📄 নিজেকে পরিচালনা ও পরিশুদ্ধকরণের বেশ কিছু কার্যকর পদ্ধতি
এক. নিজের সম্পর্কে খারাপ ধারণা করা : কারণ, মানুষ অধিকাংশ সময় চালচলন ঠিক করার ব্যাপারে বেখবর থাকে। নিজের সম্পর্কে ভালো ধারণা রাখলে আত্মতুষ্টি চলে আসে। আর আত্মতুষ্টি চলে আসলে নিজের দাসে পরিণত হয়। যার ফলে যে মন্দ স্বভাব ছিল, সেটা তো ভালো হয়ই না; বরং যে ভালো গুণ ছিল, সেটাও আর বাকি থাকে না। কারণ, খাহেশাত মানুষের চিন্তার চেয়েও শক্তিশালী, আর নফস শত্রুর চেয়েও ক্ষতিকর। কারণ, এই নফসই মন্দ বিষয়ের আদেশ করে, প্রবৃত্তির দিকে ছুটে বেড়ায় যেমনটি আল্লাহ তাআলা বলেন— ‘নিঃসন্দেহে, নফস মন্দ বিষয়ে আদেশ দানকারী।’
এজন্যই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, )غلب من الشديد ليس نفسه غلب من الشديد ولكن الناس( শক্তিশালী সে নয়, যে মানুষকে কাবু করে। বরং সে-ই প্রকৃত শক্তিশালী, যে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।’
দুই. বিনয় : আব্দুল মালিক বিন মারওয়ান বলেন— ‘সে-ই শ্রেষ্ঠ মানুষ, যে বড়ো হয়েও দুনিয়ামুখীতা ত্যাগ করে, শক্তিশালী হয়েও ইনসাফ করে।’
কেউ কেউ বলেন—‘যখন কোনো মহৎ বিষয়ে বিনয় অবলম্বন করা হয়, তখন বিনয়ী সেই মহৎ বিষয় থেকে ঊর্ধ্বে উঠে যায়।’
ইমাম মাওয়ারদি রহ. বলেন— ‘রাজা বাদশাহরা সবচেয়ে বেশি ইচ্ছা-অভিপ্রায় করতে পারে, সবচেয়ে বিস্তৃত আশা-আকাঙ্ক্ষা করতে পারে। তাই, তাদের থেকেই যদি অহংকার ও আত্মতুষ্টি দেখা যায়, তাহলে সেটা খুবই মন্দ। বরং তা সামান্য প্রকাশ পাওয়াও লজ্জাজনক বিষয়। অহংকার ও আত্মতুষ্টির মাঝে পার্থক্য হচ্ছে, যদিও মন্দ হওয়ার ক্ষেত্রে দুটোই সমান, তবে অর্থগত দিক থেকে একটি অপরটি থেকে ভিন্ন। আত্মতুষ্টি নিজের ক্ষেত্রে এবং নিজের বিভিন্ন গুণের ক্ষেত্রে পাওয়া যায়। আর অহংকার বিভিন্ন মর্যাদা ও পদমর্যাদার ক্ষেত্রে পাওয়া যায়। অতএব, অহংকার বাহির থেকে সৃষ্টি হয়, আর আত্মতুষ্টি নিজের ভেতর থেকেই সৃষ্টি হয়। আর তাই সেটি অনেকটা অবিচ্ছেদ্যভাবে থাকে। তবে দুটোই মর্যাদাবান ও গুণী ব্যক্তিদের জন্য কলঙ্ক。
যিনি বলেছেন (প্রবাদ) কতই না সুন্দর বলেছেন—
إذا أردت شريف الناس كلهم فانظر الى ملك في زي مسكين ذلك الذي عظمت في الله رغبته وذاك يصلح للدنيا وللدين
'তুমি যদি শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিকে দেখতে চাও, তাহলে এমন বাদশাহকে দেখো-যে গরিব-মিসকিনের বেশে আছে। কারণ, আল্লাহকে পাওয়ার ব্যাকুলতা তার মাঝেই বেশি পরিমাণে রয়েছে। এমন বাদশাহই দ্বীন-দুনিয়ার বাদশাহ হওয়ার যোগ্যতা রাখে।'
তিন. বেশি বেশি পরামর্শ করা : কেননা, সাথিদের সাথে পরামর্শ করা নিজের জ্ঞান-বুদ্ধি বৃদ্ধি করে, আত্মতুষ্টি দূর করে। জ্ঞানী ব্যক্তিরা বলেন, 'বুদ্ধির দাবি হলো—জ্ঞানীদের সিদ্ধান্ত শোনার পর নিজে সিদ্ধান্ত দেবে। দার্শনিকদের চিন্তা জানার পর নিজে চিন্তা করবে। কারণ, নিজের সিদ্ধান্ত অনেক সময় বিফলে যায়। তদ্রুপ কেবল নিজের একার চিন্তা প্রায় সময় বিপথে যায়।'
চার. আল্লাহর জন্য খাঁটি নিয়ত করা : বান্দা যে আমল আল্লাহর জন্য করে, শুধু সে আমলই আল্লাহ তাআলা কবুল করেন। তাঁর সাথে কাউকে শরিক না করে আমল করলেই কেবল তা কবুল হয়। একইভাবে বান্দাদের নিয়ত অনুযায়ী আল্লাহ তাআলা তাদের সাহায্য করেন। আর খলিফা আল্লাহর সাহায্যের সবচেয়ে বেশি মুখাপেক্ষী। সুতরাং তার নিয়তই সবচেয়ে বেশি শুদ্ধ হতে হবে।
সালিম ইবনু আবদিল্লাহ ইবনি উমার রা. উমার ইবনু আবদিল আজিজের কাছে পত্র লিখে বলেন— 'নিয়তের পরিমাণ অনুযায়ীই আল্লাহর থেকে সাহায্য আসে। অতএব, যদি বান্দার নিয়ত পূর্ণাঙ্গ হয়, তাহলে আল্লাহর সাহায্যপ্রাপ্তিও পূর্ণাঙ্গ হয়ে আসবে। আর যার নিয়ত কম হবে, আল্লাহর সাহায্য তার জন্য সে পরিমাণই হবে।'
টিকাঃ
১৫৬ তাসহিলুন নাজর, ৪৭
১৫৭ সূরা ইউসুফ, আয়াত: ৫৩
১৫৮ মুশকিলুল আসার, ১৬৪৫
১৫৯ সুনানু বাইহাকি, ৭৮৭৭
১৬০ তাসহিলুন নাজার, পৃষ্ঠা: ৫৪