📘 ইসলামি অর্থব্যবস্থার ইতিহাস > 📄 ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (আইডিবি)

📄 ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (আইডিবি)


ওআইসি'র সুপারিশের বাস্তবায়ন হিসেবে ১৯৭৩ সালের ডিসেম্বর মাসে অনুষ্ঠিত মুসলিম দেশসমূহের অর্থমন্ত্রীগণের সম্মেলনে মুসলিম দেশসমূহের সেবার উদ্দেশ্যে একটি ইসলামি উন্নয়ন ব্যাংক প্রতিষ্ঠার সংকল্প ঘোষিত হয়। জুলাই ১৯৭৫-এ আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক। এর কার্যক্রম শুরু হয় একই বছরের অক্টোবর মাস থেকে। ব্যাংকটির উদ্দেশ্য শরীয়তের নীতিমালা অনুযায়ী সদস্য রাষ্ট্রসমূহের এবং মুসলিম জনসমাজগুলোর স্বতন্ত্রভাবে ও সামষ্টিকভাবে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও সামাজিক অগ্রগতি ত্বরান্বিত করা।
আইডিবির ভূমিকার মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন উৎপাদনশীল প্রকল্প ও উদ্যোগের জন্য ঋণমুক্ত পুঁজিতে অংশগ্রহণ ও ঋণ প্রদান। তা ছাড়া সদস্য দেশগুলোকে অন্যান্য ধরনের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নতিতে আর্থিক সহযোগিতা প্রদান করাও এটির কাজ। বিশেষ কিছু উদ্দেশ্যে তহবিল প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনা করাও আইডিবির একটি দায়িত্ব। সদস্য নয়, এমন রাষ্ট্রগুলোর মুসলিম জনসমাজকে সহযোগিতা প্রদানের জন্যও তহবিল তৈরি করে তারা। আইডিবির অধিকার রয়েছে আমানত গ্রহণ করার এবং শরীয়া-সম্মত আর্থিক সম্পদকে গতিশীল করার। তাই এটির দায়িত্ব হলো সদস্য দেশগুলোর মাঝে বৈদেশিক বাণিজ্যের প্রসার ঘটাতে সহযোগিতা করা। সদস্য দেশগুলোতে কারিগরি সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়া। এবং এসব দেশে উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তিবর্গের জন্য প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা (আইডিবি ওয়েবসাইট)।
আইডিবির শেয়ারহোল্ডার হলো মুসলিম দেশগুলোর সরকারসমূহ। প্রায় ৫৭টি দেশ অর্গ্যানাইজেশান অব ইসলামিক কনফারেন্সের সদস্য। বোর্ডে প্রতিনিধিত্ব করেন সদস্য দেশগুলোর অর্থমন্ত্রীগণ (কোষাধ্যক্ষবৃন্দ)। ব্যাংকটির স্বীকৃত পুঁজির পরিমাণ ১৯৭৫ সালে দুই বিলিয়ন ইসলামি দিনার থেকে বেড়ে ১৯৯২ সালে ছয় বিলিয়ন হয়। ২০০১ সালে তা পনেরো বিলিয়নে উন্নীত হয়। এর শেয়ারপ্রতি মূল্যমান ১০,০০০ ইসলামি দিনার এবং লগ্নিকৃত পুঁজি আট বিলিয়ন ইসলামি দিনারের কিছু বেশি। প্রতিষ্ঠাকালে ও এর কিছু বছর পর পর্যন্ত কেবল সৌদি আরবের জেদ্দায় আইডিবি'র একটি প্রধান কার্যালয় ছিল। সেই থেকে নিয়ে প্রতিষ্ঠানটির পরিসর বাড়তে বাড়তে এর স্থানীয় কার্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে মরক্কোর রাবাত, মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুর, কাজাখাস্তানের আলমাতিতে। মাঠ পর্যায়ের প্রতিনিধি রয়েছে মধ্যপ্রাচ্য, মধ্য-এশিয়া, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং আফ্রিকার আরও এগারোটি সদস্য দেশে। মজার ব্যাপার হলো, যোগাযোগের সুবিধার্থে আইডিবির তিনটি দাপ্তরিক ভাষা রয়েছে— আরবি, ইংরেজি ও ফরাসি।
আইডিবির কার্যক্রমের পরিসর খুবই বিস্তৃত। এতে প্রধানত রয়েছে: প্রকল্পের অর্থায়ন, ব্যবসায়ের অর্থায়ন, ব্যক্তিগত খাতের প্রচারণা, বিশেষ সহযোগিতা ও বৃত্তি, কারিগরি সাহায্য, তরুণ গবেষকদের পৃষ্ঠপোষকতা কার্যক্রম, ইসলামি ব্যাংকসমূহের পোর্টফোলিও, বিনিয়োগ তহবিল এবং অবকাঠামো তহবিল।
শরীয়াহসম্মতভাবে আইডিবির অর্থায়নের মাধ্যমসমূহ প্রধানত নিম্নরূপ (আইডিবি ওয়েবসাইট):
➡ ঋণ: এ ঋণ সুদমুক্ত, তবে ব্যবস্থাপনার চার্জ প্রযোজ্য। এটির পরিমাণ বার্ষিক ০.৭৫% থেকে ২.৫০% পর্যন্ত হয়ে থাকে। ত্রিশ বছরের ঋণের জন্য বর্ধিত সময়কাল দশ বছর পর্যন্ত হতে পারে। এসব ঋণের প্রধান উদ্দেশ্য হলো প্রকল্পসমূহের জন্য দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের ব্যবস্থা করা। এই প্রকল্পগুলো হতে হবে এমন, যার কাছ থেকে উল্লেখযোগ্য আর্থ-সামাজিক প্রভাব প্রত্যাশিত এবং তা উপার্জনমূলক ধাঁচের নয়। অবকাঠামোগত প্রকল্পের জন্য এগুলো সবচেয়ে বেশি উপযোগী।
➡ ইজারা: উপার্জনমূলক প্রকল্পের জন্য পুঁজি উপকরণ ও অন্যান্য স্থায়ী সম্পদের অর্থায়নে এটি ব্যবহার করা হয়। সাধারণত ব্যাংকিং ইজারায় যেমনটি হয়, ইজারার মেয়াদ শেষে সম্পদের মালিকানা ইজারাগ্রহীতার কাছে হস্তান্তর করে দেওয়া হয়। এখানেও তা-ই। প্রস্তুতির মেয়াদকাল ছয় থেকে ৪৮ মাস পর্যন্ত হওয়ার পাশাপাশি ইজারার মেয়াদ বর্ধিত হতে পারে ১৫ বছর পর্যন্ত। ইজারার প্রদেয় (ভাড়া) এমনভাবে নির্ধারিত হয়, যেন ব্যাংক বার্ষিকভাবে গড়ে প্রায় ৬% হারে ফেরত পেতে পারে। ব্যাংকের স্বার্থ সুরক্ষিত রাখার জন্য ইজারাটি সরকারি বা ব্যাংক গ্যারান্টির অধীন হয়ে থাকে।
➡ কিস্তি বিক্রয়: এ ধরনের অর্থায়ন পদ্ধতিতে ব্যাংক ওই উপকরণগুলো কিনে নেয়, যেগুলো মূলত পুঁজির সম্পদ। তারপর গ্রহীতার কাছে সেগুলো বিক্রি ও সরবরাহ করে কিস্তি আকারে। কিস্তির সার্বিক মেয়াদ ১৫ বছর পর্যন্ত বর্ধিত হতে পারে। আর কিস্তি বিক্রয় থেকে ব্যাংকের কাছে ফেরত আসার হার বছরে গড়ে প্রায় ৬%।
➡ ইস্তিসনা'আ: ইস্তিসনা'আ এক ধরনের চুক্তি। এতে ব্যাংক গ্রহীতার প্রয়োজনীয়তা অনুযায়ী নির্দিষ্ট উপকরণ উৎপাদিত করে দেওয়ার দায়িত্ব হাতে নেয়। তারপর এগুলো গ্রহীতার কাছে একটি নির্দিষ্ট মূল্যে বিক্রি করে নির্ধারিত একটি মেয়াদকাল যাবত। এই মেয়াদ ১৫ বছরের বেশি হতে পারবে না। ব্যাংকের ফেরতপ্রাপ্তি প্রায় ৬%।
➡ সমতাপূর্ণ অংশগ্রহণ: ব্যবসায়িক মূলধনে ব্যাংকের সর্বোচ্চ অংশগ্রহণ এক- তৃতীয়াংশ। বলাবাহুল্য, ব্যবসা অবশ্যই শরীয়তের সীমারেখার মাঝে পরিচালিত হতে হবে।
➡ মুনাফা ভাগাভাগি: এটি ব্যাংক ও উদ্যোক্তার মাঝে একধরনের অংশীদারিত্ব। ব্যাংক ও অংশীদারদের সম্মতিমূলক পরিমাণে মুনাফা ভাগ করে নেওয়া হয় এখানে।
➡ অর্থায়ন: এগুলো জাতীয় উন্নয়ন অর্থায়ন প্রতিষ্ঠানসমূহ (এনডিএফআই) ও ইসলামি ব্যাংকগুলোর অর্থায়নের সাধারণ ধারা। ছোট থেকে মাঝারি আকারের উদ্যোগের অর্থায়ন করা হয় এর মাধ্যমে। অর্থায়নের মেয়াদ সাধারণত ওপরে বর্ণিত মাধ্যমগুলোর চেয়ে কম। আর ফেরতের হার আগের মতোই প্রায় ৬%।
➡ কারিগরি সহযোগিতা: এটি বিনিয়োগ-পূর্ববর্তী ব্যয়ভারের অর্থায়নের জন্য। যেমন গবেষণা ও উন্নয়ন। এটি মঞ্জুরি বা সুদমুক্ত ঋণ আকারে হয়ে থাকে সর্বোচ্চ ১৬ বছর সময়কালের জন্য। বর্ধিত সময়কাল আরও চার বছর। এর সার্ভিস ফি প্রায় ১.৫%।
প্রকল্প ও ব্যবসায়ের অর্থায়নে ভূমিকা-সহ আইডিবির অন্যান্য সেবা মুসলিম জনসমাজগুলোকে উল্লেখযোগ্যভাবে সাহায্য করেছে। ব্যাংকের নীতিমালা সহানুভূতিপূর্ণ, কিন্তু গা-ছাড়া নয়। বিচক্ষণ, কিন্তু কঠোর নয়। অর্থায়নের গ্রহীতা ও দাতা উভয়ের স্বার্থই আইডিবি ব্যবস্থাপনা পর্ষদের সতর্ক নিরীক্ষণের অধীনে থাকে। আইডিবি ভাইস-প্রেসিডেন্টের উক্তি দিয়ে এভাবে শেষ করা যায়, “গুরুত্বপূর্ণ উল্লেখ যে, আইডিবির অর্থায়নের সাথে পলিসি কন্ডিশনালিটি নেই।।। এই ব্যাংক মোটেও কোনো দুধের মাছি নয়। আমরা সকল সদস্য দেশের সকল সময়ের বন্ধু। সুসময় ও দুঃসময়ে আমরা সবসময় তাদের পাশে আছি। আমাদের আর্থিক কার্যক্রমের একমাত্র ভিত্তি হলো সদস্য দেশগুলোতে উম্মতের উন্নয়ন-প্রচেষ্টায় সহযোগী হওয়ার সদিচ্ছা" (আযনান, ২০০৩)। ব্যাংকের এই দাবির যে সত্যতা রয়েছে, তার পক্ষে শক্তিশালী প্রমাণ বিদ্যমান।

টিকাঃ
১. আইএমএফ-এর কাছ থেকে কোনো সমস্যাজর্জরিত দেশ ঋণ নিলে তাদের শর্ত দেওয়া হয় যে, যেই সমস্যার জন্য তারা ঋণটি নিচ্ছে, দেশটির সরকার সেটা কাটিয়ে ওঠার জন্য দেশের অর্থনৈতিক নীতিমালা সে অনুযায়ী সংশোধন করে নেবে।- অনুবাদক

📘 ইসলামি অর্থব্যবস্থার ইতিহাস > 📄 কিছু মুসলিম দেশে অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ইসলামিকরণ

📄 কিছু মুসলিম দেশে অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ইসলামিকরণ


রাষ্ট্রপতি জেনারেল জিয়াউল হকের শাসনামলে ১৯৭৯ সালে পাকিস্তান সরকার ঘোষণা দেয়—সম্পূর্ণ অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে ইসলামি অর্থনীতির অধীনে স্থানান্তরিত করার। কোনো মুসলিম সরকার কর্তৃক ইসলামি অর্থনীতির নীতিমালা সত্যিকার অর্থে বাস্তবায়নের এটাই প্রথম লক্ষণীয় প্রচেষ্টা। ইসলামিকরণের জন্য বেশ কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করে। এতে প্রধানত রয়েছে: ইসলামি করব্যবস্থার প্রয়োগ, যাকাতব্যবস্থার প্রবর্তন এবং আর্থিক ব্যবস্থা থেকে সুদ উচ্ছেদ করে মুনাফা ও ক্ষতি ভাগাভাগি পদ্ধতির প্রচলন ঘটানো।
সুদ দূরীকরণের প্রথম পর্যায়টি দেখা যায় ১৯৭৯ সালে। সরকার ন্যাশনাল ইনভেস্টমেন্ট ট্রাস্টের (এনআইটি) কার্যক্রমের ভিত্তি পরিবর্তিত করে। এই ট্রাস্ট ১৯৬২ সালে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এর লক্ষ্য কর্পোরেট খাতে বিনিয়োগের জন্য সঞ্চয়ের ব্যবস্থাপনা করা। জুলাই ১৯৭৯ থেকে কার্যকরভাবে এর ভিত্তি হয় সুদমুক্ত। এই পরিবর্তনের প্রতি সঞ্চয়কারীদের প্রতিক্রিয়া ছিল ইতিবাচক। এনআইটির সামষ্টিক বিক্রয়, লভ্যাংশ ও পুঁজিতে উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি ঘটে (শাহাব, ১৯৮২)। কার্যক্রমের ভিত্তির অনুরূপ পরিবর্তন ঘটানো হয় ইনভেস্টমেন্ট কর্পোরেশন অব পাকিস্তানের (আইসিপি) ক্ষেত্রেও। আইসিপি ১৯৬৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল একটি বিনিয়োগ ব্যাংক হিসেবে কাজ করার লক্ষ্যে। পুঁজিবাজারের উন্নয়ন ও সমতামূলক বিনিয়োগ প্রসারে কাজ করে এটি। কার্যক্রমের ভিত্তি পরিবর্তির হওয়ার পর তা সুদমুক্ত পদ্ধতিতে কাজ করতে শুরু করে। ধাপে ধাপে বাস্তবায়িত হয়। ঋণস্বীকারপত্র অর্থায়নকে পরিবর্তিত করা হয় পার্টিসিপেটিং টার্ম সার্টিফিকেট (পিটিসি) অর্থায়নে। এখানেও পরিবর্তনের ফলাফল হয় সাফল্যপূর্ণ। লভ্যাংশের পরিমাণ ছিল ঘোষিত গড় পরিমাণের চেয়ে বেশি (প্রাগুক্ত)। তা ছাড়া ব্যাংকার্স ইকুইটি লিমিটেড নামে একটি নতুন বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠানও প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৭৯ সালে। এর লক্ষ্য ব্যক্তিগত খাতে বৃহৎ ও মধ্যম আকারের শিল্প উদ্যোগের জন্য পিএলএস অর্থায়ন প্রদান করা। আরও কিছু বড় পরিবর্তন ঘটানো হয় ১৯৮০ সালে: মুদারাবা কোম্পানি এবং মুদারাবা (ব্যবসা আরম্ভ ও নিয়ন্ত্রণ) অধ্যাদেশের ঘোষণা, এবং ব্যাংকিং আইনের সংশোধন। এই সংশোধনের ফলে সুদভিত্তিক হিসাবের বদলে লাভ ও ক্ষতি ভাগাভাগির ভিত্তিতে হিসাব খোলার অনুমোদন দেওয়া হয়।

📘 ইসলামি অর্থব্যবস্থার ইতিহাস > 📄 ইসলামি আর্থিক প্রতিষ্ঠানসমূহ স্থাপন

📄 ইসলামি আর্থিক প্রতিষ্ঠানসমূহ স্থাপন


ইসলামি আর্থিক প্রতিষ্ঠান স্থাপনের প্রথম প্রচেষ্টাটি মিশরে কিছুটা স্থায়ী হতে পেরেছিল। মিশরে ১৯৬৩ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় মিত-গাম্র সেভিংস ব্যাংক। এই ব্যাংকের পথিকৃৎ আহমেদ আন-নাজ্জার। তিনি (পশ্চিম) জার্মানির স্থানীয় সঞ্চয়ী ব্যাংকের ব্যাপারে বাস্তব অভিজ্ঞতাধারী একজন মিশরীয় বিদ্বান। নীলনদের দেশে একটি জার্মান এক্সপেরিমেন্টকে নিয়ে আসতে চেয়েছিলেন তিনি। ব্যাংকটির কাজের ভিত্তি ছিল ইসলামের সুদমুক্ত লাভ-ক্ষতি ভাগাভাগিকরণ নীতি। ব্যাংকটিকে অবশ্য ঠিক "ইসলামি” বলে আখ্যায়িত করা হতো না। কারণ ষাটের দশকে নাসেরের শাসনাধীন মিশর দ্রুতগতিতে সমাজতন্ত্রের দিকে এগিয়ে চলছিল। রাষ্ট্রপতি নাসের যেটাকে বলেন আরব সমাজতন্ত্র। বিদেশি ও প্রধান দেশীয় বিনিয়োগসমূহের গণহারে জাতীয়করণ চলছিল তখন। এহেন পরিস্থিতিতে ব্যাংকটিকে "ইসলামি” বলে সম্বোধন করাটা ছিল দুষ্কর। কিন্তু আন-নাজ্জার আমাদের বলেন যে, সুদবিহীন ইসলামি নীতিতে চলতে পারলে নাম নিয়ে তার কোনো মাথাব্যথা নেই (আন- নাজ্জার, ১৯৭৩)। ব্যাংকটির দর্শন ছিল স্থানীয় সঞ্চয়কে ক্ষুদ্র ব্যবসা ও উদ্যোগের অর্থায়নে পরিচালিত করা। শাসনরত কর্তৃপক্ষের কাছে এই মতাদর্শ গ্রহণযোগ্য বলে প্রতীয়মান হয়। মিশরের অন্য সকল ব্যাংকের মতোই মিত-গাম্রও ছিল সরকারি মালিকানাধীন। তাই একে সরকারি খাতের প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিবেচনা করা হতো এবং তা ছিল অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে জবাবদিহিতার অধীন। তবে ব্যাংকটির কার্যক্রমে কিছু পরিমাণে স্বাধীনতা দেওয়া হয়। সে-সময়কার বিচারে তা একটু অস্বাভাবিক বটে। ব্যাংকটির কার্যক্রম ছিল-জমা হিসাব, ঋণ হিসাব, সমতাপূর্ণ অংশগ্রহণ, সরাসরি বিনিয়োগ, ও সামাজিক সেবা (কার্যক্রমের ওপর আরও বিস্তারিত জানতে দ্রষ্টব্য আল-নাজ্জার, ১৯৭৩ ও ১৯৭৬, এবং আল-আশকার, ১৯৮৭)।
ঊনিশশ সত্তর ও আশির দশকগুলোতে ইসলামি বিশ্বে আরও ইসলামি ব্যাংক ও কর্পোরেশান স্থাপিত হয়। ক্রমধারা অনুযায়ী এগুলো হলো দুবাই ইসলামি ব্যাংক (১৯৭৫), কুয়েত ফাইন্যান্স হাউজ (১৯৭৭), সৌদি আরবের আর-রাজহি কোং ফর কারেন্সি এক্সচেইঞ্জ অ্যান্ড কমার্স (১৯৭৮), জর্ডান ইসলামিক ব্যাংক ফর ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট (১৯৭৮), বাহরাইন ইসলামিক ব্যাংক (১৯৭৯), ইরান ইসলামিক ব্যাংক (১৯৭৯), কাতারের ইসলামিক এক্সচেইঞ্জ অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট কর্পোরেশন (১৯৭৯), মিশরের ইন্টারন্যাশনাল ব্যাংক ফর ইনভেস্টমেন্ট অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (১৯৮০), বাংলাদেশের ইসলামি ব্যাংক (১৯৮৩), সুদানের তাদামুন ইসলামিক ব্যাংক (১৯৮৩), ব্যাংক ইসলাম মালয়শিয়া (১৯৮৩), বাইতুত তামওয়িলিস সাউদি তুনিসি (১৯৮৪), এবং সুদানের ওয়েস্ট সুদান ইসলামিক ব্যাংক (১৯৮৪)। প্রয়াত বাদশাহ ফায়সালের নামানুসারে একগুচ্ছ ফায়সাল ইসলামিক ব্যাংক স্থাপিত হয় সত্তর ও আশির দশকে সৌদি আরবে, ১৯৭৭ সালে মিশরে ও সুদানে, এবং ১৯৮৫ সালে তুরস্কে। আল-বারাকাহ গ্রুপের আবির্ভাগ ঘটে আশির দশকের শুরুতে— সুদানের আল-বারাকাহ ব্যাংক (১৯৮২), সৌদি আরবের আল-বারাকাহ ইনভেস্টমেন্ট অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট কোং (১৯৮২), বাহরাইনের আল-বারাকাহ ইসলামিক ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক (১৯৮৪), এবং আল-বারাকাহ টার্কিশ ফাইন্যান্স হাউজ (১৯৮৪)।
এখানেই শেষ না। ইসলামি ব্যাংককে বয়ে নিয়ে যাওয়া হয় ইউরোপের বুকেও: বাহামা দ্বীপপুঞ্জে ইসলামিক ইনভেস্টমেন্ট কোম্পানি (১৯৭৭), লুক্সেমবার্গে ইসলামিক ব্যাংকিং সিস্টেম (১৯৭৮), যুক্তরাজ্যে আর-রাজহি কোং ফর ইসলামিক ইনভেস্টমেন্ট (১৯৮০), সুইজারল্যান্ডে দারুল মাল আল-ইসলামি (১৯৮১), ডেনমার্কের ইসলামিক ব্যাংক ইন্টারন্যাশনাল (১৯৮৩), এবং যুক্তরাজ্যের আল-বারাকাহ ইন্টারন্যাশনাল পিএলসি (১৯৮৩)।
শেষ করার আগে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ইসলামি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সাথে আরেকটি নতুন সংযোজনের আগমনকে স্বাগত না জানালেই না। তা হলো থাইল্যান্ডে একটি ইসলামি ব্যাংকের প্রতিষ্ঠা। সেদেশে মুসলিমরা সংখ্যালঘু। মোট জনসংখ্যার দশ শতাংশের বেশি নয়। সেই থাইল্যান্ডেরই রাজধানী ব্যাংককে স্থাপিত হয়েছে একটি ইসলামি ব্যাংক, যার শাখা ছড়িয়ে পড়েছে দেশটির উত্তর ও দক্ষিণে। দ্য ইসলামিক ব্যাংক অব থাইল্যান্ড তাই সবদিক দিয়েই এক বিশাল ঘটনা। এর সাথে আরও যোগ করতে হয় যে, ইসলামি ব্যাংক স্থাপিত হওয়ার আগেই দেশটির অনৈসলামিক ব্যাংকগুলোতেও ইসলামি সেকশন সংযোজিত হয়েছিল। যেমন ক্রুং থাই ব্যাংক। এখানেই শেষ নয়। উসমান বিন আফফান ফাইন্যানশিয়াল সোসাইটির মতো আর্থিক সংস্থাও থাইল্যান্ডের দক্ষিণাঞ্চলে সফলভাবে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে প্রায় এক দশক ধরে। প্রতিষ্ঠানটি বিশেষত থাইল্যান্ডের দক্ষিণ প্রদেশগুলোতে সেবা দিয়ে থাকে, যেখানে মুসলিমরা সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠী। এ প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমের সফলতার প্রমাণ এর ক্রমবর্ধমান পুঁজি, আয়, অবদান ও কাজের বৈচিত্র্য। থাইল্যান্ডের নতুন ইসলামি ব্যাংকটির মতোই এর সাফল্য।
ইসলামি বিশ্বে উপর্যুক্ত ইসলামি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানসমূহ স্থাপনে অবদান রেখেছে বেশ কয়েকটি নিয়ামক: ১. তৃণমূল পর্যায়ে ইসলামের ব্যাপারে ক্রমবর্ধমান সচেতনতা, ২. সম্পদশালী মুসলিমদের সহযোগিতা, এবং ৩. সরকারি সহযোগিতা।
➡ ১. তৃণমূল পর্যায়ে ইসলামের ব্যাপারে ক্রমবর্ধমান সচেতনতা: ইচ্ছুক গ্রাহক, জমাকারী ও তহবিল ব্যবহারকারীদের ছাড়া ইসলামি ব্যাংক প্রতিষ্ঠা সম্ভব হতো না, যারা একইসাথে ইসলামি মিশন ও আদর্শেও বিশ্বাসী। এর ফলে স্বভাবতই ইসলামি আর্থিক বাজার গড়ে ওঠে। তহবিলের এই জমাকারী ও ব্যবহারকারীরা তাদের সঞ্চয় ও বিনিয়োগে শরীয়ত প্রয়োগ করতে আগ্রহী। এদের ছাড়া ইসলামি আর্থিক প্রতিষ্ঠানসমূহের সূচনাটা করা সম্ভব হলেও এগুলোর অগ্রগতি সাধন ও টিকিয়ে রাখা মোটেও সম্ভব হতো না। কারণ তারাই এগুলো জিইয়ে রাখার প্রয়োজনীয় উপাদান। আরেকভাবে বললে, আর্থিক খাতে ইসলামি নীতিমালা প্রয়োগের জন্য ইসলামি আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো একটি বড় অগ্রগতি বটে। কিন্তু এগুলোর বৃদ্ধি, অব্যাহত থাকা ও টিকে থাকাও একইরকম গুরুত্বপূর্ণ। এসব প্রতিষ্ঠান যেসব সেবা প্রদান করে থাকে, অর্থবাজারের অংশগ্রহণকারীদের (তহবিলের জমাকারী ও ব্যবহারকারী) সেসব সুবিধা ব্যবহার করার ইচ্ছেটাই এসব সেবার প্রসারতা ও গভীরতা বৃদ্ধি নিশ্চিত করে। একই বাজারে ইসলামি ও অনৈসলামিক উভয় ধরনের আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে কার্যক্রম চালাতে দেওয়া মানে এদের মাঝে অবশ্যম্ভাবী প্রতিযোগিতা। গ্রাহকের ধর্মীয় তাড়না কতটুকু, তা তার আর্থিক লেনদেনে প্রভাব ফেলবে। এই গ্রাহকগণ অবশ্যই এই দুই ব্যবস্থার মাঝে এক ধরনের তুলনা করে দেখবেন। অন্তত কোন ব্যবস্থাটি ভালো কাজ করে, সেটা বোঝার জন্যও তার এই তুলনা করার দরকার আছে। ইসলামি আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবস্থাপনা পর্ষদের ঘাড়ে অনেক বড় এক ভূমিকার ভার বিদ্যমান। নিজেদের কার্যক্রমের দক্ষতা নিশ্চিতকরণে সুদভিত্তিক ব্যাংকগুলোর চেয়েও আরও কঠিন পরিশ্রম করতে হয় তাদের।
➡ ২. সম্পদশালী মুসলিমদের সহযোগিতা: এই ব্যাংকগুলো প্রতিষ্ঠার জন্য প্রাথমিক তহবিলের দরকার অবশ্যই ছিল। এসব ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান স্থাপনের টাকা প্রধানত তিনটি উৎস থেকে এসেছে: প্রথমত, সম্পদশালী মুসলিমগণ, বিশেষত আরবগণ। তারা সুদভিত্তিক পদ্ধতির বিকল্প হিসেবে ইসলামি ব্যাংকিং ব্যবস্থার কার্যকারিতায় বিশ্বাস পোষণ করেছেন। যেমন দারুল মাল আল-ইসলামি এবং আল-বারাকাহ গ্রুপের অর্থায়নকারীগণ। দ্বিতীয়ত, সরকারি আর্থিক সহযোগিতাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। কুয়েত ফাইন্যান্স হাউজ ও মালয়েশিয়ার ব্যাংক ইসলাম এর কথা বিশেষভাবে প্রযোজ্য।
⇒ ৩. সরকারি সহযোগিতা: সরকার ও সাধারণ জনগণের অবদানও অনস্বীকার্য, যেমনটা হয়েছে জর্ডান ইসলামিক ব্যাংকের ক্ষেত্রে। এটি (ক) স্থানীয় মালিকানাধীন, (খ) এর ৯৮.৭ শতাংশ পুঁজি ব্যক্তি মালিকানা থেকে এসেছে (১.৩ শতাংশ অর্থায়ন করেছে হাউজিং ব্যাংক অব জর্ডান), (গ) এর কোনো শেয়ারহোল্ডারই বড় অংশের শেয়ারহোল্ডার নন, এবং (ঘ) এটা গতানুগতিকভাবে কোনো তেলনির্ভর ধনী দেশে গড়ে ওঠেনি। সরকার ও সম্পদশালী ব্যক্তিদের থেকে শুরুতে একটু সহযোগিতা পেলেই যে ইসলামি ব্যাংক প্রতিষ্ঠিত করা সম্ভব, এই ব্যাংকটি তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
ইসলামি আর্থিক প্রতিষ্ঠানসমূহের স্থাপনা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ইসলামি ব্যবসায়িক উদ্যোগকে উৎসাহ জুগিয়েছে। যেসব উদ্যোগ ইসলামি নীতিমালার ভিত্তিতে চলতে আগ্রহী, এ প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের অর্থায়ন করেছে। এটি প্রত্যক্ষ উৎসাহ। এরকম কিছু উদ্যোগ আর্থিক সম্পদের ওপর এমনভাবে নির্ভরশীল ছিল যে, এসব উদ্যোগে নিজেদের সঞ্চয় বিনিয়োগ করতে আগ্রহী মুসলিম অংশীদারদের থেকে পুঁজি হাসিল করতে পেরেছে তারা। এটি পরোক্ষ উৎসাহ। ইসলামি ব্যবসায়িক উদ্যোগগুলো বৈচিত্র্যময় বাণিজ্যিক ও শিল্প কর্মকাণ্ডে জড়িত, যাতে রয়েছে নানারকমের পণ্য: তৈরি পোশাক, আসবাবপত্র, বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি, নির্মাণশিল্প, আবাসন, চিকিৎসা উপকরণ ও প্লাস্টিক সামগ্রী।

টিকাঃ
১. প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ্য যে, সুদমুক্ত অর্থব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা, প্রায়োগিক সমস্যাগুলোর সমাধান ও ইসলামি অর্থনীতির বিবিধ প্রশিক্ষণপ্রদানে পাকিস্তানের উলামায়ে কেরাম উল্লেখযোগ্য প্রচেষ্টা চালিয়েছেন। শারিয়া আপিল বেঞ্চের বিচারপতি থাকাকালে ১৯৯৯ সালে আল্লামা মুফতি তাকি উসমানী হাফি, সুদের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে রায় প্রদান করেছেন। সেই রায়ে সুদমুক্ত অর্থব্যবস্থার একটি রূপরেখাও প্রদান করেছেন। কিন্তু দুঃখজনক সত্য হলো, এ নিয়ে আপিল, রায় ও পুনঃ আপিলের ধারাবাহিকতা এখনো চলমান। বাস্তবে এটা প্রয়োগ করা সম্ভব হয়নি- সম্পাদক

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00