📄 আর্থিক ঝুঁকি
ইবনু খালদুন এমন বেশ কয়েকটি ব্যবসায়িক ও আর্থিক ঝুঁকি চিহ্নিত করেছেন, কোনো ব্যবসা বা ব্যবসায়ী যেগুলোর মুখোমুখি হতে পারেন। এগুলো নিম্নে উল্লেখ করা হলো: ➡ শারীরিক ঝুঁকি (Physical risk): "পণ্যকে বিকৃত করা, যা একে অচল করে দিতে পারে"। ➡ অনাদায়ী ঋণ (Bad debts): “পরিশোধে বিলম্ব করা, যা মুনাফা ধ্বংস করে দিতে পারে। কারণ এ ধরনের বিলম্ব দীর্ঘ হলে তা এমনসব কর্মকাণ্ডকে ব্যাহত করে, যা থেকে মুনাফা আসতে পারত”। ➡ নৈতিক বিপত্তি (Moral hazard): “দায়িত্বের অস্বীকৃতিও থাকবে, যা কারো পুঁজির জন্য ধ্বংসাত্মক বলে প্রমাণিত হতে পারে। সেই দায়িত্বগুলো লিখিতভাবে এবং যথাযথ সাক্ষীর উপস্থিতিতে সংরক্ষণ না করা হলে এমনটা হবে। এক্ষেত্রে মামলা-মোকদ্দমা করে তেমন লাভ নেই, কারণ আইনের সহায়তার জন্য প্রমাণ থাকা চাই”। ➡ মুনাফা বা পুঁজি হারানো (Loss of profit or capital): “এই সবকিছু ব্যবসায়ীর জন্য খুবই বিপদের কারণ হতে পারে। তার হয়তো ছোটখাটো মুনাফা হবে, কিন্তু প্রচুর বিপদ ও কষ্টের ফলে। অথবা কোনো লাভই না হতে পারে, অথবা পুঁজিই হারিয়ে যেতে পারে”।
বিস্ময়কর ও মজার ব্যাপার, ইবনু খালদুনের পরামর্শ হলো এসব ঝুঁকির কারণে সকলে ব্যবসায়ী হওয়ার জন্য যোগ্য না। তাকে হতে হবে এমন ব্যক্তি, যিনি ঝুঁকি গ্রহণ করতে ইচ্ছুক এবং ব্যবসায়ী হওয়ার মতো কিছু গুণের অধিকারী। তিনি যেন কলহ-বিবাদকে ভয় না করেন, মীমাংসা করতে জানেন, কলহে জড়ানো ও আদালতে যাওয়ার জন্য সদা প্রস্তুত থাকেন। কারণ এভাবেই তার ব্যবসায়ে ন্যায্য আচরণ পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি। আরও দারুণ বিষয় আছে। তিনি বলেছেন, “যে ব্যক্তি ভীতু বা নিরুদ্যমী, তদুপরি বিচারব্যবস্থার ওপর প্রভাবের অধিকারী নন, তাদের অবশ্যই ব্যবসা পরিহার করা উচিত”। কারণ “তিনি অন্য ব্যবসায়ীদের শিকারে পরিণত হবেন। হয়তো নিজের অধিকারটা পাবেন না তাদের কাছ থেকে। মানুষ স্বভাবতই আরেক মানুষের সম্পদের প্রতি লোভী। আইনের বিধিনিষেধ না থাকলে কারো সম্পদই নিরাপদ থাকত না। এটা বিশেষত ব্যবসায়ী ও নিম্নশ্রেনীর মানুষদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য”। ইবনু খালদুনের এই শক্ত বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, ব্যবসার সাফল্যের জন্য একটি ভালো আর্থিক নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা এবং যথাযথ আইনি সেবা কতটা গুরুত্বপূর্ণ। অবশ্য অসাধু ব্যবসায়ীরা ইবনু খালদুনের সমালোচনা থেকে বাঁচতে পারেনি।
উৎপাদন প্রক্রিয়ায় দক্ষ শ্রমিকের গুরুত্বের ব্যাপারে আলোচনা করেছেন ইবনু খালদুন। এক্ষেত্রে তিনি পেশাগত প্রশিক্ষণ ও জ্ঞান অর্জনের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন। কোনো পেশার ওপর প্রশিক্ষণ সেটার দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার ওপর কী প্রভাব ফেলে, তা তিনি আলোচনা করেছেন। বলেছেন, কেউ নিজের পেশা পাল্টে ফেললে সে ওই কাজের জন্য দরকারি দক্ষতা ও মুনশিয়ানা অর্জন করতে পারবে না। তার এসব বক্তব্যকে শ্রমবিভাগের সুবিধার প্রতি একটি পরোক্ষ ইঙ্গিত হিসেবে দেখা চলে। বিভিন্ন শাস্ত্র ও জ্ঞানের আলোচনায়ও তিনি উল্লেখযোগ্য একটি অধ্যায় রেখেছেন। সেখানে আলোচিত হয়েছে বিভিন্ন বিশেষ জ্ঞানশাস্ত্র, নির্দেশনার পদ্ধতি এবং এসব ক্ষেত্রে উদ্ভূত বিভিন্ন পরিস্থিতি। বিভিন্ন শাস্ত্রের একটি বিশদ তালিকা দিয়েছেন তিনি, যদিও দুর্ভাগ্যবশত অর্থনীতির নাম আলাদা শাস্ত্র হিসেবে ঠাঁই পায়নি। অবশ্য তাতে কী! নিকট অতীতের আগে তো অর্থনীতি এমনিতেও আলাদা শাস্ত্র হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেনি!