📄 পতাকার প্রকার
(আরবিতে পতাকা বা ঝান্ডার জন্য দুটি শব্দ ব্যবহৃত হয় (اللواء) ও (والراية), তবে বাংলায় পার্থক্য না থাকলেও আরবিতে কখনো কখনো পার্থক্য করা হয়। যেমন) সুলতানের পতাকাকে বলা হয় (اللواء), আর (والراية) বলা হয় যুদ্ধের কমান্ডারের পতাকাকে। যার অধীনে একদল লোক একসাথে থাকে।
তারহিত তাসরিব ফি শরহিত তাকরিব গ্রন্থে আছে, (والراية) লাম বর্ণে জের-সহ যে অর্থ প্রকাশ করে, তা হলো, এটি এমন চিহ্ন (পতাকা), যা যুদ্ধে ব্যবহার করা হয়, যাতে বাহিনীর গতিপ্রকৃতি লক্ষ্য রাখা যায়। আর এই পার্থক্য সম্ভবত প্রচলন হিসাবে। দেখা যায়, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামেরও দুটো পতাকা ছিল। একটিকে (اللواء) এবং অপরটিকে (والراية) বলা হতো। সুতরাং, মানুষের ব্যবহারিক হিসাবের জন্য একটিকে অন্যটি থেকে পৃথক করা হয়, যদিও আভিধানিকভাবে উভয়টির অর্থই এক।
📄 পতাকার রং
মুসলিমদের যুদ্ধ কমান্ডারের পতাকা হবে সাদা, আর সুলতানের পতাকা হবে কালো। বিভিন্ন হাদিসে এমনই এসেছে। রাশিদ ইবনু সাদ রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ব্যক্তিগত (সাধারণ নেতৃত্বের) পতাকা সাদা ছিল, আর যুদ্ধ কমান্ডের পতাকা কালো ছিল।
যুদ্ধের পতাকা কালো হওয়া উত্তম। কারণ কালো রং যুদ্ধে ব্যবহৃত হয়। প্রত্যেক দল নিজেদের নির্দিষ্ট পতাকাতলে যুদ্ধে করে। পরবর্তী সময়ে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলে তারা সহজেই নিজেদের পতাকাতলে ফিরে আসতে পারে। কারণ, দিনের বেলায় কালো রং বেশি ফুটে থাকে; বিশেষ করে যুদ্ধের ময়দানে বিক্ষিপ্ত ধুলোবালির মাঝে। এ কারণেই কালো হওয়া উত্তম বলা হয়েছে। তবে শরিয়তের বিচারে কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। সাদা, লাল, হলুদ যেমন ইচ্ছা হতে পারে। নেতৃত্বের পতাকার ক্ষেত্রে সাদা রং উত্তম। কারণ, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ও সাল্লাম বলেছেন-
إن أحب الثياب عند الله تعالى البيض يلبسها أحياءكم وكفنوا فيها موتاكم
'আল্লাহ তাআলার নিকট সবচেয়ে পছন্দনীয় কাপড় হলো সাদা কাপড়। সুতরাং, সাদা কাপড় তোমরা জীবিতরা পরো, আর তোমাদের মৃতদেরও কাফন দাও।'
বাহিনীতে সাদা একটাই থাকবে, যেখানে সুলতান থাকেন; যাতে প্রয়োজনের সময় তারা সহজেই সুলতানের কাছে আসতে পারে। এ কারণে এখানে সাদা পতাকা হওয়া ভালো। যাতে সেনাপতিদের কালো পতাকা থেকে সেটাকে সহজেই পৃথক করা যায়। শরিয়তে রঙের ক্ষেত্রে কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। কারণ, একেক হাদিসে এসে রঙের এর কথা এসেছে, যেমন-
০১. সুনানু আবি দাউদে আছে:
رأيت راية رسول الله صلى الله عليه وسلم صفراء
'আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পতাকা হলুদ দেখেছি।'
০২. ইবনু আসিম প্রণীত কিতাবুল জিহাদে রয়েছে: 'আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে বসা ছিলাম। তখ আনসাররা পতাকা বাঁধলেন, আর সেটা ছিল হলুদ।'
০৩. আরেকটি হাদিসে আছে, কারজ ইবনু উসামা বলেছেন-নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বনু সালিমের পতাকা লাল বানিয়েছেন।
০৪. ইবনু জামাআ বলেন-নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পতাকা ধূসর ছিল। তিনি আরও বলেন-রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এক কালো পতাকা ছিল, যা সাদাকালো ডোরাকাটা মসৃণ কাপড়ের চর্তুকোণবিশিষ্ট। সুতরাং, পতাকায় সব ধরনের রঙ দেওয়া যাবে, তবে নেতৃত্ব ও আমিরের ক্ষেত্রে উত্তম সাদা, আর যুদ্ধের ক্ষেত্রে উত্তম কালো।
📄 পতাকার ওপর কী লেখা হবে?
ইবনু আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন-রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের যুদ্ধের পতাকা কালো ছিল, আর সাধারণ নেতৃত্বের পতাকা সাদা ছিল। সেখানে লেখা ছিল: লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ।
মোটকথা, পতাকার রং, ধরন, পরিমাপ, তার ওপর কী লেখা হবে-এগুলো সব যুগের প্রচলন হিসাবে হবে। তবে হাদিসে যেভাবে বর্ণিত আছে, সেভাবেই উত্তম। মুসলিমদের কর্তব্য হলো-তারা ওই সব চিহ্ন পরিহার করবে, যেগুলো কাফিররা ব্যবহার করে।
মোল্লা আলি কারি রহ. তার প্রখ্যাত ব্যাখ্যা গ্রন্থ মিরকাতে ‘যে কোনো জাতির সাদৃশ্য অবলম্বন করে, সে তাদের মধ্য থেকেই গণ্য হবে’– এই হাদিসের ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন-‘যে কাফিরদের সাদৃশ্য অবলম্বন করবে; যেমন: পোশাক-পরিচ্ছদে, কিংবা ফাসিক-ফাজিরদের সাদৃশ্য গ্রহণ করবে, অথবা নেককারদের সাদৃশ্য অবলম্বন করবে; তাহলে সে তাদের মধ্য হতে গণ্য হবে। অর্থাৎ, গুনাহ বা সাওয়াবের ক্ষেত্রে।
আল্লামা কারي রহ. আরও বলেন- ‘এই সাদৃশ্য অবলম্বন ব্যাপক; চাই চারিত্রিকভাবে হোক, কিংবা বৈশিষ্ট্যগতভাবে।
তিনি একটি অদ্ভুত ও আশ্চর্যজনক ঘটনাও উল্লেখ করেছেন-আল্লাহ তাআলা যখন ফিরাউন ও তার গোষ্ঠীকে পানিতে ডুবিয়ে দেন, তখন তার এক দাস ও অনুচরকে ডুবিয়ে দেন নি। সেই দাস চলনে-বলনে ও পরনে মুসা আলাইহিস সালামের অনুকরণ করত তাকে উপহাস করার জন্য। আর ফিরাউন ও তার সভাসদবর্গ তার আচরণ ও চলাফেরা দেখে হাসি-ঠাট্টায় মেতে উঠত! (ওই লোকটির পানিতে না ডোবার কারণে) মুসা আ. আল্লাহ তাআলাকে বললেন-হে আমার রব, এ তো সবচেয়ে বেশি কষ্ট দিত।
আল্লাহ তাআলা তাকে বললেন-আমি তাকে ডুবিয়ে দিই নি। কারণ, সে তোমার মতো পোশাক পরেছিল। আর আল্লাহ তাকে কষ্ট দেন না, যে তাঁর প্রেমাষ্পদের মতো।
লক্ষ্য করেন-খারাপ ইচ্ছা পোষণ করেও যদি কেউ আহলে হকের সাদৃশ্য অবলম্বন করে, বাহ্যত দুনিয়াবি আজাব থেকে মুক্তি পায়; তাহলে যে খাঁটি নিয়তে, সত্যিকার অর্থেই আম্বিয়ায়ে কিরামের অনুসরণ করবে, তার অবস্থা কেমন হবে?
টিকাঃ
*প্রাগুক্ত
**প্রাগুক্ত