📘 ইসলামি অর্থব্যবস্থার ইতিহাস > 📄 উসমানীয়দের অধীনে ইসলামি রচনা ও গবেষণা

📄 উসমানীয়দের অধীনে ইসলামি রচনা ও গবেষণা


স্থাপত্য, শিল্পকলা ও সামরিক সংগঠনের মতো ক্ষেত্রগুলোতে উন্নতি বিবেচনা করলে বলা যায়, উসমানী আমলে অর্থনৈতিক চিন্তার পূণর্বিন্যাসের প্রতি মনোযোগ প্রদান করা হয়েছে যৎসামান্য। বিগত কয়েক শতাব্দীর মুসলিম চিন্তাবিদদের আর্থ- সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের তুলনায় এই যুগে কাজের পরিমাণ ছিল কম। ইবনু খালদুনের (১৩৩২-১৪০৪) পর আল-মাকরিযির (১৩৬৪-১৪৪১) কাজটিকে উল্লেখ করা যায়। যদিও গুরুত্বের বিচারে প্রথমটির চেয়ে দ্বিতীয়টি পিছিয়ে। এ দুটো কাজই যেন মুসলিম চিন্তাবিদদের আর্থ-সামাজিক কাজের সর্বশেষ নিশানি হয়ে গেছে। সুনির্দিষ্টভাবে আর্থ-সামাজিক প্রকৃতির তেমন কাজ উসমানী সাম্রাজ্য রেখে গেছে বলে দেখা যায় না। এর মানে এই না যে, সে যুগের লেখকদের কোনো উল্লেখযোগ্য অর্জন ছিলই না। ছিল অবশ্যই, কিন্তু সেগুলো ছিল প্রধানত পুস্তক বিবরণী, জীবনী, সংকলন ও ব্যাখ্যা। সামনে উল্লেখিত উদাহরণগুলোতে তা দেখানো হবে (Hitti, 1963)।
হাজি খালিফা (মৃ. ১৬৫৭)-কে তুর্কিরা বলত কাতিব চেলেবি বা তরুণ লেখক। তিনি তার কর্মজীবন শুরু করেছিলেন সেনা কেরানী হিসেবে। সেই তিনিই নাম ও উপাধির ওপর রচনা করেন প্রধান একটি গ্রন্থপঞ্জি কাশফুয যুনুন আন আসামিল কুতুবি ওয়াল ফুনুন (কিতাব ও শাস্ত্রসমূহের নাম, উপাধি ও পরিভাষার ব্যাপারে সন্দেহ নিরসন)। এই গ্রন্থপঞ্জিতে হাজি খলিফা তার গবেষণা অনুসারে সকল আরবি, ফারসি ও তুর্কি বইয়ের নাম বর্ণানুক্রমে তালিকাবদ্ধ করেন। হাজি খলিফা নিজে যদিও তুর্কি, কিন্তু তিনি আরবিতেও পারদর্শী ছিলেন। এ কিছুটা বিরল উদাহরণ এবং সম্ভবত এমন এক ব্যতিক্রমও, যার নজির খুব বেশি সমসাময়িক তুর্কিদের মাঝে দেখা যায়নি।
মিশর থেকে আসেন আবদুল ওয়াহহাব আশ-শারানি (মৃ. ১৫৬৫)। বিখ্যাত সুফি আলিম আশ-শারানি সকল বিখ্যাত সুফির জীবনী ও ইতিহাস লিপিবদ্ধ করেন আত-তাবাকাতুল কুবরা গ্রন্থে।
আয-যাবিদি ছিলেন আরেক মিশরীয় গবেষক। সাইয়্যিদ মুরতাজা আয-যাবিদি (১৭৩৭-১৭৯১) জন্মসূত্রে ভারতীয়। কায়রোতে তিনি গাযালির ইহইয়া উলুমুদ্দীন-এর এক সুবিশাল কলেবরের ব্যাখ্যাগ্রন্থ রচনা করেন।
আবদুর রহমান ইবনু হাসসান আল-জাবারতি (মৃ. ১৮২২) নেপোলিয়ন বোনাপার্টের দ্বারা গ্র্যান্ড কাউন্সিলের একজন সদস্য হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত হন। আল-আযহারে জ্যোতির্বিজ্ঞান বিষয়েও একটি পদের অধিকারী ছিলেন তিনি। তার রচিত সেরা একটি কাজ আজাইবুল আসার ফিত তারাজিম ওয়াল আখবার (জীবনী ও ঘটনাবলির মাঝে লুকোনো বিস্ময়সমূহ)।
লেবাননের কিছু প্রধান লেখক ছিলেন ম্যারোনাইট খ্রিষ্টান। তাদের মাঝে সবচেয়ে বিখ্যাত ইউসুফ সিমআন আস-সিমআনি (১৬৮৭-১৭৬৮)। তার শ্রেষ্ঠ রচনা Bibliotheca Orientalis। এতে আরবি, হিব্রু ও অন্যান্য প্রাচ্যীয় ভাষার विशाल সংখ্যক পাণ্ডুলিপির ওপর গবেষণা রয়েছে।
সিরিয়া থেকে আসেন মুহাম্মাদ আল-মুহিব্বি (মৃ. ১৬৯৯)। তার প্রধান রচনাকর্ম হলো ১৫৯১ থেকে ১৬৮৮-এর মাঝে মারা যাওয়া প্রসিদ্ধ মুসলিমদের বারো শ নব্বইটি জীবনীর সংকলন। আরেকজন হলেন আবদুল গনি আন-নাবুলুসি (মৃ. ১৭১)। তিনি অসংখ্য গ্রন্থ উপহার দিয়েছেন।
উল্লিখিত কাজগুলো অত্যন্ত সারগর্ভ ও নজরকাড়া। এগুলো যতটা না অভিনব ও সৃষ্টিশীল, তার চেয়ে বেশি তথ্যবহুল। মৌলিক চিন্তা ও নতুন ধারণা ছিল কিছুটা কম। ইজতিহাদের দরজা রুদ্ধ করে দেওয়ার ফলাফল হয়তো এভাবেই দেখা দিতে শুরু করে।
লেখালেখির জগতে, বিশেষত ইসলামি অর্থনীতিতে উসমানীদের এই শূন্যতার পেছনে কারণ হিসেবে উল্লেখ করা যায় প্রায় এক শতাব্দী ধরে বিরাজমান বেশ কিছু নিয়ামককে। এর কয়েকটি হতে পারে: আরবি ভাষার আনুষ্ঠানিক ব্যবহার কমে আসা, ইজতিহাদের দরজা বন্ধ হয়ে যাওয়া, পশ্চিমা বুদ্ধিবৃত্তিক আগ্রাসন, সেক্যুলারায়নের লক্ষ্যে ধর্মকে বিচ্ছিন্নকরণ, এবং আইন সংক্রান্ত কর্মকাণ্ডের ব্যাপারে প্রেরণার অভাব। এই নিয়ামকগুলো সংক্ষেপে নিয়ে আলোচনা করা হলো。

টিকাঃ
[১] লেখক উসমানী আমলের অর্থনীতি ও আইনশাস্ত্রের অবদানকে যথাসম্ভব খাটো করতে চেয়েছেন বলেই মনে হয়েছে। সামনে লেখক যেসব অবদানের কথা আলোচনা করেছেন তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বেশকিছু কাজ তিনি উপেক্ষা করেছেন। উদাহরণত, উসমানী আমলে সুলতান আবদুল মাজীদের শাসনামলে গঠিত ফকিহ ও আইনবিদদের পরিষদের মাধ্যনে প্রণীত হয়েছিল মাজাল্লাতুল আহকাম আল-আদালিয়্যা। ১৮৮২ সালে তা প্রকাশিত হয়। এতে ১৮৫১ টি ধারায় হানাফি মাযহাবের আলোকে ষোলোটি অধ্যায় ও অসংখ্য উপঅধ্যায়ে পারিবারিক, দেওয়ানি ও ফৌজদারি আদালতে ব্যবহারের জন্য বিস্তৃত আইন বিধিবদ্ধ হয়। উসমানী আমলেই খালিদ আতাসি, আলি হায়দার, ফাহমী হুসাইনি প্রমুখ ফকিহ ও আইনবেত্তারা এর ব্যাখ্যা রচনা করেন। এই গ্রন্থকে অনেকেই ইসলামি আইনশাস্ত্রের প্রথম বিধিবদ্ধ প্রচেষ্টা অ্যাখ্যা দিয়েছেন। এর প্রথম অধ্যায় বেচাকেনা বিষয়ক ও সর্বশেষ অধ্যায় বিচারকার্য বিষয়ক। - সম্পাদক

📘 ইসলামি অর্থব্যবস্থার ইতিহাস > 📄 আরবি ভাষার আনুষ্ঠানিক ব্যবহার কমে আসা

📄 আরবি ভাষার আনুষ্ঠানিক ব্যবহার কমে আসা


ক্ষমতার পেন্ডুলাম তুর্কিদের দিকে হেলে যাওয়ার ফলে ইসলামি রাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক ভাষা হিসেবে আরবির ভূমিকা হ্রাস পেতে থাকে। রাষ্ট্রের শাসকগণও আরব নন, জনগণের সাথে তাদের যোগাযোগের মাধ্যমও আরবি নয়। পারস্য ভাষা যখন তার প্রতিদ্বন্দ্বীকে দৃশ্যপট থেকে ঠেলে বের করে দিতে শুরু করে, তখন থেকেই গণমানুষের সাথে আরবি ভাষার দূরত্ব শুরু হয়। এ ঘটনা ঘটেছিল ১২৫৮ সালে মঙ্গোলদের হাতে বাগদাদ পতনের আগে, পারস্যদের দাপট ক্রমাগত বাড়তে থাকার সময়। তবে তার সাথে এও সত্য যে, আব্বাসিগণ নিজেরা যেখানে ছিলেন আরব ও নিজেদের ঘিরেও রাখতেন আরব সভাসদ দিয়ে। নতুন খলিফারা সেখানে নিজেরা অনারব, তাদের ভাষাও আরবি নয়। ফলে আরবি ভাষা স্বভাবতই দেশের হর্তাকর্তাদের ভাষা থাকেনি। আরবি তখন খলিফার দরবারের দাপ্তরিক ভাষাও নয়। ফলে দপ্তরের কর্মীরা যেমন একে রাজদরবার থেকে বিদায় করে দিতে থাকে, তেমনি জনমানুষও একে আর আগের চোখে দেখেনি। এটি আব্বাসি আমলের দৃশ্য থেকে আলাদা। পারস্য প্রভাবাধীনে প্রতীকী শাসকে পরিণত হওয়ার পরও আব্বাসিরা জাতিতে ছিলেন আরব। ফলে খিলাফতের দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে আরবি তার মর্যাদা ধরে রেখেছিল।
তবে কিছু লক্ষণ থেকে বোঝা যায়: তুর্কি শাসকগণ কুরআনের ভাষা-সহ গোটা ইসলামি ঐতিহ্যের রক্ষক হিসেবে নিজেদেরকে চিত্রায়িত করতে একনিষ্ঠ প্রচেষ্টা চালিয়ে গেছেন। আরবি বর্ণমালাকে তারা তাদের তুর্কি লিখিত ভাষার মাধ্যম বানিয়ে নেন, যা ১৯২৮ সাল পর্যন্ত বহাল ছিল। উসমানীদেরকে ইসলামের প্রতি উদাসীনতার দায়ে অভিযুক্ত করা সম্ভব নয়। ধর্মটিকে তারা আপন করে নেয় অত্যন্ত আগ্রহ সহকারে। সত্যি বলতে কী, পঞ্চদশ শতাব্দীর মধ্যভাগ থেকে প্রায় দুই শতক যাবৎ ইসলামকে এক দুর্দান্ত শক্তি ও দুর্বার গতি প্রদান করে এই উসমানী সাম্রাজ্যই।
আরবি ভাষার ম্রিয়মান ভূমিকার পেছনে আরেকটি কারণ হলো পশ্চিমা প্রভাব। ফ্রান্স, ইতালি ও ইংল্যান্ড থেকে আমদানিকৃত শাস্ত্র ও দক্ষতার সাথে যোগাযোগের জন্য সেসব ভাষাই ব্যবহার করতে হতো। শিক্ষাক্ষেত্রে তাই আরবি নয়, তুরস্কের মুসলিম ও তুর্কি-মিশরীয় সেনাদের শিখতে হতো তাদের শিক্ষকদের ভাষা। সিরিয়া, লেবানন ও মিশরে মিশনারি ও অন্যান্য পশ্চিমা-প্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয়ে শিক্ষার ভাষাগত মাধ্যম ছিল ফ্রেঞ্চ ও ইংরেজি। পশ্চিমা আধুনিকায়নের প্রতি আকর্ষণ ভাষার প্রশ্ন পর্যন্ত পৌঁছে যায়। ফলে বুদ্ধিজীবীরা আরও জোরেসোরে বিশ্বাস করতে শুরু করেন যে, বুদ্ধিবৃত্তিক অভিজাত শ্রেণিতে ঠাঁই পাওয়ার উপায় হলো পশ্চিমা কোনো একটি ভাষায় কথা বলতে জানা। এদিকে মুসলিম বিশ্বে পশ্চিমা শক্তির রাজনৈতিক প্রভাবও দিনে দিনে বাড়তে শুরু করে। শেষদিকে এসে আরব মুসলিম অঞ্চলগুলো তাদের পদানত হতে থাকে। এভাবে বিদেশি শক্তিগুলো এমন স্কুল পাঠ্যক্রম তৈরি করে, যাতে রয়েছে পশ্চিমা ভাষা শেখার বাধ্যবাধকতা। এমনকি সরকারি আনুষ্ঠানিক নথিপত্রও উপস্থাপন করতে হতো আরবি ও পশ্চিমা উভয় ভাষায়। বহু সিরীয় ও লেবানিজ ব্যক্তি ফ্রেঞ্চ বলতে পারে, মিশরীয়রা ইংরেজি জানে, লিবিয়ানরা যোগাযোগ করে ইতালীয় ভাষায়। আর মরোক্কো, আলজেরিয়া ও তিউনিসিয়ার লোকেরা আরামসে কথা বলে ফরাসি ভাষায়। বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি পর্যন্ত এ অবস্থাই চলমান থাকে। এর ফলে পরাধীন দেশগুলো মুক্ত হওয়ার পরও সেসব জায়গায় এক প্রতিকূল প্রভাব বিদ্যমান রয়ে যায়। যেমন, ষাটের দশকের শুরুর দিকে ফরাসি দখলদারিত্ব থেকে মুক্ত হওয়ার পর আলজেরীয় সরকারকে বড় একটি কাজে হাত দিতে হয়। আলজেরীয়দের আরবি ভাষায় শিক্ষিত করার জন্য পুরোদমে আরবিকরণ কার্যক্রম হাতে নেন তারা। কিন্তু ইসলামের চালিকাশক্তি উসমানী সাম্রাজ্যের আরব ভূখণ্ডে আরবি ভাষাই প্রভাবশালী থাকে। সেখান থেকে এবং কায়রোর আল-আযহার বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উল্লেখযোগ্য মুসলিম আলিম বের হতে থাকেন, যারা ছিলেন নিজস্ব আরবি ভাষায় বুদ্ধিবৃত্তিক পারদর্শিতার অধিকারী।

📘 ইসলামি অর্থব্যবস্থার ইতিহাস > 📄 ইজতিহাদের দরজা বন্ধ হয়ে যাওয়া

📄 ইজতিহাদের দরজা বন্ধ হয়ে যাওয়া


ইজতিহাদের দরজাকে যখন আসলেই বন্ধ বলে ঘোষণা করা হয়, তখন এই ঘটনার পেছনের খুঁটিনাটি বিষয়গুলো সবার নিকট স্পষ্ট ছিল না। কিছু চিন্তাশীল আলিম বরং এর বিপরীতে অবস্থান গ্রহণ করেন। তারা বলেন, এমন কোনো রূপক দরজা কোনোকালেই বন্ধ করা হয়নি। কিন্তু ঐতিহাসিক পাঠ্য থেকে দেখা যায়, আলিমগণ আসলেই এমন এক বন্ধের ডাক দিয়েছিলেন। এর উদ্দেশ্য ছিল ফিকহি মতামতের ভেতর ইজতিহাদের মুখোশের আড়ালে হানাদারদের কুযুক্তি প্রতিহত করা। এই বন্ধের ঘোষণা কয়েকটি কারণে দেওয়া হয়:
➡ ১. আলিমদের একটা দল আবির্ভূত হয়, যারা ইজতিহাদের যোগ্যতা ও শর্তগুলো পূরণ করতে অক্ষম ছিল। আবার অনেকের অনুসৃত বিভিন্ন মতাদর্শ সত্যিকার অর্থে ইসলামিও ছিল না। শুরু থেকে বললে, কোনো আলিমকে ইজতিহাদের যোগ্যতা দাবি করতে হলে কঠোর কিছু শর্ত পূরণ করতে হয়। এর অল্প কয়েকটি উদাহরণ হলো কুরআনের ভাষা আরবির ওপর প্রাজ্ঞতা, পবিত্র কিতাব ও নবি-এর সুন্নাহর ব্যাপারে পূর্ণ বুঝ, সাহাবিদের ইজমার ব্যাপারে পূর্ণাঙ্গ জানাশোনা। ইসলামে নবাগত যারা ফিক্হ নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করার যোগ্য হওয়ার দাবি করতে শুরু করেন, মুসলিম ফকিহগণের কাছে মনে হয়েছে তারা এই শর্তাদি পুরোপুরি পূরণ করেন না।
➡ ২. ফিক্হশাস্ত্রে নবাগতদের কেউ কেউ নব্য সেক্যুলার মুসলিম শাসকদের দ্বারা প্রভাবিত বলে আশঙ্কা করা হয়। নিজেদের উৎকট সেক্যুলার ঝোঁককে বৈধতা প্রদানের জন্য ধর্মীয় ফতোয়ার ক্ষমতা অপব্যবহারের বাসনা হয়তো তাদের থেকে থাকতে পারে।
➡ ৩. বেশ কিছু ধর্মীয় দল ও উপদলের প্রসার ঘটে, যাদের ধর্মীয় চর্চাগুলো সবক্ষেত্রেই গ্রহণযোগ্য ছিল না। এদের কালেভদ্রে সন্দেহের চোখে দেখার পাশাপাশি কখনো দেখা হতো তিরস্কারের দৃষ্টিতে। এসব দল-উপদল প্রাথমিক যুগের ধর্মানুরাগী মুসলিমদের সত্যিকারের চর্চার সাথে কতখানি সামঞ্জস্যশীল, তা নিয়ে সন্দেহ তৈরি হচ্ছিল। এই চর্চাগুলোকে বৈধতা প্রদানের নানা চেষ্টাকে থামিয়ে দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়।
➡ ৪. ধর্মের সংস্কার তথা তাজদিদের নাম দিয়ে কোনো বিধর্মীয় নব্য সংযুক্তি তথা বিদআত যেন ছড়াতে না পারে, সেই প্রচেষ্টাও করা হয়েছিল। আশঙ্কা হচ্ছিল যে, ইজতিহাদের অযোগ্য বা যোগ্যতা সত্ত্বেও অসৎ উদ্দেশ্য লালনকারী কেউ কেউ ইজতিহাদ ও ফিকহের দোহাই দিয়ে দ্বীনের মধ্যে কোনো অযাচিত হস্তক্ষেপ করবেন। ধর্মের ক্ষেত্রে নতুন জিনিসের অসারতা নিশ্চিত করতে আলিমগণ ঘোষণা করেন যে, প্রত্যেক নতুন বিষয় বিদআত, প্রত্যেক বিদআত ভ্রষ্টতা তথা দ্বালালাহ, আর প্রত্যেক দ্বালালাহ (ও এর উদ্ভাবক) জাহান্নামি।[১] এখনো পর্যন্ত কোনো ব্যক্তিকে বিদআতি বলে আখ্যায়িত করাটা একটি গুরুতর ধর্মীয় অভিযোগ। যদিও অভিযোগ করা মানেই ওই ব্যক্তিকে আদালতে টেনেহিঁচড়ে নেওয়া উদ্দেশ্য নয়, কিন্তু তা অভিযুক্ত ব্যক্তির ধর্মীয় গৌরব ও বিশ্বাসের প্রতি গভীর ক্ষত তো অবশ্যই。

টিকাঃ
[১] সুনানু আবি দাউদ, ৫৪০৭; সুনানুত তিরমিযি, ২৬৭৬; আরও অনেকেই বর্ণনা করেছেন। হাদীসটি সহিহ। - সম্পাদক

📘 ইসলামি অর্থব্যবস্থার ইতিহাস > 📄 পশ্চিমা বুদ্ধিবৃত্তির অনুপ্রবেশ

📄 পশ্চিমা বুদ্ধিবৃত্তির অনুপ্রবেশ


উসমানী আমলে পশ্চিমা প্রভাব শুধুমাত্র বাণিজ্যিক ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ ছিল না। বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কিছু সাফল্যে উদ্দীপিত হয়ে খ্রিষ্টান মিশনারিগণ পূর্বদিকে নজর দেন। তাদের চোখে সেই পুরনো ক্রুসেডের স্মৃতি। কিছু মুসলিম নেতার গৃহীত উদারনীতি (Liberal policies) সেই পালে আরও হাওয়া দেয়। যেমন, লেবানিজ রাজকুমার দ্বিতীয় ফখরুদ্দীন (১৫৯০-১৬৩৫) ইতালি থেকে শুধু বিজ্ঞানী ও প্রকৌশলীই আমদানি করেননি, ফ্রেঞ্চ ক্যাথলিক চার্চের খ্রিষ্টান মিশনারিদেরও স্বাগত জানান (Hitti, 1963)। বেশিদিন না যেতেই লেবানিজ ও সিরীয় ভূমির প্রধান প্রধান নগরী ও পল্লীতে গড়ে ওঠে ফরাসি ক্যাথলিক ধর্মকেন্দ্র। সিরিয়ার ওপর মিশরীয় দখলদারিত্বের (১৮৩১-৪০) সময় মিশরের মুহাম্মাদ আলির পুত্র সেনাপতি ইবরাহীম স্থানীয় প্রশাসনে অমুসলিমদের পদাধিকার লাভের অধিকার ঘোষণা দেন। প্রচার ও প্রতিষ্ঠিত করেন আইনের চোখে সকল ধর্মের অনুসারীর সমতার ধারণা। তার উদারনীতির যে-কোনো বিরোধিতাকে বল প্রয়োগ করে দমিয়ে রাখা হয়। সার্বিক নিরাপত্তাপূর্ণ পরিবেশের সাথে সাথে এই বিষয়টি যোগ হওয়ায় অন্যান্য খ্রিষ্টান উপদলও তাদের ফ্রেঞ্চ ক্যাথলিক ভাইদের পদাঙ্ক অনুসরণে উৎসাহ লাভ করেন। সপ্তদশ ও অষ্টাদশ শতাব্দীর মাঝে খ্রিষ্টান মিশনারি কর্মকাণ্ডের হাত ধরে সিরিয়া ও লেবাননে প্রতিষ্ঠিত হয় বহু গির্জা। ব্রিটিশ ও আমেরিকান প্রোটেস্ট্যান্ট মিশনারিরা লেবাননে নিজেদের শক্তিশালী উপস্থিতি তৈরি করেন। ১৮৩৮ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় নেটিভ প্রোটেস্ট্যান্ট চার্চ অব সিরিয়া। খাদিভ সাইদের আমলে (১৮৫৪-৬৩) ১৮৫৭ সালে আমেরিকান ইউনাইটেড প্রেসবাইটেরিয়ান মিশন তাদের কার্যক্রম শুরু করে মিশরে (প্রাগুক্ত)।
পশ্চিমা বুদ্ধিবৃত্তিক অনুপ্রবেশের আরও লক্ষণ দেখা দিতে থাকে ক্ষয়িষ্ণু উসমানী সাম্রাজ্যের অন্যান্য স্থানেও। এটা ছিল শাসকদের নিমন্ত্রণ কিংবা বন্ধুসুলভ আচরণের ফলাফল। সিরিয়া ও লেবাননে যেসব মিশনারি কর্মকাণ্ডের কথা বলা হলো, তার পাশাপাশি শিক্ষাকার্যক্রমেও এর উল্লেখযোগ্য অনুপ্রবেশ ঘটে। বৈরুতে ১৮৩০ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় আমেরিকান স্কুল ফর গার্লস। একই শহরে ১৮৬৬ সালে প্রতিষ্ঠিত সিরিয়ান প্রোটেস্ট্যান্ট কলেজ পরবর্তীকালে হয় আমেরিকান ইউনিভার্সিটি অব বৈরুত। জেসুইট শিক্ষাকার্যক্রমের ফলে ইউনিভার্সিটি অব সেন্ট জোসেফ প্রতিষ্ঠিত হয় ১৮৮১ সালে। বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠান আজও তাদের শিক্ষাসেবা প্রদান করে যাচ্ছে। এখনো পর্যন্ত এগুলোকে ধরা হয় শিক্ষাজগতের আদর্শ নমুনা হিসেবে। শিক্ষার ভাষা হিসেবে ইংরেজির ব্যবহার এবং আমেরিকান শিক্ষাবিদদের দ্বারা নির্মিত পাঠ্যক্রমের ফলে সিলেবাসে ইসলামি উপাদানকে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয়। তাই ইসলামি শিক্ষার সুদৃঢ় অস্তিত্বের সুযোগ ছিল নগণ্য। বিংশ শতাব্দীর শেষাংশ পর্যন্ত পরিস্থিতি মোটামুটি এরকমই থাকে। এরপর ইসলামি বিশ্ব একটি ইসলামি পুনর্জাগরণবাদ প্রত্যক্ষ করে, যার ফলে পাঠ্যক্রমে ইসলামি ভাবধারার উপাদান আরও বেশি করে স্থান করে নিতে থাকে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00