📄 মাজহাব
ইসলামি রাষ্ট্রে কোনো একটি মাজহাব থাকতে হবে, যার ওপর রাষ্ট্রের সকল বা অধিকাংশ অধিবাসী আমল করবে। সুতরাং, আফগানের অধিবাসীদের হানাফি ফিকহ ও জীবনের অন্যান্য বিষয়ে হানাফি মাজহাবের ওপর আমল করতে হবে। কারণ, তারা আদি যুগ থেকেই হানাফি। তাছাড়া ফিকহ-ফতোয়ার কিতাব, মতন, শরাহ সবই হানাফি মাজহাবের। হানাফি ছাড়া অন্য মাজহাব আফগানিস্তানে অন্যরকম দৃষ্টিতে (দোষ) দেখা হয়, বিশেষ করে সাধারণদের মাঝে!
কাসিম ইবনু কুতলুবুগা (৮৭৯ হি.) যিনি ফকিহ ও মুহাদ্দিস ছিলেন। তিনি (الكفاءة فى النكاح) নামক রিসালায় বলেন— 'হানাফি মাজহাব অনুসরণকারী ব্যক্তির উচিত নয়, তার মেয়ে বিপরীত মাজহাবের ছেলের কাছে বিবাহ দেওয়া। সেটা তাদের কাছে কোনো ত্রুটির কারণে দূষণীয় নয়, বরং প্রচলনের কারণে দূষণীয়।'
'যদি কোনো মুকাল্লিদ নিজের মাজহাব ছেড়ে নতুন মাজহাব গ্রহণ করে'- ফাতওয়ায়ে হিন্দিয়্যাতে আছে, এটা নিছক দ্বীন নিয়ে তামাশা। আর এটা নাজায়েজ। ইসলামি রাষ্ট্রে বিচারব্যবস্থার ক্ষেত্রে কোনো দল/ফোর্স/বাহিনীকে বিশেষ রকম সুযোগ সুবিধা দেওয়া যাবে না। কারণ, এতে রাষ্ট্র দুর্বল হয়ে যায়। যেমন উসমানি সাম্রাজ্য দুর্বল হয়ে গিয়েছিল; যখন বিচারব্যবস্থায় বিভিন্ন সম্পর্ক প্রাধান্য পেয়েছিল, অপরিচিত নানা নিয়মনীতি অনুপ্রবেশ করেছিল এবং ভিন্ন রকম শাসন-ব্যবস্থা ও বিশেষ দলের জন্য বিশেষ সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হয়েছিল।
তাছাড়া অনেক আগে থেকেই প্রসিদ্ধ ও জগৎসেরা অধিকাংশ কাজি ও মাশায়েখ হানাফি ছিলেন!
রদ্দুল মুহতারে আছে, অধিকাংশ ইসলামি দেশে বরং প্রায় সব জনপদে হানাফি মাজহাব ছাড়া অন্য কোনো মাজহাবের নামই জানে না। যেমন: রোম, হিন্দুস্তান, সিন্ধু, মা ওয়ারাউন নাহর ও সমরকন্দ। বর্ণিত আছে, সেখানে 'তুরবাতুল 'মুহাম্মাদিন' বা মুহাম্মাদের কবরস্থান আছে। সেখানে প্রায় ৪০০ জনকে দাফন করা হয়েছে। প্রত্যেকের নাম মুহাম্মাদ, প্রত্যেকেই বড়ো বড়ো মুসান্নিফ বা লেখক এবং ফতোয়াশাস্ত্রে পারদর্শী ছিলেন। প্রত্যেকরই বিরাট সংখ্যক ছাত্র আছে! হানাফি মাজহাবের প্রসিদ্ধ কিতাব হিদায়ার গ্রন্থকার যখন মৃত্যুবরণ করেন, তখন সেখানে দাফন করতে বাধা দিলে তার পাশেই দাফন করা হয়। বর্ণিত আছে, ইমাম আবু হানিফা রাহিমাহুল্লাহর মাজহাব প্রায় চার হাজার বড়ো বড়ো ব্যক্তি গ্রহণ করেছেন, যাদের প্রত্যেকরই বহু শাগরেদ আছে—ইবনু হাজার রাহিমাহুল্লাহ (যিনি শাফিয়ি মাজহাবের আলিম ছিলেন, তিনি) বলেন— 'কোনো কোনো ইমাম বলেছেন, ইমাম আবু হানিফার যে পরিমাণ শাগরেদ ছিল, সে পরিমাণ আর কোনো প্রসিদ্ধ ইমামের ছিল না!'
তদুপরি, ইমাম আবু হানিফা ও তাঁর শাগরেদদের ইলম দ্বারা উপকৃত হয়েছেন, সেটা অন্য কারও মাধ্যমে হয় নি। বিশেষ করে সাদৃশ্যপূর্ণ অর্থাৎ একই রকম বিভিন্ন হাদিসের ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে, নতুন নতুন মাসআলা উদঘাটনের ক্ষেত্রে, বিচারব্যবস্থা ও বিধিবিধানের ক্ষেত্রে! আল্লাহ তাআলা তাদেরকে পূর্ণাঙ্গ জাযা দান করুন। আমিন! পরবর্তী সময়ে কোনো কোনো মুহাদ্দিস ইমাম আবু হানিফার জীবনীতে ৮০০ শাগরিদের কথা তাদের নাম ও নসবসহ উল্লেখ করেছেন, যার আলোচনা অনেক দীর্ঘ!
আব্বাসি খলিফাদের মাজহাব যদিও তাদের পূর্বপুরুষ ইবনু আব্বাস রা.-এর মাজহাব ছিল, কিন্তু তাদের অধিকাংশ কাজি ও মাশাইখ ছিলেন হানাফি! ইতিহাসের পাতা উল্টালে এমনই দেখা যায়। আব্বাসি খিলাফত প্রায় ৫০০ বছর ছিল।
সেলজুকি শাসন এবং খাওয়ারিজম সাম্রাজ্যের সকল শাসক ও কাজিই হানাফি ছিলেন। আর বর্তমান (রদ্দুল মুহতারের লেখকের সময়কাল) উসমানি সাম্রাজ্যের শাসকরা তো ৯০০ হিজরি থেকে আজ পর্যন্ত (আল্লাহ তাদের সাম্রাজ্যকে কিয়ামত পর্যন্ত শক্তিশালী রাখুন) শাসন-ব্যবস্থা এবং অন্যান্য বিষয়াদির দায়িত্ব শুধু হানাফিদের হাতেই সোপর্দ করেন—এমনটাই কিছু গবেষক বলেছেন।
📄 মানুষের স্বভাব ও যুগের প্রচলন
একটি সফল রাষ্ট্রে অবশ্যই জনগণের স্বভাব-প্রকৃতি যুগের প্রচলন রক্ষা করতে হবে, যদি সেগুলো শরিয়তের সাথে বিরোধপূর্ণ না হয়! সুতরাং, আফগানেও এখানকার অধিবাসীদের স্বভাব-প্রকৃতি বিবেচনা করতে হবে। যেমন: পোশাক-আশাক, বেশভূষা, ভাষা ও অন্যান্য বিষয়গুলোর যেগুলো শরিয়তের সাথে সাংঘর্ষিক না। কারণ, শরিয়তের সাথে বিরোধপূর্ণ নয়, এমন প্রচলনও শরিয়তে ধর্তব্য; এমনকি ফুকাহায়ে কিরাম এটাকে শরিয়তের দলিল বলে বিবেচনা করেছেন।
মাজাল্লাতুল আহকামিল আদালিয়্যা কিতাবের ৩৬৩ ধারাতে উল্লিখিত আছে— 'স্বভাব-প্রকৃতিও দলিল'। অর্থাৎ, স্বভাব-প্রকৃতি ব্যাপক হোক বা ব্যক্তিগত, কোনো হুকুম সাব্যস্ত করার জন্য এটাকেও দলিল বানানো হবে। স্বভাব বলতে ওই জিনিসকে বোঝায়—যা মানুষের মস্তিষ্কে বসে যায় এবং বারবার ঘটার মাধ্যমে সুস্থ মস্তিষ্কের অধিকারী মানুষের কাছে, তা গ্রহণযোগ্যতা পায়।
দলিল হওয়ার অর্থ হলো—মামলা-মোকদ্দমার সময় সেটাকে দলিল হিসাবে পেশ করা যাবে। এটা মূলত হাদিস শরিফ থেকেই নেওয়া হয়েছে— 'মুসলিমরা যেটাকে উত্তম মনে করে, সেটা আল্লাহর কাছেও উত্তম।'
কিন্তু আমেরিকা আধিপত্য বিস্তার করে যে-সকল মন্দ স্বভাব-প্রকৃতি রেখে গিয়েছে এবং পাশ্চাত্য থেকে যে সকল কৃষ্টি-কালচার ও অপসংস্কৃতি এসেছে, সেটা কিন্তু কিছুতেই আফগানদের মূল স্বভাব নয়। সুতরাং, সেটা বিবেচ্যও নয়! বরং, যেকোনো মূল্যে খুব দ্রুত সেটা উপড়ে ফেলে আফগানকে পবিত্র করতে হবে। কেননা, সেটা যেমন পূতঃপবিত্র শরিয়তের ঘোর বিরোধী, তেমনি আফগানের অধিবাসীদের স্বভাবের সাথেও বৈষম্যপূর্ণ। তাদের আগের ও পরের প্রচলন থেকেও ভিন্ন। আফগানের ইতিহাসের পাতা খুললে, যেমন: জামালুদ্দিন আফগানি রচিত তাতিম্মাতুল বায়ান ফি তারিখি আফগানিস্তান গ্রন্থে তাদের স্বভাব-প্রকৃতি কেমন ছিল, তা দেখা যায়। তাদের এসব স্বভাব প্রকৃতিতে গেঁথে গিয়েছে—
• ০১। সাহসিকতা;
• ০২। আগ বাড়িয়ে শত্রুর মোকাবিলা;
• ০৩। যুদ্ধ করার মানসিকতা;
• ০৪। (আল্লাহ ব্যতীত) অন্যের সামনে মাথা নত না করা;
• ০৫। তাদের পুরুষদের পোশাক-পরিচ্ছদ: পাঞ্জাবি, পায়জামা, পাগড়ি, চাদর। আর তাদের নারীদের লম্বা, পুরো শরীর ঢেকে যায় এমন কাপড় পরিধান করা।
• ৬। উলামায়ে কিরাম ও বড়োদের শ্রদ্ধা করা;
• ০৭। মেহমানকে সম্মান করা;
• ০৮। তাদের অধিকাংশই সুন্নাতের পাবন্দ, হানাফি মাজহাবের অনুসারী।
• ০৯। আফগানের গ্রাম ও শহরগুলোতে দ্বীনি ইলম শিক্ষার ব্যবস্থা আছে। যেমন-সরফ, নাহু, মাআনি, বায়ান, ফিকহ, উসুল, তাফসির, হাদিস, মানতেক, দর্শন, গণিত, মিরাস। অবশ্য কোনো কোনো এলাকাতে শুধু ফিকাহই পড়ানো হয়।
• ১০। প্রত্যেক গ্রামেই আছে মসজিদ, সাথে ঘরও তৈরি করা যাতে তালিবে ইলম বা ছাত্ররা সেখানে থাকতে পারে।
• ১১। তারা মন থেকেই তালিবে ইলমদের খাবারের ব্যবস্থা করে।
• ১২। সেখানে উলামায়ে কিরামের অনেক সম্মান। দ্বীনি বিষয়ে তারা আলিমদের রাহনুমাi করে।
• ১৩। ইসলামের ব্যাপারে তারা অত্যন্ত কঠোর।
• ১৪। ইসলামের জন্য তারা জান দিতে প্রস্তুত।
• ১৫। তারা স্বাধীনচেতা জাতি। অন্য কোনো ক্ষমতার সামনে মাথা নত করে না।৪৭
📄 স্বাতন্ত্র্য ও স্বয়ংসম্পূর্ণতা
ইসলামি রাষ্ট্রে আইন-কানুন, বিধিবিধান, মূলনীতি ও নীতিমালা স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে হবে। বাহিরের কাউকে—যে কেউ হোক না কেন— ভেতরের বিষয়ে হস্তক্ষেপ বা অনধিকার চর্চার সুযোগ দেওয়া যাবে না। কারণ, অন্যের ঘরে তো তার অনুমতি ছাড়া প্রবেশ করা যায় না। সেটা হবে অন্যের মালিকানায় অবৈধ হস্তক্ষেপ। তাহলে কীভাবে কোনো সাম্রাজ্যের জন্য আরেক সাম্রাজ্যে অনধিকার চর্চা করা বৈধ হতে পারে। আল্লাহ তাআলা বলেন—
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَدْخُلُوا بُيُوتًا غَيْرَ بُيُوتِكُمْ حَتَّى تَسْتَأْنِسُوا وَتُسَلِّمُوا عَلَى أَهْلِهَا ذَلِكُمْ خَيْرٌ لَّكُمْ لَعَلَّكُمْ تَذَكَّرُونَ فَإِن لَّمْ تَجِدُوا فِيهَا أَحَدًا فَلَا تَدْخُلُوهَا حَتَّى يُؤْذَنَ لَكُمْ وَإِن قِيلَ لَكُمُ ارْجِعُوا فَارْجِعُوا هُوَ أَزْكَى لَكُمْ وَاللَّهُ بِمَا تَعْمَلُونَ عَلِيمٌ
‘হে ঈমানদাগণ, তোমরা তোমাদের ঘর ছাড়া অন্যের ঘরে অনুমতি নেওয়া ও তার অধিবাসীদের সালাম দেওয়ার আগ পর্যন্ত প্রবেশ করো না। সেটাই তোমাদের জন্য কল্যাণকর, যাতে তোমরা উপদেশ গ্রহণ করতে পারো। সেখানে যদি কাউকে না পাও, তাহলে তোমাদের অনুমতি দেওয়ার আগ পর্যন্ত সেখানে প্রবেশ করো না।’
ইবনু কাসির রাহিমাহুল্লাহ এর কারণ বর্ণনা করে বলেন— ‘সেখানে তখন অন্যের মালিকানায় তার অনুমতি ছাড়া অনধিকার চর্চা করা হয়।’
সুতরাং, আমেরিকা যে আফগানের ওপর আধিপত্য বিস্তার করেছিল, সেটা ছিল অন্যায় হস্তক্ষেপ, অবৈধ প্রভাব বিস্তার এবং অনধিকার চর্চা। এজন্যই আফগানের উলামায়ে কিরাম তাদের বিরুদ্ধে জিহাদের ঘোষণা দিয়েছেন এবং আফগানের যারা তাদের সাহায্য করবে, তাদের বিরুদ্ধেও যুদ্ধ করার ফতোয়া দিয়েছেন। কেননা, এর মাধ্যমে তারা নিজেদের দ্বীনকে, নারী ও শিশুকে, সভ্যতা ও সংস্কৃতিকে রক্ষা করছে। আর আল্লাহর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন—
من قتل دون ماله فهو شهيد ومن قتل دون اهله أو دون دمه أو دون دينه فهو شهيد....
‘যে ব্যক্তি নিজের মাল রক্ষা করতে নিহত হয়, সে শহিদ। আর যে নিজের পরিবার বা নিজের জান বা নিজের দ্বীনকে রক্ষা করতে গিয়ে নিহত হয়, সেও শহিদ।’
📄 স্বাধীনতা ও বাকস্বাধীনতা
ইসলামি রাষ্ট্রে বাকস্বাধীনতা অবশ্যই থাকবে। অর্থাৎ, প্রত্যেক মুসলিমের এই সুযোগ থাকবে যে, সে ইসলামের মৌলিক বিষয়াদি তুলে ধরতে পারবে, সাধারণ মানুষের কাছে ইসলামের বিধিবিধান পৌঁছে দিতে পারবে। মোটকথা, সৎ কাজের আদেশ এবং অসৎ কাজ হতে নিষেধ করতে পারবে, এমনকি রাষ্ট্রপ্রধানকেও। তবে সেটা শরিয়ত নির্দেশিত পন্থায় হতে হবে। আল্লাহ তাআলা বলেন—
ادْعُ إِلى سَبِيلِ رَبِّكَ بِالْحِكْمَةِ وَالْمَوْعِظَةِ الْحَسَنَةِ وَجَادِلْهُم بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ إِنَّ رَبَّكَ هُوَ أَعْلَمُ بِمَن ضَلَّ عَن سَبِيلِهِ وَهُوَ أَعْلَمُ بِالْمُهْتَدِينَ
‘তুমি তোমার প্রতিপালকের প্রতি আহ্বান করো প্রজ্ঞা ও সুন্দর কথার মাধ্যমে এবং তাদের সাথে যুক্তিতর্ক করো সর্বোত্তম পন্থায়! নিঃসন্দেহে, তোমার রব তাদের সম্পর্কে অধিক অবগত, যারা তাঁর পথ থেকে গোমরাহ হয়েছে। আর তিনিই হিদায়াতপ্রাপ্তদের সম্পর্কে অধিক অবগত।’
আল্লাহ তাআলা আরও বলেন—
كُنتُمْ خَيْرَ أُمَّةٍ أُخْرِجَتْ لِلنَّاسِ تَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَتَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنكَرِ وَتُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ
তোমরাই হলে সর্বোত্তম উম্মত, মানবজাতির কল্যাণের জন্যই তোমাদের উদ্ভব ঘটানো হয়েছে। তোমরা সৎ কাজের নির্দেশ দান করবে ও অন্যায় কাজে বাধা দেবে এবং আল্লাহর প্রতি ঈমান আনবে।
মোটকথা, ইসলামে বাকস্বাধীনতা আছে। আর সেটা দ্বারা উদ্দেশ্য হলো— প্রত্যেকের সামনে থেকে জালিম শাসকের কাছে সুউচ্চ স্বরে সত্যের বাণী তুলে ধরা। যেমন, আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন—
أفضل الجهادي كلمه عدل عند سلطان جائر أو أمير جاائر.
'সবচেয়ে উত্তম জিহাদ হলো জালিম শাসক বা অত্যাচারী নেতার সামনে ইনসাফের কথা বলা'।
মুসলিম শাসকরাও সাধারণ জনগণকে উদ্বুদ্ধ করতেন, যাতে তাদের সামনে সত্য বাণী তুলে ধরে এবং শাসকরাও সেটা মেনে নিতেন! আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন- 'আমি তোমাদের শাসক ঠিকই, তবে তোমাদের মধ্যকার শ্রেষ্ঠ ব্যক্তি নই। সুতরাং, যদি আমি সত্যের ওপর অটল থাকি, তাহলে আমাকে সাহায্য করো। আর যদি সত্য থেকে বিচ্যুত হই, তাহলে আমাকে সত্যের পথে নিয়ে আসো।'
বর্ণিত আছে, এক লোক উমার রাদিয়াল্লাহু আনহুকে বলল-'আল্লাহকে ভয় করেন'। তিনি খুশি হয়ে তাকে তখন কৃতজ্ঞতা জানালেন। বললেন- 'ওই ব্যক্তিদের উপর যেন আল্লাহ রহম করেন, যে আমাদের সামনে আমাদের দোষগুলো তুলে ধরে।
আবদুল্লাহ ইবনু মুসআব রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, উমার রা. একবার বললেন-তোমরা নারীদের চল্লিশ উকিয়ার বেশি মোহর দিয়ো না, যদিও সে নিও গোত্রের মেয়ে হয়। অর্থাৎ, যদিও সে ইয়াজিদ ইবনু হুসাইন হারিসির মেয়ে হোক কারণ, সে ছিল ধনী ছিল। এখন কেউ যদি বেশি মোহর দেয়, তাহলে আমি সেই অতিরিক্ত অংশ বাইতুল মালে রেখে দেব।
তখন নারীদের কাতার থেকে এক নারী দাঁড়িয়ে বললেন-কীভাবে আপনি এ কথা বললেন?
উমার রা. বললেন-কেন কী হয়েছে? নারীটি বললেন, আল্লাহ তাআলা তো বলেছেন-
وَاِنْ اَرَدْتُّمُ اسْتِبْدَالَ زَوْجٍ مَّكَانَ zَوْجٍ وَّاٰتَيْتُمْ اِحْدٰهُنَّ قِنْطَارًا فَلَا تَأْخُذُوْا مِنْهُ شَيْـًٔا ؕ
'আর যদি তোমরা তাদের কাউকে (স্ত্রীকে) অঢেল সম্পদও দিয়ে থাকো, তবুও তা থেকে কিছুই ফিরিয়ে নিয়ো না!'
তখন উমার রা. বললেন, এক নারী সঠিক বলল, কিন্তু একজন পুরুষ ভুল বলল। (অর্থা তিনি নিজের ভুল স্বীকার করে নিলেন।)
মুহাম্মাদ ইবনু কাব কুরজি থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন-একবার এক লোক আলি রা.-কে একটি বিষয়ে জিজ্ঞাসা করল, আলি রা. তার উত্তর দেওয়ার পর লোকটি বলল, উত্তরটা আসলে এমন না, বরং এমন। তখন আলি রা. বললেন—তুমি ঠিক বলেছ, আমি ভুল বলেছি।'
কিন্তু বাক-স্বাধীনতার অর্থ এই নয় যে, যে যার মতো নিজের খেয়ালখুশির দিকে বা বিদআতের দিকে আহ্বান করবে। কারণ, সেটা ইসলামি শরিয়তে নিষিদ্ধ। আর কেউ যদি বিদআতের দিকে মানুষকে আহ্বান করে, তাহলে তাকে হত্যা করা হবে।
রদ্দুল মুহতারে আছে—'কোনো বিদআতি যদি মানুষকে বিদআতের কথা বলে, আর সে বিদআত ছড়িয়ে পড়ার আশংকা থাকে, তাহলে যদিও তার বিষয়ে কুফুরির ফায়সালা দেওয়া হয় নি; কিন্তু রাষ্ট্রকে গতিশীল রাখার জন্য এবং জনগণকে রোধ করার জন্য সুলতান তাকে হত্যা করতে পারবে। কারণ, এই ফিতনা অনেক গুরুতর ও মারাত্মক, দ্বীনের ক্ষেত্রে ক্ষতিকর প্রভাব সৃষ্টিকারী। আর যদি সেই বিদআত সরাসরি কুফুরি হয়, তাহলে বিদআতিদের সবাইকে হত্যা করা হবে; কিন্তু যদি বিদআতটি কুফুরি না হয়, তাহলে অন্যদের জন্য দৃষ্টান্তস্বরূপ শুধু তাদের নেতা ও গুরুকে হত্যা করা হবে।'
আকিদাগত বা ধর্মগত স্বাধীনতা: ইসলাম জিম্মি বা চুক্তিবদ্ধ কাফিরকে ইসলামগ্রহণে বাধ্য করে না, বরং আপন ধর্মের ওপরই বহাল রাখে। উমার রা.-এর 'আশাক' নামে এক খ্রিস্টান গোলাম ছিল। সে বলে—'আমি উমার রা.-এর এক খ্রিস্টান গোলাম ছিলাম। একবার উমার রা. আমাকে বললেন—তুমি মুসলিম হয়ে যাও, যাতে মুসলিমদের কিছু কাজে সাহায্য করতে পারো। কারণ, মুসলিমদের কাজে অমুসলিমদের সাহায্য নেওয়া উচিত নয়। তখন আমি অস্বীকার করলাম!
উমার রা. বললেন—ইসলামে কোনো বাধ্যবাধকতা নেই! যখন তার মৃত্যুর সময় হলো, তখন তিনি আমাকে মুক্ত করে দিয়ে বললেন—তোমার যেখানে ইচ্ছা যাও।'
ফুকাহায়ে কিরাম এ ব্যাপারে একমত যে, জিম্মিরা নিজেদের ধর্মের রীতিনীতি চর্চা করতে পারবে। তাদের এ-সব করতে নিষেধও করা হবে না, যতক্ষণ না তারা সেগুলো প্রকাশ্যে করে! এখন যদি তারা সেগুলো প্রকাশ্যে করতে চায়, যেমন—রাস্তায় বের হয়ে করতে চায়, তাহলে মুসলিম অধ্যুষিত এলাকা ও শহরে এগুলো করা ও বসবাসের ব্যাপারে তাদের নিষেধ করা হবে, তবে তাদের নিজেদের এলাকায় নিষেধ করা হবে না।
ইসলামে স্বাধীনতা দ্বারা উদ্দেশ্য এটাই। এর অর্থ এই না যে, প্রত্যেকে প্রত্যেকের বিশ্বাসে স্বাধীন—হোক সে ইহুদি বা খ্রিস্টান বা অন্যান্য ধর্মের অনুসারী। আবার, সে চাইলে এক ধর্ম বাদ দিয়ে অন্য ধর্ম গ্রহণ করবে। বরং, ইসলামে স্বাধীনতা দ্বারা উদ্দেশ্য হলো—আল্লাহ তাআলার সত্তা, সিফাত, ইবাদাত, ইস্তিআনাতের ক্ষেত্রে একত্ববাদিতার বিশ্বাস। কারণ, ইসলামি রাষ্ট্রের বড়ো একটি উদ্দেশ্য হলো, দ্বীনকে হিফাজত করা। আর সেটা সম্ভব দ্বীনের মৌলিক বিষয়কে হিফাজত করার মাধ্যমে, মানুষকে সঠিক আকিদার ওপর রাখার মাধ্যমে, যার ওপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উম্মাহকে রেখে গিয়েছেন, যার জন্য ভ্রান্তদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছেন, মুনাফিকদের বেড়াজাল মূলোৎপাটন করেছেন-যারা মানুষের মাঝে বিভ্রান্তিকর আকিদা, শয়তানের বানানো ও প্রত্যাখ্যাত অলিক ধ্যানধারণা ছড়ায়, আর ভাবে-তারা ভালো কাজই করছে। আবু হুরাইরা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন-
أحب الدين إلى الله الحنيفية السمحة
'আল্লাহ তাআলার নিকট সবচেয়ে পছন্দনীয় দ্বীন হলো উদার একনিষ্ঠ সরলধর্ম।'
আবু দারদা রা. থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন
وايم الله لقد تركتكم على مثل البيضاء ليلها ونهارها سواء
'আল্লাহর কসম! তোমাদের আমি শুভ্রতুল্য দ্বীনের ওপর রেখে গেলাম, যার দিন-রাত এক সমান (অর্থাৎ, উজ্জ্বল পরিষ্কার)।
আবু দারদা রা. বলেন-আল্লাহর কসম! রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সত্যই বলেছেন। তিনি আমাদের উজ্জ্বল ধর্মের ওপর রেখে গিয়েছেন, যার রাত-দিন সমান।
এই সহজ-সরল, উজ্জ্বল দ্বীন পরিবর্তন করার নামই হলো ইরতিদাদ ও কুফুরি। আর এটা ইসলামে মারাত্মক অপরাধ। এর শাস্তি হলো হত্যা এবং ইসলামের ফিরে আসার আগ পর্যন্ত আজীবন কারাদণ্ড।
কানজুল উম্মালে আছে-'মুরতাদের সামনে ইসলামকে পেশ করা হবে, তার সন্দেহ দূর করা হবে, তিন দিন তাকে আটকে রাখা হবে, যদি সে ইসলাম গ্রহণ করে, তাহলে তো হলোই। অন্যথায়, তাকে হত্যা করা হবে। তবে মুরতাদ নারীকে হত্যা করা হবে না। বরং, ইসলামগ্রহণের আগ পর্যন্ত আটকে রাখা হবে।' মূলত, ইসলাম মানুষের দ্বীন-দুনিয়ার বিষয়-আশয় খুব গুরুত্ব সহকারে দেখে। এ কারণেই যে মুফতি মানুষকে বিভিন্ন হিলা বা কৌশল শেখায়, অজ্ঞতাবশত বা বিশেষ কোনো উদ্দেশ্য বা খেয়াল-খুশির কারণে শরিয়তের সাথে বিরোধপূর্ণ ফতোয়া দেয়, যার ফলে জিজ্ঞাসু ব্যক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, এমন মুফতিকে ফতোয়া দিতে শরিয়ত নিষেধ করেছে।
একইভাবে ওই ডাক্তারের জন্য ডাক্তারি হারাম, যে মানুষের চিকিৎসা করে অথচ চিকিৎসা কী, সেটাও জানে না। ফলে তাদের অসুস্থতা আরও গুরুতর হয়। তদ্রুপ যে ব্যক্তি মানুষকে গাড়ি ভাড়া দেয় এবং ভাড়াও নিয়ে নেয়, পরবর্তী সময়ে যখন ভাড়াটে ব্যক্তি আসে তখন দেখে যে, তার কাছে কোনো গাড়িই নেই; ফলে ভাড়াটে ব্যক্তি সঙ্গীসাথি থেকে পিছিয়ে পড়ে, এমন নিঃস্ব ব্যক্তির জন্য মানুষের কল্যাণের জন্যই গাড়ি ভাড়া দেওয়া নিষিদ্ধ। কারণ, এদের মাধ্যমে মানুষের সম্পদ ও সময়ের ক্ষতি হয়।
টিকাঃ
** সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ১০
* আবু দাউদ, ৪৩৪১। আদেশ-নিষেধ অধ্যায়।
** সূত্র: খিলাফত: ১৪৮
*** সূরা নিসা, আয়াত: ২০
** প্রাগুক্ত, ৮৬৫
** তাবারানি, আওসাত, ৭৩৫১
** সুনানু ইবনি মাজাহ, ৫