📄 মানবরচিত আইনের অসারতার প্রমাণ
মানবরচিত আইনের অসারতা কুরআন-সুন্নাহ ও ইজমা দ্বারা সুসাব্যস্ত। আর এই তিনটিই ইসলামি বিধিবিধানের প্রধান উৎস। কুরআন ও সুন্নাহর বহু জায়গায় স্পষ্টভাবে ইসলামবিরোধী আইন-কানুনের অসারতা প্রমাণিত হয়েছে। আর এভাবেই ইজমা বা উম্মাহর সর্বসম্মত রায় মানবরচিত আইনের অসারতার ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। নিচে কিছু দলিল উল্লেখ করা হলো-
এক.
আল্লাহ তাআলা ইসলামি শরিয়তের ওপর চলার আদেশ করেছেন, এছাড়া অন্য যেকোনো মতবাদ গ্রহণ করতে নিষেধ করেছেন! কিন্তু কারও জন্য এ সুযোগ রাখেন নি যে, সে চাইলে অন্য কোনো নিয়মনীতি অনুসরণ করবে।
আর কুরআন-সুন্নাহয় যে সকল স্পষ্ট আইন-কানুন রয়েছে, তার প্রত্যেকটি তিনি মুসলিমদের ওপর অবশ্য পালনীয় অকাট্য বিধান হিসাবে সাব্যস্ত করেছেন, যা স্বয়ং কুরআন কারিমের আয়াত থেকে সুস্পষ্টভাবে বোঝা যায়। কারণ, আল্লাহ তাআলা কুরআনে কারিমে শাসন-ব্যবস্থাকে দু-ভাগে বিভক্ত করেছেন। এর মাঝে তৃতীয় কোনো প্রকার নেই-হয় আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের ডাকে সাড়া দিয়ে রাসুলের অনুসরণ, অথবা প্রবৃত্তির অনুসরণ। সুতরাং, যা কিছু আল্লাহর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিয়ে এসেছেন, তা ছাড়া বাকি সবকিছুই প্রবৃত্তি ও খাহেশাত! যেমনটি আয়াতে রয়েছে-
فَإِن لَّمْ يَسْتَجِيبُوا لَكَ فَاعْلَمْ أَنَّمَا يَتَّبِعُونَ أَهْوَاءَهُمْ وَمَنْ أَضَلُّ مِمَّنِ اتَّبَعَ هَوَاهُ بِغَيْرِ هُدًى مِّنَ اللَّهِ ....
তারা যদি আপনার ডাকে সাড়া না দেয় তাহলে জেনে রাখেন, তারা শুধু প্রবৃত্তির অনুসরণ করছে। আর যে ব্যক্তি আল্লাহ তাআলার হিদায়াতের পরিবর্তে প্রবৃত্তির অনুসরণ করে, তার চেয়ে অধিক পথভ্রষ্ট আর কে আছে?”
আল্লাহ তাআলা আরও বলেন-
يَـٰدَاوُۥدُ إِنَّا جَعَلْنَـٰكَ خَلِيفَةً فِى ٱلْأَرْضِ فَٱحْكُم بَيْنَ ٱلنَّاسِ بِٱلْحَقِّ وَلَا تَتَّبِعِ ٱلْهَوَىٰ فَيُضِلَّكَ عَن سَبِيلِ ٱللَّهِ ۚ إِنَّ ٱلَّذِينَ يَضِلُّونَ عَن سَبِيلِ ٱللَّهِ لَهُمْ عَذَابٌ شَدِيدٌۢ بِمَا نَسُوا۟ يَوْمَ ٱلْحِسَابِ (٢٦)
হে দাউদ, আমি তোমাকে জমিনে খলিফা বানিয়েছি। সুতরাং, তুমি মানুষের মাঝে হক অনুযায়ী ফায়সালা করো। প্রবৃত্তির অনুসরণ করো না। তাহলে প্রবৃত্তি তোমাকে আল্লাহর পথ থেকে বিচ্যুত করবে।”
এ আয়াতে আল্লাহ তাআলা শাসন-ব্যবস্থাকে দুই ভাগে ভাগ করেছেন। তৃতীয় কোনো পথ নেই। প্রথমটি হক, তথা রাসুলগণের ওপর নাজিলকৃত ওহি। দ্বিতীয়টি প্রবৃত্তি, তথা ওহির বিপরীত। এ ব্যাপারে মহান আল্লাহ তাআলা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সম্বোধন করে বলেছেন-
ثُمَّ جَعَلْنَـٰكَ عَلَىٰ شَرِيعَةٍ مِّنَ ٱلْأَمْرِ فَٱتَّبِعْهَا وَلَا تَتَّبِعْ أَهْوَاءَ ٱلَّذِينَ لَا يَعْلَمُونَ
তারপর আমি আপনাকে দ্বীনের এক বিশেষ পথের ওপর প্রতিষ্ঠিত করেছি। সুতরাং, আপনি শরিয়তের অনুসরণ করেন। যারা জানে না, তাদের প্রবৃত্তির অনুসরণ করবেন না।
এখানেও আল্লাহ তাআলা দুই ভাগ করেছেন। প্রথমটি শরিয়ত, আল্লাহ তাআলা যার ওপর তাঁর রাসুলকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন, সাথে যে অনুযায়ী আমল করার আদেশ দিয়েছেন। আর দ্বিতীয়টি, যারা জানে না তাদের প্রবৃত্তি ও খাহেশাত, যা থেকে তিনি নিষেধ করেছেন। আল্লাহ জাল্লা শানুহু আরও বলেন-
ٱتَّبِعُوا۟ مَآ أُنزِلَ إِلَيْكُم مِّن رَّبِّكُمْ وَلَا تَتَّبِعُوا۟ مِن دُونِهِۦٓ أَوْلِيَآءَ ۚ قَلِيلًا مَّا تَذَكَّرُونَ
তোমরা অনুসরণ করো ওই সকল বিধান, যা অবতীর্ণ করা হয়েছে তোমাদের প্রতি তোমাদের রবের পক্ষ থেকে। তিনি ছাড়া অন্য কোনো অভিভাবকের অনুসরণ করো না। খুব কমই তোমরা উপদেশ গ্রহণ করো।
এখানে, আল্লাহ তাআলা শুধু তাঁরই পক্ষ থেকে অবতীর্ণ বিধান অনুসরণ করতে বলেছেন। এছাড়া অন্য সব থেকে নিষেধ করেছেন। আর তিনি এটাও বলে দিয়েছেন, যারা কুরআন ব্যতীত অন্য পথ অনুসরণ করবে, তারা মূলত আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও পূজায় লিপ্ত!
এছাড়াও কুরআন খুবই জোরালো ভাষায় ওই সকল আইন-কানুনকে নিষিদ্ধ বলে ঘোষণা করেছে, যা শরিয়তের বিপরীত কিংবা এর মৌলিক বিধিবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক, অথবা সরাসরি মূল শরিয়তের সাথেই বিরোধপূর্ণ। তেমনিভাবে আল্লাহ তাআলা শরিয়ত ব্যতীত অন্য যেকোনো আইন-কানুনের ওপর আমল করতেও নিষেধ করেছেন। এরপরও যে মানবরচিত বিধিবিধানের অনুসরণ করল, সে মূলত নিজের খাহেশাতকেই অনুসরণ করল। আর তাকে কুরআন 'কাফির' ও 'জালিম' বলে আখ্যা দিয়েছে।
দুই.
আল্লাহ তাআলা কোনো মুমিনকে এই সুযোগ দেন নি যে, সে চাইলেই অন্য কোনো শাসন-ব্যবস্থার পেছনে ছুটবে। বরং, তিনি কুরআনি শাসন ছাড়া অন্য যেকোনো শাসন-ব্যবস্থাকে উপেক্ষা করার আদেশ দিয়েছেন। কিন্তু যে ব্যক্তি উপেক্ষার পরিবর্তে অন্য কোনো শাসন-ব্যবস্থার প্রতি সন্তুষ্ট থাকল, আল্লাহ তাআলা তাকে চূড়ান্তভাবে বিপথগামী শয়তানের অনুচর বলে সাব্যস্ত করেছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন,
أَلَمْ تَرَ إِلَى الَّذِينَ يَزْعُمُونَ أَنَّهُمْ آمَنُوا بِمَا أُنزِلَ إِلَيْكَ وَمَا أُنزِلَ مِن قَبْلِكَ يُرِيدُونَ أَن يَتَحَاكَمُوا إِلَى الطَّاغُوتِ وَقَدْ أُمِرُوا أَن يَكْفُرُوا بِهِ وَيُرِيدُ الشَّيْطَانُ أَن يُضِلَّهُمْ ضَلَالًا بَعِيدًا (٦٠)
'তুমি কি ওই ব্যক্তিদের লক্ষ্য করোনি, যারা মনে করে—তারা ঈমান এনেছে ওই বিধানের প্রতি, যা আপনার ওপর অবতীর্ণ করা হয়েছে, এবং যা আপনার পূর্বে অবতীর্ণ করা হয়েছে! আবার তারাই তাগুতের কাছে বিচার নিয়ে যায়! অথচ তাদের আদেশ করা হয়েছে তাগুতকে অস্বীকার করার! মূলত শয়তান তাদেরকে চূড়ান্তভাবে গোমরাহ করতে চায়।' এই আয়াতে কারিমা থেকে সাব্যস্ত হলো, যে ব্যক্তি কুরআন-সুন্নাহ ব্যতীত অন্য কোনো শাসন-ব্যবস্থার কাছে ধরা দিল, সে প্রকৃতপক্ষে তাগুতের কাছেই ধরা দিল! আর তাগুত বলা হয় ওই সমস্ত জিনিসকে, যার মাধ্যমে বান্দা তার নির্ধারিত পরিসীমা অতিক্রম করে—তা উপাস্য হওয়ার মাধ্যমে হোক, কিংবা অনুসৃত বা মাননীয় হওয়ার মাধ্যমে।
সুতরাং, প্রত্যেক জাতির তাগুত বলে ওই ব্যক্তিকে বোঝানো হবে, আল্লাহ ও তাঁর রাসুল ব্যতীত যার কাছে তারা মামলা-মোকাদ্দামা নিয়ে যায়; কিংবা ওই ব্যক্তিকে, তারা যার পূজা করে। অথবা আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে কোনো প্রমাণ ছাড়াই তাকে অনুসরণ করে, কিংবা আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের আনুগত্যের পরিবর্তে কোনো বিষয়ে তাকে মান্য করে।
উপরের আলোচনা থেকে বোঝা যায়-কেউ আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের প্রতি ঈমান আনার পর তার আর এই সুযোগ থাকে না যে, সে অন্য কারও ওপর ঈমান আনবে, অথবা অন্য কারও বিধিবিধান গ্রহণ করবে!
তিন.
আল্লাহ তাআলা কোনো মুমিন-মুমিনাকে এই অধিকার দেন নি যে, সে নিজের খেয়াল-খুশিমতো বিধান প্রণয়ন করবে; কিন্তু যদি কেউ নিজের খেয়াল-খুশিমতো বিধান প্রণয়ন করে, তাহলে সে বিপথগামী বলে গণ্য হবে। এতে প্রমাণিত হবে যে, তার অন্তরে ঈমানের কোনো চিহ্নই নেই। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলেন-
وَمَا كَانَ لِمُؤْمِنٍ وَلَا مُؤْمِنَةٍ إِذَا قَضَى اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَمْرًا أَن يَكُونَ لَهُمُ الْخِيَرَةُ مِنْ أَمْرِهِمْ وَمَن يَعْصِ اللَّهَ وَرَسُولَهُ فَقَدْ ضَلَّ ضَلَالًا مُّبِينًا (৩৬)
আর আল্লাহ ও তাঁর রাসুল কোনো বিষয়ের ফায়সালা দিলে কোনো মুমিন-মুমিনার জন্য সে বিষয়ে তাদের কোনো (ভিন্ন সিদ্ধান্তের) ইখতিয়ার সংগত নয়।
চার.
আল্লাহ তাআলা আদেশ করেছেন, হুকুম বা শাসন যেন কুরআন-সুন্নাহ অনুযায়ী হয়। এ বিষয়ে আল্লাহ তাআলা বলেন-
إِنَّا أَنزَلْنَا إِلَيْكَ الْكِتَابَ بِالْحَقِّ لِتَحْكُمَ بَيْنَ النَّاسِ بِمَا أَرَاكَ اللَّهُ ، وَلَا تَكُن لِلْخَائِنِينَ خَصِيمًا
আমি নিঃসন্দেহে আপনার ওপর কিতাব অবতীর্ণ করেছি সত্য সহকারে; যাতে আপনি মানুষের মাঝে ফায়সালা করেন ওই পদ্ধতিতে, যা আল্লাহ আপনাকে প্রদর্শন করেছেন।
আল্লাহ তাআলা আরও বলেন-
وَأَنِ احْكُم بَيْنَهُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهِ
আর আপনি তাদের মাঝে ফায়সালা করেন ওই বিধান অনুযায়ী, যা আল্লাহ অবতীর্ণ করেছেন। আর যারা আল্লাহর বিধান অনুযায়ী ফায়সালা করে না, আল্লাহ তাআলা তাদেরকে 'কাফির', 'জালিম', ও 'ফাসিক' বলে আখ্যায়িত করেছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন-
وَمَن لَّمْ يَحْكُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ فَأُولَئِكَ هُمُ الْكَافِرُونَ ..
আর যারা আল্লাহর নাজিলকৃত বিধান অনুযায়ী ফায়সালা করে না, তারাই হলো 'কাফির'।
আল্লাহ তাআলা আরও বলেন-
وَمَن لَّمْ يَحْكُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ فَأُولَئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ ..
আর যারা আল্লাহর নাজিলকৃত বিধান অনুযায়ী বিচার করে না, তারাই হলো 'জালিম'।
তিনি আরও বলেন-
وَمَن لَّمْ يَحْكُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ فَأُولَئِكَ هُمُ الْفَاسِقُونَ (٤٧)
আর যারা আল্লাহর বিধান অনুযায়ী শাসন করে না, তারাই হলো 'ফাসিক'।
উল্লিখিত আয়াতে কারিমা থেকে সাব্যস্ত হয় যে, গোটা সৃষ্টির ওপর প্রকৃত ক্ষমতা শুধু আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার। আর যেকোনো রাষ্ট্রেই মুসলিম শাসকদের কর্তব্য হলো-এই প্রকৃত ক্ষমতার সামনে নত হওয়া। কেবল তাহলেই ইসলামি নেতৃত্ব থেকে মুক্ত হবে গণতন্ত্র নামক অন্ধকার থেকে, যার মূল ভিত্তিই হলো জনগণ সকল ক্ষমতার উৎস। অতএব, গণতন্ত্রের মাধ্যমে তারা তাদের নিজেদের খেয়াল খুশিমতো যেকোনো আইন প্রণয়নের সুযোগ পাবে। তাদের কোনো মৌলিক নিয়মনীতি অনুসরণও করতে হবে না, এমনকি তারা কুরআন-সুন্নাহ পরিপন্থী বিধান প্রণয়নেরও সুযোগ পাবে।
পাঁচ.
কুরআন-সুন্নাহ যেমন শাসকদের আনুগত্যের সীমা-পরিসীমা নির্ধারণ করে দিয়েছে, তেমনি কুরআন-সুন্নাহর সাথে সাংঘর্ষিক বিষয়ে তাদের আনুগত্য করতে নিষেধ করেছে! রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে সহিহ সূত্রে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন-
لا طاعة لمخلوق في معصية الخالق
'স্রষ্টার নাফরমানির ক্ষেত্রে সৃষ্টির আনুগত্য করার বৈধতা নেই।' তিনি আরও বলেন-
إنما الطاعة في المعروف
'আনুগত্য শুধু ভালো ও বৈধ ক্ষেত্রেই করা যাবে।' রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নেতৃবর্গ সম্পর্কে বলেন-
السمع والطاعة على المرء المسلم فيما أحب وكره ما لم يؤمر بمعصية فإذا أمر بمعصية فلا سمع ولا طاعة ...
একজন মুসলিমের কর্তব্য হচ্ছে, (শাসকদের কথা) শোনা ও মান্য করা-চাই সেটা পছন্দনীয় হোক বা অপছন্দনীয়, যতক্ষণ না তাকে অবাধ্যতার আদেশ করা হয়। তাকে যখন অবাধ্যতার আদেশ করা হবে, তখন (তাদের কথা) শোনাও যাবে না, মানাও যাবে না।' তিনি আরও বলেন-
إنه سيلي أمركم من بعدي رجال يطفئون السنة ويحدثون بدعة ويؤخرون الصلاة عن مواقيتها قال ابن مسعود يا رسول الله كيف بي إذا أدركتهم قال ليس يبنى ام عبد طاعة لمن عصى الله، قالها ثلاث مرات
নিঃসন্দেহে আমার পর তোমাদের শাসন-ব্যবব্যবস্থা এমন কিছু লোক গ্রহণ করবে, যারা সুন্নাহকে নিভিয়ে দেবে, বিদআত চালু করবে এবং নামাজকে নির্দিষ্ট সময় থেকে বিলম্বিত করবে! ইবনু মাসউদ রা. বললেন- 'ইয়া রাসুলাল্লাহ, আমি যদি তাদের পাই, তাহলে কী করব?' তিনি বললেন-'হে উম্মু আবদের সন্তান, শোনো, যে আল্লাহর অবাধ্যতা করে তার কোনোরূপ আনুগত্য করা যাবে না।' তিনি কথাটি তিনবার বললেন।
ছয়.
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পর আনুগত্য শুধু কুরআন- সুন্নাহর সীমানাতেই হবে, এর বাহিরে নয়। তদুপরি উম্মাহর ফুকাহায়ে কিরাম ও মুজাতাহিদিনে ইজমা সবাই এ বিষয়ে একমত যে, কেবল আল্লাহ তাআলার আদেশকৃত বিষয়েই আনুগত্য ওয়াজিব। আবার, তাদের মাঝে এ বিষয়েও কোনো মতবিরোধ নেই যে, স্রষ্টার অবাধ্যতার ক্ষেত্রে সৃষ্টির আনুগত্যের বৈধতা নেই। তাদের মাঝে এ ব্যাপারেও কোনো মতবিরোধ নেই যে, কোনো হারাম জিনিস তথা জিনা ও নেশা হালাল করা, হদ বাতিল করতে চাওয়া, ইসলামি বিধিবিধান তুলে ফেলা, আল্লাহ তাআলার আদেশ অমান্য করে নতুন কিছু উদ্ভাবন করা—এসব তো কুফুর ও ধর্মদ্রোহিতারই নামান্তর!
এ বিষয়েও সবাই একমত যে, শাসক যখন কাফির বা মুরতাদ হয়ে যায়, তখন তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা মুসলিমদের ওপর ওয়াজিব!
বিদ্রোহ করার সবচেয়ে নিম্নস্তর হলো, তার আদেশ-নিষেধের অবাধ্যতা করা, ইসলামের সাথে বিরোধপূর্ণ বিষয়ে তোষণ না করা! আল্লাহ তাআলাই ভালো জানেন, তিনিই হিদায়াতের পথ দেখান।
সাত.
আকল এবং বিবেক-বুদ্ধির দাবিও এটাই যে, প্রত্যেকটি জিনিসের সংশোধনের নিয়ন্ত্রণে তিনিই থাকবেন, যিনি ওই জিনিস বানিয়েছেন। কারণ, তিনিই তার স্বভাব, শক্তি ও দুর্বলতা সম্পর্কে জানেন। কীসে তার ভালো বা মন্দ, সেটাও তিনি ভালো করে জানেন! আর এটা সুবিদিত যে, গোটা বিশ্ব আল্লাহ তাআলারই সৃষ্ট! সুতরাং, সুস্থ মস্তিষ্কের দাবি এটাই যে—বিশ্বজগতের কর্মবিধায়ক এবং তার সংশোধনে সক্ষম একমাত্র আল্লাহ তাআলা, অন্য কেউ নয়। আল্লাহ তাআলা বলেন—
وَمَن يَبْتَغِ غَيْرَ الْإِسْلَامِ دِينًا فَلَن يُقْبَلَ مِنْهُ وَهُوَ فِي الْآخِرَةِ مِنَ الْخَاسِرِينَ
আর যে ইসলাম ব্যতীত অন্য কোনো ধর্ম তালাশ করবে, তার থেকে সে ধর্ম কিছুতেই গ্রহণ করা হবে না। আর সে আখিরাতে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে।
এখানে, আল্লাহ তাআলা সুস্পষ্টভাবে বলেছেন, যে ব্যক্তি ইসলাম ব্যতীত অন্য কোনো ধর্মাবলম্বী হবে, সেই ধর্ম যেমন অগ্রহণযোগ্য হবে, তেমনিভাবে সে নিজেও ক্ষতিগ্রস্ত হবে! আর ক্ষতিগ্রস্ত দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, সাওয়াব থেকে বঞ্চিত হওয়া। দুনিয়ার নেক আমলগুলো হাতছাড়া করা। আর যে ব্যক্তি বাতিল ধর্মের জন্য দৌড়ঝাঁপ করবে, তার জন্য আফসোস ও আক্ষেপ তো থাকবেই!
ইসলামি আইন-কানুন তথা আল্লাহ তাআলা যে সকল বিধিবিধান প্রণয়ন করেছেন, সেগুলোর উদ্দেশ্য হলো—ব্যক্তিগত ও সামাজিকভাবে মানুষের উপকার করা ও সংশোধন! আল্লামা ইবনুল কায়্যিম রাহিমাহুল্লাহ বলেন- 'শরিয়তের ভিত্তিই হলো শাসন- ব্যবস্থা এবং দুনিয়া ও আখিরাতে বান্দার কল্যাণ! আর এই শরিয়ত পুরোটাই ইনসাফপূর্ণ, রহমতে ভরপুর, কল্যাণ দ্বারা সুসজ্জিত এবং প্রজ্ঞা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। সুতরাং, যে সকল বিষয় ইনসাফের পরিবর্তে জুলুমপূর্ণ, রহমতের পরিবর্তে কষ্টকর, কল্যাণের পরিবর্তে ক্ষতিকর এবং প্রজ্ঞার পরিবর্তে অনর্থক হবে; সেটা শরিয়ত বলে বিবেচিত হবে না, যদিও ভুল ব্যাখ্যা করে তাকে শরিয়ত বলে প্রচার করা হয়!'
মোটকথা, শরিয়ত হলো বান্দাদের মাঝে আল্লাহ তাআলার ইনসাফ, সৃষ্টির মাঝে তাঁর রহমত, জমিনে তাঁর ছায়া। আর আল্লাহ তাআলার প্রজ্ঞাই হলো আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের সত্যতার জন্য সবচেয়ে পূর্ণাঙ্গ ও বাস্তবসম্মত দলিল। সেই প্রজ্ঞা দ্বারা উদ্দেশ্য-আল্লাহ তাআলা থেকে প্রসারিত আপন নূর, যা দ্বারা অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন ব্যক্তিরা অন্তর্দৃষ্টি লাভ করেছে, তাঁর দান করা হিদায়াত দ্বারা হিদায়াতপ্রাপ্ত লোকেরা হিদায়াতপ্রাপ্ত হয়েছে, তাঁর পূর্ণাঙ্গ শিক্ষার মাঝে রয়েছে প্রত্যেক রোগের নিরাময়, তাঁর দেখানো সরল পথের ওপর কেউ অটল থাকা মানে সঠিক পথের ওপরই অটল থাকা।
সুতরাং এই শরিয়ত হলো, মানুষের চোখের শীতলতা, প্রাণের সুধা এবং হৃদয়ের প্রশান্তি। এখান থেকেই লাভ করা যাবে অন্তরের খোরাক, ওষুধ ও আরোগ্য, আলো এবং শুদ্ধতা! জগতে যত কল্যাণ নিহিত রয়েছে, তা শুধু এই শরিয়ত থেকে লাভ করা যাবে। এর মাধ্যমেই পাওয়া যাবে। আর জগতে যত ত্রুটি-বিচ্যুতি আছে, তার একমাত্র কারণ এই শরিয়তকে বিফল করার অপচেষ্টা। এই শরিয়তের কিছু রসম- রেওয়াজ ও রীতিনীতি না থাকলে এই দুনিয়া কবেই বিরান হয়ে যেত। পুরো জগৎ ধ্বংস হয়ে যেত।
সুতরাং, এই শরিয়তেই হলো মানুষের রক্ষার মাধ্যম। এই পুরো জগতের ভিত্তি। এর বরকতেই আল্লাহ তাআলা আসমান ও জমিনকে বিচ্যুত হওয়া বা নড়বড়ে হওয়া থেকে বিরত রেখেছেন। অবশ্য আল্লাহ তাআলা যখন বিশ্বজগৎ ধ্বংস করার ইচ্ছা করবেন, তখন শরিয়তের অবশিষ্ট সেই সামান্য রসম-রেওয়াজও দুনিয়া থেকে উঠিয়ে নেবেন।
সুতরাং, এই শরিয়ত দিয়ে আল্লাহ তাআলা তাঁর রাসুলকে পাঠিয়েছেন। আর এটাই হলো জগতের খুঁটি। সফলতার রাজতোরণ। দুনিয়া ও আখিরাতে সৌভাগ্যের মাধ্যম।
টিকাঃ
* সূরা কাসাস, আয়াত: ৫০
* সূরা সোয়াদ, আয়াত: ২৬
* সূরা জাসিয়া, আয়াত: ১৮
* সূরা আরাফ, আয়াত: ৩
* সূরা নিসা, আয়াত: ৬০
* সূরা আহজাব, আয়াত: ৩৬
২০ সূরা নিসা, আয়াত: ১০৫
* সূরা মায়িদা, আয়াত: ৪৯
২২ সূরা মায়িদা, আয়াত: ৪৪
২০ সূরা মায়িদা, আয়াত: ৪৫
২৪ সূরা মায়িদা, আয়াত: ৪৭
* মুসান্নাফু ইবনি আবি শাইবা, ৩৩৭১৭
** সহিহ বুখারি, ৭১৪৫
২৭ সহিহ বুখারি, ৭১৪৪
* মুসনাদু আহমাদ, ৩৭৯০
* সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ৮৫