভাববেন, তখন যেটা নিজের কাছে ভালো লাগবে না, সেটা জনগণের কাছেও চাপাবেন না।
০২. তার দরজায় প্রয়োজনগ্রস্ত লোক এলে সেটাকে তুচ্ছ মনে করবেন না; বরং এর চিন্তা থেকেও দূরে থাকবেন। কারণ, আল্লাহ তাআলা চান না যে, জনগণের প্রয়োজন বিলম্বে পুরা করা হোক।
এই ব্যাপারে একটি ঘটনা বর্ণিত আছে। বিখ্যাত দার্শনিক এরিস্টটল একদিন তাদের বাদশাহকে উপদেশ দিয়ে বললেন-বাদশাহ, কেউ যখন প্রয়োজনে পড়ে আপনার দরবারে আসে, আপনি তাদের প্রয়োজনপূরণে শিথিলতা করবেন না। যাতে আল্লাহর রহমত ও মাগফিরাত বঞ্চিত না হয়ে যান।
০৩. দিনের পুরো সময় ব্যক্তিগত কাজে ব্যয় করবেন না; বরং চেষ্টা করবেন-কীভাবে রাষ্ট্র পরিচালনা জনগণের দেখভাল করায় সময় বেশি ব্যয় করা যায়।
ঘটনা বর্ণিত আছে যে-গ্রিসের এক দার্শনিক তাদের এক শাসককে উপদেশ দিতে গিয়ে বলেছিলেন-গাফেলদের মতো ঘুমিয়ে থাকবেন না, যাতে আপনার আদালত থেকে সুবিচারপ্রার্থীরা বঞ্চিত হয়ে আল্লাহর দরবারে বিচার না দিয়ে বসে। তখন আপনার রাষ্ট্র ত্রুটিপূর্ণ হয়ে যাবে। কারণ, রাষ্ট্র তো একটা সূর্যের মতো, যার আলো সকালে এক দেওয়ালে পড়ে, বিকালে অপর দেওয়ালে পড়ে। তদ্রুপ রাষ্ট্রক্ষমতা শাসকের নাফরমানির কারণে (সূর্যের আলোর মতো) এক শাসক থেকে অপর শাসকের কাছে হস্তান্তিরিত হয়।
০৪. প্রত্যেকটা কাজ সহজে কোমলভাবে সমাধানের চেষ্টা করবেন, কঠোরভাবে করবেন না। কারণ, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শাসকদের জন্য দুআ করে বলেন-
اللهم ارفق على كل وال رفق على رعيته واعنف على كل وال عنف على فعلى رعيته
আয় আল্লাহ, যে সকল শাসকরা জনগণের সাথে কোমল আচরণ করে, আপনিও তাদের সাথে কোমল আচরণ করেন। আর যারা জনগণের সাথে কঠোর আচরণ করে আপনিও তাদের সাথে কঠোরতা করেন।
হিশাম ইবনু মালিকের ঘটনা: তিনি অনেক বড়ো একজন খলিফা ছিলেন। বর্ণিত আছে, তিনি একবার আবু হাজিম রহ.-কে যিনি ওই যুগের একজন প্রসিদ্ধ আলিম ও জাহিদ ছিলেন-জিজ্ঞাসা করেন শাসনকার্যে জুলুম না করার উপায় কী। তখন আবু হাজিম রহ. বলেন, আপনি যদি আসলেই জুলুম থেকে মুক্ত হতে চান তাহলে আপনার কর্তব্য, নির্দিষ্ট স্থান থেকেই শুধু কর নেবেন। আবার শরিয়ত নির্দেশিত খাতেই সেগুলো ব্যয় করবেন। তখন হিশাম বলেন-সেটা কার পক্ষেই বা সম্ভব? আবু হাজিম রহ. বলেন—তাঁর পক্ষেই সম্ভব যে জাহান্নামের আগুন সহ্য করতে পারে না।
০৫. তিনি সাধ্যমতো চেষ্টা করবেন, যাতে অধিকাংশ জনগণ তাঁর প্রতি খুশি থাকে। তবে সেই খুশিটা শরিয়তসম্মত কারণেই হতে হবে। ঘটনা: একবার একজন শ্রেষ্ঠ আলিম এক বাদশাহকে উপদেশ দিতে গিয়ে বলেন—আপনি যদি চান, আল্লাহ তাআলা আপনার প্রতি সন্তুষ্ট থাকুক, তাঁর রহমত আপনার ওপর বর্ষিত হোক, তাহলে কোনো সাধারণ কারণ বা শরয়ি কারণ ছাড়া জনগণের সমালোচনাও করবেন না, তাদের মারবেনও না, জনগণের সন্তুষ্টি অর্জনের ক্ষেত্রে যেন শুধুই আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি উদ্দেশ্য হয়।
০৬. আল্লাহ তাআলার হুকুমের বিরোধিতা করে অন্য কারও সন্তুষ্টি অর্জনের পেছনে ছুটবেন না, নিজের ইচ্ছার ওপর শরিয়তের ইচ্ছাকে প্রাধান্য দেবেন। তিনি শরিয়তের বিধি মোতাবেক কারও বিরুদ্ধে রায় দিলে যদি কেউ তার সাথে শত্রুতা পোষণ করে, তাহলে তাঁর কোনো ক্ষতি হবে না। কারণ, এটাই তো তাঁর দায়িত্ব।
০৭. জনগণ যদি শাসকের পক্ষ থেকে শাসকের কাছে বিচার চান, তাহলে তিনি ইনসাফ করবেন। যদি দয়া চান, তাহলে তিনি মাফ করে দেবেন। যদি তাদের সাথে কোনো বিষয়ে ওয়াদা দেন, তাহলে তিনি এর খিলাফ করবেন না।
০৮. শাসকের কর্তব্য মুত্তাকি একনিষ্ঠ আমলি আলিমদের সোহবত গ্রহণ করা, তাদের ওয়াজ নসিহত শোনা, সাথে সাথে ওই সব আলিমদের থেকে বিরত থাকবেন, যাদের অভ্যাসই হলো শাসকের প্রশংসা করা, তাঁর চাহিদানুযায়ী নসিহত করা, যাতে শাসক তাদের উপহার-উপঢৌকন দেন; চাই হালাল হোক বা হারাম।
০৯. তিনি সাধ্যমতো চেষ্টা করবেন যাতে গর্ব, অহংকার না চলে আসে, বিশেষ করে ক্রোধ। কারণ, এই ক্রোধই আকল-বুদ্ধির শত্রু। তাছাড়া এর এত এত ক্ষতি আছে যে, বলে শেষ করা যাবে না।
১০. তিনি নিজে জুলুম থেকে বিরত থাকবেন না, বরং তাঁর কর্তব্য হলো—তাঁর সৈন্য, নায়িব, কাতিব, খাদিমসহ আরও যারা অধীনে থেকে কাজ করছে, সবাইকে জনগণের ওপর জুলুম করা থেকে বিরত রাখবেন। কারণ, এই জুলুমই সুলতানদের নেতৃত্ব শেষ করে দেয়。
টিকাঃ
আদ দুররাতুল গারবা, ফি নাসিহাতিম