📘 ইসলামী রাষ্ট্রে অমুসলিম নাগরিকের অধিকার ও মর্যাদা > 📄 হাদ জাতীয় অপরাধের শাস্তি

📄 হাদ জাতীয় অপরাধের শাস্তি


যদি কোন অমুসলিম হাদ্দ জাতীয় কোন অপরাধে (যেমন-চুরি, ডাকাতি, যিনা ও যিনার অপবাদ আরোপ প্রভৃতি) লিপ্ত হয়, তাহলে তাদেরকে ঐ সকল অপরাধের জন্য নির্ধারিত শাস্তি ভোগ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে মুসলিম-অমুসলিম নির্বিশেষে সকলের জন্য আইন সমানভাবে প্রযোজ্য হবে। ৯১০ তবে যেহেতু তারা মদ সেবনকে বৈধ বলে বিশ্বাস করে, তাই তাদের ক্ষেত্রে মদপানের শাস্তি প্রযোজ্য হবে না, যদি তারা খোলাখুলিভাবে মদ সেবন না করে। যদি তারা মুসলিম জনপদের মধ্যে প্রকাশ্যে মদ সেবন করে, তা হলে তাদেরকে সাধারণ দণ্ড দেয়া যাবে।
অনুরূপভাবে কেউ কোন অমুসলিম- পুরুষ বা নারী-কে যিনার অপরাধে লিপ্ত তার জন্য হাদ্দ প্রযোজ্য হবে না; তবে তা'যীরের ৯১১ আওতায় যে কোন সাধারণ উপযুক্ত দণ্ড দেয়া যাবে, চাই অপরাধী দণ্ডনীয় মুসলিম হোক কিংবা অমুসলিম। কারণ যিনার অপরাধের হাদ্দ কার্যকর করার অন্যতম শর্ত হল অপরাধ আরোপিত ব্যক্তিকে মুসলিম হতে হবে। ৯১৩

টিকাঃ
৯০৯. আল-কাসানী, বাদাই', ৭:১, ১১১-৯
৯১০. যখন হজরত উমর রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু বনু সুলাইম গোত্রের জনৈক মুসলমান ও খ্রিস্টানের মধ্যে সংঘটিত চুরি, ব্যাভিচার ও ব্যভিচারের অপবাদ ও মদপানের শাস্তি কার্যকর করেন, ঠিক সেভাবেই অমুসলিমদের ওপরও তা প্রয়োগ করেন। তবে তিনি যখন বনু তগবিয়্যাহ গোত্রের জনৈক খ্রিস্টানকে মদপানের অপরাধে বেত্রাঘাত করেন তখন ঐ খ্রিস্টান বলেছিলেন, “আমি মদকে হালাল মনে করি।” তখন হজরত উমর রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু মুসলিমদের মত কঠোর শাস্তি কার্যকর না করে তাকে তা’যীর স্বরূপ হালকা শাস্তি প্রদান করেন।
৯১১. এটি অধিকাংশ ইমামের অভিমত। বর্ণিত রয়েছে, “রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) দুজন ইয়াহুদীর যিনার শাস্তিপ্রকরণ প্রস্তুত নির্দেশ করে হত্যা করেছিলেন।” (আবু দাউদ, আল- জামে', কিতাবুল হুদূদ), হা. নং: ৪০৬৩) তবে ইমাম আবু হানীফা ও ইমাম মালিক (রাহ.)-এর মতে বিবাহিত অমুসলিমদের যিনার জন্য ‘রাজম’ (প্রস্তর নিক্ষেপে হত্যার শাস্তি) প্রযোজ্য হবে না। তাঁদের দৃষ্টিতে- রাজম কার্যকর করার জন্য অপরাধীর মুসলিম হওয়া শর্ত। অনুরূপভাবে তাঁদের দৃষ্টিতে কোন বিবাহিত মুসলিম কোন অমুসলিম মহিলার সাথে যিনা করলে ও মুসলিমের জন্য রাজমের দণ্ড প্রযোজ্য হবে না। কারণ রাজমের শাস্তি কার্যকর করার জন্য অপরাধীকে মুসলিম হবার পাশাপাশি ‘মুহসান’ও হতে হবে। তাঁদের মতে ‘মুহসান’ হবার জন্য মুসলিম মহিলার সাথে বিয়ে হবার শর্ত রয়েছে। বর্ণিত রয়েছে যে, হজরত কা’ব ইবনু মালিক (রাহ.) যখন জনৈক ইয়াহুদী কিংবা খ্রিস্টান মহিলাকে বিয়ে করতে মনস্থ করলেন, তখন রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাকে বললেন, “এ আশা ছেড়ে দাও। কেননা এ বিয়েতে তুমি ‘মুহসান’ হবে না।” (দারাকুতনী, জাম-সুন্নান, হা.নং: ৩০৪৮)
৯১২. তা’যীর : যে সব অপরাধের জন্য শারীআতে কোন সুনির্দিষ্ট শাস্তি নেই, সে সব অপরাধের শাস্তিকে তা'যীর বলা হয়। স্থান, কাল-অবস্থার নিরিখে কল্যাণের দাবি অনুপাতে এ ধরনের শাস্তির মাত্রা ও প্রকৃতি নির্ধারিত হয়।

📘 ইসলামী রাষ্ট্রে অমুসলিম নাগরিকের অধিকার ও মর্যাদা > 📄 কিসাস জাতীয় অপরাধের শাস্তি

📄 কিসাস জাতীয় অপরাধের শাস্তি


ইসলামী রাষ্ট্রে বসবাসকারী মুসলিম ও অমুসলিম নির্বিশেষে সকলের জন্য হত্যাকারের ক্ষেত্রে কিসাসের বিধান সমানভাবে প্রযোজ্য হবে। যদি কোন মুসলিম কোন অমুসলিমকে কিংবা কোন অমুসলিম অপর কোন অমুসলিম অথবা কোন মুসলিমকে ইচ্ছাকৃতভাবে হত্যা করে, তা হলে হত্যাকারীর শাস্তি হল মৃত্যুদণ্ড। এ ক্ষেত্রে মুসলিম ও অমুসলিমদের মধ্যে কোন রূপ বৈষম্য করা যাবে না। ৯১৫ রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর আমলে জনৈক মুসলিম এক অমুসলিমকে হত্যা করলে তিনি খুনীকে মৃত্যুদণ্ড দেন। তিনি বলেন, وَمَنْ يَقْتُلُ مِنَّا أَحَدًا - “যে অমুসলিম নাগরিক তার চুক্তি রক্ষা করবে, তার রক্তে বদলা নেয়ার দায়িত্ব আমাদের।” ৯১৬ হজরত উমর (রা)-এর আমলে বাখর ইবন ওয়া’ইল গোত্রের এক ব্যক্তি জনৈক হীরাবাসী অমুসলিমকে হত্যা করে। তিনি খুনীকে নিহত ব্যক্তির উত্তরাধিকারীদের হাতে সমর্পণের আদেশ দেন। ৯১৭ অতএব তাকে উত্তরাধিকারীদের হাতে সমর্পণ করা হলে তারা তাকে হত্যা করে। ৯১৮ তা ছাড়া ভুলবশত ও কারণবশত হত্যার ক্ষেত্রেও অমুসলিমদের জন্য মুসলিমদের মতো একই রূপ দিয়াতের বিধান প্রযোজ্য হবে। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, دِيَةُ ذِمِّي دِيَةُ مُسْلِمٍ - “অমুসলিমের দিয়াত মুসলিমের দিয়াতের মতোই সমান।” ৯১৯ তবে যে সকল হত্যার জন্য কাফফারা ওয়াজিব হয় এবং কাফফারার মধ্যে যেহেতু শাস্তির পাশাপাশি ‘ইবাদতের আমেজ মিশ্রিত থাকে, তাই এ বিধান অমুসলিমদের জন্য প্রযোজ্য হবে না।
মানবদেহের বিভিন্ন বিভিন্ন অপরাধের (যেমন-চোরি, বিদ্ধংসুকমণ, অঙ্গোচ্ছেদকরণ ও ক্ষতিসাধন এবং বিভিন্ন আঘাত প্রভৃতি) ক্ষেত্রেও মুসলিম ও অমুসলিম নির্বিশেষে সকলের জন্য কিসাস ও দিয়াতের বিধান সমানভাবে প্রযোজ্য হবে। ৯২০

টিকাঃ
৯১৩. ইবনু 'আবাসিন, রওয়াক্বুল মুতাজ, ৫:৩,৭:৬০৭; ইবনু কুদামাহ, আল-মুগনী, ৭:৭,৭:১৭০
৯১৪. কিসাস হল অপরাধীর সাথে তার বাড়াবাড়ির অনুরূপ আচরণ করা। অর্থাৎ অপরাধী কোন ব্যক্তির দেহ পরিমাপ দৈহিক ক্ষতি সাধন করবে তারপর সে-ই পরিমাণ দৈহিক ক্ষতি সাধন করাই হচ্ছে কিসাস। অপরাধী তাকে হত্যা করলে প্রতিশোধ স্বরূপ সেও মৃত্যুদণ্ড প্রাপ্ত হবে এবং যখন কেউ একসাথে প্রতিশোধ স্বরূপ তাকেও খতম করা হবে।
৯১৫. এটি হানফীগণের অভিমত। তবে শাফি‘ঈ ও হাম্বালী স্কুলের ইমামগণের মতে- কোন অমুসলিমকে হত্যার জন্য মুসলিম থেকে কিসাস নেয়া যাবে না। তবে দিয়াতও ওয়াজিব হবে। (আল-সারখাসী, আল-মাবসুত, ৯:৫,৬:১৭-৯; ইবনু নু’জায়ম, আল-বাহরুর রাইক্ব, ৯:৬,৭:৩৭৭)
৯১৬. ইবনু আবী শায়বাহ, আল-মুহাল্লাহ, হা.নং: ২৭৪৬০; আল-বাইহাক্বী, আস-সুনানুল কুবরা, ৯:৭,৭:২০৯-১০
৯১৭. সাধারণ কিসাস কার্যকর করার দায়িত্ব সরকারের ওপর বর্তায়। তবে নিহত ব্যক্তির অভিভাবক নিজ হাতে কাজটি সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে সক্ষম হলে এবং সরকার বা তার প্রতিনিধি তাকে এ কাজের উপযুক্ত মনে করলে তাকে নিজ হাতেই হত্যাকারীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার অনুমতি দিতে পারে। তবে এ কাজটি করতে হবে সরকার কর্তৃক কিসাসের লোকের উপস্থিতিতে, যাতে সে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার বেলায় কোন রূপ বাড়াবাড়ি করতে না পারে। (ইবনু কুদামাহ, আল- মুগনী, ৪:৮,৭: ২৩০-৪)
৯১৮. ইবনু আবী শায়বাহ, আল-মুহাল্লাহ, হা.নং: ২৭৪৬৭; আল-বাইহাক্বী, আস-সুনানুল কুবরা, হা.নং: ১৫৭৩৫
৯১৯. ইবনু আবী শায়বাহ, আল-মুহাল্লাহ, ৫:৬,৬০২
৯২০. এটি হানফীগণের অভিমত। তবে শাফি‘ঈ ও হাম্বালী ইমামদের মতে- কোন অমুসলিমদের অপর অমুসলিমদের জন্য মুসলিম থেকে কিসাস নেয়া যাবে না। তবে কোন মুসলিমের সাথে অমুসলিমদের আনা অমুসলিম থেকে কিসাস নেয়া যাবে না। মালেকীদের মতে- মানবদেহের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অপরাধের বেলায় অপরাধী কিবা আহত যে কোন একজন অমুসলিম হলে কিসাসের বিধান প্রযোজ্য হবে না। তবে অমুসলিমরা পরস্পর এক অপরের দেহের বিরুদ্ধে অপরাধ করলে, তা হলে কিসাসের অপরাধের বেলায় সর্বসম্মতভাবে কিসাসের বিধান প্রযোজ্য হবে।

📘 ইসলামী রাষ্ট্রে অমুসলিম নাগরিকের অধিকার ও মর্যাদা > 📄 সাধারণ অপরাধের শাস্তি

📄 সাধারণ অপরাধের শাস্তি


যে কোন অমুসলিমের সাধারণ অপরাধের জন্য বিচারকরা অবশ্যই অবস্থা এবং অপরাধের প্রকৃতি ও মাত্রা বিচার-বিশ্লেষণ করে যে কোন রূপ উপযুক্ত শাস্তি দিতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে মুসলিম ও অমুসলিম নির্বিশেষে সকলের জন্য একই রূপ বিধান সমানভাবে কার্যকর করা হবে। তাদের মধ্যে কোন রূপ বৈষম্য সৃষ্টি করা চলবে না। আল্লাহ তা’আলা বলেন, وَلَا يَجْرِمَنَّكُمْ شَنَآنُ قَوْمٍ عَلَى أَلَّا تَعْدِلُوا اعْدِلُوا هُوَ أَقْرَبُ لِلتَّقْوَى - “এবং কোন সম্প্রদায়ের শত্রুতার কারণে কখনো ন্যায়বিচার পরিত্যাগ করো না। সুবিচার করো। এটাই তাকওয়ার অধিক নিকটবর্তী।” ৯২১

টিকাঃ
৯২১. আল-কুরআন, ৫ (সূরাতুল মা’ইদাহ) : ৮

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00