📄 শত্রুদের প্রতি রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ক্ষমা ও মহানুভবতা
শত্রুদের প্রতি রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর ক্ষমা ও মহানুভবতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হচ্ছে, মক্কা বিজয়ের পর মক্কাবাসী অমুসলিমদের প্রতি তার সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা। শান্তিরপূবর্কে মক্কা বিজয়ের শেষে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ঘোষণা করলেন, “মুসলিমদের পবিত্রতা স্বয়ং-অহংকার সম্পর্কিত ক্ষেত্রেও শেষ হবে না; বরং তা সকল অমুসলিম দলদাদের দখলেই থাকবে।” এ মর্মে তিনি নিজের রাসূলত্বও পুন-গ্রহণ করেন নি। হজরত রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মক্কার সবাইকে বাইতুল্লাহ শারীফকে সমবেত হবার জন্য ঘোষণা দিলেন। সবাই সমবেত হলে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) অমুসলিম মক্কাবাসীদের লক্ষ্য করে তাদের বিগত বছর বছর ইসলামে সাথে চরম শক্রতামূলক আচরণের বর্ণনা দিয়ে জানতে চাইলেন, مَا تَرَوْنَ أَنِّي فَاعِلٌ بِكُمْ? – “এখন তোমরা আমরা নিকট কি রূপ আচরণ আশা কর?” তখন তারা লজ্জায় শুধু এটুকু বলল, أَخٌ كَرِيمٌ ابْنُ أَخٍ كَرِيمٍ- “আমরা আপনার নিকট ভাল আচরণই আশা করি। আপনি তো আমাদের একজন মহানুভব ভাই, একজন বড়ই মহানুভব ভাইয়ের সন্তান।” এরপর রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সে ঐতিহাসিক প্রত্যুত্তর প্রদান করলেন, যা হজরত ইউসুফ (‘আলাইহিস সালাম) স্বীয় অপরাধী ভাইদের উদ্দেশ্যে বলেছিলেন, الْيَوْمَ لَا تَثْرِيبَ عَلَيْكُمُ اذْهَبُوا فَأَنْتُمُ الطُّلَقَاءُ، وَهُوَ أَرْحَمُ الرَّاحِمِينَ – “আজ তোমাদের বিরুদ্ধে কোন প্রকার অভিযোগ নেই। আল্লাহ তোমাদের ক্ষমা করুন। তিনিই শ্রেষ্ঠ দয়ালু। যাও! তোমরা মুক্ত।” ৯২৫ শত্রুদের প্রতি রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর ক্ষমা ও মহানুভবতার আরেকটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হচ্ছে- ইয়ামামার হানিফা গোত্রের সর্দার ছুমামাহ ইবনু উছাল (রা)-এর প্রতি কৃত আচরণ। ইসলাম গ্রহণের পূর্বে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ও মুসলিমদের প্রাণের শত্রু ছিলেন। এ সময় তিনি কয়েকজন সাবীহাকে হাতের নাগালে পেয়ে অত্যন্ত নির্মমভাবে হত্যা করেন। ফলে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁকে হত্যার অনুমতিও দিয়েছিলেন। পরবর্তীকালে তিনি যখন মুসলিমদের হাতে বন্দী হন, তখন রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সবাইকে তাঁর সাথে ভাল আচরণ করার নির্দেশ দেন। সে সময় বাড়িতে যা খাবার ছিল তিনি তা একত্রিত করে তাঁর সামনে পরিবেশন করেন। তারপর সকাল-সন্ধ্যায় রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর উট দোহন করে তার দুধ ঘুমামাহর নিকট পাঠিয়ে দেয়ার নির্দেশ দেন। অবশেষে কোনরূপ শাস্তি ছাড়াই তাঁকে মুক্ত করে দেন। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর এ আচরণে তিনি মুগ্ধ হয়ে ইসলাম গ্রহণ করেন।
টিকাঃ
৯২৫. ইবনু হিশাম, আস-সীরাতুন নাবাবিয়্যাহ, ৫:৭,৭:৭৫; কাজী ইয়ায, আশ-শিফা, ২:১,৭:১১৩
📄 হাদিয়া আদান-প্রদান
মানবিক ও সামাজিক আচার-আচরণের ক্ষেত্রে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মুসলিম ও অমুসলিমদের মধ্যে তারতম্য করতেন না। তিনি অমুসলিমদের উপহার-উপঢৌকন গ্রহণ করতেন এবং নিজেও তাদের উপহার দিতেন। বর্ণিত রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মাক্বাও আবু সুফইয়ান (রা)-এর নিকট (মাদীনা মুনাওয়ারার উৎকৃষ্ট জাতের খেজুর) ‘আক্বায়া হাদিয়া পাঠিয়েছিলেন। তখনও তিনি (আবু সুফইয়ান) ইসলাম গ্রহণ করেননি। ১৪৮ রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর এ মহানুভবতার ফলেই বাইরারের ইয়াহুদী সরদার সালাম ইবন মিশকাম্নের স্ত্রী যায়নাব মিনাতুল হারছি তাঁকে বিষ মিশ্রিত গোশত খাওয়াতে সক্ষম হয়। বিশর ইবনুল বারা’ (রা) নামক এক সাহাবী তা খাওয়ার ফলে প্রাণও হারান। ১৪৯
টিকাঃ
১৪৮. আবু-সা’আদবী, আল-মাফযুদ, খ, ২, পৃ. ১৬৯
১৪৯. আল বুখারী, আস-সাহীহ, (কিতাবুল রিহায়), হা. নং: ২৬৯৪; ইবনু ক্বাইয়িম আল-জাওযিয়্যাহ, যা’দুল মা’আদ, খ, ৩, পৃ. ২৬৫
📄 কুশলাদি জানা ও দেখা সাক্ষাত করা
রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) অমুসলিমদের খোঁজ-খবর নিতেন, অসুস্থ হলে রোগ শয্যায় গিয়ে কুশল জিজ্ঞেস করতেন এবং তাদেরকে ইসলাম গ্রহণের আহবান জানাতেন। ১৫০ কোন অমুসলিম যদি শ্বশুরগোষ্ঠীতে হয়ে তাঁর সেবা করতে চাইত, তবে তিনি তাকে বাধা দিতেন না। এ সুযোগে কোন কোন ইয়াহুদী তাঁর সাথে অশোভন আচরণ করত; কিন্তু তিনি সর্বদাাই তাদের ক্ষমা করতেন। হযরত আনাস (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, জনৈক ইয়াহুদী বালক রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সেবা করতেন। একবার তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাকে দেখতে গিয়েছিলেন এবং ইসলাম গ্রহণের দাওয়াতও দেন। ১৫১
টিকাঃ
১৫০. মুসলিম, আস-সাহীহ, (কিতাবুল জিহান), হা.নং : ১৭৬৯
১৫১. আল বুখারী, আস-সাহীহ, (কিতাবুল মরদা), হা.নং : ৫৬৫৭
📄 আতিথেয়তা
রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) অমুসলিমদের সাথে মেহমানদারি করতে কখনো অস্বীকৃতি বোধ করেননি। তাঁর নিকট প্রায়ই অমুসলিম মেহমানদের আগমন ঘটত। তারা অনেক সময় প্রচুর পরিমাণ আহার গ্রহণ করত। একবার এক অমুসলিম সাতটি বকরীর দুধ পান করেছিল। ১৫২ অমুসলিম মেহমানদের আদর-যত্নে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কোন ত্রুটি করতেন না। তিনি নিজ হাতে তাদের খাওয়া পরিবেশন করতেন। তাঁর মেহমানদারী ও উদারতায় মুগ্ধ হয়ে বহু অমুসলিম ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। কোন কোন সময় অমুসলিম মেহমান মজলিসের শিষ্টাচার ভঙ্গ করত; কিন্তু রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)তাদেরকে ক্ষমা করতেন।
টিকাঃ
১৫২. তিরমিযী, আল-জামি’, (কিতাবুল আত্ব-ইদাহ), হা.নং : ১৪৪৬