📄 জীবিকা উপার্জন ও চাকুরীর অধিকার
জীবিকা উপার্জনের জন্য অমুসলিমরা তাদের যোগ্যতা ও সামর্থ্য অনুযায়ী স্বাধীনভাবে যে কোন কর্ম ও পেশা অবলম্বন করতে পারবে। তাদেরকে নিজেদের বিবেকের বিরুদ্ধে কোন কর্ম ও পেশা অবলম্বনে বাধ্য করা না। ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প-কারিগরি, কৃষি ও চাকুরী প্রকৃতির হার তাদের সকলের জন্য উন্মুক্ত থাকবে। এ সব ক্ষেত্রে মুসলিমরা যে সুযোগ-সুবিধা ভোগ করে থাকে, অমুসলিমরাও তা ভোগ করবে। তাদের মধ্যে কোন রূপ বৈষম্য সৃষ্টি করা চলবে না। চাকুরীতে নিয়োগের ক্ষেত্রে মুসলিম ও অমুসলিম নির্বিশেষে সকলের যোগ্যতার মাপকাঠি হবে একটাই এবং এ ধরণের তথায় পরিশেষে নয়, একমাত্র যোগ্যতার ভিত্তিতে নির্বাচন করা হবে।৫৭ মোগল সম্রাট আওরঙ্গকেব যখন রাষ্ট্রীয় উচ্চপদে অমুসলিমদের নিয়োগ দানের বিষয়ে প্রশ্ন করা হয়েছিল, তখন তাঁর জবাবে তিনি বলেছিলেন, “যোগ্য ব্যক্তিকে যথোপযুক্ত স্থানে নিয়োগ দেওয়াই হল ইসলামী শরীয়াহর নীতিমালা দাবি।”৬০ তাঁর ৩৫ বছরের শাসনামলে বহু হিন্দু-অমুসলিম প্রশাসন উচ্চপদে নিয়োগিত ছিল। যেমন জশবঙ্গ সিংহ, রাজা রামকরণ, কবির সিংহ, অর্জননাথ সিংহ, প্রেমদেব সিংহ, দীলিপ রায় ও রসিক লাল প্রমুখ। স্যার মার্ক্স শালীন খাঞ্চজা হুকুমের শাসনামলের কথা লেখেন এভাবে- “খ্রিষ্টান, পৌত্তলিক, ইহুদী ও মুসলিমরা ইসলামী সরকারের কর্মচারি হিসেবে সমান অধিকার নিয়ে কর্মরত ছিলেন।”৬১ তবে রাষ্ট্রের আদর্শ ও নিরাপত্তাগত প্রয়োজনে যে সব দায়িত্ব পালনের জন্য মুসলিম জনবল রয়েছে (যেমন- রাষ্ট্রপ্রধান, সেনাবাহিনী, মুসলিম আদালতের কাজী প্রভৃতি), সে সব ক্ষেত্রে অমুসলিমদেরকে নিয়োগ দেয়া যাবে না। এগুলো ছাড়া বাদবাকী সমগ্র প্রশাসনের বড় বড় সকল পদে (যেমন- মহা হিসাব রক্ষক, প্রধান হিসাব নিয়ন্ত্রক, মহাপ্রাপ্যশালী ও পোষ্ট মাষ্টার জেনারেল প্রভৃতি), এমনকি নির্বাহী ক্ষমতা সম্পন্ন বিভিন্ন মন্ত্রণালয়েও যোগ্যতা সাপেক্ষে অমুসলিমদেরকে নিয়োগ দেয়া যাবে না। অনুপভাবে সেবাবাহিনীতেও কেবল প্রত্যক্ষ যুদ্ধ সংক্রান্ত দায়িত্বের তাদেরকে নিয়োগ দেয়া যাবে না। তবে প্রত্যক্ষ যুদ্ধের সাথে সরাসরি সম্পর্কিত নয়- সামরিক বিভাগের এমন সব দায়িত্বে তাদেরকে নিয়োগ দিতে কোন বাধা নেই।৬২ উল্লেখ যে, রাষ্ট্রপ্রধান, সেনাবাহিনী, বিচারপতি ও এ ধরনের অন্য যে সব শীর্ষ পদে আসীন হয়ে সরকারের নীতির নির্ধারনে অংশীদারি হওয়ার কথা, সে সব পদে কোন অমুসলিম সমাসীন হতে পারবে না- এর কারণ কোন সংকীর্ণতা বা জাতি বিদ্বেষ নয়; বরং এর যথার্থ কারণ হল, ইসলামী রাষ্ট্র একটি আদর্শভিত্তিক রাষ্ট্র। তাই এ রাষ্ট্রের এ সব পদে এমন ব্যক্তিরাই প্রতিষ্ঠিত হতে পারবে, যারা এ আদর্শে খুব শিষ্টতা ভালোভাবে অনুবাদন করে এবং এদের প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস ও শ্রদ্ধা বলে মানে। এ সব লোক থেকেই এ আশা করা যেতে পারে যে, তারা পূর্ণ আন্তরিকতার সাথে নিজেদের দীন ও ইসলামী দায়িত্ব মনে করে এ রাষ্ট্রের যাবতীয় কাজ পরিচালনা করবে। অপরদিকে ইসলামী রাষ্ট্র যেহেতু নিষ্ঠা, আন্তরিকতা ও বিশ্বস্ততার ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে, তাই রাষ্ট্রের কোন অমুসলিম নাগরিক নিছক জীবিকা ও পদমর্যাদা লাভের খাতিরে এ ব্যবস্থার পরিচালনা ও উচ্চপদ সাধনের কাজে আত্মনিয়োগ করলে, ইসলাম তা পছন্দ করে না। কেননা যারা ইসলামের আদর্শে বিশ্বাসী নয়, তাদেরকে যদি রাষ্ট্রের উপযুক্ত শীর্ষ পদসমূহে আসীনও করা হয়, তবে তারা এ আদর্শের সিদ্ধিটি অনুসরণ করতে সক্ষম হবে না এবং সে অনুযায়ী কাজ করতেও পারবে না। আর এ আদর্শের জন্য তাদের সে রূপ আন্তরিকতাও সৃষ্টি হবে না, যার ওপর রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকার ভিন্ন প্রতিষ্ঠিত থাকবে।
টিকাঃ
৫৮। আল-কাসানী, বাদাই’ই খ.৭,পৃ.১১২
৫৯। আবু ইউসুফ, কিতাবুল খারাজ, পৃ.১১৪
৬০। আল-মাওছু আউন ফিক্বাহিয়া, খ.৭,পৃ.২৫১
৬১। বছরপ্রতি, কিরা দ্বিতীয় বা সামপ্রতিক সংকীর্ণ চিন্তাক মাত্র এক রাতের কোন পদে কাউকে নিয়োগ দেয়া ইসলামে মহত্বপূর্ণ। হযরত আবূ বাকর (রা) হযরত ইছাদ ইবনু আবী সুফইয়ান (রা) কে আমীর দিচ্ছিল ফিরিয়ায় প্রেরণের সময় ফরমান করেন, فَإِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْقِسْطَ إِنْ وَوَيْهِ هُمُ الْمُشْرِكُونَ تَقِفُ وَلَا تَقْتُلُوا وَلَا تَنْفِرُوا وَلَا تَتَغَرَّبُوا وَلَا تَتَرَيَّصُوا وَلَا تَتَبَطَّرُوا فِي الْأَرْضِ مَا جَاءَ بِهِ اللَّهُ وَلَا يَخْرُقْ وَلَا يَصْرِفُ مَرَةً سَنَّةً وَلَا يَضَعُ مُرَةً فِي مَعْرُوفٍ وَلَا يَسْرِفُ مَرَةً فِي مَحْفُوظٍ فَإِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ الْمُفْسِدِينَ “হে ইয়াযীদ, তোমার আত্মীয়-স্বজন রয়েছে। আমি তোমার দিক থেকে এটা সর্বাধিক আশঙ্কা করছি যে, তুমি বিজিত পক্ষ নিরোধের ব্যাপারে তাদেরকে অধিকার প্রদান করবে। অথচ রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন যে, কোন ব্যক্তি মুসলিমদের কোন কাজও দায়িত্ব দিতে হবে না। দায়িত্বশীলদের পদ থেকে কাজের কারণে তাদের বিভাগ দ্বারা যখন ইসলাম গ্রহণ করা হবে না তখন তাদের কর্তব্য হবে সকল জাতির সকল প্রকার জনপদের ক্ষমতা ও সকল ইছাদ (যারা কাজ করবে তারা তোমারা বা নিয়মিত) গ্রহণ করবে না, সে যখন ও তাকে দায়িত্বের দাবি দল করেন।” (আহমাদ, আল-মুনীব (মুসনাদু আবি বাকরা), হা.নং: ২১; হাকীম, আল-মুসতাদরাক্ব, কিতাবুল আহকাম, হা.নং: ৭৬৯৪)
৬০। নাজীব, শেখ মোহাম্মদ গোয়েব, ইসলামী রাষ্ট্রে অমুসলিম নাগরিক, সেবিনার শারক্ব এনু ২০০৮, বি.আই.বি, ঢাকা, পৃ.২০১
৬১। প্রাগুক্ত, পৃ.২১১
৬২। আল-মাওদুদী, আল-আহকামুল সুলতানিয়াহ্, পৃ. ৪৪; আল-মাওছু আল ফিক্বাহিয়া, খ.৭,পৃ.২৭১
📄 অর্থনৈতিক কারবার পরিচালনার অধিকার
ইসলামী রাষ্ট্রে অমুসলিমরা অর্থনৈতিক কারবার পরিচালনার ক্ষেত্রে মুসলিমদের মতো একই রূপ সুবিধা লাভ করবে। তারা ব্যবসার পাশাপাশি ইজারা (leasing), মুযারা‘আহ (crop-sharing), মুদারাবারাহ (profit & loss sharing) ৭৩ ও মুশাকারাহ (co-ownership) ৭৪ প্রভৃতি পদ্ধতিতে অর্থনৈতিক লেনদেন ও কারবার করতে পারবে। তবে এ সব কারবার ও লেনদেনের ক্ষেত্রে (কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া যেমন- মদ ও শূকরের ব্যবসা) তাদেরকে ইসলামী বিধি-বিধান মেনে চলতে হবে। সুদ ও জুয়া এবং জনগণের অর্থনৈতিক অবস্থার ওপর খারাপ প্রভাব সৃষ্টি করে- এ ধরনের ইসলামে নিষিদ্ধ যে কোন পন্থায় অর্থনৈতিক লেনদেন করতে পারবে না। ৭৫
টিকাঃ
৭৩. মুদারাবারাহ : এক ধরনের অংশীদারিত্ব মূলক ব্যবসা, যেখানে একজন বা একপক্ষ (সাহিবুল মাল) মূলধন সরবরাহ করে এবং অপরপক্ষ ব্যাপক বাণিজ্য অভিজ্ঞতা ও শ্রম নিয়োগ করে। দ্বিতীয় পক্ষকে 'মুদারিব' (ব্যবস্থাপক) বলা হয়। এ ধরনের ব্যবসায় যে মুনাফা উপার্জিত হয় তা দু পক্ষের মধ্যে পূর্বসম্মত হারে ভাগ হয়।
৭৪. মুশাকারাহ : এক ধরনের অংশীদারী কারবার, যেখানে প্রত্যেক অংশীদার একতরে মূলধন ও ব্যবস্থাপনার সমান অথবা বিভিন্ন মাত্রায় অংশ নেয়। এ ধরনের কারবারে মুনাফা অংশীদারদের মধ্যে পূর্ব স্বীকৃত অনুপাত অনুসারে বন্টিত হয়।
৭৫. আস-সারাসী, আল-মাবসুত, খ.১০, পৃ. ৬৪; আল-কাসানী, বাদাই‘ খ.৪, পৃ.১৭৯
📄 জমির মালিকানা ও ব্যবহারের অধিকার
অমুসলিমরা ইসলামী রাষ্ট্রের নাগরিক পরিগণিত হয়ে যাওয়ায় পর তারা তাদের জমির মালিক হবে। ইসলামী রাষ্ট্র তাদেরকে বেদখল করতে পারবে না। তদুপরি তারা নতুন জমিও ক্রয় করতে পারবে। তাদের জমির মালিকানা উত্তরাধিকার সূত্রে হস্তান্তরিত হবে এবং তারা নিজেদের সম্পত্তি বেচা, কেনা, দান করা ও বন্ধক রাখা ইত্যাদির নিরূপণ অধিকারী হবে। ৭৬
টিকাঃ
৭৬. ইবনুল হুমাম, ফাতহুল কাদীর, খ.৪, পৃ. ৩০৯
📄 পারিবারিক আইনে বিচারের অধিকার
অমুসলিমদের পারিবারিক কর্মকাণ্ড তাদের নিজস্ব পারিবারিক আইন (personal law) অনুযায়ী পরিচালিত হবে। এ ক্ষেত্রে তাদের ওপর ইসলামী বিধি-বিধান কার্যকর করা হবে না। মুসলিমদের পারিবারিক জীবনে যে সব বিষয় অবৈধ, সে সব যদি তাদের ধর্মীয় ও জাতীয় আইনে বৈধ হয়, তা হলে আদালত তাদের আইন অনুসারেই ফায়সালা করবে। উদাহরণ স্বরূপ সাক্ষী ছাড়া বিয়ে, মাহর (দেনমোহর) ব্যতীত বিয়ে, ‘ইদ্দাতের’ ৭৭ মধ্যে পুনরায় বিয়ে অথবা ইসলামে যাদের সাথে বিয়ে নিষিদ্ধ তাদের সাথে বিয়ে প্রভৃতি তাদের আইনের বৈধ হয়ে থাকে, তা হলে তাদের জন্য এ সব কাজ বৈধ বলে মেনে নেওয়া হবে। তবে কোন ক্ষেত্রে যদি বিদ্যমান উভয় পক্ষ স্বয়ং ইসলামী আদালতে আবেদন জানায় যে, ইসলামী আইন মোতাবেক তাদের বিবাদের ফায়সালা করা হোক, তবেই আদালত তাদের ওপর শারী‘আতের বিধান কার্যকর করবে। তা ছাড়া পারিবারিক আইনের সাথে সংশ্লিষ্ট কোন বিবাদে যদি এক পক্ষ মুসলিম হয়, তা হলে ইসলামী আইন অনুযায়ী ফায়সালা করা হবে। যেমন কোন খ্রিস্টান মহিলার স্বামী যদি মুসলিম হয় এবং সে মারা যায়, তা হলে এ মহিলাকে ইসলামী আইন অনুযায়ী স্বামীর মৃত্যুরজনিত ‘ইদ্দাত পুরোপুরি পালন করতে হবে। ‘ইদ্দাতের মধ্যে বিয়ে করলে সে বিয়ে বাতিল হবে। ৭৮
টিকাঃ
৭৭. ইদ্দাত : বিধবা হওয়ার বা তালাক পাওয়ার পর যে নির্দিষ্ট সময় পার না হলে স্ত্রীলোকের পুনরায় বিবাহ。
৭৮. আস-সারাসী, আল-মাবসুত, খ.১০, পৃ-৫১