📄 আবু বকর রা. এর নির্বাচন
ইমাম বুখারি রহ. উমার ইবনুল খাত্তাব রা. থেকে অনেক বড়ো একটি হাদিস বর্ণন করেন। যার একাংশ এমন, উমার রা. বলেন-
যখন আল্লাহ তাঁর নবীকে মৃত্যু দিলেন, তখন আবু বকর রা. ছিলেন আমাদের মধ্যে সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ ব্যক্তি। অবশ্য আনসারগণ আমাদের বিরোধিতা করেছেন। তারা সকলে বনু সায়িদার চত্বরে মিলিত হয়েছেন। আমাদের থেকে বিমুখ হয়ে আলি, জুবাইর ও তাদের সাথিরাও বিরোধিতা করেছেন। অপরদিকে, মুহাজিরগণ আবু বকরের কাছে সমবেত হলেন।
তখন আমি আবু বকরকে বললাম-আবু বকর, একটা কাজ করেন, আমাদের নিয়ে আমাদের ওই আনসার ভাইদের কাছে চলেন।
তিনি তাই করলেন। আমরা তাদের উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। যখন আমরা তাদের নিকটবর্তী হলাম, তখন আমাদের সঙ্গে তাদের দুজন পুণ্যবান ব্যক্তির সাক্ষাৎ হলো। তারা উভয়েই এ বিষয়ে আলোচনা করলেন, যে বিষয়ে লোকেরা ঐকমত্য করছিল। এরপর তারা জিজ্ঞেস করলেন-হে মুহাজির দল, আপনারা কোথায় যাচ্ছেন?
তখন আমরা বললাম-আমরা আমাদের ওই আনসার ভাইদের উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছি।
তারা বললেন-না, আপনাদের তাদের নিকট না যাওয়াই উচিত। আপনারা আপনাদের বিষয় সমাপ্ত করে নেন।
তখন আমি বললাম-আল্লাহর কসম! আমরা অবশ্যই তাদের কাছে যাব। আমরা যেতে শুরু করলাম। অবশেষে বনু সায়িদার চত্বরে তাদের কাছে এলাম। আমরা দেখতে পেলাম, তাদের মাঝখানে এক লোক বস্ত্রাবৃত অবস্থায় রয়েছেন। আমি জিজ্ঞেস করলাম—ওই লোকটি কে? তারা জবাব দিল—তিনি সাদ ইবনু উবাদাহ।
আমি জিজ্ঞেস করলাম—তার কী হয়েছে? তারা বলল, তিনি জ্বরে আক্রান্ত। আমরা কিছুক্ষণ বসার পরই তাদের খতিব উঠে দাঁড়িয়ে কালিমায়ে শাহাদাত পড়লেন এবং আল্লাহর যথোপযুক্ত প্রশংসা করলেন। তারপর বললেন—অতঃপর আমরা আল্লাহর (দ্বীনের) সাহায্যকারী ও ইসলামের সেনাদল এবং তোমরা, হে মুহাজির দল, একটি ছোটো দল মাত্র, যে দলটি তোমাদের গোত্র থেকে আলাদা হয়ে আমাদের কাছে পৌঁছেছে। অথচ এরা এখা আমাদের মূল থেকে সরিয়ে দিতে এবং খিলাফত থেকে বঞ্চিত করতে চাচ্ছে।
যখন তিনি নিশ্চুপ হলেন, তখন আমি কিছু বলার ইচ্ছে করলাম। আর আমি আগে থেকেই কিছু কথা সাজিয়ে রেখেছিলাম, যা আমার কাছে ভালো লাগছিল। আমি ইচ্ছে করলাম, আবু বকর রা.-এর সামনে কথাটি পেশ করব। আমি তার ভাষণ থেকে সৃষ্ট রাগকে কিছুটা ঠান্ডা করতে চাইলাম। আমি যখন কথা বলতে চাইলাম, তখন আবু বকর রা. বললেন—তুমি থামো। আমি তাকে রাগান্বিত করাটা পছন্দ করলাম না। তাই, আবু বকর রা. কথা বললেন। আর তিনি ছিলেন আমার চেয়ে সহনশীল ও গম্ভীর।
আল্লাহর কসম! তিনি এমন কোনো কথা বাদ দেন নি, যা আমি সাজিয়ে রেখেছিলাম। অথচ তিনি তাৎক্ষণিকভাবে ওই রকম, বরং তার থেকেও উত্তম কথা বললেন। অবশেষে তিনি কথা বন্ধ করে দিলেন। এরপর আবার বললেন—তোমরা তোমাদের ব্যাপারে যেসব উত্তম কাজের কথা বলেছ, আসলে তোমরা এর উপযুক্ত। তবে খিলাফতের ব্যাপারটি কেবল এই কুরাইশ বংশের জন্য নির্দিষ্ট। তারা হচ্ছে বংশ ও আবাসভূমির দিক দিয়ে সর্বোত্তম আরব। আর আমি এই দুজন হতে যেকোনো একজনকে তোমাদের জন্য নির্ধারিত করলাম। তোমরা যেকোনো একজনের হাতে ইচ্ছামতো বাইআত করে নাও। এরপর তিনি আমার ও আবু উবাইদা ইবনুল জাররাহ রা.-এর হাত ধরলেন। তিনি আমাদের মাঝখানেই বসা ছিলেন। আমি তার এ কথা ব্যতীত, যত কথা বলেছেন কোনোটাকে অপছন্দ করি নি। আল্লাহর কসম! আবু বকর যে জাতির মধ্যে বর্তমান আছেন, সে জাতির ওপর আমি শাসক নিযুক্ত হওয়ার চেয়ে এটাই শ্রেয় যে, আমাকে পেশ করে আমার ঘাড় ভেঙে দেওয়া হবে। ফলে তা আমাকে কোনো গুনাহের কাছে নিয়ে যেতে পারবে না। হে আল্লাহ, হয়তো আমার আত্মা আমার মৃত্যুর সময় এমন কিছু আকাঙ্ক্ষা করতে পারে, যা এখন আমি পাচ্ছি না।
তখন আনসারদের এক ব্যক্তি বলে উঠল—আমি এ জাতির অভিজ্ঞ ও বংশগত সম্ভ্রান্ত। হে কুরাইশ, আমাদের হতে হবে এক আমির, আর তোমাদের হতে হবে এক আমির।
এ সময় অনেক কথা ও হইচই শুরু হয়ে গেল। আমি এ মতবিরোধের দরুন শঙ্কিত হয়ে পড়লাম। তাই আমি বললাম—আবু বকর, আপনি হাত বাড়ান। তিনি হাত বাড়ালেন। আমি তার হাতে বাইআত করলাম। মুহাজিরগণও তার হাতে বাইআত করলেন। অতঃপর আনসারগণও তার হাতে বাইআত করলেন। আর আমরা সাদ ইবনু উবাদাহ রা.-এর দিকে এগিয়ে গেলাম।
তখন তাদের এক লোক বলে উঠল—তোমরা সাদ ইবনু উবাদাহকে জানে মেরে ফেলেছ।
তখন আমি বললাম—আল্লাহ সাদ ইবনু উবাদাহকে শেষ করে দিয়েছেন। উমার রা. বলেন—আল্লাহর কসম! আমরা সে সময়ের জরুরি বিষয়ের মধ্যে আবু বকরের বাইআতের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কোনো কিছুকে মনে করি নি। আমাদের আশঙ্কা ছিল, যদি বাইআতের কাজ সম্পন্ন না করেই আমরা আনসারদের থেকে আলাদা হয়ে যাই, তাহলে তারা আমাদের পরে তাদের কারও হাতে বাইআত করে নেবে। তারপর হয়তো আমাদের নিজ ইচ্ছার বিরুদ্ধে তাদের অনুসরণ করতে হতো, না হয় তাদের বিরোধিতা করতে হতো। ফলে তা মারাত্মক বিপর্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়াত। অতএব, যে ব্যক্তি মুসলিমদের পরামর্শ ছাড়া কোনো ব্যক্তির হাতে বাইআত করবে, তার অনুসরণ করা যাবে না। আর ওই লোকেরও অনুসরণ করা যাবে না, যে তার অনুসরণ করবে। কেননা, উভয়েরই নিহত হওয়ার আশঙ্কা আছে।
এই হচ্ছে প্রথম বাইআত। আবু বকর রা.-এর হাতে মুহাজির-আনসারদের শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিদের বাইআত। তারপর আরেকবার বাইআত অনুষ্ঠিত হয়, যা মসজিদের মিম্বারে ব্যাপকভাবে সবার জন্য হয়েছিল।
প্রথম বাইআত ছিল নেতৃত্বগ্রহণের বা আমির হওয়ার বাইআত। আর দ্বিতীয়টি আনুগত্যের বাইআত। এখান থেকে প্রমাণিত হয় যে, নেতৃত্ব গ্রহণ বা আমির হওয়ার জন্য গণ্যমান্য ও বড়ো বড়ো ব্যক্তিদের বাইআতই যথেষ্ট। তারাই সবকিছুর সমাধান করবেন, সেখানে সাধারণদের উপস্থিতি শর্ত নয়।
উপরে বলা হয়েছে, প্রথম বাইআতই নেতৃত্বগ্রহণের বাইআত ছিল। এর দলিল হলো, ইবনু আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত একটি হাদিস। তিনি বলেন—‘আল্লাহ তাআলা মুসলিমদের দায়িত্বভার আবু বকর রা. এর কাঁধে দিয়ে দিয়েছেন।’
টিকাঃ
* সহিহ বুখারি: ৬৮৩০
* মুসান্নাফু ইবনি আবি শাইবা : ৩৭০৪৩
📄 উমার ইবনুল খাত্তাব রা. এর নির্বাচন
উমার রা. এর নির্বাচন ছিল অন্য পদ্ধতিতে। যখন আবু বকর রা. এর অসুস্থতা গুরুতর হয়ে গেল, তিনি তখন লোকদেরকে কাছে ডাকলেন। তিনি তাদের উদ্দেশ্যে বললেন—
‘তোমরা তো আমার অবস্থা দেখতেই পাচ্ছো। আমি হয়তো খুব শীঘ্রই এ অসুস্থতার দরুন মৃত্যুবরণ করবো। অতএব, আল্লাহ তাআলা তোমাদের কৃত প্রতিশ্রুতিকে বাইআত মুক্ত করে দিয়েছেন। তোমাদের সাথে আমার করা চুক্তি তুলে দিয়েছেন, তোমাদের দায়িত্বভার তোমাদের কাছেই ফিরিয়ে দিয়েছেন। সুতরাং, তোমাদের যাকে ইচ্ছা তাকে আমির বানাও। আর এটা আমার জীবদ্দশাতেই হওয়া ভালো। তাহলে, আমার পর আর বিরোধিতা সৃষ্টি হবে না।’
তখন সাহাবায়ে কিরাম পরস্পর আলাপ-আলোচনা করলেন। দেখা গেল, প্রত্যেকেই নিজে আমির না হয়ে তার অপর ভাইকে আমির বানাতে চাচ্ছে, যদি তার মাঝে যোগ্যতা দেখা যায়। তাই, তারা শাসনভারের বিষয়টি আবু বকর রা. এর হাতে সোপর্দ করে বললেন—‘হে রাসুলের খলিফা, আমরা আপনার সিদ্ধান্ত চাচ্ছি।’
আবু বকর রা. বললেন— ‘তাহলে আমাকে কিছু সময় দাও, যাতে আল্লাহর জন্য, তাঁর দ্বীনের জন্য এবং তাঁর বান্দাদের জন্য চিন্তা করতে পারি (যে কাকে আমির বানানো যায়)।’
পরে আবু বকর সিদ্দিক আব্দুর রহমান ইবনু আউফকে ডেকে উমার রা. সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করেন। তিনি বলেন— ‘আপনি আমার কাছে যা-ই জানতে চাইবেন, তার সবই তো আমার থেকে বেশ ভালো জানেন।’
আবু বকর রা. বললেন— ‘তবুও!’
তখন আব্দুর রহমান রা. বললেন— ‘আপনি যাদের ভালো মনে করেন, তিনি তো তাদের সবার চাইতে শ্রেষ্ঠ।’
তারপর উসমান ইবন আফফান রা.-কে ডেকে উমার রা. সম্পর্কে জানতে চাইলেন। উসমান রা. বললেন- 'আপনি তো তার সম্পর্কে আমার চাইতেও ভালো জানেন।'
আবু বকর রা. বললেন-'তবুও তুমি তোমার মতটা বলো!'
তখন উসমান রা. বললেন- 'হায় আল্লাহ! আমার জানামতে তার প্রকাশ্য অবস্থা থেকে অপ্রকাশ্য অবস্থা উত্তম। আমাদের সাথে তার কোনো তুলনাই হয় না।'
তখন আবু বকর রা. বললেন- 'আল্লাহ তোমার ওপর রহম করেন! যদি আমি তাকে খলিফা নাও বানাই, তাহলে তোমাকে বশ্যই বানাবো।'
তারপর উসাইদ ইবন হুজাইর রা.-কে ডেকে অনুরূপ কথা বললেন, তখন উসাইদ রা. বললেন- 'হায় আল্লাহ! আমি তো তাকে আপনার পর সবচেয়ে উত্তম ব্যক্তি বলে মনে করি। যেখানে সন্তুষ্ট থাকতে হয়, তিনি সেখানে সন্তুষ্ট হন। যেখানে রুষ্ট হতে হয়, সেখানে তিনি রুষ্ট হোন। তিনি প্রকাশ্যে যা করেন, তার চেয়ে অনেক ভালো করেন অপ্রকাশ্যে। এই খিলাফতের দায়িত্বভার শুধু তিনিই নিতে পারেন।'
এভাবে আবু বকর রা. সাদ ইবনু জায়িদ-সহ অনেক মুহাজির-আনসার সাহাবিদের কাছেই পরামর্শ চাইলেন। তাদের সবাই উমার রা. সম্পর্কে প্রায়ই একই মন্তব্য করলেন, শুধু তালহা ইবনু উবাইদুল্লাহ রা. উমার রা.-এর কঠোরতায় সংকিত হয়ে বললেন-যখন আপনাকে আপনার রব জিজ্ঞাসা করবেন, উমারের কঠোরতা সত্ত্বেও তুমি কেন তাকে খলিফা বানালে, তখন আপনি কী উত্তর দেবেন?
আবু বকর রা. বললেন-আমাকে একটু বসাও। তোমরা কি আমাকে আল্লাহর কথা বলে ভয় দেখাচ্ছ? শাসন-ব্যবস্থায় যেই জুলুম করবে, সে ধ্বংস হয়ে যাবে। আমি বলছি, আর আল্লাহ আপনি সর্বোত্তম ব্যক্তিকে মুসলিমদের আমির বানান। আবু বকর রা. সবার সামনে উমার রা.-এর কঠোরতার কারণ বর্ণনা করে বলেন-আমি খুব নরম ও সরল ছিলাম বলে, সে কঠোর ছিল। অন্যথায় যদি সে নিজেই শাসনভার গ্রহণ করত, তাহলে এখন তোমরা যা অন্য রকম দেখছ, তার সবকিছুই সে ছেড়ে দিত।”
📄 অসিয়তনামা
অতঃপর আবু বকর রা. জনগণের উদ্দেশ্যে একটি অসিয়তনামা লিখলেন, যা নিম্নরূপ-
বিসমিল্লাহির রহমানির রহিম। আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু, দুনিয়ায় শেষ মুহূর্তে, আখিরাতে যাত্রার প্রথম সময়ে আবু বকর ইবনু কুহাফা এই অসিয়তনামা লিখছেন। এটা এমন একটি মুহূর্ত-যখন কাফিরও ঈমান আনতে চায়, ফাসিকও ভালো হয়ে যেতে চায়, মিথ্যুকও সত্য বলতে চায়। আমি এখন তোমাদের জন্য আমার পরবর্তী খলিফা উমার ইবনুল খাত্তাব রা.-কে বানিয়েছি। সুতরাং, তোমরা তার কথা শোনো এবং তাকে মান্য করো। আর আমি আল্লাহর জন্য, তাঁর রাসুলের জন্য, তাঁর দ্বীনের জন্য এবং আমার ও তোমাদের জন্য কল্যাণ ছাড়া আর কোনোটারই ইচ্ছা করি নি। এখন যদি উমার ইনসাফ করে তাহলে তো এটা তার সম্পর্কে আমার সুধারণা ও পূর্বজ্ঞান: কিন্তু যদি ইনসাফের পরিবর্তে অন্য কিছু করে, তাহলে শুনে রাখো-প্রত্যেক ব্যক্তিই নিজের কর্মের ফল পাবে। তবে আমি কল্যাণটাই চেয়েছি, গায়েবের খবর তো আমার জানা নেই। 'জালিমরা অতিসত্বরই জানতে পারবে, কোন স্থানে তারা প্রত্যাবর্তন করবে।'
তিনি যখন এই অসিয়তনামা লিখে সম্পন্ন করলেন, তখন জনগণের সামনে তা পাঠ করে শোনাতে বললেন। এই উদ্দেশ্যে তিনি সবাইকে ডাকলেন আর অসিয়তনামা তার আজাদকৃত গোলামকে দিলেন। তার সাথে উমার রা.-ও ছিলেন। তখন উমার রা. সবাইকে বললেন- 'তোমরা আল্লাহর রাসুলের খলিফার কথা মনোযোগ দিয়ে শোনো এবং মান্য করো। কারণ, তিনি তোমাদের কল্যাণকামিতায় কোনো ত্রুটি করেন না।'
তখন সবাই স্থির হলো। পরে যখন উক্ত অসিয়তনামা জনগণকে পড়ে শোনানো হলো, তখন তারা বিষয়টি মেনে নিল। আবু বকর রা. তখন সামনে এসে বললেন, 'আমি যাকে তোমাদের জন্য খলিফা বানিয়েছি, তোমরা তাকে মেনে নিচ্ছ? দেখো, আমি নিজের কোনো আত্মীয়কে তোমাদের খলিফা বানাই নি; বরং, উমারের মতো ব্যক্তিকে খলিফা বানিয়েছি। সুতরাং, তোমরা তার কথা শোনো এবং মান্য করো। কারণ, আমি তোমাদের কল্যাণ সাধনে প্রাণপণ চেষ্টা করেছি।'
তখন সবাই বলল- 'আমরা শুনলাম ও মানলাম।'
তারপর আবু বকর রা. উমার রা.-কে উপস্থিত করে বললেন- 'দেখো, আমি তোমাকে আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাহাবায়ে কিরামের আমির বানালাম!' তিনি তাকে তাকওয়ার অসিয়ত করলেন। তারপর বললেন- 'দেখো, উমার, আল্লাহ তাআলার কিছু হক আছে রাতের, যা তিনি দিনে কবুল করেন না। আবার কিছু হক আছে দিনের, যা রাতে আদায় করলে কবুল করেন না। তদ্রূপ ফরজ আদায়ের আগ পর্যন্ত কোনো নফল ইবাদাতও কবুল করেন না। তুমি তো জানো, কিয়ামতের দিন যাদের নেক আমলনামার পাল্লা ভারী হবে, তা শুধু হককে অনুসরণ করার কারণেই ভারী হবে। সেদিন যে আমলনামায় হক থাকবে, সে আমলনামা ভারী হওয়া অপরিহার্য। তুমি এটাও জানো, যাদের আমলনামার পাল্লা হালকা হবে, তা শুধু বাতিলকে অনুসরণ করার কারণেই হালকা হবে। তুমি কি জানো না যে, কুরআন কঠোরতার সাথে নমনীয়তার কথাও বলেছে। আবার নমনীয়তার সাথে কঠোরতার কথাও বলেছে, যাতে মুমিন ভয় ও আশার মাঝে থাকে। এমন যেন না হয় যে, আল্লাহ তাআলার কাছে এত আশা রাখে, যার যোগ্যতা তার নেই। আবার এত ভয়ও যেন না পায় যে, সে তার ভয়ের মাঝেই মারা যাবে।
দেখো উমার, তুমি তো জানো, আল্লাহ তাআলা জাহান্নামিদের কথা আলোচনা করেছেন, তাদের বদ আমলগুলো উল্লেখ করেছেন। তাদের কথা মনে পড়লে ভয় হয়। না-জানি আমিও তাদের একজন হয়ে যাই। আবার, জান্নাতবাসীর কথা আলোচনা করেছেন, তাদের উত্তম আমলগুলো উল্লেখ করেছেন। কারণ, তাদের গুনাহগুলো তিনি মাফ করে দিয়েছেন। তাদের আলোচনা যখন স্মরণে আসে, তখন ভাবতে থাকি, তাদের আমল কোথায় আর কোথায় আমার আমল?
এখন তুমি যদি আমার অসিয়ত রক্ষা করো, তাহলে আশা করছি তুমি তাদের মধ্যে হবে না, যাদের উপস্থিতির চেয়ে মৃত্যুই পছন্দ করে সবাই।
পরে উসমান রা. আবু বকর রা. এর মৃত্যুর আগেই উমার রা. এর জন্য জনগণ থেকে বাইআত নিয়ে নেন, যাতে বিষয়টি সুদৃঢ় হয়ে যায় এবং কোনো প্রকার জোর-জবরদস্তি ছাড়াই এর ফায়সালা হয়ে যায়।
টিকাঃ
>> মাউসুআতস সিয়ার, খণ্ড: ৪
** সূরা শুআরা, আয়াত: ২২৭; ইবনে কাসীর ও কুরতুবী তাফসীর, মদিনা
📄 উসমান ইবনু আফফান রা. এর নির্বাচন
উমার ফারুক রা. যখন মৃত্যুশয্যায় খলিফা নির্বাচন করতে চাইলেন, তখন বললেন— দেখো, যদি আমি খলিফা নির্বাচন না করি, আদতে তাতে কোনো আপত্তি নেই। কারণ, আমার থেকে উত্তম ব্যক্তি আবু বকর রা. খলিফা নির্বাচন ছাড়াই রেখে চলে গেছেন। এছাড়া আমার থেকে আরও শতগুণ উত্তম ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামও নির্বাচন না করেই বিদায় নিয়েছেন। তবে এখন, আমি মনে করি, এই ছয়জনের মাঝে খিলাফত সীমাবদ্ধ, যাদের প্রতি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সন্তুষ্ট থেকে মৃত্যুবরণ করেছেন..
সহিহ মুসলিমের এক বর্ণনায় আছে, আবদুল্লাহ ইবন উমার রা. বলেন—যখন তিনি (উমার) রাসুল্লাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কথা বললেন, তখনই আমি বুঝতে পারলাম যে, তিনি নির্দিষ্ট করে কাউকে নির্বাচন করবেন না।
আমর ইবনু মাইমুন রা.-এর এক দীর্ঘ হাদিসে এসেছে, উমার ইবনুল খাত্তাবকে সাহাবায়ে কিরাম অনুরোধ করলেন—আমিরুল মুমিনিন, পরবর্তী খলিফা নির্বাচনের বিষয়ে অসিয়ত করেন!
তখন তিনি বললেন—এই ছয়জনের চেয়ে আর কাউকে এ শাসনভারের উপযুক্ত দেখি না, যাদের ওপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সন্তুষ্ট হয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন। (অতঃপর তিনি সেই ছয়জনের নাম বললেন) তারা হলেন—(১) আলি, (২) উসমান, (৩) জুবাইর, (৪) তালহা, (৫) সাদ, এবং (৬) আব্দুর রহমান। সাথে এও বললেন—পক্ষান্তরে আবদুল্লাহ ইবনু উমার রা. মজলিসে উপস্থিত থাকবে, সে শাসনভার গ্রহণ করতে পারবে না। তিনি তাকে সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য এ কথা বলেছেন।
এখানে উমার রা. ভিন্ন পন্থা অবলম্বন করেছেন, যা কালোপযোগী ছিল। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মৃত্যুর সময় সবাই আবু বকর রা. এর শ্রেষ্ঠত্ব ও অগ্রবর্তিতায় একমুখ ছিলেন। তাই, বিরোধিতা সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা খুব কমই ছিল। বিশেষ করে যেহেতু নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কথাবার্তায় উম্মাহকে এই ইঙ্গিত দিয়ে গিয়েছেন যে—তাঁর পরে খলিফা হওয়ার সর্বাধিক উপযুক্ত আবু বকর রা.।
এদিকে আবু বকর রা. যখন উমার রা.-কে খলিফা মনোনীত করেছেন, তখন তিনি জানতেন, সাহাবায়ে কিরাম সবাই একমত যে, শাসনভার গ্রহণের ক্ষেত্রে তিনিই সবচেয়ে উপযুক্ত ও শ্রেষ্ঠ। তাই, তিনি বড়ো বড়ো সাহাবায়ে কিরামের পরামর্শক্রমে তাকে খলিফা বানান। কেউ এর বিরোধিতাও করে নি। এভাবে উমার রা.-এর ব্যাপারে ইজমা সাব্যস্ত হয়।
পক্ষান্তরে, উমার রা. সম্পূর্ণ ভিন্ন পন্থা অবলম্বন করলেন। অর্থাৎ শাসন-ব্যবস্থার বিষয়টিকে নির্দিষ্ট কয়েকজন সাহাবির মাঝে সীমাবদ্ধ করে দিলেন। যারা সবাই শাসনভারের উপযুক্ত। একই সাথে তিনি নির্বাচন-পদ্ধতিও নির্দিষ্টভাবে বলে দিয়েছেন যে—তারা সবাই একত্রে এক ঘরে পরামর্শ করবেন, তাদের সাথে আবদুল্লাহ ইবনু উমার শুধু পরামর্শক হিসেবে উপস্থিত থাকতে পারবে। এর বাইরে সেস আর কিছুই করতে পারবে না। আর এই পুরো বিষয়টা শেষ করার জন্য তিনদিনের সময় সীমাবদ্ধ করে দিলেন। তিনি আরও বলেন—চতুর্থ দিন যেন তোমাদের একজন আমির অবশ্যই থাকে। এর কারণ সম্ভবত এমন যে, তিন দিনের বেশি হলে বিরোধিতা সৃষ্টি হয়ে যেতে পারে।
টিকাঃ
* আল কামিল ফিত তারিখ, খণ্ড: ২, পৃষ্ঠা: ২৬৭
* মাউসুআতুস সিয়ার, খণ্ড: ২, পৃষ্ঠা: ২৬৮
১০০ মুসনাদু বায্যার, ১৫৩
১০১ মুসলিম, ৪৬০৪
১০২ বুখারি, ৩৯০০
১০০ মাউসুআতুস সিয়ার, খণ্ড : ৫ পৃষ্ঠা : ৫৪