📄 ভূমিকা
ফিনিক্স বলা হয় আরব মরুভূমির একটি (কাল্পনিক) পাখিকে। কয়েক শতাব্দী বেঁচে থাকার পর এটি নিজেকে পুড়িয়ে মেরে ফেলে। তারপর ওই ছাই থেকে তার নতুন করে জন্ম হয়-ইসলামের পদাঙ্কের সাথে এই উপমা খুব ভালোভাবেই মিলে যায়। এই গল্পের কথক ত্রয়োদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি থেকে পঞ্চদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি।
আগের অধ্যায়ে বলা হয়েছে যে, ইসলামি খিলাফতের রাজধানী বাগদাদ মঙ্গোলদের (১২২০-১৫০০) হাতে ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। ইতিহাসবিদগণ আমাদের বলেন, লাশ আর খুলিতে থেমে গিয়েছিল ফুরাত নদীর প্রবাহ। এমনকি যে আব্বাসি খলিফা ও তার প্রতিনিধিরা মঙ্গোল অধিপতি হালাকু খাঁ-র কাছে আত্মসমর্পণের জন্য আগ বাড়িয়ে যাচ্ছিলেন, তাদেরও শেষরক্ষা হয়নি। অবশেষে উত্তর ফিলিস্তিনে ১২৬০ সালে আইন জালুতের নিষ্পত্তিমূলক যুদ্ধে তাদের অগ্রগতি রুখে দেন মিশরীয় মামলুক সুলতান বাইবার্স। তার আগ পর্যন্ত ইসলামি ভূমিগুলোকে ধ্বংস করার কাজ অব্যাহত রেখেছিল মঙ্গোলরা। আইন জালুত কিন্তু যুদ্ধের বদলা যুদ্ধের মতো কোনো কৌশলগত যুদ্ধ ছিল না। বরং তা ছিল টিকে থাকার শেষ সুযোগ। মুসলিমদের ও স্বয়ং ইসলামের টিকে থাকার প্রশ্ন জড়িত ছিল সেখানে। মঙ্গোলদের অপ্রতিরোধ্য ধ্বংসাত্মক পশ্চিমমুখী জয়যাত্রায় মিশরের মামলুকরা ছিলেন দাঁড়িয়ে থাকা সর্বশেষ দূর্গ। কোনোক্রমে যদি মঙ্গোলরা মামলুকদের ওপর চড়াও হয়ে যেত, তাহলে ইসলামের পবিত্র তীর্থস্থান মক্কা ও মদীনা একেবারেই অরক্ষিত হয়ে পড়ত পরবর্তী ধ্বংসযজ্ঞের স্থান হিসেবে। ইসলামি তীর্থস্থানকে ধ্বংসের হুমকিতে পড়তে দেখে নিশ্চয়ই মুসলিমগণ মামলুকদের পক্ষে জিহাদের জন্য কাতারবদ্ধ হয়ে যোগ দিয়ে থাকবেন। মামলুকগণ ছিলেন সুন্নি মুসলমান। মুসলিমদের অন্তরে এটা কোনো ভূখণ্ডের বা এমনকি খিলাফত রক্ষার লড়াইও ছিল না। এ যুদ্ধ ছিল আল্লাহর দ্বীনের জন্য। যত যা-ই হোক, শতাব্দীর শেষ দিকে মুসলিম বিশ্বের ভাগ্য এক অনাকাঙ্ক্ষিত মোড় নেয়।
মঙ্গোল ধ্বংসযজ্ঞের ফলে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ইসলামি সভ্যতার ধ্বংসাবশেষে ত্রয়োদশ শতাব্দীর শেষে ও চতুর্দশ শতাব্দীর শুরুতে অগ্নিশিখা ঝলকে ওঠে। আর ইসলামি বিশ্বকে মিছমার করে দিয়েছিল যারা, তারাই প্রজ্জ্বলিত করে সেই আগুন। চারটি মঙ্গোল সাম্রাজ্য ইসলামে দীক্ষিত হয়। তারা হয়ে ওঠে কেন্দ্রীয় ইসলামি ভূমিতে মুসলিমদের শক্ত সমর্থক। যেমন: হলো দজলা-ফুরাত উপত্যকায় ইল-খান, ইরানের পাহাড়ি অঞ্চল, সির-ওক্সাস অববাহিকার চাগাইতাই, ইরতিশ অঞ্চলের হোয়াইট হর্ড, এবং ভোলগা নদীর পাশে গোল্ডেন হর্ড। মধ্য এশিয়ার এই চারটি অঞ্চল থেকে বেরিয়ে আসে দুটি প্রতাপশালী ইসলামি সাম্রাজ্য-একটি হলো শিয়া সাফাভি সাম্রাজ্য, যা আজকের ইরানের ভিত্তি। আরেকটি ভারতীয় উপমহাদেশের সুন্নি মুঘল বা মঙ্গোল সাম্রাজ্য, যে অঞ্চলটি বর্তমানের পাকিস্তান ও ভারতের কিছু অংশ নিয়ে গঠিত। এখানেই শেষ না। মঙ্গোলদের পশ্চিম দিকে গড়ে ওঠে ইসলামের আরও একটি সুদীর্ঘস্থায়ী কেল্লা-তুর্কি উসমানী খিলাফত।
এই তিনটি সাম্রাজ্য ইসলামি বিশ্বের রাজনৈতিক পটভূমিকে শাসন করে চলে: উসমানী, সাফাভি, এবং মুঘল। প্রত্যেকটির ছিল স্বতন্ত্র আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতি, বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশগত বৈশিষ্ট্য এবং ইসলামি অর্থনীতির বিকাশে স্বকীয় প্রভাব। নিচে তা দেখানো হলো।