📄 ইসলামিক রিসার্চ এন্ড ট্রেনিং ইনস্টিটিউট (IRTI)
ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের অধীনে IRTI প্রতিষ্ঠিত হয় সৌদি আরবের জেদ্দায় ১৯৮১ সালে। ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (আইডিবি) প্রতিষ্ঠার জন্য উল্লেখিত শর্তসমূহের একটি ধারায় বলা হয়েছে, আইডিবির দায়িত্ব হলো: "(সদস্য দেশগুলোতে) উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তিদের জন্য প্রশিক্ষণ সুবিধাদি প্রসারিত করা এবং গবেষণাকর্মের মাধ্যমে মুসলিম দেশগুলোর অর্থনৈতিক, আর্থিক ও ব্যাংকিং কার্যক্রমকে শরীয়ত মোতাবেক হতে সক্ষম করে তোলা"। এই ধারার বাস্তবায়ন হিসেবে আইডিবি বোর্ড অব গভর্নর্স ১৯৭৯ সালে একটি প্রতিষ্ঠান স্থাপনের সংকল্প ব্যক্ত করে। এটি সদস্য রাষ্ট্রগুলোর উপকারার্থে গবেষণাকর্ম হাতে নেবে এবং প্রশিক্ষণ প্রদান করবে। এরই ফলে ১৯৮১ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় ইসলামিক রিসার্চ অ্যান্ড ট্রেনিং ইন্সটিটিউট, যা তার কার্যক্রম শুরু করে ১৯৮৩ সালে।
IRTI-এর কার্যক্রম নিম্নরূপ (আইআরটিআই ওয়েবসাইট):
১. অর্থনীতি, অর্থব্যবস্থা ও ব্যাংকিং ক্ষেত্রে শরীয়ত প্রয়োগের মডেল ও পদ্ধতি তৈরি করার উদ্দেশ্যে মৌলিক ও ব্যবহারিক গবেষণা পরিচালনা,
২. ইসলামি অর্থনীতির পেশাদার ব্যক্তিবর্গ যেন গবেষণা ও শরীয়ত-মান্যকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর চাহিদা পূরণ করতে পারেন, সেজন্য প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা,
৩. ব্যাংকের (আইডিবির) সদস্য দেশগুলোতে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের প্রশিক্ষণ দান,
৪. এর কার্যক্রমের সাথে সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রের তথ্যসমূহ সংগ্রহ, বিন্যাসকরণ ও প্রচারের জন্য তথ্যকেন্দ্র স্থাপন,
৫. প্রতিষ্ঠানের উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে সহায়ক, এরকম অন্য যে-কোনো কর্মকাণ্ড সম্পাদন।
ICRIE'র মতো IRTI'রও নিজস্ব প্রকাশনা কর্মকাণ্ড ও একটি অ্যাকাডেমিক পত্রিকা রয়েছে। এগুলো ইসলামি অর্থনৈতিক ব্যাংকিং ও অর্থব্যবস্থার ওপর বিশাল পরিসরের বিষয়বস্তু নিয়ে কাজ করে থাকে। আফ্রিকা, এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের যেসব মুসলিম দেশ এর সদস্য কিংবা মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ, সেসব জায়গায় এর প্রশিক্ষণ কার্যক্রম বিস্তৃত। উচ্চ যোগ্যতাসম্পন্ন গবেষকদের এখানে অন্তর্ভুক্তও করে নেওয়া হয়। কিন্তু ICRIE'র সাথে পার্থক্য হলো, IRTI অ্যাকাডেমিক ডিগ্রিদাতা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়। এর উদ্দেশ্য বরং গবেষণা, পেশাদার প্রশিক্ষণ, এবং তথ্যকেন্দ্রের সহায়তায় সদস্য দেশগুলোকে তথ্য সরবরাহ করা। বিভিন্নরকম শিল্প, ব্যাংকিং ও আর্থিক ক্ষেত্রে সরবরাহ করা হয় এসব তথ্য। এসব কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি IRTI আয়োজন করে থাকে বিভিন্ন সেমিনার ও আন্তর্জাতিক সম্মেলন, অতিথিদের বক্তৃতা, জ্যেষ্ঠ গবেষক ও অধ্যাপকদের জন্য বিভিন্ন প্রোগাম, এবং প্রধান প্রধান কাজের অনুবাদ। এই ময়দানের অন্যান্য গবেষণাকেন্দ্র ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে গুরুত্বপূর্ণ সংযোগও বজায় রাখে এটি। ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়সমূহ এবং ইসলামি অর্থনীতির ওপর পাঠ্যক্রমের অধিকারী পশ্চিমা বিশ্ববিদ্যালয়সমূহে এ প্রতিষ্ঠানটি ইসলামি গবেষণা প্রকল্পের জন্য আর্থিক সহায়তাও প্রদান করে। মোটকথা, IRTI ইসলামি গবেষণা ও প্রশিক্ষণের ময়দানে এক বিশাল অর্জন।
📄 ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ইসলামিক থট (IIIT)
IIIT প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৮১ সালে। বর্তমান সমাজে ইসলামের ভূমিকাকে পুনর্জীবিত করার জন্য সমাজবিজ্ঞান ও মানবিক ক্ষেত্রের সমসাময়িক ইসলামি চিন্তা ও জ্ঞানকে পুনর্গঠিত করার লক্ষ্যে কাজ করে এ প্রতিষ্ঠানটি। এ উদ্দেশ্যে IIIT মুসলিম বিশেষজ্ঞ ও বুদ্ধিজীবীদের প্রচেষ্টাকে একত্র করে থাকে। এই ইন্সটিটিউট প্রতিষ্ঠার ধারণাটি জন্ম নেয় ১৯৭৭ সালে সুইজারল্যান্ডে অনুষ্ঠিত এক সম্মেলন থেকে। উম্মতের সংকট এবং ইসলামকে পরবর্তী শতকের জন্য সামনে এগিয়ে নেওয়ার মাধ্যম সম্পর্কে আলোচনা করার জন্য সেই সম্মেলনে প্রায় ত্রিশজন অগ্রগণ্য মুসলিম বুদ্ধিজীবী অংশ নেন। সদস্যগণ সিদ্ধান্তে আসেন যে, ইসলামি চিন্তার জন্য একটি আন্তর্জাতিক মানের ইন্সটিটিউট প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। নিজেদের ধর্মের সমৃদ্ধ ঐতিহ্যকে গভীরভাবে নিরীক্ষণ করতে এবং ইসলামি বুদ্ধিবৃত্তিক সমস্যাগুলোর সমাধানে এই ইন্সটিটিউট মুসলিমদের পথ দেখাবে। প্রতিষ্ঠার এক বছরের মাথায় ইন্সটিটিউটটি প্রথম যে বড় অবদানটি রাখে, তা হলো "জ্ঞানের ইসলামিকরণে"র ওপর একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনের আয়োজন। এটি পাকিস্তানের ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক ইউনিভার্সিটি অব ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত হয়। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান কার্যালয় যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়ার হেনডনে। সেখান থেকে এটি বিভিন্ন সভা, সম্মেলন ও সমাবেশ আয়োজন করে থাকে। পাশাপাশি প্রকাশ করে মূল্যবান গবেষণা, অ্যাকাডেমিক থিসিস ও পাঠ্যবই। এই ক্ষেত্রের গবেষকদের জন্য সহযোগিতা ও বৃত্তিও প্রদান করে এটি। ইংরেজি ও আরবি ভাষায় IIIT'র প্রকাশনাগুলো সুবিশাল পরিসরের বিষয়বস্তু নিয়ে কাজ করে। এর কিছু উদাহরণ হলো (IIIT ওয়েবসাইট):
১. জ্ঞানের ইসলামিকরণ ২. সংস্কৃতির ইসলামিকরণ ৩. ইসলামি চিন্তার সমকালীন বিষয়াদি ৪. ইসলামি মেথোডোলজি ৫. অ্যাকাডেমিক গবেষণা ও থিসিস ৬. অতিথিদের বক্তৃতা ৭. পারিভাষিক অভিধান, পরিভাষা ও গবেষণা সংশ্লেষণ ৮. ইসলামি ঐতিহ্য ও ইসলামি ইতিহাস ৯. সংস্কার আন্দোলনসমূহ
মুসলিম ও অমুসলিম উভয়ের জন্যই IIIT ইসলাম সংক্রান্ত জ্ঞানের মূল্যবান উৎস সরবরাহ করে। আন্তর্জাতিক পরিসরে কাজ করার মাধ্যমে মুসলিম প্রাচ্য ও খ্রিষ্টান প্রতীচ্যের মাঝে গুরুত্বপূর্ণ সংযোগের প্রতিনিধিত্বও করে এই প্রতিষ্ঠান।
📄 দ্য ইসলামিক ফাউন্ডেশন (যুক্তরাজ্য)
ইংল্যান্ডের লেস্টার শহরে ১৯৭৩ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় ইসলামিক ফাউন্ডেশন। এর লক্ষ্য হলো শিক্ষা, প্রশিক্ষণ, গবেষণা ও প্রকাশনার একটি প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হওয়া। তা ছাড়া এই ফাউন্ডেশন সাধারণভাবে পৃথিবীতে এবং বিশেষভাবে যুক্তরাজ্যে মুসলিম ও অমুসলিমদের মাঝে সেতুবন্ধন হিসেবেও কাজ করতে আগ্রহী, (ইসলামিক ফাউন্ডেশন ওয়েবসাইট)।
এর প্রধান অবদান তিনটি: একটি সমৃদ্ধ গ্রন্থাগার, একটি মূল্যবান গবেষণাকেন্দ্র এবং স্বীকৃতিপ্রাপ্ত একটি শিক্ষণ ও প্রশিক্ষণ কার্যক্রম। যুক্তরাজ্যের বুকে তাই ইসলামিক ফাউন্ডেশন একটি বড়সড় মুসলিম মাইলফলক।
📄 ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক ইউনিভার্সিটি (মালয়েশিয়া)
বলাবাহুল্য, আজকের ইসলামি বিশ্বে IIUM প্রসিদ্ধতম প্রতিষ্ঠানগুলোর মাঝে একটি। বিশ্ববিদ্যালয়টির নিজের ভাষ্য অনুযায়ী, সূচনালগ্ন থেকেই IIUM জ্ঞানের সকল শাখায় সর্বোত্তম মানের উচ্চতর শিক্ষা নিশ্চিত করার কোনো চেষ্টাই বাকি রাখেনি। এর কাঠামো ও অবকাঠামোগত দৃষ্টিনন্দন সুবিধাগুলো ইসলামি বিশ্বের অন্য সকল প্রতিষ্ঠানের ঈর্ষার পাত্র (বিশ্ববিদ্যালয় ওয়েবসাইট)।
১৯৮৩ সালে IIUM প্রতিষ্ঠিত হওয়াটা সমসাময়িক মুসলিম উম্মতের এক বড়সড় স্বপ্নের বাস্তবায়ন। জ্ঞানের অন্বেষণে উম্মতের হাতে নেতৃত্ব ফিরে আসার ধারা সূচিত হবে এর মাধ্যমে। IIUM-এর লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের আলোচনায় এই আশাবাদ ব্যক্ত হয়েছে:
শিক্ষাগত উৎকর্ষের এক আন্তর্জাতিক কেন্দ্রে পরিণত হওয়া, যা ইসলামি ওহির জ্ঞান ও মূল্যবোধকে সকল শাস্ত্রের সাথে সমন্বিত করে এবং জ্ঞানের সকল শাখায় উম্মতের অগ্রণী ভূমিকা পুনরুদ্ধারের স্বপ্ন দেখে। (প্রাগুক্ত)
IIUM একটি পরিচালনা পর্ষদের অধীনে কার্যক্রম চালায়। আটটি পৃষ্ঠপোষক সরকারের এবং ওআইসি'র প্রতিনিধিবৃন্দ এর সদস্য। সারা বিশ্বের সরকার ও ইসলামি প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে সম্পর্ক বজায় রাখে এটি। যেমন, লীগ অব ইসলামিক ইউনিভার্সিটিজ, ইন্টারন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশান অব ইউনিভারসিটিজ এবং অ্যাসোসিয়েশান অব কমনওয়েলথ ইউনিভার্সিটিজ। কিছু মালয়েশিয়াভিত্তিক ব্যবসার সাথেও এটি সংযুক্ত, যেগুলো শিক্ষার্থীদের বাস্তব কাজের অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ করে দেয়।
বর্তমানে ২০০৬ সালে IIUM ১৫,০০০ শিক্ষার্থী এবং ৩,০০০ শিক্ষক ও প্রশাসনিক কর্মকর্তার মিলনমেলা। শিক্ষার্থী ও অ্যাকাডেমিক কর্মীদের অনেকেই প্রবাসী। সব মিলিয়ে ১০০টি দেশের প্রতিনিধিত্ব রয়েছে এতে। সেই ১৯৮৩ সালের সাদামাটা সূচনার বিচারে এটি বিশাল পথ পাড়ি দিয়ে এসেছে। সূচনালগ্নে এটি মাত্র ১৫৩জন শিক্ষার্থী এবং মুষ্টিমেয় কিছু প্রভাষক ও প্রশাসক নিয়ে কাজ করছিল (প্রাগুক্ত)।
সবচেয়ে বড় কথা, IIUM-এর প্রতিশ্রুতি: "শিক্ষা অর্জনের ইসলামি ধারণা ও ঐতিহ্যকে পুনরুজ্জীবিত ও পুনর্জীবিত করা—যেখানে জ্ঞান অন্বেষণকে ইবাদত হিসেবে গণ্য করা হয়—সেইসাথে পবিত্র কুরআন থেকে উৎসারিত বৈজ্ঞানিক চেতনার প্রসার ঘটানো। এই বিশ্ববিদ্যালয় একটি সমন্বিত শিক্ষণ ও শিক্ষা পদ্ধতি প্রবর্তনে সচেষ্ট। সেইসাথে সমন্বয়করণ, ইসলামিকরণ, আন্তর্জাতিকীকরণ ও বিপুল উৎকর্ষের মাধ্যমে নৈতিক ও আত্মিক মূল্যবোধকে জোরদার করে।”, (প্রাগুক্ত)
IIUM বিস্তৃত পরিসরের অ্যাকাডেমিক প্রোগ্রামের অধিকারী, যেগুলো দক্ষতাবৃদ্ধি ও বুদ্ধিবৃত্তিক উভয় প্রকার অর্জনের জন্য নির্মিত। এটি IIUM-এর দর্শনের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তাদের বিশ্বাসমতে, জ্ঞান অর্জন ও প্রচার করা উচিত তাওহিদের চেতনায়, একে ইবাদত মনে করে, এবং একে মানবজাতির ওপর আল্লাহর অর্পিত আমানত ভেবে (প্রাগুক্ত),
বিশ্ববিদ্যালয়টির দর্শনের ওপর একটু চোখ না বোলালেই নয়, তা হলো: ১. জ্ঞান প্রচার করতে হবে তাওহিদের চেতনায়, যা ধাবিত করবে আল্লাহকে পরম স্রষ্টা ও মানবজাতির প্রভু হিসেবে স্বীকার করার দিকে। ২. জ্ঞানক্রমের উচ্চতম স্তর হলো আল্লাহকে পরম স্রষ্টা ও মানবজাতির প্রভু হিসেবে স্বীকার করে নেওয়া। ৩. জ্ঞান আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি আমানত এবং আল্লাহ বিশ্বজগতকে যে উদ্দেশ্যে সৃষ্টি করেছেন, তার সাথে সামঞ্জস্য রেখে এর বিকাশ ঘটাতে হবে। ৪. মানুষ জ্ঞানের ব্যবহার করবে আল্লাহর বান্দা এবং পৃথিবীতে প্রতিনিধি হিসেবে আল্লাহর ইচ্ছার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে। ৫. জ্ঞান অন্বেষণ এক ধরনের ইবাদত হিসেবে বিবেচিত হবে।
লক্ষণীয় যে, উপর্যুক্ত দর্শনে ধর্মীয় ভাবধারা স্পষ্টত বিদ্যমান।