📘 ইসলামি অর্থব্যবস্থার ইতিহাস > 📄 সূচক

📄 সূচক


সূচকের গুরুত্ব দুইদিক দিয়ে: প্রথমত, ঋণদাতা ও ঋণগ্রহীতার মাঝে ন্যায় নিশ্চিত করা। দ্বিতীয়ত, এটা নিশ্চিত করা যে, ব্যবসায়িক ব্যবস্থা এখনো বৈধ। দ্বিতীয় প্রশ্নটির উত্তর প্রথমটির চেয়ে অনেক সহজতর। আর তা হলো টাকার মূল্যমানের ওঠানামা ব্যবসায়িক চুক্তির বৈধতাকে প্রভাবিত করে না। এরকম পরিবর্তন সত্ত্বেও আইনসিদ্ধ বলে বিবেচনা করা হয় এসব চুক্তিকে। এসব ব্যবসায়িক ব্যবস্থায় সম্পর্কের ভিত্তি হলো লাভ-ক্ষতির ভাগাভাগি। টাকার মূল্যমানে তারতম্য দেখা দিলে তা অংশীদারদের সেভাবেই প্রভাবিত করে, যেভাবে তারা ব্যবসার শুরুতে সমঝোতায় এসেছিল। কারো প্রতি কোনো ক্ষতি বা অন্যায় হয় না। কিন্তু ধার দেওয়ার বিষয়টা জটিলতর। সুদের হার উপস্থিত থাকলে ঋণ পরিশোধের দিনে টাকার মান আগের চেয়ে কমে গেলেও ঋণদাতার ক্ষতি তাতে পূরণ হয়ে যেত। কিন্তু মুদ্রাস্ফীতি দেখা দিলে ইসলামি পদ্ধতিতে ঋণদাতার প্রতি অন্যায় হতে পারে। ঋণ দেওয়ার সময় টাকার যে আসল মূল্য ছিল, ফেরত পাওয়ার সময় তিনি পাচ্ছেন তার চেয়ে কম।
লক্ষণীয় যে, সোনা ও রুপাকে মুদ্রা হিসেবে ব্যবহার করার ক্ষেত্রে কিন্তু এই বিতর্ক আসে না। কারণ সেক্ষেত্রে একই পরিমাণের এবং একই মানের সোনা বা রুপা ফেরত দিতে হবে। বিতর্কটি বিশেষভাবে এবং শুধুমাত্র মুদ্রার অন্য সব রূপের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, যেগুলো তার মধ্যে থাকা দামি ধাতুর শক্তির চেয়ে বরং সরকারি কর্তৃত্বের শক্তি বেশি বহন করে। এর উদাহরণ হলো সোনা বা রুপার চেয়ে কম দামি ধাতু দিয়ে তৈরি করা মুদ্রা (যেমন তামা) এবং আধুনিক যুগে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কোষাগারের অনুমোদনের মাধ্যমে তৈরি করা মুদ্রা (যেমন ব্যাংকনোট)।
এ বিষয়টি আজকের যুগের ইসলামি অর্থনীতিবিদদের মতো মধ্যযুগের মুসলিম ফকিহগণকেও ভাবিয়েছে। আর ফকিহগণ এ ব্যাপারে পরম কোনো ঐক্যমত্যে আসেননি; একেক মাযহাবের একেক মত ছিল। ফকিহগণের ঐক্যমত্য ও দ্বিমতগুলোর সারমর্ম ঈসা এভাবে তুলে ধরেছেন (ঈসা, ১৯৯৩):
➡ প্রথম মত: মুদ্রার মূল্যমানে যে ধরনের পরিবর্তনই আসুক না কেন, ঋণগ্রহীতা যতটুকু ঋণ নিয়েছে, ওই পরিমাণ অর্থই ঋণদাতাকে ফেরত দেবেন। এটি প্রধানত রিবা পরিহার করার জন্য।
➡ দ্বিতীয় মত: ঋণের চুক্তি বা ভবিষ্যতে মূল্য পরিশোধযোগ্য বিক্রয়ের চুক্তি সম্পন্ন হওয়ার সময় টাকার যে "আসল” মূল্যমান ছিল, ঋণগ্রহীতা সেটি প্রদান করবেন। এর কারণ প্রধানত মূল্যের আধার হিসেবে টাকার আসল মূল্যমান সংরক্ষণ করা।
➡ তৃতীয় মত: বিবেচনায় নেয় যে, টাকার মূল্যমানের পার্থক্যটা কি নামেমাত্র না গোনায় ধরার মতো। যদি নামেমাত্র হয়ে থাকে, তাহলে ঋণকৃত টাকার সমপরিমাণই পরিশোধ করতে হবে। যদি গোনায় ধরার মতো হয়ে থাকে, তাহলে মূল্যমান হ্রাসের কারণে ঋণদাতাকে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। কতটুকু হলে গোনায় ধরার মতো হবে, এই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে আলোচ্য পরিস্থিতিতে প্রচলিত ব্যবসায়িক চর্চার বিবেচনায়। এটা একটা মাঝামাঝি সমাধান, যা ওপরে উদ্ধৃত মত দুটির মাঝে সামঞ্জস্যবিধান করে।
ইসলামি অর্থনীতিবিদগণ এই জটিল সমস্যার উত্তর বের করার বিতর্কে নিজ নিজ মতামত সংযোজন করে চলেছেন। মধ্যযুগের ফকিহদের বিভিন্ন মত আলোচনা করার পর হাসানুজ্জামান সূচকের পক্ষে মত দেন। বলেন যে, ইসলামি আইনের অধীনে সূচক অবৈধ নয় (হাসানুজ্জামান, ১৯৮৫)। ইকবাল সূচকের পক্ষে। তিনি এমন একটি সাধারণ দরের মাত্রা ব্যবহার করার পরামর্শ দেন, যা দেশের সকল ঋণের সাথে সম্পর্কিত হবে। সরকার ক্রমাগত দরের মাত্রা পর্যালোচনা ও ঘোষণা করে চলবে (ইকবাল, ১৯৮৭)। আবদুল মান্নানের মতে টাকার মূল্যমানে পরিবর্তন যেহেতু আধুনিক যুগে অপরিহার্য হয়ে পড়েছে, সেহেতু ঋণের সূচকীকরণ ঋণদাতার প্রতি ন্যায়ানুগ আচরণ সংরক্ষণে সহায়তা করবে (মান্নান, ১৯৮১)। ঈসা এই বিষয়টি বিশদভাবে আলোচনা করার পর এই মতের পক্ষে ঝুঁকেছেন যে, টাকার আসল মূল্যমান হ্রাস পাওয়ার কারণে ঋণদাতাকে ওই পরিমাণ ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। তার মতে সূচকের পদ্ধতিটি হওয়া উচিত একটি এককের সাথে টাকার মূল্যমানের সম্পর্ক স্থাপন করার মাধ্যমে। এই এককের মূল্যমান নির্ধারিত হবে সুনির্দিষ্ট কোনো পরিমাণের মূল্যের সাপেক্ষে। যেমন এক গ্রাম স্বর্ণ (ঈসা, ১৯৯৩)। বিতর্ক অবশ্য এতেই শেষ হয়ে গিয়েছে বলে মনে হয় না। এমন কোনো ঘটনা এখন পর্যন্ত জানা নেই, যেখানে মূল্যমান হ্রাস পাওয়ার কারণে ইসলামি ব্যাংক আর্থিক ক্ষতিপূরণ দাবি করেছে।

📘 ইসলামি অর্থব্যবস্থার ইতিহাস > 📄 অর্থনৈতিক উন্নয়ন

📄 অর্থনৈতিক উন্নয়ন


বেশির ভাগ ইসলামি অর্থনীতিবিদের কাছে অর্থনৈতিক উন্নয়ন একটি কেন্দ্রীয় ও অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এর কারণ মূলত দুটি—ইসলামি অর্থনীতি থেকে সুদ বিলুপ্ত করা এবং যাকাতের প্রভাব ফিরিয়ে আনা। সুদ বিলোপ করার ফলে সম্পদ ও উৎপাদনের উন্নয়ন এবং ভূমি-পুঁজি ও শ্রমের গুরুত্বের ওপর আরও বেশি জোর দেওয়া হয়। যাকাতের ব্যাপারটি হলো ফলাফল বা আয়ের বণ্টন এবং সম্পদের ন্যায়ানুগ স্থানান্তর নিশ্চিতকরণ। তাই প্রত্যক্ষভাবে হোক বা পরোক্ষভাবে, অর্থনৈতিক উন্নয়নের বিষয়টি স্বভাবতই ইসলামি অর্থনীতিতে গভীরভাবে প্রোথিত। এর সাথে আরও কারণ যোগ করা যায়। যেমন ইসলামি অর্থনীতি তার দর্শন, কার্যক্রম ও লক্ষ্যের বিচারে অন্যান্য অর্থনীতি থেকে আলাদা। তাই বিষয়টির প্রকৃতির কারণেই ইসলামি অর্থনীতিবিদদের মাঝে ইসলামি দৃষ্টিকোণ থেকে অর্থনৈতিক উন্নয়ন সংক্রান্ত লেখালেখির তাড়না কাজ করতে পারে।
লেখালেখি-সহ অন্য যে-কোনো মাধ্যমে মত প্রকাশকারী সকল ইসলামি অর্থনীতিবিদ একমত যে, ইসলামি অর্থনীতি হলো মূল্যবোধ-ভিত্তিক। তাই ইসলামে অর্থনৈতিক উন্নয়নেরও একই পূর্বশর্ত থাকতে হবে। লেখকদের মাঝে যে মতপার্থক্য, তা সূক্ষ্মতর বিষয়গুলোতে। জোরারোপের মাত্রা এবং উন্নয়ন-সংক্রান্ত বিষয়াদি পর্যবেক্ষণের দৃষ্টিকোণ নিয়ে।
খুরশিদ আহমাদ রচিত বইটি রেফারেন্স হিসেবে খুব ব্যবহৃত হয়। তাঁর Economic Development in an Islamic Framework-এর উদ্ধৃতি প্রায়শ দেওয়া হয়। এটি যথাযথ মনোযোগের দাবিদার। আহমাদ অতি আগ্রহ সহকারে নতুনত্বের আহ্বান জানান এবং আমদানিকৃত ধ্যানধারণার বিরোধিতা করেন। সেসব ধ্যানধারণা পশ্চিমা পুঁজিবাদের রূপে পশ্চিম থেকে আসুক কিংবা সমাজতন্ত্রের রূপে প্রাচ্য থেকে। এ দুই তন্ত্রের কোনোটিই মুসলিম দেশগুলোকে অর্থনৈতিক উন্নয়নের আদর্শ নমুনা দিতে সক্ষম নয়। ইসলামি অর্থনীতির কাঠামোতে এগুলো সংস্থান করারও অনুপযোগী (আহমদ, ১৯৮০)। ইসলামি অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রধান ধাক্কাটা হতে হবে— মানবজীবনকে উদ্দেশ্য করে। এর লক্ষ্য হবে জীবনকে উদ্দেশ্যমণ্ডিত ও মূল্যবোধ-কেন্দ্রিক গড়ে তোলা। তাই ইসলামি অর্থনৈতিক উন্নয়ন দুটি ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত। হবে:
➡ কুরআন-সুন্নাহয় বর্ণিত মূল্যবোধ অনুযায়ী ইসলামি কাঠামোর ভেতরে থেকে উন্নয়ন সাধন, এবং
➡ অনুকরণ-প্রবণতা বিলোপ করা (প্রাগুক্ত)।
ইসলামি অর্থনৈতিক উন্নয়নের দার্শনিক ভিত্তিকে তুলে ধরা হয়েছে এভাবে:
➡ (ক) তাওহিদ, আল্লাহর এককত্ব ও সার্বভৌমত্ব;
➡ (খ) আল্লাহর রুবুবিয়্যাত, জীবিকা ও জীবনধারণের ঐশী ব্যবস্থাপনা এবং এই জিনিসগুলোকে তাদের পূর্ণতার দিকে ধাবিত করা;
➡ (গ) খিলাফাহ, পৃথিবীতে আল্লাহর প্রতিনিধি হিসেবে মানুষের ভূমিকা; এবং
➡ (ঘ) তাযকিয়্যা, অন্তরের পরিশুদ্ধি ও পরিবৃদ্ধি (প্রাগুক্ত)।
এই চারটি দার্শনিক খুঁটির ভিত্তিতে ও আলোকে খুরশিদ আহমাদ ইসলামি দৃষ্টিকোণ থেকে উন্নয়নের ধারণাকে নিয়ন্ত্রণকারী পরিসীমা চয়ন করেছেন। এগুলো হলো প্রধানত (প্রাগুক্ত):
➡ (১) উন্নয়নের ইসলামি ধারণাটি বিশদ প্রকৃতির। এতে নৈতিক, আত্মিক, ও জাগতিক দিকসমূহ অন্তর্ভুক্ত।
➡ (২) উন্নয়ন-প্রচেষ্টার মূল লক্ষ্য এবং উন্নয়ন-প্রক্রিয়ার উপাদান হলো মানুষ। এটা এই অর্থে যে, উন্নয়ন মানে মানুষের উন্নয়ন এবং তার দৃশ্যমান ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক পরিবেশের উন্নয়ন। একই মত ড. আবদুল হামিদ গাযালি বলে গেছেন তার "অর্থনৈতিক উন্নয়নের ইসলামি কৌশলের ভিত্তি মানুষ”-এ (গাযালি, ১৯৯৪)।
➡ (৩) ইসলামি অর্থনৈতিক উন্নয়ন একটি বহুমাত্রিক কর্মকাণ্ড।
➡ (৪) ইসলামি অর্থনৈতিক উন্নয়নের লক্ষ্য হলো অর্থনৈতিক উন্নয়নের উপাদানসমূহের মাঝে পরিমাণগত ও মানগত ভারসাম্য অর্জন করা।
➡ (৫) সামাজিক জীবনের গতিশীল মূলনীতিগুলোর মাঝে ইসলাম বিশেষভাবে দুটির ওপর জোরারোপ করেছে: প্রথমত, মানুষের প্রতি আল্লাহপ্রদত্ত সম্পদসমূহের যথাযথ ব্যবহার, এবং দ্বিতীয়ত, সেগুলোর ভারসাম্যপূর্ণ ব্যবহার, বণ্টন এবং ন্যায়বিচারের ভিত্তিতে সকল মানবীয় সম্পর্কের উন্নয়ন। পরিশেষে আহমাদ ইসলামি অর্থনৈতিক উন্নয়নের লক্ষ্যসমূহকে চিত্রায়িত করেছেন এভাবে (প্রাগুক্ত):
➡ (১) মানবসম্পদের উন্নয়ন।
➡ (২) ব্যবহার উপযোগী উৎপাদনের প্রসার, যাতে তিনটি অগ্রাধিকারযোগ্য ক্ষেত্র রয়েছে: (ক) খাদ্য এবং অন্যান্য মৌলিক প্রয়োজনীয় জিনিসের প্রাচুর্যময় উৎপাদন ও জোগান, (খ) প্রতিরক্ষামূলক প্রয়োজনীয়তা এবং (গ) মৌলিক পণ্যসমূহের উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা।
➡ (৩) জীবনমানের উন্নয়ন, যাতে রয়েছে: (ক) কর্মসংস্থান সৃষ্টি, (খ) একটি কার্যকর ও প্রশস্ত ভিত্তিবিশিষ্ট সামাজিক নিরাপত্তাব্যবস্থা, (গ) আয় ও সম্পদের সাম্যপূর্ণ বণ্টন এবং (ঘ) ভারসাম্যপূর্ণ উন্নয়ন।
➡ (৪) নতুন প্রযুক্তি।
➡ (৫) বহির্বিশ্বের ওপর নির্ভরশীলতা হ্রাস এবং মুসলিম বিশ্বের মধ্যে বৃহত্তর সমন্বয়।
ইসলামি অর্থনৈতিক উন্নয়নের এই দার্শনিক ভিত্তি বা নীতিগত লক্ষ্যের ব্যাপারে কোনো মতানৈক্য না থাকাই স্বাভাবিক। এই ভিত্তিগুলো মুসলিম বিশ্বাসের প্রতিফলন এবং ইসলামি শিক্ষার অন্তরে নিহিত। মুসলিম অর্থনীতিগুলোর মাঝে নিবিড়তর সহযোগিতার জন্য সাধারণভাবে সকল মুসলিমের ও বিশেষভাবে ইসলামি অর্থনীতিবিদদের সর্বজনীন অনুভূতি ফুটে উঠেছে এই লক্ষ্যসমূহে।
এরপর যে কাজটি আমাদের মনোযোগ আকর্ষণ করছে তা হলো দোনিয়ার Islam and Economic Development (Donia, 1979)। প্রায় ৪৫০ পৃষ্ঠা জুড়ে ড. দোনিয়া দারিদ্র্যের সমস্যাটিকে নিরীক্ষণ করেছেন। এখানে তার লক্ষ্য ছিল ইসলামি রাষ্ট্র তা নিয়ে কিভাবে কাজ করেছে। তাও আবার এমন এক সময়ে, যখন ইসলামি অর্থনীতি ছাড়া আর কোনো অর্থনৈতিক উন্নয়ন নীতিমালা ছিল না। পজিটিভ ইকোনমিকসে অর্থনৈতিক উন্নয়নের তত্ত্ব, অনৈসলামিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় অর্থনৈতিক উন্নয়ন, ইসলামি অর্থনৈতিক উন্নয়নের ধারণাগত কাঠামো, এবং ইসলামি অর্থনৈতিক উন্নয়নের ঐতিহাসিক প্রয়োগ পর্যবেক্ষণ করেন লেখক। তারপর তিনি “ইসলামের পক্ষে কি অর্থনৈতিক উন্নয়নের একটি কার্যকর ও সমন্বিত পদ্ধতি প্রদান করা সম্ভব, যা অন্যান্য অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সুবিধাগুলো নিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি সেগুলোর অসুবিধা থেকেও বেঁচে থাকতে পারবে?” প্রশ্নটির ইতিবাচক উত্তর দেন। এই উত্তরের প্রমাণাদি নিজের গবেষণাকর্মে উল্লেখের পর লেখক এই সিদ্ধান্তগুলোতে পৌঁছান (Donia, 1979, অনূদিত):
➡ (১) ন্যায়, সাম্য, ও কল্যাণের মানদণ্ডে পরিচালিত অর্থনৈতিক উন্নয়ন হলো ইসলামের নির্দেশিত একটি কর্তব্য। এই কর্তব্যগুলো পালনের দায়িত্ব রাষ্ট্রের এবং সামষ্টিকভাবে মানুষের ওপর আরোপিত, যারা যৌথভাবে আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য। উল্লেখ্য, ইসলামি বিশ্বাসমালা এবং মুসলিমরা কতটা শক্তভাবে এগুলো মেনে চলে, তা এসব দায়িত্ব সম্পন্ন করার অবিচ্ছেদ্য অংশ। কার্যক্রম যা-ই হোক, তার সাফল্য নির্ভর করে এতে জড়িত মানুষদের বিশ্বাসের ওপর।
➡ (২) অর্থনৈতিক শ্রম (জীবিকা অর্জনের জন্য শ্রম) কর্মক্ষম প্রতিটি মুসলিমের কর্তব্য। এর মধ্যে একমাত্র গ্রহণযোগ্য অংশ সেগুলো, যা ইসলামি রীতিনীতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। কর্মের লক্ষ্য, ধরন ও প্রভাব হতে হবে ইসলামি আদর্শের সীমারেখার মধ্যে। কর্মের কোনো অংশ যদি ইসলামি দৃষ্টিকোণ থেকে অগ্রহণযোগ্য হয়ে থাকে, তাহলে তা হারাম হবে। এরকম কর্ম থেকে মানুষের বিরত থাকা বাঞ্ছনীয়। তাই ইসলামি অর্থনৈতিক উন্নয়ন এমন হতে হবে, যা সংশ্লিষ্ট কারো ক্ষতিসাধন করে না। হোক সে ব্যক্তি বা রাষ্ট্র, ভোক্তা বা উৎপাদক।
➡ (৩) দায়িত্ব গ্রহণের একমাত্র গ্রহণযোগ্য মানদণ্ড হলো কর্মদক্ষতা। ইসলামি দর্শন অনুযায়ী এটি দুটি অবিচ্ছেদ্য উপাদানের ওপর নির্ভরশীল-সক্ষমতা ও একনিষ্ঠতা।
➡ (৪) জ্ঞান, বিজ্ঞান ও তথ্যের সরবরাহ একটি সামাজিক দায়িত্ব, যাতে সরকার সাহায্য করবে। রাষ্ট্র ও ব্যক্তি যৌথভাবে এর জন্য দায়বদ্ধ। যে জ্ঞান সমাজের উপকারে কাজে লাগে না, তা অগ্রহণযোগ্য। তাই ইসলামের দাবি হলো বিজ্ঞান ও এর প্রয়োগের মাঝে সম্পর্ককে বিশেষভাবে জোরদার করা।
➡ (৫) অর্থনৈতিক উন্নয়নের ওপর সম্পদের মালিকানার প্রভাব রয়েছে। ইসলাম দ্বৈত মালিকানা, ব্যক্তিগত মালিকানা ও গণমালিকানার অনুমোদন দেয়। ইসলামি অর্থনৈতিক উন্নয়ন সংক্রান্ত লেখালেখিতে শেষেরটিকে বিশেষভাবে প্রভাবশালী ভূমিকা প্রদান করা হয়েছে।
➡ (৬) অর্থনৈতিক উন্নয়নের অর্থায়ন প্রসঙ্গে সরকারি ও ব্যক্তিগত বিভিন্ন ধরনের উৎসকে ইসলাম অনুমোদন দেয়। বিশেষভাবে জোর দেওয়া হয়েছে অর্থনৈতিক উদ্বৃত্তের ব্যবস্থাপনার ওপর।
➡ (৭) ইসলামি অর্থনৈতিক উন্নয়নের একটি পূর্বশর্ত হলো যৌক্তিক অর্থনৈতিক পরিকল্পনা।
(৮) আয় ও সম্পদের ন্যায়ানুগ বণ্টন ইসলামি উন্নয়নের অত্যাবশ্যক অংশ। এর মাধ্যমে সকলের প্রয়োজনীয় চাহিদার একটি নিম্নতম মাত্রা যেমন পূরণ করতেই হবে, তেমনি সমাজে আয় ও সম্পদের মাত্রায় অবধারিত পার্থক্য থাকার বিষয়টিকেও স্বীকার করতে হবে।
ওপরের সারমর্মে দুটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। দোনিয়া দেখিয়েছেন:
➡ উৎপাদন অংশে অর্থনৈতিক উন্নয়ন রাষ্ট্র ও ব্যক্তির যৌথ দায়িত্ব। রাষ্ট্রের একার দায়িত্ব না;
➡ বণ্টন অংশে ব্যক্তি তার সামর্থ্য অনুযায়ী যতদূর সম্ভব ধনী হতে পারবে। শর্ত শুধু একটাই—দরিদ্রকে একটা পর্যায় পর্যন্ত জীবিকা সরবরাহ নিশ্চিত করা। তা ছাড়া শ্রম হতে হবে এমন, যা সমাজের জন্য কল্যাণকর। উৎপাদনের ক্ষেত্রেও একই কথা। আর জনসমাজে সার্বিকভাবে ন্যায়পরায়ণতার প্রভাব থাকতে হবে।
এবার আমরা মনোনিবেশ করব এক শিয়া আলিমের অনন্য এক কাজের ওপর। এ বিষয়ে তার লেখালেখি তার সমসাময়িকদের মাঝে এবং ইসলামি অর্থনীতিবিদদের কাছে ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হয়েছে। তা হলো বাকির আস-সাদর রচিত ইকতিসাদুনা।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00