📄 উন্নয়ন, ভোগ, শ্রম ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি
এই পর্যবেক্ষণ থেকে ইবনু খালদুন ভোগপ্রবণতার ব্যাপারে এক দুর্দান্ত সিদ্ধান্তে আসেন। অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিতে এবং ব্যবসায়িক কেন্দ্র হিসেবে শহর ও নগরের বিকাশে ভোগের একটি ইতিবাচক প্রভাব থাকতে পারে। উল্টো দিকে ভোগের অভাবের ফলে পড়তে পারে তার বিপরীত প্রভাব। সঞ্চয়ের প্যারাডক্স (The Paradox of Accumulation) যাকে বলে। প্রথমে তিনি শ্রমকে সম্পদ সৃষ্টি ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের সূচনাবিন্দু হিসেবে ধরেন। কোনো শহর বা নগরে সামষ্টিক শ্রম যদি শ্রমিকদের চাহিদা ও প্রয়োজনের চেয়ে বেশি পরিমাণ উৎপাদন করে, তাহলে উদ্বৃত্ত শ্রমটুকু দুটি জিনিস সরবরাহে ব্যবহার করা যায়: ➡ (ক) শহরের বিলাসিতার অবস্থা ও প্রচলন, এবং ➡ (খ) অন্যান্য শহরের অধিবাসীদের চাহিদা পূরণ।
এসব বিলাসী পণ্যের চাহিদা ও অন্যান্য শহরে রপ্তানিকৃত পণ্যের চাহিদা যত বাড়তে থাকবে, উদ্বৃত্ত শ্রমবিশিষ্ট শহরের সম্পদ তত বৃদ্ধি পেতে থাকবে। কারণ এই লভ্যাংশ শ্রমেরই বাস্তবায়িত মূল্য। তার মানে দক্ষ শ্রমিকদের জন্য একটি চাহিদা সৃষ্টি হবে, যা প্রতিফলিত হবে শ্রমের দামের ওপর। এর ফলে সমৃদ্ধ হতে থাকবে শিল্পকারখানা ও কারুশিল্প। “এই শহরের উপার্জন ও ব্যয় বাড়বে এবং শ্রমের মাধ্যমে সেসব পণ্য উৎপাদনকারী শ্রমজীবীদের জীবনে সচ্ছলতা আসবে”।
জনসংখ্যা বাড়লে ওপরে বর্ণিত চক্র আরও পুনরাবৃত্ত হতে থাকবে। প্রাপ্ত শ্রম বাড়বে, বর্ধমান মুনাফার হাত ধরে বাড়বে বিলাসী দ্রব্যের চাহিদা। বিলাসী পণ্য লাভের জন্য সৃষ্টি হবে কারুশিল্প। সেখান থেকে বাস্তবায়িত মূল্যও বাড়বে। ফলে আবারও বহুগুণে বাড়বে শহরের মুনাফা। শহরটির উৎপাদন কর্মকাণ্ড আগের চেয়েও তীব্র গতিতে চলতে থাকবে।
মোটকথা, ইবনু খালদুন যেন বলছেন-জনসংখ্যা বৃদ্ধি অর্থনৈতিক উন্নয়নের ওপর মোটাদাগে কোনো সমস্যা আরোপ করে না। উল্টো অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি বয়ে আনতে পারে। ইবনু খালদুনের এই মতের প্রত্যুত্তরে কেউ বলতে পারে যে, এই তত্ত্ব বাস্তবায়িত হওয়ার জন্য অতিরিক্ত উৎপাদনের সুযোগে অবশ্যই থাকতে হবে। নাহলে জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফল হবে বেকারত্ব। এই তত্ত্ব বাস্তবায়নের জন্য উৎপাদনকারীদেরকে কর্মের সুযোগ সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখতে হবে।
কর্মসংস্থান সৃষ্টির ওপর সরকারি খরচের প্রভাবের ব্যাপারে কেইনির তত্ত্ব, এবং উপার্জনের ওপর ভোগ-প্রবণতার প্রভাব সংক্রান্ত তত্ত্বকে এখানে ইবনু খালদুনের মতের সাথে তুলনা হিসেবে উল্লেখ করা যায়। মজার ব্যাপার, ইবনু খালদুন তার এই পর্যবেক্ষণকে আরও ব্যাখ্যা করে বলেছেন, “প্রত্যেক শহরে উপার্জন ও ব্যয় পরস্পরের ভারসাম্য ঠিক রাখে। উপার্জন বড় মাত্রার হলে ব্যয়ভারও বড় মাত্রার হয়। উল্টোটাও সঠিক। আর যদি উপার্জন ও ব্যয়ভার উভয়টিই বড় মাত্রায় হয়, তাহলে অধিবাসীরা অধিক আরামদায়কভাবে বসবাস করতে পারে। শহরও সমৃদ্ধ হতে থাকে”.
📄 দর
দরের ওপর বাজারশক্তির প্রভাবের ব্যাপারে ইবন খালদুন দারুণভাবে সচেতন। তিনি বলেন যে, দাম প্রভাবিত হয় দুটি প্রধান নিয়ামক দ্বারা: চাহিদা ও জোগান। জোগানের অবস্থার ওপর উৎপাদনের খরচের প্রভাবও একইভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। তার মতে, এই সবগুলোই সমৃদ্ধির অবস্থার ওপর নির্ভর করে। মৌলিক ও বিলাসী পণ্যের ওপর এদের প্রভাবের মাত্রা বিভিন্নরকম। কোনো জনসমাজ যদি সমৃদ্ধিশালী হয়ে থাকে, তাহলে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দর হবে কম। বিলাসী পণ্যের দাম হবে বেশি। সমৃদ্ধি না থাকলে হবে তার বিপরীতটা। কিন্তু পরিস্থিতি এ দুয়ের যেটাই হোক, নিত্যপ্রয়োজনীয়ের দর নির্ধারণে এর চাহিদা ও জোগানের প্রভাবশালী ভূমিকা থাকবেই। প্রাচুর্যপূর্ণ অবস্থায় যথেষ্ট শ্রম ও উপযুক্ত প্রাকৃতিক সম্পদ নিবেদিত করা হবে প্রাচুর্যশালী সমাজের চাহিদা পূরণ করার জন্য। আর এই সমাজে এসব পণ্যের চাহিদা যদি স্থিতিশীল থাকে, তাহলে সম্পৃক্ত অবস্থার উপস্থিতি ও প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের অনুপস্থিতি থাকা সাপেক্ষে পণ্যের জোগান সেটির চাহিদা মেটাতে সক্ষম হবে। ফলে দামও কমে আসবে। বোঝাই যাচ্ছে যে, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও উৎপাদন খরচ বেড়ে গেলে চাহিদার সাথে জোগানের ভারসাম্য হবে না। ফলে এসব মৌলিক দ্রব্যের দাম বাড়বে। জোগানের স্থিতিস্থাপকতা হিসেবে ধরা যায় এটাকে, যদিও ইবনু খালদুন সরাসরি এই পরিভাষা ব্যবহার করেননি। এসব প্রাচুর্যশালী সমাজে বিলাসী পণ্যের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি হবে ভিন্ন: জোগান স্বাভাবিক অবস্থায় থাকলে এবং দুর্যোগ না আসলে এগুলোর দাম বেশি হবে। কিন্তু জোগান যদি অস্বাভাবিক অবস্থায় বাধাগ্রস্ত হয়, তাহলে দাম কমে আসবে। আবারও জোগানের স্থিতিস্থাপকতার ধারণা পাওয়া গেল-মৌলিক পণ্যসমূহের জন্য স্থিতিস্থাপকতা কম, কিন্তু বিলাসী পণ্যের ক্ষেত্রে বেশি। কিন্তু জোগানের স্থিতিস্থাপকতার এই অনুমিত অবস্থা অপরিবর্তনশীল নয়। অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির সাপেক্ষে এটি পরিবর্তনশীল বলে উল্লেখ করেন ইবনু খালদুন। তার ভাষ্যে, “কোনো শহরে যখন অধিক মাত্রায় উন্নত, প্রাচুর্যশালী সভ্যতা থাকে ও বিলাসী দ্রব্যে পরিপূর্ণ থাকে, তখন আরামদায়ক বস্তুর জন্য খুব ব্যাপক পরিসরে চাহিদা দেখা দেয়। নিজের পরিস্থিতির সাপেক্ষে একেকজন মানুষ সেগুলো যত বেশি পারা যায়, অর্জন করে নিতে চায়। ফলে এসব জিনিসের ব্যাপক সংকট তৈরি হয়। অনেকেই কিনতে চাইবে, কিন্তু জোগান থাকবে কম। সেগুলোর প্রয়োজন হবে বিবিধ উদ্দেশ্যে। বিলাসী পণ্যের প্রতি অভ্যস্ত ধনবান লোকেরা মাত্রাতিরিক্ত মূল্য দিতে চাইবে সেগুলোর জন্য। কারণ অন্য যে কারো চেয়ে এগুলোর প্রয়োজন তাদের বেশি। তাই, দাম বেড়ে যাবে”। এই ব্যাখ্যা থেকে পশ্চাতমুখী চাহিদার অবস্থা চিহ্নিত করা যায়। দাম বাড়া সত্ত্বেও চাহিদা বাড়তে থাকে।
📄 শ্রমের দর
শ্রমের দরের ব্যাপারে ইবনু খালদুন বলেন যে, অর্থনৈতিক উন্নয়নের স্তর বাড়তে থাকার সাথে সাথে শ্রমের খরচও বাড়তে পারে। “প্রাচর্যশালী সভ্যতাসম্পন্ন শহরে কারুশিল্প ও শ্রম ব্যয়বহুল”, বলেন তিনি। তার দৃষ্টিতে, এর কারণ তিনটি।
➡ ১. বিলাসী পণ্যের চাহিদার কারণে তাদের প্রয়োজনীয় দক্ষতাগুলো খুব দরকার হয়।
➡ ২. কম প্রাচুর্যশালী সমাজে যত কর্মঘণ্টা ব্যয় করতে হতো, এখানে ততটা করতে হচ্ছে না। তাই কারখানা শ্রমিকরা তাদের সেবার জন্য অধিক দাম হাঁকাতে পারেন।
➡ ৩. বিলাসী পণ্যের পেছনে "অপচয়যোগ্য টাকা”র অধিকারী মানুষের সংখ্যা বেশি থাকবে, যারা এসব পণ্যের একচ্ছত্র মালিক হওয়ার বাসনায় উদ্গ্রীব। ফলে এই পণ্যগুলোর জন্য অন্তর্নিহিত মূল্যের চেয়েও বেশি খরচ করার জন্য আগ্রহী হয়ে থাকবেন তারা।
📄 উপার্জন, আয়, পুঁজি ও মূল্য
ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে ইবনু খালদুন রিযিক ও কাস্ব-এর মাঝে পার্থক্য করেছেন। রিযিক আল্লাহর দান, এমনকি মানুষ তা উপার্জনের জন্য চেষ্টা করলেও। যেমন সেচের জন্য ব্যবহৃত বৃষ্টি। কাস্ব হলো আল্লাহর দেওয়া জিনিসের সাথে মানুষের প্রচেষ্টা ও কর্মের সমন্বয়ে যা লাভ করা যায়। কাস্ব দুটি জিনিস নিয়ে গঠিত:
➡ প্রথমত, প্রয়োজন ও মৌলিক চাহিদার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ জীবিকা।
➡ দ্বিতীয়ত, কাস্ব থেকে মৌলিক চাহিদার চেয়েও বেশি পাওয়া গেলে, তা থেকে বিলাসীপণ্য ও পুঁজি আহরণ।
তাই কাস্ব বলতে বোঝানো যায় এমন উপার্জন, যা বেঁচে থাকা, বিলাসিতা এবং সঞ্চয়ের জন্য ব্যয় করা হয়। আরেকভাবে বললে কাসব (উপার্জন) = ভোগ ও সঞ্চয়। উপার্জন ও আয়ের মাঝে পার্থক্য খুব সূক্ষ্ম মনে হতে পারে। শব্দ দুটিকে সমার্থক হিসেবে ব্যবহার করলে ইবনু খালদুনের সমীকরণটি আধুনিক অর্থনৈতিক পরিভাষায় দাঁড়াবে,
আয় = ভোগ ও সঞ্চয়—কেইনিসিয়ান (Keynesian) সমীকরণ
তা ছাড়া ইবনু খালদুন দুই ধরনের উপার্জনের মাঝে পার্থক্যও করেছেন। এক ধরনের উপার্জন ব্যক্তি নিজের কর্ম ও প্রচেষ্টার মাধ্যমে পায়। আরেকটি আসে উপার্জন হস্তান্তর করার মাধ্যমে। প্রথমটিকে উপার্জন হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। দ্বিতীয়টি হস্তান্তরকারীর জন্য উপার্জন হলেও প্রাপকের জন্য তা নয়। বরং একে বলা হয় সম্পদ হস্তান্তরকরণ। এর একটি উদাহরণ হলো উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত সম্পদ। এই সম্পদ মৃত ব্যক্তিটির জীবদ্দশায় তার উপার্জন ছিল। কিন্তু উত্তরাধিকার হিসেবে যে পায়, তার জন্য এটা উপার্জন না। তার কাছে এটা হস্তান্তরিত সম্পদ। এই সূক্ষ্ম পার্থক্যের দুটি প্রভাব রয়েছে:
➡ প্রথমত, উপার্জন লাভের জন্য কর্ম ও প্রচেষ্টার নৈতিক মূল্য, এবং
➡ দ্বিতীয়ত, উপার্জন বা আয়ের সাথে পুঁজির পার্থক্য।
শেষের এই ব্যাপারটির ওপর জোর দিয়ে ইবনু খালদুন বলেন যে, উত্তরাধিকার লাভকারীরা সেটি ব্যবহার করলে তা থেকে উৎপাদিত উপযোগকে আয় হিসেবে আখ্যায়িত করা চলে।
এরপর ইবনু খালদুন মূল্যের ধারণা নিয়ে আলাপ করেন। অন্যান্য নিয়ামককে উপেক্ষা না করেই তিনি শ্রমকে মূল্যের একটি প্রধান নির্ধারক হিসেবে অভিহিত করেন। তিনি বলেন, “বড় হোক বা ছোট, মূল্যের একটি অংশ শ্রম থেকে আসে”। কিন্তু এই ধারণার ব্যবহারকে তিনি দুটি প্রধান নিয়ামক দিয়ে প্রশমিত করেন:
➡ প্রথমত, যে জিনিসটির মূল্য পরিমাপ করা হচ্ছে, তার ধরন এবং সেই জিনিসটির উৎপাদনে শ্রমের গুরুত্ব।
দ্বিতীয়ত, উৎপাদনের জন্য দরকারি দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার মাত্রা।
প্রথমটির ব্যাপারে তিনি কৃষিখাতের একটি উদাহরণ ব্যবহার করে বলেন, “যেসব এলাকায় কৃষিকাজের জন্য যত্ন ও জিনিসপত্র কম দরকার হয়, সেখানে শ্রমের অংশটি গোপন থাকতে পারে”। দ্বিতীয়টির ক্ষেত্রে অর্থাৎ দক্ষ শ্রমিক ও উচ্চ অভিজ্ঞতার ব্যাপারে তিনি বলেন, “আরও জেনে রাখা উচিত যে, ব্যক্তির উপার্জিত পুঁজি যদি কারুশিল্পের দ্বারা অর্জিত হয়ে থাকে, তাহলে সেটি তার শ্রম থেকে প্রাপ্ত বাস্তব মূল্য। মূলত শ্রম ছাড়া এখানে কিছুই নেই, কারণ অর্জন হিসেবে সেটিকে স্বতন্ত্রভাবে কেউ চায় না"। ইবনু খালদুনের দেওয়া উদাহরণকে আরও বাড়ালে গহনা, চারুকর্ম, শোভাবর্ধক জিনিসপত্র, কাপড়ের কারুকাজ ইত্যাদিকেও মূল্যবান বলা যায়। কারণ এগুলোর উৎপাদনে উচ্চমাত্রার দক্ষতা, শৈল্পিক সক্ষমতা ও অভিজ্ঞতার প্রয়োজন হয়। বা ইবনু খালদুন যেমন আরও ব্যাখ্যা করেছেন, “কিছু কারুকর্ম অন্যগুলোর সাথে সম্পর্কিত। যেমন ছুতার ও তাঁতীর কাজ যথাক্রমে কাঠ ও সুতার সাথে সম্পর্কিত। কিন্তু এই দুটি শিল্পে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো শ্রম (যা এতে প্রয়োগ করা হয়), এগুলোর মূল্য বেশি"।
তবে একটা জিনিস বুঝতে হবে যে, ইবনু খালদুনের সময় ব্যাপক উৎপাদনের প্রচলন আসেনি। উৎপাদনে শৈল্পিক কাজের পরিমাণ নির্ভর করত প্রধানত মানবীয় দক্ষতার ওপর। এসব ক্ষেত্রে শ্রম দ্বিতীয় স্থানে থাকতে পারে। অথচ ব্যাপক উৎপাদনের ক্ষেত্রে শ্রম খুব বেশি গুরুত্বপূর্ণ নয়। তাই সেখানে শ্রমের প্রতি আরোপিত মূল্য কম। মূল্যের বাকি অংশ আরোপিত হয় উৎপাদনকর্মের সাথে সম্পর্কিত অন্যান্য নিয়ামকের ওপর, যেগুলো আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। যেমন পুঁজি ও উদ্যোগ। তবে আমাদের এই চিন্তার আগাম পূর্বাভাস দিয়ে ইবনু খালদুন ইতোমধ্যেই বলে দিয়েছেন যে, শ্রম থেকে “বড় হোক বা ছোট", একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ মূল্য আসেই。