📄 জান-মাল-ইযযাত-আব্রুর নিরাপত্তা
ইসলামী রাষ্ট্রে অমুসলিমদের জান-মাল-ইযওয়াদ-এর নিরাপত্তা জান-মাল ও ইযওয়াদ-এর মতোই নিরাপত্তা। অনাবশ্যকভাবে কোন অমুসলিমের জান কিংবা মাল অথবা ইযওয়াদ-এর ওপর আঘাত হানা নিষিদ্ধ। ৮৮ কোন মুসলিম যদি কোন অমুসলিম নাগরিকের হত্যা করে, কিংবা তার ওপর আঘাত করে অথবা তার ইযওয়াদ-এর ওপর হস্তক্ষেপ করে, তা হলে একজন মুসলিমকে এরূপ আচরণ করা হলে তার যে ধরনের শাস্তি ও দণ্ড হতো, তাকে ঠিক তেমনি শাস্তি ও দণ্ড দেওয়া হবে। অতএব কোন মুসলিম যদি কোন অমুসলিম নাগরিককে হত্যা করে, তা হলে একজন মুসলিম নাগরিককে হত্যা করলে যেমন তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হত ঠিক তেমনি মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হবে।
হযরত আলী (রা)-এর আমলে জনৈক মুসলিম একজন অমুসলিমের হত্যার দায়ে গ্রেফতার হয়। যথাধীতি দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পর তিনি মৃত্যুদণ্ডের নির্দেশ দেন। এ সময় নিহত ব্যক্তির ভাই এসে বললেন, "আমি ক্ষমা করে দিয়েছি।" কিন্তু তিনি সন্তুষ্ট না হয়ে বললেন, "ওরা বোঝে না যে বিষয়ে সে বললো", "না, আমি রক্তপণ পেয়েছি এবং আমি বুঝতেও পেরেছি যে, ওকে হত্যা করলে আমার ভাই ফিরে আসবে না।" তখন তিনি খুনীকে ছেড়ে দিলেন এবং বললেন, إِنَّا قَبُولِ الرَّحْمَةِ نَجْتَكُونُ وَدِيَاتِهِمْ كَبِيَتَنَا وَتُوَالُهُمُ كَوَمُالِنَا "তারা জিজিয়া দিতে সম্মত হয়েছে এ শর্তে যে, তাদের ধন-সম্পদ ও জীবন আমাদের ধন-সম্পদ ও জীবনের মতোই সমমর্যাদা সম্পন্ন হবে।" ৮৯
অনুরূপভাবে কোন অমুসলিম নাগরিক কোন মুসলিমের হাতে ভুলক্রমে নিহত হলে তাকেও অবিকল সেই রক্তপণ দিতে হবে, যা কোন মুসলিমের নিহত হওয়ার ক্ষেত্রে দেওয়া হয়।
জান-মালের মতো তাদের ইযওয়াদ-কেও মুসলিমদের ইযওয়াদ-এর মতোই মর্যাদা সম্পন্ন। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন,
مَنْ قَذَفَ ذِمِّيَّا حُدَّ لَهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ بِسِيَاطٍ مِنْ نَارِ.
"যে ব্যক্তি কোন অমুসলিমকে যিনার অপবাদ দেবে কিয়ামতের দিন তাকে আগুনের বেত দ্বারা প্রহার করা হবে।" ৯০ কোন মুসলিমকে যেমন মদখোর বলা, গালি দেওয়া, বদনাম করা জায়িয নয়; তেমনি এ সব কাজ অমুসলিমদের ক্ষেত্রেও না জায়িয। ইবনু 'আবিদীন বলেন,
تَحْرُمُ غَيْبَةُ كَالْمُسْلِمِ لِأَنَّهُ نُعْتَقِدُ الْوَعْبِ وَحُبٌ لَّهُ مَا لَنَا فَاذَا حُرِّمَتْ غَيْبَةُ الْمُسْلِمِ حُرِّمَتْ غَيْبَتِهِ ؛ بَلْ قَالُوا : إِنَّ ظُلْمَ الدِّمِّي أَشَدٌّ.
"তার গীবত করা মুসলিমের গীবত করার মতোই হারাম। কেননা চুক্তি করার কারণে আমাদের অনুরূপ সকল অধিকার তার বেলায়ও কার্যকর হবে। অতএব মুসলিমের গীবত করা হারাম হলে তার গীবত করাও হারাম হবে। অধিকন্তু ইমামগণ বলেছেন যে, অমুসলিমদের প্রতি অবিচার করা অধিকতর জঘন্য।" ৯১
টিকাঃ
৮৬. আল-কাসানী, বাদাইয়ি ৫,৭,৭, ২১১; আব-সাবাবী, আল-মাবসুত, ৯,৩,৭,১৩৩
৮৭. হাবীবুল্লাহ, ড. হুযুর আলফাসুল ফি যিম্মায়ী বিদ্দীমী, পৃ. ২৮১
৮৮. আল-মাওসূলী, আল-আহওয়াল সুলতানীয়াহ, ১,৩,৭,৫
৮৯. আল-কাসানী, বাদাইয়ি ৫,৭,৭, ২১১; ইবনু কুদামাহ, আল-মুগনী, ৯,৩,৭,২৮৯
৯০. তাবরানী, আল-মু'জামুল আউসাত, হা.নং: ১৪৩৬
৯১. ইবনু 'আবিদীন, রাদ্দুল মুহতার, ৫,৪,৭, ৩০১
📄 স্বাধীনভাবে বসবাস, চলাফেরা ও বিচরণের অধিকার
ইসলামী রাষ্ট্রে অমুসলিমরা স্বাধীনভাবে দেশের যে কোনো স্থানে, এমন কি মুসলিম জনপদগুলোতেও নির্বিঘ্নে বসবাস করতে পারবে এবং ব্যবসা-বাণিজ্য, কাজ-কারবার ও চাকুরী প্রবৃত্তির প্রয়োজনে রাষ্ট্রের যে কোন স্থানে মুক্তভাবে বিচরণ করতে পারবে। এ ক্ষেত্রে অন্যায়ভাবে কোন রূপ বাধা সৃষ্টি করা যাবে না। তবে পবিত্র মক্কা ও মদীনা নগরীতে তাদেরকে প্রবেশ, চলাফেরা ও বসবাস করতে দেয়া জায়িয নয়।৮ আরবের দেশের অন্যান্য ভূখণ্ডে অমুসলিমদেরকে বসবাস ও বিচরণের অধিকার দেয়া যাবে কি না- তা নিয়ে ইমামগণের মধ্যে মতবিরোধ রয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, “إِذَا نَجْتَمِعُ وَنَبَانُ فِي جَزِيرَةِ الْعَرَبِ”৯ “আরব জায়ীরায়৯ মুষ্টি ধর্ম একত্রে থাকতে পারবে না।”৯৯ অর্থাত্ মূর্তকে তিনি চূড়ান্ত নির্দেশ দিয়ে বলেন, “اخْرِجُوا الْكُفْرَ كَيْنِ مِنْ جَزِيرَةِ الْعَرَبِ” - “মূর্তিকুলদেরকে তোমরা ‘আরব জায়ীরা থেকে বের করে দেবে।”৯৯ আর হাদীসগুলোর প্রেক্ষিতে ইমামগণ বলেছেন, কোন অমুসলিমকে আরব ভূখণ্ডে স্থায়ীভাবে বসবাসের সুযোগ দেয়া যাবে না। তবে তারা যে কোন প্রয়োজনে সেখানে সরকারের অনুমতি কিংবা সম্মতিক্রমে প্রবেশ করতে পারবে, চলাফেরা করতে পারবে এবং সাময়িকভাবে অবস্থানও করতে পারবে।১০
উল্লিখিত যে, ‘আরব ভূখণ্ডে অমুসলিমদের প্রবেশ, বিচরণ ও বসবাসের ওপর বিশেষ বিধি-নিষেধের ব্যাপারে কারো কারো মনে প্রশ্ন জাগতে পারে। আসল কথা হল- ‘আরব ভূখণ্ডটি ইসলামের সংরক্ষিত অঞ্চল। এখানে কেবল তারাই সাধারণভাবে প্রবেশ ও বসবাস করতে পারবে, যারা দীন ইসলামকে বিশ্বাস করে। যেমন প্রত্যেক দেশেই কিছু সংরক্ষিত এলাকা থাকে, যেখানে সে দেশের সাধারণ নাগরিকও প্রবেশ করতে পারে না। দেশের সংরক্ষিত এলাকায় প্রবেশাধিকারের বিধি-নিষেধের ব্যাপারে প্রশ্ন উত্থাপন যেমন অবান্তর ও অযৌক্তিক, ঠিক তেমনিভাবে ‘আরব ভূখণ্ডে অমুসলিমদের প্রবেশ ও বসবাস করার ওপর যে বিধি-নিষেধ আছে, সে বিষয়ে প্রশ্ন উত্থাপন করাও নিতান্তই অবান্তর ও অযৌক্তিক।
টিকাঃ
৫। এটা অধিকাংশ ইমামের অভিমত। হানাফীগণের মতে- মক্কা নগরীতে অমুসলিমরা সরকারের অনুমতিতে কিংবা সমঝোতার ভিত্তিতে প্রবেশ করতে পারবে। আর মাদীনা শরীফে ব্যবসা-বাণিজ্য, আসবাবপত্র বহন, সংবাদ দান বা গ্রহণ প্রভৃতি যে কোন প্রয়োজনে অমুসলিমদেরকে প্রবেশ করতে বাধা দেয়া যাবে না।
৬। হাদীসে ‘আরব জায়ীরা’ দ্বারা কি বুঝানো হয়েছে- তা নিয়ে ইমামগণের মধ্যে মতপার্থক্য দেখা যায়। শাফি’ঈ ও হাম্বলী ইমামগণের মতে- এখানে ‘আরব জায়ীরা’ দ্বারা কেবল হিজাজ অর্থাৎ মক্কা ও মাদীনা এবং এরচতুর্পার্শ্বস্থ সকল জনপদসমূহকে বুঝানো হয়েছে। তবে মালিকী ও হানাফীগণের মতে- সকল বিচরণের দেশ তথা সমগ্র আরব ভূখণ্ডই ‘আরবজায়ীরা’ আরবের মধ্যে শামিল হবে। তাঁদের অনুসারগণও জাতীয়গণ আরবকে মনে করেন। ইমামান তিরমিযাহ ও আহমদ (ইহুয়ানায়ে দেশে বসবাসের) প্রভৃতি জনও অন্তর্ভুক্ত হবে। (ইবনু আবিদীন, রাদ্দুল মুখতার, খ.৪,পৃ.৩৩২; ইবনু কুদামা, আল-মুগনী, খ.৯,পৃ.২৫৫-৬)
৭। ইমাম মালিক, আল-মুওয়াত্তা, হা.নং: ১৩৮৮; আল-বুখারী, আল-মুনীছুল কুরআন, হা.নং:
৮। আল-বুখারী, আল-মুনীছ, হা.নং: ২৯২৬, ১৪০২,৪৩০৭; মুসলিম, আল-মুনীছ, হা.নং: ৩০৮৯
৯। ইবনু আবিদীন, রাদ্দুল মুখতার, খ.৪,পৃ.৩৩২; ইবনু কুদামা, আল-মুগনী, খ.৯,পৃ.২৫৫-৬
📄 ধর্ম-কর্ম পালনের স্বাধীনতা
ইসলামী রাষ্ট্রে অমুসলিমরা নিজেদের এলাকা ও পরিমণ্ডলে স্বাধীনভাবে স্ব স্ব ধর্ম-কর্ম প্রকাশ্য ঢংঢোল পিটিয়ে পালন করতে পারবে। তবে ‘একান্ত মুসলিম জনপদে’৪২ অগত্যাপ্রচ প্রাচ্য ধর্থ-কর্ম পালন করতে দেয়া থেকে তাদেরকে বাধ্য রাখা অসঙ্গত নয়। ইসলামী রাষ্ট্র প্রয়োজন মনে করলে এ ক্ষেত্রে কড়াকড়ি আরোপ করতে পারবে। মুসলিম জনপদগুলোতে তাদেরকে কেবল ক্রুশ ও প্রতিমাসাহী শোভাযাত্রা বের করতে এবং প্রকাশ্য ঢংঢোল বাজাতে বাজাতে বের হতে নিষেধ করা হবে। তবে মুসলিম জনপদের অভ্যন্তরে অমুসলিমদের প্রাচীন উপাসনালয় থাকলে তার অভ্যন্তরে তারা সকল ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালন করতে পারবে। ইসলামী সরকার তাকে কোন রূপ হস্তক্ষেপ করবে না।৪৩ হযরত উসামাহ্ (রা)-এর নেতৃত্বে সিরিয়া অভিমুখে অভিযান প্রেরণের সময় তাঁর প্রতি হযরত আবূ বাকর (রা)-এর একটি গুরুত্বপূর্ণ হিদায়াত এই ছিল যে,
وَسَوْفَ نُمْرِي زَاهِرًا بِقَوْمٍ قَدْ مَرِّغُوا أَنْفُسَهُمْ فِي الصَّوَاعِ فَنَذْمَهُمُ وَمَا مَرَّغُوا أَنْفُسَهُمُ “যাত্রাপথে তোমাদের সাথে এ রূপ অনেক লোকের সাক্ষাতও হবে, যারা তাদের জীবনকে উপাসনালয়ের মধ্যে উত্সর্গ করে দিয়েছে। তাদেরকে তোমরা তাদের অবস্থার ওপর ছেড়ে দেবে।”৪৪ অমুসলিমদেরকে তাদের বিবেকের বিরুদ্ধে কোন চিন্তা অবলম্বনে বাধ্য করা যাবে না। দেশের প্রচলিত আইনের বিরোধী নয় এমন যে কোন কাজ তারা আপন বিবেকের দাবি অনুসারে করতে পারবে। এ কারণে অমুসলিমকে ইসলাম গ্রহণ করার জন্য কোন রূপ চাপ সৃষ্টি করা নিষেধ নয়। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তা'আলা বলেন, وَلَا إِكْرَاهَ فِي الدِّينِ - “দীনের ব্যাপারে কোন জোর-জবরদস্তি নেই।”৪৫ অন্য আয়াতে আল্লাহ তা'আলা রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কে উদ্দেশ্য করে বলেন, إِنَّ اللَّهَ تَعَالَى أَمَرَ رَسُوْلُهُ ﷺ لَا يُعَادِيْ أَحَدًا - “তুমি কি লোকদেরকে মু’মিন হবার জন্য বাধ্য করবে?৪৪৪০ অর্থাত্ জোর করে কাউকে মু’মিন বানানো তোমার কাজ নয়। লোকদের নিকট আল্লাহ্ বাণী পৌঁছে দেওয়াই হল তোমার একান্ত দায়িত্ব। তবে তাতে কেউ ইসলামের সৌন্দর্যের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে স্বেচ্ছায় ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করলে তা ভিন্ন কথা। এ কারণে কোন অমুসলিম ইসলাম গ্রহণ করার পর যদি তা ত্যাগ করে এ প্রমাণিত হয় যে, সে একান্ত চাপে পড়ে বাধ্য হয়ে ইসলাম গ্রহণ করেছিল, তা হলে তার বেলায় মুরতাদের হুকম প্রযোজ্য হবে না। মুসলিমরা যে সব কাজকে পাপ ও অপরাধ মনে করে, অমুসলিমরা এ ধরনের কোন কাজকে বৈধ রূপে জানে (যেমন- মদ সেবন, শূকর পালন, ক্রয়-বিক্রয় ও তার গোস্ত ভক্ষণ, ক্রুশ বহন ও শূদ্র ধনি বাজানো এবং রামাদানের দিনে পানাহার প্রভৃতি) তা করতে তাদেরে বাধা দেয়া যাবে না, যদি না তারা তা প্রকাশ্যে মুসলিমদের মধ্যে সম্পাদন করে।৪৩ অমুসলিমরা তাদের জনপদের মধ্যে পুরাতন উপাসনালয়গুলোর সংরক্ষণ ও সরকারের পাশাপাশি নতুন উপাসনালয়ও তৈরি করতে পারবে। ‘একান্ত মুসলিম জনপদে’র অভ্যন্তরে নতুনভাবে অমুসলিমদের উপাসনালয় তৈরি করতে দেয়া যাবে না। তবে সেখানে তাদের প্রাচীন উপাসনালয় তৈরি এবং অস্থায়ী অনুষ্টান পালন করতে পারবে। মুসলিমদের হতে সে সব নগরীর পত্তন হয়েছে (যেমন- বাগদাদ, কুফা, বসরা, ওয়াসিত প্রভৃতি), সেখানে অমুসলিমদেরকে নতুনভাবে কোন উপাসনালয় তৈরির অনুমতি দেয়া হবে না। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, لَا تَنْهَى كُمْ فِي دَارٍ عَنْ مُفِيْهَا لَمْ يُصِيبُوا أَنْفُسَهُمْ بِالْإِسْلَامِ وَيُحَامِدُ مَا حَرَّبَ مِنْهَا - “ইসলামী ভূখণ্ডে কোন গির্জা না নির্মাণ করা যাবে, না কোন জীর্ণ শীর্ণ গীর্জার সংস্কার করা যাবে।”৪৪ অর্থাত্, এ ধরনের নগরীতে অমুসলিমদেরকে মদ সেবন ও শূকরের ক্রয়-বিক্রয় করা থেকেও বারণ করা হবে।৪৫ ইবনু ‘আব্বাস (রা) বলেন, “যে সব জনপদকে মুসলিমরা বাসযোগ্য বানিয়েছে, সেখানে অমুসলিমদের নতুন মন্দির, গীর্জা ও উপাসনালয় বানানো, বাদ্য বাজানো এবং প্রকাশ্যে শূকরের গোস্ত ও মদ বিক্রি করার অধিকার নেই। তবে অনারবদের হাতে আক্রান্ত, পরে মুসলিমদের হাতে বিজিত এবং মুসলিমদের বসতি স্বীকরণকারী জনপদে অমুসলিমদের অধিকার তাদের সাথে সম্পাদিত চুক্তির শর্তানুসারে নির্ধারিত হবে। মুসলিমরা তা মেনে চলতে বাধ্য হবে।”৪৬ যুদ্ধের মাধ্যমে হস্তগত অমুসলিম জনপদের উপাসনালয় দখল করার অধিকার ইসলামী সরকারের রয়েছে। তবে সৌজন্যবশত এ অধিকার ভোগ করা থেকে বিরত থাকা এবং উপাসনালয়গুলোকে যে অবস্থায় রয়েছে সে অবস্থায় বহাল রাখা উত্তম। বিশিষ্ট ফকীহ আল-কাসানী বলেন, “প্রাচীন উপাসনালয়গুলোকে ধ্বংস করা কোন অবস্থায়ই বৈধ নয়।”৫৪ হযরত উমার (রা)-এর আমলে যত দেশ বিজিত হয়েছে তার কোথাও কোন উপাসনালয় ভেঙে ফেলা হয়নি বা তাতে কোন ধরনের হস্তক্ষেপ করা হয়নি। হযরত আবূ বাকর (রা)-এর আমলে হীরাবাসীদের সাথে সম্পাদিত চুক্তিপত্রে এ কথাও লেখা হয়েছিল যে, “তাদের খানকাহ্ ও গীর্জাগুলো ধ্বংস করা হবে না। প্রয়োজনের সময় শত্রুর আক্রমণ থেকে আত্মরক্ষার জন্য যে সব ইমারত তারা আশ্রয় গ্রহণ করে থাকে সেগুলোও নষ্ট করা হবে না। নাথুক ও ঘণ্টা বাজাতে নিষেধ করা হবে না। আর উত্সবের সময় ক্রুশ বের করার ওপরও কোন বিধি-নিষেধ আরোপ করা হবে না।”৫৫ হযরত উমার ইবনু ‘আবদিল ‘আযীয (রহ.) আঞ্চলিক গভর্ণরদেরকে এ মর্মে নির্দেশ দান করেছিলেন যে, أَلَا تُهْدِمُوا بِمَا يَرَوْهُ وَلَا كَيْنَهُ وَلَا يَشْكِ تَا - “তারা যেন কোন উপাসনালয়, গীর্জা ও অগ্নিকুণ্ড ধ্বংস না করে।”৫৬
টিকাঃ
৫। একান্ত মুসলিম জনপদ বলতে সে সব অঞ্চলকে বুঝানো হয়, যে সব এলাকার কৃতপক্তি মুসলিমদেরকে ধারণাকল্পও এবং সে সব এলাকাকে মুসলিমরা ইসলামী অনুষ্ঠানাদি উপাসনাঘর জন্য নির্দিষ্ট করে নিয়েছে।
৬। আল-কাসানী, বাদাই’ই খ.৭,পৃ.১১৩
৭। তাবরী, জারীদুল উমাম ওয়া তামুল মুম্লুক খ.২,পৃ.৫৪৩
৮। আল-কুর’আন, ২ (সূরাতুল বাক্বারাহ) ২৫৬
৯। আল-কুর’আন, ১০ (সূরা ইউনুছ) ৯৯
৫১। আল-কাসানী, বাদাই’ই খ.৭,পৃ.১১২
৫২। আল-কাসানী, বাদাই’ই খ.৭,পৃ.১১২
৫৩। ইবনু কুদামা, আল-মুগনী, আল-মিদয়ায়াহ্., হা.নং: ৭৪৩১; ইবনু কুদামা, আল-মুগনী, খ.৯,পৃ.২৫৫
৫৪। ইবনু কুদামা, আল-মুদয়ায়াহ্, খ.৯,পৃ.২৫৫
৫৫। মাওদুদী, ইসলামে রাষ্ট্র অমুসলিম নাগরিকদের অধিকার ও মর্যাদা। পৃ.৫৭
📄 জীবিকা উপার্জন ও চাকুরীর অধিকার
জীবিকা উপার্জনের জন্য অমুসলিমরা তাদের যোগ্যতা ও সামর্থ্য অনুযায়ী স্বাধীনভাবে যে কোন কর্ম ও পেশা অবলম্বন করতে পারবে। তাদেরকে নিজেদের বিবেকের বিরুদ্ধে কোন কর্ম ও পেশা অবলম্বনে বাধ্য করা না। ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প-কারিগরি, কৃষি ও চাকুরী প্রকৃতির হার তাদের সকলের জন্য উন্মুক্ত থাকবে। এ সব ক্ষেত্রে মুসলিমরা যে সুযোগ-সুবিধা ভোগ করে থাকে, অমুসলিমরাও তা ভোগ করবে। তাদের মধ্যে কোন রূপ বৈষম্য সৃষ্টি করা চলবে না। চাকুরীতে নিয়োগের ক্ষেত্রে মুসলিম ও অমুসলিম নির্বিশেষে সকলের যোগ্যতার মাপকাঠি হবে একটাই এবং এ ধরণের তথায় পরিশেষে নয়, একমাত্র যোগ্যতার ভিত্তিতে নির্বাচন করা হবে।৫৭ মোগল সম্রাট আওরঙ্গকেব যখন রাষ্ট্রীয় উচ্চপদে অমুসলিমদের নিয়োগ দানের বিষয়ে প্রশ্ন করা হয়েছিল, তখন তাঁর জবাবে তিনি বলেছিলেন, “যোগ্য ব্যক্তিকে যথোপযুক্ত স্থানে নিয়োগ দেওয়াই হল ইসলামী শরীয়াহর নীতিমালা দাবি।”৬০ তাঁর ৩৫ বছরের শাসনামলে বহু হিন্দু-অমুসলিম প্রশাসন উচ্চপদে নিয়োগিত ছিল। যেমন জশবঙ্গ সিংহ, রাজা রামকরণ, কবির সিংহ, অর্জননাথ সিংহ, প্রেমদেব সিংহ, দীলিপ রায় ও রসিক লাল প্রমুখ। স্যার মার্ক্স শালীন খাঞ্চজা হুকুমের শাসনামলের কথা লেখেন এভাবে- “খ্রিষ্টান, পৌত্তলিক, ইহুদী ও মুসলিমরা ইসলামী সরকারের কর্মচারি হিসেবে সমান অধিকার নিয়ে কর্মরত ছিলেন।”৬১ তবে রাষ্ট্রের আদর্শ ও নিরাপত্তাগত প্রয়োজনে যে সব দায়িত্ব পালনের জন্য মুসলিম জনবল রয়েছে (যেমন- রাষ্ট্রপ্রধান, সেনাবাহিনী, মুসলিম আদালতের কাজী প্রভৃতি), সে সব ক্ষেত্রে অমুসলিমদেরকে নিয়োগ দেয়া যাবে না। এগুলো ছাড়া বাদবাকী সমগ্র প্রশাসনের বড় বড় সকল পদে (যেমন- মহা হিসাব রক্ষক, প্রধান হিসাব নিয়ন্ত্রক, মহাপ্রাপ্যশালী ও পোষ্ট মাষ্টার জেনারেল প্রভৃতি), এমনকি নির্বাহী ক্ষমতা সম্পন্ন বিভিন্ন মন্ত্রণালয়েও যোগ্যতা সাপেক্ষে অমুসলিমদেরকে নিয়োগ দেয়া যাবে না। অনুপভাবে সেবাবাহিনীতেও কেবল প্রত্যক্ষ যুদ্ধ সংক্রান্ত দায়িত্বের তাদেরকে নিয়োগ দেয়া যাবে না। তবে প্রত্যক্ষ যুদ্ধের সাথে সরাসরি সম্পর্কিত নয়- সামরিক বিভাগের এমন সব দায়িত্বে তাদেরকে নিয়োগ দিতে কোন বাধা নেই।৬২ উল্লেখ যে, রাষ্ট্রপ্রধান, সেনাবাহিনী, বিচারপতি ও এ ধরনের অন্য যে সব শীর্ষ পদে আসীন হয়ে সরকারের নীতির নির্ধারনে অংশীদারি হওয়ার কথা, সে সব পদে কোন অমুসলিম সমাসীন হতে পারবে না- এর কারণ কোন সংকীর্ণতা বা জাতি বিদ্বেষ নয়; বরং এর যথার্থ কারণ হল, ইসলামী রাষ্ট্র একটি আদর্শভিত্তিক রাষ্ট্র। তাই এ রাষ্ট্রের এ সব পদে এমন ব্যক্তিরাই প্রতিষ্ঠিত হতে পারবে, যারা এ আদর্শে খুব শিষ্টতা ভালোভাবে অনুবাদন করে এবং এদের প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস ও শ্রদ্ধা বলে মানে। এ সব লোক থেকেই এ আশা করা যেতে পারে যে, তারা পূর্ণ আন্তরিকতার সাথে নিজেদের দীন ও ইসলামী দায়িত্ব মনে করে এ রাষ্ট্রের যাবতীয় কাজ পরিচালনা করবে। অপরদিকে ইসলামী রাষ্ট্র যেহেতু নিষ্ঠা, আন্তরিকতা ও বিশ্বস্ততার ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে, তাই রাষ্ট্রের কোন অমুসলিম নাগরিক নিছক জীবিকা ও পদমর্যাদা লাভের খাতিরে এ ব্যবস্থার পরিচালনা ও উচ্চপদ সাধনের কাজে আত্মনিয়োগ করলে, ইসলাম তা পছন্দ করে না। কেননা যারা ইসলামের আদর্শে বিশ্বাসী নয়, তাদেরকে যদি রাষ্ট্রের উপযুক্ত শীর্ষ পদসমূহে আসীনও করা হয়, তবে তারা এ আদর্শের সিদ্ধিটি অনুসরণ করতে সক্ষম হবে না এবং সে অনুযায়ী কাজ করতেও পারবে না। আর এ আদর্শের জন্য তাদের সে রূপ আন্তরিকতাও সৃষ্টি হবে না, যার ওপর রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকার ভিন্ন প্রতিষ্ঠিত থাকবে।
টিকাঃ
৫৮। আল-কাসানী, বাদাই’ই খ.৭,পৃ.১১২
৫৯। আবু ইউসুফ, কিতাবুল খারাজ, পৃ.১১৪
৬০। আল-মাওছু আউন ফিক্বাহিয়া, খ.৭,পৃ.২৫১
৬১। বছরপ্রতি, কিরা দ্বিতীয় বা সামপ্রতিক সংকীর্ণ চিন্তাক মাত্র এক রাতের কোন পদে কাউকে নিয়োগ দেয়া ইসলামে মহত্বপূর্ণ। হযরত আবূ বাকর (রা) হযরত ইছাদ ইবনু আবী সুফইয়ান (রা) কে আমীর দিচ্ছিল ফিরিয়ায় প্রেরণের সময় ফরমান করেন, فَإِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْقِسْطَ إِنْ وَوَيْهِ هُمُ الْمُشْرِكُونَ تَقِفُ وَلَا تَقْتُلُوا وَلَا تَنْفِرُوا وَلَا تَتَغَرَّبُوا وَلَا تَتَرَيَّصُوا وَلَا تَتَبَطَّرُوا فِي الْأَرْضِ مَا جَاءَ بِهِ اللَّهُ وَلَا يَخْرُقْ وَلَا يَصْرِفُ مَرَةً سَنَّةً وَلَا يَضَعُ مُرَةً فِي مَعْرُوفٍ وَلَا يَسْرِفُ مَرَةً فِي مَحْفُوظٍ فَإِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ الْمُفْسِدِينَ “হে ইয়াযীদ, তোমার আত্মীয়-স্বজন রয়েছে। আমি তোমার দিক থেকে এটা সর্বাধিক আশঙ্কা করছি যে, তুমি বিজিত পক্ষ নিরোধের ব্যাপারে তাদেরকে অধিকার প্রদান করবে। অথচ রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন যে, কোন ব্যক্তি মুসলিমদের কোন কাজও দায়িত্ব দিতে হবে না। দায়িত্বশীলদের পদ থেকে কাজের কারণে তাদের বিভাগ দ্বারা যখন ইসলাম গ্রহণ করা হবে না তখন তাদের কর্তব্য হবে সকল জাতির সকল প্রকার জনপদের ক্ষমতা ও সকল ইছাদ (যারা কাজ করবে তারা তোমারা বা নিয়মিত) গ্রহণ করবে না, সে যখন ও তাকে দায়িত্বের দাবি দল করেন।” (আহমাদ, আল-মুনীব (মুসনাদু আবি বাকরা), হা.নং: ২১; হাকীম, আল-মুসতাদরাক্ব, কিতাবুল আহকাম, হা.নং: ৭৬৯৪)
৬০। নাজীব, শেখ মোহাম্মদ গোয়েব, ইসলামী রাষ্ট্রে অমুসলিম নাগরিক, সেবিনার শারক্ব এনু ২০০৮, বি.আই.বি, ঢাকা, পৃ.২০১
৬১। প্রাগুক্ত, পৃ.২১১
৬২। আল-মাওদুদী, আল-আহকামুল সুলতানিয়াহ্, পৃ. ৪৪; আল-মাওছু আল ফিক্বাহিয়া, খ.৭,পৃ.২৭১