📘 ইসলামি অর্থব্যবস্থার ইতিহাস > 📄 যাকাত ও কর

📄 যাকাত ও কর


কোনো গ্রন্থপঞ্জির তালিকায় যখনই যাকাতের উল্লেখ করা হয় অথবা কোনো লেখনীর বিষয়সূচিতে এর অনুসন্ধান করা হয়-তখন একটি প্রামাণ্যগ্রন্থের কথা মাথায় আসবেই। তা হলো ফকিহ ইউসুফ আল-কারযাভি রচিত ফিকহুয যাকাত। মূল আরবি থেকে ইংরেজি-সহ বহু ভাষায় অনূদিত বইটি মুদ্রিত হয়েছে এবং এখনো সারা বিশ্বে এর চাহিদা রয়েছে। দুই খণ্ডে এই বইটি ইসলামের তৃতীয় রুকনের এক বিশ্বকোষ। আল-কারযাভি এই পুরো বিষয়টিকে একদম চষে ফেলেছেন বলা চলে। প্রধান চারটি মাযহাবের মতামত উল্লেখ করে উপসংহার টেনেছেন নিজস্ব মত উপস্থাপনের মাধ্যমে। এই বইটির উদ্দেশ্য তিনরকম:
➡ প্রথমত, যাকাতের ধর্মীয় ফরজিয়াতের ব্যাপারে মুসলিমদের শিক্ষিত করে তোলা,
➡ দ্বিতীয়ত, যাকাতের করভিত্তি নির্ধারণে যে জটিলতা তৈরি হয়েছে, তার আলোকে বিংশ শতাব্দীর সমাজে যাকাতের প্রয়োগ অভিযোজিত করা, এবং
➡ তৃতীয়ত, একদিকে সামাজিক কল্যাণমূলক কর হিসেবে ও অপরদিকে বিনিয়োগের উৎসাহ হিসেবে যাকাতের উপকারিতা তুলে ধরা।
এই বিংশ শতকে এসে যাকাতের ওপর লেখালেখি করার বেশ কিছু কারণ রয়েছে। আল-কারযাভি তার বইটির প্রথম ১৯৬৯ সালের সংস্করণের মুখবন্ধে এ কারণগুলো উল্লেখ করেছেন, যার পুনরাবৃত্তি ঘটেছে ১৯৮১ সংস্করণেও (আল- কারযাভি, ১৯৮১):
➡ (১) একদিকে ইসলামের তৃতীয় রুকন হিসেবে ও অপরদিকে ইসলামি অর্থনীতির একটি ভিত্তিপ্রস্তর হিসেবে বিষয়টির সার্বিক গুরুত্ব এবং প্রাচীনকালের ফকিহগণের কাজগুলোর তুলনায় আধুনিক সময়ের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে বিষয়টির পুনর্লিখন। এই পুনর্লিখন আরও বিশেষভাবে প্রয়োজনীয় হয়ে দাঁড়ায় চারটি প্রামাণ্য মাযহাবের মাঝে মতপার্থক্যের কারণে। লেখকের মতে, আধুনিক সময়ের মুসলিমগণ এই বিষয়ের ওপর একটি ঐক্যমত্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি চায়, বৈচিত্র্য না। আর লেখক এই ব্যাপারটিই সমাধা করার চেষ্টা করেছেন। ফলে বইটির শুরুতেই আল-কারযাভির উদ্দেশ্যের দিকে আলোকপাত হয়। আর তা হলো একটি আধুনিক সমাজে মুসলিম সমাজের মনোযোগ ইসলামি লেখালেখির দিকে আকৃষ্ট করা: বিতর্কের বিষয় হিসেবে নয়, বরং একীভূত বিষয় হিসেবে।
➡ (২) যাকাতের ব্যাপারে এমন কিছু নতুন বিষয়ের আবির্ভাব ঘটেছে, যেগুলো ক্লাসিক্যাল ফকিহদের যুগে ছিল না, বা থাকলেও আজকের মতো সমমাত্রায় না। আর এই বিষয়গুলোর ব্যাখ্যা ও পূর্ণাঙ্গ আলোচনা প্রয়োজন, যাতে যাকাতের ব্যবহার মানুষের কাছে স্পষ্টতর হয়। এরকম কিছু উদাহরণ হলো আধুনিক সমাজে উদ্ভূত কিছু বাণিজ্যিক কার্যক্রম থেকে আগত উপার্জন। যেমন, সম্পত্তি ভাড়া দেওয়া, বিশেষত বৃহৎ বাণিজ্যিক মাত্রায় করা হয়ে থাকলে, আধুনিক শিল্পখাতের উৎপাদিত পণ্যের মুনাফা, এমন স্থাবর বা অস্থাবর সম্পত্তি যা থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ উপার্জন আসে, যেমন জাহাজ, বাণিজ্যিক বাহন, বিমান, এবং পুজিকাঠামো ও মালিকানার বৈচিত্র্যে ভরপুর নানান কোম্পানি। আরও কিছু উদাহরণ হলো শিল্পবহির্ভূত সেবাখাত থেকে উৎপাদিত আয়, এবং মজুরি ও বেতনের ভিত্তিতে চাকরিতে নিয়োগ থেকে উৎপাদিত আয়। এগুলো-সহ অন্যান্য অনেক ক্ষেত্রে যাকাতযোগ্য ভিত্তি, নিম্নসীমা ও হার হিসেব করাটা একদম সোজাসাপটা না-ও হতে পারে। ক্লাসিক্যাল ফিক্‌হ গ্রন্থগুলো থেকেই এর সবটার সমাধান সম্ভব না। এর সাথে সমস্যা হিসেবে যুক্ত হবে আধুনিক আর্থিক ব্যবস্থার ভিত্তিতে যাকাতের নিসাব নির্ধারণ। এর ফলে অনেকেরই মনে হতে পারে যে, পুরনো আমলের নিয়ম হিসেবে যাকাত তথা ইসলামি অর্থনীতি আধুনিক সমাজে আর প্রযোজ্য না। তাই আল-কারযাভি আজকের সমাজের ভাষায় এ বিষয়টি নিয়ে লেখার তাগিদ অনুভব করেন। ক্লাসিক্যাল ফতোয়ার সাথে আজকের বাস্তবতার মেলবন্ধন ঘটানোর এক একনিষ্ঠ চেষ্টা এটি। আল-কারযাভি বলেন যে, পণ্যবিনিময় ব্যবস্থা থেকে মুদ্রাবিনিময় ব্যবস্থায় সরে আসাটাও এ বিষয়টির পুনর্লিখনের কারণ।
➡ (৩) বিভিন্ন করের মাঝে সম্পর্ক আধুনিক ইসলামি রাষ্ট্রের আরও একটি মাথাব্যথার কারণ। যার ফলে যাকাত বিষয়ে পুনর্লিখনের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। ইসলামি রাষ্ট্র যাকাত ছাড়াও অন্য কোনো কর আরোপের অধিকার রাখে কি না, কিংবা কর বলতেই বা কী বোঝায়, এগুলো শুধু সাধারণ মুসলিমদের প্রশ্ন নয়। ইসলামি সরকারি অর্থায়নের বিতর্কের ময়দানেও এটি পৌঁছে গেছে। এ বিষয়ক মতামত একাধিক-কারো মতে সমাজের প্রয়োজন পূরণে যাকাত থেকে প্রাপ্ত আয় অপর্যাপ্ত হলে অন্যান্য কর আরোপ করা যাবে। কারো মতে শুধুমাত্র জিহাদ ও সামরিক কার্যক্রমে অর্থায়নের প্রয়োজন হলে তবেই তা করা যাবে। কেউ কেউ আবার যাকাত ছাড়া অন্য কোনো কর আরোপের পুরো অধিকারটিই নাকচ করে দেন।
ফিকহুয যাকাতের আলোচনাপদ্ধতি একজন অ্যাকাডেমিক গবেষকের মতোই। আল-কারযাভি প্রথমে আলোচ্য বিষয়ের সাথে প্রাসঙ্গিক কুরআনের সকল আয়াত ও বিশুদ্ধ হাদীস উল্লেখ করেন। দ্বিতীয়ত, বিষয়সূচিকে এমন সামঞ্জস্যপূর্ণ ক্রমধারায় বিভক্ত করেন, যাতে পাঠকের বুঝতে সুবিধা হয়। তৃতীয়ত, একদিকে খুলাফায়ে রাশিদীন ও প্রধান চার মাযহাবের ইমামগণের মতামত উল্লেখ করেন এবং অপরদিকে ইসলামের বিধানের সাথে আহলে কিতাবদের যাকাতের বিধানের তুলনা দেখান। চতুর্থত, লেখক আলোচ্য বিধানের একটি বিশ্লেষণাধর্মী ব্যাখ্যা প্রদান করে সে বিধানটির মাকসাদের ওপর আলোকপাত করেন। পঞ্চমত, বিতর্কাধীন বিষয়টিতে যথাযথ স্পষ্টতা সহকারে যুক্তি ও ব্যাখ্যা উল্লেখ করে নিজের মতামত দিয়ে শেষ করেন। আল-কারযাভি এই সকল ধাপ সম্পন্ন করে এমন একটি মতামত প্রদান করে, যাতে ইজতিহাদের নীতিমালা অনুসরণ করে সিদ্ধান্ত পৌঁছানোর ধারা প্রতিফলিত হয়।
সত্তরের দশকের শেষ থেকে আশির দশকের শুরুতে ইসলামি লেখকগণ যেসব বিষয়ে আগ্রহ দেখিয়েছেন, তার মাঝে রয়েছে ইসলামি সামাজিক নিরাপত্তা। আল-ফানজারি আমাদের পরিচয় করিয়ে দিচ্ছেন তার Islam and Social Security: a Comhensively Concise Study of the Application of Zakah as a Tool to Achieving Islamic Social Solidarity (ইসলাম ও সামাজিক নিরাপত্তা: ইসলামি সামাজিক ঐক্য অর্জনের হাতিয়ার হিসেবে যাকাতের প্রয়োগ) নিয়ে একটি সংক্ষিপ্ত পাঠের সাথে। এটির প্রথম সংস্করণ প্রকাশিত হয় সত্তরের দশকের শেষদিকে এবং তৃতীয় সংস্করণ নব্বইয়ের দশকের শুরুতে (আল-ফানগারি, ১৯৯০)। তিনি মিশরীয় আইন-পরিষদের বড় কর্মকর্তা এবং আল-আযহার বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন অ্যাকাডেমিক। তাই তার দৃষ্টিভঙ্গি একজন জ্যেষ্ঠ সরকারি প্রশাসক ও বিশ্বের প্রাচীন ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বনামধন্য গবেষকের প্রতিফলন।
বইটির প্রধান আলোচ্য হলো-সামাজিক নিরাপত্তা অর্জনের উপাদান হিসেবে যাকাতের ভূমিকা। জীবনধারণের আবশ্যক জিনিসের বাইরে ইসলাম মানুষের যেসব চাহিদা মেটানোর নিশ্চয়তা দিয়েছে, সেগুলো উল্লেখের মাধ্যমে শুরুটা করেন তিনি। তারপর দেখিয়েছেন সামাজিক বীমা, সামাজিক ঐক্য ও সামাজিক নিরাপত্তার মাঝে পার্থক্য। রাষ্ট্রের ভূমিকার গুরুত্ব দেখিয়ে তিনি বলেন যে, সামাজিক বীমা সরকারি একটি ব্যবস্থা হলেও তাতে ব্যক্তির পক্ষ থেকে নিয়মিত কিস্তি পরিশোধ করার একটি ব্যাপার অন্তর্ভুক্ত। পক্ষান্তরে সামাজিক ঐক্য হলো একে অপরকে সাহায্য করার জন্য স্বেচ্ছায় অংশগ্রহণমূলক একটি ব্যবস্থা, যদিও তা একসময় সামষ্টিক প্রচেষ্টার রূপ লাভ করতে পারে। প্রথমটির তুলনায় দ্বিতীয়টিতে রাষ্ট্রের ভূমিকা বেশ কম। অপরদিকে সামাজিক নিরাপত্তায় নাগরিকদের প্রতি রাষ্ট্রের আর্থিক বাধ্যবাধকতা অন্তর্ভুক্ত। কোনো আর্থিক বিনিময়ের প্রত্যাশা ছাড়াই রাষ্ট্র তার অভাবী ও বয়োবৃদ্ধ নাগরিকদের সাহায্য প্রদান করবে। আল-ফানজারি বলেছেন, এই কর্তব্যের কথা কুরআন ও সুন্নাহয় স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যাকাতের বিধান প্রদানের মাধ্যমে। এখান থেকে বেশ শক্তভাবে সিদ্ধান্তে আসা যায় যে, কোনো সরকার সামাজিক নিরাপত্তা প্রদানে কাজ না করে থাকলে, সেটি অনৈসলামিক সরকারে পরিণত হয়।
লেখক আরও বলেছেন, ইসলাম উভয় ধরনের ব্যবস্থাই প্রদান করেছে—নিজের সম্পদ থেকে অভাবীদের দান করার জন্য ব্যক্তিমানুষদের আদেশ দেওয়ার মাধ্যমে সামাজিক ঐক্য তৈরি করা, এবং রাষ্ট্রকে কুরআন ও সুন্নাহ অনুযায়ী যাকাতের বিধান কার্যকর করার আদেশ দেওয়ার মাধ্যমে সামাজিক নিরাপত্তা গড়ে তোলা। লেখকের মতে, সামাজিক নিরাপত্তা ইসলামের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ এবং নাগরিকদের এই অধিকার অন্য সকল অধিকারের ঊর্ধ্বে। কারণ বান্দাদের প্রতি এটি আল্লাহর এক অনুগ্রহ।
আল-ফানজারি তার লেখা শেষ করেছেন জরুরি কিছু সুপারিশের মাধ্যমে। যেমন, ইসলামি সরকারের মন্ত্রীসভায় যাকাতের জন্য মন্ত্রণালয় ও সচিবালয় স্থাপনের প্রয়োজনীয়তা। মজার ব্যাপার হলো, সম্ভবত তার এই সুপারিশকে আমলে নেওয়ার ফলেই এখন কিছু ইসলামি সরকারের সভায় যাকাতের জন্য আলাদা মন্ত্রণালয় দেখতে পাওয়া যায়। তা ছাড়া যাকাতের ওপর আন্তর্জাতিক সম্মেলনও এখন অস্বাভাবিক কিছু নয়, ১৯৮৪ যার শুরুটা করে কুয়েত যাকাত হাউজ (আল-আশকার ও হক, ১৯৯৫)।
আমরা মনে করি আমাদের আলোচনায় আরও একটি যাকাত-সংক্রান্ত বই অন্তর্ভুক্ত হওয়ার দাবি রাখে। তা হলো মাহমুদ আবু সাউদের ফিকহুয যাকাতিল মুআসির বা সমকালীন যাকাত। কারণ এর আলোচ্যসূচী একেবারে অনন্য। বইটি একইসাথে আরবি ও ইংরেজিতে প্রকাশিত হয়েছে। আর প্রকাশ করেছেও এই ময়দানের এক বিশেষায়িত প্রকাশনা সংস্থা যাকাত রিসার্চ ফাউন্ডেশন। যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রকাশিত হয়েছে এটি। বইটি উভয় ভাষায় প্রকাশিত করার কারণ হলো ইংরেজিভাষী পাঠকের সংখ্যা বিশাল। আর লেখক শুরুতেই ক লিখেছেন, “আরব মুসলিমদের তুলনায় অনারব মুসলিমদের সংখ্যা প্রায় দশ গুণ” (আবু সাউদ, ১৯৮৮)। আর এ বইটির বার্তা দ্রুত তাদের কাছে পৌঁছানো দরকার।
আবু সাউদ যেসব কারণে এ বইটি লিখেছেন, তার ভাষ্যে সেগুলো হলো (ক) “ইসলামের এই ভিত্তিপ্রস্তরকে ঘিরে থাকা সংশয়ের মোটা আবরণ”, (খ) “বিভিন্ন মাযহাবের বিপরীত মতামত”, এবং (গ) “আধুনিক লেনদেন-পদ্ধতি এবং সেগুলোর ধারণা, উপার্জন ও বিনিয়োগের পদ্ধতির ব্যাপারে দূরদৃষ্টির অভাব”, (প্রাগুক্ত)। মনে হতে পারে যে, আল-কারযাভির গ্রন্থে এই কারণগুলো আরও দুই দশক আগেই উল্লেখিত হয়েছে। কিন্তু আবু সাউদের নিজের ভাষ্যমতে, “আল-কারযাভির কাজ থেকে লেখক প্রভূত উপকৃত হয়েছেন”, তবে লেখকের "নিজস্ব পর্যবেক্ষণ রয়েছে” এবং আছে এমন মতামত, যা আল-কারযাভির সাথে মেলে না। মোটকথা, দুই লেখকের উদ্দেশ্য একই (প্রাচীন বা মধ্যযুগের ইসলামে অস্তিত্ব ছিল না, এরকম সমসাময়িক বিষয়ের আলোচনা)। কিন্তু সেগুলোর শ্রেষ্ঠ সমাধান কী হতে পারে, এ ব্যাপারে তাদের প্রদত্ত সুপারিশ, মতামত বা ফতোয়ায় পার্থক্য আছে।
কার্যত, যে ক্লাসিক্যাল মতপার্থক্যের ফলে বিভিন্ন মাযহাবের উদ্ভব ঘটেছে, সেই ধারা থেমে যায়নি। বইয়ের একাধিক জায়গায় আমরা ক্লাসিক্যাল ও সমসাময়িক ফকিহদের সাথে আবু সাউদকে দ্বিমত করতে দেখি: "আমরা প্রাচীন ফকিহদের প্রদত্ত ধারা এবং আল-কারযাভি-সহ বহু সমসাময়িক ফকিহর মতের সাথে একমত নই” (প্রাগুক্ত)। খুলাফায়ে রাশিদীন, প্রাচীন ফকিহ, ও সমকালীন আলিমদের ফতোয়া উল্লেখের পর বইয়ের বহু জায়গায় আবু সাউদকে বলতে দেখা যায়: "আমরা এর সাথে একমত না-ও হতে পারি", "আমাদের দৃঢ় পর্যবেক্ষণ রয়েছে”, বা “আমরা কঠোরভাবে আপত্তি জানাচ্ছি”। এরপর নিজের দৃষ্টিভঙ্গি উপস্থাপন করেন তিনি।
আবু সাউদের প্রেরণায় কোনো সন্দেহ নেই। আর তার “সমকালীন যাকাত” এ বিষয়ক লেখালেখির মূল্যবান সংযোজন। মতের এই পার্থক্য আসলে প্রয়োগের পার্থক্য, যার লক্ষ্য হলো আধুনিক সময়ে যাকাতের পদ্ধতি ও নীতিমালা হিসেবের ক্ষেত্রে উত্তম প্রয়োগ-রীতি বের করে আনা। এটি চূড়ান্ত ন্যায্যতা অর্জনের লক্ষ্যে শাস্ত্রীয় মতবিরোধ। কিন্তু সামাজিক, অর্থনৈতিক ও ধর্মীয় বিধান হিসেবে যাকাতের স্বীকৃতি তো সকলেই দিয়ে থাকেন।
বিংশ শতাব্দীর বাকি অংশ থেকে আজও পর্যন্ত মুসলিমদের মনোযোগ ধরে রেখেছে যাকাত। যাকাতের ওপর সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে, কর্মশালা আয়োজিত হয়েছে অগ্রগণ্য বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের হাতে। যেমন ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের (IDB) ইসলামি রিসার্চ অ্যান্ড ট্রেনিং ইন্সটিটিউট (IRTI)। ১৯৭০-এর শেষ অংশ থেকে যাকাত বিষয়ক আইন এবং নিজস্ব আর্থিক ব্যবস্থায় আনুষ্ঠানিকভাবে যাকাত ব্যবস্থাপনায় সক্রিয় হয়ে উঠেছে বিভিন্ন সরকার।
আগেই বলা হয়েছে যে, প্রথম আন্তর্জাতিক যাকাত সম্মেলন ১৯৮৪ সালে কুয়েতে অনুষ্ঠিত হয়েছিল-কুয়েত যাকাত হাউজের উদ্যোগে। দুই বছর পর ১৯৮৬ সালে দ্বিতীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় সৌদি আরবের রিয়াদে। এর পৃষ্ঠপোষক ছিল সৌদি আরবের অর্থ-মন্ত্রণালয়ের যাকাত ও আয়কর বিভাগ। দ্বিতীয় সম্মেলনের সুপারিশ বাস্তবায়নের ধারায় ১৯৯০ সালে মালয়শিয়ার কুয়ালালামপুরে তৃতীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এর পৃষ্ঠপোষক ছিল ইসলামিক সেন্টার অব মালয়শিয়া, সৌদি আরবের যাকাত ও আয়কর বিভাগ, কুয়েতের যাকাত হাউজ, কুয়েতের আন্তর্জাতিক যাকাত শরীয়াহ বোর্ড এবং IRTI।
যাকাত বিষয়ক তৃতীয় সম্মেলন ছিল বিশেষভাবে বাস্তবমুখী। যেসব মুসলিম রাষ্ট্র শরীয়ত মেনে চলতে চায়, সেখানে যাকাতবিধি প্রবর্তনের জন্য প্রশাসনিক বিন্যাসের ওপর আলোকপাত করা হয়। এই বিষয়গুলোতে বিশেষ গুরুত্বপ্রদান, ইসলামি অর্থনীতি প্রয়োগের প্রচেষ্টা এবং জটিল প্রশাসনিক সমস্যা নিয়ে কাজ করার ক্ষেত্রে এর অগ্রগতির কারণে তৃতীয় সম্মেলনকে নিম্নে পর্যাপ্ত স্থান দিয়ে আলোচনা করা হলো।
তৃতীয় সম্মেলনের প্রধান আলোচ্য ছিল একটি: যাকাতের প্রশাসনিক দিক। এই দৃষ্টিকোণ থেকে সম্মেলনটি তিনটি প্রধান লক্ষ্য অর্জনে কাজ করে:
➡ (ক) যাকাতের প্রশাসনিক দিকের ব্যাপারে ওআইসি'র সদস্য দেশগুলোর মাঝে তথ্য, জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার প্রসার ঘটানো,
➡ (খ) আর্থিক ব্যবস্থায় যাকাত প্রবর্তন করতে ইচ্ছুক সদস্য দেশগুলোকে তাদের শুরুর দিকের প্রশাসনিক সমস্যাগুলো কাটিয়ে উঠতে সাহায্য করা, এবং
➡ (গ) যাকাতের বিভিন্নরকম প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর অর্থনৈতিক গুরুত্বের ব্যাপারে বুঝ আরও বৃদ্ধি করা (আল-আশকার ও হক, ১৯৯৫)।
মুসলিম দেশগুলোর সরকারি আর্থিক ব্যবস্থা থেকে যাকাত বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ার কারণ হিসেবে দুটি বিষয় উল্লেখ করা যায়:
➡ প্রথমত, সরকারব্যবস্থায় দীর্ঘকাল শরীয়ত প্রয়োগের অনুপস্থিতি, যা মুসলিম বিশ্বের ওপর পশ্চিমাদের সামরিক আগ্রাসনের সময় আরও প্রকট হয়ে ওঠে;
➡ দ্বিতীয়ত, এই বিশ্বাস যে, আধুনিকায়নের সুফল ভোগ করতে হলে মুসলিম দেশগুলোকে সেক্যুলার ব্যবস্থা গ্রহণ করে নিয়ে ইসলামি ব্যবস্থাকে সরিয়ে দিতে হবে। হোক তা অর্থনীতির ক্ষেত্রে বা অন্য যে-কোনো ক্ষেত্রে।
তাই তৃতীয় সম্মেলন ছিল বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এটি এই দুটি বিষয়কে ঘিরেই অনুষ্ঠিত হয়েছিল। প্রথমটি প্রত্যক্ষভাবে, দ্বিতীয়টি পরোক্ষভাবে। উপস্থাপিত গবেষণাপত্রগুলো এই বিষয়কেই তুলে ধরেছে। বাহরাইন, মিশর, ইরাক, জর্দান, কুয়েত, লিবিয়া, সৌদি আরব, সুদান, ইয়েমেন, ইরান, বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও মালয়শিয়ার প্রেক্ষাপটে যাকাতের প্রয়োগ আলোচিত হয়। যেসব দেশ তাদের আইনব্যবস্থায় যাকাত আইন বাস্তবায়িত করতে ইচ্ছুক, তারা এই তুলনামূলক গবেষণা থেকে দারুণভাবে উপকৃত হবে। অন্যান্য দেশের অভিজ্ঞতাকে নিজেদের জন্য কাজে লাগাতে পারবে তারা।
সম্মেলনে উপস্থাপিত গবেষণাপত্রগুলোকে তিনটি শ্রেণিতে ভাগ করা যায়। প্রথম প্রকারের আলোচ্য বিষয় হলো যাকাতের আর্থিক নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা। সরকারি রাজস্ব ও করদাতাদের ওপর বাধ্যতামূলক ও ঐচ্ছিক যাকাত সংগ্রহের তুলনামূলক প্রভাব নিয়ে আলোচনা করে দ্বিতীয় প্রকারটি। আর তৃতীয় প্রকারে অনুসন্ধান করা হয়েছে কয়েকটি দেশের যাকাত সংগ্রহ ও বণ্টনব্যবস্থার পরীক্ষামূলক চর্চাকে।
নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা তিনটি প্রধান ধরনের নিয়ন্ত্রণের ওপর আলোকপাত করে: শরীয়ত নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে নিশ্চিত করা হবে যে, যাকাতের সংগ্রহ ও বণ্টন শরীয়তের বিধিমালা অনুযায়ী হচ্ছে। আর্থিক নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে নিশ্চিত করা হবে যে, সংগ্রহ ও বণ্টন সরকারের মৌলিক হিসেব ও আর্থিক বিধানের মধ্যেই আছে। কোনো ধরনের অনিয়ম করা হয়নি। আর অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে নিরীক্ষণ করা হবে— যাকাতের প্রয়োগ এই ব্যবস্থা প্রবর্তনের উদ্দেশ্য হাসিল করতে পারছে কি না, এবং তা প্রশাসনের সর্বনিম্ন খরচে হচ্ছে কি না।
ফুয়াদ আল-উমর তার গবেষণায় কয়েকটি দেশের উদাহরণ পর্যবেক্ষণ করেছেন। তারপর যাকাতের নিয়ন্ত্রণের ব্যাপারে কয়েকটি বিষয়ের ওপর জোর দিয়েছেন। এর মধ্যে দুটো বিষয় সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য: প্রথমত, সংগ্রহ ও বণ্টনের প্রশ্নে যাকাতের প্রবর্তন এখনো প্রশাসনের কাছে বড় একটি চ্যালেঞ্জ। দ্বিতীয়ত, যাকাতব্যবস্থা এমনভাবে প্রয়োগ করতে হবে, যেন প্রশাসনের খরচ সর্বনিম্ন রাখা যায়। তার পরামর্শমতে, যাকাতের রাজস্ব বণ্টনের জন্য নতুন পথ সৃষ্টি করতে গুরুত্ব সহকারে চেষ্টা করা উচিত, যাতে দারিদ্র্য দূরীকরণ ও ভিক্ষাবৃত্তিকে নিরুৎসাহিত করা যায়, (আল-উমর, ১৯৯৫)। পাকিস্তানের যাকাতের ওপর মুহাম্মাদ আকরাম খানের গবেষণাতেও এসব বিষয় উঠে এসেছে। খান তার গবেষণায় যে কয়েকটি মত উল্লেখ করেছেন, তার মধ্যে তিনি অলস টাকার নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত সমস্যার ব্যাপারে চিন্তিত। এর পরিমাণ কয়েক বিলিয়ন রুপি পর্যন্ত হতে পারে, যা উদ্দিষ্ট জনগণের মাঝে বণ্টন করা যেত (খান, ১৯৯৫)। পাকিস্তান ও কুয়েতের যাকাত প্রশাসনের মাঝে সুন্দর একটি তুলনা করেছেন তিনি। দুই দেশের ভূমির আকার ও সম্পদের পার্থক্য বিবেচনায় নিলে তুলনাটি বড়ই আগ্রহোদ্দীপক। দুটি দেশের কিছু সাদৃশ্য থাকলেও রয়েছে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি পার্থক্যও। সাদৃশ্য হলো উভয় দেশই তাদের দেশে যাকাত প্রবর্তিত করেছে প্রায় একই সময়ে। পাকিস্তানে ১৯৮০ সালে এবং কুয়েতে ১৯৮২ সালে। আর পার্থক্য হলো, দুই দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক-রাজনৈতিক বিন্যাসে রয়েছে বিরাট ফারাক। একদিকে কুয়েত হলো ধনাঢ্য পেট্রোলিয়ামধারী রাষ্ট্র। অপরদিকে পাকিস্তানে দারিদ্র্যের অবস্থা বেশ করুণ। স্বভাবতই, ভৌগলিক প্রশস্ততার ব্যাপারটি সে দেশের প্রশাসন-কাঠামোর আকার ও আকৃতিকে প্রভাবিত করবে। আর সম্পদের পরিমাণের ফলে বেছে নেওয়া যেতে পারে যাকাত সংগ্রহের বিভিন্ন পদ্ধতি। খানের পর্যবেক্ষণ-মতে, পাকিস্তানের যাকাত-প্রশাসনের কাঠামো পাঁচটি উপাদান নিয়ে গঠিত (কেন্দ্র, প্রদেশ, জেলা, তহসিল ও স্থানীয়)। অপরদিকে কুয়েত মোটাদাগে কেন্দ্রীভূত। তা ছাড়া, পাকিস্তানে যেখানে যাকাত সংগ্রহ বাধ্যতামূলক, কুয়েতে তা ঐচ্ছিক।
সুদান আরেকটি আগ্রহ উদ্রেককারী দৃষ্টান্ত। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষদিকে এটি ছিল মাহদি সংস্কার আন্দোলনের ভূমি। এর প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মাদ আহমাদ আল-মাহদি (১৮৪৪-১৮৮৫) নিজেকে প্রতীক্ষিত মাহদি বলে দাবি করে। তার লক্ষ্য ছিল সুদানে একটি ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা। মাহদি রাষ্ট্রের আমলে রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের ইসলামিকরণ প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে যাকাতব্যবস্থা প্রবর্তিত হয়। বিংশ শতাব্দীর শেষাংশে সুদান এর সাংগঠনিক কাঠামোকে চূড়ান্ত করতে পাঁচ বছর সময় নেয়। যাকাত কায়েম হয় দুই ধাপে: (ক) যাকাত তহবিল বাস্তবায়নের মাধ্যমে ১৯৮০ সালে ঐচ্ছিক ধাপ, এবং (খ) যাকাত ও কর আইন পাশ করার মাধ্যমে ১৯৮৪ সালে বাধ্যতামূলক ধাপ। আস-সাওরির ব্যাখ্যামতে, সুদানের যাকাত-ব্যবস্থা প্রযুক্ত হয় তিনটি ভিন্ন ভিন্ন পর্যায়ে: শরয়ী নিয়ন্ত্রণ, আর্থিক নিয়ন্ত্রণ ও প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ। যাকাত-কর্মীদের যথাযথ প্রশিক্ষণ এবং যথেষ্ট পরিমাণ নিযুক্তি নিশ্চিত করার ওপর জোরারোপ করেন তিনি।
সুদানের ওপর আবদুল্লাহর গবেষণায় যাকাত রাজস্ব বণ্টনের ক্ষেত্রে প্রচার-প্রসারের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়। আবদুল্লাহ বিশ্বাস করেন, যাকাত বিভাগের উচিত শরীয়তের বিধান মেনে খোলাখুলি যাকাত বণ্টন করা। এতে যাকাত-দাতাগণ আশ্বস্ত হবেন যে, তাদের যাকাত সঠিকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। না হলে প্রাপ্তব্য সম্পদের যাকাতের হিসেব এবং যাকাত বিভাগ আসলে কতটুকু সংগ্রহ করছে, তার মাঝে একটি গ্যাপ রয়েই যাবে (আবদুল্লাহ, ১৯৯৫)।
যাকাত ব্যবস্থাপনার দ্বিতীয় বিষয় হলো এটি প্রদান বাধ্যতামূলক করা হবে কি না, সেই প্রশ্ন। বাধ্যতামূলক করার অর্থ যাকাতকে রাষ্ট্রের অধিকার হিসেবে আখ্যায়িত করা। আর ঐচ্ছিক থাকা মানে এর দায়িত্ব ব্যক্তিগতভাবে ছেড়ে দেওয়া। এই দুই ব্যবস্থার পার্থক্যের অর্থনৈতিক প্রভাব আবদুল্লাহ সালামার দৃষ্টি আকর্ষণ করে। সুদানে যাকাত প্রদানকে ঐচ্ছিক থেকে বাধ্যতামূলক করার ব্যাপারটি পর্যবেক্ষণ করেন তিনি। দেখা গেছে যে, বাধ্যতামূলক করার পরে যাকাতের অগ্রগতি উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু প্রশাসনিক খরচ আবার বেড়ে গেছে, বিশেষত যাকাত বণ্টনের ক্ষেত্রে। বাধ্যতামূলক করার আগে যে যাকাত কম আসত, এটা সুদানের জনগণের ধার্মিকতার অভাবের কারণে নয়। বরং সরকার যাকাত থেকে প্রাপ্ত সম্পদ পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে শরীয়াহ-নির্দেশিত খাতে ব্যয় করবে কি না, এই সন্দেহ থেকে। সন্দেহ রয়ে গিয়েছিল যে, সরকার অন্যান্য করের থেকে যাকাতকে পৃথক করে না। যাকাতের অর্থ এমনসব খাতে ব্যয় করে, যেটা শরীয়তে যাকাতের খাত হিসেবে নির্ধারিত নয়। এজন্যই আবদুল্লাহ যাকাত বণ্টনকে উন্মুক্ত রাখার ওপর জোর দিয়েছেন (প্রাগুক্ত)। আর সালামাও একই কারণে যাকাত বিভাগকে মন্ত্রণালয়ের অন্যান্য করবিভাগ থেকে আলাদা রাখার কথা বলেছেন (প্রাগুক্ত)।
ঐচ্ছিকভাবে যাকাত প্রদানের ওপর বাধ্যতামূলক যাকাত ব্যবস্থা কীরকম ও কতটা প্রভাব ফেলে, সেই প্রশ্ন ইসলামি ম্যাক্রো-অর্থনীতিবিদদের মনোযোগ আকৃষ্ট করেছে। যেহেতু যাকাত একটি ধর্মীয় ইবাদত, সেহেতু আল্লাহকে খুশি করার জন্য যাকাত দেওয়া হয়। ফলে দুই ব্যবস্থার মাঝে নেতিবাচক কোনো সম্পর্ক না-ও থাকতে পারে। পাকিস্তানে পরিচালিত একটি গবেষণা থেকে দেখা যায়,
➡ (ক) দরিদ্র মানুষ ও দাতব্য সংস্থাগুলো সরকারি প্রতিনিধির কাছ থেকে প্রাপ্ত আনুষ্ঠানিক যাকাতের চেয়ে অনানুষ্ঠানিক যাকাতের ওপর বেশি নির্ভরশীল,
➡ (খ) বাধ্যতামূলক ব্যবস্থা প্রবর্তিত হওয়ার পর স্বেচ্ছায় যাকাত প্রদানের উৎসাহে কোনো ভাটা পড়েনি, এবং
➡ (গ) স্বেচ্ছায় যাকাত পরিশোধ নির্ভর করে সমাজের বেশ কয়েকটি আর্থ-সামাজিক ও ধর্মীয় নিয়ামকের ওপর (মুহাম্মাদ, ১৯৯৫)।
ওপরে যেগুলো উল্লেখ করা হলো, সেগুলো-সহ আরও অনেক গবেষণা থেকে বিভিন্ন মডেলের ধারণা পাওয়া যায়। নিজেদের অর্থব্যবস্থায় যাকাত প্রবর্তিত করতে ইচ্ছুক দেশগুলোর প্রশাসকগণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে এখান থেকে সাহায্য পেতে পারেন। একটি মুসলিম দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি অর্থনৈতিক বিষয় এটি। বলাবাহুল্য, এ বিষয়ে যা যা লিখিত হয়েছে, তার পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রদান করা এই পরিচ্ছেদের উদ্দেশ্য নয়। আগ্রহী পাঠকগণ সিদ্দিকি (১৯৮০), খান (১৯৯১) ও কাহফের (১৯৯৪) গ্রন্থপঞ্জিগুলো দেখে নিতে পারেন।
বিংশ শতাব্দীর শেষ অব্দি যাকাত নিয়ে লেখালেখি চলমান থাকে। তবে আলোচনার পরিসর আরও প্রশস্ত হয়। আর্থিক নীতিমালার কাঠামোর সাপেক্ষে বিষয়টিকে বিবেচনা করা এবং সম্পদের ন্যায়ানুগ বণ্টন আলোচিত হয় এতে। একটি উদাহরণ দেওয়া যাক। মক্কায় ১৯৭৮ সালে এবং ইসলামাবাদে ১৯৮১ সালে আয়োজিত দুটি সভার শিরোনাম “Monetary and Fiscal Economics of Islam”। এতে অংশগ্রহণকারীদের মনোযোগের বড় অংশ জুড়ে স্বভাবতই ছিল যাকাত। মক্কার আলোচনাসভায় কিছু প্রধান তাত্ত্বিক বিষয়ের ওপর আলোকপাত করা হয়। আর ইসলামাবাদের আলোচনাসভায় উঠে এসেছে ইসলামি ব্যাংকিং-এর কিছু নিরীক্ষার পর্যবেক্ষণ। সভার বিবরণী থেকে দেখা যায় যে, গবেষকগণ ইসলামি রাষ্ট্রের আর্থিক নীতিমালায় যাকাতের অবস্থান নিয়ে ভালোরকম আলোচনা করেছেন। (দ্রষ্টব্য, আহমেদ, ইকবাল ও খান, ১৯৮৩)। নানারকম শিরোনামের অধীনে যাকাতের উল্লেখ দেখে অবাক হওয়ার কিছু নেই। যাকাত একটি বহুমাত্রিক বিষয়। তাই যাকাত নিয়ে এবং অন্যান্য বিষয়ের ওপর যাকাতের প্রভাব নিয়ে আলাদাভাবে আলোচনা হওয়াটাই প্রত্যাশিত। বিষয়টির গুরুত্ব দুটি মাত্রার মাঝে নিহিত: ইসলামের তৃতীয় রুকনের বিচারে ইবাদত হিসেবে যাকাতের অবস্থান, এবং অর্থনৈতিক ও আর্থিক প্রভাবের বিচারে একটি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড হিসেবে যাকাতের ভূমিকা। দ্বিতীয়টির ক্ষেত্রে বলা যায়, বিভিন্ন বিষয়ের ওপর যাকাতের উল্লেখযোগ্য প্রভাব রয়েছে:
➡ (ক) রাষ্ট্রের আর্থিক নীতিমালা,
➡ (খ) কর নীতিমালা,
➡ (গ) অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি,
➡ (ঘ) সামাজিক ন্যায়বিচার,
➡ (ঙ) ন্যায়ানুগ বণ্টন ও চাহিদা পূর্ণকরণ,
➡ (চ) সঞ্চয় ও বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত,
➡ (ছ) ব্যবসায়িক উদ্যোগের আর্থিক নীতিমালা ও
➡ (জ) ভোক্তা আচরণ।
স্বভাবতই ইসলামি অর্থনীতিতে সবচেয়ে বেশি গবেষণা হওয়া বিষয়গুলোর মধ্যে যাকাতের স্থান একদম ওপরে।
স্থান ও সময়ের হিসেবে যাকাতকে তার প্রাপ্য সম্মানটুকু দেওয়া হলো। এবার আমরা দ্বিতীয় বিষয়টির দিকে মনোনিবেশ করছি, যা ইসলামি অর্থনীতির ওপর প্রথম আন্তর্জাতিক সম্মেলনের আগে ও পরে মুসলিম অর্থনীতিবিদদের মনোযোগ দখলে রেখেছে।

📘 ইসলামি অর্থব্যবস্থার ইতিহাস > 📄 রিবা বা সুদ উৎখাত

📄 রিবা বা সুদ উৎখাত


বিংশ শতাব্দীতে সুদমুক্ত ইসলামি অর্থনীতি নিয়ে লেখালেখির ক্ষেত্রে একটি নতুন দিক সৃষ্টি হয়েছিল। বিশেষত শতাব্দীটির শেষার্ধে। তা হলো ইসলামি অর্থনীতিবিদগণ এ বিষয়টি আলোচনা করেছেন প্রধান প্রধান আর্থিক বিষয়াদির প্রেক্ষাপটে: (ক) ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানসমূহের কার্যক্রম, (খ) মুদ্রাগত ও আর্থিক নীতিমালা। লক্ষ্য ছিল একেবারেই পরিষ্কার—আধুনিকতার প্রশ্নটি নিয়ে কাজ করা। যেখানে দেখাতে চাওয়া হয়েছে, ইসলাম এখনো আমাদের জীবনের সাথে প্রাসঙ্গিক। তবে অবশ্যই এর আর্থিক উপকরণ ও ব্যাংকিং ব্যবস্থায় নতুনত্ব আনা প্রয়োজন, যাতে ব্যাংকগুলো সফলভাবে সুদমুক্ত ইসলামি ভিত্তির ওপর কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারে এবং নতুন যুগের সমস্যাগুলোর সমাধান বের করা যায়।

📘 ইসলামি অর্থব্যবস্থার ইতিহাস > 📄 সুদমুক্ত ব্যাংকিং

📄 সুদমুক্ত ব্যাংকিং


সুদমুক্ত ব্যাংকিং একটি নতুন বিষয় ছিল, যেটাকে বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝির আগ পর্যন্ত গুরুত্ব সহকারে নেওয়াই হয়নি। বাণিজ্যিক ব্যাংকিং জিনিসটাই তো উনবিংশ শতকের উদ্ভাবন। এ বিষয়ক শুরুর দিকের লেখালেখিগুলো ইসলামি অর্থনীতিবিদদের মনোযোগ কাড়তে শুরু করে সবে বিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগে। সিদ্দিকির রচিত Banking without Interest ১৯৬৯ সালে প্রথমে উর্দুতে এবং তারপর ১৯৭৩ সালে ইংরেজিতে প্রকাশিত হয়। সেখানে তিনি ব্যাংকিং কার্যক্রমকে একটি ইসলামি দৃষ্টিকোণ থেকে আলোচনা করেন। তারও আগে যারা যারা সুদমুক্ত ব্যাংকিং নিয়ে লেখালেখি করেছেন, তাদের অবদান সম্পর্কে পাঠকদের মূল্যবান তথ্য প্রদান করেন তিনি (সিদ্দিকি, ১৯৭৩)। বিষয়টির ওপর উর্দু, ইংরেজি ও আরবিতে কাজ হয়েছে। উর্দুতে আমরা দুটি গুরুত্বপূর্ণ কাজের সন্ধান পাই। সাইয়্যিদ আবুল আলা মওদুদির রিবা (১৯৬১) এবং শাইখ আহমাদ ইরশাদের Banking without Interest (১৯৬৪)। ইংরেজিতে আনওয়ার ইকবাল কুরেশির Islam and the Theory of Interest প্রকাশিত হয়েছে সেই ১৯৪৬ সালে, মুহাম্মাদ উযাইরের An Outline of Interestless Banking ১৯৫৫-তে, আফযালুর রাহমানের Banking and Insurance in Islam ১৯৭৯-তে। মাহমুদ আবু সাউদের Is it Possible to Establish Islamic Banks? মুহামাদ আবদুল্লাহ আল-আরাবির Contemporary Banking (উভয়টি ১৯৬৫), এবং ঈসা আবদুহুর Banking without Interest (১৯৭৪) আরবি ভাষায় কিছু অনন্য কাজ। এই সকল কাজের কমন দিকটি হলো, লেখকগণ ভবিষ্যতে আসন্ন জটিলতাগুলো বুঝেও ইসলামি ব্যাংকিংকে সম্ভব বলেছেন। দেশের ব্যাংকিং আইনের অনুমোদন পেলে এগুলো লাভ-ক্ষতি-ভাগাভাগির ভিত্তিতে কার্যক্রম চালাতে সক্ষম হবে। যেসকল জমাকারী তাদের অর্থ বিনিয়োগ করতে ইচ্ছুক, ব্যাংক একটি স্বাধীন পক্ষ হিসেবে তাদের সাথে অংশীদারিত্বের চুক্তিতে প্রবেশ করবে। আর বিনিয়োগে অনিচ্ছুক জমাকারীগণ তাদের অর্থ জমা রাখবেন চাহিবামাত্র পাওয়ার শর্তে। এই সাধারণ মূলনীতিগুলোর আরও বিশ্লেষণ এবং শাস্ত্রীয় আলোচনা ও ব্যাখ্যা নিরীক্ষণ করা হয়েছে সিদ্দিকির Banking without Interest-এ। আসন্ন কর্মযজ্ঞের আকার উপলব্ধি করে সিদ্দিকি ১৯৭৩ সালে ইসলামি অর্থনীতিবিদদের আহ্বান জানান এ বিষয়ে আলোচনা আরও সামনে এগুনোর জন্য (সিদ্দিকি, ১৯৭৩)। উনিশশ নব্বইয়ের দশকেও পুরোদমে চলমান থেকেছে এসকল আলোচনা।
সেই প্রাথমিক পর্যায়ে লেখালেখির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ধারার আগমন ঘটেছে ব্যাংকিং অ্যাকাডেমিক ও চর্চাকারীদের কাছ থেকে। মিশরে ১৯৬৩ সালে প্রথম ইসলামি ব্যাংক প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনার অভিজ্ঞতার আলোকে এমন একটি কাজ করেছেন আন-নাজ্জার। মিত-গাম্র ব্যাংকের মাধ্যমে তিনি ইসলামি ব্যাংকিং-এর ধারণা প্রবর্তিত করলেও কাজটা তিনি ঠিক ইসলামি স্লোগানে মুড়িয়ে করেননি। সঞ্চয়ী ব্যাংকগুলো প্রায় এক দশক ধরে সফলভাবে কার্যক্রম চালানোর পর সরকার এগিয়ে এসে ব্যাংকটিকে সরকারি তত্ত্বাবধান ও আইনের অধীনে স্থানান্তরিত করে (আল-নাজ্জার, ১৯৭৩, ১৯৭৬)। মিত-গাম্র ব্যাংককে আত্মীকৃত করা প্রতিষ্ঠান নাসের সোশ্যাল ব্যাংক এখনো মিশরে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। এর একটি আলাদা সামাজিক ভূমিকা রয়েছে-যাকাত সংগ্রহ ও বণ্টন করা এবং অভাবীদের সামাজিক ঋণ প্রদান করা।
ইসলামি ব্যাংক নিয়ে লেখালেখি শুরু হওয়া ও সেগুলো প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরের প্রায় দুটি দশক ইসলামি ব্যাংকিং-এর বিশেষ বিশেষ দিকের ওপর সুনির্দিষ্ট লেখনীকর্মের সাক্ষী। আরিফ'। এই গবেষণাকর্মগুলোর বেশ কৌতূহল উদ্রেককারী এক জরিপ আমাদের সামনে পেশ করেছেন। ১৯৬০-এর মাঝামাঝি থেকে শুরু করে আশির দশকের শেষ পর্যন্ত এই বিষয়গুলোর ওপর অবদান বেশ চোখে পড়ার মতো (আরিফ, ১৯৮৮)। জোরারোপ ও বিস্তারের দিক দিয়ে বৈচিত্র্য থাকলেও ইসলামি অর্থনীতিবিদগণ একমত যে, ইসলামি ব্যাংকিং কার্যক্রমের ভিত্তি অবশ্যই সুদের বদলে হতে হবে PLS (profit and loss sharing বা লাভ-ক্ষতির বণ্টন) নীতি। বিংশ শতাব্দীর শেষদিক পর্যন্ত ইসলামি ব্যাংকিং-এর ওপর প্রচুর পরিমাণ তাত্ত্বিক কাজ থাকলেও ব্যাংকগুলোর কার্যক্রমের ওপর বাস্তব কর্ম খুবই সীমিত ছিল বলে প্রতীয়মান হয়। বাংলাদেশ, মিশর, মালয়শিয়া, পাকিস্তান ও সুদানে কিছু কেইস স্টাডি পরিচালনা করা হয়েছে বটে (প্রাগুক্ত), কিন্তু গবেষণার পরিমাণ এখনো খুব কম। মাঠ পর্যায়ের গবেষণা থেকে জানা যায়, এসব দেশের ইসলামি ব্যাংকসমুহের PLS নীতির প্রয়োগে সাদৃশ্য ও পার্থক্য আছে। যেমন, বাংলাদেশের ইসলামি ব্যাংক PLS জমা হিসাব, PLS বিশেষ নোটিস জমা হিসাব, ও PLS টার্ম জমা হিসাব প্রদান করে থাকে। পক্ষান্তরে ব্যাংক ইসলাম মালয়শিয়া চালাচ্ছে দুই ধরনের বিনিয়োগ জমা। একটি সাধারণ জনগণের জন্য, আরেকটি প্রাতিষ্ঠানিক গ্রাহকদের জন্য (প্রাগুক্ত)। গবেষণাটি থেকে আরও দেখা গেছে, স্থান ও কালভেদে মুনাফা-ভাগাভাগির অনুপাত ও পরিশোধের পদ্ধতি বিভিন্নরকম। উদাহরণস্বরূপ, মালয়শিয়ায় মাসিক ভিত্তিতে, মিশরে ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে, বাংলাদেশ ও পাকিস্তানে ষান্মাসিক ভিত্তিতে, আর সুদানে বার্ষিক ভিত্তিতে মুনাফা ঘোষণা করা হয় (প্রাগুক্ত)।
কার্যক্রমগত খুঁটিনাটির সমস্যা এখানেই শেষ না। মুরাবাহা কার্যক্রমে মুনাফার অনুপাত হিসেব করার জন্য ইসলামি ব্যাংকগুলোর LIBOR ছাড়া আর কোনো মানদণ্ড নেই। LIBOR যে সুদের হারভিত্তিক, তা তো সর্বজনবিদিত। মুরাবাহা কার্যক্রম যদি এটাকে মানদণ্ড হিসেবে ব্যবহার করে, তাহলে সেটা আদতে সুদের হারের ভিত্তিতেই পরিচালিত হচ্ছে। তা ছাড়া মুরাবাহা ছাড়া ইসলামি ব্যাংকিং-এর অন্যান্য কার্যক্রমেও তুলনার জন্য এই একই ভিত্তিকে ব্যবহার করা হয়: LIBOR-এর সাথে তুলনায় মুনাফার হার। ইসলামি ব্যাংকগুলোকে এই সমস্যা সমাধানে সাহায্য করার জন্য একটি মুনাফা-সূচক প্রতিষ্ঠিত করা যায়, যা মুরাবাহা ও অন্যান্য বিনিয়োগ কার্যক্রমে ব্যবহৃত হবে। এরকম একটি সূচক স্থাপন করার একটি তাত্ত্বিক কাঠামো প্রদান করেছেন আল-আশকার (আল-আশকার, ১৯৯৫)। অবশ্য সূচকের প্রস্তাবিত নমুনার আরও নিরীক্ষণ এবং এর কার্যকারিতা পরীক্ষার জন্য আরও কাজ করা দরকার।
বিংশ শতাব্দীর শেষ চতুর্ভাগ পর্যন্ত ইসলামি ব্যাংকিং-এর ওপর মূল্যবান অনেক কাজ হয়েছে। তবুও এসব লেখালেখির রয়েছে দুটি বিশেষ সীমাবদ্ধতা: প্রথমত, লেখকগণ তাদের বিশ্লেষণ করেছেন এটা ধরে নিয়ে যে, অর্থনীতিতে রিবা একেবারে অনুপস্থিত। দ্বিতীয়ত, মুদ্রা ও অর্থ সংক্রান্ত নীতিগুলো তারা অন্তত বিশদভাবে হলেও আলোচনা করেননি। সেগুলো আসতে চলেছে আরও মোটামুটি এক দশক পরে। এভাবেই সুদমুক্ত অর্থনীতি ও ইসলামি ব্যাংকিং ব্যবস্থা নিয়ে শতাব্দীটির শেষ পর্যন্ত লেখালেখি অব্যাহত থাকে।

টিকাঃ
১. মুহাম্মাদ আরিফ, মালয়েশিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, ইসলামিক ব্যাংকিং, এশিয়ান-প্যাসিফিক ইকোনমিক লিটরেচার, খন্ড-২, সংখ্যা-২, সেপ্টেম্বর ১৯৮৮। পৃষ্ঠা ৪৮-৬৪। - সম্পাদক
১. Libor সূচককে কন্ট্রাক্টের মুনাফার হার বা যেকোনো অনুপাত নির্ধারণের জন্য পরিমাপক হিসেবে ছেড়ে দিলে তা নিঃসন্দেহে হারাম হবে। কিন্তু এ ধরনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত কোনো সূচকের সারণী সামনে রেখে যদি নির্দিষ্ট হার বেঁধে দেওয়া হয়, অর্থাৎ সুদী সূচকের হাতে যদি ছেড়ে দেওয়া না হয়, বরং সেই সূচককে কেবলই অনুপাত নির্ধারণে কোনো পক্ষের ওপর অবিচার হয়নি এটি প্রকাশ করার জন্য ব্যবহার করা হয় তাহলে জায়েজ হবে, বলা বাহুল্য সেক্ষেত্রে এটি প্রি-এগ্রিমেন্ট অবস্থায় ব্যবহৃত হচ্ছে, মূল এগ্রিমেন্টে এর কোনো ভূমিকা থাকছে না। দ্র: শারীআহ স্ট্যান্ডার্ডস, মুরাবাহা, ধারা নং ৪/৬, AAOIFI, বাহরাইন। - সম্পাদক

📘 ইসলামি অর্থব্যবস্থার ইতিহাস > 📄 মুদ্রাগত ও আর্থিক নীতিমালা এবং ইসলামি সম্পদ বণ্টন

📄 মুদ্রাগত ও আর্থিক নীতিমালা এবং ইসলামি সম্পদ বণ্টন


ইসলামি ব্যাংকসমূহ প্রতিষ্ঠার প্রথম তরঙ্গের কিছুকাল পরেই ইসলামি অর্থনীতিবিদদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে মুদ্রানীতি। মক্কায় ১৯৭৮ সালে প্রথমবারের মতো একটি সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় ইসলামে মুদ্রা ও অর্থ নীতিমালার ওপর। দ্বিতীয়টি আয়োজিত হয় ১৯৮১ সালে ইসলামাবাদে। যৌথভাবে এই সম্মেলনের বিবরণী প্রকাশ করে ইসলামাবাদের Institute of Policy Studies এবং জেদ্দার International Centre for Research in Islamic Economics। এতে রয়েছে উন্নতমানের কিছু গবেষণা নিবন্ধ। এসব নিবন্ধের সাধারণ আলোচ্য হলো কোনো ইসলামি রাষ্ট্রে একক রাজস্বনীতি সম্ভব কি না। আর যদি সম্ভব হয়ে থাকে, তাহলে তা অনৈসলামিক রাজস্বনীতি থেকে কিভাবে তা আলাদা হবে। লেখকগণ প্রথম প্রশ্নটির সাধারণভাবে ইতিবাচক উত্তর দিয়েছেন। কিন্তু প্রশ্নটির দ্বিতীয় অংশের উত্তর নিয়ে লেখকগণের মতামতের মাঝে কিছুটা পার্থক্য রয়েছে। শুরুতে একটি সাধারণ মতৈক্য রয়েছে যে, ইসলামি রাষ্ট্রের রাজস্ব নীতিমালা হতে হবে ইসলামি আদর্শকেন্দ্রিক। অন্যান্য অনৈসলামিক নীতিমালার মতো এটি মূল্যবোধ-বর্জিত হতে পারবে না (আহমাদ প্রমুখ, ১৯৮৩)। ইসলামি রাষ্ট্রের কার্যক্রম কমবেশি ওইসকল সেক্যুলার রাষ্ট্রের মতোই হবে। তবে এর সাথে একটি অতিরিক্ত দায়িত্ব থাকবে ইসলামি আদর্শের শুধু প্রচারই নয়, বরং তার প্রতিরক্ষাও করা।
ইসলামি আর্থিক নীতি নিয়ে গবেষকদের মাঝে মতপার্থক্যের উদ্ভব ঘটে যখন আলোচ্য বিষয় ছিল কর-আরোপ। কাহফ্ফের মৌলিক দৃষ্টিভঙ্গি হলো জীবনযাত্রার যে গ্রহণযোগ্য মানটি সামাজিকভাবে নির্ধারিত, দরিদ্রদের জন্য ওইটুকু নিশ্চিত করার বাইরে সরকারের আর কোনো দায়বদ্ধতা নেই। তাই তার মতে প্রতিরক্ষা খাতের জন্য যতটুকু দরকার, তার বাইরে যাকাত ছাড়া ইসলামি রাষ্টের আর কোনো আর্থিক অধিকার নেই (কাহফ, ১৯৮৩)। পূর্বতন ফকিহগণের ইজমা উদ্ধৃত করে কাহফ মত দেন যে, কর আরোপ বা আর্থিক ব্যবস্থাপনার অন্যান্য নীতিমালায় রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব সীমিত হওয়া উচিত। ফলে কাহফ করকে উপার্জন পুনর্বণ্টনের উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করারও বিরুদ্ধে (প্রাগুক্ত)। তার সাথে অবশ্য অপর কিছু লেখক একমত নন। তাদের যুক্তি হলো, ইসলামি সমাজের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যসমূহ অর্জনের জন্য যাকাতের বাইরে অন্যান্য কর আরোপ করা-সহ অন্যান্য নীতির ক্ষেত্রে ইসলামি রাষ্ট্রের আরও কার্যকর ভূমিকা থাকা উচিত। এসব লক্ষ্যের মধ্যে রয়েছে আরও সমতাপূর্ণ একটি আর্থ-সামাজিক শৃঙ্খল নির্মাণ, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ত্বরান্বিতকরণ, এবং মুদ্রাগত স্থিতিশীলতা বজায় রাখা (আহমদ প্রমুখ, ১৯৮৩)।
ইসলামি রাজস্ব-নীতির প্রতি উচ্চ গুরুত্ব আরোপের ক্ষেত্রে মুতাওয়াল্লি একটি অভিনব ধারণা প্রদান করেছেন। অর্থবাজারে স্থিতিশীলতা ও সাম্যাবস্থা অর্জনের জন্য রাজস্ব-নীতিমালার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি। সুদের অনুপস্থিতি এই লক্ষ্য অর্জনে সহায়ক হতে পারে। তাই ইসলামি রাষ্ট্র "আয় ও অলস সম্পদে”র ওপর "economic dues" আরোপ করতে পারে, “যার হার নির্ভর করবে স্থিতিশীলতা আনয়নকারী শর্তসমূহের ওপর। এর ফলে অলস নগদ অর্থকে ব্যয়বহুল করে তোলা যাবে, যা বিনিয়োগের উৎসাহদাতা হিসেবে কাজ করবে (মুতাওয়াল্লি, ১৯৮৩)। ধারণাটি তাত্ত্বিকভাবে উপযোগী মনে হলেও বাস্তবে এর কিছু প্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে। যেমন, সঞ্চয়ের বদলে ভোগ বেড়ে যাওয়া। তা ছাড়া এর ফলে নগদ অর্থের ওপর দ্বিগুণ করের চাপ পড়বে। একবার যাকাত হিসেবে, আরেকবার অর্থনৈতিক শুল্ক হিসেবে। এটা শরীয়তে অনুমোদিত নয়।
কোনো ইসলামি রাষ্ট্রের মুদ্রানীতির প্রধান প্রধান লক্ষ্য হিসেবে তিনটি জিনিসকে চিহ্নিত করা গেছে (আহমাদ প্রমুখ, ১৯৮৩)। এগুলো হলো: মুদ্রার মূল্যমানের স্থিতিশীলতা, পূর্ণ কর্মসংস্থান ও যথাযথ হারে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সহকারে অর্থনৈতিক সচ্ছলতা, এবং ন্যায়ানুগ বণ্টনের ব্যবস্থা করা। আল-জারহি জোর দিয়ে বলেছেন যে, ইসলামি অর্থনীতিতে টাকার মূল্যমান ঠিক রাখাটা সেখানকার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জন্য প্রায় ফরজ। তার মতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উচিত টাকার জোগান শুধু এই পরিমাণ বর্ধিত হওয়ার অনুমতি দেওয়া, যাতে আসল মজুদের প্রবৃদ্ধিতে কোনো অবদান সংযুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে (আল-জারহি, ১৯৮১)। ইসলামি মুদ্রানীতিতে টাকার মূল্যমান ঠিক রাখাকে কেন উচ্চমাত্রার গুরুত্ব দেওয়া উচিত? এ ব্যাপারে উমর চাপরার মত হলো, ইসলামে রিবার ধারণার ওপর এটির প্রভাব রয়েছে। ঋণকৃত অর্থ ফিরিয়ে দেওয়ার সময় যদি টাকার মান কমে গিয়ে থাকে, তাহলে সুদের অনুপস্থিতির ফলে ঋণের আসল মূল্য আর কিছুতেই ফেরত পাওয়া যাবে না (চাপরা, ১৯৮৫)। এর ফলে বিনাসুদে ঋণদাতার প্রতি অবিচার করা হবে। ইসলামি সমাজে আর্থ-সামাজিক ন্যায়বিচার ও সার্বিক কল্যাণের ওপর মুদ্রাস্ফীতির যে বিরূপ প্রভাব, তার সাথে আরও একটি সমস্যা হিসেবে যোগ হবে এটি।
ইসলামি মুদ্রানীতির আরেকটি লক্ষ্য হলো অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও পূর্ণ কর্মসংস্থান অর্জন। চাপরা এই লক্ষ্যের সাথে পুরোপুরি একমত। কিন্তু অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির সর্বাধিককরণ-কে ইসলামি আর্থিক নীতির সার্বিক লক্ষ্য হিসেবে নির্ধারণ করে নেওয়ার ব্যাপারে সতর্ক করে দিয়েছেন তিনি। স্রেফ উৎপাদন সর্বাধিককরণের জন্য অপ্রয়োজনীয় ও নৈতিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ পণ্য উৎপাদন করা অনুমোদিত নয়। কারণ চাপরার মতে, এর ফলে আল্লাহপ্রদত্ত প্রাকৃতিক সম্পদের অপব্যবহার হবে। তা ছাড়া বর্তমান ভোগ ও ভবিষ্যৎ ভোগের জন্য পণ্য উৎপাদনের মাঝে ভারসাম্যও বজায় রাখতে হবে (চাপরা, ১৯৮৫)।
বেশির ভাগ মুসলিম অর্থনীতিবিদের মতে, ইসলামি অর্থনীতিতে ন্যায়ানুগ বণ্টনের লক্ষ্য সক্রিয়ভাবে অর্জনের জন্য অবশ্যই মুদ্রানীতিকে কাজে লাগানো উচিত। (আহমাদ প্রমুখ, ১৯৮৩)। কিন্তু আরিফের মত হলো, মুদ্রানীতি তৈরি ও প্রয়োগের ক্ষেত্রে ন্যায়ানুগ বণ্টনের ওপর অতিরিক্ত মাথা ঘামালে এর অন্যান্য লক্ষ্য অর্জনের দক্ষতা ও কার্যকারিতার ওপর বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে (প্রাগুক্ত)। তবে এর মানে এই না যে, ন্যায়ানুগ বণ্টন গুরুত্বহীন। উপার্জন-বৈষম্য কমিয়ে আনাটা যে ইসলামি রাষ্ট্রের নীতিমালার একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য, এ ব্যাপারে তিনি অন্যদের সাথে একমত। কিন্তু তার মতে অন্যান্য অর্থনৈতিক নীতির মাধ্যমে এই লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব। মুদ্রানীতিকে এত এত লক্ষ্যের ভারে ন্যুব্জ করে দেওয়া ঠিক নয় (আহমাদ প্রমুখ, ১৯৮৩)।
অনৈসলামিক মুদ্রাব্যবস্থায় উপকরণ হিসেবে ব্যবহৃত সুদ যেহেতু এখানে অনুপস্থিত, সেহেতু কেন্দ্রীয় ব্যাংক সেটার বদলে টাকার জোগান নিয়ন্ত্রণে মনোনিবেশ করতে পারে বলে ইসলামি মুদ্রাবিদগণ মত দেন। ইসলামি অর্থনীতিতে টাকার জোগানের ওপর যথাযথ নিয়ন্ত্রণ চর্চা করা সম্ভব হবে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন টাকার নিয়মনীতি ঠিক করে দেওয়ার মাধ্যমে। উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন টাকা হলো প্রবহমান মুদ্রা ও ব্যাংকের সংরক্ষিত সম্পদ। তা ছাড়া নগদ অর্থ জমার অনুপাত, তারল্য অনুপাত, ও ক্রেডিটের ঊর্ধ্বসীমার তারতম্য করে টাকার জোগানে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আনয়ন করা সম্ভব। টাকার জোগান নিয়ন্ত্রণ করার পাশাপাশি সম্পদের বরাদ্দকরণেও মুদ্রানীতিকে ব্যবহার করা যায়। অনৈসলামিক ব্যবস্থার সুদের হারকে সরিয়ে আনা যেতে পারে ইসলামি ব্যবস্থার লাভ-ক্ষতি-ভাগাভাগি অনুপাতে (আহমাদ প্রমুখ, ১৯৮৩)। চাপরা তার Towards a Just Monetary System-এ যেসব সুবিন্যস্ত মত তুলে ধরেছেন, তার মধ্যে এটিও একটি। ইসলামি অর্থনীতিতে আর্থিক ও মুদ্রানীতি কার্যত কেমন হওয়া উচিত, সে ব্যাপারে তার এই গবেষণাকর্ম এক সুচারু নিরীক্ষণ (চাপরা, ১৯৮৫)। ইসলামি অর্থনৈতিক লেখালেখির ময়দানে এই বিষয়ক বহু অবদানের মধ্যে চাপরার Towards a Just Monetary System এক অনবদ্য সংযোজন। এটি বিশদ, সুবিন্যস্ত, তাত্ত্বিকভাবে বিশ্লেষণাত্মক, ব্যবহারিক ক্ষেত্রে বাস্তবসম্মত।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00