📘 ইসলামি রাষ্ট্র ব্যবস্থা > 📄 নির্বাচনের গুরুত্ব

📄 নির্বাচনের গুরুত্ব


রাষ্ট্রপ্রধান নির্বাচনের বিষয়টি সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, শরিয়তের বহু ফরজ বিষয় রাষ্ট্রপ্রতি নির্বাচনের ওপর নির্ভরশীল। আর মূলনীতি হলো-ফরজ বা ওয়াজিব যার ওপর নির্ভরশীল, সেটা ওয়াজিব। সুতরাং, রাষ্ট্রপ্রধান নির্বাচন করাও ওয়াজিব। এ কারণেই 'আকায়াদে নাসাফিয়্যারে' বলা হয়েছে- মুসলিমদের জন্য এমন একজন খলিফা থাকা আবশ্যক, যিনি—

০১. মুসলিমদের বিধিবিধান কার্যকর করবেন;
০২. হদ কায়েম করবেন;
০৩. সীমান্ত পাহারা দেবেন;
০৪. সেনাবাহিনী প্রস্তুত করবেন;
০৫. জাকাত উসুল করবেন;
০৬. চোর, ডাকাত ও শত্রুদের দমন করবেন;
০৭. জুমুআ ও ঈদের নামাজের ব্যবস্থা করবেন;
০৮. বিভিন্ন ক্ষেত্রে সাক্ষীদের সাক্ষ্য গ্রহণ করবেন;
০৯. ছোটো এবং ইয়াতিমদের বিবাহ করাবেন;
১০. গনিমত বণ্টন করবেন।

এজন্যই সাহাবায়ে কিরাম খলিফা নির্বাচনের বিষয়টি সাইয়িদুল আম্বিয়া মুহাম্মাদ মুস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দাফনের পূর্বে সম্পন্ন করেছিলেন। তাই যদি কারও মধ্যে খলিফা বা রাষ্ট্রপ্রধান হওয়ার সমস্ত যোগ্যতা পরিপূর্ণভাবে থাকে, তাহলে সে শরিয়ত-বিবেচিত রাষ্ট্রপ্রধান হতে পারবে না, যতক্ষণ না তার নির্বাচন শরয়ি পদ্ধতিতে হয়।

📘 ইসলামি রাষ্ট্র ব্যবস্থা > 📄 খলিফা নির্বাচনের পদ্ধতি

📄 খলিফা নির্বাচনের পদ্ধতি


উপরে খুলাফায়ে রাশিদার নির্বাচন পদ্ধতির আলোচনা থেকে জানা যায়, নির্বাচনের মোট তিনটি পদ্ধতি রয়েছে, যার প্রত্যেকটি খুলাফায়ে রাশিদার কর্ম দ্বারা প্রমাণিত এবং এর ওপর সাহাবায়ে কিরামের ইজমাও প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তবে উলামায়ে কিরাম খলিফা নির্বাচনের চতুর্থ আরেকটি পদ্ধতি উল্লেখ করেছেন, যাকে তাগাল্লুব বা জোর-জবরদস্তির পদ্ধতি বলা হয়। এটা মূলত প্রয়োজন বা মাজবুরের পদ্ধতি। আমি এখন সংক্ষিপ্তভাবে এই চারটি পদ্ধতি উল্লেখ করছি। বিস্তারিত বিবরণ বড়ো বড়ো কিতাবে আছে। অতএব, প্রয়োজন হলে সেখান থেকে দেখে নেওয়া যাবে-

১ম পদ্ধতি-বাইআতগ্রহণ : আল্লামা ইবনু খালদুন বলেন-বাইআত মানে আনুগত্যের ওপর চুক্তি করা। বাইআত গ্রহণকারী যেন তার আমিরের সাথে এই মর্মে চুক্তিবদ্ধ হচ্ছে যে-সে তার আমিরকে নিজের বিষয়ে এবং মুসলিমদের বিষয়ে চিন্তা করার ক্ষমতা সোপর্দ করবে। আমিরের সাথে কোনো বিষয়ে মতবিরোধ করবে না; বরং তাকে যা আদেশ করবে, তা পালন করবে, পছন্দ হোক বা অপছন্দ।

সাহাবিগণ যখন আমিরের হাতে বাইআত গ্রহণ এবং চুক্তিবদ্ধ হতেন, তখন চুক্তিকে সুদৃঢ় করার জন্য নিজেদের হাত আমিরের হাতে রাখতেন। এখন যেন এক প্রকার ক্রেতা-বিক্রেতার মতো হয়ে গেল। এজন্যই বাইআত বলে নামকরণ করা হয়েছে (যা আরবি ক্রয়-বিক্রয় ক্রিয়াপদ 'বাই' থেকে নির্গত)। মূলত, হাতে হাত রাখাকে বাইআত বলে। এটাই আভিধানিক ও শরয়ি অর্থ। হাদিসে এই উদ্দেশ্যেই সব জায়গায় বাইআত শব্দটি এসেছে। যেমন-লাইলাতুল আকাবার বাইআত/আকাবার বাইআত, গাছের নিচে বাইআত। এখান থেকেই বলা হয়-খুলাফায়ে রাশিদার বাইআত।

📘 ইসলামি রাষ্ট্র ব্যবস্থা > 📄 বাইআতের প্রকার

📄 বাইআতের প্রকার


বাইআতের বিষয়বস্তুর ওপর ভিত্তি করে মূলত বাইআতের প্রকার নির্ণয় করা হয়। যেমন-

০১. ইসলামের ওপর বাইআত : এটা হচ্ছে বাইআতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রকার, যা কাফির হওয়ার মাধ্যমে ভেঙে যায়। আর অন্যান্য বাইআত অবাধ্যতা বা কবিরা গুনাহের মাধ্যমে ভাঙে। জারির ইবনু আবদিল্লাহর রা.-এর হাদিসে এই বাইআতের কথাই বলা হয়েছে। তিনি বলেন-

بايعت رسول الله صلى الله عليه وسلم على شهادة أن لا إله إلا الله، وأن محمدا رسول الله، وإقام الصلاة، وإيتاء الزكاة، والسمع والطاعة والنصح لكل مسلم

আমি রাসুল্লাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাতে এই মর্মে বাইআত গ্রহণ করেছি যে- 'আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আল্লাহ ছাড়া সত্য কোনো ইলাহ নেই, মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসুল এবং (আমি এই মর্মেও সাক্ষ্য দিচ্ছি যে,) আমি নামাজ কায়েম করব, প্রত্যেক মুসলিম ভাইয়ের কল্যাণ কামনা করব।'

০২. সাহায্য করার ওপর বাইআত : যেমন বাইআতে আকাবায় হয়েছিল। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন-

وأبا يعكم على أن تمنعوني مما تمنعون منه نسائكم وأبنائكم

'আমি তোমাদের বাইআত করছি এই মর্মে যে, তোমরা আমাকে ওই সকল অপছন্দনীয় বিষয় থেকে রক্ষা করবে, যার থেকে তোমরা নিজেদের স্ত্রী ও সন্তানদের রক্ষা করো।'

তখন যারা বিন মারুর রা. নবীজির হাত ধরে বললেন-“ঠিক আছে। ওই মহান সত্তার কসম! যিনি আপনাকে সত্য ধর্ম দিয়ে পাঠিয়েছেন। আমরা অতি অবশ্যই আপনাকে রক্ষা করবো ওই সব অপছন্দনীয় বিষয় থেকে, যার থেকে আমরা (নিজেদের) রক্ষা করি। তখন আমরা আল্লাহর রাসুলের হাতে বাইআত গ্রহণ করলাম।

০৩. জিহাদের ওপর বাইআত: যেমনটা হুদাইবিয়ার বাইআতের সময় হয়েছিল।

০৪. হিজরতের ওপর বাইআত : যেমন মুজাশি রা. এর হাদিসে এসেছে। তিনি বলেন, আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে আমার ভাইকে নিয়ে মক্কা বিজয়ের পর এসে বললাম- 'হে আল্লাহর রাসুল, আমি আমার ভাইকে আপনার কাছে নিয়ে এসেছি, যাতে আপনি তাকে হিজরতের ওপর বাইআত করেন।'

নবীজি বললেন-'মুহাজিররা তো (মক্কা থেকে) হিজরতের সাওয়ার নিয়ে গেছে।'

আমি বললাম-তাহলে কীসের ওপর বাইআত করবেন?

তিনি বললেন-'আমি তাকে বাইআত করবো ইসলাম, ইমামত ও জিহাদের ওপর।'

০৫. আনুগত্যের ওপর বাইআত : যেমন উবাদা রা.-এর হাদিসে এসেছে। তিনি বলেন-আমরা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাতে বাইআত গ্রহণ করেছি কথা শোনা ও মানার ওপর। অসচ্ছল ও সচ্ছল অবস্থায়, সুখে ও দুঃখে এবং আমাদের ওপর অন্যদের প্রাধান্য দেওয়ার ওপর। আর এই মর্মে যে, আমরা শাসকের বিরোধিতা করব না এবং যেখানেই থাকি সত্য কথা বলব, আল্লাহর ব্যাপারে কোনো নিন্দুকের নিন্দার ভয় করব না।”

০৬. অন্যকে প্রাধান্য দেওয়ার ওপর বাইআত: যেমন পূর্বের হাদিসে বর্ণিত হয়েছে।

০৭. হক কথা বলার ওপর বাইআত: যেমন পূর্বের হাদিসে বর্ণিত হয়েছে।

০৮. প্রত্যেক মুসলিম ভাইয়ের কল্যাণ কামনার ওপর বাইআত: যেমন জারির রা. এর হাদিসে এসেছে।

০৯. আনুগত্যের ওপর বাইআত: এটাও জারির রা. এর হাদিসে উল্লেখ আছে। আর এটাই সুফিদের বাইআত।

খলিফা নির্বাচিত হওয়ার বাইআত তখনই বিবেচ্য হবে, যখন সেটা গণ্যমান্য ব্যক্তিদের থেকে পাওয়া যাবে। তারা হলো মুসলিমদের উলামায়ে কিরাম ও জ্ঞানী ব্যক্তিবর্গ, যারা খুব সহজেই কোনোরূপ কষ্ট ছাড়াই বাইআতের সময় একত্র হতে পারবেন। তাদের কী কী গুণ থাকতে হবে, তা সামনে আলোচিত হবে। মূলত এটাই ইসলামের নির্ধারিত পন্থা, যা সালাফদের থেকে চলে আসছে। এই মূলনীতির আলোকেই আবু বকর রা. এর নির্বাচন সমাপ্ত হয়েছে।

ইমাম মাওয়ারদি রহ. বলেন— যখন গণ্যমান্য ব্যক্তি একত্র হবেন, তখন তারা নিজেদের মধ্য থেকে নেতৃত্বের উপযোগী ব্যক্তিদের মাঝে নেতৃত্বের শর্ত ও গুণাবলি যাচাই করবেন। তারপর তাদের মধ্য থেকে সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ ব্যক্তি তথা গুণাবলিতে পূর্ণাঙ্গ ব্যক্তিকে পেশ করবেন, লোকজন যার আনুগত্য তাৎক্ষণিকভাবে গ্রহণ করবে। বাইআতের জন্য এমন ব্যক্তিকে পেশ করতে বিলম্ব করবে না। এভাবে যখন গণ্যমান্য ব্যক্তিদের ইজতিহাদ ও চিন্তাভাবনার মাধ্যমে কেউ নির্দিষ্ট হবে, তখন তার সামনে নেতৃত্ব পেশ করা হবে। তিনি যদি মেনে নেন, তাহলে তারা তার হাতে বাইআত গ্রহণ করবে। আর তাদের বাইআতের মাধ্যমেই তিনি খলিফা হয়ে যাবেন। সুতরাং, এখন সাধারণ মানুষদের জন্য অপরিহার্য তার হাতে বাইআত গ্রহণ করা এবং তার আদেশের সামনে মাথা নত করা; কিন্তু তিনি যদি নেতৃত্ব গ্রহণে অস্বীকৃতি জানান, সেটা থেকে বিরত থাকেন; তাহলে তাকে বাধ্য করা হবে না। কারণ, বাইআত সন্তুষ্ট চিত্তে ও স্বেচ্ছায় চুক্তি করার নাম। এখানে, কোনো বাধ্যবাধকতা বা জোর-জবরদস্তি নেই। এখন, তিনি ছাড়া অন্য যে হকদার আছেন, এই হক তার দিকে ফিরে যাবে।

২য় পদ্ধতি-পূর্ববর্তী খলিফার অসিয়ত: এটা দুই প্রকার—

এক. অসিয়তনামা একজনের জন্য হবে। যেমনটি আবু বকর রা. উমার রা.-এর নামে অসিয়ত লিখে গিয়েছেন। (যেটি কিছুদূর আগে একবার উল্লেখ করা হয়েছে। পেছনে গিয়ে আবার দেখা যেতে পারে।)

ইমাম বাগাভি রহ. বলেন- খলিফা মৃত্যুর আগে যদি একজন যোগ্য ব্যক্তিকে শাসনভার অর্পণ করেন, তাহলে তার বিরোধিতা করা বৈধ নয়। যেমন আবু বকর রা. তার পরে উমার রা.-কে খলিফা বানিয়েছেন।”

দুই. পূর্ববর্তী খলিফা শাসন-ব্যবস্থাকে একটি নির্দিষ্ট জামাআতের মাঝে শূরা বা পরামর্শভিত্তিক করে দেবেন, যাতে তারা নিজেদের মধ্য থেকে একজন নতুন খলিফা নির্বাচন করতে পারে। যেমনটি উমার রা. করেছেন।

উমার রা. খিলাফত-ব্যবস্থাকে ছয়জনের পরামর্শের ওপর ভিত্তি করে গিয়েছেন। এরপর তারা নিজেরা মিলে উসমান রা.-কে নির্বাচন করেছেন। যেমনটি আমর ইবনু মাইমুন রা.-এর দীর্ঘ হাদিসে এসেছে। তার একাংশ এমন- 'হে আমিরুল মুমিনিন! আমাদের আপনার পরবর্তী খলিফার অসিয়ত করে যান।' উমার রা. বললেন, 'আমি তো ছয়জনের এই দল বা জামাআতের চেয়ে কাউকে শাসন-ব্যবস্থার উপযুক্ত মনে করি না, যাদের প্রতি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সন্তুষ্ট থাকা অবস্থায় দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়েছেন।'

এরপর তিনি : ১। আলি ইবনু আবি তালিব, ২। উসমান ইবনু আফফান, ৩। জুবাইর, ৪। তালহা, ৫। সাদ, ৬। আব্দুর রহমান। এই ছয়জনের নাম উল্লেখ করেন। (এই অংশেরও কিছুটা বিস্তারিত বর্ণনা পেছনে গেছে।)

আহকামে সুলতানিয়া গ্রন্থে মাওয়ারদি রহ. লিখেছেন: ইমাম নিযুক্ত হওয়া, এটার বৈধতাও ইজমা দ্বারা সাব্যস্ত, মুসলিমদের নির্দ্বিধায় দুটো কাজ করার কারণে-

০১. একটি হলো, আবু বকর রা. যখন উমার রা.-কে খলিফা হওয়ার নির্দেশ দেন, তখন মুসলিম উম্মাহ তার নেতৃত্ব মেনে নেয়।

০২. দ্বিতীয়টি হলো, উমার রা. যখন শাসন-ব্যবস্থাকে শুরা ভিত্তিক করে গেলেন, তখন তারা সবাই পরামর্শ সভা করতে রাজি হয়ে গেলেন।

মূলত, তখন এই অসিয়তনামাই পরবর্তী খলিফা হওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল। অসিয়তনামায় থাকা নাম/নামগুলোর মাধ্যমে এখানে না থাকা অন্যান্য সাহাবায়ে কিরাম এই শুরা থেকে বের হয়ে গেলেন। (যেমন উমারের পর ঘটিছল।)

আব্বাস রা. যখন শুরার মজলিসে যাওয়ার কারণে আলি রা.-কে নিন্দা করলেন, তখন আলি রা. বলেন-'দেখেন, বিষয়টি ছিল মুসলিম উম্মাহর জন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ, তাই উক্ত মজলিসে অংশগ্রহণ না করাটা কল্যাণকর মনে হয় নি।' আর এর মাধ্যেমে এভাবে অসিয়তনামাও খলিফা মনোয়নের ক্ষেত্রে ইজমা হয়ে গেল।

সুতরাং, কোনো খলিফা যদি পরবর্তী খলিফার ব্যাপারে নির্দেশ দিতে চান, তাহলে তার কর্তব্য খুব ভালো করে চিন্তা করা যে-কে হতে পারে সবচেয়ে হকদার? কার মাঝে সবচেয়ে বেশি বৈশিষ্ট্য আছে?

এই দুই প্রকার মূলত খলিফা নির্বাচনের দুটো আলাদা পদ্ধতি। এখন তাহলে মোট পদ্ধতি হলো তিনটি।

তৃতীয় পদ্ধতি- জোর-জবরদস্তি

এটা মূলত প্রভাব বিস্তার করার মাধ্যমে সুলতান হওয়ার একটি মজবুরি পদ্ধতি। অর্থাৎ, কোনো জালিম সাধারণ মানুষের ওপর অন্যায়-অত্যাচার করা শুরু করে এবং মানুষ তার আনুগত্য স্বীকার করার আগ পর্যন্ত এভাবেই শাসনকার্য চালিয়ে যায়। আর এভাবে একসময় তার নেতৃত্ব সাব্যস্ত হয়। জনগণের ওপর তার আনুগত্য আবশ্যক হয়ে যায়।

এরকম ঘটনা ঘটেছিল আব্দুল মালিক ইবনু মারওয়ানের সময়। কোনো এক মাধ্যমে একবার যখন তিনি জুবাইর রা. এর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেন, তখন ঘটনাক্রমে আবদুল্লাহ ইবনু জুবাইরের ওপর জোর-জবরদস্তি করে তিনি প্রাধান্য বিস্তার করেন। আর এই সময় কেউ সাগ্রহে, আর কেউ বাধ্য হয়ে তার হাতে বাইআত গ্রহণ করে। এভাবেই তার শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়।

আদদুররুল মুখতারে আছে, প্রয়োজনের কারণে অর্থাৎ ফিতনা রোধ করার জন্য প্রভাব বিস্তারকারীর শাসন বৈধ হবে। তদ্রুপ আনাস ইবনু মালিক রা.-এর হাদিসও এর প্রমাণ বহন করে। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন-

اسمعوا وأطيعوا وإن استعمل عليكم عبد حبشي كأن رأسه زبيبة

'তোমরা (শাসকের কথা) শোনো এবং মান্য করো, যদিও তোমাদের ওপর হাবশি গোলাম নিযুক্ত করা হয়, যার মাথা কিশমিশের মতো (কালো এবং স্থল)।'

ইমাম আহমাদ রহ.-এর সূত্রে আবু ইয়ালা বলেন- 'যখন কেউ তরবারির শক্তিবলে জোর-জবরদস্তি করে মুসলিমদের ওপর প্রাধান্য বিস্তার করে খলিফা হয়, আর তাকে আমিরুল মুমিনিনও বলা হয়; তাহলে আল্লাহর প্রতি এবং কিয়ামত দিবসের প্রতি বিশ্বাসী কারও জন্য এই বৈধতা নেই যে-সে তার ওপর হামলা করবে, তাকে ইমাম হিসাবে মেনে নেবে না; চাই সে সুলতান নেককার হোক বা ফাজির (পাপাচারী)।'

ইবন হাজার রহ. বলেন- 'ফুকাহায়ে কিরাম একমত পোষণ করেছেন যে, প্রভাব বিস্তারকারী শাসকের আনুগত্য এবং তার সাথে জিহাদ করা ওয়াজিব। আর তার ওপর বিদ্রোহ করার চেয়ে আনুগত্যই অধিক কল্যাণকর। কারণ, এতে রক্তারক্তিও বন্ধ থাকবে, পরিবেশও শান্ত থাকবে।'

এই তিন পদ্ধতির কোনো এক পদ্ধতিতে যখন খলিফা মনোনীত হবে, তখন তার আনুগত্য থেকে বের হওয়াকে বিদ্রোহ ও অভ্যুত্থান বলা হবে। 'বিদ্রোহ করার' বিস্তারিত বিবরণ ও হুকুম ফিকাহের কিতাবে উল্লিখিত আছে। এই সংক্ষিপ্ত পরিসরে তার বিস্তারিত আলোচনা উপস্থাপন করা সম্ভব নয়।

টিকাঃ
১০০ মুকাদ্দামাতু ইবনু খালদুন, ২০৯
১০৬ সহিহ বুখারি ২১৫৭
১০০ মুসনাদু আহমাদ, ১৫৭৯৮
১০৮ সহিহ বুখারি, ৪৩০৫
১১০ সূত্র: আল-আহকামুস সুলতানিয়া
১১২ আহকামে সুলতানিয়া, ৩০
১১০ সহিহ বুখারি, ৭১৪২
১১৪ আহকামে সুলতানিয়া, ২০
১১৫ ফাতহুল বারি, খণ্ড: ৭, পৃষ্ঠা

📘 ইসলামি রাষ্ট্র ব্যবস্থা > 📄 বর্তমান গণতান্ত্রিক নির্বাচন পদ্ধতি

📄 বর্তমান গণতান্ত্রিক নির্বাচন পদ্ধতি


বর্তমানে যেসব নির্বাচন পদ্ধতি (গণতন্ত্র বা অন্যান্য) আছে, তার কোনোটারই শরয়ি ভিত্তি নেই। একসময় মুসলিম উম্মাহর সাথেও এর কোনো সম্পর্ক ছিল না। এগুলোতে যদি কল্যাণই থাকত, তাহলে সাহাবায়ে কিরাম তা বর্জন করতেন না। এটা আসলে কাফিরদের রচিত জাহিলি যুগের ষড়যন্ত্রের একটি অংশ। সুতরাং, এই পদ্ধতি অনুযায়ী আমল করা মুসলিমদের জন্য শোভনীয় নয়।

এগুলোর মাঝে অনেক অপ্রীতিকর, অবৈধ ও ক্ষতিকর জিনিস আছে। যেমন-

০১. পরস্পরের মাঝে বিরোধিতা সৃষ্টি করে। গোত্র, দল ও ভাষাভিত্তিক সাম্প্রদায়িকতা সৃষ্টি করে। এর মাধ্যমে সাম্প্রদায়িকতার দিকে আহ্বান করা হয়, যাকে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জাহিলি ও দুর্গন্ধযুক্ত বলেছেন। জাবির ইবনু আবদুল্লাহ রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন-আমরা গাজায় ছিলাম, (বর্ণনাকারী সুফইয়ান আরেক আরেকবার 'গাজা' বলার জায়গা 'জাইশ' বলেছেন,) তখন মুহাজিরদের একজন এক আনসারি সাহাবির নিতম্বে আঘাত করেন। তখন আনসারি সাহাবি স্বগোত্রের লোকদের সাহায্যের জন্য তাদের ডেকে বললেন-হে আনসার ভাইয়েরা!

এদিকে মুহাজির সাহাবিও-'হে মুহাজির ভাইগণ' বলে ডাক দিয়ে তাদের সাহায্য চাইলেন।

তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সেই আওয়াজ শুনে বললেন,
ما " কি সমস্যা? জাহিলি যুগের স্লোগান দিচ্ছ কেন?' بال دعوى الجاهلية

উপস্থিত লোকেরা বলল-'হে আল্লাহর রাসুল, এক মুহাজির অপর আনসারের নিতম্বে আঘাত করেছে।'

তখন তিনি বললেন-'এই দুর্গন্ধযুক্ত আওয়াজ পরিহার করো।'

তাছাড়া এই ধরনের পারস্পরিক বিরোধিতার কারণে মুসলিম উম্মাহ দুর্বল হয়ে যাবে, ইসলামের শত্রুদের মোকাবিলার শক্তি ফুরিয়ে যাবে। তাছাড়া আল্লাহ তাআলা বিরোধিতা থেকে নিষেধও করেছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন-

وَاعْتَصِمُوا بِحَبْلِ اللَّهِ جَمِيعًا وَلَا تَفَرَّقُوا

'তোমরা সম্মিলিতভাবে আল্লাহর রজ্জুকে আঁকড়ে ধরো, বিরোধিতা করো না।'

আল্লাহ তাআলা আরও বলেন-

وَلَا تَنَازَعُوا فَتَفْشَلُوا وَتَذْهَبَ رِيحُكُمْ

তোমরা পরস্পর বিরোধিতা করো না। তাহলে তোমরা ব্যর্থ হবে, তোমাদের প্রতাপ চলে যাবে।

০২. বর্তমানে নির্বাচনের মূল ভিত্তিই হচ্ছে জ্ঞানী ও মূর্খের চিন্তা, আলিম ও ফাসিকের রায়, পুরুষ ও নারীর বিবেচনা এক সমান। মুমিন ও কাফিরের সিদ্ধান্তও এক পর্যায়ের। অর্থাৎ নির্বাচনের ক্ষেত্রে সবাই সমান। অথচ এই পদ্ধতি ইসলামি শিক্ষা ও জীবন-ব্যবস্থার সম্পূর্ণ বিপরীত। আল্লাহ তাআলা বলেন-

قُلْ هَلْ يَسْتَوِي الَّذِينَ يَعْلَمُونَ وَالَّذِينَ لَا يَعْلَمُونَ

আপনি বলেন-যারা জানে আর যারা জানে না, তারা কি সমান হতে পারে?

আল্লাহ তাআলা আরও বলেন-

قُلْ هَلْ يَسْتَوِي الْأَعْمَى وَالْبَصِيرُ

বলেন-অন্ধ ও চক্ষুমান কি সমান হতে পারে?

০৩. ব্যক্তিগত ও রাষ্ট্রীয় সম্পদ কোনো শরয়ি বা কল্যাণকর খাতে ব্যয় না করে প্রচুর পরিমাণে অপচয় করা হয়, যেমনটি প্রায় সব দেশেই দেখা যায়। অথচ আল্লাহ তাআলা বলেছেন-

إِنَّ الْمُبَذِّرِينَ كَانُوا إِخْوَانَ الشَّيَاطِينِ وَكَانَ الشَّيْطَانُ لِرَبِّهِ كَفُورًا

আর তুমি অপচয় করো না। কারণ, নিঃসন্দেহে অপচয়কারী শয়তানের ভাই। আর শয়তান তো তার রবের প্রতি অকৃতজ্ঞ।

কাতাদা রহ. থেকে বর্ণিত, তাফসিরে তাবারিতে আছে- 'অপচয় করো না'-এটা দ্বারা উদ্দেশ্য-গুনাহের কাজে, বাতিল খাত ও ফ্যাসাদ সৃষ্টির ক্ষেত্রে খরচ করা। অর্থাৎ, যারা নিজেদের সম্পদ আল্লাহ তাআলার অবাধ্যতার ক্ষেত্রে ও অকল্যাণকর খাতে ব্যয় করে, তারাই শয়তানের ভাই তথা দোসর। যে অন্য কারও কাজকর্ম অনুসরণ করে, আরবরা তাকে অনুসৃত ব্যক্তির ভাই বলে। আর যেহেতু শয়তানকে সেগুলোর প্রতি অকৃতজ্ঞ, শোকর আদায় করে না। বরং, অকৃতজ্ঞা প্রকাশ করে। আল্লাহ তাআলার আনুগত্য না করে, তাঁর অবাধ্যতার লিপ্ত থেকে, তেমনি আদম- সন্তানদের মধ্যে যারা শয়তানের দোসর, গুনাহের ক্ষেত্রে অপচয় করে, তারাও তাদের প্রতি আল্লাহর নিয়ামতের শুকরিয়া আদায় করে না, তাঁর বিরোধিতা ও অবাধ্যতা করে। বরং, আল্লাহ তাআলা তাদের যে সকল ধন-সম্পদ দান করে অনুগ্রহ করেছেন, সেগুলোর ক্ষেত্রেও তারা শয়তানের অনুসরণ করে। অর্থাৎ, তারা আল্লাহর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ না করে অকৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে।

০৪. যারা নির্বাচনে দাঁড়ায়, তারা জনগণকে বিভিন্ন মিথ্যা ইশতিহার দিয়ে নিজেদের ভোট দেওয়ার আহ্বান করে। প্রকৃতপক্ষে এটা আগ বাড়িয়ে নেতৃত্ব চাওয়ারই নামান্তর, যা ইসলামে নিষিদ্ধ। আব্দুর রহমান ইবনু সামুরা রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন-

يا عبد الرحمن بن سمرة لا تسأل الإمارة فإنك إن أوتيتها عن مسألة وكلت اليها وإن أوتيتها من غير مسألة أعنت عليها ...

‘হে আব্দুর রহমান ইবনু সামুরা, তুমি কখনো নিজ থেকে নেতৃত্ব চেয়ো না। কারণ, যদি তোমাকে নেতৃত্ব দেওয়া হয় তোমার চাওয়ার কারণে, তাহলে তোমাকে সে কাজের দিকে ন্যস্ত করে দেওয়া হবে। আর যদি চাওয়া ছাড়াই দেওয়া হয়, তাহলে সে বিষয়ে তোমাকে সাহায্য করা হবে।'

সুতরাং, কোনো মর্যাদাবান বা মহৎ মানুষের জন্য এটা সমীচীন নয় যে, তারা এ সকল গণতান্ত্রিক কোনো মুমিনের কাজ নির্বাচনে ভোট দেবে। কারণ, ভোট দেওয়ার অর্থই হলো তাদের সাহায্য করা। এই নির্বাচনের উদ্দেশ্যই হলো, জনগণকে মানবরচিত আইন-কানুনের অভিমুখী করা। অথচ আমরা তো মানবের রব রচিত আইন-কানুনের অভিমুখী হতে চাই। আল্লাহ তাআলা বলেন-

أَفَحُكْمَ الْجَاهِلِيَّةِ يَبْغُونَ وَمَنْ أَحْسَنُ مِنَ اللَّهِ حُكْمًا لِقَوْمٍ يُوْقِنُونَ

তারা কি জাহিলি যুগের বিধি-বিধান চায়? দৃঢ় বিশ্বাসী সম্প্রদায়ের জন্য বিধান প্রদানে আল্লাহ হতে কে বেশি শ্রেষ্ঠ?

ইবনু কাসির রহ. বলেন- ‘এই আয়াতে আল্লাহ তাআলা তাদের নিন্দা করছেন, যারা আল্লাহর কল্যাণময়, অনিষ্ট-মুক্ত বিধিবিধান ছেড়ে ওই সকল প্রবৃত্তি-রচিত মতাদর্শের দিকে ছোটে, যা কোনো শরয়ি প্রমাণ ছাড়াই মানুষ বানিয়েছে। যেমন- জাহিলি যুগে লোকেরা তাদের পূর্বপুরুষদের রেখে যাওয়া ভ্রষ্টতা ও মূর্খতাপূর্ণ মনগড়া বিধিবিধান অনুযায়ী ফায়সালা করত। একইভাবে তাতারিরা যেমন তাদের প্রধান জাহাঙ্গির খান রচিত ইয়সিক বা ইয়াসা প্রধান নামের মতাদর্শে রাষ্ট্র পরিচালনা করত। ইয়াসিক বা ইয়াসনা আইন-কানুনের সমষ্টির নাম, যা জাহাঙ্গির বিভিন্ন ধর্ম তথা ইহুদি, খ্রিস্টান এবং ইসলাম ও অন্যান্য ধর্ম থেকে লাভ করেছে। তবে বেশ কিছু আইন আছে, যা তার নিজের প্রবৃত্তি ও মনগড়া। পরবর্তী সময়ে তার বংশের কাছে এটাই ধর্মরূপ লাভ করেছে, যাকে তারা কিতাব-সুন্নাহর ওপর প্রাধান্য দিত। সুতরাং, যে ব্যক্তি এরূপ করবে সে কাফির, তার সাথে লড়াই করা ওয়াজিব-যতক্ষণ না সে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের বিধানের দিকে ফিরে আসে। অতএব, আল্লাহ ছাড়া কারও কোনো বিধান প্রণয়নের অধিকার নেই-সামান্য হোক বা বেশি।

আল্লাহ তাআলা বলেন-তারা কি আল্লাহ তাআলার হুকুমের পরিবর্তে জাহিলিয়াতের বিধিবিধিন চায়? অর্থাৎ, 'যারা আল্লাহ তাআলার শরিয়ত ভালো করে অনুধাবন করে, তাঁর প্রতি ঈমান ও বিশ্বাস রাখে এবং মানে যে, আল্লাহ তাআলাই সমস্ত বিচারকদের বিচারক, সৃষ্টজীবের প্রতি তার মা-বাবার চাইতেও। যারা এটা বিশ্বাস করে, তাদের জন্য আল্লাহ তাআলার চাইতে বিধিবিধানের ক্ষেত্রে কে অধিক ইনসাফকারী?

০৫. এ সকল নির্বাচনে অনেক শরিয়তবিরোধী অবৈধ জিনিস পাওয়া যায়। যেমন- জনগণকে ধোঁকা দেওয়া। তাদেরকে ঘুষ দেওয়ার প্ররোচনা দেওয়া, প্রতারণা করা; যাতে তারা জনগণের ভোট পায়। কারণ, এটা নির্বাচনের ক্ষেত্রে বেশ প্রভাব সৃষ্টি করে।

আমার যা বলার ছিল, তা তো আমি বললাম, বাকি আল্লাহ তাআলাই ভালো জানেন।

ইসলামে 'নির্দিষ্ট সময়ের জন্য শাসক' এমন শাসন-ব্যব ব্যবস্থা কখনোই ছিল না; না খুলাফায়ে রাশিদার যুগে, আর না উমাইয়া-আব্বাসিদের যুগে। বরং সবাই 'সব সময়ের' জন্য শাসক হিসাবে থাকতেন-মৃত্যু পর্যন্ত, কিংবা অন্য কেউ জোরপূর্বক ক্ষমতা নেওয়ার আগ পর্যন্ত, অথবা নিজেই পদ থেকে সরে আসার আগ পর্যন্ত। নির্দিষ্ট সময়ের দাবি করেছেন না কোনো সাহাবি, না কোনো তাবিয়ি, আর না কোনো তাবি-তাবিয়ি; বরং তারা আনুগত্যের ওপর বাইআত গ্রহণ করেছেন, যতদিন পর্যন্ত খলিফা আল্লাহ তাআলার হুকুম কার্যকর রাখেন। কিন্তু শেষ যুগে এসে নির্দিষ্ট শাসন-ব্যবস্থার দাবি উঠল-সিদ্ধান্ত মোতাবেক ৫ বছরের কম বা বেশি। এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, এটা একটি বিদআত। পশ্চিমা চিন্তায় প্রভাবিত ব্যক্তিরাই শুধু এর স্লোগান দিতে পারে।

তাছাড়া এর কারণে জনগণের সম্পদ, বাইতুল মালের সম্পদ অপচয় করা হয়; কোনো নেক খাতে ব্যয় করা হয় না। এছাড়াও এর কারণে সাধারণ ও বিশিষ্টজনদের পরস্পরের মাঝে বিরোধিতা ও সাম্প্রদায়িকতা সৃষ্টি হয়, যেমনটি প্রায় সব দেশেই দেখা যায়। এর কারণে বহিরাগত শত্রুকেও একেবারে ঘরের কোণায় নিয়ে আসা হয়। এখন কিছু সমসাময়িক বুদ্ধিজীবী শাসন-ব্যবস্থা নির্দিষ্টকাল পর্যন্ত করার দাবি তুলছেন। দলিল হিসাবে তারা বলছেন—খিলাফত, এটা একটি ওকালাতের চুক্তি, অর্থাৎ নির্বাচন করা নির্বাচনকারীর পক্ষ থেকে পদপ্রার্থীকে উকিল বানানো, যাতে পদপ্রার্থী ভোটারদের পক্ষ থেকে নায়েব বা উকিল হয়ে যায় নেতৃত্বের পরিচালনার ক্ষেত্রে। আর জানা বিষয় যে—উকালতি চুক্তি নির্দিষ্ট সময়ের সাথে যুক্ত করার ক্ষেত্রে শরিয়তের পক্ষ থেকে কোনো বাধা নেই।

আমাদের জবাব: খিলাফত মানে যদি উকালতের চুক্তি হতো, তাহলে ভোটার বা নির্বাচনকারীর এই সুযোগ থাকত যে, সে চাইলে পদপ্রার্থীকে শাসক হওয়ার পর বরখাস্ত করে দিতে পারে। কারণ, শাসক তো তার উকিল বা নায়েব। কেননা, ওকালাতের ক্ষেত্রে মক্কেলের এই অধিকার আছে যে, সে চাইলেই উকিলকে বরখাস্ত করে দিতে পারে। অথচ খিলাফতের ক্ষেত্রে তো এমনটা নেই। কারণ, মুসনাদু আহমাদে আবদুল্লাহ ইবনু আমর থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন—

مَنْ مَاتَ وَلَيْسَتْ عَلَيْهِ طَاعَةٌ مَاتَ مَيْتَةً جَاهِلِيَّةً فَإِنْ خَلَعَهَا مِنْ بَعْدِهِعَقْدِهَا فِي عُنُقِهِ لَقِيَ اللَّهَ تَبَارَكَ وَتَعَالَى وَلَيْسَتْ لَهُ حُجَّةٌ

যে ব্যক্তি বাইআত গ্রহণ না করা অবস্থায় মৃত্যুবরণ করল, তার মৃত্যু জাহিলিয়াতের মৃত্যুর মতো। আর যদি বাইআত গ্রহণের পর তা খুলে ফেলে, তাহলে সে আল্লাহ তাবারকা ওয়া তাআলার মুখোমুখি হবে এ অবস্থায় যে, তার সাথে কোনো প্রমাণ নেই।

আরেকটি হাদিস আছে আবদুল্লাহ বিন উমার রা. এর। তিনি বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি—

مَنْ خَلَعَ يَدًا مِنْ طَاعَةٍ لَقِيَ اللَّهَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَلَا حُجَّةَ لَهُ، وَمَنْ مَاتَ وَلَيْسَ فِي عُنُقِهِ بَيْعَةٌ مَاتَ مِيتَةً جَاهِلِيَّةً، رَوَاهُ مُسْلِمٌ

যে ব্যক্তি বাইআত থেকে হাত সরিয়ে ফেলে, সে কিয়ামতের দিন কোনো প্রমাণ ছাড়া আল্লাহ তাআলার মুখোমুখি হবে। আর যে মৃত্যুবরণ করবে এ অবস্থায় যে, তার গলায় (জিম্মায়) কোনো বাইআত নেই, তাহলে তার মৃত্যু জাহিলিয়াতের মৃত্যুর মতো হলো。

বাইআত থেকে হাত সরিয়ে ফেলা বা খুলে ফেলার অর্থ বাইআত ভঙ্গ করা। বাইআত ভঙ্গ করাকে সরিয়ে ফেলা বলা হয় এ কারণে যে, বাইআত গ্রহণকারী বাইআতকারীর হাতে হাত রাখে। যেহেতু হাত রাখাকে বাইআত গ্রহণ করা বলা হয়, তাই বাইআত ভঙ্গ করাকে বলা হয় হাত সরিয়ে ফেলা। তবে আমি বলি, এখানে তিনটি বিষয় আছে-

এক. জ্ঞানী-গুণীদের মজলিসে খলিফা নির্বাচন করা। এটা মূলত পদপ্রার্থীকে ভোটারদের পক্ষ থেকে যাচাই করার এবং নেতৃত্বের ক্ষেত্রে তার যোগ্যতার বিষয়ে সাক্ষ্য দেওয়ার মতো।

দুই. তার হাতে জ্ঞানী-গুণীদের বাইআত গ্রহণ, যাকে তারা নেতৃত্বের জন্য নির্দিষ্ট করেছে এবং তার যোগ্যতার বিষয়ে সাক্ষ্য দিয়েছে। এটা তাদের মাঝে এবং নতুন খলিফার মাঝে চুক্তি এই মর্মে যে-তারা ইমামের কথা শোনা ও মানাকে আবশ্যক করে নেবে, যদি সেটা নাফরমানি না হয়। একই সাথে খলিফাও আবশ্যক করে নেবে তাদের হক আদায় করার এবং তাদের দ্বীনের হেফাজত করার। এই চুক্তির মাধ্যমেই তিনি খলিফা হবেন, তাই এই বাইআতকে (বাইআতুল ইনয়িকাদ) নেতৃত্ব সংগঠিত হওয়ার বাইআত বলে।

তিন. জ্ঞানী-গুণীদের বাইআত শেষ হওয়ার পর আনুগত্যের বিষয়ে সাধারণ জনগণের বাইআত। এই বাইআতকে আনুগত্যের বাইআত বলা হয়।

শাসন-ব্যবস্থা সুনির্দিষ্টকাল পর্যন্ত হওয়ার বিষয়ে তাদের আরেকটি দলিল হলো- শরিয়তে এমন কোনো স্পষ্ট দলিল নেই, যা শাসন-ব্যবস্থা সুনির্দিষ্টকাল পর্যন্ত হওয়াকে নিষেধ করে।

আমরা বলি-অনির্দিষ্টভাবে খুলাফায়ে রাশিদার এবং পরবর্তী ন্যায়নিষ্ঠ শাসকদের শাসন করাটাই এক্ষেত্রে আদর্শের মাপকাঠি। কারণ, আমাদেরকে খুলাফায়ে রাশিদার সুন্নাহর অনুসরণ করতে আদেশ করা হয়েছে। যেমন: ইরবাজা ইবনু সারিয়া রা.-এর দীর্ঘ হাদিসে আছে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন-

وَسَتَرَوْنَ مِنْ بَعْدِي اخْتِلافًا شَدِيدًا؛ فعليكم بسنتي وسنة الخلفاء الراشدين المهديين، عَضُّوا عليها بالنواجذ وإياكم والأمور المُحْدَثَاتِ؛ فإن كل بدعة ضلالة.

আমার পরে তোমরা অনেক মতবিরোধ দেখতে পাবে। তখন তোমরা আমার সুন্নাহ এবং হিদায়াতপ্রাপ্ত খুলাফায়ে রাশিদিনের সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরো। তোমরা সেই সুন্নাহকে দাঁত দিয়ে কামড়ে ধরো। তোমরা প্রত্যেক নবউদ্ভাবিত বিষয় সম্পর্কে সতর্ক থেকো। কারণ, প্রত্যেক নবউদ্ভাবিত বিষয়ই বিদআত, আর বিদআতের পরিণام ভ্রষ্টতা。

আর এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, খুলাফায়ে রাশিদার একটি সুন্নাহ হলো অনির্দিষ্টকাল পর্যন্ত শাসন-ব্যবস্থা। তাছাড়া নির্দিষ্টকালের মাঝে বিভিন্ন ক্ষতি তো আছেই।

ফায়দা : ইমাম শাফিয়ি রাহিমাহুল্লাহ একবার মাসজিদুল হারামে বসে ছিলেন। তিনি বললেন—তোমরা আমাকে যা-ই জিজ্ঞাসা করবে, আমি কুরআনে কারিম থেকে এর উত্তর দেব।

তখন এক ব্যক্তি বলল, মুহরিম যদি কোনো ভিমরুলকে মেরে ফেলে, তাহলে এর হুকুম কী?

তিনি উত্তরে বললেন—মুহরিমের ওপর কোনো কিছুই আবশ্যক হবে না।

লোকটি এবার প্রশ্ন করল—এটা কুরআনের কোথায় আছে?

তিনি বললেন—আল্লাহ তাআলা বলেছেন— ‘আর রাসুল তোমাদের যা দেবে, সেটাই তোমরা গ্রহণ করো।’ তারপর তিনি সনদ উল্লেখ করে বললেন যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন—উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু পর্যন্ত সনদ উল্লেখ করার পর বলেন—উমার রা. বলেছেন—মুহরিম ভিমরুলকে হত্যা করতে পারে।

টিকাঃ
১২৭ সহিহ বুখারি, ৪৯০৫
১২৮ সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ১০৩
১২৯ সূরা আনফাল, আয়াত: ৪৬
১০০ সূরা যুমার, আয়াত: ৯
১০১ সূরা আনআম, আয়াত: ৫০
১০২ সূরা ইসরা, আয়াত: ২৬-২৭
১০০ সহিহ বুখারি, ৬৬২২
১০৪ সূরা মায়িদা, আয়াত: ৫০
১৯ তাফসীরে ইবনে
১০০ সহিহ মুসলিম, ১৮৫১

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00