📘 ইসলামি রাষ্ট্র ব্যবস্থা > 📄 রাষ্ট্রপ্রধান কাকে বলে?

📄 রাষ্ট্রপ্রধান কাকে বলে?


রাষ্ট্রপ্রধান বা ইমামতে কুবরা বলা হয় ব্যাপক নেতৃত্বকে; যার লক্ষ্য দ্বীন প্রতিষ্ঠা করা। আর তা হতে পারে সামনে লিখিত বিষয়াবলি দ্বারা-

* ০১। দ্বীনি ইলমের শাখা-প্রশাখা প্রাণবন্ত রাখা;
* ০২। ইসলামের রুকনসমূহকে সমুজ্জ্বল রাখা;
* ০৩। জিহাদ কায়েম করা;
* ০৪। বাহিনীকে সুবিন্যস্ত রাখা;
* ০৫। মুজাহিদদের খরচ দেওয়া;
* ০৬। তাদেরকে 'ফাই' (যুদ্ধলব্ধ সম্পদ) দেওয়া;
* ০৭। আদালতের ব্যবস্থা করা;
* ০৮। হদ কায়েম করা;
* ০৯। জুলুম-নির্যাতন দূর (বন্ধ) করা;
* ১০। সৎ কাজের আদেশ এবং অসৎ কাজ হতে নিষেধ করা।

আর এগুলো যখন করা হবে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পক্ষ থেকে নায়েব হয়ে, তখনই সেটা হবে ইমামতে কুবরা।

আল্লামা তাফতাজানি রহ. ইমামতে কুবরার পরিচয় দিয়েছেন এভাবে- 'ইমামতে কুবরা হচ্ছে, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের খলিফা হয়ে দ্বীনি ও দুনিয়াবি উভয় বিষয়াদিতে ব্যাপকভাবে ক্ষমতা অর্জন।

📘 ইসলামি রাষ্ট্র ব্যবস্থা > 📄 নির্বাচনের গুরুত্ব

📄 নির্বাচনের গুরুত্ব


রাষ্ট্রপ্রধান নির্বাচনের বিষয়টি সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, শরিয়তের বহু ফরজ বিষয় রাষ্ট্রপ্রতি নির্বাচনের ওপর নির্ভরশীল। আর মূলনীতি হলো-ফরজ বা ওয়াজিব যার ওপর নির্ভরশীল, সেটা ওয়াজিব। সুতরাং, রাষ্ট্রপ্রধান নির্বাচন করাও ওয়াজিব। এ কারণেই 'আকায়াদে নাসাফিয়্যারে' বলা হয়েছে- মুসলিমদের জন্য এমন একজন খলিফা থাকা আবশ্যক, যিনি—

০১. মুসলিমদের বিধিবিধান কার্যকর করবেন;
০২. হদ কায়েম করবেন;
০৩. সীমান্ত পাহারা দেবেন;
০৪. সেনাবাহিনী প্রস্তুত করবেন;
০৫. জাকাত উসুল করবেন;
০৬. চোর, ডাকাত ও শত্রুদের দমন করবেন;
০৭. জুমুআ ও ঈদের নামাজের ব্যবস্থা করবেন;
০৮. বিভিন্ন ক্ষেত্রে সাক্ষীদের সাক্ষ্য গ্রহণ করবেন;
০৯. ছোটো এবং ইয়াতিমদের বিবাহ করাবেন;
১০. গনিমত বণ্টন করবেন।

এজন্যই সাহাবায়ে কিরাম খলিফা নির্বাচনের বিষয়টি সাইয়িদুল আম্বিয়া মুহাম্মাদ মুস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দাফনের পূর্বে সম্পন্ন করেছিলেন। তাই যদি কারও মধ্যে খলিফা বা রাষ্ট্রপ্রধান হওয়ার সমস্ত যোগ্যতা পরিপূর্ণভাবে থাকে, তাহলে সে শরিয়ত-বিবেচিত রাষ্ট্রপ্রধান হতে পারবে না, যতক্ষণ না তার নির্বাচন শরয়ি পদ্ধতিতে হয়।

📘 ইসলামি রাষ্ট্র ব্যবস্থা > 📄 খলিফা নির্বাচনের পদ্ধতি

📄 খলিফা নির্বাচনের পদ্ধতি


উপরে খুলাফায়ে রাশিদার নির্বাচন পদ্ধতির আলোচনা থেকে জানা যায়, নির্বাচনের মোট তিনটি পদ্ধতি রয়েছে, যার প্রত্যেকটি খুলাফায়ে রাশিদার কর্ম দ্বারা প্রমাণিত এবং এর ওপর সাহাবায়ে কিরামের ইজমাও প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তবে উলামায়ে কিরাম খলিফা নির্বাচনের চতুর্থ আরেকটি পদ্ধতি উল্লেখ করেছেন, যাকে তাগাল্লুব বা জোর-জবরদস্তির পদ্ধতি বলা হয়। এটা মূলত প্রয়োজন বা মাজবুরের পদ্ধতি। আমি এখন সংক্ষিপ্তভাবে এই চারটি পদ্ধতি উল্লেখ করছি। বিস্তারিত বিবরণ বড়ো বড়ো কিতাবে আছে। অতএব, প্রয়োজন হলে সেখান থেকে দেখে নেওয়া যাবে-

১ম পদ্ধতি-বাইআতগ্রহণ : আল্লামা ইবনু খালদুন বলেন-বাইআত মানে আনুগত্যের ওপর চুক্তি করা। বাইআত গ্রহণকারী যেন তার আমিরের সাথে এই মর্মে চুক্তিবদ্ধ হচ্ছে যে-সে তার আমিরকে নিজের বিষয়ে এবং মুসলিমদের বিষয়ে চিন্তা করার ক্ষমতা সোপর্দ করবে। আমিরের সাথে কোনো বিষয়ে মতবিরোধ করবে না; বরং তাকে যা আদেশ করবে, তা পালন করবে, পছন্দ হোক বা অপছন্দ।

সাহাবিগণ যখন আমিরের হাতে বাইআত গ্রহণ এবং চুক্তিবদ্ধ হতেন, তখন চুক্তিকে সুদৃঢ় করার জন্য নিজেদের হাত আমিরের হাতে রাখতেন। এখন যেন এক প্রকার ক্রেতা-বিক্রেতার মতো হয়ে গেল। এজন্যই বাইআত বলে নামকরণ করা হয়েছে (যা আরবি ক্রয়-বিক্রয় ক্রিয়াপদ 'বাই' থেকে নির্গত)। মূলত, হাতে হাত রাখাকে বাইআত বলে। এটাই আভিধানিক ও শরয়ি অর্থ। হাদিসে এই উদ্দেশ্যেই সব জায়গায় বাইআত শব্দটি এসেছে। যেমন-লাইলাতুল আকাবার বাইআত/আকাবার বাইআত, গাছের নিচে বাইআত। এখান থেকেই বলা হয়-খুলাফায়ে রাশিদার বাইআত।

📘 ইসলামি রাষ্ট্র ব্যবস্থা > 📄 বাইআতের প্রকার

📄 বাইআতের প্রকার


বাইআতের বিষয়বস্তুর ওপর ভিত্তি করে মূলত বাইআতের প্রকার নির্ণয় করা হয়। যেমন-

০১. ইসলামের ওপর বাইআত : এটা হচ্ছে বাইআতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রকার, যা কাফির হওয়ার মাধ্যমে ভেঙে যায়। আর অন্যান্য বাইআত অবাধ্যতা বা কবিরা গুনাহের মাধ্যমে ভাঙে। জারির ইবনু আবদিল্লাহর রা.-এর হাদিসে এই বাইআতের কথাই বলা হয়েছে। তিনি বলেন-

بايعت رسول الله صلى الله عليه وسلم على شهادة أن لا إله إلا الله، وأن محمدا رسول الله، وإقام الصلاة، وإيتاء الزكاة، والسمع والطاعة والنصح لكل مسلم

আমি রাসুল্লাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাতে এই মর্মে বাইআত গ্রহণ করেছি যে- 'আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আল্লাহ ছাড়া সত্য কোনো ইলাহ নেই, মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসুল এবং (আমি এই মর্মেও সাক্ষ্য দিচ্ছি যে,) আমি নামাজ কায়েম করব, প্রত্যেক মুসলিম ভাইয়ের কল্যাণ কামনা করব।'

০২. সাহায্য করার ওপর বাইআত : যেমন বাইআতে আকাবায় হয়েছিল। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন-

وأبا يعكم على أن تمنعوني مما تمنعون منه نسائكم وأبنائكم

'আমি তোমাদের বাইআত করছি এই মর্মে যে, তোমরা আমাকে ওই সকল অপছন্দনীয় বিষয় থেকে রক্ষা করবে, যার থেকে তোমরা নিজেদের স্ত্রী ও সন্তানদের রক্ষা করো।'

তখন যারা বিন মারুর রা. নবীজির হাত ধরে বললেন-“ঠিক আছে। ওই মহান সত্তার কসম! যিনি আপনাকে সত্য ধর্ম দিয়ে পাঠিয়েছেন। আমরা অতি অবশ্যই আপনাকে রক্ষা করবো ওই সব অপছন্দনীয় বিষয় থেকে, যার থেকে আমরা (নিজেদের) রক্ষা করি। তখন আমরা আল্লাহর রাসুলের হাতে বাইআত গ্রহণ করলাম।

০৩. জিহাদের ওপর বাইআত: যেমনটা হুদাইবিয়ার বাইআতের সময় হয়েছিল।

০৪. হিজরতের ওপর বাইআত : যেমন মুজাশি রা. এর হাদিসে এসেছে। তিনি বলেন, আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে আমার ভাইকে নিয়ে মক্কা বিজয়ের পর এসে বললাম- 'হে আল্লাহর রাসুল, আমি আমার ভাইকে আপনার কাছে নিয়ে এসেছি, যাতে আপনি তাকে হিজরতের ওপর বাইআত করেন।'

নবীজি বললেন-'মুহাজিররা তো (মক্কা থেকে) হিজরতের সাওয়ার নিয়ে গেছে।'

আমি বললাম-তাহলে কীসের ওপর বাইআত করবেন?

তিনি বললেন-'আমি তাকে বাইআত করবো ইসলাম, ইমামত ও জিহাদের ওপর।'

০৫. আনুগত্যের ওপর বাইআত : যেমন উবাদা রা.-এর হাদিসে এসেছে। তিনি বলেন-আমরা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাতে বাইআত গ্রহণ করেছি কথা শোনা ও মানার ওপর। অসচ্ছল ও সচ্ছল অবস্থায়, সুখে ও দুঃখে এবং আমাদের ওপর অন্যদের প্রাধান্য দেওয়ার ওপর। আর এই মর্মে যে, আমরা শাসকের বিরোধিতা করব না এবং যেখানেই থাকি সত্য কথা বলব, আল্লাহর ব্যাপারে কোনো নিন্দুকের নিন্দার ভয় করব না।”

০৬. অন্যকে প্রাধান্য দেওয়ার ওপর বাইআত: যেমন পূর্বের হাদিসে বর্ণিত হয়েছে।

০৭. হক কথা বলার ওপর বাইআত: যেমন পূর্বের হাদিসে বর্ণিত হয়েছে।

০৮. প্রত্যেক মুসলিম ভাইয়ের কল্যাণ কামনার ওপর বাইআত: যেমন জারির রা. এর হাদিসে এসেছে।

০৯. আনুগত্যের ওপর বাইআত: এটাও জারির রা. এর হাদিসে উল্লেখ আছে। আর এটাই সুফিদের বাইআত।

খলিফা নির্বাচিত হওয়ার বাইআত তখনই বিবেচ্য হবে, যখন সেটা গণ্যমান্য ব্যক্তিদের থেকে পাওয়া যাবে। তারা হলো মুসলিমদের উলামায়ে কিরাম ও জ্ঞানী ব্যক্তিবর্গ, যারা খুব সহজেই কোনোরূপ কষ্ট ছাড়াই বাইআতের সময় একত্র হতে পারবেন। তাদের কী কী গুণ থাকতে হবে, তা সামনে আলোচিত হবে। মূলত এটাই ইসলামের নির্ধারিত পন্থা, যা সালাফদের থেকে চলে আসছে। এই মূলনীতির আলোকেই আবু বকর রা. এর নির্বাচন সমাপ্ত হয়েছে।

ইমাম মাওয়ারদি রহ. বলেন— যখন গণ্যমান্য ব্যক্তি একত্র হবেন, তখন তারা নিজেদের মধ্য থেকে নেতৃত্বের উপযোগী ব্যক্তিদের মাঝে নেতৃত্বের শর্ত ও গুণাবলি যাচাই করবেন। তারপর তাদের মধ্য থেকে সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ ব্যক্তি তথা গুণাবলিতে পূর্ণাঙ্গ ব্যক্তিকে পেশ করবেন, লোকজন যার আনুগত্য তাৎক্ষণিকভাবে গ্রহণ করবে। বাইআতের জন্য এমন ব্যক্তিকে পেশ করতে বিলম্ব করবে না। এভাবে যখন গণ্যমান্য ব্যক্তিদের ইজতিহাদ ও চিন্তাভাবনার মাধ্যমে কেউ নির্দিষ্ট হবে, তখন তার সামনে নেতৃত্ব পেশ করা হবে। তিনি যদি মেনে নেন, তাহলে তারা তার হাতে বাইআত গ্রহণ করবে। আর তাদের বাইআতের মাধ্যমেই তিনি খলিফা হয়ে যাবেন। সুতরাং, এখন সাধারণ মানুষদের জন্য অপরিহার্য তার হাতে বাইআত গ্রহণ করা এবং তার আদেশের সামনে মাথা নত করা; কিন্তু তিনি যদি নেতৃত্ব গ্রহণে অস্বীকৃতি জানান, সেটা থেকে বিরত থাকেন; তাহলে তাকে বাধ্য করা হবে না। কারণ, বাইআত সন্তুষ্ট চিত্তে ও স্বেচ্ছায় চুক্তি করার নাম। এখানে, কোনো বাধ্যবাধকতা বা জোর-জবরদস্তি নেই। এখন, তিনি ছাড়া অন্য যে হকদার আছেন, এই হক তার দিকে ফিরে যাবে।

২য় পদ্ধতি-পূর্ববর্তী খলিফার অসিয়ত: এটা দুই প্রকার—

এক. অসিয়তনামা একজনের জন্য হবে। যেমনটি আবু বকর রা. উমার রা.-এর নামে অসিয়ত লিখে গিয়েছেন। (যেটি কিছুদূর আগে একবার উল্লেখ করা হয়েছে। পেছনে গিয়ে আবার দেখা যেতে পারে।)

ইমাম বাগাভি রহ. বলেন- খলিফা মৃত্যুর আগে যদি একজন যোগ্য ব্যক্তিকে শাসনভার অর্পণ করেন, তাহলে তার বিরোধিতা করা বৈধ নয়। যেমন আবু বকর রা. তার পরে উমার রা.-কে খলিফা বানিয়েছেন।”

দুই. পূর্ববর্তী খলিফা শাসন-ব্যবস্থাকে একটি নির্দিষ্ট জামাআতের মাঝে শূরা বা পরামর্শভিত্তিক করে দেবেন, যাতে তারা নিজেদের মধ্য থেকে একজন নতুন খলিফা নির্বাচন করতে পারে। যেমনটি উমার রা. করেছেন।

উমার রা. খিলাফত-ব্যবস্থাকে ছয়জনের পরামর্শের ওপর ভিত্তি করে গিয়েছেন। এরপর তারা নিজেরা মিলে উসমান রা.-কে নির্বাচন করেছেন। যেমনটি আমর ইবনু মাইমুন রা.-এর দীর্ঘ হাদিসে এসেছে। তার একাংশ এমন- 'হে আমিরুল মুমিনিন! আমাদের আপনার পরবর্তী খলিফার অসিয়ত করে যান।' উমার রা. বললেন, 'আমি তো ছয়জনের এই দল বা জামাআতের চেয়ে কাউকে শাসন-ব্যবস্থার উপযুক্ত মনে করি না, যাদের প্রতি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সন্তুষ্ট থাকা অবস্থায় দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়েছেন।'

এরপর তিনি : ১। আলি ইবনু আবি তালিব, ২। উসমান ইবনু আফফান, ৩। জুবাইর, ৪। তালহা, ৫। সাদ, ৬। আব্দুর রহমান। এই ছয়জনের নাম উল্লেখ করেন। (এই অংশেরও কিছুটা বিস্তারিত বর্ণনা পেছনে গেছে।)

আহকামে সুলতানিয়া গ্রন্থে মাওয়ারদি রহ. লিখেছেন: ইমাম নিযুক্ত হওয়া, এটার বৈধতাও ইজমা দ্বারা সাব্যস্ত, মুসলিমদের নির্দ্বিধায় দুটো কাজ করার কারণে-

০১. একটি হলো, আবু বকর রা. যখন উমার রা.-কে খলিফা হওয়ার নির্দেশ দেন, তখন মুসলিম উম্মাহ তার নেতৃত্ব মেনে নেয়।

০২. দ্বিতীয়টি হলো, উমার রা. যখন শাসন-ব্যবস্থাকে শুরা ভিত্তিক করে গেলেন, তখন তারা সবাই পরামর্শ সভা করতে রাজি হয়ে গেলেন।

মূলত, তখন এই অসিয়তনামাই পরবর্তী খলিফা হওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল। অসিয়তনামায় থাকা নাম/নামগুলোর মাধ্যমে এখানে না থাকা অন্যান্য সাহাবায়ে কিরাম এই শুরা থেকে বের হয়ে গেলেন। (যেমন উমারের পর ঘটিছল।)

আব্বাস রা. যখন শুরার মজলিসে যাওয়ার কারণে আলি রা.-কে নিন্দা করলেন, তখন আলি রা. বলেন-'দেখেন, বিষয়টি ছিল মুসলিম উম্মাহর জন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ, তাই উক্ত মজলিসে অংশগ্রহণ না করাটা কল্যাণকর মনে হয় নি।' আর এর মাধ্যেমে এভাবে অসিয়তনামাও খলিফা মনোয়নের ক্ষেত্রে ইজমা হয়ে গেল।

সুতরাং, কোনো খলিফা যদি পরবর্তী খলিফার ব্যাপারে নির্দেশ দিতে চান, তাহলে তার কর্তব্য খুব ভালো করে চিন্তা করা যে-কে হতে পারে সবচেয়ে হকদার? কার মাঝে সবচেয়ে বেশি বৈশিষ্ট্য আছে?

এই দুই প্রকার মূলত খলিফা নির্বাচনের দুটো আলাদা পদ্ধতি। এখন তাহলে মোট পদ্ধতি হলো তিনটি।

তৃতীয় পদ্ধতি- জোর-জবরদস্তি

এটা মূলত প্রভাব বিস্তার করার মাধ্যমে সুলতান হওয়ার একটি মজবুরি পদ্ধতি। অর্থাৎ, কোনো জালিম সাধারণ মানুষের ওপর অন্যায়-অত্যাচার করা শুরু করে এবং মানুষ তার আনুগত্য স্বীকার করার আগ পর্যন্ত এভাবেই শাসনকার্য চালিয়ে যায়। আর এভাবে একসময় তার নেতৃত্ব সাব্যস্ত হয়। জনগণের ওপর তার আনুগত্য আবশ্যক হয়ে যায়।

এরকম ঘটনা ঘটেছিল আব্দুল মালিক ইবনু মারওয়ানের সময়। কোনো এক মাধ্যমে একবার যখন তিনি জুবাইর রা. এর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেন, তখন ঘটনাক্রমে আবদুল্লাহ ইবনু জুবাইরের ওপর জোর-জবরদস্তি করে তিনি প্রাধান্য বিস্তার করেন। আর এই সময় কেউ সাগ্রহে, আর কেউ বাধ্য হয়ে তার হাতে বাইআত গ্রহণ করে। এভাবেই তার শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়।

আদদুররুল মুখতারে আছে, প্রয়োজনের কারণে অর্থাৎ ফিতনা রোধ করার জন্য প্রভাব বিস্তারকারীর শাসন বৈধ হবে। তদ্রুপ আনাস ইবনু মালিক রা.-এর হাদিসও এর প্রমাণ বহন করে। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন-

اسمعوا وأطيعوا وإن استعمل عليكم عبد حبشي كأن رأسه زبيبة

'তোমরা (শাসকের কথা) শোনো এবং মান্য করো, যদিও তোমাদের ওপর হাবশি গোলাম নিযুক্ত করা হয়, যার মাথা কিশমিশের মতো (কালো এবং স্থল)।'

ইমাম আহমাদ রহ.-এর সূত্রে আবু ইয়ালা বলেন- 'যখন কেউ তরবারির শক্তিবলে জোর-জবরদস্তি করে মুসলিমদের ওপর প্রাধান্য বিস্তার করে খলিফা হয়, আর তাকে আমিরুল মুমিনিনও বলা হয়; তাহলে আল্লাহর প্রতি এবং কিয়ামত দিবসের প্রতি বিশ্বাসী কারও জন্য এই বৈধতা নেই যে-সে তার ওপর হামলা করবে, তাকে ইমাম হিসাবে মেনে নেবে না; চাই সে সুলতান নেককার হোক বা ফাজির (পাপাচারী)।'

ইবন হাজার রহ. বলেন- 'ফুকাহায়ে কিরাম একমত পোষণ করেছেন যে, প্রভাব বিস্তারকারী শাসকের আনুগত্য এবং তার সাথে জিহাদ করা ওয়াজিব। আর তার ওপর বিদ্রোহ করার চেয়ে আনুগত্যই অধিক কল্যাণকর। কারণ, এতে রক্তারক্তিও বন্ধ থাকবে, পরিবেশও শান্ত থাকবে।'

এই তিন পদ্ধতির কোনো এক পদ্ধতিতে যখন খলিফা মনোনীত হবে, তখন তার আনুগত্য থেকে বের হওয়াকে বিদ্রোহ ও অভ্যুত্থান বলা হবে। 'বিদ্রোহ করার' বিস্তারিত বিবরণ ও হুকুম ফিকাহের কিতাবে উল্লিখিত আছে। এই সংক্ষিপ্ত পরিসরে তার বিস্তারিত আলোচনা উপস্থাপন করা সম্ভব নয়।

টিকাঃ
১০০ মুকাদ্দামাতু ইবনু খালদুন, ২০৯
১০৬ সহিহ বুখারি ২১৫৭
১০০ মুসনাদু আহমাদ, ১৫৭৯৮
১০৮ সহিহ বুখারি, ৪৩০৫
১১০ সূত্র: আল-আহকামুস সুলতানিয়া
১১২ আহকামে সুলতানিয়া, ৩০
১১০ সহিহ বুখারি, ৭১৪২
১১৪ আহকামে সুলতানিয়া, ২০
১১৫ ফাতহুল বারি, খণ্ড: ৭, পৃষ্ঠা

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00