📘 ইসলামি রাষ্ট্র ব্যবস্থা > 📄 আবু বকর রা.-এর রাষ্ট্রনীতি

📄 আবু বকর রা.-এর রাষ্ট্রনীতি


এক. তিনি একবার খুতবার শুরুতে বললেন—‘হে লোকসকল, আমাকে তোমাদের শাসক বানানো হয়েছে, যদিও আমি তোমাদের শ্রেষ্ঠ ব্যক্তি নই। অতএব, আমি যদি ভালো কাজ করি, তাহলে আমাকে সাহায্য করো। আর আমি যদি মন্দ কাজ করি, তাহলে আমাকে সংশোধন করো। সত্য বলা আমানত, মিথ্যা বলা খিয়ানত। তোমাদের দুর্বল ব্যক্তি আমার কাছে শক্তিশালী যতক্ষণ না আমি তার হক ফিরিয়ে দেব, ইন শা আল্লাহ। আর তোমাদের শক্তিশালী (জালিম) ব্যক্তি আমার কাছে অসহায় ঠিক ততক্ষণ পর্যন্ত যতক্ষণ না আমি তার থেকে (আরেক ব্যক্তির) হক তুলে আনি, ইন শা আল্লাহ।’

তার এ কথায় বেশ কিছু বিষয়ের ইঙ্গিত রয়েছে—

:: প্রথমত, ইসলামের দৃষ্টিতে মানুষ সমান—শাসক হোক বা শাসিত, সাদা হোক বা কালো, আরব কিংবা আজমি। কোনোভাবেই একে অন্যের ওপর শ্রেষ্ঠত্বের অধিকারী নয়। এটা বোঝা যায় তার উল্লিখিত কথা—‘যদিও আমি তোমাদের শ্রেষ্ঠ ব্যক্তি নই’ থেকে।

:: দ্বিতীয়ত, তিনি বলেছেন—‘যদি আমি ভালো কাজ করি, তাহলে আমাকে সাহায্য করো।’ এখান থেকে বোঝা যায়, জনগণের সুযোগ আছে শাসকের ভুল শুধরে দেওয়ার। আসল বিষয় হচ্ছে—রাজার চালে রাজ্য চলে। শাসক যদি ঠিক থাকে তাহলে জনগণ এমনিতেই ঠিক হয়ে যায়। এজন্যই জনগণের কর্তব্য হচ্ছে শাসককে শুধরে দেওয়া, তবে সেটা শরিয়ত নির্দেশিত পন্থায় হতে হবে।

:: তৃতীয়ত, মানুষের মাঝে ইনসাফ ও সাম্যতা রক্ষা করা, যা ইসলামি রাষ্ট্রের প্রধান উদ্দেশ্য এবং শাসকের প্রধান কর্তব্য। এটা বোঝা যায় তার কথা—‘তোমাদের দুর্বল ব্যক্তি...’ থেকে।

দুই. তিনি বলেন—‘সত্য বলা আমানত, মিথ্যা বলা খিয়ানত’। এখানে, সিদ্দিকে আকবর রা. উম্মাহকে পরিচালনা করার বড়ো একটি মূলনীতি ঘোষণা দিয়েছেন। কারণ, সত্যবাদিতাই হলো শাসক এবং শাসিতের মাঝে নির্ভরতার ভিত্তি। রাষ্ট্র শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে যার প্রভাব অনেক বিস্তৃত। তাছাড়া সত্যবাদিতা হলো ভিত্তিমূলক স্বভাব, ইসলাম যার কথা বলে। আল্লাহ তাআলা বলেন—

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَكُونُوا مَعَ الصَّادِقِينَ

হে ঈমানদারগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং সত্যবাদীদের সঙ্গ অবলম্বনকরো

তিন. আবু বকর রা. প্রয়োজনগ্রস্ত এবং দুর্বলদের খিদমত করতেন। আবু সালিহ গিফারি রা. থেকে বর্ণিত, উমার রা. মদিনার ঝুপড়িতে বসবাস করা এক অন্ধ বৃদ্ধাকে প্রত্যেক রাতে ওয়াদা দিতেন যে—তিনি তাকে পানি এনে দেবেন, তার কাজ করে দেবেন; কিন্তু পরদিন এলে দেখতেন, অন্য কেউ তার আগে এসে সব কাজ করে দিয়েছে। একদিন তিনি কয়েকবার আসা যাওয়া করলেন, যাতে তার আগে কেউ যেতে না পারে। তিনি নজরদারি করছিলেন। তিনি হঠাৎ দেখলেন যে, আবু বকর রা. বৃদ্ধার কাছে যাচ্ছেন, অথচ তিনি তখন মুসলিম জাহানের খলিফা।

চার. তিনি যেকোনো দায়িত্ব তার যোগ্য ব্যক্তির কাছেই অর্পণ করতেন। তাই দেখা যায়, তিনি আবু উবাইদা ইবনুল জাররাহ রা.-কে (যাকে নবীজি এই উম্মাহর আমিন ও বিশ্বস্ত বলেছেন) অর্থমন্ত্রী বানিয়েছেন, বাইতুল মালের যাবতীয় বিষয়ের দায়িত্ব তাকে দিয়েছেন। উমার ইবনুল খাত্তাব রা.-কে কাজির (বিচারের) দায়িত্ব (আইন মন্ত্রণালয়) দিয়েছেন, জায়িদ ইবনু সাবিত রা.-কে লেখার (ডাক, চিঠি ও যোগাযোগ মন্ত্রণালয়) দায়িত্ব দিয়েছেন।

পাঁচ. দ্বীন ইসলাম হিফাজতের দৃঢ় ইচ্ছা। যখন কিছু কাবিলা মুরতাদ হয়ে গিয়েছিল, তখন তিনি জিহাদের ঘোষণা দেন; সমস্ত কাবিলার উদ্দেশ্যে একটি পত্র লেখেন, কিছু লোক পাঠিয়ে প্রত্যেক গোত্রের মাঝে সে পত্র পড়ে শোনাতে বলেন। পতাকা তৈরি করে এগারোজনকে পতাকা দেন—

খালিদ ইবনুল ওয়ালিদকে পতাকা দিয়ে তুলাইহা ইবনু খুওয়াইলিদের উদ্দেশ্যে প্রেরণ করেন। তুলাইহার কাজ সম্পন্ন করার পর মালিক ইবনু নুওয়াইরার উদ্দেশ্যে বিতাহ নামক অঞ্চলে রওনা হওয়ার নির্দেশ দেন। পরবর্তী নির্দেশ আসার আগ পর্যন্ত সেখানেই অবস্থান করতে বলেন।

ইকরামাকে পতাকা দেন মুসাইলামার উদ্দেশ্যে। শুরাহবিল ইবনু হাসানাকে প্রথমে ইকরামার পেছনে পেছনে মুসাইলামাতুল কাজ্জাবের উদ্দেশ্যে, তারপর বনু কুজাআর উদ্দেশ্যে প্রেরণ করেন।

মুহাজির ইবনু আবু উমাইয়াকে মিথ্যা নবী আনসির সৈন্যবাহিনীর উদ্দেশ্যে প্রেরণ করেন। কাইস ইবনু মাকশুহ ছাড়া তার সন্তানদের সাহায্য করতে বলেন। কারণ, কাইস ইবনু মাকশুহ বাইআত ভঙ্গ করেছিল।

খালিদ ইবনু সায়িদকে পতাকা দিয়ে শামের উচ্চভূমির উদ্দেশ্যে পাঠান। আমর ইবনুল আসকে কুযাআ, ওয়াদিয়া এবং হারিস গোত্রের লোকদের উদ্দেশ্যে পাঠান। হুজাইফা ইবনু মুহসিন গাতফানিকে আম্মানের দাবা, ইরফাজা ও হারসামা-সহ অন্যান্য গোত্রের উদ্দেশ্যে পাঠান।

তারিফা ইবনু হাজিব রা.-কে বনু সালিম এবং তাদের সাথে অবস্থানকারী হাওয়াবিন গোত্রের যারা আছে, তাদের উদ্দেশ্যে প্রেরণ করেন। সুওয়াইদ ইবনু মুকরিন রা.- কে ইয়ামানের তিহামা অঞ্চলের (পাহাড় ও সাগরের মাঝে অবস্থিত নিম্নভূমি) উদ্দেশ্যে প্রেরণ করেন।

আলা ইবনু হাজরামি রা.-কে বাইরাইনের অধিবাসীদের উদ্দেশ্যে প্রেরণ করেন। তিনি প্রত্যেক আমিরকে পৃথক একটি পত্র লিখে দেন, যাতে তার সাথে আলাদাভাবে চুক্তিবদ্ধ হন। তখন প্রত্যেক আমির তার সৈন্যদের নিয়ে বেরিয়ে পড়েন।

তার এ বিশাল পদক্ষেপ থেকে বোঝা যায়, মুরতাদদের বিরুদ্ধে লড়াই করার মূল প্রেরণা ছিল তার গাইরত ও দীনের হিফাজত।

টিকাঃ
১৭৩ আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, খণ্ড:
১৭৪ সূরা তাওবা, আয়াত: ১১৯
১৭৫ সুয়ুতি, তারিখুল খুলাফা
১৭৬ মাওসুআতুস সিয়ার, খণ্ড: ৬, পৃষ্ঠা: ৫১১
১” আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, খণ্ড: ৬, পৃষ্ঠা: ৩৪৮

📘 ইসলামি রাষ্ট্র ব্যবস্থা > 📄 উমার ইবনুল খাত্তাব রা.-এর উপদেশ

📄 উমার ইবনুল খাত্তাব রা.-এর উপদেশ


এক. একবার তিনি সাথিদের বললেন— 'তোমরা যা ইচ্ছা কামনা করো।' তখন একজন বলল, 'আমার কামনা হলো, এই বাড়িটি যদি স্বর্ণ দিয়ে ভরে যেত, আর আমি তা আল্লাহর রাস্তায় খরচ করতাম আর দান করতাম।'

আরেকজন বলল—'আমার ইচ্ছা হলো, এই বাড়িতে যদি অনেকগুলো হীরকখণ্ডের টুকরো থাকত, যা আমি আল্লাহর রাস্তায় খরচ করতাম, আর দান করতাম।'

তারপর উমার রা. বললেন— 'তোমরা যা পারো কামনা করো।' উপস্থিত লোকেরা বলল—'হে আমিরুল মুমিনিন, আপনি কী বলতে চাচ্ছেন, আমরা জানি না।'

তিনি বললেন—'আমার ইচ্ছা হলো, যদি এই বাড়িটি আবু উবাইদা ইবনুল জাররাহ, মুআজ ইবনু জাবাল, আবু হুজাইফার আজাদকৃত দাস সালিম, হুজাইফা ইবনুল ইয়ামানের মতো মহান লোকদের দ্বারা ভরে থাকত, যাদের দ্বারা মুসলিম উম্মাহর কাজ করব।'

দুই. সায়িদ ইবনুল মুসাইয়িব থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, উমার রা. মানুষের উদ্দেশ্যে আঠারোটি বাক্য তৈরি করেন, যার প্রত্যেকটিই আলাদা একটি দর্শন ও নীতিবাক্য। যথা:

০১। যে তোমার কোনো জিনিসের ক্ষেত্রে আল্লাহর অবাধ্যতা করে, তোমার দেওয়া তার সবচেয়ে উত্তম শাস্তি হলো—ওই জিনিসের ক্ষেত্রে তার অবাধ্যতার সমপরিমাণ আল্লাহর আনুগত্য করবে।

০২। তুমি তোমার অপর ভাইয়ের যেকোনো বিষয় উত্তমভাবে সাজিয়ে রাখো, যদি না সে তোমাকে নিষেধ করে।

০৩। কোনো মুসলিম ভাই থেকে কোনো কথা বের হলে খারাপ ধারণা করো না, যদি তা ভালো হওয়ার সম্ভাবনা রাখে।

০৪। কেউ যদি অপবাদের সম্মুখীন হয়, তাহলে এমন কেউ যেন তাকে দোষ না দেয়, যার ব্যাপারে (পূর্ব থেকে) খারাপ ধারণা ছিল।

০৫। যে তার রহস্যময় বিষয় গোপন রাখবে, সে কল্যাণ লাভ করবে।

০৬। তুমি সৎ এবং সত্যবাদী বন্ধুদের সঙ্গ গ্রহণ করো, তাদের সাথে বাস করো। কারণ, তারা সুখে তোমার শোভা বর্ধন করবে, দুঃখে তোমাকে সাজসরঞ্জাম দেবে।

০৭। সবসময় সত্য কথা বলো, যদিও তার কারণে মরে যেতে হয়।

০৮। অনর্থক কাজে ব্যস্ত হয়ো না।

০৯। যে জিনিসটি ঘটেনি তার সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করো না। কারণ, সেটা অস্তিত্বহীন বিষয়ে ব্যস্ততা।

১০। এমন কারও প্রয়োজন পূরণ করতে যেয়ো না, যে প্রয়োজন পূরণ করতে চায় না।

১১। সংঘর্ষপূর্ণ শপথ করো না, অন্যথায় ধ্বংস হয়ে যাবে।

১২। পাপাচারী চেনার জন্য পাপাচারীদের সংস্পর্শে যেয়ো না।

১৩। শত্রুকে এড়িয়ে যাও।

১৪। বিশ্বস্ত ছাড়া অন্য কোনো বন্ধুকে প্রশ্রয় দিয়ো না। তবে শুনে রাখো, সে-ই বিশ্বস্ত যে আল্লাহকে ভয় করে।

১৫। কবরের সামনে বিনীত হয়ে দাঁড়াও।

১৬। আনুগত্য করার ক্ষেত্রে নমনীয় হও।

১৭। অবাধ্যতা করে ফেললে আল্লাহর আশ্রয় গ্রহণ করো।

১৮। যারা আল্লাহকে ভয় করে, তাদের সাথে নিজের বিষয়ে পরামর্শ করো। কারণ আল্লাহ তাআলা বলেন-

إِنَّمَا يَخْشَى اللَّهَ مِنْ عِبَادِهِ الْعُلَمَاءُ إِنَّ اللَّهَ عَزِيزٌ غَفُورٌ

তার বান্দাদের মধ্য হতে শুধু আলিমরাই আল্লাহকে ভয় করে。

তিন. ইসহাক ইবনু রাশিদ থেকে বর্ণিত, উমার রা. বলেন—'দোষী হওয়ার জন্য এটাই যথেষ্ট যে, নিজের ভুল ত্রুটি না দেখে অন্যের ভুল ত্রুটি নিয়ে লেগে থাকে। নিজে যে দোষ করে, মানুষকে সে দোষের জন্য নিন্দা করে। সাথি বা মানুষকে অযথাই কষ্ট দেয়...

চতুর্থ, শাকিক রা. থেকে বর্ণিত, উমার রা. একটি চিঠিতে লেখেন— 'দুনিয়া হলো সবুজ শ্যামল ও সুমিষ্ট। অতএব, যে তার হক অনুযায়ী দুনিয়ার সামগ্রী গ্রহণ করবে, তার জন্য দুনিয়াতে বরকত দেওয়া হবে। আর যে অবৈধভাবে গ্রহণ করবে, তার উদাহরণ হলো ওই লোকের মতো—যে খায় কিন্তু তৃপ্ত হয় না।'

টিকাঃ
২” ইবনু আসাকির, তারিখু দিমাশক, খণ্ড :
*** ইবনু আসাকির, তারিখ দিমাশক
১৮০ মুসান্নাফু ইবনি আবি শাইবা

📘 ইসলামি রাষ্ট্র ব্যবস্থা > 📄 উমার রা.-এর সিয়াসাত বা রাষ্ট্রনীতি

📄 উমার রা.-এর সিয়াসাত বা রাষ্ট্রনীতি


এক. তিনি যখন আবু বকর রা.-এর স্থানে আসেন, মানুষ তার কাঠিন্যের কারণে ভয়ে তটস্থ ছিল। তিনি তখন প্রথম খুতবাতেই মানুষের ভয় দূর করার জন্য বলেন—'আয় আল্লাহ! আমি খুবই দুর্বল। সুতরাং আমাকে শক্তিশালী করে দেন। আমি অনেক বেশি দৃঢ়। অতএব, আমাকে নমনীয় করে দেন। আমি খুব কৃপণ। সুতরাং আমাকে দানশীল বানিয়ে দেন।'

আর-রিয়াজুন নাজিরাতু ফি মানাকিবিল আশারা কিতাবে (২/৩১৫) আছে, ইবনু শিহাব-সহ অন্যান্য আহলে ইলম বলেন—'মিম্বারে বসে উমার রা. সর্বপ্রথম যে কাজটি করেন, তা হলো—আবু বকর রা. মিম্বারে যেখানে পা রাখতেন; অর্থাৎ মিম্বারের প্রথম ধাপে বসেন, আর মিম্বারের নিচে মাটিতে পা রাখেন।

তখন উপস্থিত লোকেরা বলল—'আবু বকর রা. যেখানে বসতেন, সেখানেই যদি আপনি বসতেন।'

তিনি বলেন—'আবু বকর রা.-এর পা যেখানে থাকত, সেখানে বসাই আমার জন্য যথেষ্ট।'

উমার রা. খিলাফত গ্রহণ করার পর সবাই এত ভয় পেয়েছিল যে, মসজিদের প্রাঙ্গনে বসারও সাহস হয় নি। তারা বলছিল—'আগে দেখি, উমার রা. কী বলেন!'

বর্ণনাকারীরা বলেন—'আবু বকর রা. এতটাই নমনীয় ছিলেন যে, শিশুরা পর্যন্ত তাকে দেখলে তার কাছে ছুটে যেত, আর 'আব্বুব' 'আব্বুব' বলে ডাকত। তখন তিনি তাদের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতেন। বিপরীতে উমার রা. এতটাই গম্ভীর ছিলেন যে, বড়ো বড়ো ব্যক্তিরা পর্যন্ত তার মজলিস থেকে পালিয়ে অপেক্ষা করছিলেন যে, সামনে কী হবে।

উমার রা. যখন লোকদের ভয় পাওয়ার বিষয়টি শুনলেন, তখন ঘোষণা করা হলো, নামাজ শুরু হতে যাচ্ছে। তখন সবাই উপস্থিত হলে উমার রা. মিম্বারে উঠে আবু বকর রা.-এর পা রাখার স্থানে বসলেন। হামদ ও সানা পাঠ করার পর বললেন- 'আমি শুনতে পেয়েছি, তোমরা আমার রূঢ়তা ও রুক্ষতাকে খুব ভয় পাচ্ছ। আর বলাবলি করছ-রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের মাঝে থাকা অবস্থাতেই উমার রা. আমাদের সাথে কঠোর আচরণ করতেন, তারপর আবু বকর রা. শাসক থাকা অবস্থাতেও আমাদের সাথে কঠোরতা অবলম্বন করতেন, না জানি তিনি এখন নিজে শাসক হওয়ার পর কী করেন। যারা এ কথা বলাবলি করেছে সত্যই বলেছে। আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে গোলাম এবং খাদেমের মতোই ছিলাম। কোনো মানুষই তাঁর নম্রতা ও নমনীয়তার নাগাল ধরতে পারবে না। শুধু তাই নয়, আল্লাহ তাআলা নিজের সুন্দর নামগুলো থেকে দুটো নাম তাকে দান করে সেই নাম দুটো কুরআনে কারিমে উল্লেখ করেছেন رؤوف رحيم 'অত্যন্ত কোমল, দয়াশীল।'

তাই, আমি তাঁর জন্য খোলা তরবারি ছিলাম, যদি না তিনি কোষবদ্ধ করেন; কিংবা রেখে দেন আর আমি ফিরে আসি। এভাবে তাঁর সাথে থাকতে থাকতে একদিন তাঁর মৃত্যু হলো, আর তিনি আমার প্রতি সন্তুষ্ট ছিলেন, আলহামদু লিল্লাহ। আমি এ অবস্থা নিয়ে গৌরবান্বিত। তারপর মুসলিমদের শাসক হলেন আবু বকর রা.।

তার ধীরতা, বদান্যতা এবং নমনীয়তা অস্বীকার করবে— এমন কেউ এখানে নেই। আমি তার খাদেম ও সাহায্যকারী ছিলাম। তার নমনীয়তার সাথে আমার কাঠিন্যকে মিলিয়ে রাখতাম। এক কথায়, আমি তার জন্য ছিলাম খোলা তরবারি, যতক্ষণ না তিনি কোষবদ্ধ করেন বা রেখে দেন, আর আমি ফিরে আসি। এভাবে থাকতে থাকতে একসময় তাঁরও মৃত্যু হলো। আর তখন তিনি আমার প্রতি সন্তুষ্ট ছিলেন, আলহামদু লিল্লাহ। সেজন্য আমি সৌভাগ্যবান।

এখন আমাকে তোমাদের শাসক বানানো হয়েছে। সুতরাং জেনে রাখো, আমার রূঢ়তাও দ্বিগুণ রূপ লাভ করেছে। তবে এটা শুধু জালিম ও দুষ্কৃতিদের জন্য। আর যারা ধার্মিক, শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্বের অধিকারী ও ভালো মানুষ, তাদের জন্য আমি খুবই নমনীয়। তবে আমি কাউকে এ সুযোগ দেব না যে, সে জুলুম বা সীমালঙ্ঘন করবে; বরং আমি তার মাথার এক পাশ মাটির ওপর রেখে অপর পাশের ওপর দুই পা রেখে চাপ দেব, যদি না সে সত্যের অনুগত হয়।

আমার ওপর তোমাদের কিছু হক রয়েছে, যা তোমাদের সামনে উল্লেখ করছি। সুতরাং সেগুলো তোমরা আমার থেকে আদায় করবে। আমার ওপর তোমাদের একটি অধিকার, তোমাদের আল্লাত জাঙ্গালা এর সকল 'ফাই' বা গনিমত দেবেন সেগুলো এবং আমি খাজনা আত্মসাৎ না করে যথাযথ খাতে ব্যয় করব। আমার ওপর তোমাদের আরেকটি অধিকার, যখন তোমাদের কোনো সম্পদ আমার কাছে জমা হবে, সে সম্পদ আপন খাতেই ব্যয় হবে। আমার ওপর তোমাদের আরেকটি অধিকার, আমি তোমাদের ভাতা ও অনুদান তোমাদের দান করব, ইন শা আল্লাহ। আমার ওপর তোমাদের আরেকটি অধিকার, তোমাদের কখনো ধ্বংসাত্মক কাজে নিক্ষেপ করবো না। একই সাথে যখন তোমরা যুদ্ধে যাবে, তখন তোমাদের ফিরে আসার আগ পর্যন্ত পরিবারের দেখাশোনার দায়ভার আমার ওপর। আমি এসব কথা বলছি আর নিজের জন্য এবং তোমাদের জন্য ইস্তিগফার করছি।'

সায়িদ ইবনুল মুসাইয়িব ও আবু সালামা ইবনু আবদির রহমান রহ. বলেন— 'আল্লাহর কসম! উমার রা. নিজের প্রত্যেকটি ওয়াদা রক্ষা করেছেন। কাঠিন্যের স্থানে কাঠিন্য অবলম্বন করেছেন। নমনীয়তার স্থানে নমনীয়তা অবলম্বন করেছেন। তিনি পরিবারের দেখাশোনা করতেন। মুজাহিদদের দরজার সামনে গিয়ে সালাম দিতেন। তাদের স্ত্রীদের (পর্দার আড়াল থেকে) বলতেন—বাজার থেকে তোমাদের জন্য কিছু নিয়ে আসবো? কারণ, কিছু কিনতে গিয়ে তোমরা ঠকবে, সেটা আমি চাই না। তখন তার সাথে ছোটো ছোটো কিশোর-কিশোরীদের পাঠিয়ে দিত। তিনি যখন বাজারে যেতেন, তখন তার সাথে অসংখ্য কিশোর-কিশোরী থাকত। তাদের তিনি প্রয়োজনীয় সামান কিনে দিতেন। যাদের কাছে কেনার কিছু ছিল না, তাদের জন্য নিজের টাকা দিয়েই কিনতেন। যুদ্ধ থেকে যখন কোনো দূত আসত, তখন তিনি নিজে তাদের কাছে তাদের স্বামীদের চিঠি নিয়ে যেতেন। তাদের বলতেন—তোমাদের স্বামীরা আল্লাহর রাস্তায় আছে, আর তোমরা আল্লাহর রাসুলের শহরে আছ। যদি তোমরা নিজেরাই পড়তে পার, তাহলে তো ভালো, আর না হলে দরজার কাছে আসো, যাতে তোমাদের পড়ে শোনাতে পারি। তারপর বলতেন—আমাদের দূত অমুক দিন যাবে। তাই, তোমরা চাইলে চিঠি লিখে জমা দাও, যাতে তোমাদের চিঠি পাঠাতে পারি। তারপর তিনি কাগজ নিয়ে তাদের বলতেন, এই যে দোয়াত-কাগজ। দরজার কাছে এসে বলো আমি লিখে দিই। এভাবে তিনি প্রত্যেকের ঘরে ঘরে গিয়ে চিঠি লিখে আনতেন। তারপর তাদের চিঠি পাঠিয়ে দিতেন। আর তিনি যখন সফরের ইচ্ছা করতেন, সফরের সময় হলে সবার উদ্দেশ্যে বলতেন-যাত্রার প্রস্তুতি নাও। তখন ঘোষক সবার কাছে তার কথা পৌঁছে দিয়ে বলত, আমিরুল মুমিনিন তোমাদেরকে সফরের প্রস্তুতি নিতে বলেছেন। সুতরাং উঠো, বাহনকে পানি পান করাও, সফরের প্রস্তুতি নাও। তারপর দ্বিতীয়বার বলতেন, সফর শুরু করো। তখন সবাই বলাবলি করত, বাহনে আরোহণ করো, আমিরুল মুমিনিন আবার আমাদের সফরের কথা বলেছেন। যখন তারা আরোহণ করত, তিনিও আরোহণ করতেন।

তার সাথে দুটো থলে থাকত। একটিতে ছাতু, অপরটিতে খেজুর। সামনে মশকে পানি থাকত, পেছনে থাকত একটি পাত্র। কখনো যাত্রাবিরতি করলে পাত্রে ছাড় নিতেন, একটু পানি ঢালতেন, একটি শিনার বিছাতেন। বর্ণনাকারী বলেন— শিনার মানে ছোটো মাদুর বিশেষ। কেউ যদি দাবি দাওয়া, পানি বা অন্য কোনো প্রয়োজনে তার কাছে আসত, তিনি তাকে বলতেন, ছাতু আর খেজুর খাও। তারপর যেখান থেকে সফর করেছেন সেখানে যেতেন। সেখানে যদি কোনো সামান পড়ে আছে দেখতেন, তাহলে উঠিয়ে নিতেন, কিংবা কোনো পঙ্গু ব্যক্তিকে দেখতেন অথবা কারও বাহনে কোনো সমস্যা হয়েছে দেখতেন, তাহলে তার জন্য একটা বাহন ভাড়া নিয়ে সেটাতে তাকে উঠাতেন। ফিরে আসার পথে যদি কোনো সামান দেখতেন, তুলে নিতেন কিংবা কাউকে সমস্যায় পড়া পেতেন তাকে পেছনে বসাতেন। পরদিন কেউ যখন দেখত তার সামান হারিয়ে গেছে, তখন সে আমিরুল মুমিনিন আসার আগ পর্যন্ত সামান খুঁজত না। উমার রা. যখন আসতেন, তার উটটি মানুষের সামানে বড়ো স্তূপে পরিণত হতো। তখন লোকজন তাকে গিয়ে বলত—'আমিরুল মুমিনিন, এই আমার হারিয়ে যাওয়া পাত্র।'

তখন উমার রা. বলতেন— 'কেউ কি তার পাত্র সম্পর্কে এতটা বেখবর থাকে, যা দিয়ে সে পান করে, নামাজের জন্য ওজু করে, সবসময় কি আমি এ রকম পড়ে যাওয়া জিনিসের খেয়াল রাখব, সবসময় কি আমি না ঘুমিয়ে থাকব?' তারপর তাকে তার পাত্র দিতেন।

আরেকজন এসে বলত—এটা আমার ধনুক। অপরজন বলত—এটা আমার দড়ি। এই এই...আরকি..। তিনি তখন তাদের একটু তিরস্কার করে দিয়ে দিতেন।

তিনি যখন শামে গেলেন, সেখানকার মুসলিম নেতৃস্থানীয়রা বৃহদাকার ঘোড়া ও সাদা কাপড় নিয়ে এলো। তারা তাকে ওই বড় ঘোড়ায় আরোহণ করতে বললেন, যাতে শত্রুদের কাছে গম্ভীর দেখা যায়। পশমের কাপড়ের পরিবর্তে সাদা কাপড় পড়তে বললেন। কিন্তু তিনি না করলেন। পরে তারা বার বার বলাতে পশমের কাপড় নিয়েই ঘোড়ায় উঠলেন, তখন ঘোড়া দ্রুত ছোটায় হাতে থাকা উটের রশি টান খেল। তখন ঘোড়া থেকে নেমে নিজের উটে উঠে বললেন, এটা তো দেখি আমাকে অন্যরকম করে দিল যেন নিজেকেই চিনতে পারছিলাম না। (পুরো ঘটনাটি আবু হুজাইফা ইসহাক ইবনু বাশার, ফুতুহুশ শাম গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন।)

টিকাঃ
১৮১ মুসান্নাফু ইবনি আবি শাইবা : ২৯৫১১

📘 ইসলামি রাষ্ট্র ব্যবস্থা > 📄 উমার রা.-এর রাষ্ট্রনীতি

📄 উমার রা.-এর রাষ্ট্রনীতি


এক. আবু ফারাস রহ. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, উমার ইবনুল খাত্তাব রা. বলেন—'লোকসকল, দেখো, আমরা তোমাদের সম্পর্কে জানতাম যখন আমাদের সামনে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ছিলেন। যখন ওহি নাজিল হতো, তখন আল্লাহ তাআলা তোমাদের সম্পর্কে কিছু বলতেন। কিন্তু এখন দেখো, আল্লাহর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিদায় নিয়েছেন, ওহি চলে গেছে। এখন তোমাদের মুখের কথা দিয়েই তোমাদের আমরা চিনব। যে ভালো কিছু প্রকাশ করবে, তার সম্পর্কে ভালো ধারণা করবো এবং সে কারণেই তাকে ভালোবাসব। আর যে খারাপ কিছু প্রকাশ করবে, তার সম্পর্কে খারাপ ধারণাই করতে হবে এবং সে কারণেই তাকে অপছন্দ করবো। আর তোমাদের মনের ও অভ্যন্তরীণ বিষয় তোমাদের মাঝে এবং তোমাদের রবের মাঝে থাকবে। দেখো একটা সময় ছিল, যখন আমি মনে করতাম, যে কুরআনে কারিম তিলাওয়াত করত তার উদ্দেশ্য থাকত শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টি এবং তাঁর প্রতিদান। শেষ পর্যন্ত এটাই আমাদের ধারণা ছিল; কিন্তু এখন দেখছি, কিছু লোক মানুষের সন্তুষ্টির আশায় কুরআন তিলাওয়াত করে। তোমরা কিন্তু আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যেই তিলাওয়াত করবে, তাঁর উদ্দেশ্যেই আমল করবে। শোনো, আল্লাহর কসম। আমি আমার শাসকদেরকে তোমাদের কাছে এজন্য পাঠাই না যে, তারা তোমাদের মারধর করবে, তোমাদের সম্পদ আত্মসাৎ করবে; বরং এ-জন্যই পাঠাই যে, তারা তোমাদের দ্বীন ও নবীর সুন্নাহ শিক্ষা দেবে। এখন কেউ যদি ভিন্ন কিছু করে তাহলে তার বিষয়টি আমার সামনে পেশ করো। ওই সত্তার কসম! যার হাতে আমার প্রাণ তার থেকে আমি কিসাস গ্রহণ করব।'

তখন আমর ইবনুল আস রা. দাঁড়িয়ে বললেন- 'আমিরুল মুমিনিন, মুসলিম শাসক হওয়ার পর কোনো জনগণকে শাস্তি দিলে তার থেকে আপনি কিসাস নেবেন?'
তিনি বললেন- 'হ্যাঁ, যার হাতে উমারের জান তার কসম করে বলছি, অবশ্যই আমি তার থেকে কিসাস নেব। কেন নেব না? অথচ আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে দেখেছি নিজের থেকে কিসাস গ্রহণ করছেন। সুতরাং সাবধান! মুসলিমদের গায়ে হাত দিয়ো না, না তাদের অপদস্থ করবে। তাদের পরিবারের সাথে মিলিত হতে বাধা দিয়ো না, তাহলে তাদের ফিতনায় ফেলে দেবে। তাদের হক আটকে রেখো না, হয়তো এটা তাদের কুফুরির দিকে নিয়ে যাবে। তাদের নিয়ে বড়ো কোনো গাছের কাছে যাত্রাবিরতি করো না। তাহলে তাদের হারিয়ে ফেলবে (কারণ, তখন তারা ছড়িয়ে পড়বে) ।

দুই. তারিখ বা সন প্রবর্তন: তিনিই প্রথম ইসলামি সন প্রবর্তন করেন। তারিখ অর্থ সময় জানানো। তদ্রূপ তাওরিখেরও একই অর্থ। ইমাম সাইদাবি রহ. বলেন, তারিখ ২। 'আরখ' ধাতু থেকে নেওয়া হয়েছে। যার অর্থ সৃষ্টি হওয়া, যেমন: সন্তান সৃষ্টি হওয়া।

ইমাম সাগানি রহ. বলেন-কেউ কেউ বলে, তারিখ ماه وروز থেকে আরবি করা হয়েছে। যার অর্থ দিন, মাস, বছর গণনা করা। পরবর্তীতে আরবরা শব্দটিকে আরবিতে রূপান্তরিত করে। ইসলামি সন প্রবর্তনের প্রেক্ষাপট নিয়ে কয়েকটি বর্ণনা আছে-

(ক) ইবন সামারকান্দি রহ. বর্ণনা করেন, আবু মুসা আশআরি রা. উমার রা.-এর কাছে চিঠি লেখেন-আপনার যে সকল চিঠি আমাদের কাছে আসে, সেগুলোতে তারিখ লেখা থাকে না। তাই, বিভিন্ন অবস্থা ঠিক রাখার জন্য সন রচনা করলে ভালো হয়। তখন তিনি সন প্রবর্তন করলেন।

(খ) আবু ইয়াকজান রহ. বলেন—উমার রা.-এর সামনে একটি সিল পেশ করা হলে সেখানে শাবান মাস দেখতে পান। তিনি তখন বলেন—এটা কোন শাবান মাস-বর্তমান, অতীত না ভবিষ্যৎ।

(গ) ইবনু আব্বাস রা. বলেন-উমার রা. যখন সন প্রণয়নের ইচ্ছা করেন, তখন সাহাবায়ে কিরামকে একত্র করে পরামর্শ চাইলে সাদ ইবনু আব্বাস রা. বললেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লামের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে তারিখ রচনা করেন। তালহা রা. বলেন-তাকে প্রেরণের সময়কে কেন্দ্র করে, আলি ইবনু আবি তালিব রা.-এর মত ছিল হিজরতকে কেন্দ্র করে হোক। কারণ, হিজরতের মাধ্যমেই সত্য-মিথ্যা পৃথক করা হয়েছে। অন্যরা বলল-জন্মকে কেন্দ্র করে। একদল বলল-নবুয়তকে কেন্দ্র করে।

সময়টি ছিল ১৭ হিজরির। কেউ কেউ বলেন-১৬ হিজরির। পরে তারা আলি রা.-এর মতের ওপর একমত পোষণ করেন। সহিহ বুখারির প্রখ্যাত ভাষ্যকার ইবনু হাজার রহ. ফাতহুল বারিতে বলেন, সুহাইলি রহ. বলেন, সাহাবায়ে কিরাম হিজরি সন প্রবর্তন করেছেন কুরআনে কারিমের এই আয়াতকে লক্ষ্য করে-

للمَسْجِدٌ أُسِّسَ عَلَى التَّقْوَىٰ مِنْ أَوَّلِ يَوْمٍ ..

'যে মসজিদ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে তাকওয়ার ওপর, প্রথম দিন থেকে।'

কারণ জানা বিষয়, এখানে অনির্দিষ্ট প্রথম দিন উদ্দেশ্য নয়; বরং নির্দিষ্ট দিনই উদ্দেশ্য। আর সেটা ওই সময় যখন ইসলাম বিজয় লাভ করেছে, নবী সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিশ্চিন্তে মহান রব্বল আলামিনের ইবাদাত করেছেন এবং প্রথম মসজিদ নির্মাণ করেছেন। তাই, সাহাবায়ে কিরাম একমত হলেন যে, তারিখের সূচনা সেই দিনকে কেন্দ্র করেই হোক। তাদের এই কাজ থেকে আমরা বুঝতে পারলাম যে, مِنْ أَوَّلُ يَوْمٍ তথা প্রথম দিন বলে উদ্দেশ্য ইসলামি ইতিহাসের প্রথম দিন।

তিনি আরও বলেন—চারটি বিষয়কে কেন্দ্র করে সন প্রবর্তন করা যায়—নবীজির জন্ম, প্রেরণ, হিজরত এবং মৃত্যু; কিন্তু তাদের কাছে হিজরতকে কেন্দ্র করে প্রবর্তন করাই অগ্রাধিকার পেল। কারণ, জন্ম ও প্রেরণের সময়কাল বিরোধপূর্ণ। আর তারা মৃত্যুকে নির্ধারণ করেন নি। কারণ, তা শুনলেই মন দুঃখ-কষ্টে ভরে যাবে। তাই হিজরতই প্রাধান্য পেল।

মুহাররম মাস থেকে শুরু করার কারণ: ইবনু হাজার রহ. বলেন—'(হিজরতের মাস) রবিউল আউয়াল মাসে হিজরি সনের গণনা শুরু না হয়ে মুহাররম মাস থেকে শুরু করা হয়েছে। কারণ, হিজরতের পরিকল্পনা হয় মুহাররম মাসে। নবীজির হাতে (আনসারদের) বাইআত সংগঠিত হয় জিলহজের মাঝ বরাবর। আর এই বাইআতই ছিল হিজরতের মূল ভূমিকা। আর বাইআতের পর সর্বপ্রথম যে মাসের সূচনা হয়, তা ছিল মুহাররম। তাই, এই মাসকে দিয়ে সূচনা করাই যুক্তিযুক্ত ছিল। মুহাররম মাসে শুরু করার আরও যতগুলো যুক্তি আছে, তার মধ্যে এটাকেই আমার শক্তিশালী মনে হয়েছে।'

সূরা ফজরের তাফসির করতে গিয়ে ইমাম সুয়তি রহ. ইকলিল গ্রন্থে বলেন, সায়িদ ইবনু মানসুর এবং বাইহাকি রহ. ইবনু আব্বাস রা. থেকে বর্ণনা করেন—মুহাররম মাসই হলো বছরের প্রভাত।

ইবনু হাজার রহ. বলেন—এর মাধ্যমে বুঝে আসে, কেন সাহাবায়ে কিরাম হিজরতের মাস রবিউল আউয়াল থেকে হিজরি সনের গণনা শুরু না করে মুহাররম মাস থেকে শুরু করেছেন।

তিন. বাইতুল মালের সূচনা;
চার. দিওয়ানের প্রবর্তন;

বাইতুল মাল হলো যেখানে রাষ্ট্রের অর্থ সঞ্চয় ও হিফাজত করে রাখা হয়। আর দিওয়ান বলে রাষ্ট্রীয় নথি ও খতিয়ানকে, যেখানে রাষ্ট্রীয় বিষয়াদি রেকর্ড করে রাখা হয়। ইসলামি রাষ্ট্রের প্রাথমিক যুগে প্রচলিত বাইতুল মাল ছিল না। কারণ, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের যুগে যখনই কোনো অর্থ আসত, তিনি সাথে সাথেই তা বণ্টন করে দিতেন। আবু বকর রা.-ও একই পদ্ধতি অবলম্বন করেছেন। শুরুর যুগে উমার রা.-ও একই পদ্ধতি অবলম্বন করেছেন; কিন্তু পরবর্তী সময়ে যখন ইসলামি খিলাফত পূর্ব-পশ্চিমে বিস্তৃত হলো, তখন তিনি একটি পদ্ধতি অবলম্বনের চিন্তা করলেন, যার মাধ্যমে খলিফার দায়িত্বে থাকা যাবতীয় অর্থ, এবং সৈন্যদের বিপুল সংখ্য হিসাব রাখা সম্ভব হয়। এ কারণে সৈন্য ও বিভিন্ন পদে থাকা ব্যক্তিদের নাম সংরক্ষণ করার প্রয়োজন দেখা দিল। কারণ, এছাড়া জানার উপায় নেই যে, কাকে একবার দেওয়া হলো, আবার কাকে দেওয়া হলো।

না। তখন আবার মুসলিম উম্মাহর বিজয় একটার পর একটা হতেই থাকল। ফলে এত পরিমাণ সম্পদ জমা হলো, যা ইতোপূর্বে মুসলিমদের আর কখনোই ছিল না।

তখন উমার রা. দেখলেন—এভাবে এগুলোর হিসাব রাখা খলিফা ও শাসকের পক্ষে সম্ভব নয়। তাছাড়া এত বিশাল অর্থ-সম্পদ কোনো হিসাব-কিতাব ছাড়াই ব্যক্তিবর্গের হাতে রেখে দেওয়াটাও অর্থনীতির খিলাফ। তখন তার সেই অর্থনৈতিক নীতিমালা প্রণয়নের চিন্তার ফসলই ছিল বাইতুল মাল। এখান থেকেই দিওয়ান তৈরি করা হয়। মূলত উমার রা. এই ইসলামি রাষ্ট্রে প্রথম দিওয়ান প্রণয়ন করেন।

যখন বাহরাইন থেকে অঢেল সম্পদ আসে, তখন অর্থনীতি নিয়ে তার এই চিন্তা শুরু হয়েছিল। আবু হুরাইরা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন—'বাহরাইন থেকে আমি পাঁচ লক্ষ দিরহাম নিয়ে উমার রা.-এর কাছে রাতে এলাম। বললাম— আমিরুল মুমিনিন! এই অর্থগুলো রাখেন।'

তিনি জিজ্ঞেস করলেন— 'কী পরিমাণ?'

আমি বললাম—'৫ লক্ষ পরিমাণ।'

তিনি বললেন—'আপনি জানেন, ৫ লক্ষ দিরহাম কী পরিমাণ?'

আমি বললাম—'হ্যাঁ, এক লক্ষ দিরহাম ৫ দিয়ে গুণ করলেই ৫ লক্ষ দিরহাম।'

তিনি বললেন—'আপনার চোখে ঘুম ঘুম ভাব, রাতে ঘুমিয়ে সকালে আসেন।'

সকাল হলে আবার তার কাছে গিয়ে বললাম—'এই সম্পদগুলো রেখে দেন।'

তিনি বললেন—'কী পরিমাণ?'

আমি বললাম—'৫ লক্ষ দিরহাম।'

তিনি বললেন— 'বৈধ উপায়ে এসেছে তো?'

আমি বললাম— 'আমার জানামতে বৈধ উপায়েই এসেছে।'

তখন তিনি লোকদের বললেন— 'দেখো, এখন প্রচুর সম্পদ এসেছে। তোমরা যদি চাও, তাহলে পাত্রে মেপে দেব, না হয় ওজন করে দেব, কিংবা চাইলে গুণেও দেব!'

তখন এক লোক বলল—'আমিরুল মুমিনিন, আপনি সবার নামগুলো একটি ফাইলে সংরক্ষণ করে রাখেন। এরপর সে অনুযায়ী বণ্টন করবেন।'

উমার রা.-এর কাছে প্রস্তাবটি বেশ ভালো লাগল।

পাঁচ. উমার রা. প্রত্যেক এলাকায় তাদের শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিকে প্রশাসক নিযুক্ত করতেন। আবু ইউসুফ রহ.-এর খারাজ নামক গ্রন্থে আছে, উমার রা. কুফাবাসীর কাছে পত্র লিখে বলেন যে, তারা যেন তার কাছে তাদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ ও সর্বোত্তম ব্যক্তিকে প্রেরণ করে, বসরা ও শামবাসীদের কাছেও অনুরূপ পত্র লেখেন। তখন কুফাবাসী উসমান ইবনু ফারকাদকে, শামবাসী মান ইবনু ইয়াজিদ, বসরার অধিবাসী হাজ্জাজ ইবনু গালাতকে পাঠান। তাদের প্রত্যেকেই একে অপরের সমতুল্য ছিলেন।

উমার রা. তাদের প্রত্যেককেই খারাজের (জমির রাজ্যস্ব-ভার) দায়িত্ব দিয়েছেন।

ছয়. উমার রা. যেকোনো নতুন বিষয়ে পরামর্শ করতেন। নিয়ার আসলামি রহ. থেকে বর্ণিত, উমার রা.-এর সামনে কোনো নতুন বিষয় দেখা দিলে পরামর্শ সভার সাথে, আনসারদের থেকে মুআজ ইবনু জাবাল, উবাই ইবনু কাব এবং জায়িদ ইবনু সাবিত রা.-দের সাথে পরার্মশ করতেন।

সাত. আদালতে উমার রা.-এর রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপ: উমার রা.-এর যুগে ইসলাম যখন চতুর্দিক ছড়িয়ে পড়ল, খিলাফত যখন চারপাশে বিস্তৃত হলো, তখন খলিফার ব্যস্ততা বেড়ে গেল, বড়ো বড়ো শহরের গভর্নরদের কাজ বেড়ে গেল, মামলা- মোকদ্দমাও বৃদ্ধি পেতে থাকল। তখন উমার রা. সবগুলো ব্যবস্থাপনা স্বয়ংসম্পূর্ণ করার চিন্তা করলেন, যাতে প্রশাসক শাসনাধীন বিষয়গুলোতে ভালোভাবে সময় দিতে পারেন। সে সময় উমার রা. বিভিন্ন শহরে; যেমন: কুফা, বসরা, শাম, মিসরে কাজি নিয়োগ দেন। অতএব, উমার রা.-ই সর্বপ্রথম স্বয়ংসম্পূর্ণভাবে কাজি নিযুক্ত করেন, বিচার-ব্যবস্থাকে শুধু তাদের সাথেই নির্দিষ্ট করে দেন এবং শাসক- প্রশাসকদের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা করেন। তিনি নিজেই তাদের নিয়োগ দিতেন, তাদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করতেন। তিনি বলতেন-বিচার-ব্যবস্থায় কোনো সমস্যা হলে শুধু তার কাছেই যেন পেশ করে, কোনো শাসক যেন সেখানে অনধিকার চর্চা না করে।

তদ্রুপ উমার রা.-ই সর্বপ্রথম কাজিদের ভাতা আলাদাভাবে বাইতুল মাল থেকে প্রদান করতেন। তার পূর্বে এই পদ্ধতি ছিল না। কারণ, আলাদাভাবে কাজীদের ভাতা-ব্যবস্থা নববি যুগেও ছিল না, আবু বকর রা.-এর যুগেও ছিল না।

আট. তার আরেকটি রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপ ছিল, তিনি খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ রা.- কে নেতৃত্ব থেকে বরখাস্ত করেন। কারণ, মানুষ তার ব্যাপারে ফিতনায় পড়ে গিয়েছিল। সব যুদ্ধে বিজয়ী হওয়ার ফলে সবাই আল্লাহকে ভুলে গিয়ে তাকেই বিজয় দানকারী মনে করত।

আদি ইবনু সাহল রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন-উমার রা. বিভিন্ন শহরে পত্র লিখে পাঠান যে, আমি খালিদ রা.-কে কোনো অসন্তুষ্টি বা খিয়ানতের কারণে বরখাস্ত করি নি। আসলে মানুষ তার ব্যাপারে ফিতনায় আক্রান্ত হয়েছিল। তাই, আমার আশঙ্কা ছিল যে, তারা খালিদ রা.-এর ওপর নির্ভর হয়ে পরীক্ষায় পড়ে যাবে। তখন আমি চাইলাম, সবাই জানুক প্রকৃতপক্ষে সমস্ত কাজ সম্পাদনা করেন একমাত্র আল্লাহই। তারা যেন এ ব্যাপারে ফিতনায় পড়ে না যায়

টিকাঃ
১৯৮৩ উমদাতুল কারি, খণ্ড: ১৯/
১** সিয়াসাতুল মাল ফীল ইসলাম, ১৫৭
১৯৮৩ খারাজ নামক কিতাবে আবু ইউসুফ চরর্ণনা করেন। পৃষ্ঠা: ৫৬
১৮৭ কানযুল উম্মাল, ৩৭০১৯

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00