📄 সাফাভিদের অধীনে বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ
উসমানী সাম্রাজ্যের চেয়ে সাফাভিদের রচনাগত বুদ্ধিবৃত্তিক কর্মকাণ্ড সক্রিয়তর ছিল বলে প্রতীয়মান হয়। এই বুদ্ধিবৃত্তিক কার্যক্রমের জন্য উপযোগী পরিবেশ সৃষ্টিতে তিনটি নিয়ামককে কৃতিত্ব প্রদান করা যায়: ১. রাষ্ট্রের তুলনামূলক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা; ২. রাষ্ট্রের সহযোগিতা, এবং ৩. আলিমগণের শক্তিশালী অবস্থান।
➡ ১. রাষ্ট্রের তুলনামূলক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা: উসমানী সাম্রাজ্যের চেয়ে ছোট হওয়ায় সাফাভি সাম্রাজ্য সামলানো সহজতর ছিল। ফলে তুর্কি প্রতিবেশীদের চেয়ে তাদের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাও ছিল বেশি। এই স্থিতাবস্থা নড়বড়ে হয়েছিল শাহ ইসমাঈলের সময়ে। তিনি সাম্রাজ্য থেকে সুন্নিদের বিতাড়িত করা ও তুর্কিদের বিরুদ্ধে সীমান্ত বিস্তৃত করার আদর্শিক সম্প্রসারণবাদী নীতি অবলম্বন করে এই বিপদ ডেকে আনেন। সুন্নি উযবেকদের খুরাসান থেকে অপসৃত করে উত্তরে অক্সাসে পাঠাতে তিনি কিছুটা সফল হয়েছেন বটে। কিন্তু সুন্নি উসমানীদের বিরুদ্ধে তার এই সাফল্য অব্যাহত থাকেনি। উল্টো ১৫১৪ সালে তাদের হাতে পরাজিত হয়ে তার সাম্রাজ্য ছোট হয়ে যায়। তবে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ভালোই ছিল। কারণ শাহ ইসমাঈল তার সাম্রাজ্যকে শিয়াপন্থী রাখতে সমর্থ হন। এতে শিয়া ও সুন্নিদের মাঝে অভ্যন্তরীণ কোন্দল গজিয়ে ওঠার সম্ভাবনা একেবারে শেষ না হলেও বেশ কমে আসে। সপ্তদশ শতাব্দী থেকে শুরু করে আজও পর্যন্ত দেশটি শিয়া অধ্যুষিতই আছে।
➡ ২. রাষ্ট্রের সহযোগিতা: বুদ্ধিবৃত্তিক উন্নতির প্রতি রাষ্ট্রটির সহযোগিতা সবচেয়ে বেশি প্রতিভাত হয় শাহ প্রথম আব্বাসের শাসনামলে (১৫৮৮-১৬২৯)। শিয়া ধর্মের ব্যাপারে নিজের বুঝকে সমৃদ্ধ করার বাসনায় তিনি একটি ধর্মীয়-সামাজিক সংস্কার আন্দোলন হাতে নেন। আরব থেকে শিয়া আলিমদের আনিয়ে নেন, শিক্ষা-শিক্ষণের কেন্দ্র হিসেবে মাদারিস (একবচনে মাদ্রাসা) নির্মাণ করেন, এবং শিক্ষাদাতা আলিম ও শিক্ষারত বিদ্যার্থী উভয়পক্ষকে প্রদান করেন বহুল প্রয়োজনীয় আর্থিক পৃষ্ঠপোষণ।
➡ ৩. আলিমগণের শক্তিশালী অবস্থান: উসমানীদের অধীনে আলিমগণের অবস্থান যেরকম, সাফাভিদের অধীনে তেমনটা ছিল না। রাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষকতা পেলেও জনগণকে ইসনা আশারিয়া শিয়া মতাদর্শে দীক্ষিত করার শিক্ষক হিসেবে বিবেচনা করা হতো আলিমদেরই। তাদের এই আর্থিক সহযোগিতা নিয়মিত ছোট ছোট পরিমাণে না এসে, আসত এককালীন এবং বিপুল উপঢৌকন হিসেবে। তা ছাড়া সরকারি পদ গ্রহণ থেকে বিরত থাকায় তারা প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণাধীনে থাকতেন না, যেমনটা থাকতেন উসমানী সুন্নি আলিমগণ। সরকারি কোনো চাপ যদি আসতও, তারা দেশ ছেড়ে সোজা পার্শ্ববর্তী ইরাকের নাজাফে চলে যেতেন। ওখানে ছিল শিয়াদের পবিত্র তীর্থস্থান ইমাম আলির মাজার (প্রাগুক্ত)।
শিয়া আলিমগণের মাঝে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য নামগুলো হলেন মির দামাদ, মোল্লা সাদরা, ও মুহাম্মাদ বাকির মাজলিসি। মির দামাদ (মৃ. ১৬৩১) ও মোল্লা সাদরা (মৃ. ১৬৪০) আধ্যাত্মিকতাবাদ ও ফালসাফার সমর্থক ছিলেন। ইস্পাহানে আধ্যাত্মিক দর্শনের একটি মাযহাব প্রতিষ্ঠিত করেন তারা। প্রচার করেন যে, আলিমগণের চিন্তাপদ্ধতি হিসেবে বিজ্ঞান ও দর্শনকে বাতিল করে দেওয়াটা অনুচিত। সত্যের অনুসন্ধানে নিজেদের বিবেক ও আত্মিকতার পাশাপাশি এগুলোকেও মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করতে হবে। রাজনৈতিক প্রস্তুতি ও আত্মিক প্রশিক্ষণের মাঝে মোল্লা সাদরা কোনো পার্থক্য দেখতেন না।
কিন্তু শিয়াদের সবচেয়ে বিখ্যাত আলিম হিসেবে মুহাম্মাদ বাকির মাজলিসির (মৃ. ১৭০০) নাম এক অনন্য উচ্চতায় অবস্থান করে। তিনি আধ্যাত্মিকতাবাদ (ইরফান) এবং ধর্মীয় দর্শনের (ফালসাফা) বিরোধী ছিলেন। ইসলামের শিক্ষা ও শিক্ষণে জোরালোভাবে ফিক্সের ওপর মনোনিবেশ করার মতবাদ প্রচার করেন তিনি। তার শিক্ষার প্রভাব আজও পর্যন্ত দৃশ্যমান হয় (প্রাগুক্ত)। কয়েক দশক আগে মির দামাদ ও মোল্লা সাদরার প্রতিষ্ঠিত মাযহাবের আধ্যাত্মিকতা-শিক্ষণের বিরুদ্ধে মাজলিসি প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। মাজলিসি তার রচিত গ্রন্থ আল-আসফারুল আরবাআ-তে উল্লেখ করেন যে, রাজনৈতিক ক্যারিয়ার শুরু করার আগে নেতার অবশ্যই উচিত এক ধরনের আত্মিক প্রশিক্ষণের মধ্য দিয়ে যাওয়া। আত্মিক উপলব্ধি ও রাজনীতির জগতের মাঝে সম্পর্ককে এভাবেই দেখেছেন তিনি।
অবশ্য সাফাভিদের অধীনে ইসলামি অর্থনীতির ওপর উল্লেখযোগ্য কোনো কাজের সন্ধান মেলে না। শিয়া ফকিহদের মূল ব্যস্ততা ছিল সাধারণ জনগণকে শিয়া মতবাদের ব্যাপারে শিক্ষিত করে তোলাকে ঘিরে। এর ফলে হয়তো তাদের ইসলামি অর্থনীতি নিয়ে লেখালেখি করার অবসর সংকুচিত হয়ে আসে। তবে শিয়া ঘরানা থেকে ইসলামি অর্থনৈতিক চিন্তার ওপর একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজের আবির্ভাব ঘটেছে। প্রসিদ্ধ শিয়া বিশেষজ্ঞ মুহাম্মাদ বাকির আল-সদরের রচিত ইকতিসাদুনা (আমাদের অর্থনীতি) এ বিষয়ক প্রধান গ্রন্থ। ১৯৬০-এর শেষ দিকে রচিত এই গ্রন্থ নবম অধ্যায়ে আলোচিত হবে।