📘 ইসলামি অর্থব্যবস্থার ইতিহাস > 📄 আরবি ভাষার আনুষ্ঠানিক ব্যবহার কমে আসা

📄 আরবি ভাষার আনুষ্ঠানিক ব্যবহার কমে আসা


ক্ষমতার পেন্ডুলাম তুর্কিদের দিকে হেলে যাওয়ার ফলে ইসলামি রাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক ভাষা হিসেবে আরবির ভূমিকা হ্রাস পেতে থাকে। রাষ্ট্রের শাসকগণও আরব নন, জনগণের সাথে তাদের যোগাযোগের মাধ্যমও আরবি নয়। পারস্য ভাষা যখন তার প্রতিদ্বন্দ্বীকে দৃশ্যপট থেকে ঠেলে বের করে দিতে শুরু করে, তখন থেকেই গণমানুষের সাথে আরবি ভাষার দূরত্ব শুরু হয়। এ ঘটনা ঘটেছিল ১২৫৮ সালে মঙ্গোলদের হাতে বাগদাদ পতনের আগে, পারস্যদের দাপট ক্রমাগত বাড়তে থাকার সময়। তবে তার সাথে এও সত্য যে, আব্বাসিগণ নিজেরা যেখানে ছিলেন আরব ও নিজেদের ঘিরেও রাখতেন আরব সভাসদ দিয়ে। নতুন খলিফারা সেখানে নিজেরা অনারব, তাদের ভাষাও আরবি নয়। ফলে আরবি ভাষা স্বভাবতই দেশের হর্তাকর্তাদের ভাষা থাকেনি। আরবি তখন খলিফার দরবারের দাপ্তরিক ভাষাও নয়। ফলে দপ্তরের কর্মীরা যেমন একে রাজদরবার থেকে বিদায় করে দিতে থাকে, তেমনি জনমানুষও একে আর আগের চোখে দেখেনি। এটি আব্বাসি আমলের দৃশ্য থেকে আলাদা। পারস্য প্রভাবাধীনে প্রতীকী শাসকে পরিণত হওয়ার পরও আব্বাসিরা জাতিতে ছিলেন আরব। ফলে খিলাফতের দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে আরবি তার মর্যাদা ধরে রেখেছিল।
তবে কিছু লক্ষণ থেকে বোঝা যায়: তুর্কি শাসকগণ কুরআনের ভাষা-সহ গোটা ইসলামি ঐতিহ্যের রক্ষক হিসেবে নিজেদেরকে চিত্রায়িত করতে একনিষ্ঠ প্রচেষ্টা চালিয়ে গেছেন। আরবি বর্ণমালাকে তারা তাদের তুর্কি লিখিত ভাষার মাধ্যম বানিয়ে নেন, যা ১৯২৮ সাল পর্যন্ত বহাল ছিল। উসমানীদেরকে ইসলামের প্রতি উদাসীনতার দায়ে অভিযুক্ত করা সম্ভব নয়। ধর্মটিকে তারা আপন করে নেয় অত্যন্ত আগ্রহ সহকারে। সত্যি বলতে কী, পঞ্চদশ শতাব্দীর মধ্যভাগ থেকে প্রায় দুই শতক যাবৎ ইসলামকে এক দুর্দান্ত শক্তি ও দুর্বার গতি প্রদান করে এই উসমানী সাম্রাজ্যই।
আরবি ভাষার ম্রিয়মান ভূমিকার পেছনে আরেকটি কারণ হলো পশ্চিমা প্রভাব। ফ্রান্স, ইতালি ও ইংল্যান্ড থেকে আমদানিকৃত শাস্ত্র ও দক্ষতার সাথে যোগাযোগের জন্য সেসব ভাষাই ব্যবহার করতে হতো। শিক্ষাক্ষেত্রে তাই আরবি নয়, তুরস্কের মুসলিম ও তুর্কি-মিশরীয় সেনাদের শিখতে হতো তাদের শিক্ষকদের ভাষা। সিরিয়া, লেবানন ও মিশরে মিশনারি ও অন্যান্য পশ্চিমা-প্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয়ে শিক্ষার ভাষাগত মাধ্যম ছিল ফ্রেঞ্চ ও ইংরেজি। পশ্চিমা আধুনিকায়নের প্রতি আকর্ষণ ভাষার প্রশ্ন পর্যন্ত পৌঁছে যায়। ফলে বুদ্ধিজীবীরা আরও জোরেসোরে বিশ্বাস করতে শুরু করেন যে, বুদ্ধিবৃত্তিক অভিজাত শ্রেণিতে ঠাঁই পাওয়ার উপায় হলো পশ্চিমা কোনো একটি ভাষায় কথা বলতে জানা। এদিকে মুসলিম বিশ্বে পশ্চিমা শক্তির রাজনৈতিক প্রভাবও দিনে দিনে বাড়তে শুরু করে। শেষদিকে এসে আরব মুসলিম অঞ্চলগুলো তাদের পদানত হতে থাকে। এভাবে বিদেশি শক্তিগুলো এমন স্কুল পাঠ্যক্রম তৈরি করে, যাতে রয়েছে পশ্চিমা ভাষা শেখার বাধ্যবাধকতা। এমনকি সরকারি আনুষ্ঠানিক নথিপত্রও উপস্থাপন করতে হতো আরবি ও পশ্চিমা উভয় ভাষায়। বহু সিরীয় ও লেবানিজ ব্যক্তি ফ্রেঞ্চ বলতে পারে, মিশরীয়রা ইংরেজি জানে, লিবিয়ানরা যোগাযোগ করে ইতালীয় ভাষায়। আর মরোক্কো, আলজেরিয়া ও তিউনিসিয়ার লোকেরা আরামসে কথা বলে ফরাসি ভাষায়। বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি পর্যন্ত এ অবস্থাই চলমান থাকে। এর ফলে পরাধীন দেশগুলো মুক্ত হওয়ার পরও সেসব জায়গায় এক প্রতিকূল প্রভাব বিদ্যমান রয়ে যায়। যেমন, ষাটের দশকের শুরুর দিকে ফরাসি দখলদারিত্ব থেকে মুক্ত হওয়ার পর আলজেরীয় সরকারকে বড় একটি কাজে হাত দিতে হয়। আলজেরীয়দের আরবি ভাষায় শিক্ষিত করার জন্য পুরোদমে আরবিকরণ কার্যক্রম হাতে নেন তারা। কিন্তু ইসলামের চালিকাশক্তি উসমানী সাম্রাজ্যের আরব ভূখণ্ডে আরবি ভাষাই প্রভাবশালী থাকে। সেখান থেকে এবং কায়রোর আল-আযহার বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উল্লেখযোগ্য মুসলিম আলিম বের হতে থাকেন, যারা ছিলেন নিজস্ব আরবি ভাষায় বুদ্ধিবৃত্তিক পারদর্শিতার অধিকারী।

📘 ইসলামি অর্থব্যবস্থার ইতিহাস > 📄 ইজতিহাদের দরজা বন্ধ হয়ে যাওয়া

📄 ইজতিহাদের দরজা বন্ধ হয়ে যাওয়া


ইজতিহাদের দরজাকে যখন আসলেই বন্ধ বলে ঘোষণা করা হয়, তখন এই ঘটনার পেছনের খুঁটিনাটি বিষয়গুলো সবার নিকট স্পষ্ট ছিল না। কিছু চিন্তাশীল আলিম বরং এর বিপরীতে অবস্থান গ্রহণ করেন। তারা বলেন, এমন কোনো রূপক দরজা কোনোকালেই বন্ধ করা হয়নি। কিন্তু ঐতিহাসিক পাঠ্য থেকে দেখা যায়, আলিমগণ আসলেই এমন এক বন্ধের ডাক দিয়েছিলেন। এর উদ্দেশ্য ছিল ফিকহি মতামতের ভেতর ইজতিহাদের মুখোশের আড়ালে হানাদারদের কুযুক্তি প্রতিহত করা। এই বন্ধের ঘোষণা কয়েকটি কারণে দেওয়া হয়:
➡ ১. আলিমদের একটা দল আবির্ভূত হয়, যারা ইজতিহাদের যোগ্যতা ও শর্তগুলো পূরণ করতে অক্ষম ছিল। আবার অনেকের অনুসৃত বিভিন্ন মতাদর্শ সত্যিকার অর্থে ইসলামিও ছিল না। শুরু থেকে বললে, কোনো আলিমকে ইজতিহাদের যোগ্যতা দাবি করতে হলে কঠোর কিছু শর্ত পূরণ করতে হয়। এর অল্প কয়েকটি উদাহরণ হলো কুরআনের ভাষা আরবির ওপর প্রাজ্ঞতা, পবিত্র কিতাব ও নবি-এর সুন্নাহর ব্যাপারে পূর্ণ বুঝ, সাহাবিদের ইজমার ব্যাপারে পূর্ণাঙ্গ জানাশোনা। ইসলামে নবাগত যারা ফিক্হ নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করার যোগ্য হওয়ার দাবি করতে শুরু করেন, মুসলিম ফকিহগণের কাছে মনে হয়েছে তারা এই শর্তাদি পুরোপুরি পূরণ করেন না।
➡ ২. ফিক্হশাস্ত্রে নবাগতদের কেউ কেউ নব্য সেক্যুলার মুসলিম শাসকদের দ্বারা প্রভাবিত বলে আশঙ্কা করা হয়। নিজেদের উৎকট সেক্যুলার ঝোঁককে বৈধতা প্রদানের জন্য ধর্মীয় ফতোয়ার ক্ষমতা অপব্যবহারের বাসনা হয়তো তাদের থেকে থাকতে পারে।
➡ ৩. বেশ কিছু ধর্মীয় দল ও উপদলের প্রসার ঘটে, যাদের ধর্মীয় চর্চাগুলো সবক্ষেত্রেই গ্রহণযোগ্য ছিল না। এদের কালেভদ্রে সন্দেহের চোখে দেখার পাশাপাশি কখনো দেখা হতো তিরস্কারের দৃষ্টিতে। এসব দল-উপদল প্রাথমিক যুগের ধর্মানুরাগী মুসলিমদের সত্যিকারের চর্চার সাথে কতখানি সামঞ্জস্যশীল, তা নিয়ে সন্দেহ তৈরি হচ্ছিল। এই চর্চাগুলোকে বৈধতা প্রদানের নানা চেষ্টাকে থামিয়ে দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়।
➡ ৪. ধর্মের সংস্কার তথা তাজদিদের নাম দিয়ে কোনো বিধর্মীয় নব্য সংযুক্তি তথা বিদআত যেন ছড়াতে না পারে, সেই প্রচেষ্টাও করা হয়েছিল। আশঙ্কা হচ্ছিল যে, ইজতিহাদের অযোগ্য বা যোগ্যতা সত্ত্বেও অসৎ উদ্দেশ্য লালনকারী কেউ কেউ ইজতিহাদ ও ফিকহের দোহাই দিয়ে দ্বীনের মধ্যে কোনো অযাচিত হস্তক্ষেপ করবেন। ধর্মের ক্ষেত্রে নতুন জিনিসের অসারতা নিশ্চিত করতে আলিমগণ ঘোষণা করেন যে, প্রত্যেক নতুন বিষয় বিদআত, প্রত্যেক বিদআত ভ্রষ্টতা তথা দ্বালালাহ, আর প্রত্যেক দ্বালালাহ (ও এর উদ্ভাবক) জাহান্নামি।[১] এখনো পর্যন্ত কোনো ব্যক্তিকে বিদআতি বলে আখ্যায়িত করাটা একটি গুরুতর ধর্মীয় অভিযোগ। যদিও অভিযোগ করা মানেই ওই ব্যক্তিকে আদালতে টেনেহিঁচড়ে নেওয়া উদ্দেশ্য নয়, কিন্তু তা অভিযুক্ত ব্যক্তির ধর্মীয় গৌরব ও বিশ্বাসের প্রতি গভীর ক্ষত তো অবশ্যই。

টিকাঃ
[১] সুনানু আবি দাউদ, ৫৪০৭; সুনানুত তিরমিযি, ২৬৭৬; আরও অনেকেই বর্ণনা করেছেন। হাদীসটি সহিহ। - সম্পাদক

📘 ইসলামি অর্থব্যবস্থার ইতিহাস > 📄 পশ্চিমা বুদ্ধিবৃত্তির অনুপ্রবেশ

📄 পশ্চিমা বুদ্ধিবৃত্তির অনুপ্রবেশ


উসমানী আমলে পশ্চিমা প্রভাব শুধুমাত্র বাণিজ্যিক ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ ছিল না। বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কিছু সাফল্যে উদ্দীপিত হয়ে খ্রিষ্টান মিশনারিগণ পূর্বদিকে নজর দেন। তাদের চোখে সেই পুরনো ক্রুসেডের স্মৃতি। কিছু মুসলিম নেতার গৃহীত উদারনীতি (Liberal policies) সেই পালে আরও হাওয়া দেয়। যেমন, লেবানিজ রাজকুমার দ্বিতীয় ফখরুদ্দীন (১৫৯০-১৬৩৫) ইতালি থেকে শুধু বিজ্ঞানী ও প্রকৌশলীই আমদানি করেননি, ফ্রেঞ্চ ক্যাথলিক চার্চের খ্রিষ্টান মিশনারিদেরও স্বাগত জানান (Hitti, 1963)। বেশিদিন না যেতেই লেবানিজ ও সিরীয় ভূমির প্রধান প্রধান নগরী ও পল্লীতে গড়ে ওঠে ফরাসি ক্যাথলিক ধর্মকেন্দ্র। সিরিয়ার ওপর মিশরীয় দখলদারিত্বের (১৮৩১-৪০) সময় মিশরের মুহাম্মাদ আলির পুত্র সেনাপতি ইবরাহীম স্থানীয় প্রশাসনে অমুসলিমদের পদাধিকার লাভের অধিকার ঘোষণা দেন। প্রচার ও প্রতিষ্ঠিত করেন আইনের চোখে সকল ধর্মের অনুসারীর সমতার ধারণা। তার উদারনীতির যে-কোনো বিরোধিতাকে বল প্রয়োগ করে দমিয়ে রাখা হয়। সার্বিক নিরাপত্তাপূর্ণ পরিবেশের সাথে সাথে এই বিষয়টি যোগ হওয়ায় অন্যান্য খ্রিষ্টান উপদলও তাদের ফ্রেঞ্চ ক্যাথলিক ভাইদের পদাঙ্ক অনুসরণে উৎসাহ লাভ করেন। সপ্তদশ ও অষ্টাদশ শতাব্দীর মাঝে খ্রিষ্টান মিশনারি কর্মকাণ্ডের হাত ধরে সিরিয়া ও লেবাননে প্রতিষ্ঠিত হয় বহু গির্জা। ব্রিটিশ ও আমেরিকান প্রোটেস্ট্যান্ট মিশনারিরা লেবাননে নিজেদের শক্তিশালী উপস্থিতি তৈরি করেন। ১৮৩৮ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় নেটিভ প্রোটেস্ট্যান্ট চার্চ অব সিরিয়া। খাদিভ সাইদের আমলে (১৮৫৪-৬৩) ১৮৫৭ সালে আমেরিকান ইউনাইটেড প্রেসবাইটেরিয়ান মিশন তাদের কার্যক্রম শুরু করে মিশরে (প্রাগুক্ত)।
পশ্চিমা বুদ্ধিবৃত্তিক অনুপ্রবেশের আরও লক্ষণ দেখা দিতে থাকে ক্ষয়িষ্ণু উসমানী সাম্রাজ্যের অন্যান্য স্থানেও। এটা ছিল শাসকদের নিমন্ত্রণ কিংবা বন্ধুসুলভ আচরণের ফলাফল। সিরিয়া ও লেবাননে যেসব মিশনারি কর্মকাণ্ডের কথা বলা হলো, তার পাশাপাশি শিক্ষাকার্যক্রমেও এর উল্লেখযোগ্য অনুপ্রবেশ ঘটে। বৈরুতে ১৮৩০ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় আমেরিকান স্কুল ফর গার্লস। একই শহরে ১৮৬৬ সালে প্রতিষ্ঠিত সিরিয়ান প্রোটেস্ট্যান্ট কলেজ পরবর্তীকালে হয় আমেরিকান ইউনিভার্সিটি অব বৈরুত। জেসুইট শিক্ষাকার্যক্রমের ফলে ইউনিভার্সিটি অব সেন্ট জোসেফ প্রতিষ্ঠিত হয় ১৮৮১ সালে। বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠান আজও তাদের শিক্ষাসেবা প্রদান করে যাচ্ছে। এখনো পর্যন্ত এগুলোকে ধরা হয় শিক্ষাজগতের আদর্শ নমুনা হিসেবে। শিক্ষার ভাষা হিসেবে ইংরেজির ব্যবহার এবং আমেরিকান শিক্ষাবিদদের দ্বারা নির্মিত পাঠ্যক্রমের ফলে সিলেবাসে ইসলামি উপাদানকে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয়। তাই ইসলামি শিক্ষার সুদৃঢ় অস্তিত্বের সুযোগ ছিল নগণ্য। বিংশ শতাব্দীর শেষাংশ পর্যন্ত পরিস্থিতি মোটামুটি এরকমই থাকে। এরপর ইসলামি বিশ্ব একটি ইসলামি পুনর্জাগরণবাদ প্রত্যক্ষ করে, যার ফলে পাঠ্যক্রমে ইসলামি ভাবধারার উপাদান আরও বেশি করে স্থান করে নিতে থাকে।

📘 ইসলামি অর্থব্যবস্থার ইতিহাস > 📄 সেক্যুলার ধারার অনুকরণে ধর্ম ও ইসলামি সংস্কৃতিকে বিচ্ছিন্নকরণ

📄 সেক্যুলার ধারার অনুকরণে ধর্ম ও ইসলামি সংস্কৃতিকে বিচ্ছিন্নকরণ


সব পশ্চিমা প্রভাব অবশ্য মুসলিম রাষ্ট্রের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়নি। কোনো কোনোটি স্বয়ং শাসকগণই আমদানি করেছেন আধুনিকায়নের খায়েশে। এই শাসকদের প্রথমেই রয়েছেন মুহাম্মাদ আলি (১৭৬৯-১৮৪৮)। তিনি ১৮০৫ সালে কেন্দ্রীয় সরকার কর্তৃক মিশরের গভর্নর 'পাশা' হিসেবে নিয়োগ পান। ইতিহাসের বইপত্রে প্রায়শ তাকে আধুনিক মিশরের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে কৃতিত্ব প্রদান করা হয়। আলির আগে, নেপোলিয়ন বোনাপার্টের অভিযানের হাত ধরে এমনসব পশ্চিমা প্রভাবের আগমন ঘটে, যেগুলো আগে মুসলিমদের গোচরে ছিল না। এর একটি অনস্বীকার্য উদাহরণ আরবি ছাপাখানা। বোনাপার্টের নিয়ে আসা এই আরবি ছাপাকর্মের উদ্দেশ্য কিন্তু মিশরীয়দের শিক্ষাপ্রক্রিয়ার অগ্রগতি ঘটানো নয়। বরং এর মাধ্যমে ১৭৯৮ সালের ফ্রেঞ্চ প্রোপাগান্ডার আরবি লিফলেট ছাপানো হয়, যার উদ্দেশ্য ছিল জনগণের সমর্থন আদায় করা। বোনাপার্ট যুগের পরে এই ছাপাকর্মের হাত ধরেই কায়রোর বুলাক কোয়ার্টারে পুরোদমে একটি ছাপাখানা প্রতিষ্ঠিত হয়। এর নাম মাকতাবাত বুলাক (প্রাগুক্ত)।
মিশর-সহ যে-কোনো অঞ্চলের মুসলিমদের কাছে ছাপাখানা ছিল একেবারেই নতুন একটি বিষয়। এটি পশ্চিমা আধুনিকায়নের এক দৃশ্যমান উদাহরণ। তা ছাড়া ফরাসি সেনাবাহিনী তাদের সাথে বিজ্ঞানী ও দোভাষীদেরও নিয়ে আসে। তারা স্টোন অব রাশিদ আবিষ্কারের মাধ্যমে হায়েরোগ্লিফিক লিপির পাঠোদ্ধার করেন। এসব ফরাসি তৎপরতা দেখে মনে হচ্ছিল মিশরীয় মাটিতে তারা দীর্ঘকাল থাকার পরিকল্পনা করছে। কিন্তু ব্রিটিশ নৌবাহিনীর হাতে ফ্রেঞ্চ নৌবহর ধ্বংস এবং ১৮০১ সালে আলেকজান্দ্রিয়ার যুদ্ধে ফ্রেঞ্চদের পরাজয়ের পর এতে আচমকা ছেদ পড়ে। প্রায় আশি বছরের মধ্যে ব্রিটিশরা মিশরীয় ভূমধ্যসাগরীয় বন্দরগুলোতে অবতরণ করে। যে অবস্থানের স্থায়িত্বকাল ছিল প্রায় পঁচাশি বছর।
আধুনিকায়নের ফরাসি দৃষ্টান্তে মুগ্ধ হয়ে মুহাম্মাদ আলি একটি সংস্কারমূলক কার্যক্রমে হাত দেন। অত্যন্ত কঠোর হলেও সেটা দেশটিকে মামলুক পশ্চাৎপদতা (?) থেকে বের করে আনে। আধুনিকায়নের তাড়নায় ১৮১৭ সালে তিনি বিভিন্ন প্রকৌশল বিদ্যালয় এবং ১৮২৭ সালে চিকিৎসা বিদ্যালয় স্থাপন করেন, যেগুলোর শিক্ষকরা ছিলেন মূলত ফ্রান্স থেকে আমদানিকৃত। সামরিক ও শিক্ষাগত প্রতিনিধিদল আনা হয় ফ্রান্স ও ইতালি থেকে। রাষ্ট্রীয় খরচে মিশর থেকে প্রতিনিধি পাঠানো হয় ফ্রান্স, ইতালি, অস্ট্রিয়া ও ইংল্যান্ডে। স্কুলের ইতিহাসগ্রন্থগুলোতে যা ‘দুর্গের ভেতর জবাই’ নামে পরিচিত, সে ঘটনা আয়োজন করার মধ্য দিয়ে তিনি নিজেকে রাজনৈতিকভাবে চিরতরে মামলুকদের থেকে মুক্ত করে নেন। কায়রোর শক্তিশালী নিরাপত্তাবিশিষ্ট দুর্গে খোলাখুলি একটি পার্টির আয়োজন করেন তিনি।
আমন্ত্রিত মামলুকদের নিয়ে যাওয়া হয় একটি সংকীর্ণ পথের ভেতর, যেখানে তাদের জবাই করে হত্যা করে প্রহরীরা। খুবই অল্প কয়েকজন বাদে মিশরের সকল মামলুকের জীবনাবসান ঘটানো হয় সেখানে। অর্থনৈতিক নীতিমালাতেও মুহাম্মাদ আলি ছিলেন সমপরিমাণে কঠোর। মিশরের সকল ভূমি বাজেয়াপ্ত করে নেন তিনি এবং নিজেকে ঘোষণা করেন সেগুলোর একচ্ছত্র মালিক। ভূমি ও উৎপাদনের একচেটিয়া মালিক হওয়ার মাধ্যমে তিনিই হয়ে ওঠেন একমাত্র উৎপাদক, নির্মাতা ও চুক্তিকারী। সেচ ও খাল প্রকল্প এবং রাষ্ট্রীয় উদ্যোগের জন্য বাধ্যতামূলক শ্রমের পরিবেশ এতই অসহনীয় ছিল যে, বহু মানুষ তাদের জীবন হারায়। বাকিদের হাতের অংশবিশেষ কেটে ফেলতে হয় নিজেদেরকে শ্রমের অনুপযোগী হিসেবে দেখানোর স্বার্থে (Armstrong, 2000)। বিজ্ঞান ও প্রকৌশলে পশ্চিমা অনুপ্রবেশ পরিণত হয় মিশরে পশ্চিমা বুদ্ধিবৃত্তিক আগ্রাসনে। মুহাম্মাদ আলির নাতি ইসমাঈল ছিলেন ইউরোপিয়ানদের তুলনায় আমেরিকানদের প্রতি বেশি অনুরক্ত। তার শাসনামলে (১৮৬৩-৭৯) উচ্চতর মিশরে ১৮৬৫ সালে একটি আমেরিকান বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। আর কায়রোতে ১৮৬৫ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় আমেরিকান কলেজ ফর গার্লস。

টিকাঃ
[১] বিস্তারিত জানতে দ্রষ্টব্য: আন-নুজুমুয যাহিরাহ, ৩/১৭৩। - সম্পাদক

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00