📄 নাম বিশ্লেষণ
০১. ‘খলিফা’ শব্দটি ইস্তিখলাফ ধাতু এসেছে। যার অর্থ কাউকে নিজের স্থলবর্তী করা। এ-জন্যই আবু বকর রা.-কে বলা হয় ‘খলিফাতু রাসুলিল্লাহ’। হাদিসে আছে— যদি আমি তাকে খলিফা নিয়োগ করে যাই, তাহলেও কোনো সমস্যা নেই। কারণ, আমার থেকে উত্তম ব্যক্তি খলিফা নিয়োগ করে গেছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন—
يَا دَاوُودُ إِنَّا جَعَلْنَاكَ خَلِيفَةً فِي الْأَرْضِ فَاحْكُم بَيْنَ النَّاسِ بِالْحَقِّ
‘হে দাউদ, আমি তোমাকে জমিনে খলিফা বানিয়েছি। সুতরাং, তুমি মানুষের মাঝে হক অনুযায়ী ফায়সালা করো।’
০২. ‘ইমাম’ মূলত এমন প্রত্যেককে বলা হয়, যাকে কোনো বিষয়ে অনুসরণ করা হয়। এজন্য মসজিদের ইমাম সাহেবকেও ইমাম বলা হয়। তদ্রুপ বিধিবিধানের ইমামকেও ইমাম বলা হয়। যেমন—ইমাম আবু হানিফা, ইমাম মালিক, ইমাম শাফিয়ি, ইমাম আহমাদ। এখানে থেকে শাসককেও ইমাম বলা হয়। এর বহুবচন 'আয়িম্মা'। 'মুতলি' গ্রন্থের লেখক বলেন, ইমাম মানে খলিফা। যেমন, আল্লাহ তাআলা বলেছেন-
وَإِذِ ابْتَلَى إِبْرَهِمَ رَبُّهُ بِكَلِمَةٍ فَأَتَمَّهُنَّ قَالَ إِنِّي جَاعِلُكَ لِلنَّاسِ إِمَامًا
'আর স্মরণ করুন, যখন ইবরাহিমকে তাঁর রব কয়েকটি কথা দ্বারা পরীক্ষা করেছিলেন। অতঃপর তিনি সেগুলো পূর্ণ করেছিলেন। আল্লাহ বললেন, 'নিশ্চয়ই আমি আপনাকে মানুষের ইমাম বানাবো।'
এছাড়া বহু হাদিসে খলিফা অর্থে ইমাম শব্দ এসেছে। যেমন: হাদিসে আছে, ইমাম হচ্ছেঢালস্বরূপ।
ইমামতের প্রকার: ইমামাত দুই প্রকার-
০১. দ্বীনি বিষয়ে ইমামত, এবং
০২. দুনিয়াবি বিষয়ে ইমামত।
০১. দ্বীনি বিষয়ে ইমামত: এটি তো দ্বীনি বিষয়গুলোতেই হয়ে থাকে, যা পরিচালনা করেন আম্বিয়ায়ে কিরাম ও উলামায়ে ইজাম। তারাই ইমামতের সবচেয়ে উঁচু স্থানে আছেন।
০২. দুনিয়াবি বিষয়ে ইমামত: এটি দ্বারা উদ্দেশ্য-জনগণের নেতৃত্ব গ্রহণ ও তাদের দেখাভাল করা ইত্যাদি। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন-
خيار أئمتكم الذين تحبونهم ويحبونكم، وتصلون عليهم ويصلون عليكم وشرار أئمتكم الذين تبغضونهم ويبغضونكم، وتلعنونهم ويلعنونكم
'তারাই সবচেয়ে উত্তম শাসক, যাদেরকে তোমরা ভালোবাসো, আর তারাও তোমাদেরকে ভালোবাসে। তারা তোমাদের জন্য দুআ করে, আর তোমারাও তাদের জন্য দুআ করো। আর সবচেয়ে নিকৃষ্ট শাসক তারা, যাদের তোমরা ঘৃণা করে, আর তারাও তোমাদের ঘৃণা করে। তোমরা তাদের জন্য বদ দুআ করো, তারাও তোমাদের জন্য বদ দুআ করে।'
সবচেয়ে উত্তম হচ্ছে দ্বীনি ও দুনিয়াবি ইমামত; উভয়কে একসাথে সমন্বয় করা। তাহলে তিনি মানুষকে সত্যের পথও দেখাবেন, সেই সাথে শরিয়তের নির্দেশ মোতাবেক মানুষের জীবনও পরিচালনা করবেন।
০৩. আমিরুল মুমিনিন : এটি আমির ও মুমিনিন এই দুই শব্দের যুক্তরূপ। 'আমির' শব্দটি 'ইমারাত' থেকে এসেছে, যার অর্থ 'বড়ো হওয়া'। হাদিসে আছে-
لقد أمر أمر ابن أبي كبشة
ইবনু আবি কাবশার বিষয়টা তো (গুরুতর) হয়ে গেল।
আবু হুরাইরা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছেন-
من اطاعني فقد اطاع الله ومن عصاني فقد عصى الله ومن يطع الأمير فقد أطاعني ومن يعصي الأمير فقد عصاني (متفق عليه)
'যে আমার আনুগত্য করল, সে আল্লাহর আনুগত্য করল। আর যে আমার অবাধ্যতা করল, সে আল্লাহর অবাধ্যতা করল। আর যে আমিরের আনুগত্য করে, সে আমার আনুগত্য করে। আর যে আমিরের অবাধ্যতা করে, সে আমার অবাধ্যতা করে।'
আর 'মুমিনিন' শব্দটি 'মুমিন' শব্দের বহু বচন। সর্বপ্রথম আমিরুল মুমিনিন বলে নামকরণ করা হয় উমার ইবনুল খাত্তাব রা.-কে। ইবনু আবি শাইবা তার তারিখুল মাদিনা গ্রন্থে আব্দুল আজিজ ইবনু ইমরান থেকে (তিনি তার বাবা থেকে, তিনি তার দাদা থেকে) বর্ণনা করেন— 'একদিন উমার রা. সিংহাসনে বসলেন। তিনি বললেন—আমরা কীভাবে বলব, আবু বকর রা. খলিফাতুর রাসুল? এরকম করেই বলব? আর কি কোনো নাম নেই?
উপস্থিত লোকেরা বলল— 'আমির' বলা যায়।
তিনি বললেন—সবাই-ই তো আমির।
তখন মুগিরা ইবনু শু'বা বলেন—আমরা হলাম মুমিনিন। আর আপনি আমাদের আমির। সুতরাং, আপনি হলেন আমিরুল মুমিনিন।
তখন উমার রা. বললেন, ঠিক আছে। তাহলে এখন থেকে 'আমিরুল মুমিনিন'।
ইমাম বুখারি রহ. রচিত আল-আদাবুল মুফরাদে আছে, উমার ইবনু আবদিল আজিজ রহ. একবার আবু বকর ইবনু সুলাইমান ইবনি হাসমাকে জিজ্ঞাসা করলেন—আবু বকর রা. পত্র লেখার সময় কেন লিখতেন 'আল্লাহর রাসুলের খলিফা আবু বকরের পক্ষ থেকে।' অতঃপর উমার রা. (প্রথম দিকে) লিখতেন 'আবু বকর রা.-এর খলিফা উমার ইবনুল খাত্তাবের পক্ষ থেকে।' আচ্ছা, সর্বপ্রথম 'আমিরুল মুমিনিন' কে লিখেছেন?
তখন আবু বকর ইবনু সুলাইমান বলেন— আমাকে আমার দাদি শিখিয়েছেন, তিনি অগ্রবর্তী মুহাজিরদের জামাআতে শামিল ছিলেন। উমার রা. যখন বাজারে যেতেন, তখন আমার দাদির ঘরে আসতেন। তিনি বলেন— একবার উমার রা. ইরাকের গভর্নরের কাছে পত্র পাঠিয়ে বললেন—তুমি দুজন শক্তিশালী অভিজাত ব্যক্তিকে আমার কাছে পাঠাও, যাতে করে আমি তাদের ইরাক ও ইরাকের অধিবাসীর অবস্থা জিজ্ঞাসা করতে পারি।
তখন সেই গভর্নর লাবিদ ইবন রবিআ ও আদি ইব্ন হাতিমকে পাঠালেন। পরে তারা দুজন মদিনায় আগমন করেন এবং মসজিদে নববীর প্রাঙ্গনে উট বেঁে মসজিদে প্রবেশ করেন! তারা আমর ইবন আসকে দেখতে পেয়ে বললেন-তুমি 'আমিরুল মুমিনিন' উমারের কাছে আমাদের জন্য অনুমতি চাও। তিনি তাদের দুজনকে তার কাছে পাঠালেন। তারা উমার রা.-এর সামনে গিয়ে এভাবে সালাম দিল : আসসালামু আলাইকুম, ইয়া আমিরাল মুমিনিন।
তাদের এভাবে সালাম দেওয়ার কারণে উমার রা. জিজ্ঞেস করলেন, কে প্রথম শুরু করেছে এটা, আমর ইবনুল আস, তুমি তাদের অবশ্যই বের করবে। এরপর লাবিদ উবনু রবিআ এবং আদি ইবনু হাতিম এগিয়ে এলেন। তারাও বললেন, আমিরুল মুমিনিনের কাছে আমাদের আসার অনুমতি দেন।
তখন আমি তাদের দুজনকে বললাম-তোমরা ঠিকই বলেছ। তিনি আমাদের আমির, আর আমরা মুমিন। তাই, তিনি হলেন আমিরুল মুমিনিন। তখন থেকেই এভাবে পত্র লেখা শুরু হয়।
০৪. মালিক : (রাজা) এ নামটি জাহিলি যুগ এবং ইসলামি যুগের প্রথম নাম মুলক থেকে নির্গত। আল্লাহ তাআলা বলেন-
تُؤْتِي الْمُلْكَ مَن تَشَاء وَتَنزِعُ الْمُلْكَ مِمَّن تَشَاء
'আপনি যাকে ইচ্ছা করেন, তাকে (মুলক) রাজত্ব দান করেন। আবার যার থেকে ইচ্ছা রাজত্ব নিয়ে নেন।'
সুলাইমান আ. এর কথা বলতে গিয়ে আল্লাহ তাআলা বলেন-
وَهَبْ لِي مُلْكًا لَّا يَنبَغِي لِأَحَدٍ مِّنْ بَعْدِي
'আর আমাকে এমন রাজত্ব দান করুন, যা আমার পর আর কারও জন্য অর্জিত হবে না।'
আল্লাহ তাআলা আরও বলেন-
تَبَارَكَ الَّذِي بِيَدِهِ الْمُلْكُ
বরকতময় ওই মহান সত্তা, যার হাতে রয়েছে রাজত্ব।'
'মালিক' শব্দের বহুবচন 'মূলক'। আল্লাহ তাআলা বলেন-
إِنَّ الْمُلُوكَ إِذَا دَخَلُوا قَرْيَةً
'রাজারা যখন জনপদে প্রবেশ করে।'
আল্লাহ তাআলা আরও বলেন-
وَإِذْ قَالَ مُوسَى لِقَوْمِهِ يَا قَوْمِ اذْكُرُوا نِعْمَةَ اللَّهِ عَلَيْكُمْ إِذْ جَعَلَ فِيكُمْ أَنبِيَاء وَجَعَلَكُم مُّلُوكًا وَآتَاكُم مَّا لَمْ يُؤْتِ أَحَدًا مِّنَ الْعَالَمِينَ
'আর ওই সময়কে স্মরণ করো, যখন মুসা তাঁর সম্প্রদায়কে বললেন, হে কওম, তোমরা তোমাদের ওপর আল্লাহর নিয়ামতকে স্মরণ করো, যখন তিনি তোমাদের মাঝ থেকে নবীদের সৃষ্টি করেছেন এবং তোমাদেরকে রাজত্বের অধিপতি বানিয়েছেন। আর তোমাদেরকে এমন সব নিয়ামত দান করেছেন, যা বিশ্ববাসীর মধ্য হতে (তোমাদের পূর্বে) আর কাউকে দেননি।'
'মূলক' শব্দের অর্থ নেতৃত্ব ও ক্ষমতা। কেউ কেউ বলেন, 'মালিক' শব্দটি 'মিলক' থেকে এসেছে, যার অর্থ মালিক হওয়া।
০৫. রাইস: এসেছে রিয়াসাত থেকে। বলা হয় 'রায়িসুল কউম', মানে কোনো সম্প্রদায়ের ব্যবস্থাপক ও নীতিনির্ধারক। সুতরাং, এই শব্দটি ব্যাপক। ইমামকেও বলা যেতে পারে, আবার অন্যকেও। আবদুল্লাহ ইবনু আমর ইবনু আস রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি-
إن الله لا يقبض العلم انتزاعًا ينتزعه من العباد، ولكن يقبض العلم بقبض العلماء حتى إذا لم يبق عالمًا اتَّخذ الناس رؤوسا جهالاً، فسئلوا فأفتوا بغير علم؛ فضلوا وأضلوا)): متفق عليه.
'আল্লাহ তাআলা বান্দাদের অন্তর থেকে ইলম মুছে দিয়ে তুলে নেবেন না। বরং, আলিমদের তুলে নেওয়ার মাধ্যমে ইলম তুলে নেবেন। এভাবে যখন কোনো আলিমকে অবশিষ্ট থাকবে না, তখন মানুষ জাহিলদের রাইস বা প্রধান বানাবে। তাদের কাছে কিছু জানতে চাইলে তারা না-জেনে ফতোয়া দেবে। এভাবে নিজেরাও ভ্রষ্ট হবে, অন্যদেরও ভ্রষ্ট করে ছাড়বে।'
০৬. সুলতান: কুরআনে কারিমে আছে-
إِنَّهُ لَيْسَ لَهُ سُلْطَنٌ عَلَى الَّذِينَ آمَنُوا وَعَلَى رَبِّهِمْ يَتَوَكَّلُونَ
‘নিঃসন্দেহে, তার কোনো ক্ষমতা নেই ওই ব্যক্তিদের ওপর, যারা ঈমান আনে আর তাদের প্রতিপালকের ওপর ভরসা করে।’
ইমাম জাওহারি বলেন—সুলতান অর্থ শাসক। আর মুসতাওইব গ্রন্থের লেখক বলেন—সুলতান মানে ইমাম। সুলতান শব্দটি সালতানাত থেকে নির্গত, যার অর্থ রাজত্ব। কেউ কেউ বলেন—এর অর্থ ক্ষমতা ও বিজয়। এ অর্থেই আল্লাহ তাআলা বলেন—
إِنَّهُ لَيْسَ لَهُ سُلْطَانٌ عَلَى الَّذِينَ آمَنُوا وَعَلَىٰ رَبِّهِمْ يَتَوَكَّلُونَ
‘নিঃসন্দেহে, তার কোনো ক্ষমতা নেই ওই ব্যক্তিদের ওপর, যারা ঈমান আনে আর তাদের প্রতিপালকের ওপর ভরসা করে।
إِنَّمَا سُلْطَانُهُ عَلَى الَّذِينَ يَتَوَلَّوْنَهُ وَالَّذِينَ هُم بِهِ مُشْرِكُونَ
তার ক্ষমতা তো শুধু তাদের ওপর, যারা তাকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করে, আর আল্লাহর সাথে শরিক করে।’
০৭. হাকিম : এই শব্দটি ‘হুকুম’ ধাতু থেকে এসেছে। যে ব্যক্তি কোনো বিষয়ে হুকুম আরোপ করে, তাকেই ‘হাকিম’ বলা হয়। সুতরাং, এটাও ব্যাপক অর্থে ব্যবহৃত হয়। ইমামকেও বলা হয়, আবার অন্যকেও বলা হয়। তবে বেশি ব্যবহৃত হয় বিচারকের ক্ষেত্রে। হুকুমের মূল অর্থ কাউকে জুলুম থেকে বাধা দেওয়া।
০৮. ওলি : এই শব্দটিও ব্যাপক। ইমাম, গাইরে ইমাম সবার ক্ষেত্রেই ব্যবহৃত হয়। এই শব্দটি কুরআনে কারিমেও এসেছে—
وَأُولِي الْأَمْرِ مِنكُمْ
(আর নির্দেশ মেনে নাও রাসুলের) এবং তোমাদের মধ্যে যারা বিচারক তাদের।
এই নামগুলোর মধ্যে সর্বাধিক প্রসিদ্ধ নাম আমিরুল মুমিনিন। খুলাফায়ে রাশিদার তিনজনকে, বনু উমাইয়া, বনু আব্বাস ও উসমানিদের আমিরুল মুমিনিন বলা হতো। অনুরূপ ইসলামের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গকেও আমির বলা হতো।