📘 ইসলামি রাষ্ট্র ব্যবস্থা > 📄 আলি রা. এর রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপ

📄 আলি রা. এর রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপ


এক. তিনি পূর্ববর্তী খলিফাদের খুব প্রশংসা করতেন। ইমাম সুয়ুতি রহ.-এর তারিখুল খুলাফাতে উল্লেখ আছে, হাসান রা. থেকে ইবনু আসাকির রহ. বর্ণনা করেন—আলি রা. যখন বসরায় আগমন করেন, তখন ইবনু কাওয়া ও কাইস ইবনু আব্বাদ তার কাছে এসে বলল: 'আচ্ছা বলেন তো, আপনি কী উদ্দেশ্যে এখানে এসেছেন? উম্মাহর নেতৃত্ব গ্রহণ করে একে অপরকে মারামারিতে লিপ্ত করছেন। আসলে কি আল্লাহর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আপনাকে (নেতৃত্ব গ্রহণের) নির্দেশ দিয়েছেন? আপনি কিছু শুনে থাকলে বলেন। কারণ, আপনি যা শুনেছেন সে বিষয়ে আপনি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, নিরাপদ।'

তখন আলি রা. বলেন— 'শোনো, এ ব্যাপারে আমার কাছে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কোনো নির্দেশ নেই। আল্লাহর কসম! আমি যদি তাকে সর্বপ্রথম সত্যায়ন করে থাকি, তাহলে তো আমি কখনোই তার নামে মিথ্যা কথা বলতে পারি না। আর যদি আমার কাছে এ ব্যাপারে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কোনো নির্দেশ থাকত, তাহলে তো আমি আবু বকর রা. ও উমার রা.- কে মিম্বারের ওপর বসতেই দিতাম না। তখন আমার নিজ হাতেই আমি তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করতাম, যদিও আমার হাতে এই রুমালটি ছাড়া আর কিছুই না থাকত। বস্তুত নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে হত্যাও করা হয় নি, তিনি আচমকাও মৃত্যুবরণ করেন নি। অসুস্থ অবস্থায় কিছু কাল ছিলেন, মুয়াজ্জিন তার কাছে এসে নামাজের অনুমতি চাইলে তিনি আবু বকর রা.-কে নামাজ পড়ানোর আদেশ করতেন, যদিও আমার মর্যাদা তার কাছে কেমন, কতটুকু তার সেটা অজানা ছিল না। আবু বকরকে ইমামতির নির্দেশ দেওয়ার পর নবীজির স্ত্রীদের একজন (আম্মাজান আয়িশা) আবু বকর রা.-কে নামাজ পড়ানো থেকে ফেরাতে চাইলে তিনি কষ্ট পান এবং তার কথা না করে দিয়ে বলেন—

انتن صواحب يوسف مروء ابا بكر يصلي بالناس

'তোমরা নারীরা আসলে ইউসুফ আ. এর (সাথে চক্রান্ত করা নারীদের মতো)। যাও আবু বকরকে নামাজ পড়ানো।

পরে যখন নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মৃত্যুবরণ করলেন, তখন আমরা চিন্তা করে আমাদের দুনিয়াবি বিষয়ের জন্য তাকে নির্বাচন করলাম, যাকে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের দ্বীনের জন্য মনোনীত করেছিলেন। কারণ, নামাজই ইসলামের ভিত্তি, নামাজই দ্বীনের মূল ও প্রধান।

তাই, আমরা আবু বকর রা. এর হাতে বাইআত গ্রহণ করলাম। আর তিনি তার যোগ্যও ছিলেন। তার বিষয়ে কেউ ইখতিলাফও করে নি, কেউ তার বিরুদ্ধে উসকেও দেয় নি, তার থেকে দায়মুক্তিও ঘোষণা করে নি। তাই, আমি আবু বকর রা.-এর হক আদায় করি। তার আনুগত্য মেনে নিই। তার সাথেই তার বাহিনীতে যুদ্ধ করি। তিনি কিছু দিলে সেটা আমি গ্রহণ করতাম, তিনি যুদ্ধের আদেশ করলে যুদ্ধ করতাম। তার আদেশে নিজের চাবুক দিয়ে হদ প্রয়োগ করতাম।

তার মৃত্যুর পর উমার রা. যখন শাসনভার গ্রহণ করলেন, তিনি তার ভাই আবু বকর রা. এর নির্দেশেই শাসনভার গ্রহণ করেছিলেন। তখন আমরা তার বাইআত গ্রহণ করলাম। তার বিষয়েও কেউ মতবিরোধ করে নি। কেউ তার বিরুদ্ধে উসকেও দেয় নি, সম্পর্কমুক্তও ঘোষণা করে নি। আমি উমার রা. এর হক আদায় করেছি। তার আনুগত্য স্বীকার করেছি। তার বাহিনীতে তারই সাথে যুদ্ধ করেছি। তিনি কিছু দিলে সেটা আমি গ্রহণ করতাম। তিনি যুদ্ধের কথা বললে আমি যুদ্ধ করতাম। তার নির্দেশে আমার নিজ হাতে হদ প্রয়োগ করতাম।

তিনি যখন ইনতিকাল করলেন, তখন মনে মনে নবীজির আত্মীয়তার কথা, ইসলামের ক্ষেত্রে অগ্রবর্তিতা ও শ্রেষ্ঠত্বের কথা চিন্তায় এলো। আমার মনে হচ্ছিল যে, আমার সাথে ইনসাফ করা হচ্ছে না। উমার রা. জীবিত থাকাবস্থায় আশঙ্কা করেছিলেন, না-জানি পরবর্তী খলিফা কোনো পাপ করে ফেলতে পারে। তাই, তিনি খিলাফত থেকে নিজেও বের হয়ে এলেন, নিজের ছেলেকেও বের করে ফেললেন। যদি তিনি পক্ষপাতিত্ব করতে চাইতেন, তাহলে খিলাফতের ক্ষেত্রে তার ছেলেকেই অগ্রাধিকার দিতেন; কিন্তু তিনি খিলাফতের বিষয়টি কুরাইশের ছয়জনের একটি দলের কাছে সোপর্দ করলেন, যাদের মধ্যে আমিও ছিলাম। যখন সবাই একত্র হলো, তখন আমার মনে হলো আমার সাথে ইনসাফ করা হবে না।

যাই হোক, আব্দুর রহমান ইবনু আউফ রা. আমাদের প্রতিশ্রুতি গ্রহণ করলেন, যার হাতে আল্লাহ তাআলা এই শাসনভার সোপর্দ করবেন আমরা তার কথা শুনবো এবং মানবো। তারপর তিনি উসমান রা. এর হাতে হাত রেখে বাইআত গ্রহণ করলেন। তখন আমি চিন্তা করে দেখি এবারও আমাকে নিজ হাতে বাইআত গ্রহণের পরিবর্তে আনুগত্য করতে হলো। এবারও দেখি আমাকে অন্যের প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হতে হলো। যাই হোক, আমরা উভয়ের হাতে বাইআত গ্রহণ করেছি। তার হকও আদায় করেছি, আনুগত্যও স্বীকার করেছি। তার বাহিনীতে তারই সাথে যুদ্ধ করেছি। তার সময়ে আমি নিজের চাবুক দিয়েই হদ প্রয়োগ করতাম।

যখন তিনি শহিদ হলেন, তখন আমি নিজের বিষয়ে চিন্তা করলাম। যখন আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের (নামাজ পড়ানোর নির্দেশে) নির্দেশিত দুই খলিফা চলে গেলেন এবং পরবর্তী প্রতিশ্রুতিবদ্ধ তৃতীয় খলিফা শহিদ হলেন, তখন দেখি মক্কা-মদিনার অধিবাসী, কুফা-বসরার অধিবাসীরা আমার হাতে বাইআত গ্রহণ করে। আর তখনই আমার বিরুদ্ধে আমার সমতুল্য নয় এমন এক ব্যক্তি বিদ্রোহ করে বসল-যে কিনা আমার মতো রাসুলের নিকটাত্মীয়ও নয়, আমার মতো আলিমও নয়, তদ্রুপ ইসলাম গ্রহণে আমার চেয়ে অগ্রবর্তীও নয়। মূলত আমিই তার চেয়ে বেশি হকদার ছিলাম।'

আলি রা.-এর দীর্ঘ বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, পূর্ববর্তী খলিফাদের প্রশংসা বর্ণনা করাও খলিফার একটি রাষ্ট্রীয় বক্তব্য। তাহলে জনগণও তার প্রতি আকৃষ্ট হবে। খলিফাদের ভুলত্রুটি হয়ে গেলেও সেগুলো উল্লেখ করবে না, বরং সে বিষয়ে নীরবতা অবলম্বন করবে।

দুই. রাষ্ট্রীয় আরও কিছু কর্তব্য আছে, যা আলি রা. বলেন-শাসকের কর্তব্য, শাসনকার্যে তিনটি মূলনীতি অবলম্বন করা। যথা: (ক) রাগের সময় শাস্তি না দেওয়া; (খ) সদাচারীকে যত দ্রুত সম্ভব পুরস্কৃত করা; (গ) নতুন কোনো কিছু করার উদ্যোগ গ্রহণ করলে ধীরে সুস্থে করা।

কারণ, রাগের সময় শাস্তি না দিয়ে বিলম্বিত করলে মাফ করার মানসিকতা তৈরি হতে পারে। আর সদাচারীকে দ্রুত পুরস্কৃত করলে জনগণও খুব সহজেই তার ডাকে সাড়া দেবে। আর ধীর সুস্থে কাজ করলে কাজের বিভিন্ন পদ্ধতি চিন্তায় আসতে পারে, ফলে সঠিক পদ্ধতি স্পষ্ট হবে।

তিন. তিনি একবার এক ইহুদির সাথে আদালতে উপস্থিত হয়েছিলেন। ঘটনাটি মাসিরা থেকে তিনি কাজি শুরাইহ থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন-আলি রা. যখন সিফফিন যুদ্ধে গমন করেন, তখন হঠাৎ তার শিরস্ত্রাণটি হারিয়ে যায়। যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর কুফায় ফিরে এলে তিনি শিরস্ত্রাণটি এক ইহুদির হাতে দেখতে পান। তখন তিনি ওই ইহুদিকে বলেন- 'শিরস্ত্রাণটি তো আমার। এটা আমি বিক্রি করি নি, কাউকে হাদিয়াও দিই নি।'

ইহুদিও বলল-'না! শিরস্ত্রাণটি আমার।'

তখন আলি রা. বললেন- 'তাহলে কাজির কাছে চলো।'

আলি রা. আদালতে গিয়ে কাজি শুরাইহর পাশে বসে বললেন, বিবাদী যদি ইহুদি না হতো, তাহলে আমি তার সাথেই বসতাম; কিন্তু আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি-

أصغروهم من حيث أصغرهم الله

আল্লাহ তাআলা যে সকল ক্ষেত্রে তাদেরকে (আহলে কিতাব) লাঞ্ছিত করেছেন, তোমরাও সেসব স্থানে তাদেরকে লাঞ্ছিত করো।

তখন কাজি শুরাইহ বললেন- 'আচ্ছা, আমিরুল মুমিনিন! এবার বলেন-আপনার দাবি কী?'

তিনি বললেন- 'ইহুদির এই যে শিরস্ত্রাণটি হাতে দেখতে পাচ্ছ, এটা আমার। আমি এটা বিক্রিও করি নি, কাউকে দানও করি নি।'

শুরাইহ ইহুদিকে জিজ্ঞাসা করলেন-'এ ব্যাপারে তুমি কী বলো?'
সে বলল-'এটা আমারই শিরস্ত্রাণ। এটা আগে থেকেই আমার কাছে আছে।'
তখন শুরাইহ আমিরুল মুমিনিনকে বললেন- 'আপনার কাছে কি কোনো প্রমাণ আছে?'

তিনি বললেন-'আছে। হাসান হুসাইনই সাক্ষ্য দেবে যে-শিরস্ত্রাণটি আমার।'
শুরাইহ বললেন-'সন্তানের সাক্ষ্য পিতার ক্ষেত্রে অগ্রহণযোগ্য।'
তখন আলি রা. বললেন- 'জান্নাতি ব্যক্তির সাক্ষ্য অগ্রহণযোগ্য? আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি-

الحسن والحسين سيدا شباب أهل الجنة

'হাসান হুসাইন জান্নাতি যুবকদের সর্দার।'

তখন ওই ইহুদি বলে উঠলে- 'আমিরুল মুমিনিন আমাকে তার কাজির কাছে নিয়ে এসেছেন, অথচ তার কাজিই তার বিরুদ্ধে ফায়সালা করেছে। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, এই দ্বীন ইসলামই সত্য। আমি আরও সাক্ষ্য দিচ্ছি, আল্লাহ ছাড়া সত্য কোনো ইলাহ নেই এবং মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহর রাসুল। আসলে শিরস্ত্রাণটি আপনারই ছিল।'

সুতরাং এখান থেকে বোঝা গেল, শাসকের কর্তব্য হলো-তিনি নিজেও শরিয়তের বিধিবিধান পালন করবেন। ফলে তাকে দেখেই মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে শরিয়তের পাবন্দি করবে। কারণ, রাজার চালেই রাজ্য চলে। এজন্যই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম সম্রাট হিরক্লিয়াসের কাছে লেখা পত্রে বলেছিলেন-

• فإن توليت فإن عليك إثم الأريثين

'যদি তুমি (ইসলাম গ্রহণ থেকে) ফিরে যাও, না হলে প্রজাদের গুনাহ তোমারই ওপর বর্তাবে।'

টিকাঃ
***সুয়ুতি, তারিখুল খুলাফা
১৯৬ সহিহ বুখারি, ৪৫৫৫

📘 ইসলামি রাষ্ট্র ব্যবস্থা > 📄 আলি রা. এর চমৎকার বিচার

📄 আলি রা. এর চমৎকার বিচার


জুর ইবনু হাবিশ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন—দুজন লোক একসাথে খেতে বসেছে। একজনের কাছে ৩টি রুটি, অপরজনের কাছে ৫টি। তারা যখন রুটিগুলো সামনে রেখেছে, তখন এক লোক তাদের সামনে এসে সালাম দেয়। তারা তাকে তাদের সাথে খেতে বলে। লোকটিও তাদের সাথে শরিক হয়। তিন জন মিলে ৮টি রুটি খায়। যাওয়ার সময় লোকটি আট দিরহাম দিয়ে বলে— 'এই নাও তোমাদের খাবারের বিনিময়।'

এখন দুজন ঝগড়া শুরু করে দেয়। পাঁচ রুটিওয়ালা বলে— 'আমার পাঁচ দিরহাম, আর তোমার তিন দিরহাম।'

তিন দিরহামওয়ালা বলে— 'দেখো! সমান সমান ভাগ ছাড়া আমি নেব না।'

তখন তারা দুজন আমিরুল মুমিনিন আলি রা.-এর কাছে পুরো ঘটনাটি খুলে বলে। আলি রা. তিন রুটিওয়ালাকে বলেন— 'দেখো, তোমার সাথি তো একটি সুন্দর মতই পেশ করেছে। কারণ, তার রুটি তোমার চেয়েও বেশি। সুতরাং, তুমি তিনটিই মেনে নাও।'

সে বলে উঠল—'আমি ইনসাফ পেতে চাই।'

তখন আলি রা. বললেন— 'তুমি যদি ইনসাফ পেতে চাও, তাহলে তো তোমার ভাগ্যে একটাই জুটবে!'

লোকটি বলল—'আরে! এটা কী?'

তিনি বললেন— 'এটাই ইনসাফ।'

সে বলল—'তাহলে আমাকে বুঝিয়ে দেন—ইনসাফ কীভাবে হলো, যাতে আমি মেনে নিতে পারি?'

আলি রা. বললেন—'তাহলে শোনো, আটটি রুটিকে ২৪ ভাগ করো। তোমরা তিনজনই মিলেমিশে এই ২৪ ভাগ রুটি খেয়েছ। যেহেতু কে কম খেয়েছে, আর কে বেশি খেয়েছে জানা নাই; সুতরাং ধরা হবে, সবাই সমান সমান খেয়েছ। তাহলে তুমি খেয়েছ ২৪ ভাগের ৮ ভাগ। মূলত, ২৪ ভাগের ৯ ভাগ তোমার নিজের। আর তোমার সাথি খেয়েছে ৮ ভাগ। প্রকৃত পক্ষে, সে ১৫ ভাগের মালিক। সেখান থেকে শুধু ৮ ভাগ খেয়েছে। তার আরও বাকি আছে ৭ ভাগ, যা দিরহামওয়ালা খেয়েছে।

আর তোমার বাকি ছিল এক ভাগ, যা দিরহামওয়ালা খেয়েছে। সুতরাং, তোমার একভাগের বিনিময়ে এক দিরহাম, আর তার ৭ ভাগের বিনিময়ে ৭ দিরহাম।'
তখন লোকটি বলল-'এখন আমি বুঝলাম।'

টিকাঃ
১৯ তারিখুল খুলাফা, ১৩৯

📘 ইসলামি রাষ্ট্র ব্যবস্থা > 📄 যুদ্ধে শাসকের কর্তব্য

📄 যুদ্ধে শাসকের কর্তব্য


শত্রুদের মাঝে মতবিরোধ সৃষ্টি করা : যেমন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম গাজওয়াতুল আহজাবে মতভেদ সৃষ্টি করেছেন। ঘটনাটি সংক্ষিপ্তভাবে বললে এ-রকম-ইহুদিদের ক্ষুদ্র একটা দল, যাদের মাঝে সালাম ইবনু আবু হাকিফ, ফিনানা ইবনু রাবি ইবনি আবিল হাকিফ, সালাম ইবনু মুশকিম-এরা ছিল বন নাজির গোত্রের লোক। হাওজা ইবনু কাইস এবং আম্মার, এরা দুইজন ছিল ওয়াইনি গোত্রের। এরা আরবের বড়ো বড়ো গোত্রকে সম্মিলিত করার পরিকল্পনা করে। প্রথমে মক্কার মুশরিকদের কাছে গিয়ে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রস্তাব পেশ করে, সাথে সাথে সাহায্য করারও প্রতিশ্রুতি দেয়। কুরাইশরা প্রস্তাবে রাজি হয়ে যায়। তারপর এরা গাতফান গোত্রের কাছে গিয়ে একই প্রস্তাব পেশ করলে তারাও প্রস্তাবে সাড়া দেয়।

যুদ্ধের সময় হলে কুরাইশ গোত্র তাদের নেতা আবু সুফইয়ানের সাথে বের হয়, গাতফান গোত্র তিন দলে ভাগ হয়ে বের হয় তাদের নেতা উওয়াইনা ইবনু হিসন বনু ফাজারা গোত্রের দায়িত্বে থাকেন, হারিস ইবনু আতফ বনু মুরবা গোত্রের থাকে আর মুসইর ইবনু রাখিলা আশজা গোত্রের দায়িত্বে থাকেন। যখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের বিষয়টা জানতে পারলেন, তখন মদিনার সীমান্তে খন্দক তৈরির আদেশ দেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজেও প্রচুর পরিশ্রম করেন। এভাবেই খন্দকের কাজটা সম্পূর্ণ হলো। খন্দক তৈরির সময় বেশ কিছু মুজিজা দেখা গিয়েছে, যা সিরাতের কিতাবে উল্লেখ আছে। তারা একে একে রুমা উপাত্যকার স্রোতের মিলনকেন্দ্রে তাঁবু ফেলেছে, যা জারফ ও জাগাবা নামক জায়গার মাঝে। বিভিন্ন সম্প্রদায় মিলে এরা হাজার খানেক ছিল সংখ্যায়। কিনান গোত্রও তাদের আনুগামী হয়ে এসেছে। তারা উদ্বুদ-প্রান্তর অভিমুখী নিকমা এলাকার শেষ অংশে তাঁবু ফেলেছে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিন হাজার মুসলিম বাহিনী নিয়ে মদিনা শহর থেকে বের হন, কেউ কেউ বলে সংখ্যা ছিল মাত্র ৯০০জন।

কাব ইবনু আসাদ ছিল বনু কুরাইজার প্রধান রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে সন্ধিতে আবদ্ধ ছিল তো হুয়াই ইবন আখতাব তার কাছে এসে সন্ধি ভঙ্গ করার জন্য তাদের উষ্কে দিতে থাকে, কাবও না করছিল; কিন্তু একসময় তার প্ররোচনায় প্রভাবিত হয়ে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে কৃত সন্ধি ভেঙে ফেলল। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিষয়টা জানতে পারলে সাদ ইবনু মুআজ, সাদ ইবনু উবাদা-তারা দুজন আউস ও খাজরোজ গোত্রপ্রধান-আমর ইবনু আউফ গোত্রের বন্ধু খাওয়াত ইবনু জুবাইর, হারিস ইবনু খাজরাজ গোত্রের বন্ধু আব্দুল্লাহ ইবনু রবাহা রা.-কে তাদের বিষয়টা যাচাই করার জন্য পাঠান। তারা বন কুরাইজা বস্তিতে পৌঁছলে তাদের প্রকাশ্যে বিশ্বাসঘাতকতা করতে দেখেন। শুধু তাই নয়, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের শানে তারা বিভিন্ন খারাপ শব্দ ও ব্যবহার করেছিল। তখন সাদ ইবনু মুআজ তাদের তিরস্কার করেন। তারপর সবাই চলে আসেন।

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের বলে দিয়েছেন, যদি সত্যিই বুন কুরাইজা বিশ্বাস ভঙ্গ করে থাকে, তাহলে যেন তাকে অস্পষ্টভাবে ইঙ্গিতে বিষয়টা জানিয়ে দেয়। তখন তারা এসে নবী রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বললেন-আজল ও কারাহ। অর্থাৎ আজল ও কারাহ 'রাজি' অভিযানে যেমন চুক্তি ভঙ্গ করেছিল, তদ্রুপ বনু কুরইজাও চুক্তি ভঙ্গ করেছে।

ফলে বিষয়টা গুরুতর হয়ে গেল, চতুর্দিক থেকে মুসলিমরা শত্রুদের দ্বারা বেষ্টিত হয়ে গেল, যখন এইরকম গুরুতর কঠিন অবস্থা, তখন নুআইম ইবনু মাসউদ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে এসে বলল-ইয়া রাসুলাল্লাহ, আমি ইসলাম গ্রহণ করে নিয়েছি। যদিও আমার কাউম এ-বিষয়ে কিছুই জানে না। এখন আমাকে তাদের বিরুদ্ধে যে কোনো কিছুর আদেশ করতে পারেন।

তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে বলেন-তুমি তো একাই আছ। আমাদের পক্ষে যদি পার, তাহলে যুদ্ধটা কোনো কৌশলে বন্ধ করার চেষ্টা করো। কারণ, যুদ্ধ মানেই ধোঁকা।

তখন নুআইম রা. বনু কুরাইজার কাছে এসে বললেন-জাহিলি যুগে তাদের সাথে নুআইম রা.-এর চলাফেরা হতো, দেখো, তোমরা জানো আমি তোমাদের কেমন ভালোবাসি, আমাদের এবং তোমাদের মাঝে কতটা দৃঢ় সম্পর্ক।

তারা বলল-তা তো বটেই।

তিনি বললেন-তোমরা কিন্তু কুরাইশ ও গাতফানের মতো নও। এ শহরটা যেহেতু তোমাদেরই, তাই তোমরা কুরাইশ ও গাতফানের মতো পালাতে পারবে না। যদি যুদ্ধে তোমরা জিতে যাও, তাহলে তো হলো। আর না-হয় তারা তোমাদের ছেড়ে নিজেদের এলাকায় চলে যাবে। আর তখন তোমরা একা মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সাথে যুদ্ধ করার সামার্থ্য রাখবে না। এখন যদি কুরাইশ ও গাতফানের সাথে হয়ে যুদ্ধ করতেই চাও, তাহলে আগে তাদের থেকে কোনো কিছু বন্ধক হিসাবে নিয়ে রেখো

তারা বলল—আপনি তো সুন্দর পরামর্শ দিলেন।

তারপর তিনি কুরাইশের কাছে গিয়ে আবু সুফইয়ানকে বললেন—তোমরা তো আমার সম্পর্কে সুধারণাই রাখো। তো শোনো, তোমাদের অনতিবিলম্বে জানাতে হবে এমন একটা বিষয় আমার কানে এসেছে। এখন শুনতে চাইলে আমার নাম গোপন রাখতে হবে।

তারা বলল—কী সে বিষয়?

তিনি বললেন—ইহুদিরা মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের) সাথে চুক্তি ভঙ্গ করে এখন খুব অনুতপ্ত হয়েছে। তারা এখন এই ওয়াদা করেছে যে, তোমাদের থেকে একদল যোদ্ধাকে বন্ধক হিসাবে নিয়ে মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর কাছে সোপর্দ করবে, তারপর তার সাথে মিলে তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে। তখন কুরাইশ তাকে ধন্যবাদ জানাল।

তারপর গাতফানের কাছে এসে একই কথা বলল। তারপর চতুর্থ হিজরির শাউয়াল মাসের শনিবার রাতে আবু সুফইয়ান ও গাতফান বনু কুরাইজার কাছে দূত পাঠিয়ে বলল—দেখো আমাদের এখন আর থাকার মতো জায়গা নেই, সুতরাং তোমরাই যুদ্ধ শুরু করে দাও।

তখন ইহুদিরা দূত পাঠিয়ে বলল—আজ কিন্তু শনিবার, তবুও তোমাদের সাথে লড়াই করব না, যতক্ষণ না তোমরা আমাদের বন্ধক দাও।

তখন কুরাইশ ও গাতফান আবার দূত পাঠিয়ে বলল—আল্লাহর কসম, কখনোই তোমাদের বন্ধক দেব না। তোমরা বরং বেরিয়ে পড়ো।

তখন বনু কুরাইজা বলাবলি করল—তাহলে তো নুআইম সত্যই বলল! যখন দূত ফিরে এসে তাদের এই প্রত্যাখানের কথা বলল তখন কুরাইশরাও বলল—নুআইম তো তাহলে ঠিকই বলেছে। ফলে তারা লড়াই করার ইচ্ছা বাদ দিলে এভাবে এই বিশাল দশ হাজারের বাহিনীও দুর্বল হয়ে গেল। আল্লাহ তাআলা তাদের পরাজিত করেন।

মোটকথা, শত্রুরা যখন পরস্পর মতবিরোধে লিপ্ত হয়ে যায়, তখন এমনিতেই দুর্বল হয়ে যায়। কারণ, মতবিরোধ থেকে দুর্বলতা সৃষ্টি হয়, শক্তি ও রাষ্ট্র হাতছাড়া হয়। এ-জন্য আল্লাহ তাআলা বলেন-

وَلَا تَنَازَعُوا فَتَفْشَلُوا وَتَذْهَبَ رِيحُكُمْ وَاصْبِرُوا إِنَّ اللَّهَ مَعَ الصَّابِرِينَ

তোমরা পরস্পর মতবিরোধে লিপ্ত হয়ো না তাহলে ব্যর্থ হবে, শক্তিও প্রতাপ চলে যাবে。

টিকাঃ
** সূরা আনফাল, আয়াত: ৪৬

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00