📘 ইসলামি রাষ্ট্র ব্যবস্থা > 📄 উসমান রা.-এর রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপ

📄 উসমান রা.-এর রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপ


প্রশাসক ও গভর্নরদের ক্ষেত্রে তার একটি রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপ ছিল, তিনি তার প্রশাসকদের কাছে পত্র লিখে বলেন- 'দেখো, আল্লাহ তাআলা শাসকদের নির্দেশ দিয়েছেন তারা যেন রক্ষক হয়। তাদের এ-কথা বলেন-তারা যেন রক্ষক হয় (কর আদায়কারী) এই উম্মাহর অগ্রভাগ জামাআত রক্ষক ছিল, ভক্ষক ছিল না। তবে খুবই আশঙ্কা যে, শাসকরা ভক্ষক হয়ে যাবে, (শুধু রাজস্ব নিয়েই চিন্তা করবে) রক্ষক থাকবে না (প্রজাদের দেখভাল করবে না)। যদি তারা এমনটাই করে, তাহলে লজ্জা উঠে যাবে, আমানতদারিতা ও আনুগত্য চলে যাবে। শোনো, সবচেয়ে উত্তম পন্থা হচ্ছে-তোমরা মুসলিমদের বিষয়াদির দেখভাল করবে, একই সাথে তাদের কর্তব্যেরও খেয়াল রাখবে। তাদের প্রাপ্য তাদের দেবে। তাদের কর্তব্য তাদের থেকে আদায় করবে। জিম্মিদের ক্ষেত্রেও দুটো বিষয় খেয়াল করবে-তাদের প্রাপ্য তাদের দেবে এবং তাদের দায়িত্ব তাদের থেকে বুঝে নেবে। তারপর যে সকল শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করো, তাদের সাথে আনুগত্যের সাথে বিজয় লাভ করো。

এখান থেকে বোঝা যায় যে, উসমান রা. প্রশাসকদের কাছে পাঠানো এই পত্রে জনগণের ওপর তাদের দায়-দায়িত্বের বিষয়ে খুব জোর দিয়েছেন। তিনি তাদের ভালো করে বুঝিয়েছেন যে-তাদের দায়িত্ব সম্পদ জমা করা নয়, বরং তাদের কর্তব্য হচ্ছে জনগণের দেখভাল করা। এ কারণে তিনি সুস্পষ্ট করে বলে দিয়েছেন, কীভাবে মানুষদের শাসন করবে। অর্থাৎ, জনগণ থেকে তাদের কর্তব্য আদায় করা এবং তাদের তাদের প্রাপ্য বুঝিয়ে দেওয়া। তারা যদি এমনটা করে, তাহলে এই উম্মাহ ঠিক থাকবে। আর তারা যদি রক্ষক হয়ে যায়, শুধু সম্পদ নিয়েই চিন্তা করে, তাহলে লজ্জা-শরম উঠে যাবে, আমানতদারিতা ও বিশ্বস্ততা চলে যাবে।

টিকাঃ
১৯০ তারিখুত তাবারি, খণ্ড: ৫, পৃষ্ঠা: ২৪৪৮

📘 ইসলামি রাষ্ট্র ব্যবস্থা > 📄 আলি রা. এর কিছু উপদেশ

📄 আলি রা. এর কিছু উপদেশ


০১. আবু ইসহাক থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আলি রা. বলেছেন- 'কিছু উপদেশ এমন আছে, সে অনুযায়ী যদি তোমরা কোনো পশুকেও চালাতে থাকো, তাহলে তার মতো আরেকটা পশুর নাগাল পাওয়ার আগেই সেটাকে ক্লান্ত করে ফেলবে। তাই, একজন বান্দার উচিত হলো: * (ক) বান্দা যেন তার রবের কাছেই শুধু আশা করে; * (খ) তার গুনাহকেই যেন ভয় করে;

(গ) যে জানে না সে যেন জানতে লজ্জাবোধ না করে; (ঘ) যখন কোনো আলিমকে তার অজানা বিষয়ে জিজ্ঞাসা করা হয়, তখন যেন এ কথা বলতে লজ্জাবোধ না করে—'আল্লাহই ভালো জানেন'।

শুনে রাখো—ঈমান থেকে সবরের স্থান হলো শরীর থেকে মাথার স্থানের মতো। যদি মাথাই না থাকে, তাহলে শরীরের কোনো মূল্য নেই। তদ্রূপ যদি সবর না থাকে, তাহলে ঈমানের কোনো মূল্য নেই।

০২. হারিস থেকে বর্ণিত, তিনি আলি রা. থেকে বর্ণনা করেন—'যে ঈমান আনার পর কুরআন শিখবে, তার উদাহরণ হচ্ছে এমন ফলের মতো, যার ঘ্রাণও সুন্দর, স্বাদও মিষ্ট। আর যে ঈমানও আনে নি, কুরআনও শেখে নি, তার উদাহরণ হলো এমন টক ফলের মতো, যার ঘ্রাণও অসুন্দর, স্বাদও তিতা।'

০৩. বনু আমির গোত্রের একজন থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আলি রা. বলেছেন— 'আমি তোমাদের ব্যাপারে দুটো জিনিসের আশঙ্কা করি— এক. দীর্ঘায়ুর আকাঙ্ক্ষা; ও দুই. খাহেশাতের অনুসরণ। দীর্ঘায়ু কামনা আখিরাতকে ভুলিয়ে দেয়, আর খাহেশাতের অনুসরণ সত্য থেকে বিমুখ করে। দুনিয়া পশ্চাতে চলে গেছে, আর আখিরাত সামনেই আসছে। দুনিয়া ও আখিরাত উভয়টিরই অনেক গোলাম আছে, তোমরা আখিরাতের গোলাম হও। কারণ আজ আমলের সুযোগ আছে, কিন্তু হিসাব নেওয়া হবে না। আর আগামীকাল হিসাব হবে, কিন্তু আমলের সুযোগ হবে না।”

০৪. হাসান রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আলি রা. বলেছেন—'এমন ব্যক্তি বড়োই সৌভাগ্যবান যে গুমনাম—সবাইকে চেনে, কিন্তু সবাই তাকে চেনে না। তবে আল্লাহ তাআলা তাকে সন্তোষজনক হিসাবে জানেন। তারাই হলো হিদায়াতের প্রদীপ, যাদের মাধ্যমে প্রতিটি অন্ধকারও যেন দূরীভূত হয়ে যায়। আল্লাহ তাআলা তাদের আপন রহমতে দাখিল করবেন। তারা মানুষের গোপনীয় বিষয় প্রকাশ করে বেড়ায় না, রূঢ় ব্যবহার করে না, মানুষকে দেখিয়ে আমল করে না।
ইবনু হাজার হাইতামি রহ.-এর সাওয়াইক গ্রন্থে আছে, আলি রা. এর নীতিবাক্য—
০১. মানুষ এতটাই অসচেতন যে, মৃত্যুর আগে তার চেতন ফিরে পাবে না।

> মুসান্নাফু ইবনি আবি শাইবা
** মুসান্নাফু ইবনি আবি শাইবা
১৯০ মুসান্নাফু ইবনি আবি শাইব

০২. যে নিজের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে খেয়াল রাখে, সে ব্যর্থ হয় না। মানুষকে যা সুন্দর করে তোলে সেটার বিচারেই তাকে মূল্য দেওয়া হবে।

০৩. যে নিজেকে ভালো করে চেনে, সে তার রবকেও চিনতে পারে।

০৪. মানুষ তার জিহ্বার কাছে লুক্কায়িত। (অর্থাৎ, নিজের খারাপ অবস্থা সম্পর্কে বলে না, বরং অন্যের ব্যাপার নিয়ে মুখ চালু রাখে..)

০৫. যে নিজের জিহ্বাকে নিয়ন্ত্রণ করে, তার অনেক সঙ্গী তৈরি হয়।

০৬. ইহসান ও সদাচারের মাধ্যমে স্বাধীন ব্যক্তিকেও দাস ও গোলাম বানানো যায়।

০৭. বিপদের সময় ছটফট করলে বিপদ মহাবিপদে পরিণত হয়।

০৮. বিদ্রোহ করে বিজয় অর্জন করাকে বিজয় বলে না।

০৯. অহংকারী কখনো প্রশংসার যোগ্য নয়।

১০. অতিভোজন স্বাস্থ্যসম্মত নয়।

১১. বেয়াদবের কোনো সম্মান নেই।

১২. হিংসুকের শান্তি নেই।

১৩. প্রতিশোধের ইচ্ছা থাকলে নেতৃত্ব দেওয়া যায় না।

১৪. পরামর্শ ব্যতীত কোনো কাজ করলে সেটা সঠিক হতে পারে না।

১৫. মিথ্যুক কখনো অভিজাত হতে পারে না।

১৬. মুত্তাকির সম্মানের চেয়ে আর কোনো মর্যাদাপূর্ণ সম্মান হয় না।

১৭. তাওবার চেয়ে সফল কোনো সুপারিশকারী নেই।

১৮. পবিত্রতার চাইতে সুন্দর কোনো লিবাস (আবরণকারী) হতে পারে না।

১৯. মূর্খতার চাইতে ভয়ংকর কোনো রোগ নেই।

২০. মানুষ যা জানে না, তাকে শত্রু মনে করে।

২১. যে ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সচেতন থাকে, সীমানা অতিক্রম করে না-এমন ব্যক্তিকে আল্লাহ রহম করুন।

২২. বার বার ওজর পেশ করা ব্যক্তির গুনাহের দিকে ইঙ্গিত করে।

২৩. সভাসদবর্গকে উপদেশ দেওয়ার অর্থ নিন্দা করা।

২৪. কোনো জাহেলের ওপর ইহসান করার অর্থ হলো আবর্জনার ওপর বাগান তৈরি করা।

২৫. অস্থিরতা সবরের চেয়েও বেশি কষ্টকর।

২৬. জিজ্ঞাসিত ব্যক্তি (উত্তরের) ওয়াদা দেওয়ার আগ পর্যন্ত সুাধীন।

২৭. যার ষড়যন্ত্র যত বেশি গোপনীয়, সেই তত বড়ো শত্রু।

২৮. হিকমত ও প্রজ্ঞা মুমিনের হারানো সম্পদ।

২৯. কৃপণতা সব ধরনের দোষের মূল।

৩০. যখন তাকদির নেমে আসে, তখন চেষ্টা-তদবির ব্যর্থ হয়ে যায়। প্রবৃত্তির দাস গোলামির দাসের চেয়েও লাঞ্ছিত।

৩১. যার কোনো দোষ নেই, হিংসুক তার ওপরও বেজার।

৩২. অপরাধের জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে কোনো অপরাধীর সুপারিশ করে।

৩৩. সে-ই সৌভাগ্যবান, যে অনেক নসিহত গ্রহণ করে।

৩৪. ইহসান ও সদাচার শত্রুর মুখ বন্ধ করে দেয়।

৩৫. সে-ই সবচেয়ে দরিদ্র, যার বুদ্ধি নেই।

৩৬. যার জ্ঞান আছে, সে-ই সেরা ধনী।

৩৭. লোভী অপদস্থতার শৃঙ্খলে আবদ্ধ।

৩৮. অধিকাংশ সময় লোভের বেড়াজালে আটকা পড়েই মানুষ পরাস্ত হয়।

৩৯. যখন তোমাদের কাছে অনেক নিয়ামত আসে, তখন না-শোকরি করে সেগুলোকে বিলুপ্ত করে দিও না।

৪০. যখন শত্রুকে নাগালে পাও, তখন নাগালে পাওয়ার শুকরিয়া হিসেবে তাকে ক্ষমা করে দাও।

৪১. কৃপণতা মূলত দারিদ্র্যকেই ডেকে নিয়ে আসে। দুনিয়াতে গরিবদের মতো বসবাস করে, অথচ আখিরাতে ধনীদের কাতারে হিসাব নেওয়া হবে।

৪২. জ্ঞানী ব্যক্তির মুখ অন্তরের পেছনে থাকে, আর মূর্খ ব্যক্তির অন্তর মুখের পেছনে থাকে।

৪৩. ইলম সাধারণকেও অসাধারণ করে তোলে, আর মূর্খতা উচ্চকেও অনুষ্ঠ করে ছাড়ে।

৪৪. ইলম সম্পদের চেয়ে শতভাগ শ্রেষ্ঠ।

৪৫. ইলম তোমাকে রক্ষা করে, অথচ তুমি সম্পদকে রক্ষা করো।

৪৬. ইলম বিচার করে, আর সম্পদের বিচার করা হয়।

৪৭. আমাকে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত করে রাখে নির্লজ্জ আলিম এবং অজ্ঞ আবেদ। নির্লজ্জ আলিম মানুষকে ফতোয়া দেয়, আর তার নির্লজ্জতা দিয়ে মানুষকে দূরে সরিয়ে রাখে। আর অজ্ঞ আবেদ তার ইবাদতের মাধ্যমে মানুষকে ভ্রষ্ট করে।

৪৮. যার ইলম কম, সে-ই সবচেয়ে কম মূল্যবান। কারণ, প্রত্যেক মানুষের মূল্যমান নির্ধারণ করা হয় ওই জিনিসের মাধ্যমে, যা তাকে উত্তম করে তোলে。

টিকাঃ
** মুসান্নাফ ইবনি আরি নাট

📘 ইসলামি রাষ্ট্র ব্যবস্থা > 📄 আলি রা. এর রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপ

📄 আলি রা. এর রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপ


এক. তিনি পূর্ববর্তী খলিফাদের খুব প্রশংসা করতেন। ইমাম সুয়ুতি রহ.-এর তারিখুল খুলাফাতে উল্লেখ আছে, হাসান রা. থেকে ইবনু আসাকির রহ. বর্ণনা করেন—আলি রা. যখন বসরায় আগমন করেন, তখন ইবনু কাওয়া ও কাইস ইবনু আব্বাদ তার কাছে এসে বলল: 'আচ্ছা বলেন তো, আপনি কী উদ্দেশ্যে এখানে এসেছেন? উম্মাহর নেতৃত্ব গ্রহণ করে একে অপরকে মারামারিতে লিপ্ত করছেন। আসলে কি আল্লাহর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আপনাকে (নেতৃত্ব গ্রহণের) নির্দেশ দিয়েছেন? আপনি কিছু শুনে থাকলে বলেন। কারণ, আপনি যা শুনেছেন সে বিষয়ে আপনি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, নিরাপদ।'

তখন আলি রা. বলেন— 'শোনো, এ ব্যাপারে আমার কাছে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কোনো নির্দেশ নেই। আল্লাহর কসম! আমি যদি তাকে সর্বপ্রথম সত্যায়ন করে থাকি, তাহলে তো আমি কখনোই তার নামে মিথ্যা কথা বলতে পারি না। আর যদি আমার কাছে এ ব্যাপারে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কোনো নির্দেশ থাকত, তাহলে তো আমি আবু বকর রা. ও উমার রা.- কে মিম্বারের ওপর বসতেই দিতাম না। তখন আমার নিজ হাতেই আমি তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করতাম, যদিও আমার হাতে এই রুমালটি ছাড়া আর কিছুই না থাকত। বস্তুত নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে হত্যাও করা হয় নি, তিনি আচমকাও মৃত্যুবরণ করেন নি। অসুস্থ অবস্থায় কিছু কাল ছিলেন, মুয়াজ্জিন তার কাছে এসে নামাজের অনুমতি চাইলে তিনি আবু বকর রা.-কে নামাজ পড়ানোর আদেশ করতেন, যদিও আমার মর্যাদা তার কাছে কেমন, কতটুকু তার সেটা অজানা ছিল না। আবু বকরকে ইমামতির নির্দেশ দেওয়ার পর নবীজির স্ত্রীদের একজন (আম্মাজান আয়িশা) আবু বকর রা.-কে নামাজ পড়ানো থেকে ফেরাতে চাইলে তিনি কষ্ট পান এবং তার কথা না করে দিয়ে বলেন—

انتن صواحب يوسف مروء ابا بكر يصلي بالناس

'তোমরা নারীরা আসলে ইউসুফ আ. এর (সাথে চক্রান্ত করা নারীদের মতো)। যাও আবু বকরকে নামাজ পড়ানো।

পরে যখন নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মৃত্যুবরণ করলেন, তখন আমরা চিন্তা করে আমাদের দুনিয়াবি বিষয়ের জন্য তাকে নির্বাচন করলাম, যাকে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের দ্বীনের জন্য মনোনীত করেছিলেন। কারণ, নামাজই ইসলামের ভিত্তি, নামাজই দ্বীনের মূল ও প্রধান।

তাই, আমরা আবু বকর রা. এর হাতে বাইআত গ্রহণ করলাম। আর তিনি তার যোগ্যও ছিলেন। তার বিষয়ে কেউ ইখতিলাফও করে নি, কেউ তার বিরুদ্ধে উসকেও দেয় নি, তার থেকে দায়মুক্তিও ঘোষণা করে নি। তাই, আমি আবু বকর রা.-এর হক আদায় করি। তার আনুগত্য মেনে নিই। তার সাথেই তার বাহিনীতে যুদ্ধ করি। তিনি কিছু দিলে সেটা আমি গ্রহণ করতাম, তিনি যুদ্ধের আদেশ করলে যুদ্ধ করতাম। তার আদেশে নিজের চাবুক দিয়ে হদ প্রয়োগ করতাম।

তার মৃত্যুর পর উমার রা. যখন শাসনভার গ্রহণ করলেন, তিনি তার ভাই আবু বকর রা. এর নির্দেশেই শাসনভার গ্রহণ করেছিলেন। তখন আমরা তার বাইআত গ্রহণ করলাম। তার বিষয়েও কেউ মতবিরোধ করে নি। কেউ তার বিরুদ্ধে উসকেও দেয় নি, সম্পর্কমুক্তও ঘোষণা করে নি। আমি উমার রা. এর হক আদায় করেছি। তার আনুগত্য স্বীকার করেছি। তার বাহিনীতে তারই সাথে যুদ্ধ করেছি। তিনি কিছু দিলে সেটা আমি গ্রহণ করতাম। তিনি যুদ্ধের কথা বললে আমি যুদ্ধ করতাম। তার নির্দেশে আমার নিজ হাতে হদ প্রয়োগ করতাম।

তিনি যখন ইনতিকাল করলেন, তখন মনে মনে নবীজির আত্মীয়তার কথা, ইসলামের ক্ষেত্রে অগ্রবর্তিতা ও শ্রেষ্ঠত্বের কথা চিন্তায় এলো। আমার মনে হচ্ছিল যে, আমার সাথে ইনসাফ করা হচ্ছে না। উমার রা. জীবিত থাকাবস্থায় আশঙ্কা করেছিলেন, না-জানি পরবর্তী খলিফা কোনো পাপ করে ফেলতে পারে। তাই, তিনি খিলাফত থেকে নিজেও বের হয়ে এলেন, নিজের ছেলেকেও বের করে ফেললেন। যদি তিনি পক্ষপাতিত্ব করতে চাইতেন, তাহলে খিলাফতের ক্ষেত্রে তার ছেলেকেই অগ্রাধিকার দিতেন; কিন্তু তিনি খিলাফতের বিষয়টি কুরাইশের ছয়জনের একটি দলের কাছে সোপর্দ করলেন, যাদের মধ্যে আমিও ছিলাম। যখন সবাই একত্র হলো, তখন আমার মনে হলো আমার সাথে ইনসাফ করা হবে না।

যাই হোক, আব্দুর রহমান ইবনু আউফ রা. আমাদের প্রতিশ্রুতি গ্রহণ করলেন, যার হাতে আল্লাহ তাআলা এই শাসনভার সোপর্দ করবেন আমরা তার কথা শুনবো এবং মানবো। তারপর তিনি উসমান রা. এর হাতে হাত রেখে বাইআত গ্রহণ করলেন। তখন আমি চিন্তা করে দেখি এবারও আমাকে নিজ হাতে বাইআত গ্রহণের পরিবর্তে আনুগত্য করতে হলো। এবারও দেখি আমাকে অন্যের প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হতে হলো। যাই হোক, আমরা উভয়ের হাতে বাইআত গ্রহণ করেছি। তার হকও আদায় করেছি, আনুগত্যও স্বীকার করেছি। তার বাহিনীতে তারই সাথে যুদ্ধ করেছি। তার সময়ে আমি নিজের চাবুক দিয়েই হদ প্রয়োগ করতাম।

যখন তিনি শহিদ হলেন, তখন আমি নিজের বিষয়ে চিন্তা করলাম। যখন আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের (নামাজ পড়ানোর নির্দেশে) নির্দেশিত দুই খলিফা চলে গেলেন এবং পরবর্তী প্রতিশ্রুতিবদ্ধ তৃতীয় খলিফা শহিদ হলেন, তখন দেখি মক্কা-মদিনার অধিবাসী, কুফা-বসরার অধিবাসীরা আমার হাতে বাইআত গ্রহণ করে। আর তখনই আমার বিরুদ্ধে আমার সমতুল্য নয় এমন এক ব্যক্তি বিদ্রোহ করে বসল-যে কিনা আমার মতো রাসুলের নিকটাত্মীয়ও নয়, আমার মতো আলিমও নয়, তদ্রুপ ইসলাম গ্রহণে আমার চেয়ে অগ্রবর্তীও নয়। মূলত আমিই তার চেয়ে বেশি হকদার ছিলাম।'

আলি রা.-এর দীর্ঘ বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, পূর্ববর্তী খলিফাদের প্রশংসা বর্ণনা করাও খলিফার একটি রাষ্ট্রীয় বক্তব্য। তাহলে জনগণও তার প্রতি আকৃষ্ট হবে। খলিফাদের ভুলত্রুটি হয়ে গেলেও সেগুলো উল্লেখ করবে না, বরং সে বিষয়ে নীরবতা অবলম্বন করবে।

দুই. রাষ্ট্রীয় আরও কিছু কর্তব্য আছে, যা আলি রা. বলেন-শাসকের কর্তব্য, শাসনকার্যে তিনটি মূলনীতি অবলম্বন করা। যথা: (ক) রাগের সময় শাস্তি না দেওয়া; (খ) সদাচারীকে যত দ্রুত সম্ভব পুরস্কৃত করা; (গ) নতুন কোনো কিছু করার উদ্যোগ গ্রহণ করলে ধীরে সুস্থে করা।

কারণ, রাগের সময় শাস্তি না দিয়ে বিলম্বিত করলে মাফ করার মানসিকতা তৈরি হতে পারে। আর সদাচারীকে দ্রুত পুরস্কৃত করলে জনগণও খুব সহজেই তার ডাকে সাড়া দেবে। আর ধীর সুস্থে কাজ করলে কাজের বিভিন্ন পদ্ধতি চিন্তায় আসতে পারে, ফলে সঠিক পদ্ধতি স্পষ্ট হবে।

তিন. তিনি একবার এক ইহুদির সাথে আদালতে উপস্থিত হয়েছিলেন। ঘটনাটি মাসিরা থেকে তিনি কাজি শুরাইহ থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন-আলি রা. যখন সিফফিন যুদ্ধে গমন করেন, তখন হঠাৎ তার শিরস্ত্রাণটি হারিয়ে যায়। যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর কুফায় ফিরে এলে তিনি শিরস্ত্রাণটি এক ইহুদির হাতে দেখতে পান। তখন তিনি ওই ইহুদিকে বলেন- 'শিরস্ত্রাণটি তো আমার। এটা আমি বিক্রি করি নি, কাউকে হাদিয়াও দিই নি।'

ইহুদিও বলল-'না! শিরস্ত্রাণটি আমার।'

তখন আলি রা. বললেন- 'তাহলে কাজির কাছে চলো।'

আলি রা. আদালতে গিয়ে কাজি শুরাইহর পাশে বসে বললেন, বিবাদী যদি ইহুদি না হতো, তাহলে আমি তার সাথেই বসতাম; কিন্তু আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি-

أصغروهم من حيث أصغرهم الله

আল্লাহ তাআলা যে সকল ক্ষেত্রে তাদেরকে (আহলে কিতাব) লাঞ্ছিত করেছেন, তোমরাও সেসব স্থানে তাদেরকে লাঞ্ছিত করো।

তখন কাজি শুরাইহ বললেন- 'আচ্ছা, আমিরুল মুমিনিন! এবার বলেন-আপনার দাবি কী?'

তিনি বললেন- 'ইহুদির এই যে শিরস্ত্রাণটি হাতে দেখতে পাচ্ছ, এটা আমার। আমি এটা বিক্রিও করি নি, কাউকে দানও করি নি।'

শুরাইহ ইহুদিকে জিজ্ঞাসা করলেন-'এ ব্যাপারে তুমি কী বলো?'
সে বলল-'এটা আমারই শিরস্ত্রাণ। এটা আগে থেকেই আমার কাছে আছে।'
তখন শুরাইহ আমিরুল মুমিনিনকে বললেন- 'আপনার কাছে কি কোনো প্রমাণ আছে?'

তিনি বললেন-'আছে। হাসান হুসাইনই সাক্ষ্য দেবে যে-শিরস্ত্রাণটি আমার।'
শুরাইহ বললেন-'সন্তানের সাক্ষ্য পিতার ক্ষেত্রে অগ্রহণযোগ্য।'
তখন আলি রা. বললেন- 'জান্নাতি ব্যক্তির সাক্ষ্য অগ্রহণযোগ্য? আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি-

الحسن والحسين سيدا شباب أهل الجنة

'হাসান হুসাইন জান্নাতি যুবকদের সর্দার।'

তখন ওই ইহুদি বলে উঠলে- 'আমিরুল মুমিনিন আমাকে তার কাজির কাছে নিয়ে এসেছেন, অথচ তার কাজিই তার বিরুদ্ধে ফায়সালা করেছে। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, এই দ্বীন ইসলামই সত্য। আমি আরও সাক্ষ্য দিচ্ছি, আল্লাহ ছাড়া সত্য কোনো ইলাহ নেই এবং মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহর রাসুল। আসলে শিরস্ত্রাণটি আপনারই ছিল।'

সুতরাং এখান থেকে বোঝা গেল, শাসকের কর্তব্য হলো-তিনি নিজেও শরিয়তের বিধিবিধান পালন করবেন। ফলে তাকে দেখেই মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে শরিয়তের পাবন্দি করবে। কারণ, রাজার চালেই রাজ্য চলে। এজন্যই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম সম্রাট হিরক্লিয়াসের কাছে লেখা পত্রে বলেছিলেন-

• فإن توليت فإن عليك إثم الأريثين

'যদি তুমি (ইসলাম গ্রহণ থেকে) ফিরে যাও, না হলে প্রজাদের গুনাহ তোমারই ওপর বর্তাবে।'

টিকাঃ
***সুয়ুতি, তারিখুল খুলাফা
১৯৬ সহিহ বুখারি, ৪৫৫৫

📘 ইসলামি রাষ্ট্র ব্যবস্থা > 📄 আলি রা. এর চমৎকার বিচার

📄 আলি রা. এর চমৎকার বিচার


জুর ইবনু হাবিশ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন—দুজন লোক একসাথে খেতে বসেছে। একজনের কাছে ৩টি রুটি, অপরজনের কাছে ৫টি। তারা যখন রুটিগুলো সামনে রেখেছে, তখন এক লোক তাদের সামনে এসে সালাম দেয়। তারা তাকে তাদের সাথে খেতে বলে। লোকটিও তাদের সাথে শরিক হয়। তিন জন মিলে ৮টি রুটি খায়। যাওয়ার সময় লোকটি আট দিরহাম দিয়ে বলে— 'এই নাও তোমাদের খাবারের বিনিময়।'

এখন দুজন ঝগড়া শুরু করে দেয়। পাঁচ রুটিওয়ালা বলে— 'আমার পাঁচ দিরহাম, আর তোমার তিন দিরহাম।'

তিন দিরহামওয়ালা বলে— 'দেখো! সমান সমান ভাগ ছাড়া আমি নেব না।'

তখন তারা দুজন আমিরুল মুমিনিন আলি রা.-এর কাছে পুরো ঘটনাটি খুলে বলে। আলি রা. তিন রুটিওয়ালাকে বলেন— 'দেখো, তোমার সাথি তো একটি সুন্দর মতই পেশ করেছে। কারণ, তার রুটি তোমার চেয়েও বেশি। সুতরাং, তুমি তিনটিই মেনে নাও।'

সে বলে উঠল—'আমি ইনসাফ পেতে চাই।'

তখন আলি রা. বললেন— 'তুমি যদি ইনসাফ পেতে চাও, তাহলে তো তোমার ভাগ্যে একটাই জুটবে!'

লোকটি বলল—'আরে! এটা কী?'

তিনি বললেন— 'এটাই ইনসাফ।'

সে বলল—'তাহলে আমাকে বুঝিয়ে দেন—ইনসাফ কীভাবে হলো, যাতে আমি মেনে নিতে পারি?'

আলি রা. বললেন—'তাহলে শোনো, আটটি রুটিকে ২৪ ভাগ করো। তোমরা তিনজনই মিলেমিশে এই ২৪ ভাগ রুটি খেয়েছ। যেহেতু কে কম খেয়েছে, আর কে বেশি খেয়েছে জানা নাই; সুতরাং ধরা হবে, সবাই সমান সমান খেয়েছ। তাহলে তুমি খেয়েছ ২৪ ভাগের ৮ ভাগ। মূলত, ২৪ ভাগের ৯ ভাগ তোমার নিজের। আর তোমার সাথি খেয়েছে ৮ ভাগ। প্রকৃত পক্ষে, সে ১৫ ভাগের মালিক। সেখান থেকে শুধু ৮ ভাগ খেয়েছে। তার আরও বাকি আছে ৭ ভাগ, যা দিরহামওয়ালা খেয়েছে।

আর তোমার বাকি ছিল এক ভাগ, যা দিরহামওয়ালা খেয়েছে। সুতরাং, তোমার একভাগের বিনিময়ে এক দিরহাম, আর তার ৭ ভাগের বিনিময়ে ৭ দিরহাম।'
তখন লোকটি বলল-'এখন আমি বুঝলাম।'

টিকাঃ
১৯ তারিখুল খুলাফা, ১৩৯

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00