📘 ইসলামি অর্থব্যবস্থার ইতিহাস > 📄 আইন-সংক্রান্ত কর্মকাণ্ডের প্রতি পৃষ্ঠপোষণের অভাব

📄 আইন-সংক্রান্ত কর্মকাণ্ডের প্রতি পৃষ্ঠপোষণের অভাব


উসমানী তুর্কিদের শাসনামলে স্থাপত্য ও শৈল্পিক অর্জনের বিপরীতে আইনবিদদের কাজের প্রতি আগ্রহ কম ছিল। অর্থনীতি-সহ অন্যান্য আইনশাস্ত্রীয় বিষয়ে উল্লেখযোগ্য রচনাকর্মের অনুপস্থিতির কারণ হিসেবে এটিকে আবারও উল্লেখ করা চলে। এটা সত্য যে, উসমানীয়রা বিজিত ভূমি থেকে শ্রেষ্ঠ কিছু প্রতিভাকে সাম্রাজ্যের রাজধানীতে এনে জড়ো করতে উদগ্রীব ছিলেন। এর উদ্দেশ্য ছিল সাম্রাজ্যের গৌরব সমুন্নত করতে এদের মেধা ব্যবহার করা। তবে এটাও সত্য যে, এই উদ্যোগে আইনশাস্ত্রীয় বিষয় অন্তর্ভুক্ত ছিল না। সাম্রাজ্যের গৌরব বাড়াতে দরকারি মেধাগুলো ছিল মূলত স্থাপত্য ও শিল্পকারখানার মতো কারিগরি ধাঁচের। শিল্পনৈপুণ্যের প্রয়োজন। ছিলো নতুন সাম্রাজ্যের সামরিক দক্ষতার জন্য, শরীয়তের জন্য নয়। উসমানী প্রশাসন শিল্পনৈপুণ্য অর্জন করতে চেয়েছিল স্থাপত্যকলায়, আইনশাস্ত্রে না। এর পাশাপাশি সাম্রাজ্যটি যেহেতু ছিল সেনানিয়ন্ত্রিত রাষ্ট্র, তাই সামরিকীকরণের প্রতি তাদের অন্তর্নিহিত ঝোঁক ছিল। তুর্কি সেলজুকদের থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত ব্যবস্থায় এর স্পষ্ট চিত্রায়ন ঘটেছে। তাই সমসাময়িক আইনবিদদের কর্মবিকাশের জন্য উসমানীরা তাদের তেমন কিছু দিতে পারেননি। তা ছাড়া বেশির ভাগ ফিক্হ ও আইনশাস্ত্রবিদ "আধুনিকায়নে"-র যে-কোনো চেষ্টাকে সন্দেহের চোখে দেখতেন। তাই নিজেদের সামরিক রাষ্ট্রের উন্নয়নে আগ্রহী উসমানীদের চোখে তারা ছিলেন অতি কঠোর এবং সাম্রাজ্যের জন্য প্রয়োজনীয় নতুনত্বের গতির সাথে তাল মেলাতে অক্ষম।
উসমানীয়দের শাসনাধীনে আলিমগণের ভূমিকা ছিল মিশ্র ধাঁচের। উসমানী শাসনের প্রথমদিকে নতুন খলিফাদের কাছে উলামায়ে কেরাম ও শরীয়ত খুবই মর্যাদার আসন পেয়েছে। এর কারণ হলো, ইসলামি রাষ্ট্রের অপরিহার্য বৈশিষ্ট্য হিসেবে তারা সাম্রাজ্যে শরীয়তের প্রবর্তন চেয়েছিলেন। যে কারণেই হোক, শরীয়তের প্রচার-প্রসার উসমানীয়দের হাতে আনুষ্ঠানিক আকৃতি লাভ করে। তারা আলিমগণকে বিভিন্ন দপ্তর ও প্রতিষ্ঠানে নিযুক্ত করেন। স্থাপন করেন শরীয়াহ আদালত। সম্ভবত এটাই প্রথম দৃষ্টান্ত, যেখানে নেতৃত্বধারী বিচারক বা কাযীদের সাথে সহকারী হিসেবে থাকতেন ধর্মীয় পরামর্শবিদ তথা মুফতি। আলোচ্য মামলার ক্ষেত্রে আইনের ব্যাখ্যা ও ফতোয়া প্রদান করার দায়িত্ব ছিল তাদের হাতে। কাযী ও মুফতিদের সমন্বয়ে গঠিত এই আদালতগুলো ছিল রাষ্ট্রযন্ত্রেরই অংশ, যেখানে লোকবল নিয়োগ দেওয়া হতো উসমানী প্রশাসকদের দ্বারা। বেতন ও ভর্তুকি প্রদান করা হতো রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে (Armstrong, 2000)। তা ছাড়া ধর্মীয় স্কুল বা মাদ্রাসাও স্থাপন করা হয়। এগুলোর শিক্ষকগণ ছিলেন কাযী ও মুফতিদের মতোই সরকারি দপ্তরের অংশ। শরীয়াহ আদালত সুদীর্ঘকাল যাবৎ মিশরে তার উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন করতে থাকে। এমনকি ১৯৫০-এর দশকের মাঝামাঝি পর্যন্তও সক্রিয় ছিল এগুলো। তারপর মিশরের সেক্যুলার সরকারের হাতে ১৯৫২ সালে তাদের বিলুপ্তি ঘটে।
ইস্তাম্বুল সরকার যতদিন শক্তিশালী ছিল, ততদিন পর্যন্ত উলামা ও সরকারের মধ্যকার সম্পর্ক ছিল সহযোগিতার। কিন্তু যেদিন থেকে কেন্দ্রীয় সরকারে অবক্ষয় দেখা দিতে শুরু করে, তখন থেকেই সম্পর্ক খারাপ হতে শুরু করে। যেমন, মুহাম্মাদ আলি শাসিত মিশরে আলিমদের সাথে কঠোর আচরণ করা হয়। মুহাম্মাদ আলি যেসব সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করেন, সেগুলোর মাঝে ওয়াকফ সম্পত্তিও ছিল। দরিদ্র, ধর্মীয় উদ্দেশ্য, শরীয়তের ছাত্র ও আলিমগণের সহায়তার জন্য এসব সম্পদ এককালে দান করে গিয়েছিলেন ধর্মানুরাগী বিত্তবান মুসলিমরা (Armstrong, 2000)। উলামাদের জীবিকার উৎস হারিয়ে যায় এভাবে এবং এর লক্ষ্য ছিল তাদের মুখ বন্ধ করে দেওয়া। তবে ছড়ানো-ছিটানো প্রতিবাদ অবশ্যই জেগে উঠেছিল, মূলত বেসরকারি আলিমগণের পক্ষ থেকে।
আবদুল ওয়াহহাব আশ-শারানি (মৃ. ১৫৬৫) এমনই এক উদাহরণ। তার চিন্তাধারা মূলধারার সাথে কিছু ব্যতিক্রম ছিল। তারপরও তিনি রাষ্ট্রের দৈন্যদশা ও দারিদ্র্য নিয়ে চিন্তিত ছিলেন। তুর্কি পাশা ও মামলুক বেইয়ের দ্বৈত নিয়ন্ত্রণের জাঁতাকলে এই অবস্থা হয়েছিল মিশরীয় খেটে-খাওয়া মানুষদের। কর আরোপ ও আদায়ে শ্রমিকদের ওপর সরকারি লোকদের নির্মমতা প্রত্যক্ষ করেন তিনি। কর পরিশোধে ব্যর্থ হয়ে যেন কারাগারে যেতে না হয়, সেজন্য তাদের পুরো উৎপাদন এবং এমনকি কখনো কখনো গবাদি-পশুও বিক্রি করে দেওয়া লাগত। লোভনীয় প্রত্যেকটা ব্যবসাকে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয় বাজেয়াপ্তকরণের মাধ্যমে। এই সবকিছুর ব্যাপারে আশ-শারানি ছিলেন কঠোর সমালোচক। তিক্ত স্বরে তিনি তুলনা করে দেখান যে, তুর্কি শাসনাধীনে কৃষক-শ্রমিকরা কী দুরবস্থায় আছে এবং সে তুলনায় মামলুকদের অধীনে তারা কতটা প্রাচুর্যশালী ছিল (Nicholson 1993)। আশ-শারানি কোনো বেতনভোগী কাযী ছিলেন না, সরকারি জনবলেরও অংশ ছিলেন না। তিনি ছিলেন ইহজগতের প্রতি বিমুখ এক সহজ-সরল সুফি। তবুও তো এহেন বিরোধিতা চলতে দেওয়া যায় না।
আলিমগণের ওপর নিপীড়ন এবং সেক্যুলার-করণের বিপরীতে ধর্মীয় শিক্ষাকে কোণঠাসা করে ফেলার কারণে স্বভাবতই কিছু আলিম ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। আধুনিকায়নের বেশে আনা পরিবর্তনগুলোর প্রতি হয়ে ওঠেন বীতশ্রদ্ধ।
সাধারণভাবে লেখালেখি এবং বিশেষত আর্থ-সামাজিক গবেষণার অনুপস্থিতির পেছনে উল্লিখিত কোন নিয়ামক কতটুকু ভূমিকা রেখেছে, তা বলা মুশকিল। কিন্তু এতটুকু বললে অত্যুক্তি হবে না যে, এই নিয়ামকগুলো মোটাদাগে এ ধরনের লেখালেখির জন্য সঠিক পরিবেশ তৈরি হতে দেয়নি। প্রায় তিন শতাব্দী পরে গিয়ে বুদ্ধিবৃত্তিক জীবনীশক্তি আবারও ফুলকি দিয়ে ওঠে। পরিচিতি লাভ করে সংস্কার আন্দোলন নামে, যা আমরা পরে দেখব। তবে ইতিবাচক দিক হলো, সামরিক শাসক হিসেবে উসমানীরা আইনশৃঙ্খলার প্রতি যথেষ্ট মনোযোগ দিয়েছেন। আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতি যদি অনুকূল থাকত, তাহলে তা হয়তো পুঁজিবাদী চেতনার বিকাশে ভূমিকা রাখতে পারত।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00