📘 ইসলামি রাষ্ট্র ব্যবস্থা > 📄 সিয়াসাতের প্রকারভেদ

📄 সিয়াসাতের প্রকারভেদ


সিয়াসাত বা শাসন-ব্যবস্থা তিন প্রকার—
* ০১. বাড়াবাড়ি,
* ০২. ছাড়াছাড়ি এবং
* ০৩. মধ্যপন্থা।

যারা প্রান্তিকতা নিয়ে থাকে, তারা মনে করে শরিয়ত এ-যুগের দাবি পূরণে অক্ষম। তাই কেউ এমন সব শাস্তি কার্যকর করে, যা শরিয়ত আদৌ বলে নি। তারা মনে করে, এটাই সিয়াসাত। আবার কেউ এত শিথিলতা করে যে, হদ কায়েম করে না। তারা মনে করে, শরিয়ত এসব ক্ষেত্রে খুব কঠোরতার পরিচয় দিয়েছে। এই বলে তারা নমনীয় করার চেষ্টা করে। ফলে চোরের হাতও কাটে না, অন্যান্য হদও কায়েম করে না। এভাবে তারা শরিয়তের হুদুদ উঠিয়ে ফেলে। আর সে-ই মধ্যমপন্থায় আছে, যে আল্লাহ তাআলার শরিয়ত অনুযায়ী ফায়সালা করে, শরিয়তের সীমা-পরিসীমা সম্পর্কে জ্ঞাত থাকে। আর যে আল্লাহ তাআলার শরিয়ত অনুযায়ী ফায়সালা করে, তার সিয়াসাতকেই সিয়াসাতে শারইয়্যাহ বলা হয়। জাতির ওই সব কল্যাণই এই সিয়াসাতের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে, যা শরিয়ত সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা করেছে। সুতরাং ওই সকল প্রস্তাব ও সিদ্ধান্তই গ্রহণযোগ্য হবে, যা শরিয়তসম্মত।

রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সেই সময় এই উম্মাহর সিয়াসাতের প্রথম নেতা ছিলেন, যখন আল্লাহ তাআলা বিশদভাবে, স্পষ্ট ভাষায় এবং পূর্ণাঙ্গরূপে এই সিয়াসাতের বিধিবিধান বর্ণনা করেছেন। সুতরাং এতে না সামান্য ভুল আছে, আর না সামান্য ত্রুটি থাকতে পারে। আল্লাহ তাআলা বলেন—

الْيَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِينَكُمْ وَأَتْمَمْتُ عَلَيْكُمْ نِعْمَتِي وَرَضِيتُ لَكُمُ الْإِسْلَامَ دِينًا

আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীন পূর্ণ করে দিলাম, তোমাদের ওপর আমার নিয়ামত পূর্ণাঙ্গ করে দিলাম। আর তোমাদের জন্য ইসলামকে দ্বীন হিসাবে মনোনীত করলাম。

অতএব, আল্লাহ তাআলা এই দ্বীনকে পূর্ণাঙ্গ করে দিয়েছেন। সুতরাং কোনো খলিফা বা অন্য কারও প্রয়োজন নেই এই দ্বীন পূর্ণাঙ্গ করার, বা এই দ্বীনের সঙ্গে তার মত বা চিন্তা যুক্ত করার। কারণ, কুরআনের বর্ণনা অনুযায়ীই এই দ্বীন পূর্ণাঙ্গ। এখন যে দাবি করে—ইসলামের বিধিবিধান সেকেলে, আধুনিক যুগের সাথে তাল মেলাতে পারে না, তার এই দাবি শরয়ি এবং যুক্তিগতভাবে অগ্রহণযোগ্য ও প্রত্যাখ্যাত। শরয়িভাবে বাতিল হওয়ার কারণ আল্লাহ তাআলা বলে দিয়েছেন— 'আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণ করে দিলাম তোমাদের ওপর আমার নিয়ামতকে পূর্ণাঙ্গ করে দিলাম এবং তোমাদের জন্য ইসলামকে দ্বীন হিসাবে মনোনীত করলাম।

এই আয়াতে দ্বীনের পূর্ণাঙ্গতা দ্বারা উদ্দেশ্য কিয়ামত পর্যন্ত পূর্ণাঙ্গ (যত আধুনিক যুগই আসুক না কেন)। পক্ষান্তরে পূর্ববর্তী আসমানি ধর্মগুলোও পূর্ণাঙ্গ ছিল, তবে সেটা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য। আর এই দ্বীন ইসলামের পূর্ণাঙ্গতা কিয়ামত পর্যন্ত। সুতরাং যুগের বিবর্তন হোক আর পরিবর্তন হোক কখনোই এই দ্বীনের নিয়মনীতির পরিবর্তন হবে না। বরং কিয়ামত পর্যন্ত প্রত্যেক যুগের প্রত্যেক মানুষের প্রয়োজনীয়তা এই দ্বীন ইসলামের মাধ্যমেই পূরণ হবে।

ইমাম রাজি রহ. এই আয়াতের তাফসির প্রসংঙ্গে বলেন— 'আল্লাহ তাআলা থেকে প্রেরিত পূর্ববর্তী ধর্ম সব যুগে তার নির্দিষ্ট সময়ের জন্য যথেষ্ট ছিল। আল্লাহ তাআলা ওই ধর্ম প্রেরণের পূর্বেই জানতেন যে, আজকে যেটা পূর্ণাঙ্গ সেটা আগামীতে পূর্ণাঙ্গ থাকবে না, বরং কোনো গ্রহণযোগ্যতাই থাকবে না।

সুতরাং যদি কোনো ধর্ম প্রেরণের পর রহিত করা হয়, বা কোনো বিধান না থাকার পর নতুন করে যুক্ত করা হয়, তাহলে এতে কোনো সমস্যা নেই। আর শেষ যুগে আল্লাহ তাআলা পূর্ণাঙ্গ শরিয়ত প্রেরণ করেন, যা কিয়ামত পর্যন্ত অবশিষ্ট থাকবে। মোটকথা, শরিয়ত সবসময় পূর্ণাঙ্গ থাকে তবে কোনোটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য, আর কোনোটি 'কিয়ামত পর্যন্ত'। এ কথাটি বোঝানোর জন্যই আল্লাহ তাআলা বলেন—

الْيَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِينَكُمْ

তার কথা যুক্তিগতভাবে প্রত্যাখ্যাত। কারণ, যেকোনো জিনিস মেরামত করতে হলে কিছু নিয়মনীতি অনুসরণ করতে হয়। আর সেই নিয়মনীতি ওই ব্যক্তিই তৈরি করতে পারে, যে ওই জিনিসের প্রকৃত অবস্থা, যোগ্যতা, ধারণ ক্ষমতা সম্পর্কে এবং কীসে তার উন্নতি আর কীসে তার ক্ষতি, সে সম্পর্কে জ্ঞান রাখে।

সুতরাং সার্বিক এবং পূর্ণাঙ্গভাবে একজন মানুষের অবস্থা সম্পর্কে তিনি জ্ঞানী হবেন যিনি তাকে সৃষ্টি করেছেন, তাকে পরিচালনা করছেন। আর তিনি তো আল্লাহ ছাড়া আর কেউ নন, যিনি একক, সৃষ্টিকর্তা ও ক্ষমতাবান। অতএব, মানুষের সংশোধন ও আত্মশুদ্ধি করতে হলে আল্লাহরই প্রণয়নকৃত মূলনীতি অনুসরণ করতে হবে। আর এটাই হলো ইসলাম, যাতে মানুষের প্রতিটি প্রয়োজনের বিধান রয়েছে। এ কথা একজন মূর্খ বা হঠকারী লোক ছাড়া কেউ অস্বীকার করতে পারে না। আল্লাহ তাআলাই ভালো জানেন। এই সিয়াসাতকেই সিয়াসাতে মুহাম্মাদিয়্যা বলে, যা অনুসরণ করেছেন খুলাফায়ে রাশিদিন এবং তাদের পরবর্তী ইসলামের আদর্শে আদর্শিত ন্যায়পরায়ণ শাসকগণ। সুতরাং একজন আদর্শ খলিফাকেও খুলাফায়ে রাশিদার জীবনচরিত, তাদের উপদেশ ও শাসননীতি অধ্যয়ন করতে হবে।

টিকাঃ
১৬১ সূরা মায়িদা, আয়াত: ৩
১৭০ সূরা মায়িদা, আয়াত: ৩
১৭১ তাফসিরে কাবির, খণ্ড: ১১, পৃষ্ঠা:

📘 ইসলামি রাষ্ট্র ব্যবস্থা > 📄 আবু বকর রা.-এর উপদেশ

📄 আবু বকর রা.-এর উপদেশ


আবদুল্লাহ ইবন হাকিম থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমাদের উদ্দেশ্যে আবু বকর রা. বক্তব্য প্রদান করলেন। তিনি আল্লাহ তাআলার হামদ ও সানা বর্ণনা করার পর বললেন—আমি তোমাদের উপদেশ দিচ্ছি, আল্লাহ তাআলাকে ভয় করার, তার যথোপযুক্ত প্রশংসা করার, আশা ও ভয় একত্র করার। কারণ, আল্লাহ তাআলা জাকারিয়া আ. এবং তার পরিবারবর্গের প্রশংসা করতে গিয়ে বলেন-

إِنَّهُمْ كَانُوا يُسَارِعُونَ فِي الْخَيْرَاتِ وَيَدْعُونَنَا رَغَبًا وَرَهَبًا وَكَانُوا لَنَا خَاشِعِينَ

নিঃসন্দেহে তারা কল্যাণকর কাজসমূহে দ্রুত অগ্রবর্তী থাকত, আর আমাকে আশা ও ভয়ের সাথে ডাকত। আর তারা ছিল আমার সামনে বিনয়ী

আল্লাহর বান্দারা! তোমরা শুনে রাখো-তিনি তার ওয়াদাকে (জান্নাতকে) তোমাদের জানের (ব্যয় করার) সাথে আবদ্ধ করে দিয়েছেন, সে বিষয়ে তোমাদের থেকে প্রতিশ্রুতিও নিয়েছেন, আর তিনি তোমাদের থেকে সামান্য জিনিস (নফস ও মাল) কিনে নিয়েছেন বিশাল বিনিময়ে (জান্নাত)। এই যে তোমাদের সামনে আল্লাহর কিতাব-যার নূর কখনো নিভে যাবে না, যার মুজিযা কখনো শেষ হবে না। সুতরাং তোমরা তাঁর নূর থেকে আলো গ্রহণ করো, তাঁর কিতাব থেকে উপদেশ গ্রহণ করো। তোমরা তাঁর থেকে নূর গ্রহণ করো অন্ধকার দিনের জন্য। তিনি তো তোমাদের সৃষ্টি করেছেন তাঁর ইবাদাতের জন্য। আর তোমাদের সাথে নিযুক্ত করে দিয়েছেন সম্মানিত লিপিবদ্ধকারী ফেরেশতাদের, যারা তোমাদের কৃতকর্ম সম্পর্কে জানে।

আল্লাহর বান্দারা, তোমরা জেনে রাখো-তোমরা এমন সময়ে আসা-যাওয়া করছ, যার জ্ঞান তোমাদের থেকে অদৃশ্য করে রাখা হয়েছে। অতএব, তোমরা যদি চাও যে-তোমাদের নির্দিষ্ট মেয়াদ শেষ হয়ে যাবে, আর তোমরা কাজ করতে থাকবে; তাহলে করো দেখি; কিন্তু তোমরা তা কিছুতেই করতে পারবে না আল্লাহর সাহায্য ছাড়া। সুতরাং তোমরা তোমাদের নির্ধারিত মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই পিছিয়ে রাখতে চেষ্টা করো তো দেখি, যা তোমাদের মন্দ আমলের দিকে নিয়ে যাবে। কারণ, এক জাতি ছিল-যারা নিজেদের নির্ধারিত মেয়াদ অন্যদের জন্য সাব্যস্ত করেছিল, নিজেদের তারা ভুলে গিয়েছিল। আজ কোথায় তাদের দৃষ্টান্ত? সুতরাং বাঁচো ভাই, বাঁচো! তারপর মুক্তি পাওয়ার চেষ্টা করো। কারণ, তোমাদের পেছনে এক তলবকারী রয়েছে, যার তিক্ততা খুবই দ্রুত।

আবু বকর রা.-এর আরেকটি উপদেশ: তিনি বলেন—আজ কোথায় সেই রাজা-বাদশাহরা, যারা বিভিন্ন নগরী বিনির্মাণ করে চারপাশে বাগান দিয়ে সুরক্ষিত করেছিল। আজ তারা কোথায়, যারা যুদ্ধে শত্রুদের পরাস্ত করে দম্ভভরে ফুলে উঠত। আজ তারা অন্ধকার কবরে মিশে গেছে।

টিকাঃ
১২ সূরা আম্বিয়া, আয়াত: ১০

📘 ইসলামি রাষ্ট্র ব্যবস্থা > 📄 আবু বকর রা.-এর রাষ্ট্রনীতি

📄 আবু বকর রা.-এর রাষ্ট্রনীতি


এক. তিনি একবার খুতবার শুরুতে বললেন—‘হে লোকসকল, আমাকে তোমাদের শাসক বানানো হয়েছে, যদিও আমি তোমাদের শ্রেষ্ঠ ব্যক্তি নই। অতএব, আমি যদি ভালো কাজ করি, তাহলে আমাকে সাহায্য করো। আর আমি যদি মন্দ কাজ করি, তাহলে আমাকে সংশোধন করো। সত্য বলা আমানত, মিথ্যা বলা খিয়ানত। তোমাদের দুর্বল ব্যক্তি আমার কাছে শক্তিশালী যতক্ষণ না আমি তার হক ফিরিয়ে দেব, ইন শা আল্লাহ। আর তোমাদের শক্তিশালী (জালিম) ব্যক্তি আমার কাছে অসহায় ঠিক ততক্ষণ পর্যন্ত যতক্ষণ না আমি তার থেকে (আরেক ব্যক্তির) হক তুলে আনি, ইন শা আল্লাহ।’

তার এ কথায় বেশ কিছু বিষয়ের ইঙ্গিত রয়েছে—

:: প্রথমত, ইসলামের দৃষ্টিতে মানুষ সমান—শাসক হোক বা শাসিত, সাদা হোক বা কালো, আরব কিংবা আজমি। কোনোভাবেই একে অন্যের ওপর শ্রেষ্ঠত্বের অধিকারী নয়। এটা বোঝা যায় তার উল্লিখিত কথা—‘যদিও আমি তোমাদের শ্রেষ্ঠ ব্যক্তি নই’ থেকে।

:: দ্বিতীয়ত, তিনি বলেছেন—‘যদি আমি ভালো কাজ করি, তাহলে আমাকে সাহায্য করো।’ এখান থেকে বোঝা যায়, জনগণের সুযোগ আছে শাসকের ভুল শুধরে দেওয়ার। আসল বিষয় হচ্ছে—রাজার চালে রাজ্য চলে। শাসক যদি ঠিক থাকে তাহলে জনগণ এমনিতেই ঠিক হয়ে যায়। এজন্যই জনগণের কর্তব্য হচ্ছে শাসককে শুধরে দেওয়া, তবে সেটা শরিয়ত নির্দেশিত পন্থায় হতে হবে।

:: তৃতীয়ত, মানুষের মাঝে ইনসাফ ও সাম্যতা রক্ষা করা, যা ইসলামি রাষ্ট্রের প্রধান উদ্দেশ্য এবং শাসকের প্রধান কর্তব্য। এটা বোঝা যায় তার কথা—‘তোমাদের দুর্বল ব্যক্তি...’ থেকে।

দুই. তিনি বলেন—‘সত্য বলা আমানত, মিথ্যা বলা খিয়ানত’। এখানে, সিদ্দিকে আকবর রা. উম্মাহকে পরিচালনা করার বড়ো একটি মূলনীতি ঘোষণা দিয়েছেন। কারণ, সত্যবাদিতাই হলো শাসক এবং শাসিতের মাঝে নির্ভরতার ভিত্তি। রাষ্ট্র শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে যার প্রভাব অনেক বিস্তৃত। তাছাড়া সত্যবাদিতা হলো ভিত্তিমূলক স্বভাব, ইসলাম যার কথা বলে। আল্লাহ তাআলা বলেন—

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَكُونُوا مَعَ الصَّادِقِينَ

হে ঈমানদারগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং সত্যবাদীদের সঙ্গ অবলম্বনকরো

তিন. আবু বকর রা. প্রয়োজনগ্রস্ত এবং দুর্বলদের খিদমত করতেন। আবু সালিহ গিফারি রা. থেকে বর্ণিত, উমার রা. মদিনার ঝুপড়িতে বসবাস করা এক অন্ধ বৃদ্ধাকে প্রত্যেক রাতে ওয়াদা দিতেন যে—তিনি তাকে পানি এনে দেবেন, তার কাজ করে দেবেন; কিন্তু পরদিন এলে দেখতেন, অন্য কেউ তার আগে এসে সব কাজ করে দিয়েছে। একদিন তিনি কয়েকবার আসা যাওয়া করলেন, যাতে তার আগে কেউ যেতে না পারে। তিনি নজরদারি করছিলেন। তিনি হঠাৎ দেখলেন যে, আবু বকর রা. বৃদ্ধার কাছে যাচ্ছেন, অথচ তিনি তখন মুসলিম জাহানের খলিফা।

চার. তিনি যেকোনো দায়িত্ব তার যোগ্য ব্যক্তির কাছেই অর্পণ করতেন। তাই দেখা যায়, তিনি আবু উবাইদা ইবনুল জাররাহ রা.-কে (যাকে নবীজি এই উম্মাহর আমিন ও বিশ্বস্ত বলেছেন) অর্থমন্ত্রী বানিয়েছেন, বাইতুল মালের যাবতীয় বিষয়ের দায়িত্ব তাকে দিয়েছেন। উমার ইবনুল খাত্তাব রা.-কে কাজির (বিচারের) দায়িত্ব (আইন মন্ত্রণালয়) দিয়েছেন, জায়িদ ইবনু সাবিত রা.-কে লেখার (ডাক, চিঠি ও যোগাযোগ মন্ত্রণালয়) দায়িত্ব দিয়েছেন।

পাঁচ. দ্বীন ইসলাম হিফাজতের দৃঢ় ইচ্ছা। যখন কিছু কাবিলা মুরতাদ হয়ে গিয়েছিল, তখন তিনি জিহাদের ঘোষণা দেন; সমস্ত কাবিলার উদ্দেশ্যে একটি পত্র লেখেন, কিছু লোক পাঠিয়ে প্রত্যেক গোত্রের মাঝে সে পত্র পড়ে শোনাতে বলেন। পতাকা তৈরি করে এগারোজনকে পতাকা দেন—

খালিদ ইবনুল ওয়ালিদকে পতাকা দিয়ে তুলাইহা ইবনু খুওয়াইলিদের উদ্দেশ্যে প্রেরণ করেন। তুলাইহার কাজ সম্পন্ন করার পর মালিক ইবনু নুওয়াইরার উদ্দেশ্যে বিতাহ নামক অঞ্চলে রওনা হওয়ার নির্দেশ দেন। পরবর্তী নির্দেশ আসার আগ পর্যন্ত সেখানেই অবস্থান করতে বলেন।

ইকরামাকে পতাকা দেন মুসাইলামার উদ্দেশ্যে। শুরাহবিল ইবনু হাসানাকে প্রথমে ইকরামার পেছনে পেছনে মুসাইলামাতুল কাজ্জাবের উদ্দেশ্যে, তারপর বনু কুজাআর উদ্দেশ্যে প্রেরণ করেন।

মুহাজির ইবনু আবু উমাইয়াকে মিথ্যা নবী আনসির সৈন্যবাহিনীর উদ্দেশ্যে প্রেরণ করেন। কাইস ইবনু মাকশুহ ছাড়া তার সন্তানদের সাহায্য করতে বলেন। কারণ, কাইস ইবনু মাকশুহ বাইআত ভঙ্গ করেছিল।

খালিদ ইবনু সায়িদকে পতাকা দিয়ে শামের উচ্চভূমির উদ্দেশ্যে পাঠান। আমর ইবনুল আসকে কুযাআ, ওয়াদিয়া এবং হারিস গোত্রের লোকদের উদ্দেশ্যে পাঠান। হুজাইফা ইবনু মুহসিন গাতফানিকে আম্মানের দাবা, ইরফাজা ও হারসামা-সহ অন্যান্য গোত্রের উদ্দেশ্যে পাঠান।

তারিফা ইবনু হাজিব রা.-কে বনু সালিম এবং তাদের সাথে অবস্থানকারী হাওয়াবিন গোত্রের যারা আছে, তাদের উদ্দেশ্যে প্রেরণ করেন। সুওয়াইদ ইবনু মুকরিন রা.- কে ইয়ামানের তিহামা অঞ্চলের (পাহাড় ও সাগরের মাঝে অবস্থিত নিম্নভূমি) উদ্দেশ্যে প্রেরণ করেন।

আলা ইবনু হাজরামি রা.-কে বাইরাইনের অধিবাসীদের উদ্দেশ্যে প্রেরণ করেন। তিনি প্রত্যেক আমিরকে পৃথক একটি পত্র লিখে দেন, যাতে তার সাথে আলাদাভাবে চুক্তিবদ্ধ হন। তখন প্রত্যেক আমির তার সৈন্যদের নিয়ে বেরিয়ে পড়েন।

তার এ বিশাল পদক্ষেপ থেকে বোঝা যায়, মুরতাদদের বিরুদ্ধে লড়াই করার মূল প্রেরণা ছিল তার গাইরত ও দীনের হিফাজত।

টিকাঃ
১৭৩ আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, খণ্ড:
১৭৪ সূরা তাওবা, আয়াত: ১১৯
১৭৫ সুয়ুতি, তারিখুল খুলাফা
১৭৬ মাওসুআতুস সিয়ার, খণ্ড: ৬, পৃষ্ঠা: ৫১১
১” আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, খণ্ড: ৬, পৃষ্ঠা: ৩৪৮

📘 ইসলামি রাষ্ট্র ব্যবস্থা > 📄 উমার ইবনুল খাত্তাব রা.-এর উপদেশ

📄 উমার ইবনুল খাত্তাব রা.-এর উপদেশ


এক. একবার তিনি সাথিদের বললেন— 'তোমরা যা ইচ্ছা কামনা করো।' তখন একজন বলল, 'আমার কামনা হলো, এই বাড়িটি যদি স্বর্ণ দিয়ে ভরে যেত, আর আমি তা আল্লাহর রাস্তায় খরচ করতাম আর দান করতাম।'

আরেকজন বলল—'আমার ইচ্ছা হলো, এই বাড়িতে যদি অনেকগুলো হীরকখণ্ডের টুকরো থাকত, যা আমি আল্লাহর রাস্তায় খরচ করতাম, আর দান করতাম।'

তারপর উমার রা. বললেন— 'তোমরা যা পারো কামনা করো।' উপস্থিত লোকেরা বলল—'হে আমিরুল মুমিনিন, আপনি কী বলতে চাচ্ছেন, আমরা জানি না।'

তিনি বললেন—'আমার ইচ্ছা হলো, যদি এই বাড়িটি আবু উবাইদা ইবনুল জাররাহ, মুআজ ইবনু জাবাল, আবু হুজাইফার আজাদকৃত দাস সালিম, হুজাইফা ইবনুল ইয়ামানের মতো মহান লোকদের দ্বারা ভরে থাকত, যাদের দ্বারা মুসলিম উম্মাহর কাজ করব।'

দুই. সায়িদ ইবনুল মুসাইয়িব থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, উমার রা. মানুষের উদ্দেশ্যে আঠারোটি বাক্য তৈরি করেন, যার প্রত্যেকটিই আলাদা একটি দর্শন ও নীতিবাক্য। যথা:

০১। যে তোমার কোনো জিনিসের ক্ষেত্রে আল্লাহর অবাধ্যতা করে, তোমার দেওয়া তার সবচেয়ে উত্তম শাস্তি হলো—ওই জিনিসের ক্ষেত্রে তার অবাধ্যতার সমপরিমাণ আল্লাহর আনুগত্য করবে।

০২। তুমি তোমার অপর ভাইয়ের যেকোনো বিষয় উত্তমভাবে সাজিয়ে রাখো, যদি না সে তোমাকে নিষেধ করে।

০৩। কোনো মুসলিম ভাই থেকে কোনো কথা বের হলে খারাপ ধারণা করো না, যদি তা ভালো হওয়ার সম্ভাবনা রাখে।

০৪। কেউ যদি অপবাদের সম্মুখীন হয়, তাহলে এমন কেউ যেন তাকে দোষ না দেয়, যার ব্যাপারে (পূর্ব থেকে) খারাপ ধারণা ছিল।

০৫। যে তার রহস্যময় বিষয় গোপন রাখবে, সে কল্যাণ লাভ করবে।

০৬। তুমি সৎ এবং সত্যবাদী বন্ধুদের সঙ্গ গ্রহণ করো, তাদের সাথে বাস করো। কারণ, তারা সুখে তোমার শোভা বর্ধন করবে, দুঃখে তোমাকে সাজসরঞ্জাম দেবে।

০৭। সবসময় সত্য কথা বলো, যদিও তার কারণে মরে যেতে হয়।

০৮। অনর্থক কাজে ব্যস্ত হয়ো না।

০৯। যে জিনিসটি ঘটেনি তার সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করো না। কারণ, সেটা অস্তিত্বহীন বিষয়ে ব্যস্ততা।

১০। এমন কারও প্রয়োজন পূরণ করতে যেয়ো না, যে প্রয়োজন পূরণ করতে চায় না।

১১। সংঘর্ষপূর্ণ শপথ করো না, অন্যথায় ধ্বংস হয়ে যাবে।

১২। পাপাচারী চেনার জন্য পাপাচারীদের সংস্পর্শে যেয়ো না।

১৩। শত্রুকে এড়িয়ে যাও।

১৪। বিশ্বস্ত ছাড়া অন্য কোনো বন্ধুকে প্রশ্রয় দিয়ো না। তবে শুনে রাখো, সে-ই বিশ্বস্ত যে আল্লাহকে ভয় করে।

১৫। কবরের সামনে বিনীত হয়ে দাঁড়াও।

১৬। আনুগত্য করার ক্ষেত্রে নমনীয় হও।

১৭। অবাধ্যতা করে ফেললে আল্লাহর আশ্রয় গ্রহণ করো।

১৮। যারা আল্লাহকে ভয় করে, তাদের সাথে নিজের বিষয়ে পরামর্শ করো। কারণ আল্লাহ তাআলা বলেন-

إِنَّمَا يَخْشَى اللَّهَ مِنْ عِبَادِهِ الْعُلَمَاءُ إِنَّ اللَّهَ عَزِيزٌ غَفُورٌ

তার বান্দাদের মধ্য হতে শুধু আলিমরাই আল্লাহকে ভয় করে。

তিন. ইসহাক ইবনু রাশিদ থেকে বর্ণিত, উমার রা. বলেন—'দোষী হওয়ার জন্য এটাই যথেষ্ট যে, নিজের ভুল ত্রুটি না দেখে অন্যের ভুল ত্রুটি নিয়ে লেগে থাকে। নিজে যে দোষ করে, মানুষকে সে দোষের জন্য নিন্দা করে। সাথি বা মানুষকে অযথাই কষ্ট দেয়...

চতুর্থ, শাকিক রা. থেকে বর্ণিত, উমার রা. একটি চিঠিতে লেখেন— 'দুনিয়া হলো সবুজ শ্যামল ও সুমিষ্ট। অতএব, যে তার হক অনুযায়ী দুনিয়ার সামগ্রী গ্রহণ করবে, তার জন্য দুনিয়াতে বরকত দেওয়া হবে। আর যে অবৈধভাবে গ্রহণ করবে, তার উদাহরণ হলো ওই লোকের মতো—যে খায় কিন্তু তৃপ্ত হয় না।'

টিকাঃ
২” ইবনু আসাকির, তারিখু দিমাশক, খণ্ড :
*** ইবনু আসাকির, তারিখ দিমাশক
১৮০ মুসান্নাফু ইবনি আবি শাইবা

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00