📄 উপার্জন, আয়, পুঁজি ও মূল্য
ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে ইবনু খালদুন রিযিক ও কাস্ব-এর মাঝে পার্থক্য করেছেন। রিযিক আল্লাহর দান, এমনকি মানুষ তা উপার্জনের জন্য চেষ্টা করলেও। যেমন সেচের জন্য ব্যবহৃত বৃষ্টি। কাস্ব হলো আল্লাহর দেওয়া জিনিসের সাথে মানুষের প্রচেষ্টা ও কর্মের সমন্বয়ে যা লাভ করা যায়। কাস্ব দুটি জিনিস নিয়ে গঠিত:
➡ প্রথমত, প্রয়োজন ও মৌলিক চাহিদার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ জীবিকা।
➡ দ্বিতীয়ত, কাস্ব থেকে মৌলিক চাহিদার চেয়েও বেশি পাওয়া গেলে, তা থেকে বিলাসীপণ্য ও পুঁজি আহরণ।
তাই কাস্ব বলতে বোঝানো যায় এমন উপার্জন, যা বেঁচে থাকা, বিলাসিতা এবং সঞ্চয়ের জন্য ব্যয় করা হয়। আরেকভাবে বললে কাসব (উপার্জন) = ভোগ ও সঞ্চয়। উপার্জন ও আয়ের মাঝে পার্থক্য খুব সূক্ষ্ম মনে হতে পারে। শব্দ দুটিকে সমার্থক হিসেবে ব্যবহার করলে ইবনু খালদুনের সমীকরণটি আধুনিক অর্থনৈতিক পরিভাষায় দাঁড়াবে,
আয় = ভোগ ও সঞ্চয়—কেইনিসিয়ান (Keynesian) সমীকরণ
তা ছাড়া ইবনু খালদুন দুই ধরনের উপার্জনের মাঝে পার্থক্যও করেছেন। এক ধরনের উপার্জন ব্যক্তি নিজের কর্ম ও প্রচেষ্টার মাধ্যমে পায়। আরেকটি আসে উপার্জন হস্তান্তর করার মাধ্যমে। প্রথমটিকে উপার্জন হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। দ্বিতীয়টি হস্তান্তরকারীর জন্য উপার্জন হলেও প্রাপকের জন্য তা নয়। বরং একে বলা হয় সম্পদ হস্তান্তরকরণ। এর একটি উদাহরণ হলো উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত সম্পদ। এই সম্পদ মৃত ব্যক্তিটির জীবদ্দশায় তার উপার্জন ছিল। কিন্তু উত্তরাধিকার হিসেবে যে পায়, তার জন্য এটা উপার্জন না। তার কাছে এটা হস্তান্তরিত সম্পদ। এই সূক্ষ্ম পার্থক্যের দুটি প্রভাব রয়েছে:
➡ প্রথমত, উপার্জন লাভের জন্য কর্ম ও প্রচেষ্টার নৈতিক মূল্য, এবং
➡ দ্বিতীয়ত, উপার্জন বা আয়ের সাথে পুঁজির পার্থক্য।
শেষের এই ব্যাপারটির ওপর জোর দিয়ে ইবনু খালদুন বলেন যে, উত্তরাধিকার লাভকারীরা সেটি ব্যবহার করলে তা থেকে উৎপাদিত উপযোগকে আয় হিসেবে আখ্যায়িত করা চলে।
এরপর ইবনু খালদুন মূল্যের ধারণা নিয়ে আলাপ করেন। অন্যান্য নিয়ামককে উপেক্ষা না করেই তিনি শ্রমকে মূল্যের একটি প্রধান নির্ধারক হিসেবে অভিহিত করেন। তিনি বলেন, “বড় হোক বা ছোট, মূল্যের একটি অংশ শ্রম থেকে আসে”। কিন্তু এই ধারণার ব্যবহারকে তিনি দুটি প্রধান নিয়ামক দিয়ে প্রশমিত করেন:
➡ প্রথমত, যে জিনিসটির মূল্য পরিমাপ করা হচ্ছে, তার ধরন এবং সেই জিনিসটির উৎপাদনে শ্রমের গুরুত্ব।
দ্বিতীয়ত, উৎপাদনের জন্য দরকারি দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার মাত্রা।
প্রথমটির ব্যাপারে তিনি কৃষিখাতের একটি উদাহরণ ব্যবহার করে বলেন, “যেসব এলাকায় কৃষিকাজের জন্য যত্ন ও জিনিসপত্র কম দরকার হয়, সেখানে শ্রমের অংশটি গোপন থাকতে পারে”। দ্বিতীয়টির ক্ষেত্রে অর্থাৎ দক্ষ শ্রমিক ও উচ্চ অভিজ্ঞতার ব্যাপারে তিনি বলেন, “আরও জেনে রাখা উচিত যে, ব্যক্তির উপার্জিত পুঁজি যদি কারুশিল্পের দ্বারা অর্জিত হয়ে থাকে, তাহলে সেটি তার শ্রম থেকে প্রাপ্ত বাস্তব মূল্য। মূলত শ্রম ছাড়া এখানে কিছুই নেই, কারণ অর্জন হিসেবে সেটিকে স্বতন্ত্রভাবে কেউ চায় না"। ইবনু খালদুনের দেওয়া উদাহরণকে আরও বাড়ালে গহনা, চারুকর্ম, শোভাবর্ধক জিনিসপত্র, কাপড়ের কারুকাজ ইত্যাদিকেও মূল্যবান বলা যায়। কারণ এগুলোর উৎপাদনে উচ্চমাত্রার দক্ষতা, শৈল্পিক সক্ষমতা ও অভিজ্ঞতার প্রয়োজন হয়। বা ইবনু খালদুন যেমন আরও ব্যাখ্যা করেছেন, “কিছু কারুকর্ম অন্যগুলোর সাথে সম্পর্কিত। যেমন ছুতার ও তাঁতীর কাজ যথাক্রমে কাঠ ও সুতার সাথে সম্পর্কিত। কিন্তু এই দুটি শিল্পে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো শ্রম (যা এতে প্রয়োগ করা হয়), এগুলোর মূল্য বেশি"।
তবে একটা জিনিস বুঝতে হবে যে, ইবনু খালদুনের সময় ব্যাপক উৎপাদনের প্রচলন আসেনি। উৎপাদনে শৈল্পিক কাজের পরিমাণ নির্ভর করত প্রধানত মানবীয় দক্ষতার ওপর। এসব ক্ষেত্রে শ্রম দ্বিতীয় স্থানে থাকতে পারে। অথচ ব্যাপক উৎপাদনের ক্ষেত্রে শ্রম খুব বেশি গুরুত্বপূর্ণ নয়। তাই সেখানে শ্রমের প্রতি আরোপিত মূল্য কম। মূল্যের বাকি অংশ আরোপিত হয় উৎপাদনকর্মের সাথে সম্পর্কিত অন্যান্য নিয়ামকের ওপর, যেগুলো আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। যেমন পুঁজি ও উদ্যোগ। তবে আমাদের এই চিন্তার আগাম পূর্বাভাস দিয়ে ইবনু খালদুন ইতোমধ্যেই বলে দিয়েছেন যে, শ্রম থেকে “বড় হোক বা ছোট", একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ মূল্য আসেই。
📄 বাণিজ্য
বাণিজ্য ও তার সাথে সম্পর্কিত আর্থিক ঝুঁকির ব্যাপারে ইবনু খালদুন কিছু দারুণ আলাপ এনেছেন। প্রথমে বাণিজ্যের উদাহরণ দেন তিনি। তার মতে এর অর্থ “পণ্য ক্রয় করে তা ক্রয়মূল্যের চেয়ে বেশি দামে বিক্রির চেষ্টার মাধ্যমে নিজের পুঁজি বৃদ্ধি করা। বেশি দাম পাওয়া যায় বাজারের ওঠানামার জন্য অপেক্ষা করার মাধ্যমে। অথবা সেই পণ্যকে এমন জায়গায় পরিবহন করার মাধ্যমে, যেখানে এর চাহিদা আরও বেশি এবং দামও বেশি। আরেকটি পদ্ধতি হলো ভবিষ্যতের কোনো তারিখে উচ্চতর মূল্য পরিশোধের চুক্তিতে বিক্রি করা”। এই সংজ্ঞা থেকে নিম্নলিখিত বিষয়গুলোর ওপর আলোকপাত করা যায়:
বাণিজ্য হলো পুঁজি বিকশিত করার একটি মাধ্যম। আর এটা করার পদ্ধতি হলো, ক্রয়মূল্যের চেয়ে বেশি দামে বিক্রি করা। দামের এই পার্থক্যকে ইবনু খালদুন উল্লেখ করেছেন 'লাভ' হিসেবে। এর উপায় হলো, বাজারের দর ওঠানামার জন্য অপেক্ষা করা, বা পণ্যটি এমন অঞ্চলে পরিবহন করা যেখানে দাম বেশি, বা এখন বিক্রি করে ভবিষ্যতে মূল্য পরিশোধের চুক্তি করা।
ঊনবিংশ শতাব্দীর পর থেকে যে অর্থনৈতিক ধারণা পরিচিতি লাভ করে, উল্লিখিত সংজ্ঞাটি তার সাথে খাপে খাপে মিলে যায়। কিছু উদাহরণ হলো ফিজিওক্র্যাট টার্গোটের মূল্য-বিনিময়ের ধারণা (Value-exchange), প্রশংসামূলক মূল্য (valeur appreciative), মুনাফার ধারণা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে তুলনামূলক সুবিধার ধারণা এবং ঋণে বিক্রয় ও টাকার সময়মান (time value of money)।
তা ছাড়া ইবনু খালদুন ব্যবসার ক্ষেত্রে একটি আগ্রহ উদ্রেককারী ধারণা প্রদান করেছেন। সম্ভবত সেটা কস্ট-প্লাস দর (cost-plus pricing) নির্ধারণে উদ্যোক্তার প্রান্তিক লভ্যাংশ নির্ণয়ে কার্যকর। তিনি ব্যাখ্যা করেন যে, যদিও "পুঁজির সাপেক্ষে লাভ অল্প হয়, পুঁজি বড় হলে লভ্যাংশও বড় হবে। কারণ ছোট জিনিস অনেকগুলো হলেও তা বড়ই হয়"। এই যুক্তিটিকে আরেকটু প্রশস্ত করলে একে ব্যবহার করে- বিনিয়োগকৃত পুঁজি থেকে প্রাপ্ত অভ্যন্তরীণ মুনাফার হার এবং বিনিয়োগ মূল্যায়নে নিট বর্তমান পদ্ধতির পার্থক্যও বোঝা যায়। বিশেষত বড় প্রকল্পের ক্ষেত্রে বর্তমান মূল্য পদ্ধতিকে লভ্যাংশের অভ্যন্তরীণ হারের চেয়ে উত্তম হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়ে থাকে। এটা ঠিক যে, ইবনু খালদুন মোট বর্তমান মূল্য নিয়ে সেভাবে কথা বলেননি। কিন্তু ধারণাগত মূলনীতির সাথে সাদৃশ্যটা অবশ্যই আছে।
📄 আর্থিক ঝুঁকি
ইবনু খালদুন এমন বেশ কয়েকটি ব্যবসায়িক ও আর্থিক ঝুঁকি চিহ্নিত করেছেন, কোনো ব্যবসা বা ব্যবসায়ী যেগুলোর মুখোমুখি হতে পারেন। এগুলো নিম্নে উল্লেখ করা হলো: ➡ শারীরিক ঝুঁকি (Physical risk): "পণ্যকে বিকৃত করা, যা একে অচল করে দিতে পারে"। ➡ অনাদায়ী ঋণ (Bad debts): “পরিশোধে বিলম্ব করা, যা মুনাফা ধ্বংস করে দিতে পারে। কারণ এ ধরনের বিলম্ব দীর্ঘ হলে তা এমনসব কর্মকাণ্ডকে ব্যাহত করে, যা থেকে মুনাফা আসতে পারত”। ➡ নৈতিক বিপত্তি (Moral hazard): “দায়িত্বের অস্বীকৃতিও থাকবে, যা কারো পুঁজির জন্য ধ্বংসাত্মক বলে প্রমাণিত হতে পারে। সেই দায়িত্বগুলো লিখিতভাবে এবং যথাযথ সাক্ষীর উপস্থিতিতে সংরক্ষণ না করা হলে এমনটা হবে। এক্ষেত্রে মামলা-মোকদ্দমা করে তেমন লাভ নেই, কারণ আইনের সহায়তার জন্য প্রমাণ থাকা চাই”। ➡ মুনাফা বা পুঁজি হারানো (Loss of profit or capital): “এই সবকিছু ব্যবসায়ীর জন্য খুবই বিপদের কারণ হতে পারে। তার হয়তো ছোটখাটো মুনাফা হবে, কিন্তু প্রচুর বিপদ ও কষ্টের ফলে। অথবা কোনো লাভই না হতে পারে, অথবা পুঁজিই হারিয়ে যেতে পারে”।
বিস্ময়কর ও মজার ব্যাপার, ইবনু খালদুনের পরামর্শ হলো এসব ঝুঁকির কারণে সকলে ব্যবসায়ী হওয়ার জন্য যোগ্য না। তাকে হতে হবে এমন ব্যক্তি, যিনি ঝুঁকি গ্রহণ করতে ইচ্ছুক এবং ব্যবসায়ী হওয়ার মতো কিছু গুণের অধিকারী। তিনি যেন কলহ-বিবাদকে ভয় না করেন, মীমাংসা করতে জানেন, কলহে জড়ানো ও আদালতে যাওয়ার জন্য সদা প্রস্তুত থাকেন। কারণ এভাবেই তার ব্যবসায়ে ন্যায্য আচরণ পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি। আরও দারুণ বিষয় আছে। তিনি বলেছেন, “যে ব্যক্তি ভীতু বা নিরুদ্যমী, তদুপরি বিচারব্যবস্থার ওপর প্রভাবের অধিকারী নন, তাদের অবশ্যই ব্যবসা পরিহার করা উচিত”। কারণ “তিনি অন্য ব্যবসায়ীদের শিকারে পরিণত হবেন। হয়তো নিজের অধিকারটা পাবেন না তাদের কাছ থেকে। মানুষ স্বভাবতই আরেক মানুষের সম্পদের প্রতি লোভী। আইনের বিধিনিষেধ না থাকলে কারো সম্পদই নিরাপদ থাকত না। এটা বিশেষত ব্যবসায়ী ও নিম্নশ্রেনীর মানুষদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য”। ইবনু খালদুনের এই শক্ত বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, ব্যবসার সাফল্যের জন্য একটি ভালো আর্থিক নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা এবং যথাযথ আইনি সেবা কতটা গুরুত্বপূর্ণ। অবশ্য অসাধু ব্যবসায়ীরা ইবনু খালদুনের সমালোচনা থেকে বাঁচতে পারেনি।
উৎপাদন প্রক্রিয়ায় দক্ষ শ্রমিকের গুরুত্বের ব্যাপারে আলোচনা করেছেন ইবনু খালদুন। এক্ষেত্রে তিনি পেশাগত প্রশিক্ষণ ও জ্ঞান অর্জনের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন। কোনো পেশার ওপর প্রশিক্ষণ সেটার দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার ওপর কী প্রভাব ফেলে, তা তিনি আলোচনা করেছেন। বলেছেন, কেউ নিজের পেশা পাল্টে ফেললে সে ওই কাজের জন্য দরকারি দক্ষতা ও মুনশিয়ানা অর্জন করতে পারবে না। তার এসব বক্তব্যকে শ্রমবিভাগের সুবিধার প্রতি একটি পরোক্ষ ইঙ্গিত হিসেবে দেখা চলে। বিভিন্ন শাস্ত্র ও জ্ঞানের আলোচনায়ও তিনি উল্লেখযোগ্য একটি অধ্যায় রেখেছেন। সেখানে আলোচিত হয়েছে বিভিন্ন বিশেষ জ্ঞানশাস্ত্র, নির্দেশনার পদ্ধতি এবং এসব ক্ষেত্রে উদ্ভূত বিভিন্ন পরিস্থিতি। বিভিন্ন শাস্ত্রের একটি বিশদ তালিকা দিয়েছেন তিনি, যদিও দুর্ভাগ্যবশত অর্থনীতির নাম আলাদা শাস্ত্র হিসেবে ঠাঁই পায়নি। অবশ্য তাতে কী! নিকট অতীতের আগে তো অর্থনীতি এমনিতেও আলাদা শাস্ত্র হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেনি!