📄 মুসলিম দেশসমূহের মাঝে অর্থনৈতিক সহযোগিতা
মুসলিম দেশসমূহের মাঝে অর্থনৈতিক সহযোগিতার বিষয়টি ইসলামি অর্থনীতিবিদদের বেশ মনোযোগ আকৃষ্ট করেছে। স্বভাবতই সার্বিকভাবে সহযোগিতার আহ্বান জানানো হয়। জোর দেওয়া হয় অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক সমস্যা থেকে মুক্তিলাভের জন্য এর গুরুত্বের ওপর। অবশ্য পদ্ধতির বৈচিত্র্য এবং জোরারোপের পরিমাণের বিভিন্নতা রয়েছে। প্রায় দুই দশক আগে ইউসরি একটি সমন্বিত ইসলামি সমবায় ব্যবস্থার প্রস্তাবনা রেখেছিলেন। এর লক্ষ্য হবে অনৈসলামিক অর্থনৈতিক গোষ্ঠীর ওপর থেকে নির্ভরতা বিলোপ করা। এটি হতে পারে নিম্নলিখিত মূলনীতিসমূহের ভিত্তিতে (ইউসরি, ১৯৮৫):
➡ (১) উৎপাদন ও রপ্তানিতে বৈচিত্র্যের প্রবর্তন ঘটানো, যার ফলে মুসলিম দেশগুলো একপণ্য (one-product) অর্থনৈতিক অবস্থা থেকে মুক্তি লাভ করবে। এটি এসকল দেশের একটি অর্থনৈতিক বৈশিষ্ট্য। শিল্পখাতে অগ্রসর দেশগুলোতে একটি বা দুটি কাঁচামাল রপ্তানি করার ওপরই দেশগুলো নির্ভরশীল হয়ে থাকে।
➡ (২) মুসলিম দেশগুলোর মাঝে বহুজাতিক ইসলামি বিনিয়োগের প্রচারণা।
➡ (৩) ইসলামি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রচারণা এবং এগুলোর প্রতিষ্ঠা ও কার্যক্রম পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় সহযোগিতা প্রদান।
➡ (৪) এমন এক ইসলামি শুল্ক ব্যবস্থার প্রয়োগ, যা মুসলিম দেশগুলোর জন্য উপযুক্ত হবে।
➡ (৫) অনৈসলামিক দর্শন-নির্ভর অর্থনৈতিক সংস্থায় যোগ দেওয়া থেকে বিরত থাকা।
➡ (৬) মুসলিম দেশগুলোর মাঝে একটি ইসলামি কাস্টমস ইউনিয়ন স্থাপন করা, যেখানে এই দেশগুলো তাদের উৎপাদন কর্মকাণ্ড বিশেষভাবে পরিচালনা করতে পারবে। এর উদ্দেশ্য হবে তুলনামূলক কম খরচ এবং নিজেদের মাঝে যথাযথভাবে সম্পদ বণ্টনের সুবিধা অর্জন করা।
➡ (৭) একটি ইসলামি কেন্দ্রীয় পরিকল্পনা পর্ষদ স্থাপন করা, যা মুসলিম দেশগুলোর মাঝে অর্থনৈতিক নীতিমালার সমন্বয় সাধনে সাহায্য করবে। সেইসাথে এসব দেশে ইসলামি পদ্ধতিতে বিনিয়োগ করতে চাওয়া বিনিয়োগকারী ও উদ্যোক্তাদেরও সাহায্য করবে এটি।
➡ (৮) ইসলাম যে পারস্পরিক ভ্রাতৃত্বের আদেশ করে, তার ভিত্তিতে মুসলিম দেশগুলোর মাঝে সহযোগিতা থাকতে হবে।
বলাবাহুল্য, ইউসরি তার প্রস্তাবিত পরিকল্পনার উপকারিতা নিয়ে বেশ বিস্তারিত আলাপ করেছেন।
মুসলিম দেশগুলোর মাঝে অর্থনৈতিক সহযোগিতার এই একই বিষয়টি নিয়ে শাইখ যাকিও আলোচনা করেছেন। তিনি মনোনিবেশ করেছেন মুসলিম দেশগুলোতে ব্যাপক আকারে ছড়িয়ে পড়া সমস্যা এবং সেগুলোর টেকসই সমাধান অনুসন্ধানের ওপর (যাকি, ১৯৮০)। এগুলো হলো:
➡ (ক) সম্পদ ও আয়ের ভুল বণ্টন;
➡ (খ) একপণ্য অর্থনীতি;
➡ (গ) পুঁজির সংকট;
➡ (ঘ) দক্ষ ও অভিজ্ঞ শ্রমিকের অভাব;
➡ (ঙ) নিম্নমানের প্রযুক্তি;
➡ (চ) শিল্পখাতে উন্নত প্রযুক্তি প্রয়োগের অভাব;
➡ (ছ) সমন্বিত কৌশলগত পরিকল্পনার অভাব এবং
➡ (জ) মুসলিম দেশগুলোর মাঝে সমন্বয়ের অভাব।
এই সমস্যাগুলো কিভাবে সামাল দেওয়া যায়, সে ব্যাপারে যাকি বিভিন্ন পরামর্শ দিয়েছেন। প্রাকৃতিক, মানবীয় ও আর্থিক অর্থনৈতিক সম্পদের উন্নত ব্যবহার, শিল্পায়ন ত্বরান্বিতকরণ এবং কৃষিখাতের উন্নয়ন এসব পরামর্শের মাঝে কয়েকটি উদাহরণ (প্রাগুক্ত)।
এই লেখকগণের বিশ্লেষণের দুই দশক পর এসব সমস্যার কতটুকু এখনো বিরাজমান, তা আন্দাজ করা তেমন কঠিন কিছু নয়। ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক ওআইসিভুক্ত দেশগুলোর জন্য বহুল প্রয়োজনীয় অর্থায়ন ও পুঁজি সরবরাহে প্রশংসনীয় ভূমিকা পালন করছে। তারপরও অনেক কাজ বাকি। প্রযুক্তির প্রয়োগ বাড়ছে, দক্ষ শ্রমিক আগের চেয়ে অনেক বেশি সুলভ, আর গত প্রায় দুই দশকে দারুণভাবে উন্নত হয়েছে অবকাঠামো। কিন্তু কৌশলগত পরিকল্পনা এবং মুসলিম দেশসমূহের মাঝে সমন্বয়ে এখনো অনেক অসুবিধা বিদ্যমান।
তা ছাড়া ওআইসিভুক্ত দেশগুলোর মাঝে আন্তঃআঞ্চলিক বাণিজ্য এখনো খুবই সীমিত। যেমন, ইউরো জোনের অর্ধেক থেকে চার-পঞ্চমাংশ পর্যন্ত বাণিজ্য জোনের সদস্য দেশগুলোর সাথেই সংঘটিত হয়। কিন্তু ২০০১ সালে ওআইসিভুক্ত দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ বাণিজ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে মাত্র প্রায় ১১ শতাংশ এবং আমদানির ক্ষেত্রে ১৪ শতাংশ। নিচে ছক ৯.১-এ তা দেখানো হয়েছে।
মুসলিম বিশ্বে অর্থনৈতিক উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বৈষম্য এবং হরেক রকম অর্থনৈতিক কাঠামো রয়েছে। তাই মুদ্রাগত ঐক্য স্থাপনের চূড়ান্ত লক্ষ্য নিয়ে মুসলিম দেশগুলোর মাঝে নিজেদের মুদ্রায় সামঞ্জস্য আনার শর্ত পূরণ করা সম্ভব বলে মনে হয় না (Wilson, 2004)। যথাযথ মুদ্রাগত ঐক্য সফল হওয়ার জন্য মানডেল (১৯৬১) ও ম্যাককিনন (১৯৬৩) তিনটি শর্তের কথা বলেছেন।
➡ প্রথমত, সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মাঝে সম্পদ, বিশেষত শ্রম ও পুঁজি স্থানান্তরযোগ্য হতে হবে;
➡ দ্বিতীয়ত, অর্থনৈতিক কাঠামো একইরকম হতে হবে;
➡ তৃতীয়ত, মুদ্রা, অর্থ ও অন্যান্য অর্থনৈতিক নীতিমালার মাঝে সমন্বয় সাধনের সদিচ্ছা থাকতে হবে।
মানডেল ও ম্যাককিনন আরও বলেছেন যে, সফল মুদ্রাগত ঐক্যের জন্য পুঁজির মুক্ত চলাচলের পাশাপাশি কিছু আর্থিক বাজার সমন্বয়ও পূর্বশর্ত। এই শর্তগুলো ওআইসিভুক্ত দেশগুলোতে পূরণ হয় না। সব ওআইসি দেশের মাঝে শ্রম স্থানান্তরে বিধিনিষেধ রয়েছে। তা ছাড়া ওয়ার্ক পারমিটের ওপর ক্রমেই বেড়ে চলেছে বিধিনিষেধ। এর মাধ্যমে বিদেশিদের বদলে স্থানীয় নাগরিকদের কর্মসংস্থানকে উৎসাহিত করা হয় (Wilson, 2004)। তা ছাড়া বাস্তবতা হলো, মুসলিম অর্থনীতিগুলোর মধ্যে পুঁজির প্রবাহ একেবারেই কম। এটি পুঁজিবাজারের সীমিত মাত্রা ও পোর্টফোলিও বিনিয়োগ প্রবাহের বিধিনিষেধের আংশিক প্রতিফলন। ব্যতিক্রম শুধুমাত্র সৌদি আরব ও মালয়শিয়া, যেখানে পুঁজিবাজার ৪০০ বিলিয়ন ডলারের চেয়ে বেশি। তা ছাড়া সেখানে সরকারি বন্ডে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বাণিজ্য হয়ে থাকে, যার মাঝে মালয়শিয়ার সুকুক সার্টিফিকেটও অন্তর্ভুক্ত।
**ছক ৯.১: ওআইসি সদস্য রাষ্ট্রসমূহের মাঝে অন্তঃবাণিজ্য, ২০০১**
| দেশের নাম | অন্তঃ-রপ্তানি (ইউএস ডলার বিলিয়ন) | অন্তঃ-রপ্তানির ভাগ % | অন্তঃ-আমদানি (ইউএস ডলার বিলিয়ন) | অন্তঃ-আমদানির ভাগ % |
|---|---|---|---|---|
| আলজেরিয়া | ১.৩৩ | ৬.৮ | ০.৯১ | ৭.৯ |
| বাংলাদেশ | ০.২২ | ৩.৮ | ০.৮৮ | ৯.৮ |
| মিশর | ০.৭৬ | ১৮.৪ | ১.৬৮ | ১৩.২ |
| ইন্দোনেশিয়া | ৪.৮১ | ৭.৪ | ৪.৭৪ | ১২.২ |
| ইরান | ৩.৬৮ | ১৪.০ | ২.৪৫ | ১৩.৩ |
| ইরাক | ১.০৪ | ৯.৪ | ১.১০ | ২১.২ |
| জর্দান | ১.১৯ | ৫১.৮ | ১.৪২ | ২৯.১ |
| কুয়েত | ২.১২ | ১১.৩ | ১.৭১ | ২১.৭ |
| মালয়শিয়া | ৪.৯৫ | ৫.৬ | ৪.৭১ | ৬.৪ |
| মরক্কো | ০.৫০ | ৭.০ | ১.৮৮ | ১৭.১ |
| পাকিস্তান | ১.৯৮ | ২১.৫ | ৪.৪৫ | ৪৩.৬ |
| সৌদি আরব | ১০.৩৩ | ১৪.৭ | ৩.৩৯ | ৮.০ |
| সিরিয়া | ১.৩১ | ২৪.০ | ০.৯৪ | ১৪.৮ |
| তিউনিসিয়া | ০.৭৩ | ১১.১ | ০.৯২ | ৯.৭ |
| তুর্কিয়ে | ৩.৯০ | ১২.৫ | ৫.২৭ | ১২.৭ |
| সংযুক্ত আরব আমিরাত | ৬.০৬ | ১৫.১ | ৯.০০ | ২০.৮ |
| ইয়েমেন | ০.৪৯ | ১৪.০ | ১.১৭ | ৩৮.৫ |
উৎস: ইসলামি ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক, বার্ষিক প্রতিবেদন, ১৪২৩ হি., জেদ্দা, ২০০৩, পৃ. ৬৩
প্রায় পঁচিশ বছর আগে দেওয়া ইউসরির পরামর্শের বিপরীতে মুসলিম দেশ থেকে পুঁজি প্রবাহিত হচ্ছে উল্টো পশ্চিমা বিশ্বে। ছক ৯.২-এ উল্লেখিত বেশির ভাগ পোর্টফোলিও বিনিয়োগ প্রবাহে অন্তঃপ্রবাহের বদলে দেখা যাচ্ছে মুসলিম বিশ্ব থেকে উন্নত দেশ থেকে বহিপ্রবাহ। ইসলামি বিশ্বে প্রধান কার্যালয়বিশিষ্ট বহুজাতিক কোম্পানির অভাব মুসলিম দেশগুলোর মাঝে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) সীমিত করে দিচ্ছে। এমনকি মুসলিম অর্থনীতিসমূহ এবং পুরো বৈশ্বিক অর্থনীতির মাঝে এফডিআই চলাচল একেবারেই সামান্য, যা ছক ৯.২ থেকে দেখা যায়।
মুসলিম বিশ্বে অর্থবাজারের সমন্বয় আরেকটি কারণে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। তা হলো পুঁজি রপ্তানির ওপর সর্বজনীনভাবে প্রযুক্ত বিদেশি লেনদেন নিয়ন্ত্রণ। GCC রাষ্ট্রগুলো প্রধানতম ব্যতিক্রম। যদিও এসব দেশে উদ্ভূত তহবিল ইসলামি বিশ্বের পরিবর্তে বহুলাংশে পশ্চিমে বিনিয়োগ হয় (Wilson, 2004)।
মুসলিম মুদ্রাগত ঐক্য সফল হতে হলে অভিন্নতার মানদণ্ড নির্ধারণ ও পূরণ করতে হবে। মাস্ট্রিক্টে যেসব মানদণ্ডের ব্যাপারে ঐক্যমত্য হয়েছে এবং পরে ঋণ মানদণ্ড বাদে বহুলাংশে ইউরো ব্যবহারকারী দেশগুলোতে প্রযুক্ত হয়েছে, মুসলিম দেশগুলোকেও সেগুলোর অনুরূপ হতে হবে।
**ছক ৯.২: নির্বাচিত মুসলিম অর্থনীতিসমূহে পুঁজির অন্তঃপ্রবাহ ও বহিপ্রবাহ**
| দেশের নাম | ব্যক্তিগত K/GDP % ১৯৯০* | ব্যক্তিগত K/GDP % ২০০২* | FDI/GDP % ১৯৯০** | FDI/GDP % ২০০২** |
|---|---|---|---|---|
| বাংলাদেশ | ০.৯ | ২.৬ | 0.0 | ০.১ |
| মিশর | ৬.৮ | ৬.৬ | ১.৭ | ০.৮ |
| ইন্দোনেশিয়া | ৪.১ | ৫.৪ | ১.০ | ২.১ |
| ইরান | ২.৬ | ২.৪ | 0.0 | 0.0 |
| জর্দান | ৬.৩ | ৭.৮ | ১.৭ | ০.৯ |
| কুয়েত | ১৯.৩ | ১৮.৯ | ১.৩ | ০.৫ |
| মালয়শিয়া | ১০.৩ | ১৯.৯ | ৫.৩ | ৫.৮ |
| মরক্কো | ৫.৫ | ৩.৩ | ০.৬ | ১.৪ |
| পাকিস্তান | ৪.২ | ৫.৩ | ০.৬ | ১.৪ |
| সৌদি আরব | ৮.৮ | ১৩.৯ | ১.৬ | ০.৫ |
| সিরিয়া | ১৮.০ | ১৬.৮ | 0.0 | ১.৫ |
| তিউনিসিয়া | ৯.৫ | ১০.৬ | ০.৬ | ৩.৮ |
| তুর্কিয়ে | ৪.৩ | ৭.৭ | ০.৫ | ০.৭ |
| ইয়েমেন | ১৬.২ | ৩.৬ | ২.৭ | ১.১ |
টীকা: * FDI ও পোর্টফোলিও বিনিয়োগ অন্তপ্রবাহ ও বহিপ্রবাহের সমষ্টি ** FDI অন্তপ্রবাহ ও বহিপ্রবাহের সমষ্টি
উৎস: ওয়ার্ল্ড ডেভেলপমেন্ট ইন্ডিকেটরস, বিশ্বব্যাংক, ওয়াশিংটন, ২০০৪।
মুদ্রাস্ফীতির হারের তারতম্য তুর্কিতে ৪০% আর GCC রাষ্ট্রগুলোতে প্রায় শূন্য (বিশ্বব্যাংক, ২০০২)। সুদের হারের পার্থক্য ও লেনদেন হারের চলাচলেও এই বৈষম্য ফুটে ওঠে। তাই অভিন্নতার সম্ভাবনা খুবই কম (প্রাগুক্ত)।
তারপরও মুসলিম দেশগুলোর মাঝে কাস্টমস ইউনিয়ন প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে ইউসরির ভবিষ্যদ্বাণী কিংবা সুপারিশ আংশিকভাবে বাস্তবায়িত হয়েছে। GCC তে মুক্তবাণিজ্য অর্জন করা সহজ ছিল। তেল রপ্তানির কারণে এই দেশগুলো অনুকূল বাণিজ্যিক অবস্থানে রয়েছে। আর আমদানি পরিশোধেও কোনো বিধিনিষেধ ছিল না। গভীর সমন্বয় আসে ২০০২ সালে, যখন মুক্তবাণিজ্য অঞ্চলকে স্থগিত করে দেয় একটি কাস্টমস ইউনিয়ন। প্রতিটি GCC রাষ্ট্র পাঁচ শতাংশের একটি সাধারণ ট্যারিফ গ্রহণ করে। আর পণ্য চলাচলের ওপর থেকে সরিয়ে দেওয়া হয় অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ (Looney, 2003)। সাধারণ বাজারের অনেক পূর্বশর্ত GCC দেশগুলোতে আগে থেকেই রয়েছে। বিশেষত পুঁজি বা স্থানীয় নাগরিকদের চলাচলে কোনো বাহ্যিক বিধিনিষেধ নেই। তাই আরও নিবিড় অর্থনৈতিক সমন্বয়ের দিকে এগোনোর ব্যাপারে একমত হওয়া তুলনামূলক সহজ হয়ে যায়। যেহেতু একক মুদ্রাকে কার্যকর কাস্টমস ইউনিয়নের আবশ্যক পূর্বশর্ত হিসেবে ধরা হয়, তাই এই পদক্ষেপটুকু নেওয়াটাই ছিল স্বাভাবিক (আয-যোবাইদি, ২০০২)। GCC'র লক্ষ্য হলো ২০০৫ সালের মাঝে মুদ্রাগত ঐক্য অর্জন করা। আর একক মুদ্রা হিসেবে হয়তো দিনারকে নির্ধারণ করা হতে পারে, যা বিদ্যমান ছয়টি মুদ্রাকে প্রতিস্থাপিত করবে ২০১০ সালের মধ্যে।
এই সম্ভাব্য সমস্যাগুলোর কোনো সরল স্বল্পমেয়াদি সমাধান নেই। দেখা যাক, উৎপাদিত পণ্যের উল্লেখযোগ্য পরিমাণ রপ্তানি এবং সেবা থেকে প্রাপ্ত উপার্জনবিশিষ্ট আরও মুসলিম দেশ দীর্ঘমেয়াদে নতুন এই মুদ্রা গ্রহণ করে নেয় কি না। সেইসাথে উপসাগরীয় দিনারকেও পরিণত হতে হবে সত্যিকার অর্থে ইসলামি দিনারে। তাহলে লেনদেনের হার ও জ্বালানির দামের মাঝে সম্পর্ক দুর্বল হয়ে পড়বে। ইসলামি দিনার ব্লকের বৈদেশিক লেনদেনের আয় তখন হবে আরও বৈচিত্র্যময় ও ভারসাম্যপূর্ণ। এটি সহায়তা করবে মুদ্রার স্থিতিশীলতা তৈরিতে। বৈচিত্র্যের জন্য সত্যিকারের প্রণোদনা তৈরি হবে। সেটা নতুন সদস্য অন্তর্ভুক্ত করার মাধ্যমে ব্লককে প্রশস্ত করার মাধ্যমে যেমন, তেমনি ব্লকের বিদ্যমান রাষ্ট্রগুলোর রপ্তানি ও সেবাখাতের উপার্জন-ক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমেও (Wilson, 2004)।
📄 সূচক
সূচকের গুরুত্ব দুইদিক দিয়ে: প্রথমত, ঋণদাতা ও ঋণগ্রহীতার মাঝে ন্যায় নিশ্চিত করা। দ্বিতীয়ত, এটা নিশ্চিত করা যে, ব্যবসায়িক ব্যবস্থা এখনো বৈধ। দ্বিতীয় প্রশ্নটির উত্তর প্রথমটির চেয়ে অনেক সহজতর। আর তা হলো টাকার মূল্যমানের ওঠানামা ব্যবসায়িক চুক্তির বৈধতাকে প্রভাবিত করে না। এরকম পরিবর্তন সত্ত্বেও আইনসিদ্ধ বলে বিবেচনা করা হয় এসব চুক্তিকে। এসব ব্যবসায়িক ব্যবস্থায় সম্পর্কের ভিত্তি হলো লাভ-ক্ষতির ভাগাভাগি। টাকার মূল্যমানে তারতম্য দেখা দিলে তা অংশীদারদের সেভাবেই প্রভাবিত করে, যেভাবে তারা ব্যবসার শুরুতে সমঝোতায় এসেছিল। কারো প্রতি কোনো ক্ষতি বা অন্যায় হয় না। কিন্তু ধার দেওয়ার বিষয়টা জটিলতর। সুদের হার উপস্থিত থাকলে ঋণ পরিশোধের দিনে টাকার মান আগের চেয়ে কমে গেলেও ঋণদাতার ক্ষতি তাতে পূরণ হয়ে যেত। কিন্তু মুদ্রাস্ফীতি দেখা দিলে ইসলামি পদ্ধতিতে ঋণদাতার প্রতি অন্যায় হতে পারে। ঋণ দেওয়ার সময় টাকার যে আসল মূল্য ছিল, ফেরত পাওয়ার সময় তিনি পাচ্ছেন তার চেয়ে কম।
লক্ষণীয় যে, সোনা ও রুপাকে মুদ্রা হিসেবে ব্যবহার করার ক্ষেত্রে কিন্তু এই বিতর্ক আসে না। কারণ সেক্ষেত্রে একই পরিমাণের এবং একই মানের সোনা বা রুপা ফেরত দিতে হবে। বিতর্কটি বিশেষভাবে এবং শুধুমাত্র মুদ্রার অন্য সব রূপের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, যেগুলো তার মধ্যে থাকা দামি ধাতুর শক্তির চেয়ে বরং সরকারি কর্তৃত্বের শক্তি বেশি বহন করে। এর উদাহরণ হলো সোনা বা রুপার চেয়ে কম দামি ধাতু দিয়ে তৈরি করা মুদ্রা (যেমন তামা) এবং আধুনিক যুগে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কোষাগারের অনুমোদনের মাধ্যমে তৈরি করা মুদ্রা (যেমন ব্যাংকনোট)।
এ বিষয়টি আজকের যুগের ইসলামি অর্থনীতিবিদদের মতো মধ্যযুগের মুসলিম ফকিহগণকেও ভাবিয়েছে। আর ফকিহগণ এ ব্যাপারে পরম কোনো ঐক্যমত্যে আসেননি; একেক মাযহাবের একেক মত ছিল। ফকিহগণের ঐক্যমত্য ও দ্বিমতগুলোর সারমর্ম ঈসা এভাবে তুলে ধরেছেন (ঈসা, ১৯৯৩):
➡ প্রথম মত: মুদ্রার মূল্যমানে যে ধরনের পরিবর্তনই আসুক না কেন, ঋণগ্রহীতা যতটুকু ঋণ নিয়েছে, ওই পরিমাণ অর্থই ঋণদাতাকে ফেরত দেবেন। এটি প্রধানত রিবা পরিহার করার জন্য।
➡ দ্বিতীয় মত: ঋণের চুক্তি বা ভবিষ্যতে মূল্য পরিশোধযোগ্য বিক্রয়ের চুক্তি সম্পন্ন হওয়ার সময় টাকার যে "আসল” মূল্যমান ছিল, ঋণগ্রহীতা সেটি প্রদান করবেন। এর কারণ প্রধানত মূল্যের আধার হিসেবে টাকার আসল মূল্যমান সংরক্ষণ করা।
➡ তৃতীয় মত: বিবেচনায় নেয় যে, টাকার মূল্যমানের পার্থক্যটা কি নামেমাত্র না গোনায় ধরার মতো। যদি নামেমাত্র হয়ে থাকে, তাহলে ঋণকৃত টাকার সমপরিমাণই পরিশোধ করতে হবে। যদি গোনায় ধরার মতো হয়ে থাকে, তাহলে মূল্যমান হ্রাসের কারণে ঋণদাতাকে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। কতটুকু হলে গোনায় ধরার মতো হবে, এই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে আলোচ্য পরিস্থিতিতে প্রচলিত ব্যবসায়িক চর্চার বিবেচনায়। এটা একটা মাঝামাঝি সমাধান, যা ওপরে উদ্ধৃত মত দুটির মাঝে সামঞ্জস্যবিধান করে।
ইসলামি অর্থনীতিবিদগণ এই জটিল সমস্যার উত্তর বের করার বিতর্কে নিজ নিজ মতামত সংযোজন করে চলেছেন। মধ্যযুগের ফকিহদের বিভিন্ন মত আলোচনা করার পর হাসানুজ্জামান সূচকের পক্ষে মত দেন। বলেন যে, ইসলামি আইনের অধীনে সূচক অবৈধ নয় (হাসানুজ্জামান, ১৯৮৫)। ইকবাল সূচকের পক্ষে। তিনি এমন একটি সাধারণ দরের মাত্রা ব্যবহার করার পরামর্শ দেন, যা দেশের সকল ঋণের সাথে সম্পর্কিত হবে। সরকার ক্রমাগত দরের মাত্রা পর্যালোচনা ও ঘোষণা করে চলবে (ইকবাল, ১৯৮৭)। আবদুল মান্নানের মতে টাকার মূল্যমানে পরিবর্তন যেহেতু আধুনিক যুগে অপরিহার্য হয়ে পড়েছে, সেহেতু ঋণের সূচকীকরণ ঋণদাতার প্রতি ন্যায়ানুগ আচরণ সংরক্ষণে সহায়তা করবে (মান্নান, ১৯৮১)। ঈসা এই বিষয়টি বিশদভাবে আলোচনা করার পর এই মতের পক্ষে ঝুঁকেছেন যে, টাকার আসল মূল্যমান হ্রাস পাওয়ার কারণে ঋণদাতাকে ওই পরিমাণ ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। তার মতে সূচকের পদ্ধতিটি হওয়া উচিত একটি এককের সাথে টাকার মূল্যমানের সম্পর্ক স্থাপন করার মাধ্যমে। এই এককের মূল্যমান নির্ধারিত হবে সুনির্দিষ্ট কোনো পরিমাণের মূল্যের সাপেক্ষে। যেমন এক গ্রাম স্বর্ণ (ঈসা, ১৯৯৩)। বিতর্ক অবশ্য এতেই শেষ হয়ে গিয়েছে বলে মনে হয় না। এমন কোনো ঘটনা এখন পর্যন্ত জানা নেই, যেখানে মূল্যমান হ্রাস পাওয়ার কারণে ইসলামি ব্যাংক আর্থিক ক্ষতিপূরণ দাবি করেছে।
📄 অর্থনৈতিক উন্নয়ন
বেশির ভাগ ইসলামি অর্থনীতিবিদের কাছে অর্থনৈতিক উন্নয়ন একটি কেন্দ্রীয় ও অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এর কারণ মূলত দুটি—ইসলামি অর্থনীতি থেকে সুদ বিলুপ্ত করা এবং যাকাতের প্রভাব ফিরিয়ে আনা। সুদ বিলোপ করার ফলে সম্পদ ও উৎপাদনের উন্নয়ন এবং ভূমি-পুঁজি ও শ্রমের গুরুত্বের ওপর আরও বেশি জোর দেওয়া হয়। যাকাতের ব্যাপারটি হলো ফলাফল বা আয়ের বণ্টন এবং সম্পদের ন্যায়ানুগ স্থানান্তর নিশ্চিতকরণ। তাই প্রত্যক্ষভাবে হোক বা পরোক্ষভাবে, অর্থনৈতিক উন্নয়নের বিষয়টি স্বভাবতই ইসলামি অর্থনীতিতে গভীরভাবে প্রোথিত। এর সাথে আরও কারণ যোগ করা যায়। যেমন ইসলামি অর্থনীতি তার দর্শন, কার্যক্রম ও লক্ষ্যের বিচারে অন্যান্য অর্থনীতি থেকে আলাদা। তাই বিষয়টির প্রকৃতির কারণেই ইসলামি অর্থনীতিবিদদের মাঝে ইসলামি দৃষ্টিকোণ থেকে অর্থনৈতিক উন্নয়ন সংক্রান্ত লেখালেখির তাড়না কাজ করতে পারে।
লেখালেখি-সহ অন্য যে-কোনো মাধ্যমে মত প্রকাশকারী সকল ইসলামি অর্থনীতিবিদ একমত যে, ইসলামি অর্থনীতি হলো মূল্যবোধ-ভিত্তিক। তাই ইসলামে অর্থনৈতিক উন্নয়নেরও একই পূর্বশর্ত থাকতে হবে। লেখকদের মাঝে যে মতপার্থক্য, তা সূক্ষ্মতর বিষয়গুলোতে। জোরারোপের মাত্রা এবং উন্নয়ন-সংক্রান্ত বিষয়াদি পর্যবেক্ষণের দৃষ্টিকোণ নিয়ে।
খুরশিদ আহমাদ রচিত বইটি রেফারেন্স হিসেবে খুব ব্যবহৃত হয়। তাঁর Economic Development in an Islamic Framework-এর উদ্ধৃতি প্রায়শ দেওয়া হয়। এটি যথাযথ মনোযোগের দাবিদার। আহমাদ অতি আগ্রহ সহকারে নতুনত্বের আহ্বান জানান এবং আমদানিকৃত ধ্যানধারণার বিরোধিতা করেন। সেসব ধ্যানধারণা পশ্চিমা পুঁজিবাদের রূপে পশ্চিম থেকে আসুক কিংবা সমাজতন্ত্রের রূপে প্রাচ্য থেকে। এ দুই তন্ত্রের কোনোটিই মুসলিম দেশগুলোকে অর্থনৈতিক উন্নয়নের আদর্শ নমুনা দিতে সক্ষম নয়। ইসলামি অর্থনীতির কাঠামোতে এগুলো সংস্থান করারও অনুপযোগী (আহমদ, ১৯৮০)। ইসলামি অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রধান ধাক্কাটা হতে হবে— মানবজীবনকে উদ্দেশ্য করে। এর লক্ষ্য হবে জীবনকে উদ্দেশ্যমণ্ডিত ও মূল্যবোধ-কেন্দ্রিক গড়ে তোলা। তাই ইসলামি অর্থনৈতিক উন্নয়ন দুটি ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত। হবে:
➡ কুরআন-সুন্নাহয় বর্ণিত মূল্যবোধ অনুযায়ী ইসলামি কাঠামোর ভেতরে থেকে উন্নয়ন সাধন, এবং
➡ অনুকরণ-প্রবণতা বিলোপ করা (প্রাগুক্ত)।
ইসলামি অর্থনৈতিক উন্নয়নের দার্শনিক ভিত্তিকে তুলে ধরা হয়েছে এভাবে:
➡ (ক) তাওহিদ, আল্লাহর এককত্ব ও সার্বভৌমত্ব;
➡ (খ) আল্লাহর রুবুবিয়্যাত, জীবিকা ও জীবনধারণের ঐশী ব্যবস্থাপনা এবং এই জিনিসগুলোকে তাদের পূর্ণতার দিকে ধাবিত করা;
➡ (গ) খিলাফাহ, পৃথিবীতে আল্লাহর প্রতিনিধি হিসেবে মানুষের ভূমিকা; এবং
➡ (ঘ) তাযকিয়্যা, অন্তরের পরিশুদ্ধি ও পরিবৃদ্ধি (প্রাগুক্ত)।
এই চারটি দার্শনিক খুঁটির ভিত্তিতে ও আলোকে খুরশিদ আহমাদ ইসলামি দৃষ্টিকোণ থেকে উন্নয়নের ধারণাকে নিয়ন্ত্রণকারী পরিসীমা চয়ন করেছেন। এগুলো হলো প্রধানত (প্রাগুক্ত):
➡ (১) উন্নয়নের ইসলামি ধারণাটি বিশদ প্রকৃতির। এতে নৈতিক, আত্মিক, ও জাগতিক দিকসমূহ অন্তর্ভুক্ত।
➡ (২) উন্নয়ন-প্রচেষ্টার মূল লক্ষ্য এবং উন্নয়ন-প্রক্রিয়ার উপাদান হলো মানুষ। এটা এই অর্থে যে, উন্নয়ন মানে মানুষের উন্নয়ন এবং তার দৃশ্যমান ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক পরিবেশের উন্নয়ন। একই মত ড. আবদুল হামিদ গাযালি বলে গেছেন তার "অর্থনৈতিক উন্নয়নের ইসলামি কৌশলের ভিত্তি মানুষ”-এ (গাযালি, ১৯৯৪)।
➡ (৩) ইসলামি অর্থনৈতিক উন্নয়ন একটি বহুমাত্রিক কর্মকাণ্ড।
➡ (৪) ইসলামি অর্থনৈতিক উন্নয়নের লক্ষ্য হলো অর্থনৈতিক উন্নয়নের উপাদানসমূহের মাঝে পরিমাণগত ও মানগত ভারসাম্য অর্জন করা।
➡ (৫) সামাজিক জীবনের গতিশীল মূলনীতিগুলোর মাঝে ইসলাম বিশেষভাবে দুটির ওপর জোরারোপ করেছে: প্রথমত, মানুষের প্রতি আল্লাহপ্রদত্ত সম্পদসমূহের যথাযথ ব্যবহার, এবং দ্বিতীয়ত, সেগুলোর ভারসাম্যপূর্ণ ব্যবহার, বণ্টন এবং ন্যায়বিচারের ভিত্তিতে সকল মানবীয় সম্পর্কের উন্নয়ন। পরিশেষে আহমাদ ইসলামি অর্থনৈতিক উন্নয়নের লক্ষ্যসমূহকে চিত্রায়িত করেছেন এভাবে (প্রাগুক্ত):
➡ (১) মানবসম্পদের উন্নয়ন।
➡ (২) ব্যবহার উপযোগী উৎপাদনের প্রসার, যাতে তিনটি অগ্রাধিকারযোগ্য ক্ষেত্র রয়েছে: (ক) খাদ্য এবং অন্যান্য মৌলিক প্রয়োজনীয় জিনিসের প্রাচুর্যময় উৎপাদন ও জোগান, (খ) প্রতিরক্ষামূলক প্রয়োজনীয়তা এবং (গ) মৌলিক পণ্যসমূহের উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা।
➡ (৩) জীবনমানের উন্নয়ন, যাতে রয়েছে: (ক) কর্মসংস্থান সৃষ্টি, (খ) একটি কার্যকর ও প্রশস্ত ভিত্তিবিশিষ্ট সামাজিক নিরাপত্তাব্যবস্থা, (গ) আয় ও সম্পদের সাম্যপূর্ণ বণ্টন এবং (ঘ) ভারসাম্যপূর্ণ উন্নয়ন।
➡ (৪) নতুন প্রযুক্তি।
➡ (৫) বহির্বিশ্বের ওপর নির্ভরশীলতা হ্রাস এবং মুসলিম বিশ্বের মধ্যে বৃহত্তর সমন্বয়।
ইসলামি অর্থনৈতিক উন্নয়নের এই দার্শনিক ভিত্তি বা নীতিগত লক্ষ্যের ব্যাপারে কোনো মতানৈক্য না থাকাই স্বাভাবিক। এই ভিত্তিগুলো মুসলিম বিশ্বাসের প্রতিফলন এবং ইসলামি শিক্ষার অন্তরে নিহিত। মুসলিম অর্থনীতিগুলোর মাঝে নিবিড়তর সহযোগিতার জন্য সাধারণভাবে সকল মুসলিমের ও বিশেষভাবে ইসলামি অর্থনীতিবিদদের সর্বজনীন অনুভূতি ফুটে উঠেছে এই লক্ষ্যসমূহে।
এরপর যে কাজটি আমাদের মনোযোগ আকর্ষণ করছে তা হলো দোনিয়ার Islam and Economic Development (Donia, 1979)। প্রায় ৪৫০ পৃষ্ঠা জুড়ে ড. দোনিয়া দারিদ্র্যের সমস্যাটিকে নিরীক্ষণ করেছেন। এখানে তার লক্ষ্য ছিল ইসলামি রাষ্ট্র তা নিয়ে কিভাবে কাজ করেছে। তাও আবার এমন এক সময়ে, যখন ইসলামি অর্থনীতি ছাড়া আর কোনো অর্থনৈতিক উন্নয়ন নীতিমালা ছিল না। পজিটিভ ইকোনমিকসে অর্থনৈতিক উন্নয়নের তত্ত্ব, অনৈসলামিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় অর্থনৈতিক উন্নয়ন, ইসলামি অর্থনৈতিক উন্নয়নের ধারণাগত কাঠামো, এবং ইসলামি অর্থনৈতিক উন্নয়নের ঐতিহাসিক প্রয়োগ পর্যবেক্ষণ করেন লেখক। তারপর তিনি “ইসলামের পক্ষে কি অর্থনৈতিক উন্নয়নের একটি কার্যকর ও সমন্বিত পদ্ধতি প্রদান করা সম্ভব, যা অন্যান্য অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সুবিধাগুলো নিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি সেগুলোর অসুবিধা থেকেও বেঁচে থাকতে পারবে?” প্রশ্নটির ইতিবাচক উত্তর দেন। এই উত্তরের প্রমাণাদি নিজের গবেষণাকর্মে উল্লেখের পর লেখক এই সিদ্ধান্তগুলোতে পৌঁছান (Donia, 1979, অনূদিত):
➡ (১) ন্যায়, সাম্য, ও কল্যাণের মানদণ্ডে পরিচালিত অর্থনৈতিক উন্নয়ন হলো ইসলামের নির্দেশিত একটি কর্তব্য। এই কর্তব্যগুলো পালনের দায়িত্ব রাষ্ট্রের এবং সামষ্টিকভাবে মানুষের ওপর আরোপিত, যারা যৌথভাবে আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য। উল্লেখ্য, ইসলামি বিশ্বাসমালা এবং মুসলিমরা কতটা শক্তভাবে এগুলো মেনে চলে, তা এসব দায়িত্ব সম্পন্ন করার অবিচ্ছেদ্য অংশ। কার্যক্রম যা-ই হোক, তার সাফল্য নির্ভর করে এতে জড়িত মানুষদের বিশ্বাসের ওপর।
➡ (২) অর্থনৈতিক শ্রম (জীবিকা অর্জনের জন্য শ্রম) কর্মক্ষম প্রতিটি মুসলিমের কর্তব্য। এর মধ্যে একমাত্র গ্রহণযোগ্য অংশ সেগুলো, যা ইসলামি রীতিনীতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। কর্মের লক্ষ্য, ধরন ও প্রভাব হতে হবে ইসলামি আদর্শের সীমারেখার মধ্যে। কর্মের কোনো অংশ যদি ইসলামি দৃষ্টিকোণ থেকে অগ্রহণযোগ্য হয়ে থাকে, তাহলে তা হারাম হবে। এরকম কর্ম থেকে মানুষের বিরত থাকা বাঞ্ছনীয়। তাই ইসলামি অর্থনৈতিক উন্নয়ন এমন হতে হবে, যা সংশ্লিষ্ট কারো ক্ষতিসাধন করে না। হোক সে ব্যক্তি বা রাষ্ট্র, ভোক্তা বা উৎপাদক।
➡ (৩) দায়িত্ব গ্রহণের একমাত্র গ্রহণযোগ্য মানদণ্ড হলো কর্মদক্ষতা। ইসলামি দর্শন অনুযায়ী এটি দুটি অবিচ্ছেদ্য উপাদানের ওপর নির্ভরশীল-সক্ষমতা ও একনিষ্ঠতা।
➡ (৪) জ্ঞান, বিজ্ঞান ও তথ্যের সরবরাহ একটি সামাজিক দায়িত্ব, যাতে সরকার সাহায্য করবে। রাষ্ট্র ও ব্যক্তি যৌথভাবে এর জন্য দায়বদ্ধ। যে জ্ঞান সমাজের উপকারে কাজে লাগে না, তা অগ্রহণযোগ্য। তাই ইসলামের দাবি হলো বিজ্ঞান ও এর প্রয়োগের মাঝে সম্পর্ককে বিশেষভাবে জোরদার করা।
➡ (৫) অর্থনৈতিক উন্নয়নের ওপর সম্পদের মালিকানার প্রভাব রয়েছে। ইসলাম দ্বৈত মালিকানা, ব্যক্তিগত মালিকানা ও গণমালিকানার অনুমোদন দেয়। ইসলামি অর্থনৈতিক উন্নয়ন সংক্রান্ত লেখালেখিতে শেষেরটিকে বিশেষভাবে প্রভাবশালী ভূমিকা প্রদান করা হয়েছে।
➡ (৬) অর্থনৈতিক উন্নয়নের অর্থায়ন প্রসঙ্গে সরকারি ও ব্যক্তিগত বিভিন্ন ধরনের উৎসকে ইসলাম অনুমোদন দেয়। বিশেষভাবে জোর দেওয়া হয়েছে অর্থনৈতিক উদ্বৃত্তের ব্যবস্থাপনার ওপর।
➡ (৭) ইসলামি অর্থনৈতিক উন্নয়নের একটি পূর্বশর্ত হলো যৌক্তিক অর্থনৈতিক পরিকল্পনা।
(৮) আয় ও সম্পদের ন্যায়ানুগ বণ্টন ইসলামি উন্নয়নের অত্যাবশ্যক অংশ। এর মাধ্যমে সকলের প্রয়োজনীয় চাহিদার একটি নিম্নতম মাত্রা যেমন পূরণ করতেই হবে, তেমনি সমাজে আয় ও সম্পদের মাত্রায় অবধারিত পার্থক্য থাকার বিষয়টিকেও স্বীকার করতে হবে।
ওপরের সারমর্মে দুটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। দোনিয়া দেখিয়েছেন:
➡ উৎপাদন অংশে অর্থনৈতিক উন্নয়ন রাষ্ট্র ও ব্যক্তির যৌথ দায়িত্ব। রাষ্ট্রের একার দায়িত্ব না;
➡ বণ্টন অংশে ব্যক্তি তার সামর্থ্য অনুযায়ী যতদূর সম্ভব ধনী হতে পারবে। শর্ত শুধু একটাই—দরিদ্রকে একটা পর্যায় পর্যন্ত জীবিকা সরবরাহ নিশ্চিত করা। তা ছাড়া শ্রম হতে হবে এমন, যা সমাজের জন্য কল্যাণকর। উৎপাদনের ক্ষেত্রেও একই কথা। আর জনসমাজে সার্বিকভাবে ন্যায়পরায়ণতার প্রভাব থাকতে হবে।
এবার আমরা মনোনিবেশ করব এক শিয়া আলিমের অনন্য এক কাজের ওপর। এ বিষয়ে তার লেখালেখি তার সমসাময়িকদের মাঝে এবং ইসলামি অর্থনীতিবিদদের কাছে ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হয়েছে। তা হলো বাকির আস-সাদর রচিত ইকতিসাদুনা।