📄 ইসলামি আর্থিক প্রতিষ্ঠানসমূহ স্থাপন
ইসলামি আর্থিক প্রতিষ্ঠান স্থাপনের প্রথম প্রচেষ্টাটি মিশরে কিছুটা স্থায়ী হতে পেরেছিল। মিশরে ১৯৬৩ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় মিত-গাম্র সেভিংস ব্যাংক। এই ব্যাংকের পথিকৃৎ আহমেদ আন-নাজ্জার। তিনি (পশ্চিম) জার্মানির স্থানীয় সঞ্চয়ী ব্যাংকের ব্যাপারে বাস্তব অভিজ্ঞতাধারী একজন মিশরীয় বিদ্বান। নীলনদের দেশে একটি জার্মান এক্সপেরিমেন্টকে নিয়ে আসতে চেয়েছিলেন তিনি। ব্যাংকটির কাজের ভিত্তি ছিল ইসলামের সুদমুক্ত লাভ-ক্ষতি ভাগাভাগিকরণ নীতি। ব্যাংকটিকে অবশ্য ঠিক "ইসলামি” বলে আখ্যায়িত করা হতো না। কারণ ষাটের দশকে নাসেরের শাসনাধীন মিশর দ্রুতগতিতে সমাজতন্ত্রের দিকে এগিয়ে চলছিল। রাষ্ট্রপতি নাসের যেটাকে বলেন আরব সমাজতন্ত্র। বিদেশি ও প্রধান দেশীয় বিনিয়োগসমূহের গণহারে জাতীয়করণ চলছিল তখন। এহেন পরিস্থিতিতে ব্যাংকটিকে "ইসলামি” বলে সম্বোধন করাটা ছিল দুষ্কর। কিন্তু আন-নাজ্জার আমাদের বলেন যে, সুদবিহীন ইসলামি নীতিতে চলতে পারলে নাম নিয়ে তার কোনো মাথাব্যথা নেই (আন- নাজ্জার, ১৯৭৩)। ব্যাংকটির দর্শন ছিল স্থানীয় সঞ্চয়কে ক্ষুদ্র ব্যবসা ও উদ্যোগের অর্থায়নে পরিচালিত করা। শাসনরত কর্তৃপক্ষের কাছে এই মতাদর্শ গ্রহণযোগ্য বলে প্রতীয়মান হয়। মিশরের অন্য সকল ব্যাংকের মতোই মিত-গাম্রও ছিল সরকারি মালিকানাধীন। তাই একে সরকারি খাতের প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিবেচনা করা হতো এবং তা ছিল অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে জবাবদিহিতার অধীন। তবে ব্যাংকটির কার্যক্রমে কিছু পরিমাণে স্বাধীনতা দেওয়া হয়। সে-সময়কার বিচারে তা একটু অস্বাভাবিক বটে। ব্যাংকটির কার্যক্রম ছিল-জমা হিসাব, ঋণ হিসাব, সমতাপূর্ণ অংশগ্রহণ, সরাসরি বিনিয়োগ, ও সামাজিক সেবা (কার্যক্রমের ওপর আরও বিস্তারিত জানতে দ্রষ্টব্য আল-নাজ্জার, ১৯৭৩ ও ১৯৭৬, এবং আল-আশকার, ১৯৮৭)।
ঊনিশশ সত্তর ও আশির দশকগুলোতে ইসলামি বিশ্বে আরও ইসলামি ব্যাংক ও কর্পোরেশান স্থাপিত হয়। ক্রমধারা অনুযায়ী এগুলো হলো দুবাই ইসলামি ব্যাংক (১৯৭৫), কুয়েত ফাইন্যান্স হাউজ (১৯৭৭), সৌদি আরবের আর-রাজহি কোং ফর কারেন্সি এক্সচেইঞ্জ অ্যান্ড কমার্স (১৯৭৮), জর্ডান ইসলামিক ব্যাংক ফর ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট (১৯৭৮), বাহরাইন ইসলামিক ব্যাংক (১৯৭৯), ইরান ইসলামিক ব্যাংক (১৯৭৯), কাতারের ইসলামিক এক্সচেইঞ্জ অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট কর্পোরেশন (১৯৭৯), মিশরের ইন্টারন্যাশনাল ব্যাংক ফর ইনভেস্টমেন্ট অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (১৯৮০), বাংলাদেশের ইসলামি ব্যাংক (১৯৮৩), সুদানের তাদামুন ইসলামিক ব্যাংক (১৯৮৩), ব্যাংক ইসলাম মালয়শিয়া (১৯৮৩), বাইতুত তামওয়িলিস সাউদি তুনিসি (১৯৮৪), এবং সুদানের ওয়েস্ট সুদান ইসলামিক ব্যাংক (১৯৮৪)। প্রয়াত বাদশাহ ফায়সালের নামানুসারে একগুচ্ছ ফায়সাল ইসলামিক ব্যাংক স্থাপিত হয় সত্তর ও আশির দশকে সৌদি আরবে, ১৯৭৭ সালে মিশরে ও সুদানে, এবং ১৯৮৫ সালে তুরস্কে। আল-বারাকাহ গ্রুপের আবির্ভাগ ঘটে আশির দশকের শুরুতে— সুদানের আল-বারাকাহ ব্যাংক (১৯৮২), সৌদি আরবের আল-বারাকাহ ইনভেস্টমেন্ট অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট কোং (১৯৮২), বাহরাইনের আল-বারাকাহ ইসলামিক ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক (১৯৮৪), এবং আল-বারাকাহ টার্কিশ ফাইন্যান্স হাউজ (১৯৮৪)।
এখানেই শেষ না। ইসলামি ব্যাংককে বয়ে নিয়ে যাওয়া হয় ইউরোপের বুকেও: বাহামা দ্বীপপুঞ্জে ইসলামিক ইনভেস্টমেন্ট কোম্পানি (১৯৭৭), লুক্সেমবার্গে ইসলামিক ব্যাংকিং সিস্টেম (১৯৭৮), যুক্তরাজ্যে আর-রাজহি কোং ফর ইসলামিক ইনভেস্টমেন্ট (১৯৮০), সুইজারল্যান্ডে দারুল মাল আল-ইসলামি (১৯৮১), ডেনমার্কের ইসলামিক ব্যাংক ইন্টারন্যাশনাল (১৯৮৩), এবং যুক্তরাজ্যের আল-বারাকাহ ইন্টারন্যাশনাল পিএলসি (১৯৮৩)।
শেষ করার আগে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ইসলামি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সাথে আরেকটি নতুন সংযোজনের আগমনকে স্বাগত না জানালেই না। তা হলো থাইল্যান্ডে একটি ইসলামি ব্যাংকের প্রতিষ্ঠা। সেদেশে মুসলিমরা সংখ্যালঘু। মোট জনসংখ্যার দশ শতাংশের বেশি নয়। সেই থাইল্যান্ডেরই রাজধানী ব্যাংককে স্থাপিত হয়েছে একটি ইসলামি ব্যাংক, যার শাখা ছড়িয়ে পড়েছে দেশটির উত্তর ও দক্ষিণে। দ্য ইসলামিক ব্যাংক অব থাইল্যান্ড তাই সবদিক দিয়েই এক বিশাল ঘটনা। এর সাথে আরও যোগ করতে হয় যে, ইসলামি ব্যাংক স্থাপিত হওয়ার আগেই দেশটির অনৈসলামিক ব্যাংকগুলোতেও ইসলামি সেকশন সংযোজিত হয়েছিল। যেমন ক্রুং থাই ব্যাংক। এখানেই শেষ নয়। উসমান বিন আফফান ফাইন্যানশিয়াল সোসাইটির মতো আর্থিক সংস্থাও থাইল্যান্ডের দক্ষিণাঞ্চলে সফলভাবে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে প্রায় এক দশক ধরে। প্রতিষ্ঠানটি বিশেষত থাইল্যান্ডের দক্ষিণ প্রদেশগুলোতে সেবা দিয়ে থাকে, যেখানে মুসলিমরা সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠী। এ প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমের সফলতার প্রমাণ এর ক্রমবর্ধমান পুঁজি, আয়, অবদান ও কাজের বৈচিত্র্য। থাইল্যান্ডের নতুন ইসলামি ব্যাংকটির মতোই এর সাফল্য।
ইসলামি বিশ্বে উপর্যুক্ত ইসলামি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানসমূহ স্থাপনে অবদান রেখেছে বেশ কয়েকটি নিয়ামক: ১. তৃণমূল পর্যায়ে ইসলামের ব্যাপারে ক্রমবর্ধমান সচেতনতা, ২. সম্পদশালী মুসলিমদের সহযোগিতা, এবং ৩. সরকারি সহযোগিতা।
➡ ১. তৃণমূল পর্যায়ে ইসলামের ব্যাপারে ক্রমবর্ধমান সচেতনতা: ইচ্ছুক গ্রাহক, জমাকারী ও তহবিল ব্যবহারকারীদের ছাড়া ইসলামি ব্যাংক প্রতিষ্ঠা সম্ভব হতো না, যারা একইসাথে ইসলামি মিশন ও আদর্শেও বিশ্বাসী। এর ফলে স্বভাবতই ইসলামি আর্থিক বাজার গড়ে ওঠে। তহবিলের এই জমাকারী ও ব্যবহারকারীরা তাদের সঞ্চয় ও বিনিয়োগে শরীয়ত প্রয়োগ করতে আগ্রহী। এদের ছাড়া ইসলামি আর্থিক প্রতিষ্ঠানসমূহের সূচনাটা করা সম্ভব হলেও এগুলোর অগ্রগতি সাধন ও টিকিয়ে রাখা মোটেও সম্ভব হতো না। কারণ তারাই এগুলো জিইয়ে রাখার প্রয়োজনীয় উপাদান। আরেকভাবে বললে, আর্থিক খাতে ইসলামি নীতিমালা প্রয়োগের জন্য ইসলামি আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো একটি বড় অগ্রগতি বটে। কিন্তু এগুলোর বৃদ্ধি, অব্যাহত থাকা ও টিকে থাকাও একইরকম গুরুত্বপূর্ণ। এসব প্রতিষ্ঠান যেসব সেবা প্রদান করে থাকে, অর্থবাজারের অংশগ্রহণকারীদের (তহবিলের জমাকারী ও ব্যবহারকারী) সেসব সুবিধা ব্যবহার করার ইচ্ছেটাই এসব সেবার প্রসারতা ও গভীরতা বৃদ্ধি নিশ্চিত করে। একই বাজারে ইসলামি ও অনৈসলামিক উভয় ধরনের আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে কার্যক্রম চালাতে দেওয়া মানে এদের মাঝে অবশ্যম্ভাবী প্রতিযোগিতা। গ্রাহকের ধর্মীয় তাড়না কতটুকু, তা তার আর্থিক লেনদেনে প্রভাব ফেলবে। এই গ্রাহকগণ অবশ্যই এই দুই ব্যবস্থার মাঝে এক ধরনের তুলনা করে দেখবেন। অন্তত কোন ব্যবস্থাটি ভালো কাজ করে, সেটা বোঝার জন্যও তার এই তুলনা করার দরকার আছে। ইসলামি আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবস্থাপনা পর্ষদের ঘাড়ে অনেক বড় এক ভূমিকার ভার বিদ্যমান। নিজেদের কার্যক্রমের দক্ষতা নিশ্চিতকরণে সুদভিত্তিক ব্যাংকগুলোর চেয়েও আরও কঠিন পরিশ্রম করতে হয় তাদের।
➡ ২. সম্পদশালী মুসলিমদের সহযোগিতা: এই ব্যাংকগুলো প্রতিষ্ঠার জন্য প্রাথমিক তহবিলের দরকার অবশ্যই ছিল। এসব ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান স্থাপনের টাকা প্রধানত তিনটি উৎস থেকে এসেছে: প্রথমত, সম্পদশালী মুসলিমগণ, বিশেষত আরবগণ। তারা সুদভিত্তিক পদ্ধতির বিকল্প হিসেবে ইসলামি ব্যাংকিং ব্যবস্থার কার্যকারিতায় বিশ্বাস পোষণ করেছেন। যেমন দারুল মাল আল-ইসলামি এবং আল-বারাকাহ গ্রুপের অর্থায়নকারীগণ। দ্বিতীয়ত, সরকারি আর্থিক সহযোগিতাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। কুয়েত ফাইন্যান্স হাউজ ও মালয়েশিয়ার ব্যাংক ইসলাম এর কথা বিশেষভাবে প্রযোজ্য।
⇒ ৩. সরকারি সহযোগিতা: সরকার ও সাধারণ জনগণের অবদানও অনস্বীকার্য, যেমনটা হয়েছে জর্ডান ইসলামিক ব্যাংকের ক্ষেত্রে। এটি (ক) স্থানীয় মালিকানাধীন, (খ) এর ৯৮.৭ শতাংশ পুঁজি ব্যক্তি মালিকানা থেকে এসেছে (১.৩ শতাংশ অর্থায়ন করেছে হাউজিং ব্যাংক অব জর্ডান), (গ) এর কোনো শেয়ারহোল্ডারই বড় অংশের শেয়ারহোল্ডার নন, এবং (ঘ) এটা গতানুগতিকভাবে কোনো তেলনির্ভর ধনী দেশে গড়ে ওঠেনি। সরকার ও সম্পদশালী ব্যক্তিদের থেকে শুরুতে একটু সহযোগিতা পেলেই যে ইসলামি ব্যাংক প্রতিষ্ঠিত করা সম্ভব, এই ব্যাংকটি তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
ইসলামি আর্থিক প্রতিষ্ঠানসমূহের স্থাপনা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ইসলামি ব্যবসায়িক উদ্যোগকে উৎসাহ জুগিয়েছে। যেসব উদ্যোগ ইসলামি নীতিমালার ভিত্তিতে চলতে আগ্রহী, এ প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের অর্থায়ন করেছে। এটি প্রত্যক্ষ উৎসাহ। এরকম কিছু উদ্যোগ আর্থিক সম্পদের ওপর এমনভাবে নির্ভরশীল ছিল যে, এসব উদ্যোগে নিজেদের সঞ্চয় বিনিয়োগ করতে আগ্রহী মুসলিম অংশীদারদের থেকে পুঁজি হাসিল করতে পেরেছে তারা। এটি পরোক্ষ উৎসাহ। ইসলামি ব্যবসায়িক উদ্যোগগুলো বৈচিত্র্যময় বাণিজ্যিক ও শিল্প কর্মকাণ্ডে জড়িত, যাতে রয়েছে নানারকমের পণ্য: তৈরি পোশাক, আসবাবপত্র, বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি, নির্মাণশিল্প, আবাসন, চিকিৎসা উপকরণ ও প্লাস্টিক সামগ্রী।
টিকাঃ
১. প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ্য যে, সুদমুক্ত অর্থব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা, প্রায়োগিক সমস্যাগুলোর সমাধান ও ইসলামি অর্থনীতির বিবিধ প্রশিক্ষণপ্রদানে পাকিস্তানের উলামায়ে কেরাম উল্লেখযোগ্য প্রচেষ্টা চালিয়েছেন। শারিয়া আপিল বেঞ্চের বিচারপতি থাকাকালে ১৯৯৯ সালে আল্লামা মুফতি তাকি উসমানী হাফি, সুদের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে রায় প্রদান করেছেন। সেই রায়ে সুদমুক্ত অর্থব্যবস্থার একটি রূপরেখাও প্রদান করেছেন। কিন্তু দুঃখজনক সত্য হলো, এ নিয়ে আপিল, রায় ও পুনঃ আপিলের ধারাবাহিকতা এখনো চলমান। বাস্তবে এটা প্রয়োগ করা সম্ভব হয়নি- সম্পাদক