📄 উমার রা. এবং এক ঘোড়া বিক্রেতা
একবার উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু এক লোকের সাথে ঘোড়া নিয়ে দরদাম করছিলেন। এরপর তিনি যাচাইয়ের জন্য ঘোড়ায় আরোহণ করলেন; কিন্তু এতে ঘোড়ার একটি হাড় ভেঙে গেল। তখন উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু লোকটিকে বললেন—'তুমি তোমার ঘোড়া নিয়ে যাও!'
লোকটি বলল—'না, না। তা হবে না!'
উমার রা. বললেন—'তাহলে আমাদের দুজনের মাঝে মীমাংসা করার জন্য একজন সালিশ নিযুক্ত করো।'
তখন লোকটি বলল—'শুরাইহ হবে আমাদের সালিশ!'
এরপর তারা দুজন ইমাম শুরাইহ রাহিমাহুল্লাহর কাছে বিচার নিয়ে গেলেন। সবকিছু শুনে ইমাম শুরাইহ উমার রাদিয়াল্লাহু আনহুকে উদ্দেশ্য করে বললেন—'আমিবুল মুমিনিন, হয় ন্যায্যমূল্যে ঘোড়াটি কিনে নেন, অথবা ঘোড়াটি যে অবস্থায় নিয়েছেন, সে অবস্থায় ফিরিয়ে দেন!'
তখন উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন— 'এটাই কি তোমার বিচার?' (তিনি রাষ্ট্রপ্রধান হয়ে নিজের বিরুদ্ধে আসা এই নির্দেশও মেনে নেন। এবং) পরবর্তী সময়ে উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু শুরাইহকে কুফায় কাজি (বিচারক) হিসেবে নিয়োগ দেন।
টিকাঃ
* সূত্র: মুসান্নাফু ইবনি আবি শাইবা
📄 মাজহাব
ইসলামি রাষ্ট্রে কোনো একটি মাজহাব থাকতে হবে, যার ওপর রাষ্ট্রের সকল বা অধিকাংশ অধিবাসী আমল করবে। সুতরাং, আফগানের অধিবাসীদের হানাফি ফিকহ ও জীবনের অন্যান্য বিষয়ে হানাফি মাজহাবের ওপর আমল করতে হবে। কারণ, তারা আদি যুগ থেকেই হানাফি। তাছাড়া ফিকহ-ফতোয়ার কিতাব, মতন, শরাহ সবই হানাফি মাজহাবের। হানাফি ছাড়া অন্য মাজহাব আফগানিস্তানে অন্যরকম দৃষ্টিতে (দোষ) দেখা হয়, বিশেষ করে সাধারণদের মাঝে!
কাসিম ইবনু কুতলুবুগা (৮৭৯ হি.) যিনি ফকিহ ও মুহাদ্দিস ছিলেন। তিনি (الكفاءة فى النكاح) নামক রিসালায় বলেন— 'হানাফি মাজহাব অনুসরণকারী ব্যক্তির উচিত নয়, তার মেয়ে বিপরীত মাজহাবের ছেলের কাছে বিবাহ দেওয়া। সেটা তাদের কাছে কোনো ত্রুটির কারণে দূষণীয় নয়, বরং প্রচলনের কারণে দূষণীয়।'
'যদি কোনো মুকাল্লিদ নিজের মাজহাব ছেড়ে নতুন মাজহাব গ্রহণ করে'- ফাতওয়ায়ে হিন্দিয়্যাতে আছে, এটা নিছক দ্বীন নিয়ে তামাশা। আর এটা নাজায়েজ। ইসলামি রাষ্ট্রে বিচারব্যবস্থার ক্ষেত্রে কোনো দল/ফোর্স/বাহিনীকে বিশেষ রকম সুযোগ সুবিধা দেওয়া যাবে না। কারণ, এতে রাষ্ট্র দুর্বল হয়ে যায়। যেমন উসমানি সাম্রাজ্য দুর্বল হয়ে গিয়েছিল; যখন বিচারব্যবস্থায় বিভিন্ন সম্পর্ক প্রাধান্য পেয়েছিল, অপরিচিত নানা নিয়মনীতি অনুপ্রবেশ করেছিল এবং ভিন্ন রকম শাসন-ব্যবস্থা ও বিশেষ দলের জন্য বিশেষ সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হয়েছিল।
তাছাড়া অনেক আগে থেকেই প্রসিদ্ধ ও জগৎসেরা অধিকাংশ কাজি ও মাশায়েখ হানাফি ছিলেন!
রদ্দুল মুহতারে আছে, অধিকাংশ ইসলামি দেশে বরং প্রায় সব জনপদে হানাফি মাজহাব ছাড়া অন্য কোনো মাজহাবের নামই জানে না। যেমন: রোম, হিন্দুস্তান, সিন্ধু, মা ওয়ারাউন নাহর ও সমরকন্দ। বর্ণিত আছে, সেখানে 'তুরবাতুল 'মুহাম্মাদিন' বা মুহাম্মাদের কবরস্থান আছে। সেখানে প্রায় ৪০০ জনকে দাফন করা হয়েছে। প্রত্যেকের নাম মুহাম্মাদ, প্রত্যেকেই বড়ো বড়ো মুসান্নিফ বা লেখক এবং ফতোয়াশাস্ত্রে পারদর্শী ছিলেন। প্রত্যেকরই বিরাট সংখ্যক ছাত্র আছে! হানাফি মাজহাবের প্রসিদ্ধ কিতাব হিদায়ার গ্রন্থকার যখন মৃত্যুবরণ করেন, তখন সেখানে দাফন করতে বাধা দিলে তার পাশেই দাফন করা হয়। বর্ণিত আছে, ইমাম আবু হানিফা রাহিমাহুল্লাহর মাজহাব প্রায় চার হাজার বড়ো বড়ো ব্যক্তি গ্রহণ করেছেন, যাদের প্রত্যেকরই বহু শাগরেদ আছে—ইবনু হাজার রাহিমাহুল্লাহ (যিনি শাফিয়ি মাজহাবের আলিম ছিলেন, তিনি) বলেন— 'কোনো কোনো ইমাম বলেছেন, ইমাম আবু হানিফার যে পরিমাণ শাগরেদ ছিল, সে পরিমাণ আর কোনো প্রসিদ্ধ ইমামের ছিল না!'
তদুপরি, ইমাম আবু হানিফা ও তাঁর শাগরেদদের ইলম দ্বারা উপকৃত হয়েছেন, সেটা অন্য কারও মাধ্যমে হয় নি। বিশেষ করে সাদৃশ্যপূর্ণ অর্থাৎ একই রকম বিভিন্ন হাদিসের ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে, নতুন নতুন মাসআলা উদঘাটনের ক্ষেত্রে, বিচারব্যবস্থা ও বিধিবিধানের ক্ষেত্রে! আল্লাহ তাআলা তাদেরকে পূর্ণাঙ্গ জাযা দান করুন। আমিন! পরবর্তী সময়ে কোনো কোনো মুহাদ্দিস ইমাম আবু হানিফার জীবনীতে ৮০০ শাগরিদের কথা তাদের নাম ও নসবসহ উল্লেখ করেছেন, যার আলোচনা অনেক দীর্ঘ!
আব্বাসি খলিফাদের মাজহাব যদিও তাদের পূর্বপুরুষ ইবনু আব্বাস রা.-এর মাজহাব ছিল, কিন্তু তাদের অধিকাংশ কাজি ও মাশাইখ ছিলেন হানাফি! ইতিহাসের পাতা উল্টালে এমনই দেখা যায়। আব্বাসি খিলাফত প্রায় ৫০০ বছর ছিল।
সেলজুকি শাসন এবং খাওয়ারিজম সাম্রাজ্যের সকল শাসক ও কাজিই হানাফি ছিলেন। আর বর্তমান (রদ্দুল মুহতারের লেখকের সময়কাল) উসমানি সাম্রাজ্যের শাসকরা তো ৯০০ হিজরি থেকে আজ পর্যন্ত (আল্লাহ তাদের সাম্রাজ্যকে কিয়ামত পর্যন্ত শক্তিশালী রাখুন) শাসন-ব্যবস্থা এবং অন্যান্য বিষয়াদির দায়িত্ব শুধু হানাফিদের হাতেই সোপর্দ করেন—এমনটাই কিছু গবেষক বলেছেন।
📄 মানুষের স্বভাব ও যুগের প্রচলন
একটি সফল রাষ্ট্রে অবশ্যই জনগণের স্বভাব-প্রকৃতি যুগের প্রচলন রক্ষা করতে হবে, যদি সেগুলো শরিয়তের সাথে বিরোধপূর্ণ না হয়! সুতরাং, আফগানেও এখানকার অধিবাসীদের স্বভাব-প্রকৃতি বিবেচনা করতে হবে। যেমন: পোশাক-আশাক, বেশভূষা, ভাষা ও অন্যান্য বিষয়গুলোর যেগুলো শরিয়তের সাথে সাংঘর্ষিক না। কারণ, শরিয়তের সাথে বিরোধপূর্ণ নয়, এমন প্রচলনও শরিয়তে ধর্তব্য; এমনকি ফুকাহায়ে কিরাম এটাকে শরিয়তের দলিল বলে বিবেচনা করেছেন।
মাজাল্লাতুল আহকামিল আদালিয়্যা কিতাবের ৩৬৩ ধারাতে উল্লিখিত আছে— 'স্বভাব-প্রকৃতিও দলিল'। অর্থাৎ, স্বভাব-প্রকৃতি ব্যাপক হোক বা ব্যক্তিগত, কোনো হুকুম সাব্যস্ত করার জন্য এটাকেও দলিল বানানো হবে। স্বভাব বলতে ওই জিনিসকে বোঝায়—যা মানুষের মস্তিষ্কে বসে যায় এবং বারবার ঘটার মাধ্যমে সুস্থ মস্তিষ্কের অধিকারী মানুষের কাছে, তা গ্রহণযোগ্যতা পায়।
দলিল হওয়ার অর্থ হলো—মামলা-মোকদ্দমার সময় সেটাকে দলিল হিসাবে পেশ করা যাবে। এটা মূলত হাদিস শরিফ থেকেই নেওয়া হয়েছে— 'মুসলিমরা যেটাকে উত্তম মনে করে, সেটা আল্লাহর কাছেও উত্তম।'
কিন্তু আমেরিকা আধিপত্য বিস্তার করে যে-সকল মন্দ স্বভাব-প্রকৃতি রেখে গিয়েছে এবং পাশ্চাত্য থেকে যে সকল কৃষ্টি-কালচার ও অপসংস্কৃতি এসেছে, সেটা কিন্তু কিছুতেই আফগানদের মূল স্বভাব নয়। সুতরাং, সেটা বিবেচ্যও নয়! বরং, যেকোনো মূল্যে খুব দ্রুত সেটা উপড়ে ফেলে আফগানকে পবিত্র করতে হবে। কেননা, সেটা যেমন পূতঃপবিত্র শরিয়তের ঘোর বিরোধী, তেমনি আফগানের অধিবাসীদের স্বভাবের সাথেও বৈষম্যপূর্ণ। তাদের আগের ও পরের প্রচলন থেকেও ভিন্ন। আফগানের ইতিহাসের পাতা খুললে, যেমন: জামালুদ্দিন আফগানি রচিত তাতিম্মাতুল বায়ান ফি তারিখি আফগানিস্তান গ্রন্থে তাদের স্বভাব-প্রকৃতি কেমন ছিল, তা দেখা যায়। তাদের এসব স্বভাব প্রকৃতিতে গেঁথে গিয়েছে—
• ০১। সাহসিকতা;
• ০২। আগ বাড়িয়ে শত্রুর মোকাবিলা;
• ০৩। যুদ্ধ করার মানসিকতা;
• ০৪। (আল্লাহ ব্যতীত) অন্যের সামনে মাথা নত না করা;
• ০৫। তাদের পুরুষদের পোশাক-পরিচ্ছদ: পাঞ্জাবি, পায়জামা, পাগড়ি, চাদর। আর তাদের নারীদের লম্বা, পুরো শরীর ঢেকে যায় এমন কাপড় পরিধান করা।
• ৬। উলামায়ে কিরাম ও বড়োদের শ্রদ্ধা করা;
• ০৭। মেহমানকে সম্মান করা;
• ০৮। তাদের অধিকাংশই সুন্নাতের পাবন্দ, হানাফি মাজহাবের অনুসারী।
• ০৯। আফগানের গ্রাম ও শহরগুলোতে দ্বীনি ইলম শিক্ষার ব্যবস্থা আছে। যেমন-সরফ, নাহু, মাআনি, বায়ান, ফিকহ, উসুল, তাফসির, হাদিস, মানতেক, দর্শন, গণিত, মিরাস। অবশ্য কোনো কোনো এলাকাতে শুধু ফিকাহই পড়ানো হয়।
• ১০। প্রত্যেক গ্রামেই আছে মসজিদ, সাথে ঘরও তৈরি করা যাতে তালিবে ইলম বা ছাত্ররা সেখানে থাকতে পারে।
• ১১। তারা মন থেকেই তালিবে ইলমদের খাবারের ব্যবস্থা করে।
• ১২। সেখানে উলামায়ে কিরামের অনেক সম্মান। দ্বীনি বিষয়ে তারা আলিমদের রাহনুমাi করে।
• ১৩। ইসলামের ব্যাপারে তারা অত্যন্ত কঠোর।
• ১৪। ইসলামের জন্য তারা জান দিতে প্রস্তুত।
• ১৫। তারা স্বাধীনচেতা জাতি। অন্য কোনো ক্ষমতার সামনে মাথা নত করে না।৪৭
📄 স্বাতন্ত্র্য ও স্বয়ংসম্পূর্ণতা
ইসলামি রাষ্ট্রে আইন-কানুন, বিধিবিধান, মূলনীতি ও নীতিমালা স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে হবে। বাহিরের কাউকে—যে কেউ হোক না কেন— ভেতরের বিষয়ে হস্তক্ষেপ বা অনধিকার চর্চার সুযোগ দেওয়া যাবে না। কারণ, অন্যের ঘরে তো তার অনুমতি ছাড়া প্রবেশ করা যায় না। সেটা হবে অন্যের মালিকানায় অবৈধ হস্তক্ষেপ। তাহলে কীভাবে কোনো সাম্রাজ্যের জন্য আরেক সাম্রাজ্যে অনধিকার চর্চা করা বৈধ হতে পারে। আল্লাহ তাআলা বলেন—
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَدْخُلُوا بُيُوتًا غَيْرَ بُيُوتِكُمْ حَتَّى تَسْتَأْنِسُوا وَتُسَلِّمُوا عَلَى أَهْلِهَا ذَلِكُمْ خَيْرٌ لَّكُمْ لَعَلَّكُمْ تَذَكَّرُونَ فَإِن لَّمْ تَجِدُوا فِيهَا أَحَدًا فَلَا تَدْخُلُوهَا حَتَّى يُؤْذَنَ لَكُمْ وَإِن قِيلَ لَكُمُ ارْجِعُوا فَارْجِعُوا هُوَ أَزْكَى لَكُمْ وَاللَّهُ بِمَا تَعْمَلُونَ عَلِيمٌ
‘হে ঈমানদাগণ, তোমরা তোমাদের ঘর ছাড়া অন্যের ঘরে অনুমতি নেওয়া ও তার অধিবাসীদের সালাম দেওয়ার আগ পর্যন্ত প্রবেশ করো না। সেটাই তোমাদের জন্য কল্যাণকর, যাতে তোমরা উপদেশ গ্রহণ করতে পারো। সেখানে যদি কাউকে না পাও, তাহলে তোমাদের অনুমতি দেওয়ার আগ পর্যন্ত সেখানে প্রবেশ করো না।’
ইবনু কাসির রাহিমাহুল্লাহ এর কারণ বর্ণনা করে বলেন— ‘সেখানে তখন অন্যের মালিকানায় তার অনুমতি ছাড়া অনধিকার চর্চা করা হয়।’
সুতরাং, আমেরিকা যে আফগানের ওপর আধিপত্য বিস্তার করেছিল, সেটা ছিল অন্যায় হস্তক্ষেপ, অবৈধ প্রভাব বিস্তার এবং অনধিকার চর্চা। এজন্যই আফগানের উলামায়ে কিরাম তাদের বিরুদ্ধে জিহাদের ঘোষণা দিয়েছেন এবং আফগানের যারা তাদের সাহায্য করবে, তাদের বিরুদ্ধেও যুদ্ধ করার ফতোয়া দিয়েছেন। কেননা, এর মাধ্যমে তারা নিজেদের দ্বীনকে, নারী ও শিশুকে, সভ্যতা ও সংস্কৃতিকে রক্ষা করছে। আর আল্লাহর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন—
من قتل دون ماله فهو شهيد ومن قتل دون اهله أو دون دمه أو دون دينه فهو شهيد....
‘যে ব্যক্তি নিজের মাল রক্ষা করতে নিহত হয়, সে শহিদ। আর যে নিজের পরিবার বা নিজের জান বা নিজের দ্বীনকে রক্ষা করতে গিয়ে নিহত হয়, সেও শহিদ।’