📘 ইসলামী রাষ্ট্রে অমুসলিম নাগরিকের অধিকার ও মর্যাদা > 📄 অমুসলিমদের অধিকার সংরক্ষণে মুসলিম শাসকগণের ভূমিকা

📄 অমুসলিমদের অধিকার সংরক্ষণে মুসলিম শাসকগণের ভূমিকা


রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর ওফাতের পর তাঁর সরাসরি খলীফাগণ অমুসলিমদের অধিকার আদায়ে প্রতি যত্নবান ছিলেন। তাঁরাও রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর মত ইসলামী রাষ্ট্রে অমুসলিমদের সাথে পারস্পরিক সৌহার্দ্য ও সদ্ভাবের সাথে বসবাস করার দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন। তাঁরা অমুসলিম অধিবাসীদের অধিকার ও স্বাধীনতা এভাবে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন যে, মানবাধিকারের ইতিহাসে তার নজীর অভূতপূর্ব।
হযরত আবু বকর (রা) অমুসলিমদের অধিকার রক্ষার ব্যাপারে খুব বেশি সচেতন ছিলেন। একবার তিনি জানতে পারলেন, ইয়ামামার গর্ভধারিণী মজুবির ইবনু আবী উমাইয়াহ মুসলিমদেরকে বিছিন্ন করে গুরুত্বপূর্ণ চাপাবানানে অভিযুক্ত জনৈকা অমুসলিম মহিলার হাত কর্তন করেছেন এবং দাঁত উপড়ে ফেলেছেন, তখন হযরত আবু বকর (রা) তাঁকে ভর্ৎসনা করে পত্র লিখেন,
أَمَّا بَعْدُ فَلْيَمُنِّي أَنْ تُكَلِّفَ اِمرَأَةٌ فِي أَنْ تَهَبَ الْحِسَاءَ الْمُسْلِمِينَ وَرَفَعَتْ تَبَنَّتُهَا فَإِنْ كَانَتْ مَبْتَدَأَ وَفْهُمُ الظَّنِّ وَإِنْ كَانَتْ وَثَبَتْ فَلْتُغْرِي لَمَّا صَفَّتْ عِنْدَ مِنْ أَعْرَادِ الْعَطَاءِ. وَهَذَا سَهْلٌ لِّمَن تَأَمَّلَ
“আমার কাছে খবর পৌঁছেছে, মুসলিমদের বিরুদ্ধে রুটনা করার কারণে তুমি এক মহিলার হাত কর্তন করেছ এবং দাঁত উপড়ে ফেলেছ। এ কাজ মোটেই ঠিক হয়নি। কারণ সে মুসলিম দলভুক্ত হলে তাকে সতর্কীকরণই যথেষ্ট ছিল। আর মিথ্যাচরণ তো শিরক মিশ্রিত এবং আল্লাহর বিরুদ্ধাচরণ করেছ। তবু আমরা তাদের এ রায়ে বাধ্য করে দিয়েছি। এমতাবস্থায় মুসলিমদের বিরুদ্ধে প্রতারণা ভয়ানক কোন অপরাধ নয়।” -সর্বশেষে তিনি এটাও লিখেন যে, `وَهَذَا سَهْلٌ لِّمَن تَأَمَّلَ`। “তোমার এই অন্যায় যেহেতু প্রথম, তাই এবারের মতো মার্জনা করা হল। নতুবা এর জন্য তোমাকে কঠোর সাজা ভোগ করতে হবে।” ১৫৯
হযরত উমার (রা) তাঁর গভর্নরদেরকে অমুসলিম নাগরিকদের অধিকার পূরণ করতে, তাদের রক্ষায় জন্য লড়াই করতে এবং তাদের ওপর সাধ্যের বাইরে কিছু না চাপাতে নির্দেশ দেন। ১৬০ জেরুসালেম যখন বালিকা উমার (রা)-এর কাছে আত্মসমর্পণ করে, তখন এ বিজিত নগরীর অধিবাসীদের ধর্ম ও সম্পদ তাদের হাতেই ছিল এবং তাদের উপাসনালয়ও অক্ষুণ্ণ ছিল। খ্রিস্টানদের এবং তাদের প্রধান যাজক ও তার অনুসারীদের বসবাসের জন্য নগরের একটি এলাকা ছেড়ে দেওয়া হল। বিজয়ী মুসলিমরা এ পবিত্র নগরীতে তাদের ধর্মীয় অধিকার খর্ব তো করলই না; বরং উৎসাহিত করল। ৪৩০ বছর পর জেরুসালেমের খ্রিস্টীয় ধর্মযাজকদের মাধ্যমে খ্রিস্ট শাসনে চলে গেলে প্রাচ্যের খ্রিস্টানরা সদাসয় বালিকার শাসনের অবসানে অনুশোচনা করেছিল। গ্রীস থেকে ওমান পর্যন্ত বিশাল ভূখণ্ডের অধিবাসী পাখীরা তাদের আবাসভূমি ছেড়ে মুসলিম বিজয়ের ধর্মাধ্বন গ্রহণ করেছিল এবং আফ্রিকার আফ্রিকা অঞ্চল থেকে কার্যকর পূর্বেই ইসলাম পৌছার সাথে সাথে খ্রিস্টান ধর্ম একেবারে বিলীন হয়ে যায়। এ বিশাল এলাকা জুড়ে এ ধর্মবিজয়ের কারণ নতুন ধর্ম সহনশীলতার অভাব নয়; পুরাতন ধর্মবিশ্বাসীদের জীবন ও ধর্ম বিলুপ্তির কারণও পরিমিত। ইসলামের দীর্ঘ ইতিহাসে কোথাও কোন অমুসলিমকে স্বধর্ম ত্যাগ করানে ইসলাম গ্রহণ করার জন্য জোর করা হয়েছে-এর কোন নজীর নেই। টমাস আর্নল্ড বলেছেন, “অমুসলিমদেরকে জোরপূর্বক ইসলাম গ্রহণ করাবার কোন প্রচেষ্টা কিংবা খ্রিস্টান ধর্ম নির্মূল করবার উদ্দেশ্যে কোন নির্যাতনও কখনও আমি শুনিনি।” ১৬১ ঐতিহাসিক ফিনলে বলেন, “যেখানে আরবরা কোন খ্রিস্টান দেশ জয় করেছে সে ক্ষেত্রে ইতিহাস প্রমাণ করে যে, বিজিত দেশের জনগণ ইসলামের দ্রুত প্রসারে প্রতি সমর্থন জানিয়েছে। দু'জনলোক যে, অধিকাংশ খ্রিস্টানরা সরকারের শাসনব্যবস্থা বিজয়ী আরবদের চেয়ে দুর্বিষহ ছিল। সিরিয়ার জনগণ মুজাহেদের আনুগত্য জানাতো। মিশরীয় খ্রিস্টানরা তাদের দেশ আরবদের অধীনে নিয়ে যেতে সাহায্য করল। আর আফ্রিকার খ্রিস্টান বারবারা তো মুসলিমদেরকে আফ্রিকা বিজয়ে অনুপ্রেরণা করেছিল। কন্সটান্টিনোপাল সরকারের বিরুদ্ধে এ দেশগুলোর তীব্র ঘৃণার জন্য তারা মুসলিম শাসককে বরণ করে নিল।” ১৬২
এ কথা অনস্বীকার্য যে, পরবর্তী রাজ্যত্নুলে মুসলিম অমুসলিমদের অনেক জায়গায় যুলম ও নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন। তবে মদিনাতে কোথাও অমুসলিমদের সাথে আচরণ করা হয়েছে, তাদের অধিকার ক্ষুণ্ণ হয়েছে, তখন মুসলিম মনীষীগণ সর্বদা মজলুম অমুসলিমদের পক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন।
বর্ণিত রয়েছে যে, উমাইয়াহ শাসক ওয়ালীদ ইবন আবদুল মালিক দাফয়ের ইউহান্না গীর্জারপুর্ব দিকে নিনিয়ের মাসজিদের অস্তিত্বও রদ করে নিয়েছিলেন। হযরত উমার ইবন আবদিল আযীয় (রহ.) ক্ষমতায় এসে খ্রিস্টানদের এ ব্যাপারে তাঁর কাছে অভিযোগ করল। তিনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে লিখে পাঠালেন, মাসজিদের যে উঁচু অংশ গীর্জার জায়গার উপর নির্মাণ করা হয়েছে, তা ভেঙ্গে খ্রিস্টানদের হাতে সোপর্দ করে দাও। ১৬৩
অপর একজন অমুসলিম একদিন ওয়ালিদ উমার ‘আবদিল আযীয় (রহ)-এর দরবারে আপীল করে যে, আব্বাস ইবনুল ওয়ালীদ অন্যায়ভাবে তার ভূমি দখল করে রেখেছে। ওয়ালীদ ‘আবাসকে জিজ্ঞেস করেন : “এ অমুসলিম ব্যক্তির দাবীর ব্যাপারে তোমার বক্তব্য কি? আব্বাস জবাব দিল, “আমার পিতা ওয়ালীদ এ ভূমি আমার জায়গীরদারীতে অর্পণ করেছেন।” এ কথা শুনে অমুসলিম ব্যক্তিটি বলল, “আমাকুল মু’মিনীন! আপনি আল্লাহর কিতাবের অনুসারী কায়সালাম করুন।” ওয়ালীদ বললেন, “আব্বাস! আল্লাহর কিতাব অনুসারী অমুসলিমদের ভূমি জোর দখল করতে তাতে জায়গীরদারী দেওয়া যায় না।” আব্বাস বললো, “আপনার কথা সত্য; কিন্তু আমার নিকট ওয়ালীদ এর অধিকার প্রমাণপত্র রয়েছে। আপনার পূর্বের একজন খলিফার ফরমান রদ করার কী অধিকার আপনার আছে?” ওয়ালীদ জবাব দিলেন,
نَعَم، كِتَابُ اللَّهِ أَحَقُّ أَنْ يُتْبَعَ مِنْ كِتَابِ الْوَلِيدِ. فَمَا فَارْزُدَهُ عَلَيْهِ.
“ওয়ালিদের প্রমাণপত্রের চাইতে আল্লাহর কিতাবই অধিকতর উঁচ এবং তুমি অমুসলিমকে ফেরৎ দিয়ে দাও।” ১৬৪
ইমাম আবু ইউসুফ (রা.) 'আকাসীয়া খালীফা হারুনুর রশীদকে ওসিয়ত করেন, "অমুসলিম নাগরিকদের সাথে সদয় আচরণ করবেন, তাদের খোঁজ-খবর নেবেন, যাতে তারা কোন রূপ অন্যায়-অবিচার্যের সম্মুখীন না হয়, কষ্টে পড়ে না যায়, সাধ্যের বাইরে তাদের ওপর যেন কোন বোঝা চাপানো না হয় এবং অন্যায়ভাবে তাদের থেকে কোন সম্পদ যেন গ্রহণ করা না হয়।" ১৬৩

টিকাঃ
১৫৯. বুখারী, তারীখুল উসাম ওয়াল ফুআদ খ.২, পৃ. ৫০১
১৬০. আল-সা’আদাবী, কিতাবুল খুলাফা, হা.নং : ১৬৫২
১৬১. আর্নল্ড, অফ-ডিপেন্ডিং কুনান দিয়াবলু, খ.১, পৃ. ১০৯
১৬২. নাজিফ, দ্রুততত্ত্ব, পৃ.১৯৮ (Finlay-এর History of the Byzantine Empire গ্রন্থ থেকে সংগৃহীত)
১৬৩. আল-বালাদুর, ফুতুহুল বুলদান, হা.নং : ১৩৯২
১৬৪. ইবনু কাসীর, আল-বিদায়াতু ওয়াল নিহায়াহ, খ.৬, পৃ. ২৯৩
১৬৩. আবু ইউসুফ, কিতাবুল খারাজ, পৃ.৭১

📘 ইসলামী রাষ্ট্রে অমুসলিম নাগরিকের অধিকার ও মর্যাদা > 📄 অমুসলিম গবেষক ও চিন্তাবিদদের মতামত

📄 অমুসলিম গবেষক ও চিন্তাবিদদের মতামত


ক. ইসলামের প্রাথমিক কাল সামনে খ্রিস্টানরা হযরত আবু উবায়দাহ ইবনুল জাররাহ (রা)কে উদ্দেশ্য করে লিখেন,
يَا مَعْشَرَ الْمُسْلِمِينَ أَنْتُمْ أَحَبُّ إِلَيْنَا مِنَ الرُّومِ وَإِنْ كَانُوا عَلَى دِينِنَا لِأَنِّي أَرَى لَنَا وَإِنَّا بِإِزَاءِ وَأَكَدَ عَنْ ظُلْمِنَا وَأَحْسَنَ وِلَايَةٍ عَلَيْنَا.
“হে মুসলিম সম্প্রদায়! তোমরা আমাদের কাছে রোমানদের চাইতে অধিকতর প্রিয়, যদিও তারা আমাদের স্বধর্মী। কেননা তোমরা অধিকতর অধিকার রক্ষাকারী, দয়ালু, জুলম প্রতিহতকারী এবং আমাদের উত্তম শাসক।” ১৬৪
খ. বিশিষ্ট ঐতিহাসিক টমাস আর্নল্ড বলেন, “খ্রিস্টানরা মুসলিম সমাজে ধর্মীয় স্বাধীনতা মত জীবন ও ধন-সম্পদের পূর্ণ নিরাপত্তা ভোগ করত। বিশেষ করে বিলাতকারদের প্রাথমিক কালে শহরগুলোতে তারা সুখ-শান্তিপূর্ণ জীবন যাপন করত।” তিনি আরো বলেন, “আমরা যখন প্রাথমিক যুগে খ্রিস্টান প্রজাদের প্রতি মুসলিম সরকারের এমন বিস্ময়কর ন্যায়বিচার ও ধর্মীয় উদারতা দেখতে পাই, তখন দিনের আলোর মত স্পষ্ট হয়ে যায় যে, তরবারির জোরে ইসলামের প্রচার ও প্রসার সম্পর্কে যে প্রচারণা চালানো হয় তা আদৌ বিশ্বাস ও অনুসরণ করার যোগ্য নয়।” ১৬৫
গ. প্রখ্যাত জার্মান সেভিকা হল বলেন, “আরবরা বিজিত জাতিগুলোকে ইসলাম গ্রহণ করতে চাপ দেয়নি। অথচ যে সব খ্রিস্টান, যিহুদী ও ইযাইদীরা ইসলাম পূর্বকালে জঘন্যতম ও ঘৃণ্যতম ধর্মীয় গোঁড়ামী ও সংকীর্ণতার শিকড়ে আবদ্ধ ছিল, ইসলাম তাদের সকলকে কোন বাধ্য-বাধূ ছাড়াই তাদের নিজ নিজ ধর্ম-কর্ম পালনের স্বাধীনতা দান করে। অধিকন্তু মুসলিমরা তাদের উপাসনালয়, গির্জা, আশ্রমগুলোর কোনরূপ ক্ষতিসাধন করেনি। দুনিয়ার ইতিহাস এ জাতীয় আচরণ ও মহত্ত্বাবতা দেখেনি।... নতুন মুসলিম শাসক ও নৃপতিগণ বিজিত জাতিসমূহের কাজ-কারবারে কোন রূপ হস্তক্ষেপ করেনি।” খ্রিস্টীয় নবম শতাব্দীতে বাইতুল মুকাদ্দাসের প্রধান খ্রিস্টান ধর্মযাজক কন্সটান্টিনোপলের প্রধান ধর্মযাজককে 'আরবদের সম্পর্কে লিখেন, “তারা ন্যায় বিচারক। তারা কখনো কোন রূপ অবিচার করে না এবং আমাদের সাথে কোন ধরণের রূঢ় ও কঠোর আচরণ করে না।” ১৬۶
ঘ. গুস্তাব ল্য বন বলেন, “প্রকৃত পক্ষে 'আরবদের মত দয়ালু ও মহানুভব বিজেতা জাতি এবং তাদের ধর্মের মতো উদার প্রকৃতির কোন ধর্ম সম্পর্কে পৃথিবীবাশী অবহিত নয়।” ১৬৭ তিনি অমুসলিমদের সাথে মুসলিমদের আচরণ প্রসঙ্গে বলেন, “আরব সেনেরা মহান উদারতা ছাড়াও অনুপম সহিষ্ণুতা ও শৌর্য-বীর্যের অধিকারী ছিল। তারা দুর্বলদের প্রতি দয়া করত, বিজিতদের সাথে সদয় আচরণ করত এবং তাদের শর্তগুলো মেনে চলত। এ সকল গুণ পরবর্তীকালে খ্রিস্টান জাতিগুলো তাদের থেকে গ্রহণ করেছিল।” ১৬৮
ঙ. ফরাসী সাংবাদিক হেনরী ভি শ্যাম্পু বলেন, “পার্ল মাটির বাহিনীর যদি ক্রাসে আরব মুসলিমদের ওপর বিজয় লাভ না করত, তা হলে আমাদের দেশ মধ্যযুগে তত্সম্পূর্ণ হয়ে পড়ত না, বড় বড় দুর্য়োগের সম্মুখীন হত না এবং ধর্মীয় সংকীর্ণতার কারণে নিশ্চয়বদ্ধ সংঘাতও হত না। যদি বোয়ায়িয়ার মুসলিমদের ওপর বর্বরচিত্ত বিজয় সংঘটিত না হত, তা হলে স্পর্ধ ইসলামী মেহান মহান উদারতা দেখতে পেত এবং উন্নত বিভাগের লজ্জাকর কলঙ্ক থেকে রেহাই পেত। তত্পরি আট শতাব্দী কাল ধরে সভ্যতার অসংখ্য সিড়িঁতে পদত না। আমাদের যে বিজয় সম্পর্কে আমাদের অনুভূতি যা-ই হোক না কেন, জ্ঞান-বিজ্ঞান, শিল্প- কলা তথা আমাদের সভ্যতার সব কিছু জরা আমরা মুসলিমদের কাছে ঋণী এবং এ কথা আমাদের স্বীকার করতেই হবে যে, যে সময় আমরা চরম অসভ্য ও মূর্খ ছিলাম তখন তারা ছিল মানব সভ্যতার অনুপম দৃষ্টান্ত।” ১৬৯
চ. প্রাচ্যবিদ ডজি বলেন, “অমুসলিমদের প্রতি মুসলিমদের উদারতা ও সদয় আচরণ তাদেরকে ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট করেছে। তারা ইসলামের মধ্যে এমন সরলতা ও উদারতা দেখতে পেয়েছে, যা তারা তাদের পূর্ববর্তী ধর্মসমূহে কখনো দেখতে পায়নি।” ১৭০
ছ. প্রাচ্যবিদ বারোটো বলেন, “মুসলিম শাসনামসের সময় খ্রিস্টানদের অবস্থা ছিল সর্বোত্তম। মুসলিমরা ধর্মীয় ও অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে মানবিক মূল্যবোধ ও উদারতার নীতি মেনে চলত।” ১৭১
জ. প্রাচ্যবিদ ডিব্রান্ট বলেন, “অমুসলিম খ্রিস্টান, যিহুদী, ইযাহদী ও সাবীরা উমাইয়াহ খিলাফতের সময় এ ধরনের স্বাধীনতা ও অধিকার ভোগ করত, যার নজীর সে সময়ে আমরা খ্রিস্টান রাজ্যগুলোতে দেখতে পাইনি।” ১৭২
ঝ. আধুনিক কালের প্রখ্যাত আমেরিকান লেখক গ্যাস্থ গ্যাসিটারস বলেন, “ইসলামের নামে কঠোরতা প্রদর্শনের কোন স্থান প্রকৃত ইসলামে তো নেই; বরং তা শান্তির পথ। বাস্তবিকতা ইসলামের সম্পূর্ণ পরিপন্থী।” ১৭৩
ঞ. মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের খ্যাতনামা লেখক মি. ট্রেপার বলেন, “খালিফাদের শাসনামলে খ্রিস্টান ও ইযাহদী পন্ডিতদের শুধু মুখে সুখেই সম্মান করা হয়নি; তাদেরে বড় বড় পদে অধিষ্ঠিত করা হয়েছে এবং বড় বড় সরকারী দায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছে।” ১৭৪
ট. বিশিষ্ট ঐতিহাসিক মি. উইলস ইসলামী শিক্ষা নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে লিখেছেন, “ইসলামী শিক্ষা পৃথিবীতে ন্যায়বিচার ও অজনগোষ্ঠীর কর্মপন্থা অত্যন্ত চমৎকার্ভ এবং প্রতিষ্ঠা করেছে। সমাজে সদাচার ও উদারতার মনোভাব চালু করেছে। এ শিক্ষা অত্যন্ত উচ্চকাসের মানবতার কার্যোপযোগী শিক্ষা। এ শিক্ষা এমন সমাজ গড়ে তুলেছে, যেখানে তার পূর্ববর্তী যে কোন সমাজের তুলনায় নিষ্ঠুরতা ও জুলুম ন্যূনতম মাত্রায় পরিলক্ষিত হয়েছে। ইসলাম আসলে নম্রতা, সহনশীলতা, সুন্দ আচরণ ও সৌভ্রাতৃত্বের বলেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।” ১৭৫
ঠ. প্রখ্যাত ওলন্দাজ সমালোচক ডাহুই মুসলিম শাসকদের প্রতি হযরত আবূ বাকর (রা)-এর নির্দেশনার প্রশংসা করে বলেন, “প্রকৃত পক্ষে সিরিয়ার লোকজন 'আরবদের দিকে ঝুঁকে পড়েছিল। আর এটা হওয়া ই অনিবার্য ছিল। কেননা আরববা বিজিত এলাকার জনসাধারনের সাথে যে ব্যবহার করেছে তার সাথে যদি সেখাকার পূর্ববর্তী শাসকদের নীতিহীন মূলেনের তুলনা করা হয়, তা হলে আসাম-ধানার কার্যক পরিলক্ষিত হবে। সিরিয়ার যে সমস্ত খ্রিস্টান কালসী ডন (Chalee Don)কে মানত না, রোম সম্রাটের নির্দেশে তাদের নাক, কান কর্তন করা হত, ঘর-বাড়ি ধ্বংস করে দেওয়া হত। অথচ আরবের নতুন শাসকরা হযরত আবু বাকর (রা)-এর হিদায়াত অনুযায়ী স্থানীয় বাসিন্দাদের মন-প্রাণ কেড়ে নিয়েছিলেন! তাঁরা নিজেদের কথা ও প্রতিশ্রুতি মূল্য দিতেন।...” ১৭৬

টিকাঃ
১৬৪. আল-বালাযূরী, ফুতুহুল বুলদান, খ.১, পৃ.৩০৯; আর্নল্ড, প্রাগুক্ত, পৃ.৭০
১৬৫. আর্নল্ড, প্রাগুক্ত, পৃ.২১০-২১১
১৬৬. ড. হান্সুল আরব ইদাজা'উ উলিল গরব, পৃ. ৩১৪
১৬৭. Le Bon, Dr. Gustave, La Civilisation des Arabes, (অনু. হান্নাহুল আরব), পৃ. ৭২০
১৬৮. প্রাগুক্ত, পৃ.০৪৪
১৬৯. আবদুর রহমান পাশা, সুওয়াদুন মিন হায়াতিত তাবিইন, পৃ. ৪২০
১৭০. ডাবরীজী সুলতান, তারিখু আদীনুল বিয়াহ কিল ইয়াছাক, পৃ.৭০ (ডোজির নবজাতক তাবী ইসলামিয়া (পৃ.৪১১) থেকে সংগৃহীত)
১৭১. ডাবরীজী সুলতান, তারিখু আদীনুল বিয়াহ কিল ইয়াছাক, পৃ.২৪০ (বারোটো আল-হাদারাাতুল ইসলামিয়া (পৃ.১৫) থেকে সংগৃহীত)
১৭২. ডিব্রান্ট, কিসাতুল হাদারাাহ্ খ.৬, পৃ. ১00
১৭৩. কিবরি, গা সুবহা মুজাদাল ইয়াছিমি, পৃ.৪৬
১৭৪. নাজির, প্রাগুক্ত, পৃ. ১০৯
১৭৫. নাজির, প্রাগুক্ত, পৃ. ২১০-২১১
১৭৬. হাদীসুল্লা, প্রাগুক্ত, পৃ. ২৬১

📘 ইসলামী রাষ্ট্রে অমুসলিম নাগরিকের অধিকার ও মর্যাদা > 📄 উপসংহার

📄 উপসংহার


ইসলাম শান্তি ও মানবতার প্রতীক। শ্রেণী ও বর্ণ বৈষম্যহীন একটি আদর্শ সমাজ প্রতিষ্ঠাই ইসলামের উদ্দেশ্য। অন্য ধর্ম ও ধর্মাবলম্বীর প্রতি সহনশীলতা হচ্ছে এর অন্য বৈশিষ্ট্য। মাদীনার ইসলামী রাষ্ট্রে ইযাহদী ও পৌত্তলিক আর অপর দিকে মুসলিম জাতির মধ্যে সম্পাদিত মৈত্রী চুক্তিটি ছিল ধর্মীয় সহিষ্ণুতা, স্বাধীনতা ও নিরাপত্তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। অতঃপর ইসলাম যখন আরবের গণ্ডি পেরিয়ে বহির্বিশ্বে ক্রমে ক্রমে বিস্তার লাভ করছিল তখনও শাসনকারকদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল, কোন অবস্থাতেই যেন অমুসলিমদের অধিকার ক্ষুন্ন না হয়, তাদের জীবন-সম্পত্তি, ইযযাত- আব্রুর নিরাপত্তা বিঘ্নিত না হয়। ইসলামই প্রকৃত অর্থে মানবিক সভ্যতা। ইসলামে দৃঢ়তে চামড়া সাদা বা কালো দেখা হয় না, দেখা হয় না কার কী রাষ্টের সকল নাগরিকই সমঅধিকার ও মর্যাদা ভোগ করবে- এই হল ইসলামের সুস্পষ্ট নীতি। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ অমুসলিমদেরকে ইসলাম যে পরিমাণ অধিকার ও মর্যাদা দান করে এ ঐতিহাসিকভাবে এর যে প্রমাণ রয়েছে, অন্য কোথাও তার বাস্তব নজীর পাওয়া দুষ্কর। বর্তমানকালের গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোতে সকলের সমান অধিকার ও মর্যাদার কথা বলা হয়, তবে তা হল কথার ফুলঝুরি মাত্র। এর বাস্তব নিদর্শন পৃথিবীবাশী আজও কোথাও দেখেনি। পৃথিবীর উন্নত রাষ্ট্রগুলোতে সংখ্যালঘুরা হরহামেশা বিভিন্ন ধরনের নির্যাতনের সম্মুখীন হচ্ছে, যা বলার অপেক্ষা রাখে না। এ কারণেই বলা হয়ে থাকে যে, “Democracy is in fact a visionary ideal, impossible of realization.” ১৭৭

টিকাঃ
১৭৭. Rodee, Introduction to political science, p.94

📘 ইসলামী রাষ্ট্রে অমুসলিম নাগরিকের অধিকার ও মর্যাদা > 📄 গ্রন্থপঞ্জী

📄 গ্রন্থপঞ্জী


আল-কুরআন
আবু বাকর ইবনু কাছীর, আবুল ফিদা ইসমাইল, তাফসীরুল কুরআনিল আযীম, রিয়াদ: দারু তাইয়্যিবাহ, ১৯৯৯ সন।
মাকত মুরাতান, মাতাবাতুল কুরআন, (অনু. ও সম্পা. : মাওলানা মুফতী উসীন খান), মাদীনা মুরাতান: খাসেলুল হারমাইন শরীফাইন বাদশাহ ফাহদ কুরআন মুদ্রণ প্রকল্প, ১৪২৩ হি.
বুখারী
বুখারী, মুহাম্মাদ ইবনু ইসমাইল, আল-সাহীহ, বৈরুত: দারু ইবনু কাছীর, ১৯৯৯
মুসলিম, আল-সাহীহ, বৈরুত: দারু ইয্যা ইবনু হাযারিল আরবী, তা.বি.
নাসায়ী, আহমাদ, আল-মুনজামুল সুগরা, বৈরুত: দারুল কুতুবিল ইলমিয়াহ, ১৪২৪
আবু দাউদ, সুলায়মান, আস-সুন্নান, বৈরুত: দারুল ফিকর, তা.বি.
তিরমিযী, আবু ঈসা মুহাম্মাদ, আল-জামি', বৈরুত: দারু ইয্যা ইবনু হাযারিল আরবী, তা.বি.
ইবনু মাজাহ, আবু 'আব্দিল্লাহ মুহাম্মাদ, আস-সুন্নান, বৈরুত: দারুল ফিকর, তা.বি.
ইমাম মালিক, আল-মুওয়াত্তা, মিশর: দারু ইয্যা ইবনু হাযারিল আরবী, তা.বি.
ইবনু আবী শায়বাহ, আব্দুল্লাহ, আল-মুছান্নাফ, রিয়াদ: মাকতাবাতুর রুশদ, ১৪০৯ হি.
বায়হাকী, আবু বাকর আহমাদ, আস-সুন্নানুল কুবরা, মক্কা: মাকতাবাতু দারিল বায, ১৯৯৪
দারাকুতনী, আলী, আস-সুন্নান, বৈরুত: দারুল মা'রিফাহ, ১৯৯৬
ইবনুল আছীর, মাজীদীন, আন-নিহায়াতু ফী গারিবিল হাদীস, বৈরুত: আল-মাকতাবাতুল ইলমিয়াহ, ১৯৭৯
বুখারী, আল-আদাবুল মুফরাদ, বৈরুত: দারুল বাসা'ইরিল ইলমিয়াহ, ২০০৯
আবু না'ঈম আল-ইস্পাহানী, মা'রিফাতুস সাহাবাত, রিয়াদ: দারুল ওয়াতান, ১৪১৮হি.
ফিক্হু
ইমাম শাফী, আল-উম
ইমাম সারারাবী, আবু বাকর মুহাম্মাদ, আল-মাবসুত, বৈরুত: দারুল মা'রিফাহ
আল-কাসানী, আলা উদ্দীন, বাদা'ইয়ুস সানা'ই', বৈরুত: দারুল কুতুবিল ইলমিয়াহ
আল-মারঘিনানী, বুরহান উদ্দীন 'আলী, আল-হিদায়াহ, দেওবন্দ: কুতুবখানা রহীমিয়াহ
ইবনুুল হুমام, কামাল উদ্দীন, ফাতহুল কাদীর শারহুল হিদায়াহ, দারুল ফিকর
যায়লা'ঈ, উসমান, তাবয়ীনুল হাকাইক শারহু কানযিদ দাকাইক, দারুল কিতাবিল ইসলামী
ইবনু নুজায়ম, যায়ন উদ্দীন, আল-বাহরুর রা'ইক শারহু কানযিদ দাকাইক, দারুল কিতাবিল ইসলামী
আল-বাওয়ার্তী, মুহাম্মাদ, আল-ইনায়াহ শারহুল হিদায়াহ, দারুল ফিকর
ইবনু 'আব্দিবীন, মুহাম্মাদ আমীন, রাদ্দুল মুহতার, বৈরুত: দারুল কুতুবিল ইলমিয়াহ
আল-বাজ্দবী, মানসুর, দাকা'ইকু উদিন মুবা, আলমুছ কুলুর নবাবী, ইয্যারুয়া,
আল-মাজমু শারহুল মুহাযযাব, আল-মা'তাম্মুল মুনীরিয়াহ
ইবনু যামাজ, আব্দুলফাকিহিন, আল-মুগনী, বৈরুত: দারু ইয্যা ইবনু হাযারিল আরবী
আবু ইউসুফ, কিতাবুল খারাজ, বৈরুত: দারুল মা'রিফাহ, ১৯৯৯
আল-মাওছু'আতুল ফিকহিয়্যাহ, কুয়েত: ওয়াজারাতুল আওকাফ ওয়াশ-শুনুনিল ইসলামিয়াহ, ১৯৯৫
সিরাত ও তারিখ
আবূ জা'ফার মুহাম্মাদ ইবনু জারীর, তারিখুল উমাম ওয়াল মুলুক, লিডেন, ১৯৭৮
ইবনু হিশাম, আস-সীরাতুন নাবাবীয়াহ, বৈরুত: দারু ইয্যা ইবনু হাযারিল আরবী, ১৪২৫হি.
ইবনু কাছীর, আল-বিদায়াতু ওয়ান নিহায়াহ, বৈরুত: দারুল ফিকর, তা.বি.
ইবনু কাইয়্যিম আল-জাওযিয়াহ, যাদুল মা'আদ , , অবস্কৃত আরবিব বিধাব
আল-কালালপাশী, সুবহুল আ'শা, কায়রো: আল-মাতাবা'আতুল আমীরিয়াহ, ১৯১৮
আল-বালাদুরী, ফুতুহুল বুলদান, বৈরুত: দারুল হিলাল, ১৪০৫হি.
কাদী ইয়াদ, আল-শিফা'
বিবিধ :
আল-মাওয়ার্দী, আবুল হাসান ‘আলী, আল-আহকামুস সুলতানিয়্যাহ, বৈরুত : দারুল কুতুবিল ‘ইলমিয়্যাহ
মাওদূদী, সাইয়েদ আবুল আ'লা, ইসলামী রাষ্ট্র ও সংবিধান, ঢাকা : শতাব্দী প্রকাশনী, ১৯৯৭
'আবদুর রাহমান পাশা, সুওয়ারুন মিন হায়াতিস সাহাবিয়ীন, কায়রো : দারুল আদাবিল ইসলামী, ১৪১৫হি.
তাওফীক সুলতান, তায়ীখু আহলিয়্য বিখায় ফিল ইরাক, রিয়াদ : দারুল ‘উলূম, ১৪০৩
আল-লুহায়েদান, ‘আবদুল্লাহ, ফিকহু সুন্নাহ
হাবীুল্লাহ, ড. হুযূরে আকরাম কী সিয়াসী যিন্দেগী
আর্নন্ড, টমাস, The preaching of Islam (অনু: আদ-দা'ওয়াতু ইলাল ইসলাম), মিসর : মাকতাবাতুন নাহদাহ, ১৯৭০
হুফ, জি. গ্রেট, শামসুল ‘আরব তাহা'উত' আলাল গারব, (অনু: ফারুক বায়দুন ও কামাল দাসূকী), বৈরুত : দার সাদির, ১৪২৩ হি.
ডিব্রয়াট্টে, ডিল, কিস্সাতুল হাদারাতি (অনু.), বৈরুত : দারুল জীল, তা.বি.
ফিলিি, ভি. লা সুকুতা বা'দাল ইয়াওমি (অনু.), বৈরুত : শারিকাতুল মাতবূ'আত, ২০০১
আযীয, নসরুল্লাহ, ইসলামের জীবন চিত্র, ঢাকা: প্রবাল প্রকাশন লি:, ১৯৯৪
সেমিনার স্মারকগ্রন্থ ২০০৮, বাংলাদেশ ইসলামিক সেন্টার, ঢাকা
Le Bon, Dr. Gustave, La Civilisation des Arabes, (অনু. হাদারাফুল আরব)
Finlay, History of the Byzantine.
Maciver, R.M., The web of government.
Rodee, Dr. C.C., Introduction to political science, Newyork: McGraw Book Company, 2nd ed.

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00