📄 ভূমিকা
মুসলিমরা যখনই হতাশায় নিমজ্জিত হন, তখনই তারা পরিত্রাণের জন্য ধর্মের দিকে মুখ ফেরান। ইসলামি ইতিহাসের সকল নেতা চিরকালই মুসলিমদের সমস্যার শেকড় হিসেবে খুঁজে পেয়েছেন ধর্মের সঠিক পথ থেকে বিচ্যুতিকে। সকল ক্ষেত্রেই এর সমাধান ছিল মুসলিমদের অবস্থার উন্নয়নের জন্য ইসলামের বিশুদ্ধতার দিকে ফিরে যাওয়া। দৈনন্দিন জীবনে এর বুনিয়াদি শিক্ষাকে প্রয়োগ করা। খিলাফত নিয়ে ইসলামে প্রথম বিভেদ বা ফিতনা থেকে শুরু করে ১৯৬৭ সালে ছয়দিনের যুদ্ধে ইজরায়েলের হাতে মিশর-সিরিয়া-জর্ডান সেনাবাহিনীর শোচনীয় পরাজয় পর্যন্ত গোটা ইতিহাসে এই বাস্তবতার তেমন কোনো পরিবর্তন হয়নি। ধর্ম-সংস্কারের আহ্বানের বিরোধিতাও করা হয়েছে। সেক্যুলারায়নের আহ্বানও থেকেছে সমপরিমাণ শক্তিশালী, যদিও এই আহ্বান আগেরটির একেবারেই বিপরীতমুখী। বিংশ শতাব্দীর ইসলামি অর্থনৈতিক লেখালেখির বিকাশ যে পরিবেশে হয়েছে, তার ওপর এই আন্দোলনগুলোর প্রভাব নিম্নে তুলে ধরা হলো।
আলোচনার সহজতার জন্য আমরা শুরু করছি অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষাংশ থেকে। আন্দোলনগুলো তিনটি প্রধান প্রকারে বিভক্ত: ১. ট্র্যাডিশনাল বা চিরাচরিত আন্দোলন, ২. দফারফার আন্দোলন, এবং ৩. সেক্যুলার আন্দোলন।
➡ ট্র্যাডিশনাল আন্দোলন বলতে বোঝানো হয়েছে যেগুলোতে কঠোরভাবে কুরআন ও সুন্নাহর দিকে ফিরে আসার আহ্বান জানানো হয়। ইসলামি রীতি ও আদর্শকে বলি দিয়ে আধুনিকায়নের আমদানি ঘটানো যাবে না। আনুষ্ঠানিক ও সামাজিক উভয় দিক থেকেই শরীয়তের নামে নতুন উদ্ভাবন অবৈধ ও বিদআত হিসেবে গণ্য। প্রতিটি বিদআত দ্বালালাহ, আর প্রতিটি দ্বালালাহ জাহান্নামের পথ সুগমকারী।
➡ দফারফার আন্দোলনগুলো ইসলামের প্রধান উৎস কুরআন ও সুন্নাহর দিকে ফিরে আসাকে স্বীকার করে। কিন্তু সমাজের সার্বিক কল্যাণ নিশ্চিত হওয়ার শর্তে পশ্চিমা সংস্কৃতি ও জ্ঞানের আমদানিতে কোনো ক্ষতি হিসেবে দেখে না।
➡ তৃতীয় প্রকারের আন্দোলনটি সেক্যুলারায়নকেই সামনে এগিয়ে যাওয়ার একমাত্র পথ হিসেবে আখ্যায়িত করে। তাদের মতে, মুসলিম দেশগুলো প্রতিযোগিতায় ফিরে আসার জন্য সমাজে যে আধুনিকায়ন প্রয়োজন, এর জন্য সেক্যুলারিজম অপরিহার্য। তাদের মতে ইসলামি রীতি ও আদর্শের ধর্মীয় মূল্যমান অবশ্যই অতি উঁচু, তবে: (ক) সেগুলো মানুষের ব্যক্তিগত ও সামাজিক আচরণ নির্ধারণের মাঝেই সীমাবদ্ধ থাকবে। রাজনীতি, সরকার ও রাষ্ট্রের ওপর সেগুলোর কোনো প্রভাব থাকতে পারবে না, এবং (খ) তাদের দৃষ্টিতে ইসলামি শরীয়তের যা কিছু আজকের যুগের জন্য অপ্রয়োজনীয় ও অনুপযুক্ত হয়ে পড়েছে, সেগুলোকে পুনর্বিবেচনা করতে হবে। যেমন পুরুষদের বহুবিবাহ এবং তালাক সংক্রান্ত আইন। এসব আন্দোলনের প্রতিনিধিত্বমূলক কিছু উদাহরণ নিম্নে আলোচিত হলো。
টিকাঃ
১. নিচে লেখক আন্দোলনগুলোর যে প্রকারভেদ করেছেন তাতে ইসলামি চিন্তার সঠিক চিত্রায়ণ হয়নি। সাধারণত অন্য ধর্মগুলোতে সনাতনবাদ বলতে যে ধরনের গোঁড়ামি, সামঞ্জস্যবিরোধিতা ও স্থবিরতা দেখা যায়, ইসলাম তার চেয়ে ভিন্ন। ইসলামের মৌলবাদি চিন্তাধারাতেই গতিশীলতা, ইজতিহাদ, জনস্বার্থরক্ষা ইত্যাদি উপাদান রয়েছে। তাই সামঞ্জস্যপন্থা ও সেকুলারায়নের নামে সনাতন ধারার বাইরে যাওয়া ইসলামের দৃষ্টিতে বিভ্রান্তি। উল্লেখ্য, মূলধারার সকল আন্দোলন, অর্থাৎ যেগুলো ইসলামের বুনিয়াদি শিক্ষার সাথে সংগতিপূর্ণ ছিল সবগুলোই সনাতন আন্দোলন। সনাতনপন্থাকে কেবল কট্টরবাদের সমার্থক বানিয়ে ফেলা ইসলামি আন্দোলনগুলোর সঠিক চিত্রায়নের পরিপন্থি। 'সনাতনপন্থি' আন্দোলনগুলোর মাঝে দেওবন্দি আন্দোলনের মতো সামগ্রিক আন্দোলন যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে সামাজিক ও আত্মশুদ্ধিমূলক অনেক আন্দোলন।