📄 বর্তমান গণতান্ত্রিক নির্বাচন পদ্ধতি
বর্তমানে যেসব নির্বাচন পদ্ধতি (গণতন্ত্র বা অন্যান্য) আছে, তার কোনোটারই শরয়ি ভিত্তি নেই। একসময় মুসলিম উম্মাহর সাথেও এর কোনো সম্পর্ক ছিল না। এগুলোতে যদি কল্যাণই থাকত, তাহলে সাহাবায়ে কিরাম তা বর্জন করতেন না। এটা আসলে কাফিরদের রচিত জাহিলি যুগের ষড়যন্ত্রের একটি অংশ। সুতরাং, এই পদ্ধতি অনুযায়ী আমল করা মুসলিমদের জন্য শোভনীয় নয়।
এগুলোর মাঝে অনেক অপ্রীতিকর, অবৈধ ও ক্ষতিকর জিনিস আছে। যেমন-
০১. পরস্পরের মাঝে বিরোধিতা সৃষ্টি করে। গোত্র, দল ও ভাষাভিত্তিক সাম্প্রদায়িকতা সৃষ্টি করে। এর মাধ্যমে সাম্প্রদায়িকতার দিকে আহ্বান করা হয়, যাকে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জাহিলি ও দুর্গন্ধযুক্ত বলেছেন। জাবির ইবনু আবদুল্লাহ রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন-আমরা গাজায় ছিলাম, (বর্ণনাকারী সুফইয়ান আরেক আরেকবার 'গাজা' বলার জায়গা 'জাইশ' বলেছেন,) তখন মুহাজিরদের একজন এক আনসারি সাহাবির নিতম্বে আঘাত করেন। তখন আনসারি সাহাবি স্বগোত্রের লোকদের সাহায্যের জন্য তাদের ডেকে বললেন-হে আনসার ভাইয়েরা!
এদিকে মুহাজির সাহাবিও-'হে মুহাজির ভাইগণ' বলে ডাক দিয়ে তাদের সাহায্য চাইলেন।
তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সেই আওয়াজ শুনে বললেন,
ما " কি সমস্যা? জাহিলি যুগের স্লোগান দিচ্ছ কেন?' بال دعوى الجاهلية
উপস্থিত লোকেরা বলল-'হে আল্লাহর রাসুল, এক মুহাজির অপর আনসারের নিতম্বে আঘাত করেছে।'
তখন তিনি বললেন-'এই দুর্গন্ধযুক্ত আওয়াজ পরিহার করো।'
তাছাড়া এই ধরনের পারস্পরিক বিরোধিতার কারণে মুসলিম উম্মাহ দুর্বল হয়ে যাবে, ইসলামের শত্রুদের মোকাবিলার শক্তি ফুরিয়ে যাবে। তাছাড়া আল্লাহ তাআলা বিরোধিতা থেকে নিষেধও করেছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন-
وَاعْتَصِمُوا بِحَبْلِ اللَّهِ جَمِيعًا وَلَا تَفَرَّقُوا
'তোমরা সম্মিলিতভাবে আল্লাহর রজ্জুকে আঁকড়ে ধরো, বিরোধিতা করো না।'
আল্লাহ তাআলা আরও বলেন-
وَلَا تَنَازَعُوا فَتَفْشَلُوا وَتَذْهَبَ رِيحُكُمْ
তোমরা পরস্পর বিরোধিতা করো না। তাহলে তোমরা ব্যর্থ হবে, তোমাদের প্রতাপ চলে যাবে।
০২. বর্তমানে নির্বাচনের মূল ভিত্তিই হচ্ছে জ্ঞানী ও মূর্খের চিন্তা, আলিম ও ফাসিকের রায়, পুরুষ ও নারীর বিবেচনা এক সমান। মুমিন ও কাফিরের সিদ্ধান্তও এক পর্যায়ের। অর্থাৎ নির্বাচনের ক্ষেত্রে সবাই সমান। অথচ এই পদ্ধতি ইসলামি শিক্ষা ও জীবন-ব্যবস্থার সম্পূর্ণ বিপরীত। আল্লাহ তাআলা বলেন-
قُلْ هَلْ يَسْتَوِي الَّذِينَ يَعْلَمُونَ وَالَّذِينَ لَا يَعْلَمُونَ
আপনি বলেন-যারা জানে আর যারা জানে না, তারা কি সমান হতে পারে?
আল্লাহ তাআলা আরও বলেন-
قُلْ هَلْ يَسْتَوِي الْأَعْمَى وَالْبَصِيرُ
বলেন-অন্ধ ও চক্ষুমান কি সমান হতে পারে?
০৩. ব্যক্তিগত ও রাষ্ট্রীয় সম্পদ কোনো শরয়ি বা কল্যাণকর খাতে ব্যয় না করে প্রচুর পরিমাণে অপচয় করা হয়, যেমনটি প্রায় সব দেশেই দেখা যায়। অথচ আল্লাহ তাআলা বলেছেন-
إِنَّ الْمُبَذِّرِينَ كَانُوا إِخْوَانَ الشَّيَاطِينِ وَكَانَ الشَّيْطَانُ لِرَبِّهِ كَفُورًا
আর তুমি অপচয় করো না। কারণ, নিঃসন্দেহে অপচয়কারী শয়তানের ভাই। আর শয়তান তো তার রবের প্রতি অকৃতজ্ঞ।
কাতাদা রহ. থেকে বর্ণিত, তাফসিরে তাবারিতে আছে- 'অপচয় করো না'-এটা দ্বারা উদ্দেশ্য-গুনাহের কাজে, বাতিল খাত ও ফ্যাসাদ সৃষ্টির ক্ষেত্রে খরচ করা। অর্থাৎ, যারা নিজেদের সম্পদ আল্লাহ তাআলার অবাধ্যতার ক্ষেত্রে ও অকল্যাণকর খাতে ব্যয় করে, তারাই শয়তানের ভাই তথা দোসর। যে অন্য কারও কাজকর্ম অনুসরণ করে, আরবরা তাকে অনুসৃত ব্যক্তির ভাই বলে। আর যেহেতু শয়তানকে সেগুলোর প্রতি অকৃতজ্ঞ, শোকর আদায় করে না। বরং, অকৃতজ্ঞা প্রকাশ করে। আল্লাহ তাআলার আনুগত্য না করে, তাঁর অবাধ্যতার লিপ্ত থেকে, তেমনি আদম- সন্তানদের মধ্যে যারা শয়তানের দোসর, গুনাহের ক্ষেত্রে অপচয় করে, তারাও তাদের প্রতি আল্লাহর নিয়ামতের শুকরিয়া আদায় করে না, তাঁর বিরোধিতা ও অবাধ্যতা করে। বরং, আল্লাহ তাআলা তাদের যে সকল ধন-সম্পদ দান করে অনুগ্রহ করেছেন, সেগুলোর ক্ষেত্রেও তারা শয়তানের অনুসরণ করে। অর্থাৎ, তারা আল্লাহর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ না করে অকৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে।
০৪. যারা নির্বাচনে দাঁড়ায়, তারা জনগণকে বিভিন্ন মিথ্যা ইশতিহার দিয়ে নিজেদের ভোট দেওয়ার আহ্বান করে। প্রকৃতপক্ষে এটা আগ বাড়িয়ে নেতৃত্ব চাওয়ারই নামান্তর, যা ইসলামে নিষিদ্ধ। আব্দুর রহমান ইবনু সামুরা রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন-
يا عبد الرحمن بن سمرة لا تسأل الإمارة فإنك إن أوتيتها عن مسألة وكلت اليها وإن أوتيتها من غير مسألة أعنت عليها ...
‘হে আব্দুর রহমান ইবনু সামুরা, তুমি কখনো নিজ থেকে নেতৃত্ব চেয়ো না। কারণ, যদি তোমাকে নেতৃত্ব দেওয়া হয় তোমার চাওয়ার কারণে, তাহলে তোমাকে সে কাজের দিকে ন্যস্ত করে দেওয়া হবে। আর যদি চাওয়া ছাড়াই দেওয়া হয়, তাহলে সে বিষয়ে তোমাকে সাহায্য করা হবে।'
সুতরাং, কোনো মর্যাদাবান বা মহৎ মানুষের জন্য এটা সমীচীন নয় যে, তারা এ সকল গণতান্ত্রিক কোনো মুমিনের কাজ নির্বাচনে ভোট দেবে। কারণ, ভোট দেওয়ার অর্থই হলো তাদের সাহায্য করা। এই নির্বাচনের উদ্দেশ্যই হলো, জনগণকে মানবরচিত আইন-কানুনের অভিমুখী করা। অথচ আমরা তো মানবের রব রচিত আইন-কানুনের অভিমুখী হতে চাই। আল্লাহ তাআলা বলেন-
أَفَحُكْمَ الْجَاهِلِيَّةِ يَبْغُونَ وَمَنْ أَحْسَنُ مِنَ اللَّهِ حُكْمًا لِقَوْمٍ يُوْقِنُونَ
তারা কি জাহিলি যুগের বিধি-বিধান চায়? দৃঢ় বিশ্বাসী সম্প্রদায়ের জন্য বিধান প্রদানে আল্লাহ হতে কে বেশি শ্রেষ্ঠ?
ইবনু কাসির রহ. বলেন- ‘এই আয়াতে আল্লাহ তাআলা তাদের নিন্দা করছেন, যারা আল্লাহর কল্যাণময়, অনিষ্ট-মুক্ত বিধিবিধান ছেড়ে ওই সকল প্রবৃত্তি-রচিত মতাদর্শের দিকে ছোটে, যা কোনো শরয়ি প্রমাণ ছাড়াই মানুষ বানিয়েছে। যেমন- জাহিলি যুগে লোকেরা তাদের পূর্বপুরুষদের রেখে যাওয়া ভ্রষ্টতা ও মূর্খতাপূর্ণ মনগড়া বিধিবিধান অনুযায়ী ফায়সালা করত। একইভাবে তাতারিরা যেমন তাদের প্রধান জাহাঙ্গির খান রচিত ইয়সিক বা ইয়াসা প্রধান নামের মতাদর্শে রাষ্ট্র পরিচালনা করত। ইয়াসিক বা ইয়াসনা আইন-কানুনের সমষ্টির নাম, যা জাহাঙ্গির বিভিন্ন ধর্ম তথা ইহুদি, খ্রিস্টান এবং ইসলাম ও অন্যান্য ধর্ম থেকে লাভ করেছে। তবে বেশ কিছু আইন আছে, যা তার নিজের প্রবৃত্তি ও মনগড়া। পরবর্তী সময়ে তার বংশের কাছে এটাই ধর্মরূপ লাভ করেছে, যাকে তারা কিতাব-সুন্নাহর ওপর প্রাধান্য দিত। সুতরাং, যে ব্যক্তি এরূপ করবে সে কাফির, তার সাথে লড়াই করা ওয়াজিব-যতক্ষণ না সে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের বিধানের দিকে ফিরে আসে। অতএব, আল্লাহ ছাড়া কারও কোনো বিধান প্রণয়নের অধিকার নেই-সামান্য হোক বা বেশি।
আল্লাহ তাআলা বলেন-তারা কি আল্লাহ তাআলার হুকুমের পরিবর্তে জাহিলিয়াতের বিধিবিধিন চায়? অর্থাৎ, 'যারা আল্লাহ তাআলার শরিয়ত ভালো করে অনুধাবন করে, তাঁর প্রতি ঈমান ও বিশ্বাস রাখে এবং মানে যে, আল্লাহ তাআলাই সমস্ত বিচারকদের বিচারক, সৃষ্টজীবের প্রতি তার মা-বাবার চাইতেও। যারা এটা বিশ্বাস করে, তাদের জন্য আল্লাহ তাআলার চাইতে বিধিবিধানের ক্ষেত্রে কে অধিক ইনসাফকারী?
০৫. এ সকল নির্বাচনে অনেক শরিয়তবিরোধী অবৈধ জিনিস পাওয়া যায়। যেমন- জনগণকে ধোঁকা দেওয়া। তাদেরকে ঘুষ দেওয়ার প্ররোচনা দেওয়া, প্রতারণা করা; যাতে তারা জনগণের ভোট পায়। কারণ, এটা নির্বাচনের ক্ষেত্রে বেশ প্রভাব সৃষ্টি করে।
আমার যা বলার ছিল, তা তো আমি বললাম, বাকি আল্লাহ তাআলাই ভালো জানেন।
ইসলামে 'নির্দিষ্ট সময়ের জন্য শাসক' এমন শাসন-ব্যব ব্যবস্থা কখনোই ছিল না; না খুলাফায়ে রাশিদার যুগে, আর না উমাইয়া-আব্বাসিদের যুগে। বরং সবাই 'সব সময়ের' জন্য শাসক হিসাবে থাকতেন-মৃত্যু পর্যন্ত, কিংবা অন্য কেউ জোরপূর্বক ক্ষমতা নেওয়ার আগ পর্যন্ত, অথবা নিজেই পদ থেকে সরে আসার আগ পর্যন্ত। নির্দিষ্ট সময়ের দাবি করেছেন না কোনো সাহাবি, না কোনো তাবিয়ি, আর না কোনো তাবি-তাবিয়ি; বরং তারা আনুগত্যের ওপর বাইআত গ্রহণ করেছেন, যতদিন পর্যন্ত খলিফা আল্লাহ তাআলার হুকুম কার্যকর রাখেন। কিন্তু শেষ যুগে এসে নির্দিষ্ট শাসন-ব্যবস্থার দাবি উঠল-সিদ্ধান্ত মোতাবেক ৫ বছরের কম বা বেশি। এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, এটা একটি বিদআত। পশ্চিমা চিন্তায় প্রভাবিত ব্যক্তিরাই শুধু এর স্লোগান দিতে পারে।
তাছাড়া এর কারণে জনগণের সম্পদ, বাইতুল মালের সম্পদ অপচয় করা হয়; কোনো নেক খাতে ব্যয় করা হয় না। এছাড়াও এর কারণে সাধারণ ও বিশিষ্টজনদের পরস্পরের মাঝে বিরোধিতা ও সাম্প্রদায়িকতা সৃষ্টি হয়, যেমনটি প্রায় সব দেশেই দেখা যায়। এর কারণে বহিরাগত শত্রুকেও একেবারে ঘরের কোণায় নিয়ে আসা হয়। এখন কিছু সমসাময়িক বুদ্ধিজীবী শাসন-ব্যবস্থা নির্দিষ্টকাল পর্যন্ত করার দাবি তুলছেন। দলিল হিসাবে তারা বলছেন—খিলাফত, এটা একটি ওকালাতের চুক্তি, অর্থাৎ নির্বাচন করা নির্বাচনকারীর পক্ষ থেকে পদপ্রার্থীকে উকিল বানানো, যাতে পদপ্রার্থী ভোটারদের পক্ষ থেকে নায়েব বা উকিল হয়ে যায় নেতৃত্বের পরিচালনার ক্ষেত্রে। আর জানা বিষয় যে—উকালতি চুক্তি নির্দিষ্ট সময়ের সাথে যুক্ত করার ক্ষেত্রে শরিয়তের পক্ষ থেকে কোনো বাধা নেই।
আমাদের জবাব: খিলাফত মানে যদি উকালতের চুক্তি হতো, তাহলে ভোটার বা নির্বাচনকারীর এই সুযোগ থাকত যে, সে চাইলে পদপ্রার্থীকে শাসক হওয়ার পর বরখাস্ত করে দিতে পারে। কারণ, শাসক তো তার উকিল বা নায়েব। কেননা, ওকালাতের ক্ষেত্রে মক্কেলের এই অধিকার আছে যে, সে চাইলেই উকিলকে বরখাস্ত করে দিতে পারে। অথচ খিলাফতের ক্ষেত্রে তো এমনটা নেই। কারণ, মুসনাদু আহমাদে আবদুল্লাহ ইবনু আমর থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন—
مَنْ مَاتَ وَلَيْسَتْ عَلَيْهِ طَاعَةٌ مَاتَ مَيْتَةً جَاهِلِيَّةً فَإِنْ خَلَعَهَا مِنْ بَعْدِهِعَقْدِهَا فِي عُنُقِهِ لَقِيَ اللَّهَ تَبَارَكَ وَتَعَالَى وَلَيْسَتْ لَهُ حُجَّةٌ
যে ব্যক্তি বাইআত গ্রহণ না করা অবস্থায় মৃত্যুবরণ করল, তার মৃত্যু জাহিলিয়াতের মৃত্যুর মতো। আর যদি বাইআত গ্রহণের পর তা খুলে ফেলে, তাহলে সে আল্লাহ তাবারকা ওয়া তাআলার মুখোমুখি হবে এ অবস্থায় যে, তার সাথে কোনো প্রমাণ নেই।
আরেকটি হাদিস আছে আবদুল্লাহ বিন উমার রা. এর। তিনি বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি—
مَنْ خَلَعَ يَدًا مِنْ طَاعَةٍ لَقِيَ اللَّهَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَلَا حُجَّةَ لَهُ، وَمَنْ مَاتَ وَلَيْسَ فِي عُنُقِهِ بَيْعَةٌ مَاتَ مِيتَةً جَاهِلِيَّةً، رَوَاهُ مُسْلِمٌ
যে ব্যক্তি বাইআত থেকে হাত সরিয়ে ফেলে, সে কিয়ামতের দিন কোনো প্রমাণ ছাড়া আল্লাহ তাআলার মুখোমুখি হবে। আর যে মৃত্যুবরণ করবে এ অবস্থায় যে, তার গলায় (জিম্মায়) কোনো বাইআত নেই, তাহলে তার মৃত্যু জাহিলিয়াতের মৃত্যুর মতো হলো。
বাইআত থেকে হাত সরিয়ে ফেলা বা খুলে ফেলার অর্থ বাইআত ভঙ্গ করা। বাইআত ভঙ্গ করাকে সরিয়ে ফেলা বলা হয় এ কারণে যে, বাইআত গ্রহণকারী বাইআতকারীর হাতে হাত রাখে। যেহেতু হাত রাখাকে বাইআত গ্রহণ করা বলা হয়, তাই বাইআত ভঙ্গ করাকে বলা হয় হাত সরিয়ে ফেলা। তবে আমি বলি, এখানে তিনটি বিষয় আছে-
এক. জ্ঞানী-গুণীদের মজলিসে খলিফা নির্বাচন করা। এটা মূলত পদপ্রার্থীকে ভোটারদের পক্ষ থেকে যাচাই করার এবং নেতৃত্বের ক্ষেত্রে তার যোগ্যতার বিষয়ে সাক্ষ্য দেওয়ার মতো।
দুই. তার হাতে জ্ঞানী-গুণীদের বাইআত গ্রহণ, যাকে তারা নেতৃত্বের জন্য নির্দিষ্ট করেছে এবং তার যোগ্যতার বিষয়ে সাক্ষ্য দিয়েছে। এটা তাদের মাঝে এবং নতুন খলিফার মাঝে চুক্তি এই মর্মে যে-তারা ইমামের কথা শোনা ও মানাকে আবশ্যক করে নেবে, যদি সেটা নাফরমানি না হয়। একই সাথে খলিফাও আবশ্যক করে নেবে তাদের হক আদায় করার এবং তাদের দ্বীনের হেফাজত করার। এই চুক্তির মাধ্যমেই তিনি খলিফা হবেন, তাই এই বাইআতকে (বাইআতুল ইনয়িকাদ) নেতৃত্ব সংগঠিত হওয়ার বাইআত বলে।
তিন. জ্ঞানী-গুণীদের বাইআত শেষ হওয়ার পর আনুগত্যের বিষয়ে সাধারণ জনগণের বাইআত। এই বাইআতকে আনুগত্যের বাইআত বলা হয়।
শাসন-ব্যবস্থা সুনির্দিষ্টকাল পর্যন্ত হওয়ার বিষয়ে তাদের আরেকটি দলিল হলো- শরিয়তে এমন কোনো স্পষ্ট দলিল নেই, যা শাসন-ব্যবস্থা সুনির্দিষ্টকাল পর্যন্ত হওয়াকে নিষেধ করে।
আমরা বলি-অনির্দিষ্টভাবে খুলাফায়ে রাশিদার এবং পরবর্তী ন্যায়নিষ্ঠ শাসকদের শাসন করাটাই এক্ষেত্রে আদর্শের মাপকাঠি। কারণ, আমাদেরকে খুলাফায়ে রাশিদার সুন্নাহর অনুসরণ করতে আদেশ করা হয়েছে। যেমন: ইরবাজা ইবনু সারিয়া রা.-এর দীর্ঘ হাদিসে আছে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন-
وَسَتَرَوْنَ مِنْ بَعْدِي اخْتِلافًا شَدِيدًا؛ فعليكم بسنتي وسنة الخلفاء الراشدين المهديين، عَضُّوا عليها بالنواجذ وإياكم والأمور المُحْدَثَاتِ؛ فإن كل بدعة ضلالة.
আমার পরে তোমরা অনেক মতবিরোধ দেখতে পাবে। তখন তোমরা আমার সুন্নাহ এবং হিদায়াতপ্রাপ্ত খুলাফায়ে রাশিদিনের সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরো। তোমরা সেই সুন্নাহকে দাঁত দিয়ে কামড়ে ধরো। তোমরা প্রত্যেক নবউদ্ভাবিত বিষয় সম্পর্কে সতর্ক থেকো। কারণ, প্রত্যেক নবউদ্ভাবিত বিষয়ই বিদআত, আর বিদআতের পরিণام ভ্রষ্টতা。
আর এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, খুলাফায়ে রাশিদার একটি সুন্নাহ হলো অনির্দিষ্টকাল পর্যন্ত শাসন-ব্যবস্থা। তাছাড়া নির্দিষ্টকালের মাঝে বিভিন্ন ক্ষতি তো আছেই।
ফায়দা : ইমাম শাফিয়ি রাহিমাহুল্লাহ একবার মাসজিদুল হারামে বসে ছিলেন। তিনি বললেন—তোমরা আমাকে যা-ই জিজ্ঞাসা করবে, আমি কুরআনে কারিম থেকে এর উত্তর দেব।
তখন এক ব্যক্তি বলল, মুহরিম যদি কোনো ভিমরুলকে মেরে ফেলে, তাহলে এর হুকুম কী?
তিনি উত্তরে বললেন—মুহরিমের ওপর কোনো কিছুই আবশ্যক হবে না।
লোকটি এবার প্রশ্ন করল—এটা কুরআনের কোথায় আছে?
তিনি বললেন—আল্লাহ তাআলা বলেছেন— ‘আর রাসুল তোমাদের যা দেবে, সেটাই তোমরা গ্রহণ করো।’ তারপর তিনি সনদ উল্লেখ করে বললেন যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন—উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু পর্যন্ত সনদ উল্লেখ করার পর বলেন—উমার রা. বলেছেন—মুহরিম ভিমরুলকে হত্যা করতে পারে।
টিকাঃ
১২৭ সহিহ বুখারি, ৪৯০৫
১২৮ সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ১০৩
১২৯ সূরা আনফাল, আয়াত: ৪৬
১০০ সূরা যুমার, আয়াত: ৯
১০১ সূরা আনআম, আয়াত: ৫০
১০২ সূরা ইসরা, আয়াত: ২৬-২৭
১০০ সহিহ বুখারি, ৬৬২২
১০৪ সূরা মায়িদা, আয়াত: ৫০
১৯ তাফসীরে ইবনে
১০০ সহিহ মুসলিম, ১৮৫১
📄 অযোগ্য শাসককে উৎখাত করা
যদি অযোগ্যকে শাসককে উৎখাত করা এবং যোগ্যকে শাসন ক্ষমতায় বসানোর ক্ষেত্রে ফিতনার আশঙ্কা থাকে, তাহলে তাকে উৎখাত করা যাবে না। তদ্রুপ যদি যোগ্য ব্যক্তি না থাকায় অযোগ্য ব্যক্তিকে শাসন ক্ষমতায় বসানো হয়, সাথে সাথে তার ক্ষমতা পাকাপোক্তও হয়ে যায়, তারপর যোগ্য ব্যক্তির আবির্ভাব ঘটে; তাহলে তাকে উৎখাত করা, অথবা তার পরিবর্তে অন্য কাউকে শাসন ক্ষমতায় বসানো মুসলিমদের জন্য বৈধ নয়, যদি তাতে ফিতনা ছড়ানোর আশঙ্কা থাকে।
ইমাম শাতিবি রহ. ইতিসাম গ্রন্থে (২/১৫৩) লিখেছেন— 'ইমাম গাজালি রহ. বাইআতুল মাফযুল মাআ উজুদিল আফজাল কিতাবে বলেন, মুজতাহিদ আর গাইরে মুজতাহিদের মাঝে যদি শাসন-পদের বিচার করা হয়, তাহলে মুজতাহিদকেই প্রাধান্য দেওয়া হবে। কারণ, মুজতাহিদ নিজের ইলমের ওপর সুনির্ভর, আর গাইরে মুজতাহিদ পরনির্ভর; আর সুনির্ভরতা একটি গুণ। মূলনীতি হলো, বৈশিষ্ট্য বা গুণকে বিবেচনা করার সুযোগ থাকলে সেটাকে এড়িয়ে যাওয়া যায় না।'
অপরদিকে, যদি বাইআত বা পূববর্তী শাসকের অসিয়তনামার মাধ্যমে কোনো গাইরে মুজতাহিদকে শাসক বানানো হয়, অতঃপর তার শক্তি ও প্রতাপ পাকাপোক্ত হয়ে যায়, সবাই তার আনুগত্যও স্বীকার করে নেয়, তাহলে তাকে বহাল রাখা হবে, যদি তখন কুরাইশ, ইজতিহাদ ও অন্যান্য শর্তাবলি কারও মাঝে না পাওয়া যায়।
আর যদি পরবর্তী সময়ে খিলাফতের শর্তাবলি আছে এমন কাউকে পাওয়া যায়, কিন্তু অযোগ্যকে অপসারণ করলে অনেক ফিতনা ও সমস্যা সৃষ্টি হয়, তাহলে তাকে অপসারণ করা যাবে না, তার পরিবর্তে অন্য কাউকে আনা যাবে না; বরং তার আনুগত্য আবশ্যক থাকবে, তার শাসন চালিয়ে নেওয়া হবে।
মোটকথা, তার নেতৃত্ব সহিহ থাকবে। কারণ, ইজতিহাদের উদ্দেশ্য অতিরিক্ত ফায়দা। অর্থাৎ, অন্যের অনুসরণে অমুখাপেক্ষিতা এবং নিজের জ্ঞানের ওপর সুনির্ভরতা লাভ। আর খিলাফতের উদ্দেশ্য মতপার্থক্যের দরুন যেন ফিতনা সৃষ্টি না হয়, সবাই যাতে এক পতাকাতলে ঐক্যবদ্ধ হয়। এখন ক্ষুদ্র কিছু লাভের চিন্তা এবং নিছক অপ্রয়োজনীয় ফায়দা লাভের জন্য ফিতনা সৃষ্টি করে, আইন-কানুনের ধার না ধরে গোলমাল করে বৃহৎ এবং মূল ফায়দা বিসর্জন দেওয়া কীভাবে বৈধ হতে পারে?