📄 ইসলামী রাষ্ট্রের পরিচয়
ইসলামী রাষ্ট্র সর্বপ্রথম আল্লাহ তা'আলার প্রদত্ত বিধি-বিধানের ভিত্তিতে পরিচালিত একটি জনকল্যাণমূলক আদর্শবাদী রাষ্ট্র। কোন রাষ্ট্রকে ইসলামী রাষ্ট্র হতে হলে রাষ্ট্রের সকল দিক ও বিভাগে আল্লাহ্র বিধান কার্যকর করতে হবে। এখানে সরকারের স্বেচ্ছাচারিতার কোন সুযোগ নেই। আল-কুর'আন ও আস-সুন্নাহই ইসলামী রাষ্ট্রের মৌলিক আইন। অন্যান্য আইন এই মৌলিক আইনের অধীনেই তৈরি হয়। রাষ্ট্রপ্রধান এককভাবে রাষ্ট্রের প্রশাসন পরিচালনার জন্য বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার অধিকারী নন। তাঁকে দেশেরবাসীর প্রতিনিধিত্বশীল ব্যক্তিরা বা মজলিসে শুরার পরামর্শক্রমে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হয়।
ইসলামী রাষ্ট্রের প্রধান উদ্দেশ্য হল সামাজিক ন্যায় ও সুবিচার (Social Justice) প্রতিষ্ঠা করা। এখানে সকল মানুষই মানুষ হিসেবে একই রূপ সামাজিক মর্যাদার অধিকারী। প্রত্যেকেই নিজ নিজ যোগ্যতা, দক্ষতা ও শক্তি অনুযায়ী আত্মবিকাশের সুযোগ লাভ করে এবং আইন সকলের জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য হয়। এ সামাজিক সুবিচার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য ইসলামী রাষ্ট্রের বিচার বিভাগ সম্পূর্ণরূপে প্রশাসন বিভাগের প্রভাবমুক্ত হয়ে বিচার-ফায়সালা করে থাকে। এ কথা বলাই বাহুল্য যে, ইসলামে ন্যায় ও সুবিচার প্রত্যেক মানুষের সাথেই সম্পর্কিত। চাই সে মুসলিম হোক কিংবা অমুসলিম। মুসলিম হলে আত্ম-বিকাশের বেশি সুযোগ লাভ করে এবং অমুসলিম হলে কম সুযোগ লাভ করবে এবং মুসলিমরা অপরাধ করলে লঘু শাস্তি পাবে এবং অমুসলিমরা অপরাধ করলে গুরু শাস্তি পাবে- এ ধরনের অবস্থা ইসলামী রাষ্ট্রের বৈশিষ্ট্যের সম্পূর্ণ পরিপন্থী। এ কারণে ইসলামী রাষ্ট্রের রাষ্ট্রীয় আদর্শে যারা বিশ্বাসী নয় তাদের জীবন, সম্পদ ও 'ইফ্ফাতকে সার্বিক নিরাপত্তার বিধানের দায়িত্বও মুসলিমদের মতোই ইসলামী রাষ্ট্র কাঁধে তুলে নেয়। তারাও মুসলিমদের মতো একই রূপ নাগরিক অধিকার ও মর্যাদা ভোগ করে। আল্লাহ তা'আলা বলেন, أَرْسَلْنَا رُسُلَنَا بِالْبَيِّنَاتِ وَأَنْزَلْنَا مَعَهُمُ الْكِتَابَ وَالْمِيزَانَ لِيَقُومَ النَّاسُ بِالْقِسْطِ - "আমি আমার রাসূলগণকে সুস্পষ্ট নিদর্শনসহ প্রেরণ করেছি এবং তাঁদের সাথে অবতীর্ণ করেছি কিতাব ও মীযান (মানদণ্ড), যাতে মানুষ ন্যায়ের ওপর প্রতিষ্ঠিত হতে পারে।" এ আয়াতে আল্লাহ তা'আলা যুগে যুগে নবী-রাসূলগণের প্রেরণ ও কিতাবসমূহ অবতরনের যে উদ্দেশ্য ব্যক্ত করেছেন তা হল সামাজিক সুবিচার প্রতিষ্ঠা করা। এ সুবিচার যেমন রাষ্ট্রের মুসলিম নাগরিকদের মধ্যে প্রতিষ্ঠা করতে হবে, তেমনি অমুসলিম নাগরিকদের বেলাতেও সুবিচারের বিধান লঙ্ঘন করা যাবে না। এ প্রসঙ্গে অন্য আয়াতে আল্লাহ তা'আলা বলেন, إِنَّ اللهَ لَا يَنْهَاكُمْ عَنِ الَّذِينَ لَمْ يُقَاتِلُوكُمْ فِي الدِّينِ وَلَمْ يُخْرِجُوكُم مِّن دِيَارِكُمْ أَن تَبَرُّوهُمْ وَتُقْسِطُوا إِلَيْهِمْ إِنَّ اللهَ يُحِبُّ الْمُقْسِطِينَ. "দীনের ব্যাপারে যারা তোমাদের বিরুদ্ধে লড়াই করেনি এবং তোমাদেরকে তোমাদের দেশ থেকে বের করে দেয়নি, তাদের প্রতি সদ্ব্যবহার ও সুবিচার করতে আল্লাহ তা'আলা তোমাদেরকে নিষেধ করেননি। নিশ্চয় আল্লাহ তা'আলা সুবিচার কারীদেরকেই ভালোবাসেন।" এ আয়াতে সে সব অমুসলিম মুসলিমদের বিরুদ্ধে লড়াই করেনি এবং তাদেরকে দেশ থেকে বিতাড়নে অংশগ্রহণ করেনি তাদের সাথে সদ্ব্যবহার ও সুবিচার করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এ বক্তব্য অন্য আয়াতে আরো সুস্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। আল্লাহ তা'আলা বলছেন, بَلَى مَنْ أَوْفَى بِعَهْدِهِ وَاتَّقَىٰ فَإِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُتَّقِينَ - " - "একুশ "এবার কোন সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষ যেন কখনো তোমাদেরকে ন্যায়-বিচার পরিত্যাগ করতে উদ্বুদ্ধ না করে। সুবিচার কর। এটাই তাকওয়ার অধিকতর নিকটবর্তী।"৭ এ আয়াতে একাটভাবে এ নির্দেশ দেয়া হয়েছে যে, স্বজাতি ও বিজাতি নির্বিশেষে সবার বেলায় সুবিচার প্রতিষ্ঠা করতে হবে। কোন ভিন্ন জাতির ক্ষেত্রে বিদ্বেষবশত ন্যায় বিচারের বিধান লঙ্ঘন করা তাকওয়ার সম্পূর্ণ পরিপন্থী। বর্তমানে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় যদিও সামাজিক সুবিচারের কথা খুব জোরেশোরে উচ্চারিত হয়, কিন্তু বাস্তবে এর কার্যকারিতা দূর্লভ। আমরা অনেক দেশে দেখতে পাই, সকলের জন্য একই রূপ আইন কাগজে-কলমে আছে বটে, তবে তা সকলের জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য হয় না। তদনুযায়ী সমাজ ও রাষ্ট্রের সকল সুযোগ-সুবিধা সকলের জন্য সমানভাবে উপযুক্ত নয়; বরং কোথাও জাতি, কোথাও বর্ণ, কোথাও ধর্ম, কোথাও অঞ্চল, কোথাও পেশা, কোথাও ভাষা, কোথাও দল ও মতের ভিত্তিতে সমাজের সুবিধাভোগীদের বেগমপূর্ণভাবে বন্টন করা হয়। ইসলাম এ রূপ পক্ষপাপিত্বমূলক অন্যায় আচরণকে হারাম ও মহাপাপ গণ্য করে।
টিকাঃ
৪. আল-কুর'আন, ৫৭ (সূরাতুল হাদীদ)ঃ ২৫।
৫. আল-কুর'আন, ৬০ (সূরাতুল মুমতাহিনাহ)ঃ ৮।
৬. আল-কুর'আন, ৩০ (সূরাতুর মায়িদাহ)ঃ ৭৬
৭. আল-কুর'আন, ৫ (সূরাতুল মায়িদাহ)ঃ ৮।
📄 পাবলিক কোর্টে বিচার
মুসলিমদের মতোই অমুসলিমরাও রাষ্ট্রের ইসলামী আদালতে বিচার দায়ের করতে এবং তা মেনে চলবে। তবে অমুসলিমদের জন্য পৃথক বিচারালয় তৈরি, বিশেষ করে তাদের নিজস্ব পারিবারিক আইন এবং পৃথক বিচার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা এবং সেখানে অমুসলিম বিচারক কর্তৃক তাদের অপরাধ ও দাবী-দাওয়াগুলোর বিচারের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। ইসলামী আদালতে বিচার দায়ের হলে মুসলিম বিচারক কর্তৃক তাদের বিচারের ফায়সালা করা হবে এবং এর জন্য ইসলামী আইন অনুযায়ী ফায়সালা করবেন। অন্য আইনে ফায়সালা করা তার জন্য বৈধ হবে না। চাই বাদী-বিবাদী দুজনেই অমুসলিম হোক কিংবা একজন অমুসলিম এবং অপরজন মুসলিম হোক। ৯২২ আল্লাহ তা’আলা বলেন, وَأَنِ احْكُم بَيْنَهُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ وَلَا تَتَّبِعْ أَهْوَاءَهُمْ وَاحْذَرْهُمْ أَن يَفْتِنُوكَ عَن بَعْضِ مَا أَنزَلَ إِلَيْكَ. “আর আপনি তাদের পারস্পরিক ব্যাপারগুলোয় আল্লাহ্র নাযিলকৃত বিধান অনুযায়ী ফায়সালা করুন। তাদের প্রবৃত্তির অনুসরণ করবেন না এবং তাদের থেকে সতর্ক থাকুন, যেন তারা আপনাকে এমন কোন নির্দেশ থেকে বিচ্যুত না করে, যা আল্লাহ তা’আলা আপনার প্রতি নাযিল করেছেন।” ৯২৩
টিকাঃ
৯২২. আল-মাওসুআ আল-ফিকহিয়্যাহ, খ. ৭, পৃ. ১০৭
৯২৩. আল-কুরআন, ৫ (সূরাতুল মা’ইদাহ) : ৪৯
📄 অমুসলিমদের নাগরিকত্ব নষ্টের কারণ
অমুসলিম নাগরিকদের নাগরিক মর্যাদা রক্ষা করা এবং তাদের অধিকারসমূহ নিশ্চিত করা ইসলামী রাষ্ট্রের একান্ত দায়িত্ব। যারা যত বড় অপরাধীই করুক, এ জন্য তাদের নাগরিকত্ব বাতিল হবে না। যদি কিজিয়া বন্ধ করে দিয়ে, কোন মুসলিমকে হত্যা করলে, কোন মুসলিম নারীর ধর্মকে পরিবর্তন করলে মুসলিম, আলেম ও মুজাহিদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সম্পর্কে আপত্তিকর ও অশালীন মন্তব্য করলেও তাদের নাগরিকত্ব বাতিল হবে না। এ সব অপরাধের জন্য অবশ্যই শাস্তি দেওয়া হবে। তবে নিম্নের দুটি অবস্থায় তাদের নাগরিকত্ব বাতিল হয়ে যায়। ১. প্রথমত যদি সে ইসলামী রাষ্ট্র থেকে চলে গিয়ে শত্রুপক্ষের গিয়ে বসবাস শুরু করে। ২. দ্বিতীয়ত যদি সে ইসলামী রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে বিদ্রোহে লিপ্ত হয়ে দেশে নৈরাজ্যকর অবস্থা সৃষ্টি করে। অধিকাংশ ইমামের মতে- অমুসলিমরা চুক্তি ভঙ্গ জীবইয়া দ্বারা করা থেকে বিরত থাকলে তাদের নাগরিক চুক্তি বাতিল হবে না। তবে হানফীগণের মতে- এ অবস্থায়ও তাদের নাগরিকত্ব বাতিল হবে না। কেননা এ রূপ অবস্থায় আর্থিক অনটন ও অভাবের কারণে সে জিযইয়া আদায় করতে পারে না, এ ধরনের আশঙ্কা থাকতে পারে। আর এ রূপ সন্দেহজনক অবস্থায় কারো নাগরিকত্ব বাতিল করা ন্যায়-নীতি বিরোধী হবে। ৯২৪
টিকাঃ
৯২৪. আল-কাসানী, বাদাই', ৭:৭,১:১১০; ইবনু বুজ্জামান, আল-বাহরুর রাইক্ব, ৫:৬,৭:১৩৯; ইবনু কুদামাহ, আল-মুগনী, ৪:৬,৭:২৯৩
📄 অমুসলিমদের অধিকার সংরক্ষণে মুসলিম শাসকগণের ভূমিকা
রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর ওফাতের পর তাঁর সরাসরি খলীফাগণ অমুসলিমদের অধিকার আদায়ে প্রতি যত্নবান ছিলেন। তাঁরাও রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর মত ইসলামী রাষ্ট্রে অমুসলিমদের সাথে পারস্পরিক সৌহার্দ্য ও সদ্ভাবের সাথে বসবাস করার দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন। তাঁরা অমুসলিম অধিবাসীদের অধিকার ও স্বাধীনতা এভাবে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন যে, মানবাধিকারের ইতিহাসে তার নজীর অভূতপূর্ব।
হযরত আবু বকর (রা) অমুসলিমদের অধিকার রক্ষার ব্যাপারে খুব বেশি সচেতন ছিলেন। একবার তিনি জানতে পারলেন, ইয়ামামার গর্ভধারিণী মজুবির ইবনু আবী উমাইয়াহ মুসলিমদেরকে বিছিন্ন করে গুরুত্বপূর্ণ চাপাবানানে অভিযুক্ত জনৈকা অমুসলিম মহিলার হাত কর্তন করেছেন এবং দাঁত উপড়ে ফেলেছেন, তখন হযরত আবু বকর (রা) তাঁকে ভর্ৎসনা করে পত্র লিখেন,
أَمَّا بَعْدُ فَلْيَمُنِّي أَنْ تُكَلِّفَ اِمرَأَةٌ فِي أَنْ تَهَبَ الْحِسَاءَ الْمُسْلِمِينَ وَرَفَعَتْ تَبَنَّتُهَا فَإِنْ كَانَتْ مَبْتَدَأَ وَفْهُمُ الظَّنِّ وَإِنْ كَانَتْ وَثَبَتْ فَلْتُغْرِي لَمَّا صَفَّتْ عِنْدَ مِنْ أَعْرَادِ الْعَطَاءِ. وَهَذَا سَهْلٌ لِّمَن تَأَمَّلَ
“আমার কাছে খবর পৌঁছেছে, মুসলিমদের বিরুদ্ধে রুটনা করার কারণে তুমি এক মহিলার হাত কর্তন করেছ এবং দাঁত উপড়ে ফেলেছ। এ কাজ মোটেই ঠিক হয়নি। কারণ সে মুসলিম দলভুক্ত হলে তাকে সতর্কীকরণই যথেষ্ট ছিল। আর মিথ্যাচরণ তো শিরক মিশ্রিত এবং আল্লাহর বিরুদ্ধাচরণ করেছ। তবু আমরা তাদের এ রায়ে বাধ্য করে দিয়েছি। এমতাবস্থায় মুসলিমদের বিরুদ্ধে প্রতারণা ভয়ানক কোন অপরাধ নয়।” -সর্বশেষে তিনি এটাও লিখেন যে, `وَهَذَا سَهْلٌ لِّمَن تَأَمَّلَ`। “তোমার এই অন্যায় যেহেতু প্রথম, তাই এবারের মতো মার্জনা করা হল। নতুবা এর জন্য তোমাকে কঠোর সাজা ভোগ করতে হবে।” ১৫৯
হযরত উমার (রা) তাঁর গভর্নরদেরকে অমুসলিম নাগরিকদের অধিকার পূরণ করতে, তাদের রক্ষায় জন্য লড়াই করতে এবং তাদের ওপর সাধ্যের বাইরে কিছু না চাপাতে নির্দেশ দেন। ১৬০ জেরুসালেম যখন বালিকা উমার (রা)-এর কাছে আত্মসমর্পণ করে, তখন এ বিজিত নগরীর অধিবাসীদের ধর্ম ও সম্পদ তাদের হাতেই ছিল এবং তাদের উপাসনালয়ও অক্ষুণ্ণ ছিল। খ্রিস্টানদের এবং তাদের প্রধান যাজক ও তার অনুসারীদের বসবাসের জন্য নগরের একটি এলাকা ছেড়ে দেওয়া হল। বিজয়ী মুসলিমরা এ পবিত্র নগরীতে তাদের ধর্মীয় অধিকার খর্ব তো করলই না; বরং উৎসাহিত করল। ৪৩০ বছর পর জেরুসালেমের খ্রিস্টীয় ধর্মযাজকদের মাধ্যমে খ্রিস্ট শাসনে চলে গেলে প্রাচ্যের খ্রিস্টানরা সদাসয় বালিকার শাসনের অবসানে অনুশোচনা করেছিল। গ্রীস থেকে ওমান পর্যন্ত বিশাল ভূখণ্ডের অধিবাসী পাখীরা তাদের আবাসভূমি ছেড়ে মুসলিম বিজয়ের ধর্মাধ্বন গ্রহণ করেছিল এবং আফ্রিকার আফ্রিকা অঞ্চল থেকে কার্যকর পূর্বেই ইসলাম পৌছার সাথে সাথে খ্রিস্টান ধর্ম একেবারে বিলীন হয়ে যায়। এ বিশাল এলাকা জুড়ে এ ধর্মবিজয়ের কারণ নতুন ধর্ম সহনশীলতার অভাব নয়; পুরাতন ধর্মবিশ্বাসীদের জীবন ও ধর্ম বিলুপ্তির কারণও পরিমিত। ইসলামের দীর্ঘ ইতিহাসে কোথাও কোন অমুসলিমকে স্বধর্ম ত্যাগ করানে ইসলাম গ্রহণ করার জন্য জোর করা হয়েছে-এর কোন নজীর নেই। টমাস আর্নল্ড বলেছেন, “অমুসলিমদেরকে জোরপূর্বক ইসলাম গ্রহণ করাবার কোন প্রচেষ্টা কিংবা খ্রিস্টান ধর্ম নির্মূল করবার উদ্দেশ্যে কোন নির্যাতনও কখনও আমি শুনিনি।” ১৬১ ঐতিহাসিক ফিনলে বলেন, “যেখানে আরবরা কোন খ্রিস্টান দেশ জয় করেছে সে ক্ষেত্রে ইতিহাস প্রমাণ করে যে, বিজিত দেশের জনগণ ইসলামের দ্রুত প্রসারে প্রতি সমর্থন জানিয়েছে। দু'জনলোক যে, অধিকাংশ খ্রিস্টানরা সরকারের শাসনব্যবস্থা বিজয়ী আরবদের চেয়ে দুর্বিষহ ছিল। সিরিয়ার জনগণ মুজাহেদের আনুগত্য জানাতো। মিশরীয় খ্রিস্টানরা তাদের দেশ আরবদের অধীনে নিয়ে যেতে সাহায্য করল। আর আফ্রিকার খ্রিস্টান বারবারা তো মুসলিমদেরকে আফ্রিকা বিজয়ে অনুপ্রেরণা করেছিল। কন্সটান্টিনোপাল সরকারের বিরুদ্ধে এ দেশগুলোর তীব্র ঘৃণার জন্য তারা মুসলিম শাসককে বরণ করে নিল।” ১৬২
এ কথা অনস্বীকার্য যে, পরবর্তী রাজ্যত্নুলে মুসলিম অমুসলিমদের অনেক জায়গায় যুলম ও নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন। তবে মদিনাতে কোথাও অমুসলিমদের সাথে আচরণ করা হয়েছে, তাদের অধিকার ক্ষুণ্ণ হয়েছে, তখন মুসলিম মনীষীগণ সর্বদা মজলুম অমুসলিমদের পক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন।
বর্ণিত রয়েছে যে, উমাইয়াহ শাসক ওয়ালীদ ইবন আবদুল মালিক দাফয়ের ইউহান্না গীর্জারপুর্ব দিকে নিনিয়ের মাসজিদের অস্তিত্বও রদ করে নিয়েছিলেন। হযরত উমার ইবন আবদিল আযীয় (রহ.) ক্ষমতায় এসে খ্রিস্টানদের এ ব্যাপারে তাঁর কাছে অভিযোগ করল। তিনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে লিখে পাঠালেন, মাসজিদের যে উঁচু অংশ গীর্জার জায়গার উপর নির্মাণ করা হয়েছে, তা ভেঙ্গে খ্রিস্টানদের হাতে সোপর্দ করে দাও। ১৬৩
অপর একজন অমুসলিম একদিন ওয়ালিদ উমার ‘আবদিল আযীয় (রহ)-এর দরবারে আপীল করে যে, আব্বাস ইবনুল ওয়ালীদ অন্যায়ভাবে তার ভূমি দখল করে রেখেছে। ওয়ালীদ ‘আবাসকে জিজ্ঞেস করেন : “এ অমুসলিম ব্যক্তির দাবীর ব্যাপারে তোমার বক্তব্য কি? আব্বাস জবাব দিল, “আমার পিতা ওয়ালীদ এ ভূমি আমার জায়গীরদারীতে অর্পণ করেছেন।” এ কথা শুনে অমুসলিম ব্যক্তিটি বলল, “আমাকুল মু’মিনীন! আপনি আল্লাহর কিতাবের অনুসারী কায়সালাম করুন।” ওয়ালীদ বললেন, “আব্বাস! আল্লাহর কিতাব অনুসারী অমুসলিমদের ভূমি জোর দখল করতে তাতে জায়গীরদারী দেওয়া যায় না।” আব্বাস বললো, “আপনার কথা সত্য; কিন্তু আমার নিকট ওয়ালীদ এর অধিকার প্রমাণপত্র রয়েছে। আপনার পূর্বের একজন খলিফার ফরমান রদ করার কী অধিকার আপনার আছে?” ওয়ালীদ জবাব দিলেন,
نَعَم، كِتَابُ اللَّهِ أَحَقُّ أَنْ يُتْبَعَ مِنْ كِتَابِ الْوَلِيدِ. فَمَا فَارْزُدَهُ عَلَيْهِ.
“ওয়ালিদের প্রমাণপত্রের চাইতে আল্লাহর কিতাবই অধিকতর উঁচ এবং তুমি অমুসলিমকে ফেরৎ দিয়ে দাও।” ১৬৪
ইমাম আবু ইউসুফ (রা.) 'আকাসীয়া খালীফা হারুনুর রশীদকে ওসিয়ত করেন, "অমুসলিম নাগরিকদের সাথে সদয় আচরণ করবেন, তাদের খোঁজ-খবর নেবেন, যাতে তারা কোন রূপ অন্যায়-অবিচার্যের সম্মুখীন না হয়, কষ্টে পড়ে না যায়, সাধ্যের বাইরে তাদের ওপর যেন কোন বোঝা চাপানো না হয় এবং অন্যায়ভাবে তাদের থেকে কোন সম্পদ যেন গ্রহণ করা না হয়।" ১৬৩
টিকাঃ
১৫৯. বুখারী, তারীখুল উসাম ওয়াল ফুআদ খ.২, পৃ. ৫০১
১৬০. আল-সা’আদাবী, কিতাবুল খুলাফা, হা.নং : ১৬৫২
১৬১. আর্নল্ড, অফ-ডিপেন্ডিং কুনান দিয়াবলু, খ.১, পৃ. ১০৯
১৬২. নাজিফ, দ্রুততত্ত্ব, পৃ.১৯৮ (Finlay-এর History of the Byzantine Empire গ্রন্থ থেকে সংগৃহীত)
১৬৩. আল-বালাদুর, ফুতুহুল বুলদান, হা.নং : ১৩৯২
১৬৪. ইবনু কাসীর, আল-বিদায়াতু ওয়াল নিহায়াহ, খ.৬, পৃ. ২৯৩
১৬৩. আবু ইউসুফ, কিতাবুল খারাজ, পৃ.৭১