📘 ইসলামি অর্থব্যবস্থার ইতিহাস > 📄 ভারতবর্ষের সংস্কারকবৃন্দ

📄 ভারতবর্ষের সংস্কারকবৃন্দ


ভারতে বেড়ে ওঠা মুহাম্মাদ ইকবাল (১৮৭৬-১৯৩৮) এমন এক সংস্কারকের দৃষ্টান্ত, যিনি পশ্চিমে শিক্ষিত হওয়া সত্ত্বেও নিজেকে ইসলাম ও ইসলামি ঐতিহ্যের সাথে সম্পর্কিত করেন। তিনি জার্মানি থেকে পিএইচডি এবং ইংল্যান্ডের লন্ডন থেকে আইনের ওপর ডিগ্রি অর্জন করেন (Armstrong, 2000)। আবদুহ ও আফগানির কাছাকাছি বিশ্বাস পোষণ করতেন। আধুনিকতাবাদে তিনি আগ্রহী, কিন্তু বিশ্বাস করতেন এই আধুনিকতা অর্জন করতে গিয়ে ইসলাম ও ইসলামি সংস্কৃতিকে ছুঁড়ে ফেললে চলবে না। আধুনিকতাবাদ ও ধর্মের সম্পর্ক সম্পর্কে তিনি বলেন যে, যে-কোনো ধর্মের চেয়ে ইসলামই আধুনিকতাবাদের আন্দোলনগুলোকে আত্মস্থ করতে সবচেয়ে বেশি উপযোগী। কারণ এমন এক ধর্ম, যা সর্বদা মুসলিমদেরকে আল্লাহর সৃষ্টি নিয়ে গভীর চিন্তাভাবনা ও পর্যবেক্ষণ করতে বলে। পর্যবেক্ষণ ও চিন্তা থেকে শিখতে এবং অপরকে শেখাতে বলে-যাতে জ্ঞানের ভাণ্ডার বৃদ্ধি পায়। ইকবালের মতে, ইসলাম সবচেয়ে যৌক্তিক ধর্ম। আল্লাহ যে চিন্তাভাবনা ও পর্যবেক্ষণের আদেশ দিয়েছেন, তার মাধ্যমে বৈজ্ঞানিক চিন্তাকে উৎসাহিত করা হয়েছে। ধর্ম ও সংস্কৃতি হিসেবে ইসলাম এবং বৈজ্ঞানিক ও সামাজিক-রাজনৈতিক বিকাশের মাঝে তিনি কোনো সাংঘর্ষ দেখেন না। পশ্চিমের যে অগ্রগতি, তা ইসলামের ওপর খ্রিষ্টধর্মের শ্রেষ্ঠত্বের কারণে নয়। বরং এর কারণ হলো মুসলিমরা তাদের ধর্মের সম্ভাবনাগুলোর পূর্ণ সদ্ব্যবহার করেনি। এই স্বস্তিদায়ক চিন্তা হয়তো মুসলিমদের আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনতে এবং নিজেদের ধর্ম ও অতীত ইতিহাসের প্রতি বিশ্বাস শক্তিশালী করতে সহায়তা করবে।

📘 ইসলামি অর্থব্যবস্থার ইতিহাস > 📄 মুহাম্মদ ইকবাল

📄 মুহাম্মদ ইকবাল


সুফিবাদ এবং মরমিবাদ অনুপস্থিত ছিল ইকবালের সংস্কার আন্দোলনে। কেননা, এই দুটো বৈজ্ঞানিক উন্নতির মৌলিক উপাদানের সাথে সাংঘর্ষিক। যার মাধ্যমে পর্যবেক্ষণ এবং গভীর চিন্তার সমাধানে পৌঁছা যায়। ইকবাল ব্যক্তিস্বার্থবাদের সমালোচনা করেন। তার মতে, এটি ইউরোপীয় আধুনিকতাবাদের (Modernism) একটি পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া। তিনি বরং একটি জনকল্যাণমূলক সমাজব্যবস্থার পক্ষপাতী। এমন না যে, ইকবাল ইউরোপীয় জীবনের সামাজিক বৈশিষ্ট্যগুলোর সাথে পরিচিত ছিলেন না। তিনি তো ডিগ্রি অর্জনের জন্য জার্মানি ও ইংল্যান্ডে বাস করেছেনই। কিন্তু তিনি এই সিদ্ধান্তে এসেছেন তার চিরাচরিত শিক্ষাপদ্ধতির মাধ্যমেই। তা হলো— পর্যবেক্ষণ ও গভীর চিন্তা। ইকবাল চেষ্টা করেছেন পশ্চিমের উত্তম জিনিসটার সাথে প্রাচ্যের উত্তম জিনিসের মেলবন্ধন ঘটানোর। একদিকে বিজ্ঞান, পশ্চিমা দর্শন ও সামাজিক-রাজনৈতিক আদর্শ, অন্যদিকে ইসলামি ঐতিহ্য ও মূল্যবোধ। আবারও পূর্বেকার আধুনিকতাবাদী সংস্কারকদের মতো তিনি বলেন যে, শরীয়তকে আধুনিকতাবাদের সাথে তাল মেলাতে হলে ধর্মীয়-রাজনৈতিক বিষয়াদিতে উদ্ভাবনী পদ্ধতি অবলম্বন করতে হবে। The Reconstruction of Religious Thoughts in Islam গ্রন্থে তিনি বলেন, “অবাক হওয়ার কিছু নেই যে, তরুণ প্রজন্ম তাদের ধর্মবিশ্বাসের এক নতুন অভিযোজনের দাবি করে। তাই ইসলামের পুনর্জাগরণের সাথে সাথে আমাদের স্বাধীন চেতনা নিয়ে একটি বিষয় নিরীক্ষণ করা দরকার। আর তা হলো—ইউরোপ যা চিন্তা করেছে এবং যেসব সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে, সেগুলো ইসলামের ধর্মতাত্ত্বিক চিন্তার পুনঃপাঠ এবং প্রয়োজনীয় পুনর্গঠনে আমাদের কতটা কাজে লাগবে” (ইকবাল, ১৯৬৮)।

📘 ইসলামি অর্থব্যবস্থার ইতিহাস > 📄 আবুল আলা মওদুদি এবং জামাতে ইসলামি

📄 আবুল আলা মওদুদি এবং জামাতে ইসলামি


পাকিস্তানকে পুনরায় ইসলামি আদর্শের দিকে ফিরিয়ে নেওয়ার ঝাণ্ডা বহন করেন আবুল আলা মওদুদি (১৯০৩-১৯৭৯)। ইসলামি মূল্যবোধ ও আদর্শের দিকে দেশটির জনগণকে ফিরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছেন তিনি। এই লক্ষ্যগুলো অর্জনের জন্য মওদুদি ১৯৪১ সালে প্রতিষ্ঠিত করেন জামাত-ই-ইসলামি (ইসলামি সংঘ)। এটি একটি কেন্দ্রমুখী, কঠোর শৃঙ্খলাভিত্তিক দল, যা অনেকটা মিশরের ইখওয়ানুল মুসলিমীনের অনুরূপ (Sagiv, ১৯৯৫)। মিশরের দলটির মতো পাকিস্তানি জামাতের একইরকম লক্ষ্য ছিল—এমন একটি ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত করা, যাকে মওদুদি বলেছেন "Theo-democracy", (Sivan, 1990)।
মিশরের আবদুহ, আফগানি ও আল-বান্নার মতো তিনিও স্বীকার করেন যে, পশ্চিমা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি আমদানি করার প্রয়োজন থাকতে পারে বটে। কিন্তু ইসলামি মূল্যবোধ বিসর্জন না দিয়েই এসব প্রয়োগ করা সম্ভব, যেহেতু দুটির মাঝে কোনো বিবাদ নেই।
তিনি “নব্য জাহিলিয়াত”-এর এক তত্ত্ব প্রদান করেন। ইসলামি-পূর্ব আরবে বিদ্যমান জাহিলিয়াতের দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে এখানে। যার অর্থ অজ্ঞতা ও পথভ্রষ্টতা। তার মতে, বিংশ শতাব্দীর মুসলিমদের অবস্থা হলো নিজেদের ধর্ম ও ইসলামি আদর্শ সম্পর্কে অজ্ঞতা। তাই তারা যেন এক নব্য জাহিলি যুগে বসবাস করছে। তিনি আরও বলেন, বেশির ভাগ মুসলিম ইসলামের সত্যিকার উদ্দেশ্য থেকে বিচ্যুত এবং ধর্মবিমুখ হয়ে গেছে। নিজেরা আইন বানিয়ে আসমানি কর্তৃত্বকে অস্বীকার করেছে (Davidson, 2003)। এমনকি যেসব মুসলিম দেশের সরকার কঠোরভাবে শারীআ আইন বাস্তবায়ন করেনি, সেগুলোর বিরুদ্ধে জিহাদ করাকে সত্যিকারের মুমিনের দায়িত্ব বলে ঘোষণা করেন মওদুদি (Esposito, 2002)। সমাজ পরিপূর্ণ ইসলামি না হওয়া পর্যন্ত তিনি তার জামাত-ই-ইসলামির অনুসারীদেরকে সরকারের বাইরে থাকার নির্দেশনা প্রদান করেন (Sagiv, 1995)। ফলে একটি সংসদীয় দল হিসেবে জামাত ১৯৪৮ সাল পর্যন্ত স্বেচ্ছায় সরকার থেকে দূরে থাকে। পরবর্তী সময়ে দলটি সরকারের ভেতরে থেকে ক্রমান্বয়ে সংস্কারের ধারণাকে গ্রহণ করে নেয়।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00