📄 শব্দ-বিশ্লেষণ
এক. ইমামত: 'ইমামতে'র মূল অর্থ 'ইচ্ছা করা'। যেমন বলা হয়, 'যদি বাড়িতে যাওয়ার ইচ্ছা করে'। শরিয়তের পরিভাষার ইমামত দুই প্রকার:
* ০১। ইমামতে সুগরা
* ০২। ইমামতে কুবরা
এখানে, দ্বিতীয়টাই উদ্দেশ্য। হাসকাফি রাহিমাহুল্লাহ এর অর্থ এভাবে ব্যক্ত করেছেন—'ইমামতে কুবরা হলো, মানুষের ওপর ব্যাপকভাবে ক্ষমতা লাভ করা।'
ইবনু আবিদিন রাহিমাহুল্লাহ বলেন, মাকাসিস গ্রন্থে ইমামতের পরিচয় দেওয়া হয়েছে এভাবে যে ‘ইমামত হচ্ছে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পক্ষ থেকে দ্বীন-দুনিয়া; উভয় ক্ষেত্রে ব্যাপকভাবে নেতৃত্ব গ্রহণ করা।’
জুওয়াইনি রাহিমাহুল্লাহ বলেন, ‘ইমামত হলো পূর্ণাঙ্গ নেতৃত্ব ও দায়িত্ব, যা আম-খাস সবার সাথে দ্বীন-দুনিয়ার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়াদির সাথে সম্পৃক্ত। গুরত্বপূর্ণ বিষয় বলতে: • ০১. সীমান্ত পাহারা দেওয়া, • ০২. জনগণের দেখভাল করা, • ০৩. দলিল-প্রমাণ বা তরবারির মাধ্যমে (ইসলামের) দাওয়াত দেওয়া, • ০৪. অন্যায় ও ভার প্রতিহত করা, • ০৫. মজলুমের জন্য জালিমের থেকে ইনসাফ গ্রহণ করা, • ০৬. হক দিতে অস্বীকারকারীদের থেকে হক আদায় করা, • ০৭. সেই হক প্রাপ্য ব্যক্তিদের কাছে পৌঁছে দেওয়া।
দুই. ‘ইমারাত’ ও ‘ইমারত’: দুটোরই শাব্দিক অর্থ নেতৃত্ব। বলা হয়, ‘জাতির নেতৃত্ব গ্রহণ করল।’ ‘ইমারত’ ধাতুটি থেকে ‘আমির’ (নেতা) শব্দটি নির্গত হয়েছে।
আবার, আমিরের পদকেও ‘ইমারত’ বলা হয়। ফিকহের পরিভাষায় ব্যবহৃত ‘ইমারাত’ শব্দটিও অনেকটা এ অর্থে ব্যবহার করা হয়। তবে পার্থক্য এতটুকু যে, এই ‘ইমারত’ ব্যাপক ক্ষেত্রে হয়ে থাকে। আর সেটা শুধু সুলতানের পক্ষ থেকেই লাভ করা যায়। পক্ষান্তরে ফিকহের ‘ইমারাত’ কখনো ব্যাপক ক্ষেত্রে, আবার কখনো নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে হয়ে থাকে। তদ্রুপ এটা সুলতানের পক্ষ থেকেও হতে পারে, শরিয়তের পক্ষ থেকেও হতে পারে, অন্য কারও পক্ষ থেকেও হতে পারে। যেমন: অসিয়ত করা বা উকিল বানানো।
তিন. ‘খিলাফত’: ‘খিলাফত’ এর আভিধানিক অর্থ ‘কারও ওপর তার দায়িত্বে নিযুক্ত হওয়া’, কিংবা ‘তার পরিবর্তে দায়িত্ব গ্রহণ করা’।
শরিয়তের পরিভাষায় ‘খলিফার পদ’-কে ‘খিলাফত’ বলা হয়। তদ্রুপ নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের স্থলাভিষিক্ত (নায়েব বা সহকারী) হয়ে দ্বীন-দুনিয়া উভয় ক্ষেত্রে ব্যাপকভাবে নেতৃত্বগ্রহণ। এই খিলাফতকে ‘ইমামতে কুবরা’ও বলা হয়।
মুফরাদাত ফি গারিবিল কুরআন-এ (২৯৪ পৃষ্ঠায়) আছে, খিলাফত অর্থ অন্যের নায়েব (স্থলবর্তী) হওয়া—হয় তার অনুপস্থিতির কারণে, বা মৃত্যুবরণ করার কারণে, কিংবা তার অক্ষমতার কারণে। নায়েবের সম্মানার্থে এই শেষ অর্থেই আল্লাহ তাআলা মানুষকে জমিনের খলিফা বানিয়েছেন। যেমন: বর্ণিত হয়েছে—
هُوَ الَّذِي جَعَلَكُمْ خَلَائِفَ فِي الْأَرْضِ
'তিনিই এ মহান সত্তা, যিনি তোমাদের জমিনে 'খলিফা' বানিয়েছেন।'
وَهُوَ الَّذِي جَعَلَكُمْ خَلَائِفَ الْأَرْضِ
'আর তিনিই ওই মহান সত্তা, যিনি তোমাদের পৃথিবীতে 'স্থলবর্তী' বানিয়েছেন।'"
আরও বর্ণিত হয়েছে-
وَيَسْتَخْلِفُ رَبِّي قَوْمًا غَيْرَكُمْ
'আর আমার প্রতিপালক তোমাদের স্থলে অন্য কোনো জাতিকে 'খলিফা' বানাবেন।'
সুতরাং তিনিই খলিফা, যিনি মুসলিমদের দায়িত্বভার গ্রহণ করেছেন। তবে কোনো কোনো আহলে ইলম বলেন, শাসক যদি শাসনক্ষমতায় থেকে ন্যায়-ইনসাফ করে জমিনে আল্লাহর আনুগত্য প্রতিষ্ঠা করে, তাহলেই কেবল তাকে খলিফা বলা যাবে অন্যথায় নয়!
এ জন্যই আবু বকর, উমার, উসমান এবং আলি রাদিয়াল্লাহু আনহুমকে খলিফা বলা হয়। আর তাদের সম্পর্কেই নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন-
عليكم بسنتي وسنة الخلفاء الراشدين المهديين
'তোমরা আমার সুন্নাত এবং হিদায়াতপ্রাপ্ত খুলাফায়ে রাশিদার সুন্নাত আঁকড়ে ধরো।'
সাদ ইবনু জুমহান রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, সাফিনা রাদিয়াল্লাহু আনহা আমার কাছে বর্ণনা করেছেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন-
الخلافة في أمتي ثلاثين سنة ثم ملك بعد ذلك
'আমার উম্মাহর মাঝে খিলাফত থাকবে ত্রিশ বছর। তারপর খিলাফতের পর রাজতন্ত্র কায়েম হবে।'
তারপর আমাকে সাফিনা রা. বলেন, 'তুমি আবু বকর রা. এর খিলাফত, উমার রা. এর খিলাফত এবং উসমান রা. এর খিলাফত আঁকড়ে ধরে রেখো।' তারপর আমাকে বললেন, 'তুমি আলি রা. এর খিলাফতকেও আঁকড়ে ধরে রেখো।' তিনি বলেন, 'পরবর্তী সময়ে আমরা খিলাফতকে ত্রিশ বছরের মাঝেই পেয়েছি।' সাঈদ বলেন, 'আমি সাফিনা রা.-কে বললাম, বন্ধু উমাইয়্যা দাবি করে, তাদের মাঝেও খিলাফত আছে। তিনি বললেন, 'ওদের দাবি একেবারেই মিথ্যা। বরং, ওরা নিকৃষ্ট রাজতন্ত্র কায়েমকারী'৷'
শাসন-ব্যব ব্যবস্থা যে খিলাফত থেকে রাজতন্ত্রে চলে যাবে এটা মূলত গায়েবি বিষয়, যা আল্লাহ তাআলা তাঁর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে অবগত করেছেন। যেমন: নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরেক হাদিসে বলেছেন-
تكون النبوة فيكم ما شاء الله وان تكون ثم يرفعها إذا شاء يرفعها ثم تكون خلافة على منهاج النبوة فتكون ما شاء الله أن تكون ثم يرفعها إذا شاء الله أن يرفعها ثم تكون ملكا عاضا فيكون ما شاء الله أن يكون ثم يرفعها إذا شاء أن يرفعها ثم تكون ملكا جبرية فتكون ما شاء الله أن تكون ثم يرفعها اذا شاء ان يرفعها ثم تكون خلافة على منهاج نبوة
'তোমাদের মাঝে ততদিন নবুওয়াত থাকবে, যতদিন আল্লাহ ইচ্ছা করেন। তারপর তিনি যখন উঠিয়ে নেওয়ার ইচ্ছা করবেন, তখন তা উঠিয়ে নেবেন। তারপর নবুওয়াতের আদর্শে খিলাফত কায়েম হবে। অতঃপর আল্লাহ যতদিন ইচ্ছা করেন, ততদিন খিলাফত থাকবে। তারপর তিনি যখন খিলাফত উঠিয়ে নেওয়ার ইচ্ছা করবেন, তখন উঠিয়ে নেবেন। তারপর অন্যায়ের রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হবে। অতঃপর আল্লাহ যতদিন ইচ্ছা করেন, ততদিন রাজতন্ত্র থাকবে। তারপর যখন উঠিয়ে নেওয়ার ইচ্ছা করবেন, তখন উঠিয়ে নেবেন। তারপর স্বেচ্ছাচারিতার রাজত্ব কায়েম হবে। অতঃপর আল্লাহ যতদিন ইচ্ছা করেন, ততদিন বাকি থাকবে। তারপর যখন উঠিয়ে নেওয়ার ইচ্ছা করবেন, তখন উঠিয়ে নেবেন। তারপর আবার নবুওয়াতের আদর্শে খিলাফত কায়েম হবে।'
তারপর নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম চুপ হয়ে গেলেন। হাবিব নামক বর্ণনাকারী বলেন-'পরবর্তী সময়ে যখন উমার ইবনু আবদিল আজিজ নেতৃত্বের ভার গ্রহণ করলেন, আর ইয়াজিদ ইবনু নুমান ইবনি বাশির তার কাছে থাকতেন, তখন আমি এই হাদিস লিখে তার কাছে পাঠিয়ে বললাম- 'আমি আশা করি, আমিরুল মুমিনিন উমার ইবনু আবদিল আজিজ অন্যায়ের হাদিসে বর্ণিত রাজতন্ত্র এবং স্বেচ্ছাচারিতার রাজত্বের পর খিলাফতে অধিষ্ঠিত হয়েছেন। তখন ইয়াজিদ আমার লেখাটি উমার ইবনু আব্দুল আজিজকে দিলে তিনি খুব খুশি ও মুগ্ধ হন।
চার. 'দাওলাত': 'দাওলাতে'র আভিধানিক অর্থ একজনের পর আরেকজনের কাছে কোনো জিনিস অর্জিত হওয়া। অর্থসম্পদ (টাকা) বা যুদ্ধ বারবার হওয়া।
দাওলাত শব্দটি সম্পদ অর্থে যেমন ব্যবহৃত হয়, তেমনি যুদ্ধ অর্থেও ব্যবহৃত হয়। অবশ্য কেউ কেউ বলেন-দুওলাত (হ্রস উ-কার দিয়ে) শব্দটি সম্পদ অর্থে। আর দাওলাত (আ-কার দিয়ে) শব্দটি যুদ্ধ অর্থে ব্যবহৃত হয়।
আর ইদালাত অর্থ পরাস্ত করা। বলা হয়, শত্রুদের ওপর বিজয় দান করা হয়েছে। আবু সুফইয়ানের এক হাদিসে আছে, আমরা তাদেরকে পরাস্ত করি। আবার এই শব্দটি থেকে কুরআনে কারিমে এসেছে-
وَتِلْكَ الْأَيَّامُ نُدَاوِلُهَا بَيْنَ النَّاسِ
'আর এ দিনগুলোকে আমি মানুষের মধ্যে আবর্তিত করে থাকি।'
كَيْ لَا يَكُوْنَ دُولَةً بَيْنَ الْأَغْنِيَاءِ مِنْكُمْ
'যাতে তা তোমাদের মধ্যকার সম্পদশালীদের মধ্যেই আবর্তিত না হয়।' অর্থাৎ, আগে শুধু ধনীদের মাঝেই সম্পদ আবর্তিত হতো, গরিবদের তারা কিছুই দিতনা।
পারিভাষিক অর্থে, দাওলাত বলা হয় কিছু প্রদেশের সমষ্টি। এই প্রদেশসমূহ একজনের অধীনে একত্র করা হয়, যাতে ভিন্ন ভিন্ন প্রদেশে আলাদাভাবে নেতৃত্ব দেওয়া সম্ভব হয়। যার সীমা-পরিসীমা আছে। শাসক, খলিফা, বা আমিরুল মুমিনিন এই নেতৃত্বের প্রধান থাকেন। (যেমন: দাওলাতে উসমানিয়া।)
পাঁচ. 'সালতানাত' : 'সালতানাতে'র মূল অর্থ শক্তি বা ক্ষমতা। শব্দটি সুলতান থেকেই এসেছে। যেমন: এখান থেকে এসেছে।
ছয়. 'হুকুমাত' : 'হুকুমাত' শব্দটি মূলত ('বিচার করা' অর্থের আরবি মূল 'হাকামা-ইয়াহকুমু') ধাতু থেকে এসেছে। প্রখ্যাত ভাষাবিদ আসমায়ি বলেন- হুকুমাতের শাব্দিক অর্থ : কাউকে জুলুম থেকে ফিরিয়ে রাখা। যেমন, আরবরা বলে-বিরত রাখা ও বাধা দেওয়া। শাসককে বলা হয় হাকিম। কারণ, শাসক জালিমকে জুলুম থেকে বিরত রাখে।