📄 যুদ্ধে শাসকের কর্তব্য
শত্রুদের মাঝে মতবিরোধ সৃষ্টি করা : যেমন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম গাজওয়াতুল আহজাবে মতভেদ সৃষ্টি করেছেন। ঘটনাটি সংক্ষিপ্তভাবে বললে এ-রকম-ইহুদিদের ক্ষুদ্র একটা দল, যাদের মাঝে সালাম ইবনু আবু হাকিফ, ফিনানা ইবনু রাবি ইবনি আবিল হাকিফ, সালাম ইবনু মুশকিম-এরা ছিল বন নাজির গোত্রের লোক। হাওজা ইবনু কাইস এবং আম্মার, এরা দুইজন ছিল ওয়াইনি গোত্রের। এরা আরবের বড়ো বড়ো গোত্রকে সম্মিলিত করার পরিকল্পনা করে। প্রথমে মক্কার মুশরিকদের কাছে গিয়ে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রস্তাব পেশ করে, সাথে সাথে সাহায্য করারও প্রতিশ্রুতি দেয়। কুরাইশরা প্রস্তাবে রাজি হয়ে যায়। তারপর এরা গাতফান গোত্রের কাছে গিয়ে একই প্রস্তাব পেশ করলে তারাও প্রস্তাবে সাড়া দেয়।
যুদ্ধের সময় হলে কুরাইশ গোত্র তাদের নেতা আবু সুফইয়ানের সাথে বের হয়, গাতফান গোত্র তিন দলে ভাগ হয়ে বের হয় তাদের নেতা উওয়াইনা ইবনু হিসন বনু ফাজারা গোত্রের দায়িত্বে থাকেন, হারিস ইবনু আতফ বনু মুরবা গোত্রের থাকে আর মুসইর ইবনু রাখিলা আশজা গোত্রের দায়িত্বে থাকেন। যখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের বিষয়টা জানতে পারলেন, তখন মদিনার সীমান্তে খন্দক তৈরির আদেশ দেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজেও প্রচুর পরিশ্রম করেন। এভাবেই খন্দকের কাজটা সম্পূর্ণ হলো। খন্দক তৈরির সময় বেশ কিছু মুজিজা দেখা গিয়েছে, যা সিরাতের কিতাবে উল্লেখ আছে। তারা একে একে রুমা উপাত্যকার স্রোতের মিলনকেন্দ্রে তাঁবু ফেলেছে, যা জারফ ও জাগাবা নামক জায়গার মাঝে। বিভিন্ন সম্প্রদায় মিলে এরা হাজার খানেক ছিল সংখ্যায়। কিনান গোত্রও তাদের আনুগামী হয়ে এসেছে। তারা উদ্বুদ-প্রান্তর অভিমুখী নিকমা এলাকার শেষ অংশে তাঁবু ফেলেছে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিন হাজার মুসলিম বাহিনী নিয়ে মদিনা শহর থেকে বের হন, কেউ কেউ বলে সংখ্যা ছিল মাত্র ৯০০জন।
কাব ইবনু আসাদ ছিল বনু কুরাইজার প্রধান রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে সন্ধিতে আবদ্ধ ছিল তো হুয়াই ইবন আখতাব তার কাছে এসে সন্ধি ভঙ্গ করার জন্য তাদের উষ্কে দিতে থাকে, কাবও না করছিল; কিন্তু একসময় তার প্ররোচনায় প্রভাবিত হয়ে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে কৃত সন্ধি ভেঙে ফেলল। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিষয়টা জানতে পারলে সাদ ইবনু মুআজ, সাদ ইবনু উবাদা-তারা দুজন আউস ও খাজরোজ গোত্রপ্রধান-আমর ইবনু আউফ গোত্রের বন্ধু খাওয়াত ইবনু জুবাইর, হারিস ইবনু খাজরাজ গোত্রের বন্ধু আব্দুল্লাহ ইবনু রবাহা রা.-কে তাদের বিষয়টা যাচাই করার জন্য পাঠান। তারা বন কুরাইজা বস্তিতে পৌঁছলে তাদের প্রকাশ্যে বিশ্বাসঘাতকতা করতে দেখেন। শুধু তাই নয়, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের শানে তারা বিভিন্ন খারাপ শব্দ ও ব্যবহার করেছিল। তখন সাদ ইবনু মুআজ তাদের তিরস্কার করেন। তারপর সবাই চলে আসেন।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের বলে দিয়েছেন, যদি সত্যিই বুন কুরাইজা বিশ্বাস ভঙ্গ করে থাকে, তাহলে যেন তাকে অস্পষ্টভাবে ইঙ্গিতে বিষয়টা জানিয়ে দেয়। তখন তারা এসে নবী রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বললেন-আজল ও কারাহ। অর্থাৎ আজল ও কারাহ 'রাজি' অভিযানে যেমন চুক্তি ভঙ্গ করেছিল, তদ্রুপ বনু কুরইজাও চুক্তি ভঙ্গ করেছে।
ফলে বিষয়টা গুরুতর হয়ে গেল, চতুর্দিক থেকে মুসলিমরা শত্রুদের দ্বারা বেষ্টিত হয়ে গেল, যখন এইরকম গুরুতর কঠিন অবস্থা, তখন নুআইম ইবনু মাসউদ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে এসে বলল-ইয়া রাসুলাল্লাহ, আমি ইসলাম গ্রহণ করে নিয়েছি। যদিও আমার কাউম এ-বিষয়ে কিছুই জানে না। এখন আমাকে তাদের বিরুদ্ধে যে কোনো কিছুর আদেশ করতে পারেন।
তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে বলেন-তুমি তো একাই আছ। আমাদের পক্ষে যদি পার, তাহলে যুদ্ধটা কোনো কৌশলে বন্ধ করার চেষ্টা করো। কারণ, যুদ্ধ মানেই ধোঁকা।
তখন নুআইম রা. বনু কুরাইজার কাছে এসে বললেন-জাহিলি যুগে তাদের সাথে নুআইম রা.-এর চলাফেরা হতো, দেখো, তোমরা জানো আমি তোমাদের কেমন ভালোবাসি, আমাদের এবং তোমাদের মাঝে কতটা দৃঢ় সম্পর্ক।
তারা বলল-তা তো বটেই।
তিনি বললেন-তোমরা কিন্তু কুরাইশ ও গাতফানের মতো নও। এ শহরটা যেহেতু তোমাদেরই, তাই তোমরা কুরাইশ ও গাতফানের মতো পালাতে পারবে না। যদি যুদ্ধে তোমরা জিতে যাও, তাহলে তো হলো। আর না-হয় তারা তোমাদের ছেড়ে নিজেদের এলাকায় চলে যাবে। আর তখন তোমরা একা মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সাথে যুদ্ধ করার সামার্থ্য রাখবে না। এখন যদি কুরাইশ ও গাতফানের সাথে হয়ে যুদ্ধ করতেই চাও, তাহলে আগে তাদের থেকে কোনো কিছু বন্ধক হিসাবে নিয়ে রেখো
তারা বলল—আপনি তো সুন্দর পরামর্শ দিলেন।
তারপর তিনি কুরাইশের কাছে গিয়ে আবু সুফইয়ানকে বললেন—তোমরা তো আমার সম্পর্কে সুধারণাই রাখো। তো শোনো, তোমাদের অনতিবিলম্বে জানাতে হবে এমন একটা বিষয় আমার কানে এসেছে। এখন শুনতে চাইলে আমার নাম গোপন রাখতে হবে।
তারা বলল—কী সে বিষয়?
তিনি বললেন—ইহুদিরা মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের) সাথে চুক্তি ভঙ্গ করে এখন খুব অনুতপ্ত হয়েছে। তারা এখন এই ওয়াদা করেছে যে, তোমাদের থেকে একদল যোদ্ধাকে বন্ধক হিসাবে নিয়ে মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর কাছে সোপর্দ করবে, তারপর তার সাথে মিলে তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে। তখন কুরাইশ তাকে ধন্যবাদ জানাল।
তারপর গাতফানের কাছে এসে একই কথা বলল। তারপর চতুর্থ হিজরির শাউয়াল মাসের শনিবার রাতে আবু সুফইয়ান ও গাতফান বনু কুরাইজার কাছে দূত পাঠিয়ে বলল—দেখো আমাদের এখন আর থাকার মতো জায়গা নেই, সুতরাং তোমরাই যুদ্ধ শুরু করে দাও।
তখন ইহুদিরা দূত পাঠিয়ে বলল—আজ কিন্তু শনিবার, তবুও তোমাদের সাথে লড়াই করব না, যতক্ষণ না তোমরা আমাদের বন্ধক দাও।
তখন কুরাইশ ও গাতফান আবার দূত পাঠিয়ে বলল—আল্লাহর কসম, কখনোই তোমাদের বন্ধক দেব না। তোমরা বরং বেরিয়ে পড়ো।
তখন বনু কুরাইজা বলাবলি করল—তাহলে তো নুআইম সত্যই বলল! যখন দূত ফিরে এসে তাদের এই প্রত্যাখানের কথা বলল তখন কুরাইশরাও বলল—নুআইম তো তাহলে ঠিকই বলেছে। ফলে তারা লড়াই করার ইচ্ছা বাদ দিলে এভাবে এই বিশাল দশ হাজারের বাহিনীও দুর্বল হয়ে গেল। আল্লাহ তাআলা তাদের পরাজিত করেন।
মোটকথা, শত্রুরা যখন পরস্পর মতবিরোধে লিপ্ত হয়ে যায়, তখন এমনিতেই দুর্বল হয়ে যায়। কারণ, মতবিরোধ থেকে দুর্বলতা সৃষ্টি হয়, শক্তি ও রাষ্ট্র হাতছাড়া হয়। এ-জন্য আল্লাহ তাআলা বলেন-
وَلَا تَنَازَعُوا فَتَفْشَلُوا وَتَذْهَبَ رِيحُكُمْ وَاصْبِرُوا إِنَّ اللَّهَ مَعَ الصَّابِرِينَ
তোমরা পরস্পর মতবিরোধে লিপ্ত হয়ো না তাহলে ব্যর্থ হবে, শক্তিও প্রতাপ চলে যাবে。
টিকাঃ
** সূরা আনফাল, আয়াত: ৪৬